গরম তেলে পানির ছটা পড়লে যেমন ছিটকে যায়, তেমন করেই একে অপরের থেকে ছিটকে পড়লো আবির আর চড়ুই। ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলছে দু জনই। সাবিহা মাত্রই ঘরে ঢুকে দু জনকে এমন হাঁপাতে দেখে জিজ্ঞেস করে..
"কিরে? তোদের দুটোর আবার কি হলো? এমন হাঁপাচ্ছিস কেন? "
চড়ুই কোনো মতে নিজেকে শান্ত করে আবিরের দিকে চোখ কুটি করে তাকায়। পরক্ষণেই সাবিহা কে বলতে নেয়...
"আন্টি, এই দানাবলটা আমার ঠোঁ..."
আর পারলো না বলতে চড়ুই পাখি। কারন ইতোমধ্যেই আবির হামলে পড়ে তার মুখ চেপে ধরে নিয়েছে। চড়ুই কথা বলার জন্য ছটফট করছে, মুখ থেকে শুধু উমম,উমম আওয়াজ বের হচ্ছে। সাবিহা আবিরের কান্ড দেখে বলে উঠলো...
"এই এই কি করছিন? ওকে বলতে দে, কি করেছিস তুই? "
"আম্মু, এই মেয়েটা এত খচ্চর, ঘুমালে এর মুখ বেয়ে লালা পড়ে ছিহ।এই কথা বলেছি, তো উনি আমায় মারতে শুরু করেছে। "
চড়ুই চোখ গরম করে তাকায় আবিরের দিকে। এই লোকটা এত মিথ্যুক, মুখ টা ছুটলে এক্ষুনি সাবিহাকে বলতো সবটা। সাবিহা ভ্রু কুঁচকে বললো...
"ও তোকে মারছে আর তুই বুঝি এমনি বসে থাকবি? এটা মানতে হচ্ছে আমার? "
আবির এবার নেকি সুরে বললো...
"আম্মু, তোমার এমন মনে হয়? আমি মেয়ে মানুষের গায়ে হাত তুলবো এমন মনে হয় আমাকে? আর একে তো মারতেও দয়া হয়, ভয়ও হয়, আমার একটা থাপ্পড়ের সাথেই এই পেঙ্গুইন ফ্লোরে পড়বে, উল্টো ওকে মারতে গিয়ে হাড্ডির সাথে বারি লেগে আমিই বেশি ব্যথা পাবো। "
সাবিহার সন্দেহ হয়, তবে কিছু বুঝতে না দিয়ে বলে...
"ঠিক আছে। এবার ওকে ছাড়। ফ্রেশ হয়ে আসুক ও। "
"তুমি যাও আম্মু। তারপর ছাড়ছি ওকে। "
"আমি গেলে কেন? এখনই ছাড়... "
"অসম্ভব। আ্ আসলে আম্মু, ও্ ওর মুখ থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে, ব্রাশ করেনি তো এখনো। ত্ তুমি যাও না প্লিজ..."
সাবিহা আরো একবার দুটোকে নজরদারি করে বেরিয়ে যায় রুম থেকে। সে যেতেই আবির চড়ুইয়ের মুখ থেকে হাত সরায়। চড়ুই হিংস্র বাঘিনীর মতো তাকায় আবিরের দিকে...
