চৌধুরী বাড়িটার আজ দেহাতি দশা। কোথাও নীরব আর কোথাও কলরব। নিচ তলায় বেশ স্বাভাবিক একটি মুহুর্ত কাটাচ্ছে ইরিন, ড্রয়িং রুমে সোফায় পা মেলে বসে আরামসে মোবাইল টিপছে।ডায়নিং টেবিলে সানিয়া মুনিয়াদের পরিবার নাস্তা সেড়ে নিচ্ছে। একটু পরেই তারা নিজ গন্তব্যে রওনা দিবে। আর উপর তলায় পৌছালেই শোনা যায় কারো মৃদু কান্নার স্বর, একটি আতঙ্কের আভাস। ছোট খাটো একটা যুদ্ধই চলছে যেন সেথায়....
"আম্মু যখন আমাদের ছেড়ে চলে যায়, ত্ তখন বোন কথা বলা বন্ধ করে দেয়। ই্ ইমোশনাল শক এমন ভাবে ওর উপর প্রভাব ফেলে যে আম্মুর মৃত্যুকে মেনে নিতেই পারছিলো না ও। ওটাই প্রথম ঘটনা যেটার প্রভাব একা বোনের উপর পড়েছে। দু দুটো বছর ও কারোর সাথে কথা বলে নি, কারোর সাথে মিশেনি। একদম নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকতো নিরলায়, ঠিক য্ যেমন এখন বসে আছে। আ্ আমি ওর চুপ থাকাটা আবার সহ্য করতে পারবো না নিবিড়। বোন কথা বলছে না কেন? য্ যদি আবার সেই আগের মতো ও কথা বলা বন্ধ করে দেয় তো? আ্ আমি কি করবো, আমি কি নিয়ে বাঁচবো? ঐ দুটো বছর তো আমার জাহান্নামের মতো কেটেছিলো। আমি আর এমন টা চাই না। আ্ আমার বোনকে কথা বলতে বলুন না, প্লিজ। ওকে বলুন না চুপ করে না থাকতে। আমি ওকে আর বকবো না, মারবো না কোনোদিন। তবুও একবার আমার সাথে কথা বলতে বলুন না? "
কথা গুলো বলতে বলতে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়তে নিচ্ছিলো দোয়েল, কান্নার আওয়াজ তার যেন হাহাকার। নিবিড় দু বাহু ধরে তুলে ধরে তাকে।
"মিস এটম.. প্লিজ নিজেকে শান্ত করো। এমন কিছু হবে না, আমরা সবাই আছি তো। ছোট পাখি কথা বলবে দেখো,ওকে একটু সময় দাও। এমন ভেঙে পড়ে না প্লিজ... "
দূরে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আবির। গত কাল রাতের প্রতিটি কথা মনে পড়তে লাগলো, কি করে ফেললো সে। চড়ুই পাখি আর কথা বলবে না? এটা কি করে সম্ভব? ও তো চুপচাপ থাকতেই পারে না..
কাঁধে কারোর হাতের স্পর্শ পেতেই পেছনে ফিরে তাকায় আবির। সাবিহা দাঁড়িয়ে, আবির বলতে নেয়...
"আ্ আম্মু তুমি শুনলে? ও্ ওয়াইফির কি হলো,ও নাকি কথা... "
" আমার ঘরে আয় আবির। "
সাবিহার শীতল কন্ঠে থেমে যায় আবির। একবার দোয়েলের কান্নারত মুখের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে সে। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজেকে সামলে এগিয়ে যায় মায়ের রুমের দিকে।
"কাল রাতে ছাঁদে ঠিক কি হয়েছিলো আবির? "
আবির চুপ রয়, নিবিড় বলেছিলো বাড়ির সবাই জানে, কিন্তু ঠিক কতটুকু জানে তা বুঝতে পারছে না সে
"চিঠিটা আমি দেখেছি আবির। "
আবির চোখ তুলে তাকায় সাবিহার দিকে। হালকা চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো....
"তুমি ঐ চিঠি কোথায় পেলে?"
