ফয়সালা পাক্কা, একই ধাচের আবির নিবিড় কেউই কাউকে ছাড় দেওয়ার পাত্র নয়। ঝগড়ার এক পর্যায়ে দু জনই চুপ হয়ে বসে পড়ে বিছানায়। কেউ কারোর সাথে কথা বলছে না, হার মেনে নেওয়া তো অসম্ভব।
দরজায় টোকা পড়তেই দু জনই মুখ তুলে তাকায় সেদিকে। পাখি এসেছে, হাতে ট্রে। এটা বড় পাখি বুঝতে পেরেই আবির মুখ নিচু করে নেয়। নিবিড় আলতো হাসে, কাল রাতের পর থেকে মেয়েটার মুখোমুখি হয়নি সে। হয়েছিলো সকালে ফেরার সময়, তবে দোয়েল ঘুমে ছিলো। তাই তার ভাব ভঙ্গি কেমন তা বুঝে উঠতে পারে নি। এখন একটু পরখ করে দেখাই যায়।
"আন্টি কফি পাঠিয়েছে আপনাদের জন্য। "
নিবিড় চোখের ইশারায় ভেতরে আসতে বলে তাকে। জিজ্ঞেস করে..
"কখন ফিরেছো? "
দোয়েল কফির কাপ দুটো টেবিলে রাখতে রাখতেই বললো..
"একটু আগেই। "
"ফ্রেশ হয়েছো? "
"হ্যা... "
"কাল রাতে ঘুম কেমন হয়েছে? "
এই প্রশ্নটায় দোয়েল মুখ তুলে তাকায় নিবিড়ের দিকে। নিবিড় ঠোঁট চেপে হেঁসে বলে...
"ইয়ে মানে... ফার্মহাউসে হিটার ছিলো না তো। এতো ঠান্ডা, তাই জিজ্ঞেস করছিলাম, কোনো সমস্যা হয়নি তো? "
দোয়েল আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে বলে..
"না.. "
আবির এক নজর কফির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে...
"কফি কে বানিয়েছে?"
দোয়েল উত্তর দেয়..
"আমি ভাইয়া।"
" ঐ পেঙ্গুইনটাকেও একটু আকটু শিখিয়ে নিও। ভবিষ্যতে কি আর লাফিয়ে লাফিয়ে ঘর করবে ও?"
দোয়েল হালকা হেঁসে বলে..
"ওকে একটু মিষ্টি করে বললে ও টুকটাক সব কাজ করে দিবে ভাইয়া। কিন্তু রান্না বান্নার বিষয়টা বাদ, তাপের কাছে বেশিক্ষণ থাকলে শরীর খারাপ হয় ওর। তাই আমিই ওকে এসব থেকে দূরে রাখি। "
আবির আর কিছু বলে না। দোয়েল কফিতে পরিমান মতো সুগার কিউব মিক্স করে উঠে চলে যায়। নিবিড় তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে আপন মনেই বলে ওঠে...
"ইয়ারর,,ও কি রেগে আছে? নাকি লজ্জা পাচ্ছে? "
আবির বিরক্ত হয়ে বললো..
"আমি কি জানি? "
"ছোট পাখির রিয়েকশন কেমন ছিলো বল তো?"
"তাও জানি না.."
বলতে বলতেই আবির কফিতে চুমুক দেয়। নিবিড়ও এক চুমুক খেয়ে মুখ কুঁচকে বলে ওঠে...
"ভাই.. বউ আমার কফিতে চুমু মিক্স করেছিলো নাকি? খেয়াল করলাম না তো।কফি তো দেখি হেব্বি মিষ্টি.. "
আবির আগের মতো করেই বলে উঠলো...