"এটা কি হলো? আমার মুখে দুর্গন্ধ? "
"তা নয় তো কি? "
"তাহলে দুর্গন্ধওয়ালা ঠোঁটে কিস করতে যাচ্ছিলেন কেন আবার? "
"ক্ কে বলেছে আমি কিস করতে যাচ্ছিলাম? আমি ইচ্ছে করে করি নি। "
"ইচ্ছে করে করেন নি মানে? ভুতে উষ্কেছে আপনাকে? "
"তুমি উষ্কেছো মেয়ে। তুমিই আমাকে সিডিউস করছিলে নিজের দিকে। "
"আবেহ... আমি কি হট শাড়ি পড়ে আচল সরিয়ে বসে আছি নাকি যে আপনি সিডিউস হয়ে গেলেন? "
"আমি তোমার এই পাগলের বেশ দেখেই সিডিউস হয়েছি। আর তুমি কি পাগল নাকি হ্যা? এসব কেউ বড়দের বলে? "
"বেশ করেছি আন্টিকে বলতে নিচ্ছিলাম। আমি বলেই ছাড়বো। আমি এক্ষুনি গিয়ে সবাইকে বলবো। "
বলতে বলতেই চড়ুই বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে যেতে নিলেই পেছন থেকে আবির বলে ওঠে...
"ঠিক আছে, আমার আম্মুর কাছে নিজেকে খারাপ বানাতে চাইলে যাও বলে দাও।"
পা থেমে যায় চড়ুইয়ের।আবিরের কথা বুঝতে না পেরে পেছনে ঘুরে বলে.
"মানে? "
আবির দু হাত বিছানায় ভর দিয়ে বাঁকা হেসে বলে...
"তোমার কথা আম্মু বিশ্বাস করবে? "
চড়ুইও বোকার মতো বলে ওঠে...
"করবে না কেন? আন্টি আমাকে মায়ের মতো ভালোবাসে। "
আবির তাচ্ছিল্য হেঁসে বললো...
"মায়ের মতো, মা তো আর নয় তোমার। "
ছোট্ট একটি কথা, কিন্তু হুট করেই চড়ুই পাখির হৃদয়ে কেমন পাথর চাপা দিয়ে দিলো। 'মা তো নয়' এই কথায় কি আছে? বুকটা ভারি লাগছে চড়ুইয়ের, আসলেই তো তার মা নয় কেউ। তার মা তো নেই। আন্টিও তো নয়।
"উনি আমার মা। আর এই বাড়ির সবাই আমার লোক। তাই আমি যা বলবো তাই তারা বিশ্বাস করবে, তোমার কথা নয়। এখন যদি তুমি গিয়ে একটু আগের কথাটা সবাইকে বলো, আমিও গিয়ে বলবো যে তুমি আমায় নিজের দিকে সিডিউস করেছো। আর এটাই সবাই বিশ্বাস করবে, তোমাকে ছি ছি করবে। তোমার সাথে সাথে বড় পাখিরও সম্মান যাবে কিন্তু। এবার ভেবে দেখো তুমি বলবে নাকি বলবে না। "
চড়ুইয়ের বোকা মস্তিষ্কে এই টুকু কথা বিশাল প্রভাব ফেললো। বোকা পাখিটা আবিরের কথাকেই সত্য মেনে নিলো। আরেকটি ছোট আকারের অভিমানও বুকে জমা করে নিলো হুট করে। মাথা নুইয়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে আস্তে করে বলল..
"ঠিক আছে, কাউকে বলবো না। "
আবিরের মুখে বিশ্ব জয়ের হাসি।পেঙ্গুইনটা ভয় পেয়েছে অবশেষে, এতটুকু ঠিকই বুঝলো সে, তবে বুঝতে পারলো না ভয়ের সাথে সাথে একটু খানি অভিমানও জমে গিয়েছে মেয়েটার মনে।
--------
ভার্সিটির ক্লাস শেষ করেই নিবিড়ের সাথে আজ আবার সুহাসের বাড়িতে এলো বড়পাখি। ছোটপাখি, আহিশ জেসির সাথেই বাড়ি চলে যায়।
সুহাস মাত্রই পানির গ্লাসটা মুখে নিচ্ছিলো। এমন সময় নিবিড় আর দোয়েলকে নিজের সামনে দেখে ছিটকে পড়ে গেলো তার হাত থেকে গ্লাসটি। কুল কিনারা না পেয়ে বিছানার একদম কোনায় গিয়ে দু হাত জোড় করে ভয়ে ভয়ে বলতে লাগলো...
