সকাল সকাল একেবারে ফর্মাল গেটআপ নিয়েই রুম থেকে বেরিয়ে এলো আবির নিবিড়। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে দুজনেই চোখে চোখে কি সব যেন বলছে। সাবিহা তাকিয়ে দেখে তার ছেলে দুটোকে। মাঝে মধ্যে নিজেই সন্দেহে পড়ে যায় তিনি, যে এমন দু দুটো রাজপুত্র সে জন্ম দিয়েছে।
"কি দেখছো গিন্নি? "
আজমল চৌধুরীর মিষ্টি ডাকে তার দিকে হাসি মুখে ফিরে তাকায় সাবিহা। বলে...
"ছেলে দুটো দেখতে কার মতো হয়েছে বলো তো? "
"কেন? আমাদের দু জনের মতো।"
"আমার দু দুটো রাজপুত্রের জন্য এবার বউ আনতে হবে ঘরে। "
আজমল চৌধুরী পেপারের অপর পৃষ্ঠায় গিয়ে বললেন..
"তা আমি কি কথা বলবো ওদের সাথে? কাউকে পছন্দ করে কিনা,শত হলেও আমারই তো ছেলে, তোমাকে যেভাবে ভালোবেসে বিয়ে করে নিয়ে এসেছিলাম,সেভাবে ওরাও..."
সাবিহার মুখ করুণ হয়ে যায়, তা দেখে আজমল বলে উঠে..
"আহা, এতো অভিমান কিসের গিন্নি? তুমি একটা আশা করতেই পারো, তবে সেই আশা বাস্তবায়নের জন্য তোমাকেও তো একটু আকটু পরিশ্রম করতে হবে। "
সাবিহা বুদ্ধিমতী বরাবরই। তাই আজমলের কথা বুঝতে তার খুব একটা সময় ব্যয় হলো না। হেঁসে তাকায় ছেলেদের দিকে..
"গুড মর্নিং এভরিওয়ান,.. "
আবির নিবিড় একত্রেই বলে ওঠে কথাটি, এটা রোজকার অভ্যাস। এগিয়ে এসে সোফায় বসে দুজনেই। নিবিড় এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে...
"বাড়ি এতো নীরব কেন আম্মু? ছোটপাখি থাকলে তো এতটা নীরব থাকার কথা না। "
আয়েশা চায়ের ট্রে নিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলে...
"চারটেতে মিলে কাল রাত তিনটে পর্যন্ত লুডু খেলেছে। এখন একটাও আর ঘুম থেকে উঠছে না। "
"আমি উঠে গেছি মেঝো আন্টি। "
সিঁড়ির দিকে তাকাতেই দেখে এক পাখি হাসি মুখে নেমে আসছে। তবে সেটা কোন পাখি তা ঠিক চিনে উঠতে পারলো না আবির নিবিড়। আয়েশা এগিয়ে গিয়ে তাকে এনে সোফায় বসতে বললো। সাবিহাও বলে...
"আজ কি ভার্সিটি যাওয়া হচ্ছে তোদের আম্মু? "
পাখি উত্তর দিলো...
"না আন্টি, ওরা উঠুক, একটু পরেই বেরোবো একটা কাজে। "
আবির চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করে..
"তুমি... কোন পাখি? "
জিসান বলতে নিচ্ছিলো..
"আরে তোরা এখনো ওদের মধ্যে ঘুলিয়ে ফেলিস,ও তো.... "
"ছোটপাখি, আ্ আমি ছোটপাখি। "
বলেই হাসলো পাখি। জিসান তার দিকে তাকাতেই পাখি একটি অদ্ভুত হাসি দিলো।জিসানও বুঝে গিয়ে মজা নেওয়ার ব্যস্ত হলো। আবির এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে পাখির দিকে। তা খেয়ালে আসতেই পাখি একটু নড়েচড়ে বসে,দৃষ্টি নামিয়ে ফেলে। সে নার্ভাস হচ্ছে, তা দেখেই হেঁসে ফেলে আবির। তবে তা বুঝতে না পেরে ঠান্ডা স্বরে বললো...
