ছুটির দিনের আমেজটা যেন সব পরিবারেই বিদ্যমান। একটু দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা, সব কিছুতেই একটু আলসে আলসে ভাব থেকেই যায় যেন। শীতের আড়ম্বরে চারদিন শোভাবর্ধক হয়ে উঠেছে শহরের।
আজ শুক্রবার, আজমলরা তিন ভাই সপ্তাহের এই দিনেই সকালের নাস্তা সেরে এক সাথে বাজারে চলে যায়। আহিশ ব্যাস্ত হয় ভিডিও গেমে। ড্রয়িং রুমের সোফায় আয়েশ করে বসে টিভি দেখায় মত্ত জেসি আর চড়ুই পাখি। দোয়েল রান্না ঘরে সাবিহাদের সাথেই টুকটাক কাজে সাহায্য করছে। জুলেখা গলা উঁচিয়ে আহিশ জেসিকে বললো...
"তোদের আব্বুরা বলেছে আজ পারলে জিসানের বিয়ের শপিংটা সেড়ে নিতে, আবির নিবিড় সহ গিয়ে না হয়..."
আহিশ নাকোচ করে বললো...
"আজ হচ্ছে না শপিং। অন্য কাজ আছে আজ। সবারই। "
সাবিহা বললো...
"তোদের বড় আব্বু আসলে পাখিদের বাবার নম্বরটা দিস তো, জিসানের বিয়ে পর্যন্ত ওরা এখানেই থাকবে। কথা বলে রাখলে ভালো হয়। "
আহিশ উত্তর দেয়...
"ওরা আরো এক বছর এখানে থাকলেও ওদের বাবার কোনো মাথা ব্যথা নেই এটা নিয়ে। তবুও বলছো যখন কল দিয়ে বলেই দিও একবার। "
দোয়েল সাবিহাকে বলে...
"আমরা বিয়ের আগেই চলে যাবো আন্টি। ঐ ভাবে তো ভেবে চিন্তে কিছু নিয়েও আসি নি। "
"মার চিনিস মেয়ে? মুখের উপর কথা বলছিস যে? যা বলছি তাই শুনবি। এখনো এতটা বড় হোস নি তোরা। "
সাবিহার এমন মিষ্টি শাসন গুলোতে বেশ অনুভব করে দোয়েল। তাদের মা বেঁচে থাকলে হয়তো এভাবেই শাসন করতো। এর মাঝেই কলিং বেল বাজতেই একজন সার্ভেন্ট গিয়ে দরজা খুলে দিলো। একটু পরেই দোয়েলের সামনে এসে বললো...
"দোয়েল মামনি, তোমার পার্সেল আইছে। "
দোয়েল অবাক হয়, তাকে আবার কে পার্সেল পাঠালো? কৌতুহল নিয়ে পার্সেলটা হাতে নিলো সে। সাবিহা তাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে...
" কিরে? এভাবে দাঁড়িয়ে না থেকে খুলে দেখ কি আছে? "
দোয়েল মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়, কিচেনের টেবিলের উপর রেখেই বাক্সটা খুলে সে। প্রথমেই চোখে পরে কয়েকটি ইমুজি বল, যেগুলোর প্রতিটার মধ্যেই sorry লিখা। এগুলো সরাতেই কয়েকটি ছবি। ছবি গুলো দেখেই দোয়েল ঢোক গিলে। এই পার্সেলটা কে পাঠিয়েছে, সেটা এতক্ষণে ঠিক বুঝে গেছে দোয়েল। সাবিহা আড় চোখে তাকিয়ে ছবি গুলোর দিকে চোখ যেতেই বলে উঠলো....
"ওমাহ এটা তো আমার ছেলে মনে হচ্ছে। দেখি দেখি..."
বলতে বলতেই একটা ছবি হাতে তুলে নিয়ে ভালো করে লক্ষ্য করে বলে...
"এটা তো আমার নিবিড় বাবা। ওভাবে কান ধরে বসে ছবি তুলে সেটা তোকে পাঠালো কেন? সাবিহা এবার আরেকটু কৌতুহল নিয়ে বক্স হাতাতেই একটা ভাজ করা কাগজ পায়। সেটা দেখে কোনা চোখে দোয়েলের দিকে তাকিয়ে দেখে মেয়েটা মুখ চুপসে দাঁড়িয়ে আছে৷ সাবিহা জিজ্ঞেস করলো..
