গাড়ির ভেতর শুনসান নীরবতা। চড়ুই পাখি এই প্রথম একটি বুদ্ধির কাজই করছে, সেটা হলো এই মুহুর্তে মুখে আঙুল ঠেকিয়ে বসে থাকা। আড়চোখে আবিরের মুখের দিকে তাকায় একবার। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে তার, স্টিয়ারিংয়ে ঘুরাতে থাকা হাত দুটোর ভেনাস গুলো ফুলে উঠেছে । রাগ তুঙ্গে তার। চড়ুই পাখি নিজের মুখ থেকে হাত নামায়, সামনে তাকিয়েই টেনে টেনে ডেকে উঠলো আবিরকে...
"দানাবল? "
আবির চোখ কোনা করে তাকিয়ে আবার ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ দেয়। চড়ুই আবার ডাকে...
"ওও দানাবল, আমার তো খিদে পেয়েছে.. "
আবির ক্ষেপে বলে ওঠে...
"হ্যা তো খেতেই তো দিচ্ছিলাম, আটকালে কেন? "
চড়ুই বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে বললো...
"চুমু খেলে কি পেট ভরে নাকি?"
"আমার ভরে বুঝেছো? এখন আর একটাও কথা নয়।"
আবিরের ধমকের পরিপ্রেক্ষিতে চড়ুই পাখি মিনমিনিয়ে বলে ওঠে....
"চুমু খেতে দিই নি বলে এত রাগ? "
আবির তাকায় চড়ুইয়ের মুখের দিকে। মাথা নুইয়ে বসে আছে সে, আবির সামনে তাকায় আবার। চড়ুই নিজে থেকেই বলে ওঠে...
"কি করে দিতাম বলুন? ঠোঁটে চুমু খেলে তো আপনার মুখের লালা আমার মুখে ট্রান্সফার হয়ে যেতো। ওয়াক.. কি বিচ্ছিরি এটা.. আমি জানি। "
আবির নাক কুঁচকে তাকায় চড়ুইয়ের দিকে। আগের মতোই ধমকে বলে...
"জানো মানে? আগে কয় জনের লালা খেয়েছো তুমি? "
"আমিইই? কই না তো, আমার তো ঘৃণা লাগে এটা।আপনার লাগে না? "
"প্রেম টেম করোনি নাকি কোনোদিন? "
"ধূর, ভাল্লাগে না ওসব। "
"হুহ,করলেও টিকতো না তোমার প্রেম।গাধার সাথে কে প্রেম করবে আর। "
"আপনি আমাকে বার বার চুমু খেতে আসেন কেন? আপনার কি লুজ ক্যারেক্টার? "
আবির চোখ গরম করে তাকায় চড়ুইয়ের দিকে। এই মেয়ে কি বলে,...
"বোন বলেছে, যে ছেলেগুলো শরীরে হাত দেয় তারা লুজ ক্যারেক্টারের হয়। "
"তোমার শরীরে কিছু আছে ধরার মতো? "
"আপনি কি আমায় অপমান করছেন?"
আবির বিরক্ত হয়ে বলে..
"একদম নাহ,,সম্মান করছি তোমাকে। এবার চুপ করো। "
"আমরা কোথায় যাচ্ছি? "
"চুপপপ"
-------
ফার্ম হাউজের বাগান সাইডের এক কোনায় বসে ছোট ছোট কাঠের টুকরো দিয়ে আগুন ধরানোর চেষ্টা করছে দোয়েল। একটু দুরেই জেসি, জিসান, আহিশ মিলে ব্যাডমিন্টন খেলার জন্য জাল লাগাচ্ছে। তার পাশেই আজমলরা তিন ভাই মিলে পাটি বিছিয়ে বসে আছে একসাথেই। আয়েশা, সাবিহা আর জুলেখা ফার্ম হাউজের ভিতরে গেছেন রুম গুলো একটু গুছিয়ে নিতে।
"কোনো কিছু না পারলে কারোর থেকে সাহায্য চাইতে হয়। "
পরিচিত কন্ঠের আভাস পেতেই দোয়েল পেছনে ফিরে তাকায়, নিবিড় হাসি মুখে দাঁড়িয়ে, দোয়েল মুখ ঘুরিয়ে আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়। নিবিড়ও এগিয়ে এসে হাঁটু ভাজ করে বসে দোয়েলের পাশে। তার হাত থেকে দেশলাই কাঠির বক্সটা নিয়ে নিজেই কাঠে আগুন ধরায়। তারপর হুট করেই দোয়েলের দিকে ঝুঁকে সে, দোয়েল ভ্রু কুঁচকে নেয়..
