চৌধুরী বাড়ির মূল ফটকে আজ বিশেষ সোরগোল। ড্রয়িং রুম ভর্তি আত্মীয় স্বজন। জিসানের মায়ের দিকের কাজিন মহলটা বরাবরই একটু বড়সড়। মামাতো বোন সানিয়া, মুনিয়া, খালাতো বোন তন্নি আর খালাতো ভাইয়েরা প্রলয়, টিটু, সাগর। ইতোমধ্যেই তারা উপস্থিত হয়েছে বাড়িতে। রান্না ঘরের দিকে ভীড় জমেছে, মামি খালাদের। আজ রাত বাদ কালই জিসানের হলুদ অনুষ্ঠান।
আহিশের রুমের বিছানায় আজ তারই একটু জায়গা হলো না। তিন রমনী সন্ধ্যার পর পরই যে এই ঘরে সে লেপ্টেছে, আর উঠার নামই নিচ্ছে না। আহিশ কম্বলের একপাশ ফ্লোরে বিছিয়ে সেটার উপর বসে আরেক সাইড টেনে টুনে গায়ে জড়িয়ে বসে আছে। বেশ বিরক্তি নিয়ে আরো একবার বিছানার উপর একটু জায়গা চেয়ে বললো...
"জেসির বাচ্চা, যা না বোইন। তোর সব কাজিন নিচে একা একা বোর হচ্ছে, তোকে খুব মিস করছে। যা তাদেরকে একটু চিয়ার আপ করে আয়... "
জেসি নাক কুঁচকে বলে উঠলো...
"হাট... ওরা মোর বা'লের কাজিন। শা'লার আত্মীয় স্বজন, আমি ভাই পালিয়েই বিয়া করমু, তবুও এদেরকে দাওয়াত দিনে আইনা ঘরে পালতে পারমু না ভাই। "
চড়ুই দোয়েলের কোলের উপর মাথা রেখে মুখ ঢেকে রেখেছিলো কম্বল দিয়ে সম্পূর্ণ, জেসির কথায় মুখের উপর থেকে কম্বলটা সরিয়ে বলে উঠলো...
"কিন্তু তুই পালাবি কার সাথে? তোর তো কোনো প্রেমিক নেই। "
জেসি ঠোঁট উল্টে বললো...
" তুইও শেষমেশ প্রেমিক নিয়া খোটা দিলি ছোটপাখি? এবার তুই শিউর থাক, ভাবির ভাইটা না সেই দেখতে, ওকে এবার আমি পটিয়েই ছাড়বো। দেখে নিস। "
জেসির কনফিডেন্স দেখে আহিশ ফোন থেকে মুখ তুলে বললো...
"ভাবির কোনো বোন নেই রে? "
দোয়েল সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে উঠলো...
"থাকলেও তোকে পছন্দ করবে না।"
আহিশ ভ্যাবলার মতো তাকায় দোয়েলের দিকে।। মুখ বেকিয়ে বলে...
"হুহ, নিজে একটু বেশি সুন্দরী হয়েছিস তো। পেছন পেছন ছেলেরা ঘুরছে তাই এভাবে বলতে পারছিস।একদিন আমিও তোদের মতো এক সুন্দরী পটিয়ে বিয়ে করে নিবো ডিরেক্ট।হুহ..."
দরজায় কড়াঘাতের আওয়াজ পেতেই সবাই মুখ তুলে তাকায় নিবিড়ের দিকে। নিবিড় হেঁসে বলে...
"কি ব্যপার আজ দেখি চাঁদের হাট আহিশের ঘরে... "
বলতে বলতেই ভেতরে এগিয়ে আসে নিবিড়। দোয়েলের সাথে চোখাচোখি হতেই চোখ মারে সে। দোয়েল দ্রুত মুখ সরিয়ে নেয়। জেসি বলে..