"স্ স্ স্যার, আ্ আমি আর কিছু করি নি স্যার। বিশ্বাস করুন আমি পাখিদের দিকে ফিরেও তাকাই নি আর,প্ পাখি? পাখি কে? কারা এরা? আ্ আমি চিনিই না কোনো পাখিকে, ভুলে গেছি স্যার, প্লিজ আর মারবেন না স্যার। আমি কান ধরছি স্যার প্লিজ...."
সুহাসের এমন কান্ড দেখে দোয়েলের চক্ষু চরক গাছ। হঠাৎ এমন কাজের মানে কিছুই বুঝতে পারছে না সে। নিবিড় ঢোক গিললো, এই ছেলেটার সব কিছু এখনই উগলে দিতে হলো? আমতা আমতা করে বলতে লাগলো...
"আ্ আরে ছোট ভাই, ক্ কি বলছো৷ শান্ত হও, আমি কিছু করবো না, ক্ করিও নি। আমি তো... "
সুহাসও ভয়ের চোটে বলে ওঠে...
"না না স্যার, আ্ আপনিই ছিলেন, আমি জানি, চিনিও, আপনার চোখ বেগুনি, ঐ দিন বেগুনি চোখওয়ালাটাই আমায় পিটিয়েছিলো, আ্ আমি বড়পাখির বয়ফ্রেন্ড না স্যার। এ্ এই বড় পাখি, তোর সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ, ত্ তোকে আমি চিনি না, এনাকে নিয়ে যা প্লিজ..."
ব্যাস, হয়ে গেলো। নিবিড় চোখ খিঁচে বন্ধ করে নেয়। একটু পরেই ভয়ে ভয়ে এক চোখ খুলে দোয়েলের দিকে তাকাতেই দেখে মেয়েটা তার দিকেই চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে।
সুহাসের বাড়ি থেকে বের হতেই দোয়েল রাস্তার আরেক পাশে যেতে চায়। নিবিড় পিছন পিছন এগিয়ে বলতে থাকে...
"মিস এটম, গাড়ি তো এখানে। তুমি ওদিকে কোথায় যাচ্ছো? ওও মিস এটম... "
দোয়েল তড়িৎ গতিতে তর্জনী আঙুল তুলে ক্ষেপে গিয়ে বললো...
"একদম আমার পিছু পিছু আসবেন না। আমি সিএনজি নিয়ে চলে যাবো। "
নিবিড় বলতে থাকে..
"ওও মিস এটম, প্লিজ এত গরম হয় না, ব্লাস্ট করলে পুরো শহর জ্বলে যাবো তো। "
দোয়েল থেমে চোখ পাকিয়ে তাকায় নিবিড়ের দিকে। তা দেখেই নিবিড় বুকে হাত দিয়ে বললো..
"আল্লাহ, আমি ভয় পাচ্ছি। প্লিজ এভাবে তাকায় না। "
দোয়েল তিতির বিরক্ত হয়ে আবার হাঁটতে নিলেই নিবিড় এবার হাত চেপে ধরে তার। কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলে....
" প্লিজ প্লিজ, লেট মি এক্সপ্লেইন। প্লিজজজ মিস এটম... "
দোয়েল দাত কিড়মিড় করে হাত ছাড়িয়ে নেয় নিবিড়ের থেকে। দু হাত বুকে গুঁজে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো...
"কেন মেরেছেন সুহাস ভাইকে? কি ক্ষতি করেছে ও আপনার?"
নিবিড় মাথা ঝুকিয়ে চোরা কন্ঠে বলে...
