Mr and Mrs Twins Return

পর্ব - ২১

🟢

"গুমনামি ইচ্ছের মতো, বাসালি ভালো না কত.

ভালোবাসা দিচ্ছে দোহায়, আমাকে রোজ অবিরত.."

বিন্দু বিন্দু কুয়াশা জমছে সবুজ ঘাসের উপর, রাতের আকাশও ঘোলাটে, এই দিকটায় টিমটিমে বাতির আলো থাকলেও তেমন মানুষের আনাগোনা নেই। সবাই কে মেহেদী দেওয়া শেষ করে একটু আগেই চড়ুই পাখি মেহেদি দেওয়া শুরু করেছে একটি মেয়ের কাছে। সে আর মেয়েটি ছাড়া তেমন কেউই নেই এই দিকটায়, নিস্তব্ধতা কাটাতে চড়ুই পাখি সুরেলা কন্ঠে গান বাওয়ায় বাতাসে।

হঠাৎ করে মেহেদী দিতে থাকা মেয়েটিকে উঠে চলে যেতে দেখে চড়ুই পাখি ব্যস্ত হয়ে বলতে নেয়..

"আরেহ আপু,এখনো পুরোটা কমপ্লিট হয় নি তো,কোথায় যাচ্ছেন.."

"বরবাদ হয়েছি আমি, তোর অপেক্ষায়..

চুরমার করে দে আরো, কিছু ইশারায়."

পেছন থেকে এমন পুরুষালি কন্ঠের গান শুনে ফিরে তাকাতে চায় চড়ুই, কিন্তু সে পারে না। ইতোমধ্যেই তার ব্লাউজের ফাঁকের উন্মুক্ত পিঠে স্পর্শ করেছে কিছু একটা। শীতল, রুক্ষ পুরুশালি ঠোঁটের সাথে খোঁচা খোঁচা দাড়ির ঘষায় হালকা কম্পিত হয় চড়ুই পাখি। মুখ ঘুরিয়ে সেই ছোঁয়ার মালিককে খুজতে পেছনে ফিরে তাকানোর প্রচেষ্টা করতে গেলেই বুঝতে পারে লোকটি তার পিঠে নাক ঘসছে মোহনীয় ধাঁচে। শীতল একখানা হাত বা দিক থেকে এসে ছুঁয়ে দিলো চড়ুই পাখির উষ্ণ কোমড়। লোকটার স্পর্শ পিঠ থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসছে চড়ুই পাখির ঘাড়ে। চড়ুই তাকাতেই লোকটির মুখ স্পষ্ট হয়, বিচলিত ভঙ্গিতে বলতে নেয়...

"দানাবল,আপ..."

"হুশশ..."

থেমে যায় চড়ুই পাখির বুলি। আবিরের ঠান্ডা হাত বিচরন করছে চড়ুইয়ের কোমল পেটে, ঠোঁট দুটো ফাক করে মেয়েটি ফ্যাল ফ্যাল তাকিয়ে থাকে আবিরের দিকে। কি করছে এসব লোকটা তার সাথে?

আবির নিজের মতোই নিমগ্ন ভঙ্গিতে চড়ুইয়ের কাঁধে আলতো ঠোঁট ছুইয়ে বলে...

"এইখানটায় হাত পড়েছিলো না আহিশের? "

বলেই সাথে সাথে আবারো দু তিনটে চুমু বসিয়ে দেয় চড়ুইয়ের কাঁধে। মেয়েটা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলতে নেয়...

"আ্ আপনি এসব কি.."