"আমাদের রুমে মিস ইরিন একটু রেস্ট নিচ্ছে। তিনি কড়া কডে বলে দিয়েছে তার ঘুমের সময় যেন ঐ রুমে কেউ না প্রবেশ করে৷ "
নিবির হেঁসে উল্টোদিকে ঘুরতে ঘুরতে বলে...
"ওহ, ইরিন এসেছে। যাই একটু দেখা করে আসি, কত বড় হয়েছে দেখতে হবে তো একটু... "
দোয়েল খপ করে তার হাতটা চেপে ধরে বলে...
"পাগল আপনি? একটা মেয়ের রুমে এভাবে কেন যাচ্ছেন? ঘুম থেকে উঠুক দ্যান..."
নিবিড় মিটিমিটি হেঁসে বলে...
"মনে হচ্ছে কেউ একজন আমাকে নিয়ে খুব ইনসিকিউর ফিল করছে? "
দোয়েলের কানে কথাটা যেতেই দ্রুত হাত ছেড়ে দেয় সে। নিবিড় ঠেলেঠুলে দোয়েলের পাশে একটু জায়গা করে বসতে বসতে বলে...
"বাই দা ওয়ে, ছোট পাখি কোথায়? "
চড়ুই কম্বল এমন ভাবে পেঁচিয়ে আঁকাবাকা হয়ে শুয়েছে যে এখানে কেউ একজন আছে তা বোঝারই উপায় নেই। হুট করে দেখে মনে হবে যেন কম্বল ফেলে রাখা হয়েছে এমনি। নিবিড়ের কথায় কম্বলের ভেতর থেকে ছোট্ট একটি হাত বের করে তুলে দেখিয়ে বললো...
"এই যে ছোটপাখি।"
নিবিড় হাফ নিশ্বাস ছেড়ে বলে ওঠে...
"তোমার এতটাও ছোট হওয়া উচিত হয়নি যে সামনে থেকেও খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। যাই হোক,ভাই জিজ্ঞেস করেছে চুড়ি দেখেছো? পছন্দ হয়েছে? "
"ভীষণ পছন্দ হয়েছে। অনেক জোড়া চুড়ি ওখানে। দানাবলটা কোথায়? উনাকে তো থ্যাংকিউ বলা হয়নি। "
নিবিড় একটা নিশ্বাস ফেলে প্রসঙ্গ পালটে নেয় কথার। বেশ কিছুক্ষণ পর আবির পাশ কাটিয়ে যেতে নিলেই নিবিড় ডাকে তাকে...
"ভাই, আমি এদিকে... "
আবির ভেতরে তাকিয়ে দেখে সবাই- ই এখানে। আহিশ তাকে ডাকে...
"ক্যাটারিং এর কাজ করতে করতে বোর হয়ে গেছিস তাই না? আয় বোস এখানটায়। "
আবির একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নেয় চড়ুই পাখি নেই রুমে। তাই নীরবে ভেতরে ঢুকে খাটের কোনে বসে।
সেদিনের পর আবির এড়িয়ে চলেছে চড়ুইকে। যেখানে চড়ুই থাকে সেখান থেকে নীরবে উঠে চলে আসে, রাতে ইচ্ছে করেই বাড়ি ফিরে দেরি করে। হুটহাট দেখা হয়ে গেলে চড়ুই আপন মনে বেশ কথা বলে তার সাথে, কিন্তু আবির বারবারই এড়িয়ে যায় তাকে। বোকা চড়ুই তা বুঝতেও পারে না একদম।
শীতের প্রকোপে আবির বিছানায় পা তুলে বসে কম্বলটা পায়ের উপর টেনে দিলো। মাত্রই বলতে যাচ্ছিলো..
"জিসান ভাই কোথায়..."
ঠিক তখনই কম্বলের ভেতর থেকে ঠান্ডা কিছু একটা আবিরের পায়ে স্পর্শ করলো।চমকে উঠে আবির একটু পিছিয়ে যেতে নিলেই কম্বলের ভেতর থেকে আওয়াজ বের হলো...