"কিছু করে নি। "
"তাহলে? কেন মেরেছেন ওকে এভাবে? আপনারা কি মনে করেন নিজেদেরকে? সেদিন না জেনে না শুনে আমার বোনকে জেলে দিয়ে দিচ্ছিলেন আপনারা। ভাগ্য ভালো হওয়ায় ওর জায়গায় আমি গিয়েছিলাম লুকিয়ে। সেদিন আমি যতটুকু আঘাত সহ্য করেছি আমার বোন হলে তো সেদিনই ও.... ।
আপনাদের যখন যাকে ইচ্ছে পুলিশে দিয়ে দিবেন, যাকে ইচ্ছে এভাবে মারধর করে ফেলে আসবেন, একটি বার চিন্তা করে দেখেছেন এর পরবর্তী সময়টা তাদের কি করে যায়? ঐ দিন তো বাড়িতে ঢুকতে দিয়েছে এতটুকু দেখেছেন আপনারা। তারপর যে ঘরের ভেতরে আমার সামনে আমার বোনটাকে বেধরম মেরেছে সেটা কি দেখেছেন আপনারা? সারাটা রাত আমার বোন ব্যাথায় ছটফট করেছে জানেন আপনি হ্যা? আপনাদের কিছু সময়ের ক্ষোব মিটাতে গিয়ে কখন কি হয়ে যায় তা বুঝেন আপনারা ?সুহাস ভাইয়ের সেমিস্টার এক্সাম চলছে, আজ চারদিন সে পরিক্ষা দিতে পারছে না, একটা বিষয়ের জন্য পাঁচশ টাকা করে দু হাজার টাকা জমা দিতে হবে ওর। ওর বাবা নেই, পরিবারে মা ছোটবোনের সব আবদার ওর কাছেই আসে, টিউশনি করে কত জমাতে পারে বুঝতে পারছেন? একটা টিউশনির এক মাসের টাকা ওর এই চার দিনের এক্সামের জরিমানা দিতেই শেষ হয়ে যাবে। আর আপনি কিনা.... ছিহ...."
দোয়েল রাগে মুখ ফিরিয়ে নিলো নিবিড়ের দিক থেকে। চোখ দুটো টলমল করছে তার, নিবিড় দু হাতের আজলে তুলে নেয় দোয়েলের মুখখানি। বার বার করে বলতে থাকে...
"আ'ম সরি, আ'ম রিয়েলি সরি পাখি। আমি জানি আমি ভুল করেছি, কিন্তু আমি কি আর করতাম বলো? আমার রাগ হচ্ছিল ওর উপর, ইচ্ছে করছিলো যাস্ট খু'ন করে ফেলি। তোমার সাথে ওভাবে দেখে সহ্য হচ্ছিলো না আমার। আমি ভেবেছিলাম তুমি আর ও একে অপরকে.... কি করতাম আমি বলো? তোমার গায়ে হাত তোলার মতো সাহস আমার নেই, আমি পারবোও না,এমন কিছু ভাবতে, তাই নিজের রাগ মিটাতে সুহাসকেই... "
"আপনি আমার জন্য সুহাসকে মেরেছেন? কেন? আমার আর ওর মধ্যে কিছু থাকলেও আপনার কি তাতে? "
নিবিড় ঘন ঘন দু পাশে মাথা নেড়ে বলে..
"আই ডোন্ট নো, কিন্তু আমি তোমার আশপাশে এমন কাউকে সহ্য করতে পারবো না। আমি তোমাকে চাই পাখি, আমি তোমাকে.... "
"ব্যাস, আপনার সাথে আর একটাও কথা নেই আমার। আজ থেকে আপনি আপনার রাস্তায় আমি আমার রাস্তায়।"
এই বলেই দোয়েল আবার উল্টো দিকে ঘুরে চলে যেতে নিলেই নিবিড় আবারো তার হাত চেপে ধরে। এবার শুধু ধরেই ক্ষ্যান্ত হয়নি। টেনে নিয়ে এক প্রকার গাড়িরতে বসায়। সীটবেল্টটা লাগিয়ে দিতে দিতে বলে...