"চড়াই? "
"জ্বী ভাইয়া? "
পাখির উত্তর দেওয়ার ধরন দেখে এবার নিবিড়ও মুখ টিপে হেঁসে উঠলো। আবির নিবিড় একে অপরের দিকে তাকায়, তারপর আবির বলে...
"আমার জন্য আরেক কাপ চা নিয়ে আসো তো.. "
"এক্ষুনি আনছি ভাইয়া "
বলেই পাখি উঠে গিয়ে চা নিয়ে আসে আবিরের জন্য। সেটা দেওয়ার সময় সে লক্ষ্য করে আবির আবারো কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে। একটু অপ্রস্তুত হয় সে। মিনমিনে স্বরে বলে...
"এ্ এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন ভাইয়া? ক্ কিছু বলবেন? "
আবির চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বললো...
"তোমাকে যতটা শান্ত ভেবেছিলাম তুমি ততটাও নও। তবে আমাদের সাথে চালাকিটা করতে যেও না। ঐ পেঙ্গুইনটার চোখ কখনোই এত স্থির থাকে না। "
আবিরের কথা শেষ হতে না হতেই নিবিড় বলে ওঠে...
"আর চড়ুইপাখি কখনোই ভাইকে এত সুন্দর করে ভাইয়া ডাকে না। "
পাশ থেকে জিসান সহ আজমলরাও হেঁসে ফেলে নিবিড়ের কথায়। আসমত রয়েসয়ে বললো...
" পাখিদের চিনতে আমরা ওদের চুলের দিকে তাকাই, আর তোরা চোখ দেখেই বুঝে গেলি? "
নিবিড় জিজ্ঞেস করলো..
"চুল দেখে মানে? "
"বড়পাখির চুল নিচের দিকে একটু লতানো,আর ছোট পাখির চুল একদম সোজা।"
আবির উঠে দাঁড়ায়, সাবিহা দেখে বলে..
"ব্রেকফাস্ট করে নে আবির বাবা। "
"আসছি আম্মু,ওদের নিয়ে আসছি,এতক্ষণ ঘুমালে ভার্সিটি যাবে কখন।"
বলতে বলতেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায় আবির। আহিশের ঘরে গিয়ে দেখে সে নেই কোথাও। তারপর জেসির রুমের সামনে যেতেই জেসি বেরিয়ে আসে হামি তুলতে তুলতে...
"গুড মর্নিং ভাইয়া। তুমিও কি সারপ্রাইজের বিষয়ে কথা বলতে আসছিলে? "
"কিসের সারপ্রাইজ, সকাল সকাল কি মাথা গেছে? "
"সরি ভাইয়া, আমি আসলে স্বপ্নে দেখছিলাম আরকি। "
"ওরা কোথায়? "
"রুমেই আছে ভাইয়া, ঘুমাচ্ছে। "
"আহিশ?"
"ও ও রুমেই। আমি আসছি ভাইয়া। "
বলেই জেসি পাশ কাটিয়ে চলে যায় নিচে। এদিকে আবিরের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ঠুনকো কারনেই আহিশের উপর রাগ হতে থাকে কেন জানি। যতই সমবয়সী হোক বন্ধু হোক,এক সাথে রাতে ঘুমানোর মতো তো আর ছোট নেই ওরা।
এসব ভাবতে ভাবতেই আবির জেসির রুমে ঢুকে। সাথে সাথেই চোখে পড়ে চড়ুই পাখির বেসামাল অবস্থা। নাক মুখ কুঁচকে ফেলে আবির, মেয়ে মানুষের শোয়ার ধরন এতো বাজে কেন?