"তোমার বা'ল। কাজের সময় ওকে উল্টাপাল্টা প্রশ্ন কর আরো, এক কাপে দুইবার সুগার মিক্স করে ফেলেছে, আর আমারটায় দেয়ই নি। "
আবিরের কথায় নিবিড় ফিক করে হেঁসে দেয়। আবিরের থেকে কফির কাপটা নিয়ে দুটো কফি এদিক সেদিক করে মিক্স করে নেয়। এতে দুটো কফিরই মিষ্টি স্বাভাবিক হয়ে আসে। কফিতে চুমুক দিতেই হুট করেই দুজনের মাথায় কিছু একটা আসে। দুজনই এক সাথে চোখ তুলে একে অপরের দিকে তাকায়,তারপর একসাথেই নীরবে হাসে।
তাদের এই নীরব কথোপকথনের মানে হলো এই যে, চ্যলেন্জ দুজনই জিতেছে, এখন দুজনই তাদের চাওয়া পাওয়া বুঝে নিবে। আবির রাজি হয় নিবিড়ের বিয়ের ব্যপারে সাবিহার সাথে কথা বলতে, আর নিবিড়ও রাজি হয় আবিরের সামনে চড়ুইয়ের মুখ বন্ধ রাখতে। এক সাথেই দুজন বলে ওঠে..
"ডিসিশন ফাইনাল...."
---------------
কম্পানির মিটিংয়ের কারনে অফিস থেকে একটু দূরেই আরেকটা ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল ভবনে এসেছিলো আবির। নিবিড় অফিসের কাজ সামলাচ্ছে, তাই আসতে পারে নি। আবির একাই মিটিং সামলে নেয়। মিটিং শেষ করে মাত্রই কয়েকজন ক্লায়েন্টের সাথে ভবন থেকে বেরিয়েছে সে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আরো কিছু টুকটাক কথা বলছে তারা। কথার মাঝেই আবিরের কানে আসে পরিচিত কন্ঠের ডাক...
"দানাবল.... এইইই দানাবল? "
কথা থেমে যায় আবিরের। এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজতে থাকে পাঁজি মেয়েটাকে। এত জোরে জোরে ডাকছে, আবিরের সাথে সাথে আশপাশের লোকজনও যেন শব্দের উৎস খুঁজে চলেছে।
"দানাবল... এই দিকে,, এই দিকে আমি..."
কন্ঠের রেশ খুঁজে রাস্তার অপর প্রান্তে তাকাতেই আবিরের চোখ চরকগাছ। চড়ুই ছুটে আসছে চলন্ত গাড়ি গুলোকে উপেক্ষা করেই। আবির ব্যতিব্যস্ত হয়ে এগিয়ে যায় তার দিকে। চড়ুই মাত্রই এই পাশে এসে পৌঁছে কালো রাস্তা ছেড়ে একটু আইলেন্ডে উঠতে নিলেই হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। আবির দ্রুত হাতে টেনে তুলে তাকে..
"আরেহ, এই মেয়ে, এভাবে ছুটে কেউ? গাড়ি চলছে দেখো না? "
হোঁচট খাওয়ার ফলে চড়ুইয়ের এক পায়ের জুতো ছিঁড়ে গেছে। সেটার দিকে ঠোঁট উল্টে তাকিয়েই চড়ুই বলে উঠলো...
"আপনাকে এত করে ডাকলাম, শুনলেনই না। দেখুন আপনার জন্য এখন আমার জুতা ছিড়ে গেছে। "
আবির বিরক্ত হয়, ধমক দিয়ে বলে ওঠে..
"তাই বলে এভাবে ছুটবে?"
চড়ুই উপায় না পেয়ে আরেক পায়ের জুতাও খুলে রেখে দেয় সেখানে। খালি পায়ে এগিয়ে যেতে যেতে বলে...
"কি করবো, লোকগুলো তাড়া করছিলো তো৷ "
আবিরের ভ্রু কুঁচকে যায়। প্রশ্ন ছুড়ে..
"কে তাড়া করছিলো? "
চড়ুই পেছন ফিরে তাকায় রাস্তার অপর পাশে, নাহ, সেই লোক গুলোর মুখ না দেখে বলে..
