দোয়েল আর চড়ুই পাখির জন্মসূত্র একই ভ্রুণ থেকে হলেও মস্তিষ্ক গঠিত কাজ গুলোর দিকে কিছু কিছু ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় তাদের মাঝে। যেমন দোয়েল একটু ম্যাচিউর, আর চড়ুই হলো 'যখন হবে তখন দেখে নেবো 'ভাবের। ভীষণ চটপটে। দোয়েল রান্নাটা আয়ত্ত করতে পারলেও চড়ুই তা পারে নি, আবার চড়ুইয়ের ড্রয়িং খুব ভালো কিন্তু দোয়েল তাতে একদম কাঁচা। দোয়েল পড়ালেখায় পারদর্শী আর চড়ুই চলনসই টাইপ। চড়ুই ক্যারাম, উনো খেলায় পারদর্শী আর দোয়েল ব্যাটমিন্টন, সাইকেলিং ইত্যাদি।
জীবনের সাথে যুদ্ধে তারা খুব একটা পিছিয়ে নেই, নিত্য দিনের আগে পিছে লেগে থাকলেও তারা কখনো হেরে যায় নি। কখনো নিজেদের বিলীন করে দেওয়ার চেষ্টা করেনি, নিজের জন্য নয়, ঐ যে তার প্রাণের সাথে আরেকটি প্রান জুড়ে আছে, সে জন্যই। দু জনের মনেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ছিলো 'আমাকে বোনের জন্য হলেও বাচতে হবে।'
এভাবেই চলছে তারা একে অপরের পরিপূরক হয়ে। একে অপরকে ছেড়ে থাকার কথা চিন্তাতেও আনতে পারে না, দূরত্ব বাড়লে পাখিদের যে মৃত্যু নিশ্চিত। একজনের কোনো বিপদ হলে আরেকজন ঠিক টের পেয়ে যায় শরীরের ইন্দ্রিয়ের সংকেতে। উপরওয়ালা হয়তো নিয়তির কথা চিন্তা করেই তাদের একই ভ্রুণে রেখেছে,যেন এই নির্মল পাখি দুটো ছোট্ট থেকে মা হারা হয়ে ভেঙে না পরে, কখনো যেন হেরে গিয়ে মৃত্যু কামনা না করে, উপরওয়ালার এই করুনঘন বর্ণনা দোয়েল চড়ুই দুজনই মনে প্রাণে বিশ্বাস করে।
"তুমি তো বেশ ভালোই খেলো দেখছি,,ছোট পাখিকেও শিখিয়ে নিলে টিম হয়ে যেতো, ক্লাব থেকে খেলতে পারতে, তারপর ন্যাশনাল, ইন্টারন্যাশনাল... "
নিবিড়ের কথায় দোয়েল মাথা দুলিয়ে হেঁসে ওঠে। এই শীতেও ঘামছে সে, এতক্ষণ একটানা ব্যাটমিন্টন খেলার পর মোটামুটি ক্লান্তই সে। নিবিড় পানির বোতল এগিয়ে দেয়, দোয়েলের গলায় ঝুলানো ওড়নার কোনা দিয়ে তাকেই বাতাস করতে থাকে। দোয়েল বোতলের ছিপি খুলতে খুলতে বলে...
"আমার বোনকে কি আপনার অষ্টরম্ভা মনে হয়? বোন যথেষ্ট গুনি। "
"অষ্টরম্ভা বলিনি রে বাপ, এমনিই বলছিলাম। খালি উল্টো বুঝে কথা৷ "
দোয়েল এক ঢোল পানি খেয়ে সামনে তাকায়। বলতে শুরু করে...
"সবাই তো সব কিছুতে এক্সপার্ট হয় না, বোন যেগুলো পারে আমি সেসব পারি না। ব্যাটমিন্টন...চেষ্টা করেছিলো শিখতে, কিন্তু ছোট বেলা থেকেই আমার থেকে বোনের ইমিউনিটি কম, সামান্য কিছুতেই বোন প্রচুর দূর্বল হয়ে পরে, একটু বেশি দৌড়ঝাঁপ করলেই পা ব্যাথা হয়ে যায় ওর, হার্টবিট ফাস্ট হয়ে যায়। এই সব কারনে আমিই ওকে আউটডোর খেলা গুলো থেকে দূরে রেখেছি। ও যেমন, আমার কাছে তেমনই ভালো আছে। "
নিবিড় শুনে, চুপ রয় সে। দোয়েল একটু পরে নিজে থেকেই তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে...