চড়ুইয়ের চার হাত পা চার দিকে ছড়ানো। মাথার চুল গুলো দেখে হুট করেই আওলিয়া পীর বাবা মনে হবে যে কারোর। আবির এগিয়ে যায় চড়ুইয়ের কাছে। মুখের উপর থেকে চুল গুলো সরিয়ে ঠিক করে দিতেই খেয়াল করে চড়ুইয়ের মুখ খোলা। আল্লাহর গজব, এই মেয়ে এভাবে কেমনে ঘুমায়
ঠোট গোল করে নিশ্বাস ফেলে আবির এক বৃহত্তর পদক্ষেপ গ্রহন করে। চড়ুইয়ের ঘুম সম্পর্কে এই ক'দিনে বেশ অবগত হয়েছে সে। তাই এত ডাকাডাকির ঝামেলা না করে এক টানে উঠিয়ে বসায় চড়ুইকে।
হকচকিয়ে ওঠে চড়ুই, থতমত খেয়ে এদিক ওদিক তাকাতেই আবিরকে দেখে মুখ কুঁচকে নেয় সে। ঘুম ঘুম কন্ঠে বিরক্তির সহীত বলে ওঠে...
"আল্লাহ, এনাকে কোন কুক্ষনে আমার সাথে দেখা করালে তুমি। আমার ঘুমেও এনার সমস্যা। "
আবির মুখ কুঁচকে বললো..
"বিচার না দিয়ে আগে মুখ মুছে নাও ওয়াইফি, উহ ছিহ। এত বড় দামড়ির মুখ থেকে লালা পড়ে।"
চড়ুই তেতে ওঠে, ক্ষেপে গিয়ে বলে..
"আমার মুখ থেকে লালা পড়লে আপনার সমস্যা কি? বেশি ইয়াক ওয়াক করলে একদম খাইয়ে দেবো লালা।"
"শ্লেষা খেতে পারলে লালাও খেতে পারবো,সমস্যা নেই। "
"খাওয়াবো আপনাকে আরো কত কিছু। "
বলতে বলতেই দু হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙে চড়ুই, আবির সেই আগের মতোই মুখ কুঁচকে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করে এমন কান্ড গুলো।
"আহিশ কোথায়?"
"বারান্দায় "
"ও বারান্দায় কি করছে? "
"কাল রাতে বাজি ধরা হয়েছিলো যে খেলায় হারবে তাকে বারান্দায় ঘুমাতে হবে। তাই আহিশসার বাচ্চা বারান্দায়। "
আবির হতভম্ব হয়ে তাকায় বারান্দার দিকে, রুমের ভেতর থেকে দরজা লক করা, আবির উঠে দরজা খুলে দেখে আহিশ ফ্লোরে লুটিয়ে ঘুমাচ্ছে। একটা হাফ নিশ্বাস ফেলে আবার রুমে আসে আবির।
চড়ুইও খাট থেকে নেমেই দরজার দিকে এগিয়ে যায় সে। তখনই পেছন থেকে আবির তার এক হাত টেনে ধরে বাঁধা দেয়..
"কোথায় যাচ্ছো? "
"পাবনা যাচ্ছি, যাবেন? "
আবির চড়ুইয়ের দিকে উপর নিচ তাকিয়ে বলে ওঠে...
"দেখতেও তেমনই লাগছে,মানাবে তোমায় পাবনায়। "
"কি বিরক্তিকর আলামত আপনি বলুন তো? নিচে যাচ্ছি। "
"এভাবে? পাগলের মতো? "
চড়ুই দু হাত দিয়ে চুল গুলোকে খোঁপা করে নিয়ে আবার এগিয়ে যেতে নিলে আবির আবারও তার হাত টেনে ধরে।
"উফ দানাবল,,আপনাকে তো আমি...."
"চেঞ্জ করে তারপর যাও মেয়ে। জামার পেছনে স্ক্র্যাচ পড়েছে তোমার। "
চড়ুই মুখ ঘুরিয়ে নিজের পেছনে তাকায়, জামাটাও একটু টেনে সামনে এনে দেখে আবিরের কথাই সত্য। লজ্জা পায় সে, আর একটিও বাক্য ব্যয় না করে দ্রুত ছুটে যায় ওয়াশরুমে। আবির হাফ নিশ্বাস ফেলে নিজে নিজেই বিরবির করে..