" ঠিক আছে, তুমি কথা বলবে না ওকেয়। কিন্তু এখন আমার সাথে এসেছো যখন, তোমাকে সেফলি নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বও আমার। এই টুকু করতে দাও। "
---------
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমেছে ধরনীর বুকে। ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছেন বাড়ির তিন কর্তা আজমল, আসমত আর আলভি। সাথে আছে বাকিরাও। জিসান আর তারার বিয়ের দিন ঠিক করা হয়েছে । সব মিলিয়ে আর ১৬/১৭ দিনই হাতে আছে। তাই কিভাবে কি করবে, কে কেমন দায়িত্ব পালন করবে সেই নিয়েই মূলত আলোচনা চলছে। সাবিহা আর কান্তা এসে বসতেই আজমল চৌধুরী জিজ্ঞেস করে...
"আজ আমার আম্মুরা কোথায়? বাড়ি এত ঠান্ডা যে? "
আজমলের কথায় আবিরও একবার চোখ বুলিয়ে নেয় চারপাশে৷ নাহ, ছোট পাখি, বড় পাখি কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। নিবিড় মুখ তুলে তাকায় উপর তলার দিকে। দোয়েল ভীষণ কষ্ট পেয়েছে যে নিবিড়ের কাজে।
"ওরা রুমেই আছে। কি সব করছে, ডেকেছিলাম একটু আগেই, বলেছে ডিনারের সময়ই নামবে। "
সাবিহার কথায় আহিশও তাল মিলিয়ে বলে..
"ওদের কাজের অর্ডার এসেছে, সেগুলোই করছে। থাক ওরা। "
আসমত বলে ওঠে...
"থাকবে কেন? এখন ডাকো আর কি। সব কথা তো শেষই। ডিনার রেডি করা যাক?"
আজমলও বললো...
"হুম,কাল ভোরে উঠতে হবে আমারও। ডিনার রেডি করো। আহিশ, আম্মুদের ডেকে আয় তো। "
আহিশ মাথা নাড়িয়ে যায় তাদের ডাকতে। আবির বিরবির করে বলে..
"আসছে, আবার শুরু হবে পেঙ্গুইনটার বকবকানি। "
কিন্তু আবিরের ধারনা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে আহিশের সাথে নেমে এলো শুধু দোয়েল। নিবিড়ের সাথে চোখাচোখি হতেই সে করুন দৃষ্টিতে তাকায় দোয়েলের দিকে। কিন্তু দোয়েল মুখ ঘুরিয়ে নেয় তার থেকে। আবির বার বার সিঁড়ির দিকে তাকাচ্ছে, চড়ুই পাখি আসছে কিনা। কিন্তু নাহ, তার দেখা নেই।
জুলেখা দোয়েলকে একা দেখে জিজ্ঞেস করলো...
"কিরে, ছোটপাখি কোথায়? "
"আন্টি, বোন ঘুমিয়ে পড়েছে। উঠতে চাইছে না, তাই... "
দোয়েলের কথা শুনে আজমল চৌধুরী বলে উঠলো..
"ওহ, গিন্নি, তুমি একটু খেয়াল রাখবে না আম্মুদের। ঘুম পাচ্ছিলো যখন আগেই খাইয়ে দিতে না হয়। "
আসমত চৌধুরীও বলে উঠলো..
"সত্যিই , মেয়ে দুটোর শরীরের অবস্থা দেখেছো? যে ক'দিন এখানে আছে একটু নিজেদের শরীরের একটু উন্নতি করুক, ছোটপাখি টা তো আরো আগেই অসুস্থ হয়ে যায়। খাওয়া দাওয়ার এমন অনিয়ম হলে চলবে কি করে। "
সাবিহা দোয়েলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে কন্ঠে বললো...
"পারলে তো আমি নিজের কাছেই সারা জীবন রেখে দিই এই মেয়ে দুটোকে। তোদের মতো আর পাবো নাকি বল? "
আহিশ একটু ভাব নিয়ে বললো..