" আমি কি পড়ে দেখতে পারি? "
দোয়েল না করতে পারে না, মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিতেই সাবিহা কাগজটি খুলে পড়তে শুরু করে...
"ওওও মিস এটম, বোমের মতো সারাক্ষণ রেগে না থেকে একটু মাফ তো করে দিতেই পারো আমায়। চারটা দিন তো পাড় হলো, এখনো তোমার রাগ কমে নি। তোমার জন্য কি কি করতে হবে একবার বলো আমায়, আমি সব করতে রাজি, শুধু জীবন দিতে পারবো না। তাও তোমার ভালোর জন্যই বুঝলে, কারন আমি মরে গেলে আমার ভাইটাও মরে যাবে, আর আমরা দুজন এক সাথে মরে গেলে আমার আম্মু তো ভীষণ কষ্ট পাবে। আর তুমি তো আমার আম্মুকে অনেক ভালো বাসো,তার কষ্টে তোমারও তো কষ্ট হবে তাই না? এখন বলো, আমি কি তোমায় কষ্ট দিতে পারি? প্লিজ এবারের মতো মাফ করে দাও। আর কোনোদিন কোনো ছেলেকে তোমার বয়ফ্রেন্ড ভেবে পিটাবো না সত্যি বলছি। সুহাসকে তো আমার ছোট ভাইয়ের মতো দেখবো এবার থেকে। মাফ করে একটু রাগ কমাও না প্লিজ। তুমি এভাবে রেগে থাকলে আমার পেটে ভাত হজম হয় না, আজ চারদিন ধরে পেটের সমস্যায় ভুগছি, একটু তো খোঁজও নাওনা একই বাড়িতে থেকে। কি যে একটা মানুষ তুমি? প্লিজ মাফ করে দাও, প্লিজজজজজ.."
পুরোটা পড়েই সাবিহা কাগজটা ভাজ করতে করতে মাথা ঢুলিয়ে বলে...
"তাহলে এই ব্যপার, সুহাসকে ঐ হতচ্ছাড়াটা মেরেছে। আজ তো ওর একদিন কি আমার একদিন।"
বলেই সাবিহা নিবিড়ের ঘরের দিকে তেড়ে যেতে নিলে দোয়েল পেছন থেকে হাত চেপে ধরে তার।
"আন্টি, আন্টি তুমি উনাকে কিছু বলো না প্লিজ। এমনিতেই আমি ঐদিন অনেক কথা শুনিয়েছি। "
"তার পর থেকে আমার ছেলেটার সাথে ভীষন মান অভিমান চলছে তোর, তাই তো? "
দোয়েল মাথা নুইয়ে ফেলে। উত্তর দেওয়ার মতো মুখ যে নেই তার। সাবিহা একটুক্ষণ পর হেঁসে দেয় আপন চিত্তেই। জিনিস পত্র সব আবার বক্সে ঢুকিয়ে বড় পাখির হাতে দিতে দিতে বললো...
"বেশ করেছিস কথা না বলে।এই ছেলে দুটোকে সহজে হেনস্তা করা যায় না বাপু।তুই পেরেছিস, চালিয়ে যা তোদের মান অভিমান। আর জিনিস গুলো যত্নে রাখবি, কিছু সামান্য জিনিসও এক সময় মজার স্মৃতি তৈরি করে। "
এতটুকু বলেই সাবিহা বেরিয়ে যায় কিচেন থেকে। আর দোয়েল কথা গুলো শুনেই সস্তি পায়, যাক আন্টি তাকে ভুল বুঝে নি অন্তত।
জিনিস গুলো নিয়ে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে নিজেদের কক্ষের সামনে আসতেই পা থেমে যায় দোয়েলের। কারন রুমের দরজার সামনে নিবিড় হেলান দিয়ে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। পড়নে তার কালো রঙের একটি সেন্ডো গেঞ্জি আর একটি কালো শর্ট প্যান্ট। এই শীতেও শরীর বেয়ে ঘাম ঝড়ছে তার। দোয়েল বুঝে নিলো, হয়তো মাত্রই জিম থেকে এসেছে সে।
দোয়েল তাকে পাশ কাটিয়ে রুমে ঢুকতে গেলেই নিবিড় তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দোয়েল অপর পাশ দিয়ে ঢুকতে গেলে নিবিড়ও সেদিকে গিয়ে দাঁড়ায়। বিরক্ত হয় দোয়েল, আজ চারটা দিন ধরেই নিবিড় এমন করে আসছে শুধু মাত্র তার মন গলানোর জন্য। কিন্তু দোয়েল তো এত সহজে মানার পাত্রী নয়। বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে সে...