"দানাবল,,আপনাকে এত্ত এত্ত এত্ত গুলা থ্যাংকিউ হ্যা... চুড়ির জন্য। থ্যাংকিউ সো মাচ..."
আবির নাক মুখ কুঁচকে কম্বলটা সরাতেই দেখলো চড়ুইকে। এক হাতে আবিরের পা চেপে কিটকিটিয়ে হাসছে সে। আবিরের মাথায় রাগ উঠে বসে। জোড়ে একটা ধমক দিতে গিয়েও পারে না নিবিড় তার হাত চেপে ধরে। আস্তে করে বলে ওঠে...
"আহ বকছিস কেন? থ্যাংকসই তো বলছে তোকে। "
আবির চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলায়। চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে..
"দূরে যাও মেয়ে.. "
চড়ুইও বাধ্য মেয়ের মতো শোয়া থেকে উঠে দোয়েলের পাশে গিয়ে বসলো কম্বল মুড়িয়ে। সবাই ব্যস্ত হয় নিজের মতো করে। প্রত্যেকের হাতে ফোন, শুধু চড়ুই ছাড়া। সে নীরবে সবাইকে পর্যবেক্ষণ করছে শুধু। একবার একে তো একবার ওকে দেখেই যাচ্ছে।
আবিরের দৃষ্টি ফোনে নিবদ্ধ থাকলেও মন বারবার চড়ুইকেই দেখে যাচ্ছে। নিবিড় মিটিমিটি হেঁসে ফোনে কিছু টাইপ করছে আর আড়চোখে বারবার দোয়েলের দিকে তাকাচ্ছে। দোয়েলও একটু পর পর রাগী লুক নিয়ে তাকায়। কারন নিবিড় আজ সকালেই দোয়েলের ফেইসবুক আইডি খুঁজে পেয়েছে। সেই থেকেই দোয়েলকে এই সেই মেসেজ করেই যাচ্ছে। কথার টপিক খুজে না পেলে হুদাই ইমুজি পাঠাচ্ছে বার বার। দোয়েলকে ক্ষেপাতে তার ভালোই লাগে বেশ।
চড়ুইয়ের চোখ দোয়েলের ফোনে পড়ে, নিবিড় মাত্রই কোনো কিছু খুজে না পেয়ে একটি গাজরের ইমুজি পাঠায়। চড়ুই পাখি বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখে সেটা। তারপর অনেকক্ষণ চিন্তা ভাবনা করে মনে মনে গাজরের রঙ লাল থেকে সাদা করে মুলার কথা মাথায় আনে। আবারো গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হয় সে। সময় কাটে ওভাবেই আরো প্রায় দশ বারো মিটিন। চড়ুই বেশ ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আবির আর নিবিড়ের দিকে। এর মধ্যে আবিরের সাথে একবার চোখাচোখি হতেই আবির বিরক্তিতে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। চড়ুইয়ের ভাবান্তর হয় না। বেশ কিছুটা সময় পর চড়ুই তাকায় দোয়েলের দিকে। তারপর বিজ্ঞদের মতোই নীরবতা ছাড়িয়ে হঠাৎ বলে ওঠে সে...
"বোন, একবার চিন্তা কর, এই যে এই দানাবলটা, নিবিড় ভাই। এনাদের মতো এতো হ্যান্ডসাম, ড্যাসিং লোকও পাঁদে.....!!!"
তৎক্ষনাৎ পাঁচ জোড়া চোখ বিস্ফোরিত নয়নে মুখ তুলে তাকালো চড়ুইয়ের দিকে। আহিশের হাত থেকে ফোন খসে পড়ে যায় ফ্লোরে। দোয়েল হতাশ হয়ে তাকিয়েই থাকে চড়ুইয়ের দিকে। এই মুহুর্তে এমন একটা কথা যে চড়ুইয়ের মুখ থেকে বের হবে, তা চিন্তাও করতে পারে নি সে।
আবিরের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়,চমকে ধমকে বলে ওঠে....