"মনে হয় চলে গেছে। "
"কি করেছো তুমি? তাড়া করছিলো কেন? "
চড়ুই টেনে টেনে বলে...
"আমিইইই? আমি তো কিছু করিনি, হাঁটার সময় মনে হলো ওরা আমাকে ফলো করছে, তাই ছুট লাগিয়েছি আমি। ওমাহ, দেখি ওরাও আমাকে তাড়া করছে৷ "
আবিরের সাথে ক্লায়েন্টরা তার কাছে এগিয়ে আসে। জিজ্ঞেস করে...
"মি. চৌধুরী, কোনো সমস্যা? একে চিনেন আপনি? "
আবির কিছু বলতে যাবে, তার আগেই চড়ুই গদগদ হয়ে বলে উঠলো...
"হ্যা, দানাবল আমায় চেনে তো৷ আমি হলাম গিয়ে উনার ছোট চাচাতো ভাইয়ের বেস্টফ্রেন্ড। এই দানাবল বলুন না, আপনি যে আমায় চিনেন? "
লোকগুলো কেমন যেন আড়চোখে তাকায় চড়ুইয়ের দিকে। আবির বিন চৌধুরীর মতো লোকের হাত ঝাঁকিয়ে কথা বলছে এই বাচ্চা মেয়েটা, এটা মোটেও স্বাভাবিক চোখে নিতে পারছেন না তারা। আবির কিছু না বলে তাকায় চড়ুইয়ের দিকে। মেয়েটার মুখে হাসি। অথচ একটা সেকেন্ডও স্থির হয়ে দাড়াচ্ছে না। একটু পর পর এক পা একপা করে উঁচিয়ে নিচ্ছে বারবার। আবির বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে...
"সমস্যা কি? "
চড়ুই উত্তর না দিয়ে বলে..
"আপনার গাড়ি কোথায় বলুন? আমি গাড়িতে গিয়ে বসছি। "
আবির লক্ষ্য করে চড়ুইয়ের পায়ে জুতো নেই। রোদের তাপে রাস্তা মোটামুটি গরম হয়ে আছে। পায়ে তাপ লাগছে মেয়েটার। ভেবেই আবির হাফ নিশ্বাস ফেলে হুট করেই এক হাতে টেনে পাঁজা কোলে তুলে নিলো চড়ুইকে। সামনে ক্লায়েন্টের দিকে তাকিয়ে বললো...
"ঠিক আছে, বাকি প্রজেক্ট গুলো নিয়ে আমরা অফিসেই কথা বলবো কালকে। আজ আসুন... "
ক্লায়েন্টরা নত হয়ে মাথা নাড়াতেই আবির চড়ুইকে কোলে নিয়েই এগিয়ে যায় নিজের গাড়ির দিকে। দরজা খুলে ফ্রন্ট সীটে চড়ুইকে বসিয়ে, নিজেও গিয়ে বসে ড্রাইভিং সীটে।
"এবার বলো, তুমি আসলে চাও টা কি? "
আবির যতটা বিরক্ত আর রাগ নিয়ে কথাটা বললো, চড়ুই ঠিক ততটাই হাসি মুখে এনে বললো...
"আমি চাই, আপনি এখন আমাকে বাড়িতে দিয়ে আসুন... "
আবির আরো ক্ষেপে যায়, রাগে রিরি করতে করতে বলে ....
"মামা বাড়ির আবদার পেয়েছো তুমি এখানে? হ্যা... "
চড়ুইও বোকার মতো মাথা দু দিকে নাড়িয়ে বলে উঠলো...
" মামা বাড়ি থাকলেই না আবদার করবো। এটা তো ফ্রেন্ডের বাড়ির আবদার... "
"একটা থাপ্পরে দাঁত ফেলে দেবো বেয়াদপ মেয়ে। এখানে কেন এসেছো তুমি?"