"ইরিন দিয়েছে আমাকে। "
আবির দ্রুত বলতে নেয়..
"আম্মু ঐসব আমি সিরিয়াসলি....."
" পাখিদের সাথে তোর পরিচয় মাত্র কয়েক দিনের। এক মাস পাড় হয়েছে কিনা সন্দেহ। আমি ওকে গত আট বছর ধরে চিনি।... "
"আম্মু এখন এসব... "
সাবিহা হাত উঁচু করে থামতে ইশারা করে আবিরকে। বলে ওঠে...
"আমি জানি তুই এখন ছোট পাখির সম্মন্ধে কি ভাবছিস। তোর ভাবনাকে পরিবর্তন করার কোনো ইচ্ছে নেই আমার। তবে আমি আমার মেয়েকে চিনি, খুব ভালো করেই চিনি, এই চিঠিটা যে ও লেখেনি তা আমি বিশ্বাস করি। আর কে ওর সম্মানে দাগ লাগাতে চাইছে তা আমি ঠিক খুঁজে বের করবো। "
"আম্মু আমি ওকে... "
"তোকে আমি বারণ করার পর ও তুই কেন ওর কাছে গিয়েছিস? "
থমকে যায় আবির। তার মা তো তাকে কিছু বলতেই দিচ্ছে না। আবির কিছু বলার আগেই সাবিহা আবার বলে ওঠে...
"জিসানের হলুদের দিন তুই ওর এতটা ঘনিষ্ঠ কেন হয়েছিস? তোকে তো আমি বারন করেছিলাম। তোর প্রতিটা কাজের পরিপ্রেক্ষিতে ছোট পাখি যদি এমন একটা চিঠি লিখতোও তাহলে আমি দোষের কিছুই দেখতাম না। কারন তুই ওকে নিজের দিকে সিডিউজ করেছিস। আর করে যাচ্ছিস এখনো। "
আবির এখন কি করে বোঝায় যে সে নিজেকে আটকাতে পারে না ঐ একজনের কাছে। কি করে বোঝায়?
"তোকে আমি সাফ কিছু ফয়সালা দিতে চাই আবির। "
"কি বলতে চাও তুমি আম্মু? আমি যেন আর ওয়াইফির কাছে না যাই তাইতো? "
"হ্যা তাই, তবে এবার আরেকটু শুনে রাখ। আহিশ ছোটপাখিকে ভালোবাসে। "
ভেতর দিয়ে যেন কওছু একটা তীক্ষ্ণ ভাবে আঘাত করে গেলো আবিরের। কম্পিত হতে লাগলো বারবার একটি কথাই, আহিশ ছোটপাখিকে ভালোবাসে...
"ছোটপাখিও আহিশকে পছন্দই করে। তাই আমরা সীদ্ধান্ত নিয়েছি, নিবিড় আর বড়পাখির এনগেজমেন্ট এর দিনই আহিশ আর ছোটপাখিরও করিয়ে রাখবো। "
"আম্মু তুমি বুঝতে পারছো কি বলছো তুমি? আহিশ এখনো ছোট,ওনলি 20 ইয়ার্স ওল্ড। আর ছোটপাখি আর ও সেইম এইজ প্রায়, এটা কি করে তুমি... "
"আমি একা নই, আহিশ আর তোর মেঝো চাচিও ভিষণ খুশি ছোটপাখিকে নিয়ে। আর সেইম এইজ তো কি হয়েছে? এখন অহরহ এমন বিয়ে হয়েই থাকে স্বাভাবিক, আহিশের বয়স একুশ পাড় হলেই বিয়েটা দেবো না হয়। এখন এঙ্গেজম্যান্টটা করিয়ে রাখবো।"
আবিরের হাতের দিকে চোখ যেতেই সাবিহা লক্ষ্য কটে ছেলেটার হাত মুষ্টি বদ্ধ হয়ে আছে, রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। তবুও কোনো মতে হিসহিসিয়ে বললো..