"ওয়াট...! "
নিবিড় মুহুর্তে আগেই হাসতে হাসতে খাটের পাশ থেকে নিচে পড়লো। এখন এক হাত পেটে চেপে রেখে আরেক হাত তুলে আবিরের থাইয়ের উপর বারবার বাড়ি দিয়ে তাকে শান্ত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে যেন সে।
আবিরের ধমক কাজে লাগেনি একটুও। চড়ুই এবার সরাসরি দৃষ্টি দিলো আবিরের দিকে। কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে লাগলো...
" হ্যা, এই যে এখন শীতকাল। মুলার সিজন, স্বাভাবিক মুলা খেলে পাদ বেশি আসে। এখন আপনি আর আমি ইন্ডাইরেক্টলি হলেও একই কম্বলের ভেতরই বসে আছি।এখন আপনি যদি আস্তে করে একটা সাউন্ডলেস ধোঁয়া বের করেন, তাহলে সেটা আমি..... "
আবিরের ধৈর্য শক্তি রাশ পায়। থতমত খেয়ে যায় সে। হাত উঁচু করে চেঁচিয়ে বলে উঠলো...
"ঠাটিয়ে একটা চড় দেবো তোমাকে আমি। আর একটা ওয়ার্ড মুখ থেকে বের করে দেখো শুধু তুমি। "
নিবিড় কোনো মতে নিজেকে সামলে নিয়ে আবিরকে বলে...
"ভাই ভাই রিল্যাক্স। ইট’স নরমাল।ছোটপাখি তো বেশ গবেষনা করেই... "
আবির বিরক্ত নিয়ে বলে..
"স্টপ দিস ভাই। ইমব্যারেসিং... "
দোয়েল আস্তে করে চড়ুইয়ের হাতে চেপে ফিসফিসিয়ে বলে...
"বোন চুপ কর, এসব কেন বলছিস? লজ্জার বিষয়... "
চড়ুই নাকোচ করে জোরসে বলে ওঠে..
"আরেহ কিসের লজ্জা। এটা তো প্রকৃতির কাজ, সবারই হয়।.."
নিবিড় আহিশ একসাথেই সম্মতি জানিয়ে বলে...
"ঠিক ঠিক। "
আহিশ আরেকটু বাড়িয়ে বলে...
"আমি তো একদম লজ্জা পাই না, পাঁদ আসলে আমার গার্লফ্রেন্ডের সামনেও পেঁদে দিবো।"
চড়ুইও সম্মতি জানিয়ে বলে..
"সেটাই তো, নিবিড় ভাই.. আপনারও কি কালো ধোঁয়া বের হয়?"
আবারো হাসির রোল পরে পুরো রুমে। আবির আর সহ্য করতে না পেরে কম্বল সরিয়ে উঠে যেতে নেয়..
"ডিজগাসটিং... "
ওমনি চড়ুই তেড়ে উঠে আবিরের এক হাত চেপে ধরে বলে ওঠে...
"আরে আরেহ কোথায় যাচ্ছেন? আপনার কি পাঁদ আসতেছে? "
আবির দাঁতে দাঁত চেপে ঝাড়ি মেরে ছাড়িয়ে নেয় চড়ুইয়ের হাত। চড়ুই বিচলিত হয় না। বরং একদম জ্ঞানীদের মতো করে বা হাত তুলে আবিরের কাঁধে রেখে মাথা দু পাশে আলতো নাড়িয়ে বলে ওঠে...
" পাদাপাদি কোনো সরমের বিষয় না... "
আবির আর পারে না এখানে থাকতে। মেয়েটা এক যাতাকলেই ফেলে দিলো বেছে বেছে তাকেই। ঝাড়ি মেরে হাত সরিয়ে দ্রুত কদমে বের হয়ে যায় রুম থেকে। পেছন থেকে চড়ুই চেচিয়েই গেলো..
"আরে শুনুন না, শুনুন? এই যাহ, চলে গেলো? মনে হয় উনার খুব জোড়েই পাঁদ এসে গেছে... "