"ডোন্ট আফ্রেইড মিস। আসলে একটু চেক করছিলাম আরকি। এই আগুনের তেজ বেশি নাকি আমার এটমের..."
নিবিড়ের কথা বুঝে উঠতেই দোয়েল কনুই দিয়ে নিবিরের পেটের দিকে গুঁতা দেয়।
"আরেহ, তুমি তো বেশ দুষ্টু আছো মিস এটম, গুতাগুতি খেলতে চাইছো? কিন্তু এখানে তো আব্বুরা আছে দেখো, আমার লজ্জা করছে। পরে খেলবো ওকেয়? "
দোয়েল বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয় নিবিড়ের থেকে। নিবিড় হেঁসে ফেলে। একটু পরেই দোয়েল নিজ থেকেই বলে ওঠে..
"আবির ভাইয়াকে একটা কল করে দেখুন না? বোন উঠেছে কিনা। বাড়িতে কাউকে না পেলে ভয় পাবে ও৷ "
নিবিড় পকেট থেকে ফোন বের করে আবিরের নম্বরে কল দিতে যায়, তখনই গেটের দিক থেকে গাড়ির আওয়াজ কানে আসতেই বলে...
"চলে এসেছে ওরা। আর কল করা লাগবে না। "
দোয়েল উৎসুক হয়ে উঠতে নিলেই নিবিড় তার হাত টেনে আবার বসিয়ে দিয়ে বলে...
"আরেহ, ওরা এদিকেই আসবে তো। বসো। "
হলোও ঠিক তাই, ফার্ম হাউজের ভেতরে গাড়ি ঢুকতেই চড়ুইয়ের চোখ চকচক করে ওঠে। আবির গাড়ি থামাতে দেরি, তার লাফিয়ে নামতে দেরি নেই। ছুটে গিয়ে আহিশের পেছনে গিয়ে ভাউ দিলো, আহিশ ভয় পেলো না, বরং বলে উঠলো..
"আইছে ফরিং, ভয় পাই নাই আফা। কারন আমি তোরে আগেই দেখছি। "
চড়ুই পেছন থেকে হাঁটু দিয়ে আহিশের পায়ে একটা গুঁতা দিয়ে বসলো। আহিশ ব্যাথাও পেয়েছে মোটামুটি, পা ডলতে ডলতে বললো..
"এটা কি হলো? "
চড়ুই ভাব নিয়ে দোয়েলের কাছে যেতে যেতে বললো..
"ভয় পাস নি কেন,তার শাস্তি এটা।"
লাফাতে লাফাতে গিয়ে বসলো দোয়েলের পাশে..
"ওয়াও, ক্যাম্প ফায়ার? কিন্তু এখানে ক্যাম্প কোথায়? "
নিবিড় হেঁসে বলে..
"ক্যাম্প নাই তবে তুমি চাইলে বাড়ির ভেতরে গিয়ে ঘুম দিতে পারো। "
নিবিড়ের ইশারা অনুযায়ী চড়ুই পেছনে তাকায়। তারপর নিবিড়কে জিজ্ঞেস করে...
"এটা কি আপনাদের ভুতের বাড়ি ভাইয়া? "
"ভুতের বাড়ি মানে? "
দোয়েল বলে ওঠে ...
"ও ফার্ম হাউজের কথা বলছে। "
চড়ুই দোয়েলের উপর কপট রাগ দেখিয়ে বললো...
"তোর সাথে কথা নেই। আমাকে রেখে চলে এলি কেন? "
"ঘুমাচ্ছিলি তাই। শুয়েটার আনিস নি কেন? এখানে প্রচুর ঠান্ডা বোন।"
চড়ুই ভাব নিয়ে বললো...
"এই চড়ুই পাখি অল টাইম হট থাকে বুঝলি? শীত ওকে ছুতেও পারে না। "
নিবিড় হেঁসে বললো..