"এত্তো বেখেয়ালি মেয়েটা। কখন কার সামনে নিজের মান ইজ্জতের ফালুদা করে ফেলে কে জানে।"
-------
সুহাসকে দেখতে যাবে আহিশ, জেসি আর পাখিরা। এই কথাটা শুনেই নিবিড়ের মাথায় রক্ত চড়ে বসে। তার উপর ওদের সুহাসের বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছে তারই উপর। আবির ইতোমধ্যেই অফিসের জন্য বেরিয়ে গেছে। নিবিড় গাড়িতে বসে অপেক্ষা করছে আর রাগে ফুঁসছে। সবাই এসে একে একে গাড়িতে উঠে বসে। আহিশ বসে নিবিড়ের পাশে, আর বাকি তিনজন পেছনে উঠে বসে। নিবিড় রাগে জোরসে গাড়ি স্টার্ট দেয়, তা দেখেই পেছন থেকে চড়ুই বলে ওঠে...
"এই এই ভাইয়া, এত রাগ ঝাড়ছেন কেন আমাদের উপর? দানাবলের ভাই আনাবল হতে চাইছেন নাকি আপনি? গাড়ি আস্তে চালান। "
নিবিড় নিভে আসে, গাড়ির স্পিড স্লো করে চাপা রাগ নিয়েই চালাতে থাকে গাড়ি। অন্য সময় হলে তার মুখে কথার খই ফুটতো চড়ুইয়ের মতো। কিন্তু আজ সে একটি বাক্যও ব্যয় করছে না, যেটা দোয়েল খুব ভালো ভাবেই লক্ষ্য,করছে।কিন্তু নিবিড়ের হঠাৎ এমন রাগের কারন খুঁজে পাচ্ছে না সে।
সুহাসের বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই নিবিড় ছাড়া সবাই নেমে দাঁড়ায়, একে একে ভেতরে যেতে থাকে তারা। দোয়েলের মন মানছে না কেন জানি। একটু এগিয়েই পেছন ফিরে তাকায় সে, নিবিড় গাড়িতে বসেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকেই। দৃষ্টির কোনো নড়চড় নেই। দোয়েল আবার সামনে ফিরে যায়, দু কদম এগিয়ে বুজে সাহস সঞ্চার করে আবার পেছন ফিরে তাকায়। এবারও নিবিড় একি ভাবে তার দিকে তাকিয়ে। দোয়েল মনের দোটানায় পড়ে, শেষমেশ আর কিছু না ভেবেই নিবিড়ের দিকে আসতে থাকে সে। তাকে আসতে দেখে নিবিড়ও গাড়ি থেকে নেমে বুকে দু হাত গুঁজে দাঁড়ায়।
"আ্ আপনি যাবেন না সুহাসকে দেখতে? "
দোয়েল দোনোমনা করে প্রশ্নটি করেই বসে নিবিড় কে।
"ও কি আমার বয়ফ্রেন্ড? যে দেখতে যেতেই হবে? "
"তা নয়, কিন্তু এতদূর যখন এসেছেন একবার না হয়.... শুনলাম বেশ মেরেছে ওকে কারা যেন। "
দোয়েলের কথায় নিবিড়ের রাগ একটু একটু করে বাড়তে থাকে। সে কেন ঐ ছেলেটিকে নিয়ে এত পজেসিভ হবে? হতে হলে নিবিড়কে নিয়ে হোক?
"চলুন না গিয়ে একবার..ওহ "
কথার মাঝেই দোয়েলকে পেছন থেকে ধাক্কা দিলো একজন লোক, লোকালয় পথ হওয়ায় অনেক ভীরের কারনেই এমন হয়েছে। দোয়েল পড়তে নিলেই নিবির তাকে নিজের সাথে ধরে সামলে নেয়। ধাক্কা দেওয়া লোকটির দিকে তেরে যেতে নিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে...