"আপনারাও তো শুনলাম আইডেন্টিক্যাল টুইনস। "
"হুম,তোমাদের মতোই সেইম সেইম ডিএনএ। তবে ইমিউনিটির সমস্যাটা নেই। শুধু ভাই একটু শান্ত আর আমি... "
বলেই হেঁসে ওঠে নিবিড়। দোয়েলও বুঝতে পারে নিবিড়ের কথা। আরেক ঢোক পানি খেতে গেলেই অসাবধানতা বসত পানি টুকু ছিটকে গায়ে পড়ে যায়। নিবিড় ব্যস্ত হয় তা দেখে...
"আরেহ, সাবধানে খাবে তো.. "
বলতে বলতেই দোয়েলের জামা থেকে পানি ঝেড়ে ফেলতে থাকে। দোয়েলও ব্যস্ত হয়, নিবিড়ের চোখ দোয়েলের ভেজা মুখের দিকে পড়তেই থেমে যায় সে, পাতলা ঠোঁটের চার দিকে বিন্দু বিন্দু পানি জমে আছে, দোয়েলের ব্যাস্ত ভঙ্গিতে বারবার ঠোঁট নাড়ানোটা ভিষন ভাবে টানছে নিবিড়কে। দোয়েলের ভেজা গলা গলিয়ে হাত ঠেকলো কানের পেছন দিয়ে। উন্মাদনায় আকৃষ্ট স্বরে নিবিড় ডেকে ওঠে দোয়েলকে...
"মিস এটম? "
দোয়েল ফিরে তাকায় নিবিড়ের দিকে। নিবিড়ের চোখের দিকে দৃষ্টি নিতেই থেমে যায় দোয়েল, বেগুনি রঙের মনি দুটোর মাঝে কিছু একটা আছে। দোয়েলকে তীব্র ভাবে টানছে কিছু একটা।
"আ্ আমি যদি এই মুহুর্তে একটা ভুল করে ফেলি, তুমি কি খুব বেশি রাগ করবে? "
নিবিড়ের প্রশ্ন দোয়েলের কানে যায় ঠিকই, কিন্তু উত্তর দিতে পারে না সে। গলায় আটকাচ্ছে তার। কি চলছে তার ভেতরে?
নিবিড়ের হাত ধীরে ধীরে দোয়েলের মাথার পেছনে যায়। নিজেও এগিয়ে যায় দোয়েলের মুখের দিকে। ধীর, শীতল কন্ঠে ফিসফিসিয়ে নিবিড় বলে...
"ডোন্ট বি প্লিজ.. ইটস যাস্ট সফ্ট..... "
দোয়েলের ঠোঁট দুটি তিরতির করে কাঁপছে, ঘন ঘন দু দিকে মাথা নাড়ছে সে, মন সায় জানাচ্ছে, কিন্তু মস্তিষ্ক বারণ করছে তাকে। নিবিড় আরেকটি হাতে দোয়েলের গাল উঁচিয়ে ধরে, ধীরে ধীরে দোয়েলের কম্পমান পাতলা ঠোঁট দুটি নিজের ঠোঁটে পুরে নেয়, চোখ বুঁজে ফেলে দোয়েল, সে পারছে না বাঁধা দিতে নিবিড়কে, ভেসে যেতে থাকে এক অজানার অনিশ্চিত আবেশে....