"একটু হটনেস তোমার বোনকেও তো দান করতে পারো ছোট পাখি। "
সাবিহারা এসেই সবাইকে ডাকলো ডিনার করার জন্য। ছোটখাটো একটা পিকনিকের মতো করেই তারা সবাই আজ বাগানের সবুজ ঘাসের উপর বসেই ডিনার সারলো। ম্যানুতে পাখিদের পছন্দের খিচুরি আর ডিম ভুনা দেখে চড়ুই খুশি হয়ে বলেই উঠলো..
"আল্লাহ, এটা আমাদের খুব প্রিয়। "
আয়েশা হেঁসে বলে..
"তোদের জন্যই আজ স্পেশালি বানানো হয়েছে। "
বড় ছোট সবাই মিলে ডিনার শেষ করার পর গোল করে ঘাসের উপরই বসে সবাই। মাঝে হালকা রশ্মি ছড়িয়ে আগুন জ্বলছে শীতের উত্তাপ কমানোর জন্য। আহিস উঠে দাঁড়ায়। সবাইকে শান্ত করে গম্ভীর কন্ঠে বলতে শুরু করে...
"আজ তোমাদের সবাইকে এখানে এই সময় নিয়ে আসার কারন হয়তো তোমরা জানো। কারনটা হলো পাখিদের অপরাধের শাস্তি দেওয়া। "
ব্যস এতটুকু শুনতেই দোয়েল আর চড়ুইয়ের মুখের হাসি গায়েব হয়ে গেলো হঠাৎ। তাদের শাস্তি? কিন্তু কি করেছে তারা? নিজেরাই তো বুঝতে পারছে না।
আসমত চৌধুরীও আহিশের সাথে তাল মিলিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে..
"সত্যিই, পাখিরা আজ যেই অপরাধটা করেছে, সেটার শাস্তি ওদের পেতেই হবে৷ "
দোয়েল আর চড়ুইয়ের মনে ভয় হয়, ভয়ের চোটে দু জন এক সাথেই বলে ওঠে...
"কিন্তু আমরা কি করেছি? "
জেসিও বলে..
"বহু বড় অপরাধ করে ফেলেছিস তোরা দু জনই।"
দোয়েলের চোখে জল ভীর করে, তবে কি সে এই বাড়ির মানুষ গুলোর চোখেও খারাপ হয়ে গেলো?
আজমল চৌধুরী একটু নড়েচড়ে বসে বললো..
"তোরা চাইলে শাস্তিটা একটু সহজই দিতে পারি আমরা।"
দোয়েল চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া পানিটুকু মুছে নিয়ে বলে..
"জ্বী আঙ্কেল? "
আজমল চৌধুরী একটু দুরে আঙুল তাক করে বলে...
"ঐ যে ওদিকে প্রদীপ রাখা আছে, আগে গিয়ে ওগুলো একটু জ্বালিয়ে আয় তো। "
দোয়েল বড়দের কথায় কখনো প্রশ্ন করে না। উঠে দাঁড়ায় সে, ইশারায় চড়ুইকেও যেতে বলে। চড়ুইও এগিয়ে যায় দোয়েলের সাথে।
এদিকে আবিরের মাথায় কিছু ঢুকছে না, নিবিড়কে আস্তে করে জিজ্ঞেস করে...
"কি করেছে ওরা? সবাই ওদের সাথে এভাবে কথা বলছে কেন? "
নিবিড় মিটিমিটি হেঁসে বলে..
" এখন জিজ্ঞেস করছিস কেন? সন্ধ্যা থেকে তো পরে পরে ঘুমিয়েছিস। দেখে যা। "
আবির চুপ হয়ে যায়। দেখতে থাকে দোয়েল আর চড়ুই একে একে সব গুলো প্রদীপ জ্বালাচ্ছে। সব শেষ করেই দু জন মিলে ফিরে আসতে নিলেই হঠাৎ কিছু একটা মাথায় আসতেই দোয়েলের পা থেমে যায়। এক হাতে চেপে ধরে চড়ুইয়ের হাত। ধীর পায়ে আবার পেছনে ফিরে তাকায় সে। চড়ুইকেও ঘুরায়। দু কদম পিছিয়ে যেতেই যখন প্রদীপের পুরো লিখাটা জ্বলজ্বল করে উঠলো, তখন পাখিরা দু জনই অবাকের চরম পর্যায়ে।
কিছু মুহুর্ত ওভাবেই কাটে, চড়ুই দৃষ্টি সামনে রেখে দোয়েলের হাতে নাড়া দিয়ে বলে ওঠে...