"কি সমস্যা আপনার? "
"তুমি আমায় মাফ করেছো বলো? "
"আপনার সাথে আমার কোনো কথা নেই, সরুন সামনে থেকে। "
বলেই দোয়েল যেতে নিলেই নিবিড় তার বাহু চেপে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আসে..
"আরেহ, একটু তো সম্মান করো এটম, তোমার থেকে কম করে হলেও সাত- আট বছরের বড় হই। "
দোয়েল লম্বা একটা নিশ্বাস ফেলে অভিনয় করে বলে..
" ঠিক আছে, আমার ভুল হয়েছে। নিবিড় ভাইয়া, আপনাকে আমি আমার মনের তীব্র সম্মানের স্থান থেকে বলছি,দয়া করে একটু সরে দাড়িয়ে এই অধমের উপর রহম করুন। প্লিজ ভাইয়া... "
নিবিড় ক্যাবলার মতো মুখ করে বললো...
"ভাইয়া!!!!"
দোয়েল উত্তর না দিয়ে এক প্রকার ঠেলে ভেতরে ঢুকে দরজাটা ঠাস করে আটকে দেয়। নিবির আপন মনেই বলে ওঠে...
"আরে, এতদিন কিছু বলে ডাকেনি তাই তো ভালো ছিলো৷ এই ভাইয়া কেন আসলো ইয়ারর...!"
--------------
আবছা আধারে নিমজ্জিত ঘরটা এই মুহুর্তে ভীষন নীরব। ড্রীম লাইটের নীলছে আলোয় বিছানার উপর ব্ল্যাঙ্কেটের ভীরে উকি দিচ্ছে একটি পেশিবহুল তনু। উদাম শরীরে কোমর পর্যন্ত ব্ল্যাঙ্কেট টানা। উপরে সম্পূর্ণ দেহ খালি থাকায় এবস গুলো দৃশ্যমান পুরুষালি দেহের। সুগঠিত বাইসেপস যুক্ত হাত দুটো একটু উপরে তুলে রাখা। এভাবেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে উপুর হয়ে নরম বিছানায় আরামের ঘুম দিচ্ছে আবির।
তবে সেই ঘুমে তার চরম ব্যাঘাত ঘটে। কান পাতলা হলে যা হয় আর কি। পিন ড্রপ করলেও মস্তিষ্ক সচল হয়ে যায় যার, তারই কানে এসে বাজছে গুনগুনিয়ে কান্নার সুর। কেউ কাঁদছে, থেমে থেমে, বার বার নাক টানার শব্দটাও কানে আসছে আবিরের। কেউ তার খুব সন্নিকটে কাঁদছে।
তড়িৎ গতিতে লাফিয়ে ওঠে আবির। পায়ের কাছে কারো অস্তিত্ব লক্ষ্য করতেই শীতল তবে কিছুটা হুঙ্কার দিয়ে বলে ওঠে....