"চুল খোঁপা করে তোমার তুলতুলে নরম পিঠ দেখানো, শাড়ির আচল ভাজ করে রেখে ফাঁকফুকুর দিয়ে মাখনের মতো পেট দেখানো, বেশ তো চলছে। তা আর কটা ছেলে প্রেম প্রস্তাব দিয়েছে এসব দেখে, শুনি? "

চড়ুই মুখ কুঁচকে নেয়, আবিরের কথার ধরন মোটেও ভালো লাগছে না তার, অন্য রকম।

আবির এবার হেঁচকা টানে চড়ুইকে ঘুরিয়ে নেয় নিজের দিকে। টাল সামলাতে না পেরে চড়ুই ভুল করেই নিজের সদ্য মেহেদী রাঙা হাতটা ঠেকলো আবিরের পাঞ্জাবিতে। বিষয়টা মাথায় আসতেই চড়ুইয়ের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেলো। দ্রুত হাতটা সরিয়ে দেখলো আবিরের পাঞ্জাবির বুকের পাশটায় মেহেদী দিয়ে তার হাতের ছাপ বসে গেছে।

নিজের হাতের দিকে তাকাতেই চড়ুইয়ের মুখটা কাদো কাদো হয়ে গেলো। নেকি সুরে বলে উঠলো...

" এটা কি করলেন আপনি... আমার মেহেদী, আআআ..."

আবির খপ করে চড়ুইয়ের মেহেদী লেপটানো হাতটা চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো...

"চুপ, একদম নাটক করবে না এখন। কার জন্য এতো কিছু করছো তুমি হ্যা? মেহেদী কার জন্য লাগিয়েছো বলো? ছেলে পাগল করার জন্য? কি মনে করো তুমি নিজেকে, ছেলেরা তোমাকে দেখে পাগল হবে? তোমার থেকে হাজার গুন সুন্দরী রয়েছে এখানে চারপাশে। "

চড়ুই ঠোঁট উল্টে কেঁদে উঠলো, আবিরের রাগ তরতর করে বেড়ে ওঠে যেন। নিজের মেহেদী লেগে যাওয়া হাতখানা চড়ুইয়ের কোমড়ে চেপে টেনে আরেকটু কাছে নিয়ে আসলো তাকে, আরেক হাত দিয়ে চড়ুইয়ের থুতনি চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো...

"বিয়েতে কি পড়বে তুমি? "

চড়ুই কাঁদতে কাঁদতেই বললো..

"শ্ শাড়ি.."

"একদম নাহ, কাল শাড়ি পরবে না তুমি। "

"ক্ কিন্তু আমরা তো শ্ শাড়িই কিনেছি,জামা তো..."

"জামা না কিনলে যাওয়ার দরকার নেই বিয়েতে। বুঝেছো তুমি? "

"আ্ আপনি আমায় বকছেন ক্ কেন?"

চড়ুইয়ের এমন কথায় আবির থেমে যায়। দাঁতে দাঁত চেপে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলতে থাকে সে৷ ধীরে ধীরে থুতনি থেকে হাতটা সরিয়ে নেয়।

চড়ুই হিচকি তুলছে, কান্নার কারনে বারবার তার ছোট্ট তনু কেঁপে কেঁপে উঠছে। আবিরের হঠাৎ কি হলো যেন, বাঁধা নিষেধ তোয়াক্কা না করেই চড়ুইকে জড়িয়ে ধরলো বুকে। চুলের ভাঁজে হাত বুলিয়ে দিয়ে মেয়েটার কান্না থামানোর চেষ্টা করলো। কন্ঠের রেশ কমলো না তেমন,আগের মতোই গম্ভীর কিন্তু হালকা শীতল স্বরে বললো...

"কাল শুধু একবার তোমায় শাড়িতে দেখি,গায়ে আগুন ধরিয়ে দেবো একদম।"

চড়ুই পাখি কিছুটা শান্ত হয়, হেচকি তুলতে তুলতে বলে..

"ঠিক আছে,তাহলে বৌভাতের জামাটা কাল পড়বো, আর কালকের জন্য কেনা শাড়িটা বৌভাতে পড়বো।"

আবিরের হাত থেমে গেলো। চোখ মুখ খিঁচে তাকায় সে চড়ুইয়ের দিকে। এই মেয়েকে এতক্ষণ বোঝালো কি সে, বিয়ের দিন পড়া আর বৌভাতের দিন পড়া তো একই কথাই। আবির হাত উঁচিয়ে বলে ওঠে..