"এ্ এই বোন? আমি যা দেখছি তুইও কি তাই দেখছিস? "
দোয়েল উত্তর দেয় না, হুট করেই হাত ছাড়িয়ে ছুটে যায় পেছনের দিকে। দৌড়ে গিয়ে জাপ্টে ধরে সাবিহাকে। কিচ্ছু বলে না, মেয়েটা একেবারে শান্ত হয়ে যায় যেন এইটুকুতেই। সবাই ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে আসে দোয়েলের কাছে৷ এদিকে চড়ুইয়ের কোনো পরিবর্তন হয় না। পায়ের ভর ধরে রাখতে পারছে না সে, হাটু কাঁপছে ভীষণ। আর না পেরে হাটু ভেঙে বসে পড়ে ওখানেই। আহিশ ছুটে আসে তার কাছে। নিজেও বসে কাঁধ জড়িয়ে ধরে চড়ুইয়ের।....
"কিরে? তুই তো খুশি হওয়ার কথা, বড় পাখির মতো সেন্টি খাচ্ছিস কেন? "
চড়ুই অবাক চোখে তাকায় আহিশের দিকে, কন্ঠের রেশ থেকেই উচ্চারণ করে...
"আহিশ? এটা কি সত্যি? "
আহিশ সামলে নেয় চড়ুইকে। বলে..
"ইয়েস, সব সত্যি। হ্যাপি বার্থডে ছোট পাখি, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ গায়েজ। "
বলতে বলতেই আহিশ ছোট একটি পাথরের চূড়া লাগিয়ে দেয় চড়ুইয়ের মাথায়, হেঁসে বলে ওঠে..
",এবার একটু হাসতো পাখি, তাহলেই না বার্থডে কুইনের মতো লাগবে। "
দোয়েল মুখ তুলে না সাবিহার বুক থেকে, ওভাবে থেকেই বিষন্ন চিত্তে বলে ওঠে...
" আম্মুর কথা ভীষণ মনে পড়ছে আন্টি। "
কথাটা কানে যেতেই সাবিহা আরেকটু জড়িয়ে নেয় দোয়েলকে..
"এই মেয়ে, এ জন্য কাঁদতে হয়? আমাকে তোর মা মনে হয় না? আদর যত্নে ঘাটতি পড়েছে নাকি তোদের? ওঠ তো এবার। সবাই দেখছে, আমার এত বড় মেয়ে কেমন মুখ লুকিয়ে কাঁদছে দেখো৷ "
দোয়েল সোজা হয়ে দাঁড়ায়। আজমল চৌধুরী তাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। কোমল কন্ঠে বলে ওঠে..
"একদম মন খারাপ করে না আম্মু আমার, আজ শুধু আনন্দ হবে বুঝেছিস? "
দোয়েল মাথা নাড়িয়ে হ্যা বোঝায়। সবাই একে একে দুজনকে উইশ করে। তারপর দুজনই এক সাথে কেক কেটে নেয়। বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে বড়রা সবাই ফার্ম হাউজের ভেতরে চলে যায় ঘুমানোর জন্য। আর ছোটরা এখানেই থেকে যায় ব্যাটমিন্টন খেলবে বলে। আবির ভেতরে যেতে চাইলেই সাবিহা কড়া করে বারন করে বলে...
"তুই ঘুমাতে গেলে, নিবিড়ও থাকবে না এখানে। ওরা একা থাকবে নাকি হ্যা? সন্ধ্যা থেকে ঘুমিয়েছিস, এখন ওদের সাথেই থাকবি। আমার আম্মুদের দেখে রাখবি। "
ব্যস, আবির আর চেয়েও যেতে পারলো না ঘরে। হাফ নিশ্বাস ফেলে সবার থেকে একটু দূরে গিয়ে একটি শিউলি গাছের তলায় হেলান দিয়ে বসলো সে। সামনেই আহিশ আর দোয়েল খেলছে প্রতিপক্ষ হয়ে। জিসান জেসি, চড়ুই মিলে ওদের চিয়ারআপ করছে। নিবিড় এসে বসলো আবিরের পাশে। হেসেই জিজ্ঞেস করলো...