"অর্ডার ছিলো। "
"তো অর্ডার কমপ্লিট করে বাড়ি না গিয়ে রাস্তার মধ্যে দানাবল দানাবল বলে কেন ডাকছিলে? তোমার মতো ফালতু মনে হয় আমাকে দেখে? আমার ক্লায়েন্টদের সামনে এসব কোন ধরনের ডাকাডাকি? কি মনে করছে ওরা, হ্যা? "
"পরিচিত বলেই তো ডেকেছি আপনাকে। না হলে কি ডাকতাম নাকি? "
"কেন ডাকতে হবে? যেই কাজে এসেছো সেই কাজ সেরে সোজা বাড়ি যাবে। রাস্তা ঘাটে আমাকে দেখলেও ডাকার কোনো প্রয়োজন নেই। তোমার জন্য আমি ইম্ব্যারেসিং পরিস্থিতিতে পড়তে চাই না, যেটা তুমি বারবার করো। "
চড়ুইয়ের মুখটা ভোতা হয়ে আসে। ঠোঁট উল্টে বলে..
"আমার ব্যাগ আর ফোন হারিয়ে গিয়েছে। সেজন্যই না আপনাকে দেখে এসেছি আপনার কাছে। না হলে আমি এমনিই চলে যেতাম। "
আবির সামনে ফিরে তাকায়, বিরবির করে বলে ওঠে...
"যত্তসব ধান্দাবাজি..."
বলতে বলতেই গাড়ি স্টার্ট দেয় সে। চড়ুইয়ের মুখে হাসি ফুটে, যাক বাড়ি তো দিয়ে আসবে....
প্রায় পাঁচ মিনিট পথ অতিক্রম করতেই আবির গাড়ি পার্ক করে। চড়ুই বাইরে তাকিয়ে দেখে বলে ওঠে...
"ওমাহ, এটা তো আপনাদের অফিস। আমাদের তো বাড়ি যাওয়ার কথা ছিলো। "
আবির নীরবে মানিব্যাগ থেকে দু হাজার টাকা বের করে চড়ুইয়ের হাতে গুঁজে দিয়ে বললো...
"ঐ যে সামনে জুতার দোকান আছে। জুতা কিনবে, তারপর অটো নিয়ে সোজা বাড়ি যাবে। গো... "
চড়ুই তাকিয়ে থাকে আবিরের মুখের দিকে। আবির আর অপেক্ষা করে না চড়ুইয়ের উত্তরের। দ্রুত কদমে গাড়ি থেকে নেমে চলে যায় অফিসের ভেতরে। একবারও পেছনে ফিরে তাকায় না আর।
-------
লিফট থেকে বের হতেই নিবিড়ের মুখোমুখি হয় আবির। আবিরকে এমন রাগী চেহারায় দেখে নিবিড় হেঁসে জিজ্ঞেস করলো...
" কি ব্যপার ইয়াং ম্যান? শুনলাম মিটিং তো ভালোই হয়েছে। তা হলে এখন ফায়ার মুডে কেন আছিস? "
আবির এগিয়ে যায় নিজের কেবিনের দিকে। নিবিড়ও তার সাথে কদম মেলায়। আবির রাগে রি রি করতে করতে বললো...
"তোকে বলেছিলাম ঐ পেঙ্গুইনের মুখ বন্ধ করতে। "
" তুই এখনো আম্মুর সাথে কথা বলিস নি, তাই আমিও একটু জিরিয়ে নিচ্ছি আরকি। "
আবির চোখ গরম করে তাকায় নিবিড়ের দিকে। নিবিড় তার রাগকে পাত্তা না দিয়ে বললো...
"আরেহ, কি হয়েছে সেটা তো বলবি... "
"কি হয়েছে মানে? রাস্তার মধ্যে দানাবল দানাবল বলে চেচাচ্ছিলো, ক্লায়েন্টদের সামনে যা তা অবস্থা। "
কথাটা শুনেই নিবিড় হেঁসে দেয়। টেনে টেনে বলে...