---------
এদিকে চড়ুইয়ের কান্নার পরে মুখে ছড়িয়ে পড়া রক্তিম ভাবটা বরাবরই আবিরকে কাছে টানে, আবির এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় চড়ুইয়ের চঞ্চল চোখের দিকে। চড়ুইও মুখ তুলে তাকায় আবিরের দিকে। হুট করেই আবিরের বদ্ধ ঠোঁট দুটো আলগা হয়ে যায়, কিছু একটার আভাস পাচ্ছে সে, নিবিড় জিতে গেছে,কথাটা বুঝতে এক সেকেন্ডও দেরি হলো না আবিরের। হার মেনে নিলো সে, এখন আর চড়ুইকে কাছে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই বলেই মনে হলো আবিরের। মুষ্টি বদ্ধ হাত দুটো ছাড়িয়ে নেয় সে চড়ুইয়ের হাত থেকে। কিন্তু.......কিন্তু.... কিন্তু...
বার্থ কানেকশন কি আর ভিন্ন মস্তিষ্কের কথা শুনে? চড়ুই পাখি তার এত কাছে, তার ফোলা চোখ, লালছে নাকের ডগা, সুগঠিত ঠোঁট জোড়া সব কিছুই তো তার একদম কাছে। আবিরের ভেতরে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, নিবিড়কে মনে মনে আচ্ছা মতো গালি দিতে থাকে সে..
"শা'লা এবার তো ছাড়, আর কন্ট্রোল করতে পারছি না আমি...। "
আবির নিজেকে আটকে রাখতে চাইছে, চড়ুইকে ধাক্কা দিয়ে কোল থেকে ফেলে দিতে পারলে মস্তিষ্ক শান্ত হতো তার, কিন্তু আবির তাও পারছে না, মন তাকে উষ্কে দিচ্ছে আরো কাছে টেনে নেওয়ার জন্য। এবার তার বেহাল অবস্থাকে আরো এক ধাপ এগিয়ে দিতে বোকা চড়ুই নিজের হাত ঠেকলো ঠোঁটে। মিনমিনে স্বরে বলে উঠলো...
"শুনুন না? আ্ আমার না কেমন কেমন জানি লাগছে। "
আবির নিজেকে ধরে রাখার চেষ্টা করে, ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করে...
"কেমন কেমন? "
চড়ুইও বোকার মতো উত্তর দেয়..
"ঠোঁট নিসপিস করছে... "
ব্যস, আবির আর পারলো না নিজেকে কন্ট্রোল করতে। নিবিড়ের মতো শান্ত ভাবেও এগোতো পারলো না সে, আর না দিলো কোনো সতর্ক বার্তা। দ্রুত হাতে চড়ুইয়ের ঠোঁট থেকে তার হাতটা সরিয়ে দিয়ে এক হাতে চড়ুইয়ের কোমড় ঝাপ্টে ধরে আরো মিশিয়ে নেয় নিজের সাথে, আরেক হাতে শক্ত করে চড়ুইয়ের থুতনি চেপে ধরে এক প্রকার হামলে পড়ে চড়ুইয়ের ঠোঁটে সে। ঘনঘন চড়ুইয়ের ঠোঁট জোড়া চুষে নিতে থাকে সে।
চড়ুই অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে চোখ খিঁচে বন্ধ করে নেয়, নিজেকে আরেকটু গুটিয়ে খামছে ধরে আবিরের শার্ট, আবিরের হাত বিচরন করে চড়ুইয়ের পৃষ্ঠ জুড়ে। বেশ অনেকক্ষণ পর চড়ুইয়ের নিশ্বাস নিতে কষ্ট হলে সরে আসতে চায় সে, কিন্তু আবিরের শক্তির কাছে নিরুপায় সে। আবির উন্মাদের মতো কাজ করছে, কোনো মতেই সে চড়ুইয়ের ঠোঁট ছাড়ছে না। একটু পড়ে ছেড়ে দিতেই দুজন হাঁপাতে থাকে, ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলছে দুজনই, কিন্তু এই অল্পস্বল্প কিছুতে তো আবিরের পোষায় না, থামেও না সে। আবারো চড়ুইয়ের ঠোঁট দখল করে নেয় সে। আবিরের চুমু ধীরে ধীরে কামড়ে পরিনত হয়, সে শুধু পারছে না চড়ুইয়ের ঠোঁট দুটো চিবিয়ে গিলে ফেলতে। ব্যথায় চড়ুই ছাড়া পাওয়ার জন্য উমম উমম শব্দ করতে থাকে, কিন্তু ছাড়া তো দূরে থাক, চড়ুইয়ের এমন প্রতিক্রিয়া আবিরকে আরো উন্মাদে পরিনত করে। ছাড়া পেতেই চড়ুই ছটপটিয়ে উঠে যেতে চায়, কিন্তু আবির আবার তাকে টেনে নেয় কাছে, আবারো লিপ্ত হয় চড়ুইয়ের ওষ্ঠসুধা পানে।
টানা তিনবারের পর আবির ছাড়ে চড়ুইকে। তবে নিজের থেকে নয়, চড়ুই হাঁপাতে হাপাতে উঠে যেতে নিলেই আবির নিজের সাথে জড়িয়ে নেয় তাকে। মাথা চেপে ধরে নিকের বুকের উপর ঠেকিয়ে হাস্কি স্বরে উচ্চারণ করে...