"ঐ, দাড়া তুই মাদা..."
দোয়েল নিবিড়কের বাহু চেপে ধরে আটকায় তাকে..
"আরেহ, ইচ্ছে করে করে নি তো। ভুলে হয়ে গেছে। আপনি শান্ত হন। "
নিবিড় ফোঁসফোঁস করে নিশ্বাস ফেলছে। রাগে তার মাথার কাছের রগ গুলো ফুলে নীল রঙ ধারন করে আছে। দোয়েল চিন্তিত নয়নে অবলোকন করতে নেয় নিবিড়ের সেই রুপ। তবে তা বেশিক্ষণ টিকলো না। নিবিড় রাগে রিরি করতে করতেই দোয়েলের হাত টেনে এনে তাকে ফ্রন্ট সীটে বসিয়ে নিজেও গাড়ি স্টার্ট দেয়।
"কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? সুহাসের সাথে দেখা করিনি তো আমি এখনো। "
সুহাসের নামটা শুনেই নিবিড়ের রাগ যেন উচ্চে পৌঁছায়। গাড়িটা হাই রোড থেকে সরিয়ে ভিতরের এক রাস্তা দিয়ে চলা শুরু করে , গতি সে সর্বোচ্চ করে নেয় মুহুর্তেই। এমনটা দেখে দোয়েল চোখ বড় বড় করে নেয়, শান্ততা ছেড়ে কেমন যেন ছটফট করে ওঠে সে। ভয়ে সতন্ত্র হয়ে বার বার নিবিড়কে অনুরোধ করতে থাকে গাড়ির স্পিড কমানোর জন্য। কিন্তু নিবিড় যেন আজ নিজের হুশে নেই। বরং আরো বাড়িয়ে নেয় গতি। দোয়েলের কন্ঠ ক্রমশই চিৎকারে পরিনত হয়, পাগলের মতো করতে থাকে সে। এক পর্যায়ে এসে চরম বিরক্ত নিয়ে রাস্তার ধারে ব্রেক কষে নিবিড়। সীটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করার প্রয়াশ চালায়।
একটু ক্ষন পরেই বাহুতে কারো ছোঁয়া পেয়ে তাকায় নিবিড়। কিন্তু দোয়েলের অবস্থা দেখে হকচকিয়ে যায় সে, মেয়েটার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে এখনো সামনেই তাকিয়ে আছে৷ ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাপড়ে, নিশ্বাস ফেলতে পারছে না, দম বন্ধকর পরিস্থিতি।
নিবিড় ব্যতিব্যস্ত হয়, চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে..
"মিস এটম? ওয়াট হ্যাপেইন্ড? এমন করছো কেন? এই, এই দোয়েল? "
দোয়েল কথা বলতে পারছে না। নিবিড় ব্যস্ত ভঙ্গিতে গাড়ি থেকে নেমে দোয়েলের দিকের দরজাটা খুলে দেয়। মেয়েটাকে টেনে এনে নিজের বুকের সাথে জাপ্টে ধরে সে। দোয়েলও কম্পমান হাতে শক্ত করে খিঁচে ধরে নিবিড়ের বাহু..
" দোয়েল, এই দোয়েল,,শান্ত হও। প্লিজ শান্ত হও। কিচ্ছু হয় নি, কিচ্ছু হয়নি দেখো, আমি আছি তো। প্লিজ কুল ডাউন.. "
দোয়েল নিবিড়ের থেকে দুরে যাওয়ার প্রয়াশ চালায় না, বরং আরো খিঁচে ধরে তাকে। হা পায়ের তীব্র কম্পন যেন থামছেই না তার। নিবিড় বেশ অনেকক্ষন ধরে দোয়েলের মাথায়, গালে হাত বুলিয়ে শান্ত করে তাকে। কিছুটা স্বাভাবিক হতেই নিবিড় সুস্থির নিশ্বাস ফেলে। এক মুহুর্তের জন্য যে সেও কেমন উন্মাদ হয়ে উঠছিলো, মনে হচ্ছিলো হৃদপিণ্ডটা কেউ চেপে ধরছে তার। কি বিচ্ছিরি অনুভুতি।
দোয়েল নিবিড়ের বুকে লেপ্টেই চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস নিচ্ছে ঘন ঘন। নিবিড়ও এক হাতে তাকে জড়িয়ে আরেক হাত দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
"মিস এটম? ঠিক আছো তুমি? "
দোয়েল একটু খানি মাতা নাড়িয়ে বোঝায় যে ঠিক আছে সে। নিবিড় আবার জিজ্ঞেস করে...
