Mr and Mrs Twins Return

পর্ব - ২৩

🟢

একের পর এক করে করে তিনটা থাপ্পড় গালে এসে পড়তেই চড়ুই পাখির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। গালে হাত দিয়ে হতভম্ব নয়নে সামনে তাকায় সে। মুখ ফুলিয়ে কান্নারত কন্ঠে বলে উঠলো...

"তুইও আমাকে মারছিস বোন? "

দোয়েল আরেকটা থাপ্পড় মারতে গেলেই আহিশ দৌড়ে এসে সরিয়ে নেয় চড়ুইকে। নিবিড়ও এগিয়ে এসে দোয়েলের হাত চেপে ধরে বলে..

"এটম কি করছো তুমি, থামো.. "

দোয়েল ঝাপ্টা মেরে ছাড়িয়ে নেয় নিজের হাত, বলে ওঠে..

"ছাড়ুন আমার হাত। আমার বোন তো, ওকে মা'রার যথেষ্ট অধিকার আমার আছে। "

মুনিয়া মুখ কুঁচকে চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো..

"ছি ছিহ চড়ুই, এই ছিলো তোমার মনে? আমরা তো ভাবতেও পারি নি।"

সাগর বিচ্ছিরি হেঁসে বলে ওঠে...

" যৌবনের এত জ্বালা থাকলে আমাদেরও একটু সুযোগ দিতে পারতে... "

আহিশ চেচিয়ে ওঠে, সাগরের দিকে আঙুল তাক করে বলে ওঠে...

"সাগর ভাই স্টপ। ছোট পাখিকে নিয়ে আর একটা বাজে কথা মুখ থেকে বের হলে আমি ভুলে যাবো তোমরা আমার বয়সে বড়। "

চড়ুই হুট করেই আহিশের থেকে ছুটে দৌড়ে গেলো ছাঁদের দরজার দিকে। আহিশ পেছন থেকে ডাকে, কিন্তু চড়ুই পাখি ফিরে চায় না একটি বারও। তার যাওয়ার পানি নিরলস তাকিয়ে থাকে আবির নিরুদ্দেগ। তখন থেকে এই এখন পর্যন্ত তার মুখ থেকে একটি কথাও বের হয় নি। জলন্ত চোখে যে চড়ুইদের দিকে তাকিয়ে ছিলো তাও পরিবর্তন হয়নি। আর না কাউকে কিছু বলতে বাঁধা দিয়েছে সে।

আহিশের রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে, দোয়েলের কাছে এগিয়ে এসে তার দু বাহু ঝাঁকিয়ে বলে উঠলো...

" এটা কি করলি তুই বড় পাখি? আর কেউ না জানুক, আমরা তো জানি ছোটপাখি এটা কখনোই করবে না, ও এমন মেয়ে নাহ। আ্।আর তুই তো ওকে সব থেকে বেশি চিনিস বল? "

দোয়েলের চোখ বেয়ে দু ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে। আহিশের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলে...

"ছাড় আহিশ। আমার যা ঠিক মনে হয়েছে, আমি তাই করেছি। "

দোয়েল পেছনে ফিরতেই সম্মুখীন হয় নিবিড়ের। দৃষ্টিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় দু জনার। অজস্র কথা বলতে গিয়েও যেন বলা হবে না আর। দোয়েল মাথা নামিয়ে ফেলে। ধীরে ধীরে নিজের দু হাত জোর করে বলে ওঠে...

"আমায় ক্ষমা করে দিবেন। আপনার আমার সম্পর্কটা হওয়ার মতো নয়। আমি পারবো না... "

নিবিড়ের বুক ভার হয়, কাতর কন্ঠে উচ্চারণ করে...

" বড়পাখি? "

আর উত্তর আসে না দোয়েলের দিক থেকে। নীরবে হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে ছাঁদের দরজার দিকে এগোয়।আহিশ জিজ্ঞেস করে...

"এখন কোথায় যাচ্ছিস? "

"বোনের কাছে। "

"বড় পাখি, আর একবার ছোটপাখির গায়ে হাত তুলবি তো... "

"আর মারবো না, বকবোও না.."