"স্টে হিয়ার....."
চড়ুই পারে না উঠে যেতে, আবিরের বুকে থেকেই ঘন ঘন শ্বাস নিতে থাকে। লজ্জায় শালটা টেনে নিজেকে সম্পূর্ণ ঢেকে নেয় সে৷ আবির থুতনি ঠেকায় চড়ুইয়ের মাথায়। ওভাবেই নীরব থাকে দু জন, শব্দ শুনতে পাওয়া যায় শুধু চড়ুই পাখির দ্রুত হৃৎস্পন্দনের...
----------------
"বড় পাখি,তোর টার্ন এবার। আয় খেলতে আয়..."
আহিশের ডাকে ঢোক গিলে দোয়েল। নিবিড়ের দিকে মুখ তুলে চাওয়ার মতো সাধ্য তার নেই এই মুহুর্তে। এখনো যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছে সে, দ্রুত পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে ফার্ম হাউজের ভেতরের দিকে যেতে যেতে বলে...
"আ্ আমার ঘুম পাচ্ছে, আর খেলবো না।"
নিবিড় হেঁসে ফেলে দোয়েলের এমন কান্ডে। মেয়েটা রগচটা হলেও রোমান্সের দিক দিয়ে একদম কাঁচা, কি লাজুক ইশশ...
-------
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে চারদিকে। শিউলি গাছ থেকে অঝরে ফুল ঝরছে ঘাসের উপর। ঘ্রাণে মম করছে চারপাশটা। চড়ুই পাখির হৃৎস্পন্দন ছাড়াও আরেকটি আওয়াজ কানে আসতেই ঘুম হালকা হয়ে আসে আবিরের। চোখ মেলে দেখে তার মা সামনে দাঁড়িয়ে,
"আবির বাবা? ওঠ এবার? সারাটা রাত এখানেই ঘুমিয়েছিস নাকি? "
আবির হামি ছেড়ে বলে...
"আম্মু তুমি? এত সকালে কি করছো? "
"ফজরের নামাজ পড়তে উঠেছি। ছোট পাখি কোথায়? সব রুমে গিয়ে দেখলাম, ও আর তুই ছাড়া সবাই ঘুমিয়েছে। বাইরে এসে দেখি তুই এখানে। ছোট পাখি কোথায়? এই ঠান্ডায় কোথায় না কোথায় পরে আছে মেয়েটা...."
"ওহ আম্মু, এত প্যানিক করছো কেন? এইতো ও। "
"এইতো কোথায়? "
আবির মুখ কুঁচকে নিচের দিকে তাকাতেই কথা থেমে গেলো তার। চড়ুইয়ের এক বিন্দু চুল টুকুও দেখা যাচ্ছে না, অবচেতন মস্তিষ্কে শালের ভেতরে হাত এগিয়ে চেক করতেই আবির সুস্থির নিশ্বাস ফেলে। চড়ুইয়ের মুখের উপর থেকে একটু খানি শাল সরিয়ে সাবিহাকে দেখিয়ে বলে...