"আমায় তুমি এসব কেন বলছো? "
"তোকে এসব বলছি কারন এখন থেকে ছোটপাখিকে তুই নিজের ছোট ভাইয়ের বউ হিসেবে দেখতে শিখ। সম্পর্কে তুই ওর ভাসুর। তাই ছোট ভাইয়ের বউকে নিজের দিকে সিডিউজ করার মতো অপ্রীতিকর বিষয় যেন এই বাড়িতে হতে না দেখি। আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকবি তুই। "
আবির রাগে রিরি করছে, মায়ের উপর চেঁচাতে পারছে না সে। কিন্তু ভেতরের রাগ গুলোকেও দমন করা কঠিন। কান্ঠিত শানিত স্বরে শুধু হালকা আওয়াজে বলে উঠলো...
"ঠিক আছে, আমি নিজেই চলে যাচ্ছি। তুমি থাকো তোমার সো কল্ড মেয়েকে নিয়ে। যা ইচ্ছে করো, আই ডোন্ট কেয়ার... "
বলতে বলতেই দরজায় একটা থাবা মেরে লম্বা কদমে রুম ত্যাগ করে আবির। রুমে এসে দ্রুত হাতে একটা কাঁধ ব্যাগে নিজের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস পত্র নিয়ে বেরিয়ে আসে সে। সিঁড়ি বেয়ে নামতেই সামনে পড়ে আহিশ। ছেলেটার চোখ মুখ বিষাদে ভরপুর, উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলতে নেয়...
"আবির ভাই৷ কোথায় যাচ্ছিস? ছোটপাখিকে একটু ডক্ট...."
আবিরের রাগ বাড়ে। আহিশকে এই মুহুর্তে গলা টিপে মে'রে ফেলতে ইচ্ছে করছে তার। কিন্তু পারছে না আবির, পারছে না। বা হাতের কব্জি দেয়ে সজোড়ে আহিশকে ধাক্কা মেরে নিজের সামনে থেকে সরিয়ে বলে ওঠে...
"যাস্ট গো এহেড ইউ এন্ড দিস ফা'কিং গার্ল।.... "
আর একটু বাক্যও ব্যয় না করে বেরিয়ে গেলো সে বাড়ি থেকে।ড্রয়িং রুম থেকে ইরিন, জুলেখা কয়েকবার ডাকলেও ফিরে তাকায় না সে। আর না তোয়াক্কা করে কারোর বাঁধার। চলে যায় অজানা এক গন্তব্যের উদ্দেশ্যে....
--------
উপর তলা থেকে এক হাতে ব্যাগ আর আরেক হাতে চড়ুই পাখির হাত চেপে ধরে টানতে টানতে ড্রয়িং রুমে আসতে থাকে ইরিনের মা বিথী বেগম। পেছন পেছন ইরিনও নামছে। চোখে মুখে তার শয়তানি হাসি। দোয়েল বারবার বিথী বেগমেড হাত থেকে নিজের বোনকে ছাড়াতে চাইছে, কিন্তু পারছে না সে। চেচামেচির আওয়াজে নিজ নিজ ঘর থেকে বেরিয়ে আসে সাবিহা, জুলেখা, আয়েশাও। এমন দৃশ্য দেখে সাবিহা ছুটে গিয়ে চড়ুইকে ছাড়িয়ে নেয় বিথীর থেকে...
"কি করছো কি আপা,ওকে এভাবে টানছো কেন তুমি? "
বিথী জোর গলায় চেচিয়ে ওঠে সাবিহার উপর...
"এই মেয়ের জন্য তোমার ছেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে রাগ করে। তুমি কি তা খেয়াল রাখছো ভাবি? "
সাবিহা চড়ুইকে নিজের বুকে আগলে ধরে বললো...
"একদম উল্টাপাল্টা কথা বলবে না আপা, আমার ছেলেকে আমি বকেছি তাই রাগ করেছে ও। "
"তাও তো এই মেয়েরই জন্য? নষ্টা মেয়ে কোথাকার, আত্মীয় না কিছু না এই বাড়িতে পড়ে আছিস কেন তোরা দুটো? থাকছে তো থাকছে এই বাড়ির ছেলে গুলোর মাথা নষ্ট করে দিচ্ছে নিজেদের শরীর দেখিয়ে... "
আয়েশা এগিয়ে এসে বলতে নেয়...