"একটা মারবো গালে, আস্ত পাগল। যাও ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। "

"আমার মেহেদী... "

"জাহান্নামে যাক,যাও বাড়ি যাও, "

বলতে বলতেই চড়ুইয়ের চুলের খোপাটা খুলে চুল গুলো পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে দিলো আবির।শাড়ির আচলটা ছেড়ে দিয়ে চড়ুই কে টেনে দাড় করিয়ে নিয়ে আবার একটা ধমক দিতেই, চড়ুই এক ছুটে পালালো।

সেদিকে তাকিয়ে আবির আপন মনেই গলা ছেড়ে গান ধরলো..

"তোকে দেখি শুনশান রাতে, চলে আসা চিন্তা হঠাৎ এ,শান্ত অশান্ত সময় তুই কেন থাকিস না সাথে..

বরবাদ হয়েছি আমি, তোর অপেক্ষায়,

চুরমার করে দে আরো, কিছু ইশারায়...."

-----------

সকালে ঘুম ভাঙতেই আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো আবির। কারোর কন্ঠের রেশ পেয়ে দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো নিবিড় গত কাল এর জামা কাপড় গুলো সার্ভেন্টকে বুঝিয়ে দিচ্ছে ধোঁয়ার জন্য। হঠাৎ একটা জিনিসে চোখ যেতেই লাফিয়ে ওঠে আবির। ছুটে দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলতে লাগলো....

"এই এই ওয়েট... আবে শা'লা থাম... "

নিবিড় কোমড়ে হাত গুঁজে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে...

" কাল রাতে মা'ল খেয়েছিস বলে তো মনে হয় না, সকাল সকাল শা'লা ডাকছিস কেন? আমি তোর মায়ের পেটের ভাই হই। আমি আর তুই এক সাথে বেরিয়েছি, মনে নেই? "

নিবিড়ের কথায় তেমন পাত্তা না দিয়ে আবির এগিয়ে সার্ভেন্ট এর হাত থেকে গত কালকের পড়া পাঞ্জাবিটা নিয়ে বললো...

" এটা আমি ধুয়ে নেবো। আপনি যান... "

সার্ভেন্টটি চলে যায়, নিবিড় চোরা চোখে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করে আবিরের হাবভাব। সন্দেহি কন্ঠে জিজ্ঞেস করে...

" কি আছে রে এই পাঞ্জাবিতে? "

আবির পাঞ্জাবি হাতে ঘরের মধ্যিখানে যেতে যেতে বললো..

" নাথিং "

"কুচ তো গারবার হ্যায়, দেখি, কোন মেয়ের ঠোঁটের ছাপ লাগিয়েছিস দেখি দেখা আমায়... "

বলতে বলতেই ত্রস্ত হাতে পাঞ্জাবি খানা কেড়ে নেয় আবিরের থেকে। মেলে দেখে বলে...

" কই কারোর লিপস্টিক তো নেই... এমাহ ভাই এতো মেহেদী। কোন বাচ্চা মেহেদী দিয়ে হাতের ছাপ দিয়ে দিয়েছে তোর পাঞ্জাবিতে? "

আবির নিবিড় এর থেকে পাঞ্জাবি টা কেড়ে নিতে গেলেই নিবিড় দক্ষ ভঙ্গিতে ঘুরে দাঁড়ায়। আবির দাঁতে দাঁত চেপে বলে...

" ওটা বাচ্চা না। দে আমার পাঞ্জাবি। "

" এহ বললেই হলো বাচ্চা না? দেখেই বোঝা যাচ্ছে, পিচ্চি হাতের ছাপ। কোন বাচ্চা এই আকাম করলো... "

" বলছি বাচ্চা না পেঙ্গুইন করেছে। এবার দে এটা.. "

এইবার আবির সফল হয় নিবিড়ের থেকে পাঞ্জাবি টা কেঁড়ে নিতে।

"পেঙ্গুইন মানে? ছোট পাখি? এমাহ ভাই তুই ছোট পাখির হাতের ছাপ মুছতে চাইছিস না বলে.... হাউ সুইট... "

" তোমার বা'লের সুইট। এটা আমি এ্ এমনিই দিই নি ধুতে."