"এই যে... ভয় পাইয়ে দেয় এই মেয়ে। কিভাবে রয়েছে দেখো। "
সাবিহা হেঁসে ফেলে এমন কান্ডে। মেয়েটা শালের ভেতর আবিরের বুকে এমন ভাবে গুটিয়ে ঘুমাচ্ছে, বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায়ই নেই শালের ভেতর যে বিশাল দেহি আবির ছাড়াও আরেকটি ছোট্ট প্রাণ রয়েছে। সাবিহা জিজ্ঞেস করে...
"সারা রাত এভাবে ছিলো মেয়েটা? "
"শীতে কাপছিলো আম্মু,,বাড়ি থেকে সোয়েটারও নিয়ে আসে নি। আমারও চোখ লেগে এসেছে কখন বুঝতেই পারি নি, না হলে রুমে দিয়ে আসতাম। "
"যা কুয়াশা পড়ছে, ভাগ্য ভালো তোর কাছেই ছিলো।এখন রুমে দিয়ে আয় যা, আর তুইও গিয়ে ঘুমা। "
আবির শাল সহই ঘুমন্ত চড়ুইকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে বলে...
"ওকে রুমে দিয়ে যাচ্ছি আম্মু, আমি বাড়ি যাবো। ফ্রেশ হয়ে অফিস যেতে হবে। ভাই উঠলে বলে দিও আমি চলে গেছি। "
-----------
আজমলরা আজ কেউ অফিস যায় নি। ফার্ম হাউজ থেকেই তিন ভাই মিলে আহিশ, জেসি আর পাখিদের নিয়ে রওনা দেয় শহর থেকে একটু দূরে একটি অনাথ আশ্রমের পথে। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর বুঝতে পারে এটা শুধু অনাথ আশ্রম নয়, একসাথে বৃদ্ধাশ্রম ও। আজমল সাহেব এইবার শীতবস্ত্র বিতরণ করেন এখানে। এর কারন জানতে চাইলে তিনি বলেন..
"আমি প্রতি বছরই আমার আবির নিবিড়ের জন্মদিনে এখানে আসি। ওরা তো আমার কাছে থাকতো না, এনারা আমার ছেলেদের জন্য দু হাত তুলে দোয়া করে বুঝলি? এবার থেকে বছরে দুইবার আসবো। আমার ছেলেদের জন্মদিনে একবার আর আজকের দিনে মানে আমার মেয়ে দুটোর জন্মদিনে একবার। "
আজমল চৌধুরী সরল মনেই কথা খানা বলে হাটছেন, মেয়েদুটো যে কখন তার কথায় কান্না শুরু করে দিয়েছে বুঝতেই পারেন নি তিনি। আলভি খেয়াল করে এগিয়ে গিয়ে দোয়েল চড়ুইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আজমলের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো...
"কি ভাইয়া... দিলে তো মেয়ে দুটোকে কাদিয়ে? "
আজমল চৌধুরী পেছনে ফিরে দেখতেই বলে ওঠে...
"ঐ দেখো, আজকের দিনে কেউ কান্না করে? পাগল মেয়েগুলো, আয় তো আমার বুকে আয়।"
দোয়েল, চড়ুই এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে আজমল চৌধুরীকে। দোয়েল কান্নারত কন্ঠে বললো...
"আঙ্কেল,তুমি আমাদের জন্য এত কিছু কেন করছো? আ্ আমরা তো তোমাদের কেউই না। "
"কেউ না কে বললো? তোরা তো আমার আম্মা, দুই দুইটা আম্মা আমার তোরা। "
আজমলের কথায় হেঁসে দেয় সকলে। দোয়েল চড়ুইও আলতো হাসে। দোয়েল চোখ মুছতে মুছতে মুখে হাসি এনে বলে...
"তোমরা আজ আমাদের জন্য এত কিছু করছো, অথচ দেখো, আমাদের বাবার হয়তো মনেই নেই আজ যে আমাদের জন্মদিন।"
আজমলের স্নেহের হাত সরে না মেয়ে দুটোর মাথার উপর থেকে। ওভাবে রেখেই বলে...