"এসব তুমি কি বলছো আপা..."
বিথীর তার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো..
"তুমি চুপ থাকো। কি পেয়েছো কি বাড়িতে হ্যা? আমার ভাইয়েরা তোমাদের বেশিই আসকারা দিয়ে ফেলেছে, আমার মুখের উপর কথা বলতে আসো আবার? একদম চুপ করে থাকো তুমি। "
সাবিহা বলে ওঠে...
"এত কিছু তো তোমার দেখার বিষয় নয় আপা, আমার মেয়েদের নিয়ে তুমি কেন কথা বলছো? "
"আমার দেখার বিষয় না মানে? এটা আমার বাপের বাড়ি ভাবি, ভুলে যেও না তোমার আহে এই বাড়ি আমার। আমার ভাই এখন থাকলে ঠিক এটাই করতো। এই মেয়ে দুটো, কোথাকার কোন জন্ঝাল থেকে উঠে এসেছে। এই মেয়ে, তোদের কি লজ্জা নেই? এভাবে অন্যের বাড়িতে দিনের পর দিন পড়ে আছিস যে? "
দোয়েলের চোখ বেয়ে নোনা পানি গড়িয়ে পড়ে, নিজেকে খুব অসহায় লাগছে আজ। তার পাশে যেন কেউ নেই। এতটা খারাপ দিন কেন দেখতে হচ্ছে আল্লাহ? লজ্জায় ঘৃণায় মাথা নুইয়ে রেখেছে সে।
সাবিহা জোড় গলায় বলে ওঠে...
"আমার মেয়েদের সাথে তুমি এভাবে কথা বলতে পারো না আপা। "
বিথী বেগম আরো জোড়ে চেচিয়ে বলে উঠলো...
"তোমার মেয়ে মানে? রাস্তা থেকে যাকে তাকে তুলে এনে নিজের ছেলে মেয়ে বানিয়ে দেবে নাকি? "
সাবিহা কিছু বলতে নিয়েও থেমে যায় অনুভব করে তার বুক থেকে সরে যাচ্ছে ছোট্ট চড়ুই পাখিটা। সাবিহার কন্ঠ করুন হয়..
"আম্মু? কি হয়েছে তোর? "
চড়ুই ছলছল চোখে তাকায় এক পলক সাবিহার দিকে। মুখে কিছু বলে না সে, অথচ চোখ দিয়ে যেন বুঝিয়ে দেয় হাজারটা না বলা কথা, কিছু কথার আঘাত যে সরাসরি বুকে গিয়ে লাগে।
চড়ুই মুখ ফিরিয়ে নেয়। এগিয়ে এসে ফ্লোর থেকে ব্যাগ তুলে নিয়ে দোয়েলের হাত ধরে। আস্তে করে বলে ওঠে...
"চল বোন... "
দোয়েল চমকে তাকায় তার দিকে। এই অসময়েও যেন এক টুকরো প্রশান্তি তার বুক ছুয়ে গেলো। তার ভয় কমেছে। তার বোনটা কথা বলছে, আগের মতো সেই বিভৎস রোগটা নেই। কি যে খুশি লাগছে দোয়েলের। বলতে নেয়...
"ব্ বোন.. তুই ঠিক হয়ে... "
"বাড়ি চল আগে। "
বলতে বলতেই দরজার দিকে এগিয়ে যেতে নেয় চড়ুই, দোয়েলের হাত ধরে। জেসি কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে আসে। পাখিদের পথ রুখে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে...
"আ'ম সরি পাখি, আমাকে তোরা মাফ করে দিস, আমি পারি নি তোদের অপমানের হাত থেকে বাচাতে। আমার বাড়িতে এসে তোরা এভাবে অপমানিত হবি, তা কল্পনাও করতে পারি নি আমি। "
চড়ুই পাখি আলতো হাসে। জোসির হাত খানা নিজের হাতে মুষ্টি বদ্ধ করে কাতর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো...