থামলো না দোয়েল। দ্রুত কদমে নেমে যায় ছাঁদ থেকে। জেসিও তার পিছু পিছু যায়, কি না কি করে বসে দুটোতে আবার। আহিশ এগিয়ে এসে দাঁড়ায় আবির বরাবর। ক্লান্ত অথচ দৃঢ়তার সাথে বলে...

"আমি জানি না তুই আদেও কি ভাবছিস। কিন্তু, সত্য এটাই যে ছোট পাখি এমন কাজ করে নি। "

-----

এই রুম সেই রুম খুঁজে খুঁজেও চড়ুইকে পেলো না দোয়েল। নীরবে চোখের জন ফেলতে ফেলতে জেসি আর আহিশের সাথে মিলে খুজেই যাচ্ছে তাকে। বড়রা কয়েকবার জিজ্ঞেস করলে জেসি আর আহিশ এড়িয়ে যায় বিষয়টি।

প্রায় এক ঘন্টার মতো খুঁজেও চড়ুইকে পায় নি কেউ। জেসির রুমে চিন্তিত মনে খাটের উপর বসে আছে দোয়েল।নিবিড় বেশ কসরত পুশিয়েই তাকে একটু রুমে নিয়ে এসে শান্ত করেছে। চেষ্টা করছে বড়দের কানে যেন বিষয়টি না যায়, কিন্তু আদেও তা সম্ভব কিনা জানে না তারা।আবির শুধু ছাঁদ থেকে নামার সময় সবাইকে নীরবে সতর্ক করে দিয়েছে যেন বাড়ির বড়রা এই বিষয়ে কিছু না জানতে পারে।

চড়ুই বাড়ি থেকে বের হয়নি তা মোটামুটি শিউর, দারোয়ান জানিয়েছে তা। বাড়ির ভেতরেই কোথাও আছে ও কিন্তু কোথায়?

পুরোটা বাড়ি খুঁজেও যখন তাকে পাওয়া গেলো না সকলেই যেন চিন্তায় পড়ে যায়। আবির রুমে আসে নিজের। শীতের কাপড় নেওয়ার জন্য। ভাবলো একবার পেছনের বাগান এড়িয়াটায় খুঁজতে যাবে। কিন্তু রুমে ঢুকতেই নিজলর বিছানার ব্ল্যাঙ্কেটটা মেলে রাখা দেখে কিছুটা অবাক হয় সে। একটু ক্ষন পর পর নড়ে নড়ে উঠছে তা।আবির ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ব্ল্যাঙ্কেটটা সরাতেই দেখতে পেলো চড়ুই পাখি গুটিয়ে শুয়ে আছে। থেকে থেকে নাক টেনে টেনে ফুপিয়ে কাঁদছে। আবির চমকে উঠে বললো..

"তুমি এখানে? আমার রুমে কি করছো তুমি? "

চড়ুই ফিরে তাকায় আবিরের দিকে। আস্তে করে উঠে বসে বলে..

"ওহ দানাবল আপনি? "

"তোমাকে সারা বাড়ি খুঁজে ফেলছে সবাই, আর তুমি আমার রুমে কি করছো? "

"সে জন্যই তো এসেছি। আমি তো জানি আপনার রুমে কেউ আসে না, আমাকে যাতে বোন খুঁজে না পায় তাই এখানে এসেছি। আপনি বোনকে বলবেন না হ্যা, আমি খুব রাগ করেছি ওর উপর। "

আবিরের রাগে চোখ দুটি জ্বলছে। চড়ুইকে টেনে তুলে বিছানা থেকে নামিয়ে বললো..

"কেন এসেছো তুমি? আমার রুমে কেন এসেছো? তখনকার বাজে ইচ্ছে গুলো নিয়ে? তোমার এতই জ্বালা হ্যা? "

চড়ুই ছলছল চোখো তাকায় আবিরের দিকে। বলতে চায়...

"আপনিও আমায় ভুল বুঝছেন দানাবল? বোনের মতো করে? আমি তো বলছি আমি লিখিনি এইসব বাজে কথা, ঐ চিঠিটা তো আমাকে ই..."