"দেখতে হবে না, কার ফ্রেন্ড এরা? "
সাবিহা দোয়েলকে বললো...
"তুই বোস, আমি ছোট পাখিকে জাগিয়ে নিয়ে আসছি। "
সাবিহাকে থামিয়ে আবির উঠে দাড়িয়ে বললো..
"ও মেয়ের ঘুম ভাঙানো তোমার দ্বারা সম্ভব না আম্মু। আমি নিয়ে আসছি। "
সাবিহা কিছু বলে না, শুধু নীরবে একবার আবিরের যাওয়ার পানে তাকায়। পরক্ষণেই আজমলের দিকে তাকিয়ে এক লুকায়িত হাসি দেয় দুজনই।
সাবিহা, কান্তা আর জুলেখা মিলে সবাইকে খাবার সার্ভ করছিলো, তখনই আবির নেমে এলো চড়ুইকে নিয়ে। নাহ মেয়ের ঘুম কি আর এত সহজে কাটার কথা? তাও আবার কাঁচা ঘুম। আবির তাকে একেবারে পাঁজাকোলে তুলেই নিয়ে এসেছে নিচে। চড়ুই পাখি তখনও আবিরের কোলে ঘুমাচ্ছে। ডাইনিং টেবিলের কাছে এনে চড়ুইকে একটা চেয়ারে বসাতেই চড়ুই টেবিলে মাথা রাখতে যায়,কিন্তু আবির আবার তার ঘাড় চেপে ধরে টেনে তুলে বলে...
"ওয়াইফি, একদম শোয়া চলবে না এখন। খেয়ে নাও, তারপর সারা রাত পাবে ঘুমানোর জন্য। "
চড়ুই আধো আধো ঘুমে মুখ কুঁচকে নেয়। আবিরের এক একটি কথা তার কাছে এখন বিষের মতো লাগছে। ঘুমু ঘুমু কন্ঠে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে ওঠে সে...
"আমি থাকবো না এখানে, এখনই চলে যাবো আমি। এই দানাবলটা একটুও ঘুমাতে দেয় না আমাকে। "
আবিরও বলে..
"চলে যেও,এক্ষুনি যাও, গিয়ে আমাকেও উদ্ধার করো। কিন্তু তার আগে খেয়ে নাও। "
সাবিহা আবিরের দিকে তাকিয়ে বলে...
"কি রে তুই আবির বাবা? মেয়েটাকে এভাবে ঘুমের মাঝেই তুলে নিয়ে আসলি? আম্মু, আমি তোকে খাইয়ে দিচ্ছি জলদি করে, তারপর গিয়ে ঘুমিয়ে পরিস। "
চড়ুই পিটপিট করে তাকায় সাবিহার দিকে। কিছু একটা মাথায় আসতেই দু দিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে...
" তোমার হাতে খাবো না, আমাকে বোন খাইয়ে দিবে। "
এই প্রথম বার চড়ুই সাবিহার হাতে খাওয়া নাকোচ করেছে। কিছুটা অবাকই হয় সাবিহা, চড়ুইতো তার হাতে খাওয়ার জন্য সব সময় পাগল থাকতো৷ আজ কি হলো মেয়েটার? পরক্ষণেই ঘুমের ঘোরে বলছে ভেবে তেমন গায়ে নিলো না কথাটি। দোয়েলও সাবিহার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে তিনও মন খারাপ করে ফেলছে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে হালকা হেঁসে বললো...
"আ্ আন্টি, ঘুমের ঘোরে যা তা বকছে, তুমি মন খারাপ করো না তো। আমিই খাইয়ে দিচ্ছি ওকে। "
দোয়েলই খাইয়ে দেয় চড়ুইকে। চড়ুই আধো আধো ঘুমে খেয়েও নেয়। খাওয়া শেষ হতেই দোয়েল বলে...