"আমার তো কোনো মেয়ে নেই রে আম্মা, তোরা, জেসি, এরাই তো আমার মেয়ে। আজ থেকে আমাকে তোরা আমার আবির নিবিড়ের মতোই আব্বু বলে ডাকবি। এটুকু তো চাইতেই পারি আমি আমার আম্মাদের থেকে।কি আম্মা, পারি না? "
চোখে জল নিয়েই হেঁসে দেয় দোয়েল চড়ুই। মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায় দুজনই। আজমল চৌধুরীও সন্তুষ্ট তাদের উত্তরে। আহিশ আর জেসিকে ডেকে বললো...
"তোরা দুজন, কি চাই তোদের বল। আজ যা চাইবি তাই দেবো তোদেরকে আমি। "
আহিশ অবাক হয়ে বলে...
"কিন্তু বড় আব্বু, আজ তো আমাদের জন্মদিন না। "
"ধূর বেটা, তোদের তো অন্য কারনে উপহার দেবো আমি।এই যে তোরা দুটো মিলে আমাকে এই হিরের টুকরো মেয়ে দুটো এনে দিলি,সেই পুরষ্কার দিবো। "
আহিশ হেঁসে উঠে। ভাব নিয়ে দোয়েল চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে..
"দেখলি? বড় আব্বু আমাকে যা চাইবো তাই দিবে। "
চড়ুইও হেঁসে ভেঙচি কেটে বলে...
"উহ, আমরা ভালো মেয়ে বলেই তোকে গিফট দিবে। আমাদের সাথে ফ্রেন্ডশিপ না করে যদি ভন্ডদের সাথে ফ্রেন্ডশিপ করতি তাহলে কি এখন যা চাইতি তা দিতো? "
আসমত চৌধুরী সম্মতি দিয়ে বলে..
"ঠিক ঠিক, এখানে সব ক্রেডিট আমাদের দুই পাখিরই। আহিশ তো হাওয়ার ময়লা। "
আহিশ মুখ বেজার করে বললো..
"ছিহ চাচ্চু,আমাকে ময়লা বলতে পারলে তুমি?"
মুহুর্তেই আবার হাসির রোল পড়লো সবার মাঝে।
সারাটা দিন সবাই এখানেই কাটিয়ে দেয় বয়ষ্ক ও শিশুদের সাথে। চড়ুই তো মহা খুশি এত এত বাচ্চাকে পেয়ে। একটা মিনিটও সে স্থির ভাবে বসে থাকতে নারাজ, সারাটাক্ষন বাচ্চাদের সাথে ছোটাছুটি, খেলা ধুলা নিয়েই ব্যস্ত ছিলো। খাওয়া দাওয়াও করেছে সবাই মিলেই। বিকেলের দিকে যাওয়ার সময়ও তাকে বেশ কসরত পুসিয়েই নিয়ে যেতে হলো, তবুও যেন তার মন পড়ে রয়েছে ঐ অনাথ আশ্রমেই।
রাত প্রায় সাড়ে আটটার দিকে বাড়ি ফিরে আবির নিবিড়। জুলেখা দরজা খুলে দেয় তাদের। ভেতরে ঢুকে কাউকে না পেয়ে নিবিড় জিজ্ঞেস করে..
"বাড়ি শান্ত কেন চাচি? সবাই কোথায়? "
জুলেখা বললেন..
"তোদের মা আর মেঝো ভাবি বারান্দায় আছে। জিসান ফিরেনি এখনো।আর সবাই মিলে অনাথ আশ্রম গেছে। "
আবির ভ্রু কুঁচকে বললো...
"এতক্ষণ কি করছে সেখানে? "
"রওনা দিয়েছে বললো আরো আগেই। এসেই পরবে। "
আবির নিবিড় আর কথা না বাড়িয়ে নিজ নিজ রুমে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হতেই কানে আসে চড়ুইয়ের কিচিরমিচির। ঘর থেকেই তার টানটান কথার আভাস পাচ্ছে আবির। হাফ নিশ্বাস ছেড়ে আয়নার সামনে দাড়িয়ে ভেজা চুলে টাওয়াল চালাতে লাগলো সে। একটু পরেই দরজার দিক থেকে সিটির আওয়াজ পেয়ে আয়নায় তাকিয়ে দেখে নিবিড় দাঁড়িয়ে আছে। সেও মাত্রই গোসল নিয়ে এসেছে এখানে।
"আয়.."