নিবিড় মুখ এগিয়ে বললো..

"এমনি? উহুম,বিশ্বাস তো হচ্ছে না।"

আবির আমতা আমতা করে বললো...

"আ্। এ্ এটা ঐ পেঙ্গুইন নষ্ট করেছে, তাই ওকে দিয়েই ধোয়াবো।তাই নিয়ে নিয়েছি। "

নিবিড় মাথা দুলিয়ে বলে...

" আহা, ধান্দা তো ভালো ঠেকছে না ভাই.. "

"চুপচাপ রুম থেকে বের হ।আ'ম গোয়িং টু টেক শাওয়ার.."

বলতে বলতেই আবির এগিয়ে গিয়ে ওয়াশ রুমে ঢুকে গেলো হাতের পাঞ্জাবিটা নিয়ে।

------------

জেসির রুমে নক পড়তেই জেসি আর দোয়েল তাকিয়ে দেখে আবির দাঁড়িয়ে। দুজনকে স্বাভাবিক দেখে আবির আস্তে করে ভেতরে প্রবেশ করে। দুটো প্যাকেট চেয়ারের উপর রেখে বলে...

" সাড়ে বারোটায় গাড়ি। এখন এগারোটা বাজে। রেডি হয়ে নে দ্রুত, সময় মতো রেডি হতে না পারলে বাড়িতে ফেলে চলে যাবো। "

বলেই বেরিয়ে যেতে নেয় আবির, কিছু একটা ভেবেই আবার পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করে..

" আরেকটা কোথায়? একা একা ভীড়ের মধ্যে যেন লাফালাফি করতে না দেখি। "

দোয়েল একটু এগিয়ে বলে...

" না না ভাইয়া। বাইরে যায় নি ও। এই তো এখানেই আছে। "

হাতের ইশারায় খাটের দিকে দেখাতেই আবির বলে ওঠে..

"কোথায়? "

জেসি এগিয়ে গিয়ে চড়ুইয়ের মুখের উপর থেকে কম্বলটা সরিয়ে বলে..

"এইতো ও.. "

আবির ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া লুক নিয়ে কোমরে দু হাত গুঁজে তাকায় বিছানার দিকে এমন চোখ মুখ ঢেকে কে ঘুমায়? তাও আবার এমন চ্যাপটা হয়ে? আবির এক মিনিট কম্বলের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো মেয়েটার হাত পা ঠিক কোন দিকে আছে, নাহ বোঝার উপায় নেই।রেগে মেগে বম হয়ে বলে ওঠে...

" এই মেয়ে এখনো পরে পরে ঘুমাচ্ছে? রাতে কি চোর পাহারা দিয়েছে ও? "

দোয়েল বলে...

" হলুদের অনুষ্ঠান শেষে মেহেদী দিতে দিতে লেট হয়ে গেছিলো.. "

" ওকে তো আমি তিনটার দিকে ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম।"

জেসি মুখ টিপে হেঁসে বলে...

" হ্যা তিনটায় রুমে এসেছিলো তো, তারপর বসে বসে ছবি তুলেছে, এরপর... "

"এরপর? "

"এরপর যতক্ষণ পর্যন্ত বাইরে থেকে গান শুনা যাচ্ছিলো, ততক্ষণ একা একা নেচেছে রুমে। "

আবিরের রাগ তরতর করে বাড়ে। মানে যাচ্ছে তাই অবস্থা। দোয়েল বুঝতে পারে আবির রেগে গেছে। পা টিপে এগিয়ে গিয়ে দোয়েল কে ধাক্কা দিতে দিতে ডাকতে থাকে...

" বোন, ওঠ এবার। এই বোন, রেডি হতে হবে তো একটু পর গাড়ি। বিয়েতে যাবি না? "

চড়ুই নড়েচড়ে বলে..

"দানাবল বলেছে শাড়ি পড়ে বিয়েতে যাওয়া নিষেধ, তাই বিয়েতে যাওয়া হচ্ছে না আমার, আমি ঘুমাবো আরোওও.."