"পানি খাবে? "
দোয়েল সম্মতি জানায়। নিবিড় দোয়েল কে সড়ায় না নিজের থেকে। এক হাতে জড়িয়ে নিয়েই গাড়ির ডেস্ক থেকে পানির বোতলটি নেয়। নিজ হাতে দোয়েলকে পানি খাইয়ে দেয়ও। দোয়েল ক্লান্ত স্বরে বলে...
"ব্ বোন, বোন অসুস্থ হয়ে পরেছে। "
"কিচ্ছু হবে না ছোট পাখির। "
"আ্ আমার থেকে বোন বেশি উইক। সহ্য করতে পারবে না এতটা ও। "
"আচ্ছা, আচ্ছা তুমি শান্ত থাকো। আমি আহিশের থেকে খবর নিচ্ছি। "
"ওকে আসতে বলুন, আ্ আমি আপনার সাথে যাবো না। "
"আ'ম সরি, আমি বুঝতে পারি নি যে তোমার ফোবিয়া আছে। আমি... "
"আ্ আপনি রেগে গেলে হুসে থাকেন না। আর একটু হলে মরেই যেতাম আমি.. "
" প্লিজ, প্লিজ পাখি, এমন কথা বলে না। আ'ম সরি না? আমি আর কখনো তোমার উপর রাগ করবো না, আই প্রমিস। প্লিজ ভয় পায় না। "
দোয়েল শান্ত হয়ে যায়। নিবিড়ও অনুশোচনায় দগ্ধ হয়, নিজের রাগের কারনে মেয়েটার দিকে এই টুকু খেয়ালও রাখতে পারলো না সে। কি করে ভালোবাসার দাবি করবে নিবিড়? ভালোবাসায় তো যত্ন খোঁজে, নিবিড় যে তা পারে নি। একদম পারে নি।
নিজের উপর নিজেরই কেমন যেন সীমাহীন রাগ বাড়তে থাকে তার। দোয়েলকে কোলে নিয়েই গিয়ে বসে ড্রাইভিং সীটে। দোয়েল উঠতে নিলেই নিবিড় বাঁধা দেয় তাকে...
"এভাবেই থাকো, রেস্ট নাও একটু। চিন্তা করো না, আমি গাড়ি আস্তে চালাবো এইবার, আর ....কোনো ব্যাড টাচও করবো না প্রমিস। "
দোয়েল আর বাঁধা দেয় না, এমনিতেও শরীর খারাপ লাগছে তার। নিবিড়ের বুকেই মাথা রেখে চোখ বুঁজে নেয় সে। নিবিড় নিজের কথা রেখেছে। পছন্দের মানুষটিকে নিজের এত কাছে পেয়েও কোনো প্রকার বাজে স্পর্শ দেয় নি । অথচ চাইলেই নিবিড় এই মুহুর্তে মেয়েটির সর্বাঙ্গে বিরাজ করতে পারতো কোনো বাঁধা ছাড়াই। এক হাত গাড়ির স্টিয়ারিং এ রেখে আরেক হাত দিয়ে দোয়েলের ঘন চুলের ভাঁজে বিলি কাটতে লাগলো।
শীতের প্রভাব একটু একটু করে বাড়ছে। সময়টাই যে উপভোগ্য। সাবিহা আর আয়েশা বাড়ির বাইরেটায় বাগানে বসে আছে গোলসালার চেয়ারে। জুলেখাও ছিলো এতক্ষণ, আড্ডায় চা জমবে ভেবেই বাড়িতে গিয়েছে চা নিয়ে আসতে। এমন সময় বাড়ির গেইট দিয়ে নিবিড়ের গাড়ি প্রবেশ করে। সাবিহা, আয়েশা তাকাতেই খেয়াল করে কোলে পাখি বসা। দূর থেকে আবির নাকি নিবিড়, ছোট পাখি নাকি বড় পাখি বুঝতে পারলেন না তারা। সাবিহা আয়েশাকে বসতে বলে এগিয়ে গেলেন ছেলের গাড়ির কাছে। নিবিড় মাকে দেখে পাশের দরজা খুলে দেয়, তবে নাবে না সে। দোয়েলকে ওভাবে রেখেই বসে থাকে। আয়েশা চোখের ইশারায় বুঝালো "কি হয়েছে? "