"আরে রাগ করছিস কেন? তোকে তো ও ভালোবেসে এই নামে ডাকে.. "
"ভালোবাসা ফা'ক অফ...। তারাতাড়ি তুই তোর কাজ শুরু কর, আমিও আম্মুকে বলবো। ব্যস... "
"ওকেয়, এজ ইউর উইশ।লিসেন, মিস লীরা এসেছে তার বাবার প্রজেক্টের বিষয়ে কথা বলতে। "
"ওর বাপের প্রজেক্ট, ও কেন আসবে? এপোয়েন্টম্যান্ট দিয়েছে কোন মাদারবোর্ড... "
"আবে, গালি মারছিস কেন? এটা অফিস। রাগ কমা, গিয়ে কথা বল ওর সাথে। আমি বাবা এখন আমার এটমের লয়াল প্রেমিক,অন্য নারীর দিকে তাকানো হারাম। তুই যা... "
নিবিড়ের কথা শুনে ইচ্ছে করলো কয়েকটা ঘুশি বসিয়ে দিতে তার গালে। কিন্তু আবির তা করলো না। নিজেকে শান্ত রেখে এগিয়ে গেলো কেবিনের দিকে। কেবিনের দরজা খুলে প্রবেশ করেই দেখতে পেলো লীরা বসে আছে ডিভানে। হাতে একটি ম্যগাজিন বই। মাত্রই আবির বুঝতে পারলো নিবিড় কেন তখন ওসব কথা বলেছে। লীরার শরীরে একটি ডার্ক ব্লু কালার ড্রেস। স্লিভলেস ড্রেসটির নিচের দিকটা হাটুর বেশ অনেকটা উপরেই। তার ফর্সা, ভ্যাক্স করা গ্লোয়িং থাই গুলো খুব সহজেই নজর কাড়বে পুরুষের।
আবির চোখ পিরিয়ে নেয়, কেন যেন নিবিড়ের মতোই অনুভুতি হচ্ছে তার, হারাম হারাম.. কিন্তু আবির তো আর কারো লয়াল প্রেমিক না।
"হ্যালো মি. চৌধুরী। "
আবির এগিয়ে গিয়ে নিজের আরামকেদারায় বসতে বসতে উত্তর দেয়...
"হ্যালো... "
লীরা নিজের উঁচু হিল জোড়ায় ঠক ঠক আওয়াজ তুলে এগিয়ে আসে আবিরের দিকে৷ আবির হাতের ইশারায় সামনের চেয়ার দেখিয়ে বলে...
"সীট ডাউন হিয়ার.."
লীরা এগিয়ে গিয়ে বসে সেখানে...
"ড্যাড বলেছিলো আপনার সম্পর্কে, হার্ড ওয়ার্কিং..."
আবির শুনে, দক্ষ ভঙ্গিতে ল্যাপটপ খুলে চোখ রাখে তাতে। লীরা বলতে থাকে...
"তবে ড্যাড এটা বলে নি যে আপনি এতটা হ্যান্ডসাম, চার্মিং বয়...."
আবির ল্যাপটপ স্ক্রীনে চোখ রেখেই বলে...
"বিজনেস মিটিংয়ে এসব বলাও উচিৎ নয়, তো আপনি যেন কি দরকারে এসেছেন? "
"প্রজেক্ট রেডি, ড্যাড বললো সেটা একবার চেক করে নিয়ে... "
"ওকেয়, বাট চেকিং ইউনিট তো থার্ড ফ্লোরে। ওখানে আমাদের এম্প্লয়ি আছে, আপনি সেখানে যেতে পারেন। "
"নো, আপনি নিজেই চেক করে নিলে..."
"দ্যাটস নট মাই কাপ অফ টি মিস.... "
"লীরা,,, লীরা ইজ মাই নেইম.. "
"ওয়াট এভার। কাজ শেষ হলে.. ইউ ক্যান গো... "
লীরা চমৎকার হেঁসে বলে...
