নভেম্বর রেইন, একটি প্রেমময় মুহুর্ত।প্রেম পায়রা যুগল এই বৃষ্টিটে মন বিলাস করে একে অপরের হাত ধরে। কোটা শাড়ির আচল লেপ্টে থাকে কিশোরীর লতানো শরীরে। সার্থক প্রেমিক তখন ব্যস্ত হয় নারীর দেহের সূক্ষ্ণ ভাজ আড়াল করতে। হাতে হাত নিবদ্ধ রেখে কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে দাঁড়ায় একটি টং দোকানে। গরম ধোঁয়া উঠা চা আর টিন গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির রশ্মি, রাই কিশোরী এক হাতে একটু বৃষ্টির পানি নিয়ে ছিটিয়ে দেয় পাশের পুরুষটিকে, তারপর পুরুষটির কপট রাগ দেখানোর চাহনী, আর তা দেখে কিশোরীর খিলখিল করে হেঁসে ওঠার দৃশ্য।কি মধুর কি মধুর, কিন্তু এই নভেম্বর রেইন আজ দাঁড়িয়ে আছে এক অভিমানের দেওয়াল রুপে।
সন্ধ্যা ঘনিয়েছে প্রায়। দোয়েল মাত্রই ছোটমা আর বাবাকে চা বানিয়ে দিয়ে নিজ রুমে এসেছে। এই নিয়ে চতুর্থ বারের মতো জানালার পর্দাখানা সরিয়ে অদূরে দেখার চেষ্টা চালায়। গেটের বাইরে চায়ের দোকানটায় এখনো আবছা করে দেখা যাচ্ছে হালকা আকাশি রঙা চেক শার্ট পড়া সুঠাম দেহের পুরুষটিকে। বৃষ্টির ঝাপটার কারনে মুখটা স্পষ্ট না হলেও দোয়েল জানে এটা নিবিড়ই।
ও বাড়ি থেকে ফিরে এসেছে আজ তিন দিন পাড় হলো। আজমল, সাবিহারা বেশ কয়েকবার কথা বলেছে তাদের সাথে। কিন্তু নিবিড়ের সাথে যোগাযোগ নেই দোয়েলের। যোগাযোগ নেই বললেও ভুল হবে, চোখের দেখাও এক প্রকার যোগাযোগ। আর সেটা প্রায় প্রতিদিনই হয়ে আসছে।
সেদিনের পর থেকে নিবিড় প্রতিদিন সন্ধ্যায় পাখিদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। দোয়েল যতবারই বারান্দায় যায় ততবারই নিবিড় ইশারায় কানে ধরে ওঠবস করে, হাত জোর করে ক্ষমা চায়। অথচ ছেলেটা কোনো দোষই করে নি।
দোয়েল প্রতিবারই ফিরে আসে বারান্দা থেকে। মন টানলেও মস্তিষ্ক যে বার বার বাঁধা দেয় তাকে। এতটা উপরে চোখ দিতে নেই যে। নিবিড়ের সাথে তাদের যায় না অন্তত।কিন্তু ভালোবাসা কি আর ভেদ বিচার মানে? অরোধিত মন বারবার দেখতে চায় নিবিড়কেই। বারান্দায় গেলে দেখা হয়ে যাবে বলে একটু পর পরই জানালার পর্দা সরিয়ে উঁকি দেয় দোয়েল। এই যে এখনও তাই হচ্ছে।
"কাল রাতে তিনটার দিকে বারান্দায় গিয়েছিলাম আর নিবিড় ভাই আমাকে তুই মনে করে বারবার কান ধরে উঠবস করছিলো। আমিও তোর মতো শান্ত থাকার ভাঙ ধরে ইশারায় বুঝিয়ে দিয়েছি আই লাভ ইউ। বেচারা,চুলে খোপা থাকায় দুর থেকো বুঝতেও পারে নি। "
চড়ুই পাখি শান্ত পরিবেশে বড় সড় একটা বোমা ফাটালো যেন। জানালার দিকে থেকো মুখ ঘুরিয়ে চড়ুইয়ের দিকে গোল গোল করে তাকায় দোয়েল।চড়ুই কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। শুধু মিটিমিটি হাসতে হাসতে হাতের সোপিসটায় রঙ করতে থাকে।
"বোন, তুই পাগল হশে গেছিস? এটা কি করলি? "
"বেশ করেছি। নিবিড় ভাই তোকে ভালোবাসে বোন, আর তুইও যে বাসিস তা আর বলতে হবে না। এই যে একটু পরপর জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখছিস, এসব দেখলেই বোঝা যায়। তা হলে শুধু শুধু উনাকে কষ্ট দিচ্ছিস কেন? "
দোয়েল এবার সরাসরি এসে বসে চড়ুইয়ের সামনে। বুঝিয়ে বলার খাতিরে বলে ওঠে...
"দেখ বোন, আমি মোটেও চাইছি না উনার সাথে আমার... "
"বিয়ে তো একদিন করতেই হবে বোন। "
দোয়েল মুখ নামিয়ে বলে...
"হ্যা, কিন্তু নিবিড়কে না... "
চড়ুই পাখি এবার চোখ ছোট ছোট করে দু হাত কোমড়ে গুঁজে বলে ওঠে...