"গাড়ির স্পিডে ফোবিয়া আছে যে জানতাম না আম্মু, অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ঐ সীটে বসালে ঢুলে পড়ে যাচ্ছিলো,তাই... "
সাবিহা মুচকি হেঁসে চোখ ছোট ছোট করে তাকায় নিবিড়ের দিকে। মায়ের ইশারা বুঝতে পেরে হেঁসে ফেলে নিবিড়।
"আম্মু, তোমার কি ওদের ভালো লাগে? "
সাবিহা উত্তর দেয়...
"হুম,,,ভালো তো লাগবেই, মেয়ে দুটো ভীষণ লক্ষ্মী।"
"আর খুব মিষ্টি ও দেখতে, তাই না আম্মু? "
সাবিহা তাকায় নিবিড়ের বুকে ঘুমন্ত দোয়েলের দিকে। হালকা হেঁসে বলে...
"হ্যা, ওর চাচা বলে ওরা নাকি ওদের মায়ের মতো দেখতে হয়েছে। মেয়েরা মায়ের চেহারা পেলে এমনিতেই সৌন্দর্য বাড়ে।"
নিবিড় নাকোচ করে বললো..
"কি যে বলো না আম্মু। ওরা মোটেও ওদের মায়ের মতো হয়নি, আমি দেখেছিলাম। "
"ওরে হতচ্ছাড়া, তুই ওদের মাকে কিভাবে দেখবি? আমি নিজেই তো কোনোদিন দেখি নি। "
"ঐ দিন ওদের বাড়িতে পাঠালে না? তখনই তো দেখলাম। "
সাবিহা বুঝতে পেরে বলে...
"ওটা ওদের মা না, সৎ মা। "
নিবিড় চমকে তাকায় মায়ের দিকে।
"কি বলছো আম্মু? "
" ঠিকই বলছি। ওদের বয়স যখন পাঁচ বছর তখনই ওদের মা মারা যায়। তারপর ওদের বাবা আরেকটা বিয়ে করে। "
নিবিড় কিছু বলতে পারে না, নীরবে তাকিয়ে থাকে দোয়েলের ঘুমন্ত মুখের দিকে। এই কোমল দুটি ফুলের মা নেই? এরা কি বহু কাল মায়ের আদর পায় নি? কিভাবে বড় হয়েছে ওরা? মানতে পারছে না নিবিড়, বুকের ভেতর অসহনীয় যন্ত্রণা অনুভুত হচ্ছে। পাখিদের জমায়িত কষ্ট গুলো যেন ভীষন ভাবে উপলব্ধি করছে সে। মেয়েটাকে আজ সে আবার কষ্ট দিয়ে দিলো?
"আর কতক্ষণ এভাবে রাখবি? ঘরে দিয়ে আয় ওকে। ঘুমাচ্ছে ঘুমাক একটু। ওর এই অবস্থা হলে ছোট পাখি? "
"সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিলো ছোটপাখি। সুহাস ছেলেটার বাড়িতে ছিলো, আহিশ, জেসিদের সাথে। বলেছি বাড়িতে নিয়ে আসতে। "