আবির বিরক্ত হয়ে চেয়ারে ব্যাগ দুটো দেখিয়ে দোয়েলকে বলে...

"এখানে ড্রেস আছে, এগুলোই পড়বে, শাড়ি পড়ার দরকার নেই। শুধু ওর নয় তোমারও। আর জেসি তোর জন্যও ড্রেস আছে, যদি তুইও শাড়ি পড়ে ঐ বাড়িতে যাওয়ার প্ল্যান করে থাকিস তাহলে সেই প্ল্যানে ঝাড়ু মার। দ্রুত রেডি হবি... "

বলতে বলতেই বেরিয়ে যায় আবির। পেছন থেকে জেসি বলে ওঠে..

"আরে শুধু ড্রেস হলেই হবে? ম্যাচিং জুয়েলারিও তো..."

কে শোনে কার কথা। আবির তো সেই কখন চলে গেছে।

বরযাত্রীর গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে আবির নিবিড়, মোট আঠারোটা গাড়ি অলরেডি রওনা দিয়ে দিয়েছে। আরো দুটো ফুল হলেই হলো। দু জনের পড়নেই সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। হাতে ব্র্যান্ডেড ঘড়ি, চোখে সানগ্লাস সিম্পল এর মধ্যে মোটামুটি সুন্দরই লাগছে দু জনকে। আহিশ সহ বেরিয়ে এলো পাখিরা আর জেসি। সানিয়া মুনিয়া এসে দাঁড়ায় সেখানে। আবির বলে..

"যেকোনো একটায় উঠে পড়ো তোমরা লেট হচ্ছে। "

আহিশ এসে দাঁড়াতেই নিবিড় তার মাথায় গাট্টি মেরে বলে...

"তুই কি মেয়ে? এত লেট হলো কেন?"

আহিশ মুখ ফিরিয়ে বলে...

"তোমাদের সাথে আড়ি, ওদের তিন জনকে ড্রেস গিফট করেছো, আমি কি দোষ করেছি.. "

চড়ুই এগিয়ে এসে আহিশের দু গাল টেনে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে ওঠে...

"ওলে লে আমার বাবুটা রাগ করেছে গো। নিবিড় ভাই, যাওয়ার পথে আমার বাবুটার জন্য এরকম একটা গাউন কিনে দিয়েন তো। "

নিবিড় মুখ টিপে হেঁসে ওঠে.... আহিশ সরে গিয়ে বলে..

" শা'লি বন্ধু নামে খসেটি তুই। "

নিবিড় এগিয়ে যায় দোয়েলের দিকে। পেস্ট কালার গাউনটা বেশ মানিয়েছে যেন তাকে। কানের ঝুমকো, হাতে ম্যাচিং চুড়ি সব কিছুই আবির জামার সাথেই দিয়ে এসেছিলো, তাই বেশ মানান সই হয়েছে। কিছু একটা ভেবেই নিবিড় দোয়েলের বা কাধ থেকে ওড়নাটা নামিয়ে হাতের কব্জিতে রাখে,দোয়েল বলতে নেয়..

"কি করছেন? এভাবে বাজে... "

নিবিড় এক হাতে দোয়েলের চুলের কিছু অংশ পেছন থেকে এক সাইডে এনে গুছিয়ে দিতে দিতে বলে...

"ঘটে একটু বুদ্ধি থাকলে কোনো ভাবেই বাজে লাগবে না। "

দোয়েল তাকিয়ে দেখে, নাহ আগে থেকে একটু সুন্দরই লাগছে, আর খারাপ কিছুও বোঝা যাচ্ছে না।

" যাও, ছোট পাখিরটাও এভাবে ঠিক করে দাও। "

গাড়ি মোটামুটি ফুল, আবির পেছনের গাড়িতে গিয়ে দেখে সাগর, প্রলয়রা সহ আরো কয়েক জন সে গাড়িতে। আর মাত্র দুটো সীট খালি। আবির এগিয়ে এসে দেখে সামনের গাড়িতে মোটামুটি ড্রাইভিং সীট আর ফ্রন্ট সীট ছাড়া সব ভর্তি। চড়ুই বলে..