"চুপ, একদম চুপ। আমি তোমার মুখ থেকে আর একটা কথাও শুনতে চাইছি না। দোয়েলের জায়গায় আমি থাকলে এতক্ষণে গলা টিপে মেরে ফেলতাম তোমায়।.."

"আপনি আমায় বকছেন কে..."

"চুপ, একটাও কথা মুখ থেকে বের করবে না তুমি। তোমার কথা আমার যাস্ট ঘৃনা হয়। এত্তো বাজে মেয়ে তুমি? সারাক্ষণ বাচ্চাদের মতো নাটক করো কেন হ্যা? কোনো স্বাভাবিক মানুষ এত বকতে পারে? তুমি একটা মানষিক রোগী, বুঝতে পেরেছো? সব সময় এমন ন্যাকাদের মতো আচরন করো কেন হ্যা? তোমার বোনকে দেখো না? ওর মতো শান্ত থাকতে পারো না তুমি? "

চড়ুইয়ের কান্নার বেগ বাড়ে, ভেতরে জমতে থাকে তীব্র অভিমান, বলতে নেয়...

" আমি কি করেছি হ্যা? আপনি আমার সাথে সব সময় এমন করেন কেন? কোন পাকা ধানে মই দিয়েছি আপনার? "

আবিরের কন্ঠ আরো উঁচু হয়, এক প্রকার চেচিয়ে বলে উঠলো..

"তুমি আমার সবটা নষ্ট করে দিয়েছো। তোমার সাথে পরিচয় হয়েছে ধরে আমার সব কিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার ইমেজ নষ্ট হয়েছে তোমার এই ফাকিং বকবকানির কারনে৷ প্রত্যেকটা সময় কথা বলতেই হবে তোমার তাই না? একটা সেকেন্ড চুপ থাকতে পারো না? একটা সেকেন্ড? আর কি চাই তোমার হ্যা? আমার আম্মুকে তো নিজের হাত করে নিয়েছো, আম্মু আমার ৎেকেও বেশি তোমাকে ভালোবাসে, খুশি? সিমপ্যাথি নিতে নিতে তুমি নিজেকে এখন যা তা মনে করো? আমাকে ওসব লিখার সাহস কি করে পাও তুমি ড্যামিড? "

শেষের কথাটায় কেঁপে ওঠে চড়ুই। চোখ খিঁচে বন্ধ করে নেয় সে। আবির থামে না, আজ যেন মনের সব রাগ উগলে দিচ্ছে মেয়েটার উপর..

"সব কিছুর জন্য দায়ী তুমি আর তোমার ন্যাকা মার্কা কথা। তোমার জন্য আজ বড় পাখিকেও অপমানিত হতে হচ্ছে। তোমার কথা ভাবতে গিয়ে ও নিজের অনুভুতিকে চাপা দিচ্ছে। আর তুমি কি না... ছিহ.. সেইম অন ইউ। "

চড়ুই আর কথা বলে না, শুধু ভেসে আসে তার একটু পর পর নাক টানার শব্দ। আবির একটু থেকে কন্ঠ গম্ভীর করে বলে...

"আর কোনো দিন নিজেকে আমার পরিচিত বলে দাবি করবে না। আমি তোমাকে চিনি না, তুমিও আমাকে চেনো না। আমার সামনে যেন আর তোমার ঐ নোংরা মুখ থেকে কথা বের হতে না দেখি, দূরে থাকবে তুমি আমার থেকে।মনে থাকে যেন। নাও গেট আউট... "

চড়ুই চোখের পাতা তুলে চায় আবিরের মুখের দিকে..

"কি হলো, বোর হও আমার ঘর থেকে তুমি। নিজের এই বিচ্ছিরি মুখ আর আমাকে দেখাবে না তুমি। "

চড়ুই আবার মাথা নামিয়ে নেয়। নীরবে দরজার দিকে পা বাড়ায়। সে বেরিয়ে যেতেই আবির ধপ করে দরজা আটকে দেয় মুখের উপর।

রাত প্রায় তিনটা, কপালের উপর এক হাত রেখে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আছে আবির। ঘুম নেই চোখে আজ। ভেতর ঘর অস্থির হয়ে আছে কেন যেন। চড়ুইয়ের বিষয়টা মাথা থেকে সরছেই না যেন।

দরজায় নক পড়তেই উঠে গিয়ে খুললো আবির। সামনেই নিবিড় দাঁড়িয়ে। চোখে মুখে সেই আগের উজ্জলতা নেই যেন, নির্জীব ভঙ্গিতে বলে উঠলো...