"নো, আ'ম নট ডান ইয়েট... একচুয়ালি, আমি চাইছিলাম ড্যাডের এই প্রজেক্টটা আমি হ্যান্ডেল করতে... "
"সেটা তো আপনার আর আপনার ড্যাডের বিষয়,উনি যাকে ইচ্ছে তাকে দিয়ে কাজ করাক। আমি আমার প্রজেক্ট রেডি পেলেই হলো... "
"না মানে আমি বলতে চাইছি... "
লীরাকে সম্পূর্ণ করতে না দিয়েই আবির উঠে দাঁড়ায়। বেল রিং করতেই কয়েক সেকেন্ডের মাথায় দরজা খুলে রাতুল বলে উঠলো...
"ইয়েস স্যার? "
আবির নিজের ফোন পকেটে পুরে নিতে নিতে বললো...
"আই হ্যাভ টু গো... নিবিড়কে বলে দিও আমি চলে গেছি, আর এই যে, মিস লীরা কি বলতে চায় একটু শুনে নাও।.. "
রাতুল মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতেই আবির গটগট পায়ে বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে। এদিকে তার এমন খামখেয়ালি ভাব দেখে লীরা রাগে ফুঁসতে থাকে, রাতুল এক কদম এগিয়ে বলে..
"ইয়েস মিস? "
লীরা রাগে রিরি করতে করতে উঠে দাঁড়িয়ে বলে..
"নাথিং... "
কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই রাতুল হেসে মুখ ভেঙিয়ে বিরবির করে বলে উঠলো..
"উউহ, আইছে বিকি'নি পইরা স্যাররে পটাইতে... "
---------
চড়ুইকে চলে যেতে বললেও আবিরের মন খচখচ করছে। লিফট দিয়ে নামতে নামতে হাতঘরিতে একবার সময় দেখে নেয় সে, দুপুর তিনটা প্রায়। কড়া রোদ উঠেছে আকাশে। অফিস থেকে বের হতেই আবির পার্কিং লটে নিজের গাড়ির কাছে এগিয়ে যায়। চড়ুই নেই, যাক বাড়ি চলে গেছে হয়তো। ভেবেই আবির আবার পেছনে ফিরতে নিলেই ভ্রু কুঁচকে আসে তার কিছু একটা দেখে।
মেয়েটা টাকা গুলো নেয় নি। গাড়ির ডেস্কের উপর রেখে গেছে। রাগ হয়নি, কিন্তু হুট করেই মনে হলো যেন তার চিন্তা লাগছে। হ্যা, পেঙ্গুইনটার জন্যই চিন্তা হচ্ছে। ওর কাছে না আছে ফোন, না আছে টাকা। যাবে কি করে এভাবে?
আবির আশপাশে তাকিয়ে দেখে, নেই মেয়েটা। কতক্ষণ আগে বেরিয়েছে তাও তো জানে না। আবির গেটের দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করবে ভাবে। কিন্তু গেটের দারোয়ান বুঝতে পারলো না ঠিক কোন মেয়েটার কথা বলছে। আবির তাকে বুঝানোর চেষ্টা করে বলে...
"একটু বাচ্চাদের মতো দেখতে, পড়নেও বাচ্চাদের মতো সাদা গোল কূর্তি ছিলো, লম্বা চুল, বেনি করা ছিলো।হাতে... হাতে লাল কাচের চুরি..."
দারোয়ান বলে..
"আমি বুঝতে পারছি না স্যার। ছবি দেখান, হয়তো চিনবো। "
আবির নিজের ফোন বের করে। গ্যালারি ঘেটে দেখে চড়ুই বা দোয়েলের একটাও ছবি নেই। কখনো তোলাই হয় নি ছবি। আবির বুঝতে পারে না কি করবে৷ মাথায় আসতেই দ্রুত আহিশের ফেইসবুক আইডি চেক করলো সে। নাহ, চড়ুই বা দোয়েলের তেমন কোনো ছবি নেই। বেশ অনেকক্ষণ স্ক্রল করার পর দেখলো একটা পোস্ট, নর্মাল ফ্রেন্ডস গোলের একটা ভিডিও,সেখানেই আহিশ ম্যানশন দিয়েছিলো সবাইকে, Nusrat keya, Rab ti, Sayeed mumhan shuhash, Little bird , Big bird......