"ত্ তুই আমাকে বিশ্বাস করিস তো জেসি? "
জেসি দ্রুত উপর নিচ মাথা ঝাকায়।কাঁদতে কাদতেই বলে ওঠে...
"করি, করি। আমি জানি তো তুই কেমন। আমাদের থেকে ভালো তোকে কেউ চিনতেই পারবে না... "
চড়ুই আলতো হেঁসে বলে...
"তা হলে আমাদের বন্ধুত্বে কখনো ফাটল ধরবে না। আ। আহিশ কে বুঝিয়ে নিস তুই। ক্ কাল ভার্সিটিতে দেখা হচ্ছে... "
বলেই জেসির হাত ছেড়ে দিয়ে দোয়েলকে নিয়েই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায় চড়ুই।
পেছনে স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রয় সাবিহা। তার মেয়ে দুটো চলে গেলো এভাবে? তার বুক খালি করে দিয়ে চলে গেলো? ....
---------
তকন আবিরের ধাক্কায় সিঁড়িতে পড়ে পা মুছড়ে যায় আহিশের। তাকে তারাতাড়ি করে নিবিড় হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার কারনে বাড়িতে যে এত কিছু হয়ে গেলো, তা টেরও পেলো না ছেলে দুটো।
বিকেলে বাড়ি ফিরার পর খেয়াল করলো বাড়িটা নিরব। নিবিড় ভাবলো হয়তো গত কালকের ঘটনার রেশ এখনো কমেনি, তাই এমন। ড্রয়িং রুমে কাউকে না পেয়ে নিবিড় আহিশকে বললো...
"রুমে যা, রেস্ট কর গিয়ে... "
আহিশ বলে...
"আগে ছোট পাখির কি অবস্থা দেখে আসি। বড় পাখিকে কি করে জেসি সামলাচ্ছে কে জানে... "
নিবিড় একটু ভেবে বললো...
" আচ্ছা চল। "
জেসির রুমে আসতেই দেখলো জেসি বসে আছে স্টাডি টেবিলে। খানিকটা অবাক হয় আহিশ। এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো...
"তুই একা কেন? পাখিরা কোথায়? নিচেও তো দেখলাম না... "
জেসি মুখ তুলে তাকায় একবার আহিশ আর নিবিড়ের দিকে। তারপর আবার বইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে...
"চলে গেছে ওরা... "
"ওয়াট!!!"
চমকে ওঠে আহিশ নিবিড় দু'জনই। আহিশ একটু এগিয়ে বলে...
"ছোট পাখির এই অবস্থায় বড়পাখি ওকে নিয়ে... "
"ছোট পাখি নিজেই গিয়েছে। "
"জেসি তুই কি সব বলছিস হ্যা? "
জেসি ফিরে তাকায় আহিশের দিকে। তখনকার পুরো কাহিনি শুনতেই যেন নিবিড়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। দ্রুত কিছু একটা ভেবেই দোয়েলের নম্বরে ডায়াল করতেই দেখলো নম্বর বিজি আসছে। তারপর দ্রুত হাতে মেসেনজারে গিয়ে বুঝতে পারলো দোয়েল তাকে ব্লক করে দিয়েছে সব কিছু থেকেই। রাগে নিবিড় ফোন ছুড়ে মারলো বিছানায়। গটগট পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলো সাবিহাদের রুমের উদ্দেশ্যে। কিন্তু তার আর প্রয়েজন হয় নি। যাওয়ার পথেই দোতলার খোলা বারান্দায় দেখা মিললো আজমল, আসমতের সাথে। একটু দুরেই বসে আছে বিথী বেগম। সাবিহা মাত্রই চায়ের ট্রে নিয়ে গম্ভীর মুখে এসে চা দিচ্ছে আজমল আর আসমতকে।
সাবিহার মুখের দিকে তাকিয়ে আজমল চৌধুরী চায়ের কাপ হাতে তুলে নিতে নিতে বললো...