"আমার গাড়ির চাবিটা পাচ্ছি না, তোর ঘরে রেখেছি কিনা দেখ তো.. "

"এত রাতে কোথায় যাবি গাড়ি নিয়ে? "

আবিরের প্রশ্নে নিবিড় দীর্ঘ এক নিশ্বাস ফেলে বললো...

"ছোট পাখি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। দারোয়ান চাচা আটকাতে পারে নি। "

আবিরের বুকটা কেমন ধক করে ওঠে। এই রাতে মেয়েটা.... বলতে নেয়..

"ওকে তো আমি..... বড় পাখি কোথায়? "

"পাগলামো করছিলো, অনেক কষ্টে স্লিপিং পিল খাইয়ে দিয়েছি। ঘুমাচ্ছে এখন। "

আবির রুম থেকে গাড়ির চাবিটা নিয়ে এসে বলে..

" চল... "

নিবিড় সহ সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসতেই দেখে সোফায় আজমল চৌধুরী বসে আছে চিন্তিত ভঙ্গিতে। সাবিহা থেকে থেকে কাঁদছে। ইরিনের মা বিথী বেগম উঠে নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে বললেন...

"দেখো কোন নাগডের হাত ধরে বেরিয়েছে, ও মেয়ের জন্য এভাবে বসে বসে কান্না করা লাগে নাকি। আমি বাপু গেলাম ঘুমাতে.. "

আবির আস্তে করে নিবিড়কে জিজ্ঞেস করলো...

" বড়রা জেনে গেছে? "

"হুম.. "

" মানা করেছিলাম আমি... "

"কতক্ষণ আর চাপা থাকবে? "

বাড়ির বাইরে আসতেই দেখলো আহিশ দাঁড়িয়ে আছে। আবির নিবিড়কে দেখে এগিয়ে এসে বললো...

"আমি হেটে গিয়ে কিছু দুর খুঁজে এসেছি, নেই ও। "

নিবিড় বললো...

"আমাদের সাথে চল.."

আবির বললো...

"আলাদা করে খুজলে ভালো হয়।ভাই, তুই আর আহিশ একটায় যা, আমি আলাদা যাচ্ছি। পেলেই ইনফর্ম করবি সাথে সাথে। "

আবিরের কথা ধরেই রওনা দেয় তিন জন।

ভোর চারটা সময়। এক ঘন্টা খুঁজেও চড়ুই পাখিকে পাওয়া যায়নি কোথাও। রাস্তার ধারে গাড়ি থামিয়ে আবির সীটে হেলান দেয়, বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে চড়ুই পাখির উজ্জ্বল হাসি মাখা মুখটা। মেয়েটা যে বোকা, এত রাতে কোনো খারাপ লোকের চক্করে পড়লে তো...

আবির ভাবতে পারে না। ভেতর থেকে যেন ভীষণ শূন্যতা অনুভুত হচ্ছে। চড়ুই তার কেউ না, তবুও মনে হচ্ছে খুব আপন কিছু খুঁজে পাচ্ছে না সে।

সেই প্রথম দিন রাস্তায় একটা লোকের চক্করে পড়েছিলো মেয়েটা। ঘুমের কারনে বুঝতেও পারেনি কিছু, আজও যদি তেমন কিছুই হয়?

আবির আর নিতে পারছে না, রাস্তার প্রতিটি গলি থেকে শুরু করে সব জায়গায় খুঁজে ফেলেসে সে, কিন্তু মেয়েটার অস্তিত্ব নেই কোথাও। কি করবে এখন সে? কি করবে?...