নিবিড় হেলেদুলে ভেতরে ঢুকে গুনগুন করতে করতে এগিয়ে যায় আবিরের কাবার্ডের দিকে। সেখান থেকে নিজের পড়নের সাথে মিলিয়ে আবিরের গ্রে কালার গেঞ্জি আর সাদা থ্রি কোয়াটার প্যান্ট বের করে আবিরের দিকে ছুড়ে মারে। আবির সেদিকে না তাকিয়েই দক্ষ হাতে ক্যাচ করে নেয় সেগুলো। চুল মোছা শেষ করেই পড়নের টাওয়াল পাল্টে প্যান্ট পড়তে পড়তে বলে....
"তুই আমার টুইনস হয়ে এতো লুজ কেন বলতো? "
আবিরের কথার ধরন শুনে নিবিড় গুনগুন থামিয়ে ফিরে তাকায় তার দিকে। আবিরও বাঁকা হেসে মাত্রই প্যান্টের জিপ আটকায়।নিবিড় বুঝতে পারে আবির ঠিক কিসের কথা বলছে। সেও পকেট থেকে ফোন বের করে বিছানায় বসতে বসতে বলে...
"আমি লুজ নাহ, তুই একটু বেশিই ফাস্ট। আর এমনিতেও এটা প্রথমবার বলেই আমি.... "
আবিরও এগিয়ে এসে বসতে বসতে বলে...
" কার প্রথমবার, তোর নাকি ওর? "
"দুজনেরই। আর যতদূর জানি তোরও এটাই প্রথম। তাহলে তুই এতো উত্তেজিত কি করে হলি বলতো ভাই? তার উপর ছোট পাখিকে নাকি তোর পছন্দও না আবার।"
"আবির বিন চৌধুরী হট ব্লাডেড, বুঝতেই পারছিস। "
"এতটা র্যাশেনাল হওয়াটা উচিৎ হয়নি, তোরও বুঝা উচিৎ ছিলো এটা ছোটপাখিরও ফাস্ট টাইম।"
আবির ঝেড়ে বসে বললো..
"এত সব বুঝি না, চ্যলেন্জ আমিই জিতেছি, তাই এখন তুই ঐ পেঙ্গুইনকে আমার সামনে মুখে তালা লাগিয়ে রাখতে বলবি। "
নিবিড়ও তেড়ে উঠে বললো...
"বললেই হলো তুই জিতেছিস? তোর আগে আমি কিস করেছি। "
আবির ঠোঁট বাঁকিয়ে হেঁসে দু আঙুল উঁচিয়ে বলে...
"যাস্ট টু সেকেন্ডস আগে করেছিস। এটা আর এমন কি। চ্যালেন্জ আমিই জিতেছি কারন তোর ডেস্টিনেশন ছিলো এভারেজ দু মিনিট, আর আমার সাত মিনিট। "
নিবিড় চোখ গোল গোল করে বললো...
"ঐ সময়ও তুই আমার ডেস্টিনেশন নিয়ে পড়ে ছিলি ইয়ার? বহুত জাওড়া তো তুই। "
"অবশ্যই কাউন্ট করবো। আর তুই একটা করেছিস, আর আমি টানা তিনটা। "
নিবিড়ও প্যাচ দিয়ে বললো...
"তুই আমার থেকেই ইন্সপায়ার হয়ে স্টার্ট করেছিস, সো আমিই জিতেছি, আম্মুকে গিয়ে আমার আর মিস এটমের বিয়ের জন্য রাজি করা, গো..."
"এসব হচ্ছে না, চ্যালেন্জ আমিই জিতেছি। ইউ গো.. "
"আমি জিতেছি.. "
"নাহ আমি.."
"আমি.. "
"আবির জিতেছে, তুই যা ঐ পেঙ্গুইনকে আমার সামনে মুখে তালা লাগানোর ব্যবস্থা কর। "
"নিবিড় জিতেছে, তুই যা গিয়ে আম্মুকে আমার আর এটমের বিয়ের কথা বল.."