" কিরে কদ্দূর এগোলো? "
আবির বিরক্ত নিয়ে বলে...
"মেয়ে চেঞ্জ করে দে ভাই। এই পেঙ্গুইনটাকে দিয়ে হবে না। "
নিবিড় মাথা নাড়িয়ে বলে..
"নো, মাঝ পথে এসে এই কথা বললে তো আর হবে না ব্রো।ছোট পাখিকেই চুমু খেতে হবে তোর। "
আবির মুখ ঘুরিয়ে সামনে তাকায়। নিবিড়ও সেদিকে তাকিয়ে বলে ওঠে..
"আমার বউটা বেশ ভালোই খেলছে না রে?"
"শা'লা তোর বউ হলো কবে? "
"হয়নি, তবে আমি চ্যালেন্জটা জিতে গেলে তো হবে তাই না? ঐ দায়িত্ব তো তোর। "
আবির চুপ থাকে, নিবিড় উঠতে উঠতে বলে...
" যাই, বউটার সাথে একটু খেলে আসি। "
বলেই বাঁকা হাসি দেয় নিবিড়,আবির বিরবির করে বলে ওঠে..
"শা'লা ডাবল মিনার। "
-----
একটু পরেই চড়ুই পাখি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে আবিরের দিকে। মুখে তার অমায়িক হাসি।এসেই ঘাসের উপর থেকে কয়েকটি সদ্য ঝড়ে পড়া শিউলি ফুল কুরিয়ে নিতে নিতে বললো...
"আপনারও কি শিউলির ঘ্রাণ অনেক ভালো লাগে? "
"উহুম। "
"তাহলে এখানে এসে বসেছেন যে? "
"এমনি।"
"এমনি কেউ বসে? "
"এত প্রশ্ন করছো কেন মেয়ে? যাও ওদিকে, খেলো গিয়ে। "
"আমি ব্যাটমিন্টন খেলতে পারি না। এটায় বোন এক্সপার্ট। "
"তাহলে চুপচাপ বসে থাকো।"
চড়ুই এগিয়ে এসে বসে আবিরের পাশে। নিঃসংকোচে আবদার ছুড়ে..
"আপনার থেকে একটু শাল দিবেন? খুব শীত করছে। বাকিরা তো সবাই শুয়েটার পড়ে আছে। "
"তোমাকে বলিনি সুয়েটার আনতে? "
"একটুই তো চাইছি, দিন না?"
আবির দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে থাকে চড়ুইয়ের দিকে৷ হাসছে সে, আবির ভাবলো একটা ধমক দিবে এক্ষুনি, পরক্ষণেই আবার মনে হলো, আজকের দিনে অন্তত একটু সহ্য করবে সে। নীরবে গায়ের শালটা একপাশ থেকে খুলে এগিয়ে দিলো চড়ুইয়ের দিকে। চড়ুইয়ের হাসি চওড়া হয়, আরেকটু এগিয়ে এসে শালটা খুলে নিজেও গায়ে জড়িয়ে নেয়, আরেক পাশ থেকে আবিরের কাধেও তুলে দেয় একটু...
"আমরা শেয়ারিং শেয়ারিং করে পড়ছি ওকেয়? আপনারও তো শীত লাগবে না হলে। "
আবির ফিরে তাকায় চড়ুইয়ের দিকে৷ তাকে বাঁধা না দিয়ে নিজেও শালটা টেনে নেয় আরেকটু।
"পায়েস খেয়েছেন? আন্টি বেশ দারুন পায়েস বানায় কিন্তু। "
"হুমম,দেখতে হবে না? কার মা.. "
আবিরের কথায় চড়ুই মুখ কালো করে তাকায় তার দিকে, বলে ওঠে...
"আমি জানি ওটা আপনারই আম্মু, বারবার বলে এভাবে খোঁচা দেওয়ার কি আছে? আমার বুঝি কষ্ট হয় না? "
আবির তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে..