"এই কে? "
তার হুঙ্কার কাজে এসেছে। পায়ের কাছে বসে থাকা মেয়েটি দু হাটু ভাজ করে ভয়ে সিটিয়ে গেছে আরেকটু পেছনে। কান্নার বেগ আরেকটু বেড়ে যায় তার। আবির হাত বারিয়ে স্বল্প আলো যুক্ত টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালায়। সাথে সাথেই মেয়েটির মুখ স্পষ্ট হয়। এটা চড়ুই পাখি। চুল গুলো বাঁধা, কোনো ভাবেই দেকে বোঝার উপায় নেই এটা চড়ুই নাকি দোয়েল। কিন্তু আবিরের মন বলছে এটা চড়ুই পাখি। কিভাবে বুঝেছে তা সে নিজেও জানে না।
আবির সামলে নেয় নিজেকে, চড়ুই ভয় পেয়েছে, বুঝতে পেরেই কন্ঠে কোমলতা আনে সে,
"ওয়াইফি? ওয়াট হ্যাপেন্ড? ভয় পেয়েছো? "
চড়ুই নাক টেনে টেনে কাঁদতে থাকে। কান্তার তোপে হিচকি উঠে যাচ্ছে বার বার তার। আবির একটু এগিয়ে যায়, এক হাত বাড়িয়ে আলতো করে কাছে টেনে নেয় তাকে....
"এদিকে আসো, ভয় পায় না ওকেয়? আসো,কিচ্ছু হয় নি। "
চড়ুই পাখিও কি বুঝে যেন এগিয়ে গেলো আবিরের কাছে, ভয় পেলো না সে যেন। আবির নিজের উদাম শরীরে আস্তে করে জড়িয়ে নেয় চড়ুইকে। চোখ মুছে দিয়ে শান্ত করতে থাকে তাকে....
"কান্না থামাও, কিচ্ছু হয় নি। সব ঠিক আছে ওকেয়? কান্না থামাও। "
চড়ুই হাতেের তালু দিয়ে বাচ্চাদের মতো করে চোখ নাক মুছে নেয়। কান্নার কারনে বার বার কেঁপে কেঁপে উঠছে তার শরীর। আবির সময় দেয় তাকে। রাগারাগি না করে নীরবে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। একটু পরেই চড়ুই কিছুটা শান্ত হওয়ার পর আবির জিজ্ঞেস করে...
"কি হয়েছে? এত রাতে, তুমি আমার রুমে কেন এসেছো? "
চড়ুই ভাঙা ভাঙা গলায় বলে...
"আ্ আমার খুব ভয় করছিলো, ত্ তাই... "
" কেন ভয় পাচ্ছিলে তুমি? ডিনার করেছো? "
চড়ুই দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়। আবির হাত বাড়িয়ে ফোন নিয়ে সময় দেখে নেয়...
"রাত সাড়ে এগারোটা বাজে, তুমি এখনো ডিনার করো নি কেন? "
"ঘুমিয়ে গেছিলাম আমি, তাই... "
"তো এখন জেগেছো যখন যাও খেয়ে নাও। আর ভয় কেন পেয়েছিলে? "
"আ্ আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি ব্ বোন, জেসি কেউ রুমে নেই। তার পর রুম থেকে বের হয়ে দেখি বাড়িতে কেউ নেই, পুরো বাড়ি অন্ধকার হয়ে আছে। শ্ শুধু আপনিই এখানে ঘুমাচ্ছিলেন, তাই আমি... "
আবিরের ভ্রু কুঁচকে যায়। আবার ফোন হাতে নিতে নিতে বলে...
"বাড়িতে কেউ নেই মানে? সন্ধ্যায় তো সবাইকে দেখলাম,এত রাতে কোথায় যাবে সবাই? এই মেয়ে, তুমি আমার সাথে মজা করছো এই সময়? "
চড়ুই দু পাশে মাথা নাড়িয়ে বলে..
" বিশ্বাস করুন, চড়ুই মিথ্যা বলছে না।সত্যি বাড়িতে আপনি ছাড়া কেউ নেই। "
ফোন চেক করতেই আবির দেখে বেশ অনেক গুলো মেসেজ, কল বাড়ির সবার নম্বর থেকে। ঘুমের কারনে ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছিলো সে, তাই একটাও এতক্ষণ চোখে পড়ে নি তার।এখন সব গুলো পড়তেই আবির তাকায় চড়ুইয়ের দিকে।
"ওড়না কোথায় তোমার?"