"যা গিয়ে এবার ঘুমা।"
চড়ুই ঠোঁট উল্টে বললো..
"আমার হাঁটতে ইচ্ছে করছে না।"
সাবিহা বলে..
"একটু কষ্ট করে রুমে যা আম্মু। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে কষ্ট হলে নিচে আমার রুমে যা, আজ আমার সাথেই ঘুমিয়ে পরিস। "
চড়ুই নাকোচ করে বলে..
" নাহ, আমি তোমার সাথে ঘুমাবো না। আমাকে দানাবল দিয়ে আসবে রুমে। "
আবির মাত্রই খাওয়া শেষ করে পানি মুখে দিয়েছে। চড়ুইয়ের কথা শুনে আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে সে। দোয়েল, চড়ুইয়ের ঘাড়ে হালকা করে চাপড় দিয়ে বললো...
"বোন, পাগল হলি তুই? আবির ভাইকে এসব কেন বলছিস? "
চড়ুইও কপট রাগ দেখিয়ে বলে...
"পাগল হবো কেন? উনাকে কি আমি বলেছি আমাকে এখানে নিয়ে আসতে? যেভাবে কোলে করে নিয়ে এসেছে, সেভাবেই আবার দিয়ে আসবে। "
আবির পানির গ্লাসটা মুখ থেকে নামিয়ে বললো...
"আমি পারবো না। হেঁটে হেঁটে গিয়ে ঘুমাও যাও। "
চড়ুইও টেবিলে মাথা রাখতে রাখতে বলে...
"থাক, আমি এখানেই ঘুমাবো আজ। "
আজমল চৌধুরী বেশ মজা পায় চড়ুইয়ের মাঝে মধ্যে এমন বাচ্চামো গুলোতে। আবির মুখ ধুয়ে আসতেই তিনি গম্ভীর গলায় তাকে বলে...
"আবির বাবা,, ছোট পাখিকে ঘরে দিয়ে আয় যা। "
আবির বিরক্ত হয়ে বলে...
"কিন্তু আব্বু... "
"যা বলছি কর গিয়ে। ওর ঘুমের ডিসটার্ব হচ্ছে। "
আজমলের কথা আর ফেলতে পারলো না আবির। দীর্ঘ এক নিশ্বাস ফেলে চড়ুইকে পাঁজা কোলে তুলে নিলো সে। চড়ুইও চোখ বন্ধ করেই বিশ্বজয়ের হাসি দিয়ে আবিরের গলা জড়িয়ে ধরলো।
"আমার কোলে উঠে সিডিউস করতে চাইছো, এটা সরাসরি বললেই তো পারতে। এত নাটক করার কি আছে ওয়াইফি? "
আবিরের কথায় চড়ুই পিটপিট করে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো...
"কিছু না করতেই আপনি সিডিউস হয়ে যাচ্ছেন।সত্যি সত্যি সিডিউস করার জন্য কিছু করলে কি হাল হবে আপনার? "
আবির বাঁকা হেঁসে বললো...
"মেয়ে তুমি বহুত পেকে গেছো। এসব তোমার কোন বয়ফ্রেন্ড শিখিয়েছে শুনি? "
"অন্যের আমানত লালন পালন এই চড়ুই পাখি করে না। আমি তো শুধু আমার সোয়ামিকে পালবো।হিহিহি..."
"তোমার সোয়ামি তো আমি.. "
"এহ, কবে থেকে? "
"কেন? অফিসে প্রথম বার গিয়ে যে সোয়ামীর খোজ করছিলে মনে নেই? "
"উহ, বয়েই গেছে আপনার মতো দামড়া হাতিকে আমার সোয়ামি বানাইতে। "
"আমারও তোমার মতো হাড্ডির সাথে রোমান্স রোমান্স খেলার কোনো মুড নেই। বউ হওয়া তো ইম্পসিবল। "