শীতল বাতাসের সাথে ভেসে আসছে মিষ্টি এক পরিচিত সুভাস। মনোমুগ্ধকর সুভাসটি ছড়াচ্ছে রাস্তার ধারের শিউলি ফুলের গাছটি। আবিরের মনে আবেশিত আকাঙ্খায় দোলা দেয় কিছু স্মৃতি। চড়ুই পাখির ছোট্ট দেহের কম্পমান সেই দৃশ্যখানা, বারবার নিজেকে আবিরের বুকে গুটিয়ে নেওয়ার সেই সন্ধিক্ষণ, প্রথম ওষ্ঠাগত সেই স্পর্শ টার কথা।

তড়িৎ গতিতে চোখ মেলে চায় আবির, নি:শ্বাসের গতি ঘন হয়, গলা শুকিয়ে আসছে তার। শুকনো ঢোক গিলে বৃথা গলা ভেজানোর চেষ্টায় নিমজ্জিত হয় সে। কিছু একটা ভেবেই গাড়ি স্টার্ট দেয় আবার, রওনা দেয় নিজেদের ফার্ম হাউজের উদ্দেশ্যে।

গাড়ি থামিয়ে ফার্ম হাউজের ভেতরে ঢুকতে গেলেই দারোয়ান তাকে থামায়। হাতে একটা আংটি দিয়ে বলে...

"স্যার, এইডা ঐ মামনিটারে দিয়া দিয়েন কষ্ট কইরা। "

আবির ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো..

"কোন মামনি? "

"ঐ যে জমজ দুইডা মাইয়া আহে না আপনাগোর লগে, সবাই বড়পাখি ছোট পাখি কইয়া ডাকে।"

আবির চমকায়..

"এখানে এসেছিলো?"

"হয়, বহুত রাইত কইরা আইছে,অটোতে কইরা। ভাড়া ছিলো না হয়তো। অটোওয়ালা চিল্লা ফাল্লা করতাছিলো দেইখা আমি গিয়া ভাড়াটা মিটাইয়া দিছি। মামনি ঐ ভাড়ার বিনিময়ে আমারে এই সোনার আংটিটা দিয়ে চলে গেলো, ফেরত দিতে চাইছিলাম, হুনে নাই ওয়। আপনিই বলেন স্যার, পঞ্চাশ টাকার ভাড়ার লাইগা এত দামি সোনার আংটি নেওয়া টা কি উচিৎ? আপনি যাইতাছেন যহন ওরে একটু দিয়া দিয়েন স্যার... "

আবিরের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়, তড়িৎ গতিতে জিজ্ঞেস করে...

"ও এখানে আছে? "

"হয় স্যার, বাগানের দিকে গেছে, আমি কইছিলাম বাড়ির চাবি নিয়া যাইতে, নেয় নাই। বাগানের দিকেই আছে,মাইয়া মানুষ তো, আমি আর গিয়া দেখি নাই কি করতাছে। "

আবির খুশিতে দারোয়ানের কাঁধে চাপড় দিয়ে বলে...

"থ্যাংকিউ, অনেক ধন্যবাদ চাচা। "

বলেই পকেট থেকে একটি এক হাজার টাকার নোট নিয়ে দারোয়ানের হাতে দিয়ে আংটিটা নেয়। আর বলে..

"এটা রাখুন, সামনের মাস থেকে আপনার বেতন বাড়িয়ে দিবো কিছু। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। "

দৌড়ে যায় বাগানের দিকে। সেদিনের সেই শিউলি গাছের নিচে খুঁজে পায় চড়ুই পাখিকে। বুকে হাত দিয়ে সুস্থির নিশ্বাস ফেলে আবির। পকেট থেকে ফোন বের করে নিবিড়ের নম্বরে মেসেজ করে দেয়..

"তোরা বাড়ি যা, পেয়েছি আমি ওকে, নিয়ে আসছি। "

ফোনটা আবার পকেটে পুরেই এগিয়ে যায় চড়ুইয়ের কাছে। মেয়েটা দু হাটু জড়িয়ে তার উপর মাথা রেখে বসে আছে। খোলা চুলগুলো পিঠময় ছড়িয়ে রাখা,উপর থেকে ছোট্ট ছোট শিউলি ফুলের বৃষ্টি, কিছু ফুল এসে চুলে আটকাচ্ছে, আবার কিছু গড়িয়ে পড়ছে নিচে। আবির ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে একটু ভালো মতো ঝুঁকে দেখে ঘুমোচ্ছে কি না। নাহ, জেগেই আছে, ঘোলা চোখ দুটো দৃষ্টি দিয়েছে অদূরে।

"ক'টা বাজে খেয়াল আছে? চুল টুল ছেড়ে যে এভাবে গাছ তলায় বসে আছো? "

গম্ভীর কন্ঠে আবির কথাটা বললেও কোনো নড়চড় হয় না চড়ুইয়ের। একটি বার ফিরেও তাকায় না সে আবিরের দিকে। আবির আরেকটু এগিয়ে গিয়ে বসে চড়ুইয়ের পাশে, কন্ঠের রেশ কমিয়ে জিজ্ঞেস করে..