"র্ রুমে ফেলে এসেছি। "
"যাও নিয়ে আসো ওরনা, একটা সুয়েটার পড়ে নিও, বাইরে ঠান্ডা হয়তো। আমিও ফ্রেশ হয়ে নিচ্ছি। "
চড়ুই চোখ গোল গোল করে আবিরের দিকে তাকিয়ে দু দিকে মাথা নাড়ে। তা দেখে আবির জিজ্ঞেস করলো...
"কি সমস্যা? "
"রুমে যাবো না।"
"কেন? "
"ভয় করছে আমার।"
আবির হালকা ধমক দিয়ে বলে ওঠে...
"এই রুম থেকে পাশের রুমে যেতে ভয় করছে তোমার?"
চড়ুই মুখ ফুলায়, আবার কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলে ওঠে...
"বকছেন কেন আমাকে? "
আবির পরে মহা মুসকিলে, এই মেয়েকে এখন কিছু বলাও যাবে না। চড়ুইকে থামানোর জন্য আবার তারাহুরো করে বলে...
"আচ্ছা আচ্ছা, সরি, বকছি না তোমায়। সুন্দর করে বলছি,রুমে যাও সুয়েটার পরে ওরনা নিয়ে আসো। "
"একা যাবো? "
"একা কোথায় রে বাবা, আমি আছিই তো এখানে। যাও না?"
চড়ুই উঠে দাঁড়ায়, ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে আবার পেছনে পিরে তাকায় আবিরের দিকে। আবিরও খাট থেকে নেমে বিছানার কোনা থেকে শার্ট তুলে নেয় হাতে। চড়ুইও বেরিয়ে যায় রুম থেকে। আবির আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শার্ট পড়ে নেয়। দুটো বাটন লাগাতেই আয়নায় দেখতে পেলো চড়ুই ছুটে এসে আবার রুমে ঢুকছে। আবির পেছনে ফিরে জিজ্ঞেস করলো...
"কি হলো? "
চড়ুই হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের হাতে ওরনাটা দেখিয়ে বললো...
"নিয়ে এসেছি। "
আবির ভ্যাবলার মতো তাকায় তার দিকে..
"এত তারাতারি? অলিম্পিকের দৌড় দিয়েছো নাকি তুমি? সুয়েটার কোথায়? "
"গরম লাগছে, আর এখন সুয়েটার খুঁজতে গেলে যদি ভুত আমার পেছন থেকে ঘাড় মটকে দেয় তো? "
আবির বিরক্ত হয় এমন যুক্তিহীন কথায়...
"পাগল কোথাকার। এদিকে আসো। "
"কেন? "
"ঐ যে দরজা দিয়ে ভুত আসছে, তোমার ঘাড় মটকাবে। "
ব্যস, এই টুকুতেই কাজ হয়ে গেলো যেন। চড়ুই 'বাবাগো' বলে এক ছুটে এসে দাঁড়ায় আবিরের কাছে। আবির তাকে পেছনে ঘুরিয়ে চুল থেকে খোপায় লাগানো কাকড়াটা খুলে ফেলে চড়ুইয়ের।
"আহ কি করছেন? চুল ছিড়ে ফেললো আমার। "
"সরিহ"
বলেই আবির ড্রেসিন টেবিল থেকে হেয়ার ব্রাশটা নিয়ে চড়ুইয়ের চুল আছরে দেয় সুন্দর মতো। তারপর নিজেও চুলে দু তিন বার ব্রাশ চালিয়ে নেয়। বেসিনের সামনে গিয়ে পানি ছেড়ে মুখে ঝাপটা দিয়ে নেয় সে। টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতে মুছতেই দরজার দিকে এগিয়ে যায় সে...
"চলো.. "
চড়ুই কি আর এখানে থাকার পাত্রী? সেও ছুট লাগায় আবিরের পিছু পিছু..
"কোথায় যাচ্ছেন? "
পা থেমে যায় আবিরের। পেছনে ফিরে চড়ুইকে বলে...
"ডিভানের উপর শালটা নাও তো?"
চড়ুই বাধ্য মেয়ের মতো আবিরের কালো রঙের শালটা কাঁধে চাপিয়ে এগিয়ে আসে আবার। আবিরও হাটা ধরে। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতেই চড়ুই আবার জিজ্ঞেস করে...