"কি ব্যাপার গিন্নি? মন খারাপ কেন? "
সাবিহা আস্তে করে বলে...
"কিছু না। "
আজমল চৌধুরী চায়ের কাপে একটি চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করে..
"আম্মুরা কোথায়? কোথাও ঘুরতে গেছে নাকি,এসেছি ধরেই ওদের কাউকে দেখছি না। "
সাবিহা আড়চোখে একবার বিথী বেগম এর দিকে তাকায়। তারপর চোখ নামিয়ে বলে...
"ওরা চলে গেছে। "
আজমল চৌধুরী চমকে ওঠে। দ্রুত হস্তে চায়ের কাপ হাত থেকে রেখে বললো...
"চলে গেছে মানে? কই আমায় তো কিছু জানায় নি এই ব্যপারে। "
"সেটা তোমার এই বোনকেই জিজ্ঞেস করো না আব্বু... "
দরজার দিক থেকে নিবিড়ের কন্ঠ ভেসে আসতেই আজমল চৌধুরী তাকায় তার দিকে। ভ্রু কুঁচকে বলে ওঠে..
"বিথীকে জিজ্ঞেস করবো মানে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না... "
নিবিড় চোয়াল শক্ত করে এগিয়ে যায় বিথীর দিকে। গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে...
" পাখিদের অপমান করার সাহস কোথায় পেয়েছেন আপনি? "
বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে বিথী বেগম। ঢোক গিলে নিজেকে সামলে সাবিহার দিকে তাকিয়ে বলতে নেয়...
"এসব কি ভাবি? তোমাকে না আমি বলে দিয়েছি ঐ ব্যপারে যাতে আর কোনো কথা না উঠে। তাহলে.... "
নিবিড় হালকা গর্জে ওঠে বলে...
"আমার আম্মুকে চুপ করানোর আপনি কে? "
বিথী বেগম ভয় পাচ্ছে, তবুও নিজেকে সামলে বলতে নেয়...
"নিবিড় মুখ সামলে কথা বল, এই বাড়িতে আমারও হক আছে... "
নিবিড় ঘাড় ঘুরিয়ে আজমল আসমতের দিকে তাকিয়ে বলে...
"আব্বু, চাচু, তোমরা এখনো এনার ভাগ বুঝিয়ে দাও নি? "
আসমত বলে ওঠে...
"ওর হক তো সেই কবেই ওকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাড়িতে যতটুকু ভাগ ছিলো, তা ও নেয়নি, বিনিময়ে টাকা তো বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছেই ওকে। এসব কথা এখন কেন উঠছে নিবিড় বাবা?"
নিবিড় উত্তর দেয় না, সামনে তাকিয়ে বিথীকে বলে...
"শুনেছেন? এই বাড়িতে আপনার এখন কোনো হক নেই। আপনার বাপের বাড়ি হিসেবে আসছেন ভালো কথা, কিন্তু আমাদের পারিবারিক ব্যপারে নাক গলাতে আসলে আমি নিবিড় আপনাকে এই বাড়ির চৌকাঠও পেরোতে দিবো না। "
আজমল কিছুই বুঝতে পারে না, জিজ্ঞেস করে...
"কি হয়েছে আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবে তো নাকি? "
নিবিড় আজমলকে বলে...
"আব্বু, তোমার এই বোনকে জিজ্ঞেস করো তুমি। আমাদের গেস্ট, আহিশ -জোসির গেস্ট হিসেবে এসেছে পাখিরা। সেই গেস্টদের অপমান করার উনি কে হয়? ভাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে রাগ করে। সেটা ছোট পাখির জন্য হোক বা অন্য কারোর জন্য,, তা বিচার করার দায়িত্ব সম্পূর্ণ ভাইয়ের, আর নয়তো আমাদের। যেখানে আমাদের পরিবারের কেউ এই নিয়ে ছোট পাখিকে কোনো ব্লেইম দিচ্ছিলো না সেখানে উনি কে পাখিদের দোতলা থেকে টেনে হিছড়ে নামিয়ে অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার? "
কথাখানা শুনতেই আজমল চৌধুরী অবাক হয়ে যায়। চরম পর্যায়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে...