আবির বুঝতে পারে লিটেল বার্ড নামের আইডিটাই ছোট পাখির। ক্লিক করতেই দেখে আইডি লক, প্রোফাইলে তারই ছবি, তবে অস্পষ্ট। এটা দেখালে দারোয়ান কচুটাও চিনবে না। আবিরের এবার মাথা খারাপ হতে থাকে ধীরে ধীরে, কি করবে না করবে বুঝতেই পারছে না। হুট করেই কি মনে করে যেন আহিশের স্টোরি চেক দিলো সে। পাখিদের জন্মদিনের ভিডিও। এইতো ছোট পাখি, অনাথ আশ্রমে বাচ্চাদের সাথে ছুটাছুটি করছে তারই ভিডিও। আবির দ্রুত হাতে সেখান থেকে ছোট পাখির ছবিটা দারোয়ানকে দেখাতেই দারোয়ান হাতের ইশারা দিয়ে বললো...
"ঐ দিকে গেছে স্যার, কান্না করতেছিলো। ঠিক মতো হাটতে পারতেছিলো না, পায়ে জুতাও ছিলো না। "
"থ্যাংকিউ...."
বলতে বলতেই ইশারাকৃত দিকে ছুটে চললো আবির। বেশ কিছুটা পথ যেতেই আবিরের চোখে পড়ে চড়ুই পাখি। রাস্তার ধারে একটি চায়ের দোকানের সামনে বেঞ্চের উপর বসে আছে দু হাটু ভাজ করে জড়িয়ে। আবির হাফ নিশ্বাস ছাড়ে বুকে হাত দিয়ে। কিন্তু পরক্ষণেই ভ্রু কুঁচকে আসে তার পাশে একটি মধ্য বয়স্ক লোককে দেখে। আবির আস্তে করে এগিয়ে যায় তাদের কাছে...
" আমি পৌঁছে দেবো তো বাড়িতে, আমার সাথে চলো? "
লোকটার মিষ্টি কথায় চড়ুই খিটখিটে বললো...
"যা বলেছি তা তো করেন নি, আর কিছু লাগবে না। যান তো আপনি... "
"দেখো আমার ফোনে ব্যালেন্স থাকলে তো দিতামই কল করতে। আমি পৌঁছে দেবো তো, চলো? "
"বোন বলেছে, অপরিচিতদের বিশ্বাস করতে নেই। আমিও করবো না, আপনি যান তো এখান থেকে, বিরক্ত করবেন না।"
লোকটা আরো কিছু বলতে চায়, কিন্তু তখনই তার কাঁধে কেউ হাত রাখতেই বিরক্তিকর মুখে পেছনে ফিরে তাকায় সে, জিজ্ঞেস করলো...
"কি সমস্যা ভাই? "
চড়ুই মুখ তুলে তাকায়, আবির দাঁড়িয়ে আছে। লোকটির কথার প্রেক্ষিতে বলে ওঠে...
"বেশ পরোপকারী তো আপনি, দেখছেন আপনার সাথে যেতে চাইছে না, তাও পৌঁছে দিতে চাইছেন। ব্যপার কি বলুন তো? "
লোকটা বিরক্তিকর মুখ বানিয়ে বলে...
"মানে? "
আবির তার কাঁধ জড়িয়ে ধরে। পকেট থেকে ফোন বের করে লোকটার সাথে একটি সেলফি নিয়ে বলতে থাকে...
"মানে... সবাইকে কি গাধা পেয়েছেন মিয়া? বাচ্চা, সুন্দরী মেয়ে যেই না দেখলেন, ওমনি ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে চিপায় যাওয়ার চিন্তা, তাই না? "
লোকটা থতমত খেয়ে যায়, আবির বলে...