"কি হলো? কোথায় যাচ্ছেন? "
"বাইরে। "
"বাইরে কেন? বাড়ির সবাই হারিয়ে গেছে। সবাইকে খুঁজতে হবে তো। "
"চুপচাপ চলো। "
"আমাকে নিয়ে যাবেন?"
"একা থাকবে বাড়িতে তুমি? "
"একদম নাহ, কিন্তু আপনি যদি আবার আমাকে মাঝরাস্তায় ফেলে দিয়ে আসেন তো? "
আবির চোখ গরম করে তাকায় চড়ুইয়ের দিকে। তারপর আবার সামনে হাটা ধরে...
"আমাকে আপনি কোলে নিন, আমি আপনাকে শক্ত করে ধরে রাখবো, তাহলে আর আপনি আমাকে ফেলতে পারবেন না। "
আবির এবার চরম বিরক্ত হয়ে বলে...
" একটা থাপ্পড় মারবো। চুপচাপ হাটো। "
চড়ুইয়ের মুখ ভোতা হয়ে যায়। বিরবির করে আবিরকে এক সমুদ্র সমান গালি দিতে দিতেই এগিয়ে যায় তার পিছু পিছু। আবিরের কানে আসে সবই। কিন্তু এই আধ পাগলা মেয়ের সাথে এই মুহুর্তে ঝগড়া করার মুড নেই দেখেই নীরবে সয়ে যাচ্ছে সবটা। বাড়ির মেইন ডোরে তালা মেরে পার্কিং এরিয়ার দিকে এগিয়ে যায় তারা। ফোনে মেসেজ আসার আওয়াজ পেতেই পকেট থেকে ফোন হাতে নেয় আবির। নিবিড়ের মেসেজ....
"" মিস এটমের রাগ কমছে আমার থেকে। আমি কিন্তু এগিয়ে যাচ্ছি ভাই। চ্যালেন্জ তো আমিই জিতবো,আম্মুকে রাজি করানোর জন্য প্ল্যান রেডি কর তুই। ""
নিবিড় চ্যালেন্জ জিতে যাচ্ছে, এ তো কিছুতেই এত সহজে মানতে পারবে না আবির। চোখ তুলে চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে, চড়ুই তার দিকেই তাকিয়ে আছে ড্যাব ড্যাব করে। আবির এগিয়ে যায় তার দিকে। আবিরকে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে চড়ুই ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো...
"কি হলো? ড্রাইভিং সীটের দরজা তো ওপাশ দিয়ে। আপনি এদিকে আসছেন কেন? "
আবির উত্তর দেয় না। নীরবে এগিয়ে এসে একদম মুখোমুখি দাঁড়ায় চড়ুইয়ের। দৃষ্টি নিবদ্ধ করে চড়ুইয়ের কোমল ওষ্ঠে।সুন্দর, হ্যা ফিগারের দিক দিয়ে হাড্ডি হলেও মেয়েটার ঠোঁট গুলো ভীষন আকর্ষণীয়ই মনে হলো আবিরের কাছে। মন বলছে এক্ষুনি সেই অসমম্পূর্ণ কাজটা সম্পূর্ণ করে ফেলতে, নীরবতা, নিরালা এক পরিবেশ যেন আবিরের পৌরুষ চিত্তকে উষ্কে দিতে প্রস্তুত। চড়ুইয়ের দু দিক দিয়ে হাত নিয়ে গাড়িতে রাখে আবির। নিজেও ধীরে ধীরে ঝুকতে থাকে চড়ুইয়ের কোমল অধরের দিকে। আবির জিতে যাচ্ছে, এক সেকেন্ডের ব্যবধানে আবির জিতে যাচ্ছে, মনের আনন্দ নিয়েই এগোচ্ছিলো আবির চড়ুইয়ের ওষ্ঠ দখল করতে, আর ঠিক তখনই ভেসে এলো চড়ুই পাকির বিরক্তিকর বুলি...
"উফফ দানাবল। কি মশা এখানে, আপনি আমাকে এখানে দাঁড় করিয়ে রেখে মশার কামড় খাওয়াচ্ছেন কেন বুঝলাম না। "