" ঠিক আছে আমরা না হয় ও গাড়িতেই যাচ্ছি। "

সাথে সাথেই আবির ধমকে ওঠে..

"এই দাঁড়াও.. তোমাকে যেতে বলেছে? কারবারি করছো কেন? "

দাঁড়িয়ে যায় চড়ুই। আবির এগিয়ে গিয়ে সানিয়া মুনিয়াকে বললো..

" তোমরা দু'জন কষ্ট করে পেছনের গাড়িতে যাবে? আসলে পাখিরা ওখানে আনকম্ফোর্টেবল ফিল করবে, ওরা তো তোমাদেরই ভাই, তোমাদের সমস্যা হবে না তেমন। "

সানিয়া বলে ওঠে...

"তাহলে আহিস আর জেসিকে পাঠাও ও গাড়িতে... "

জেসি বলে ওঠে..

"অসম্ভব, আমি পাখিদের ছেড়ে ভিন্ন গাড়িতে যাবো না, এমনি যাওয়ার হলে তো আমি ভাইয়ার সাথে বরের গাড়িতেই যেতে পারতাম।"

মুনিয়া বলে..

" আচ্ছা তাহলে আহিশ আর ইরিন আপুকে... "

আবির বলে ওঠে..

"ইরিন ও তো আনকম্ফোর্টেবল ফিল করতে পারে, আফটার অল তোমাদের ভাইরা মোটামুটি আননোন না? "

আহিশও তাল মিলিয়ে বোঝানোর স্বরে বলে...

"হ্যা, আর দেখো, আমি, জেসি, পাখিরা মানে আমরা চারজন তো ফ্রেন্ডস গোল তাই না, একসাথে গেলেই ভালো হয়। আমি ও গাড়িতে চলে গেলে ব্যপারটা কেমন না? "

ইরিনও তাল মিলিয়ে বলে..

"আহিশ ঠিক বলছে সানি মুনি। ওরা তো তোমাদেরই ভাই, কাজিন, ওদের সাথে তোমরাই বেশি কম্ফোর্টেবল, আর ফেমিলিয়ার যেহেতু তোমরা নিজেদের মতো মজাটাও করতে পারবে, সো.."

সানিয়া খানিক বিরক্ত হয়, তবুও আর কি কগরার অগত্যা সানিয়া মুনিয়া নেমে পেছনের গাড়িতে চলে যায় আর পাখিরা তাদের জায়গায় বসে। আবির গাড়ি স্টার্ট দেয় আর নিবিড় তার পাশে। আহিশ বলে ওঠে...

"ওহ জিও আবির ভাই, যা দিয়েছিস না। একদম তেল মাখিয়ে বাশ ভরার মতো... "

আবির ধমকে বলে..

"স্যাট আপ ইডিয়েট। কি সব ভাষা ব্যবহার। "

------

বিয়ে বাড়িতে বেশ স্বাভাবিক ভাবেই কাটছিলো। স্টেজে জিসান আর তারার বিয়ে পড়ানো হচ্ছে। নিবিড় পাখিদের বেশ চোখে চোখেই রাখছে। একটু পরেই আহিশ এসে পাখিদের নিয়ে যায় ছবি তুলে দেওয়ার জন্য। নিবিড়কে একা পেয়েই মুনিয়া এসে বসে তার পাশে। এসেই সে নিজের প্রেমালাপ শুরু করে দেয়, নিবিড়ের অবস্থা নাজেহাল। কোনো অযুহাতে এদিক সেদিক গেলেও মুনিয়া পিছু ছাড়ছে না যেন। একটু পরেই দূরে সে লক্ষ্য করে একজন মহিলা আর একটি ছেলে দোয়েলের সাথে হেঁসে হেঁসে বেশ কথা বলছে৷ থেকে থেকে মাথায় হালে হাত বুলিয়েও দিচ্ছে। দোয়েলকে দেখে মনে হচ্ছে বেশ অসস্তি বোধ করছে সে। নিবিড় মুনিয়াকে ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় দোয়েলের পেছনে। মহিলাটির কথা শুনেই বুঝে যায় আসল কাহিনি। স্বাভাবিক স্বরে জিজ্ঞেস করে...