"তোমার মতো উড়ালচন্ডীর বুঝি কষ্ট ও হয়? আমার তো মনে হয় না। "
চড়ুই উত্তর দেয় না, নীরবে একবার আবিরের দিকে তাকিয়ে সামনে ফিরে চায়। আবিরও চড়ুইয়ের দিক থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে আর ঘাটে না তাকে, চুপ থাকে।
একটু পর চড়ুইয়ের দিকে তাকাতেই আবির লক্ষ্য করে মেয়েটার ঠোঁট দুটো বেশ কাঁপছে। হয়তো বেশিই ঠান্ডা লাগছে মেয়েটার। আবির হাফ নিশ্বাস ছেড়ে শালের ভেতর দিয়েই নিজের হাত এগিয়ে নিয়ে চড়ুইকে টেনে নিজের কোলের উপর বসায়।শালটা আরেকটু ভালো করে জড়িয়ে নেয় চড়ুইকে সহ। চড়ুই বাঁধা দেয় না, নিজেও হেলান দিয়ে বসে আবিরের গায়ে। শালের ভেতরই চড়ুইয়ের হাতের অস্তিত্ব পেতেই অনুভব করে হাত দুটো তার অসম্ভব ঠান্ডা হয়ে আছে। আবির নিজের হাত দিয়ে চড়ুইয়ের দু হাত মুষ্টি বদ্ধ করে নিতে নিতে বলে..
" বলেছিলাম সুয়েটার নিতে। এই শালে শীত মানায় দেখো তো? খুব অবাধ্য মেয়ে তুমি ওয়াইফি। "
চড়ুই নীরব থাকে। মুহুর্ত পরেই হঠাৎ তার কান্না ভেজা কন্ঠ কানে আসে আবিরের...
" আমার আম্মু মারা যাওয়ার পর আর কখনো আমাদের জন্মদিন পালন করা হয়নি জানেন?"
চড়ুইয়ের হাতে ডলতে থাকা হাত দুটো থেমে যায় আবিরের। বুকটা হঠাৎ ধক করে ওঠে। মেয়েটার মা নেই?
" আম্মু বেঁচে থাকলে ঠিক আমাদের জন্মদিনে আন্টির মতো করেই ইয়াম্মি পায়েস বানাতো।....
আপনি যে আমাকে উড়নচণ্ডী বললেন, আমার আম্মু থাকলে আপনাকে এখন আচ্ছা করে বকে দিতো। "
মেয়েটা লুকিয়ে কাঁদছে। শব্দ করছে না মোটেও, মুখ তুলে চাইছেও না আবিরের দিকে। হয়তো বুঝতে দিতে চায় না সে যে কাঁদছে। আবির ঢোক গিলে, আস্তে করে ডাকে...
"চড়াই পাখি? আমার দিকে তাকাও? "
চড়ুই বোকার মতো আবিরের শার্টেই চোখ মুছে কান্না লুকাতে চায়। মুখ তুলে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে একটু খানি। কিন্তু তার ভেজা পাপড়ি, লালছে নাকের ডগা আর কম্পমান ঠোটই যথেষ্ট তার মিথ্যাকে ধরে দেওয়ার জন্য।
চড়ুই মুখে মিথ্যা হাসি রেখেই আবিরের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে..
"শেষ বার আম্মু আমাদের জন্মদিনে টুকটুকে লাল রঙের কাঁচের চুড়ি উপহার দিয়েছিলো জানেন? হাত নাড়লেই আওয়াজ করতো সেগুলো। দেখুন, আজ জুলেখা আন্টিও আমাদেরকে চুড়ি উপহার দিয়েছে। সুন্দর না? "
বলতে বলতেই চড়ুই শালের ভেতর থেকে এক হাত বের করে নতুন কাঁচের চুড়ি গুলো দেখায়।আবির সেদিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে হ্যা সম্মোধন করে চড়ুইয়ের হাতটা আবার শালের আড়ালে নিয়ে নেয়। চড়ুই হাসে, তবে তাতে সত্যতা নেই। একটু পর পরই নাক টানছে সে। আবির শাল টেনে চড়ুইয়ে মাথায় ঘোমটার মতো করে দেয় যাতে কান গরম থাকে। এক হাতে চড়ুইয়ের দু হাত বদ্ধ করে রেখে আরেক হাত দিয়ে তার চুলে বিলি কেটে দিতে থাকে...