"এখানে কেন এলে? "

উহুম,এবার ও চড়ুইয়ের মুখ থেকে কোনো কথা বের হয় না। আবির একটু থেমে আবার প্রশ্ন করে..

"রাতে ঘুমাও নি একটুও? "

নাহ, এবারও চড়ুই পাখির মুখ থেকে কোনো কথা বের হয় না। আবির দীর্ঘ এক নিশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করে...

"চিঠিটা কে দিয়েছে তোমায়? "

চড়ুই পাখি উত্তর দেয় না একটি প্রশ্নেরও। আর না দৃষ্টি দেয় আবিরের দিকে। আবির ঘাটায় না আর তাকে। উঠে দাঁড়িয়ে বলে..

"চলো বাড়ি চলো। "

দু কদম এগিয়ে যায় আবির। থেমে আবার পেছন ফিরে দেখে চড়ুই এবারও নড়ে না সেই জায়গা থেকে। আবির হাফ নিশ্বাস ফেলে এগিয়ে গিয়ে নিজ মতো করে পাঁজা কোলে তুলে নেয় চড়ুই পাখিকে। চড়ুই বাঁধা দেয় না, আর না নিজ থেকে আবিরকে আগলে নেয়, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই যেন তার।

আবির হাঁটতে হাঁটতেই তাকায় চড়ুইয়ের পানে, নির্জীব হয়ে আছে আজ মেয়েটা। আগের মতো শরীরে চটপটে ভাবটা নেই যেন। প্রতিবারের মতো পা ও দোলাচ্ছে না আজ আর।

গাড়ির কাছে গিয়ে চড়ুইকে সামনের সীটে বসাতে গিয়েও থেমে যায় সে। ঘুরে আবার ফিরে আসে ড্রাইভিং সীটের কাছে। কি যেন ভেবে ডে চড়ুইকে কোলে নিয়েই বসলো ড্রাইভিং সীটে। কেন জানি মেয়েটাকে নিজের থেকে সরাতে ইচ্ছে করছে না আজ। হয়তো নতুনত্বের ভাব আর নয়তো হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা। চড়ুইও নীরবে লেপ্টে রয় আবিরের বুকে, আবির তাকে ঠিক যেভাবে পরিচালনা করছে সেভাবেই রয়। যেন নিস্তব্ধ এক পুতুল বসে আছে আবিরের কোলে।

গাড়ি চলছে শুনশান নীরতবায়, কিন্তু আজ আর আবিরের ভালো লাগছে না। বিরক্ত লাগছে, মেয়েটা কিছু বলছে না কেন? বাড়তি বকবক তো দূর, কোনো প্রশ্নের উত্তর ও দিচ্ছে না সে আজ। এমন হয়ে আছে কেন চড়ুই পাখি?

আবিরের এক হাত ঘন ঘন চড়ুইয়ের চুলের ভাঁজে চলতে থাকে। মেয়েটার কান, গাল একটু একটু করে ছুয়ে দেয় আবির ড্রাইভিং এর মাঝে মাঝেই।ফাঁকা রাস্তা হওয়ায় তেমন সমস্যাও হচ্ছে না তার, একটু পর পরই চোখ নামিয়ে তাকায় চড়ুই পাখির দিকে। আবিরের ইচ্ছে হলো মেয়েটার নরম গালে একটু খানি আদর ছুইয়ে দিতে, আবির বিন চৌধুরী তো নিজের কোনো ইচ্ছেই অপূর্ণ রাখে না, তাই নীরবে মুখ নামিয়ে ছোট ছোট চুমুতে ভরিয়ে দেয় চড়ুইয়ের বা গাল, কানের লতি, ঘাড়। আলতো হাতে আঙুলের ডগা কোমল স্থান গুলোতে স্লাইড করতে করতে আপমন মনেই প্রশ্ন করে বসে...