"কি হয়েছে মিস? "

দোয়েল অপ্রস্তুত হয়ে বলতে নেয়...

"আন্টিটা আসলে, বিয়ের জন্য... আই মিন তার ছেলের জন্য... "

নিবিড় তাকায় পাশের ছেলেটার দিকে। লাজুক ভঙ্গিতে বারবার দোয়েলের দিকেই তাকাচ্ছে সে। মহিলাটি হেঁসে বলে উঠলো...

"তুমি তো আজমল ভাইজানের ছেলে তাই না বাবা? "

"জ্বী, পাখি, ছোট পাখি খুঁজছে তো তোমায় যাও.. "

দোয়েল আর দাঁড়ায় না, নিবিড়ের কথায় মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে দ্রুত সরে যায় সেই স্থান থেকে। মহিলাটি হেঁসে বলেন..

" আহলে মেয়েটা খুব মিষ্টি তো, তাই একটু... "

নিবিড় রয়েসয়ে বলে..

" হ্যা, মিষ্টি তো বটেই। "

" আসলে বাবা, তোমার বোন কে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে, আমার ছেলের জন্য ওর সম্মন্ধটা... "

"এমাহ ছি ছিহ আন্টি এসব কি বলছেন, ও আমার বোন হতে যাবে কোন দুঃখে। "

মহিলাটি মুখ ভোতা করে বললেন..

"সেকি বাবা, আজমল ভাইজান তো বললেন ও উনার মেয়ে.. "

"হ্যা, বাবার মেয়ে তো। কিন্তু আমার বোন না। "

"মানে? "

"মানে ছেলের বউ তো মেয়ের মতোই হয় তাই না, ঐ জন্য বাবা বলেছে মেয়ে, টেকনিকালি ও বাবার পুত্র বধূ।আমার হবু বউ আরকি.. "

বলেই দাত কেলিয়ে হাসে নিবিড়। মহিলা বেশ লজ্জায় পড়ে যায়। ছেলেটাও এদিক ওদিক তাকিয়ে চলে যায় সেই স্থান থেকে। নিবিড় জিজ্ঞেস করে..

"আর কিছু বলবেন আন্টি? আসলে আমার বউ একটু বেশিই সুন্দর তো, তাই যেখানে সেখানে আপনার মতো কিছু আন্টি নিজের ছেলেকে নিয়ে হাজির হয় ওদের সামনে। আমি বুঝতে পেরেছি, ইটস ওকেয় সমস্যা নেই। পরের বয়র থেকে আগে পিছে জেনে নিয়ে তারপর নিজের ছেলেকে নিয়ে হাজির হবেন হ্যা? যাই আন্টি.. "

মহিলা লজ্জায় বিব্রত হেঁসে নিজেই স্থান ত্যাগ করে। নিবিড় হাফ নিশ্বাস ফেলে পেছনে ফিরতেই দেখে আবির বুকে হাত গুঁজে মিটিমিটি হাসছে। নিবিড় তেতে বলে..

"শা'লা, তুই হাসছিস? আমার রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে। "

আবির রয়েসয়ে বলে..

"ওসব সানু মুনুর সাথে চিপকে না থেকে নিজের বউয়ের সাথেই চিপকে থাক না, তা হলেই তো আর আন্টি নিজের ছেলেকে নিয়ে হাজির হবে না। "

নিবির হনহনিয়ে যেতে যেতে বলে...

"যাচ্ছি চিপকাতে। সুপার গ্লুর থেকেও শক্তিশালী আঠার মতো লেগে থাকবো এটম এর সাথে। ভুলেও আর একা ছাড়বো না.. "

আবির হেঁসে বলে ওঠে..

"টয়লেটে যাওয়ার সময় একা ছাড়িস একটু, ওখানে আন্টি সমাজ পৌঁছাবে না।"

Mr and Mrs Twins Return গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় টুইন রিলেটেড রোমান্টিক গল্প