"ঠিক আছে যান ভাই। বিকেল পর্যন্ত বৌ বাচ্চার সাথে একটু সময় কাটিয়ে নিন, তার পরেরটা না হয় আমিই দেখে নিবো। যান... "
বলতে বলতেই এক প্রকার ঠেলে দূরে করে দিলো আবির। তারপর চড়ুইয়ের ফুলিয়ে রাখা মুখের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বসলো তার পাশে৷ চড়ুই ভেঙচি কেটে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। আবির নীরবে হাসলো। মেয়েটা তাহলে রাগও করতে পারে।.....
" বাড়ি চলো ? "
"আপনি যান এখান থেকে। আমি আপনাকে চিনি না, আর আপনার সাথে যাবোও না। "
" আমার সাথে যাবেনা ঠিক আছে। এখানে বসে আছো কেন তাহলে? "
"তো কি করবো? আপনার দেওয়া টাকায় যাবো? আমি আপনার কাছে টাকার জন্য গিয়েছি? ধান্দাবাজি বলেছেন না? এখন আবার কেন এসেছেন এই ধান্দাবাজের কাছে? "
বলতে বলতেই নাক ফুলিয়ে কেঁদে দেয় চড়ুই পাখিটা। নাক টেনে আবার বলে ওঠে...
"লাগবে না আপনার টাকা, আমি একাই যেতে পারবো। চলে যান আপনি। "
"তো যেতে পারলে এখানে বসে আছো কেন আবার? "
"দেখতে পাচ্ছেন না কত রোদ? আমি হাঁটতে পারছি এই রোদে? পা পুড়ে যাচ্ছে না আমার? রোদ কমলেই চলে যাবো আমি। "
আবির চোখ গোলগোল করে বলে...
"রোদ কমা পর্যন্ত এখানেই বসে থাকবে? "
চড়ুই সবল কন্ঠে বলে উঠলো...
"হ্যা.. "
"এখান থেকে বাড়ি পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে যাবে? "
"হ্যা... "
আবির হাফ নিশ্বাস ফেলে। এই আধ পাগলা মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা যায় না।
"লাঞ্চ করে বেরিয়েছো বাড়ি থেকে? "
" নাহ.. "
"চলো লাঞ্চ করে নিবে "
"নাহ "
"উমম,লাঞ্চ করলে দুটো রসগোল্লা ফ্রি তোমার জন্য। "
চড়ুই মুখ ফুলিয়েই দু দিকে মাথা নেড়ে না জানায়। আবির একটু অবাক হয়ে বলে...
"রসগোল্লাও খাবে না? "
"দুটো খাবো না। "
"তো কয়টা খাবে? "
" দশটা... "
"উমম,এত গুলো খেলে তো পেট খারাপ করবে। "
"করবে না। "
"আচ্ছা তিনটা, চলো। "
"হবে না।"
"আরেহ দশটা খেলে পেট খারাপ করবে তো রে বাবা... "
" আচ্ছা আটটা তাহলে। "
"উহুম, লাস্ট চারটা। এবার চলো। "
" ঠিক আছে, তাহলে পাঁচটা। "
আবির হাফ নিশ্বাস ফেলে বলে...
"ওকেয়, ঠিক আছে। চলো। "
চড়ুই উঠে দাঁড়াতেই আবির আলতো করে পাজা কোলে তুলে নেয় তাকে। চড়ুইও তার গলা জড়িয়ে ধরে আরামসে।
আবিরের বেশ হাসি পায়, নিজেকে বাহবা দিতে মন চায়, মেয়ে মানুষের রাগ ভাঙিয়েছে সে, নাহ, ভাঙায়নি বরং ভুলিয়ে দিয়েছে। কি সুন্দর সব রাগ ভুলে চড়ুইপাখি রসগোল্লার লোভে আবিরের কোলে চড়ে বসেছে। জয় রসগোল্লার জয়...