"তুমি এত নরম কেন? "

চড়ুই পাখির আজ এতেও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। আবির আলতো হাসে, না পায় সম্মতি আর না পায় বাঁধা, সুযোগ লুফে নিতে আবির তো ওস্তাদ, তাই যতক্ষণ না বাড়ি পোঁছে ততক্ষণ পর্যন্ত যে নীরবে একটু একটু করে চড়ুই পাখির গাল, কান, গলা ঘাড়ে নিজের ঠোঁট আর হাতের বিচরন চালিয়ে গেছে।

চারদিকে আলো ফুটেছে।পাখিরা ধীরে ধীরে কিচির মিচির আওয়াজ তুলছে। একটি দিঘল রাত পেরিয়েছে একেক জনের একেক ভাবে।

দোয়েল গম্ভীর মুখ নিয়ে ব্যাগ গোছাচ্ছে, আড়চোখে একবার বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখলো চড়ুই আগের মতোই বসে আছে আনমনে। দোয়েল এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো বললো..

"কোথায় কি রেখেছিস এনে দে বোন।আমি গুছিয়ে নিচ্ছি সব।"

চড়ুই এবারও শুনলো না। নীরবে তাকিয়ে আছে দোয়েলের দিকে। দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিবিড়। এত করে বোঝানোর পরও দোয়েল আর থাকতে চাইছে না এই বাড়িতে। আহিশ পারছে না দোয়েলের মাথা ফাটিয়ে দিতে। এগিয়ে গিয়ে বাহু ধরে টেনে তুলে তাকে। রাগে বলে ওঠে...

"তোর সমস্যা টা কি বল আমায়। কেন এভাবে চলে যেতে চাইছিস? "

জেসিও এগিয়ে এসে বললো..

"বড় পাখি বাড়ির সবাই ছোটপাখিকে ভুল বুঝছে, তুই তো অন্তত জানিস তা। আর লেখাটা দেখেছিস? ছোট পাখির হাতের লিখার সাথে একটুও মিলে না। আর ওসব বাজে কথা গুলো... আমাদের ছোট পাখি বলতেই পারে না ওসব। ছোট পাখি তুই অন্তত বল ঐ চিঠিটা কে দিয়েছে তোকে, আর তুই সেটা আবির ভাইয়ের হাতেই বা কেন তুলে দিয়েছিস? "

চড়ুই নিশ্চুপ। দোয়েল আবার এগিয়ে এগিয়ে যায় ব্যাগ গোছাতে। হঠাৎই কিছু একটা মাথায় আসতেই চমকে তাকায় সে চড়ুইয়ের দিকে। হাতের জামাটা ফেলে রেখো এগিয়ে যায় চড়ুইয়ের কাছে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে ডাকে...

"ব্ বোন? "

চড়ুই উত্তর দেয় না...

"বোন কথা বল? "

চড়ুই পাখির নীরব ভাব দেখে দোয়েলের মনের ভেতর ভয় বাসা বাঁধে...

"এই বোন, কথা বল আমার সাথে। বোন আ্ আমার কিন্তু ভয় লাগছে, তুই কিছু অন্তত বল। "

দোয়েল ধীরে ধীরে উতলা হতে থাকে, এগিয়ে এসে দু হাতে চড়ুইয়ের মুখটা তুলে নিয়ে বলে..

"বোন, আমার দিকে তাকা, আমার কথা বুঝতে পারছিস না তুই? ক্ কথা বল? চুপ করে থাকিস না বোন, কথা বল তুই, কিছু তো বল। আমার কষ্ট হচ্ছে বোন, তুই কথা বল না? এই বোন?? এই.. "

দোয়েলের চোখ গড়িয়ে পানি পড়ে, বুকের ভেতর ভারী কিছু চাপছে যেন তার, তবে কি আবার সেই ছোট বেলার মতো চড়ুই......

Mr and Mrs Twins Return গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় টুইন রিলেটেড রোমান্টিক গল্প