"বিথী, আম্মুদের বের করে দিয়েছে? "
বিথী এগিয়ে আসে নিজের বড় ভাইয়ের সামনে। বলতে নেয়...
"ভাইজান, আমি যা করেছি তোমাদের পরিবারের ভালোর জন্যই করেছি। তুমি জানো না ঐ মেয়ে দুটো আসলে.... "
আর কথা সম্পূর্ণ করতে পারলো না বিথী বেগম। তার আগেই আজমল চৌধুরী সর্ব শক্তি দিয়ে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয় বিথী বেগমের গালে। তর্জনী আঙুল উঁচু করে গর্জে বলে ওঠে....
"তোর সাহস কি করে হয় আমার মেয়েদের সাথে এসব করার? আমার মেয়ে দুটোকে অপমান করিস কোন অধিকারে তুই? "
বিথী বেগম নির্বাক গালে হাত দিয়ে রয়। কি বলবেন তিনি? আহিশ এসে নিবিড়ের কানে কানে কিছু বলতেই আরো মাথা গরম হয়ে যায় তার। তবুও নিজেকে সংযত করে এগিয়ে যায় বিথী বেগমের দিকে। বলে উঠলো....
"নেক্সট টাইম আমাদের পরিবারের কোনো বিষয়ে নাগ গলাতে যেন না দেখি। অতিথি, অতিথির মতোই থাকবেন, খাবেন, ঘুরবেন, ঘুমাবেন, সময় ফুরালে চলে যাবেন, দ্যাটস ইট.. আর আপনার ঐ মেয়েকে সাবধান করে দিবেন, এই বারের মতো ছেড়ে দিলাম ওকে। এই টুইন ব্রাদার্স এত সহজ নয়, যতটা ও ভেবেছে। "
বিথী বলতে নেয়..
"ইরিন কি করেছে, ও তো... "
নিবিড় শান্ত অথচ গম্ভীর কন্ঠে বলে...
" চিঠি লিখেছে নিজ হাতে, ছোট পাখিকে বোকা পেয়ে ফুসলিয়ে তার হাত দিয়ে আবিরকে দিয়েছে ঐ চিঠি। তখন ছোট পাখিকে নষ্ট মেয়ে নষ্ট মেয়ে বলছিলেন না? আসলে আপনার মেয়েই সেই নষ্ট। ব্লাডি মাইন্ডার... চিপ গার্ল। নষ্ট মায়ের নষ্ট মেয়ে.. "
বিথী বলতে নেয়...
"নিবিড়..."
"চুপ, ঐ নষ্ট মুখে আমার নাম নিতে যেন না দেখি। মাটির সাথে মিশিয়ে দেবো একদম। মনে থাকে যেন কথা গুলো। "
নিবিড় চলে যেতে নিলেই সাবিহা এগিয়ে এসে বলে....
"আবির বাবা আমার ফোন তুলছে না। কারোর ফোনই তুলছে না। ও কোথায় আছে কি করছে, সেই যে বেরোলো, আর ফিরলো না ঘরে। ওর খোঁজ নে না বাবা? "
নিবিড় পকেট থেকে ফোন বের করে বার কয়েক কল দেয় আবিরকে। কিন্তু আবির রিসিভ করে না। একটু পরেই একটা মেসেজ আসে নিবিড়ের ফোনে...
"আমার খোঁজ নিতে মানা করে দে সবাইকে। সময় হলে আমি নিজেই যোগাযোগ করবো। "
নিবিড় মেসেজটা দেখে নিজ থেকে কিছু বলতে গেলেই আবার একটা মেসেজ আসে...
"একটু পরেই আমার ফ্লাইট, আমেরিকায় ব্যাক করছি। "