"তা হলে কাকে করবি? ছোট মার ঐ লাফাঙ্গা ভাগ্নেকে? শুনলাম ওদের সাথে নাকি আমাদের বিয়ে দিবে। শোন বোন, ছোটমা এবার যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে না, আমি কিন্তু বাড়ি থেকে পালাবো,সাথে তুইও। তখন শুধু বলে দেখিস, বোন যা হচ্ছে সবই কপাল,মেনে নে হ্যান ত্যান... এসব বললে না মেরে তোর নাক ফাটিয়ে দেবো আমি বলে রাখলাম। "
দোয়েল চিন্তার মাঝেও হেঁসে দেয়। চড়ুই পাখির কথা গুলোই যে এমন।......
----------
পকেটে থাকা ফোনটা বায়োব্রেট হতেই নিবিড় বের করলো তা। পরিচিত নম্বর দেখে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে রিসিভ করে কানে তুললো তা। বললো....
"তার মানে সত্যি সত্যিই তুই চলে গেলি? "
ওপাশ থেকে আবির কিছু মুহুর্ত চুপ থেকে প্রসঙ্গ পাল্টে বলে...
"কেমন আছিস বল? "
"তিন দিনে কারোর কোনো খোঁজ নিয়েছিস? আম্মু আব্বুকে কত কষ্টে যে ম্যানেজ করে আসছি তা আমিই জানি। কি এমন হয়েছিলো হ্যা যে এভাবে কাউকে কিছু না বলে দেশ ছেড়ে চলে গেলি?এমন কি আমাকেও না। "
আবিরের কন্ঠ একটু গাঢ় হয়, হালকা তেতে বলে ওঠে...
"আরেহ কি করবো আমি বল? ওর একটু কাছে গেলেই ধরা খেয়ে যাচ্ছি, জীবনের প্রথম চুমু খেয়েছিলাম কোনো মেয়েকে, নাকে দিয়েছি তাও বাড়ির সবাই জেনে গেলো। ঠোঁটে চুমু খেয়েছি তাও আম্মু জেনে গেলো পিঠে চুমু খেয়েছি তাও আম্মু জেনে গেলো। মানে ইয়ার আমি বেচে আছি কেন বল? যেভাবেই একটু কাছে যেতে চাই তখনই জানাজানি হয়ে যাচ্ছে। তুইও তো কতবার চুমু খেয়েছিস, ইয়ারর আম্মু তোকে কেন দেখে না? আমাকেই পায় প্রত্যেক সময়? আমিই কেন?? "
নিবিড় হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়, তার হাসির শব্দ শুনে আবির আবার বলে ওঠে...
"তুই হাসছিস? এদিকে আমি টেনশনে আছি, বিয়ের পর বাসর করতে গেলেও যদি জানাজানি হয়ে যায় তো? তখন আমি কি করবো? "
নিবিড় হাসতে হাসতে বলে...
"তোর বাসর ঘরে ক্যামেরা বসানোর দায়িত্ব আমার ভাই.. "
আবির ঘন একটা নিশ্বাস ফেলে বলে ওঠে...
"যাই হোক, কেমন আছিস? "
"কেমন আবার? চা খাচ্ছি, আর সাথে মশার কামড়ও।"
"মশার কামড়? "
"হ্যা, মেয়ে মানুষ আসলে কি চায় বলতো ভাই? "
"ওয়াট হ্যাপেইন্ড?"
"কি আবার, সে দিনের সেই মাইনর একটা কারনে মিস এটম আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। সব কিছু থেকে ব্লক করে দিয়ে বসে আছে। আমিও আর কি, প্রতিদিন সন্ধ্যা টু ভোর সকাল ওদের বাড়ির সামনে বসে থাকি। তাও এটমের মন গলে না। আমার দোষটা কি ছিলো বল তো? আমি তো কিছুই করিনি.. "
"পাখিরা বাড়ি চলে গেছে?"
"হ্যা, তোর যাওয়ার পেছনেই.. "
আবির খানিকক্ষণ চুপ রয়। মনের ভেতর তীব্র আকাঙ্খা দোলা দেয় কিছু অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করার জন্য। কিন্তু আদেও কি এমন প্রশ্ন গুলো মানাবে এই আবির বিন চৌধুরীর মুখে?..
"ও্ ওয়াইফি কেমন আছে? "
নিবিড় নিরবে ঠোঁট চেপে হেঁসে একটু গম্ভীর কন্ঠে বলে...
"ওয়াইফি ডাকছিস কেন? ও তো তোর সম্পর্কে এখন ছোট ভাইয়ের বউ হবে। "
"এখনো হয়নি.. "
"হবে তো একদিন.. "
" যা জিজ্ঞেস করছি বলবি তুই? ও নর্মাল হয়েছে? ক্ কথা বলে? "
"বলে।"
আবির একটু থেমে আবার জিজ্ঞেস করে...
"চিঠিটা ও লিখেনি তাই না? "
"হুম, ইরিন লিখেছে। ছোট পাখিকে বুঝিয়ে সুজিয়ে ওর হাতে ধরিয়ে দিলো তোকে দেওয়ার জন্য।মেয়েটা বুঝতেও পারলো না, ইরিনের কথা মতোই করে গেছে শুধু... "
"ইডিয়েট একটা। "
" তা ঠিক, এত কিছুর পরেও আমাদের কাউকে বলে নি কিছু। এটম শুধু থেকেই জানতো, কিন্তু আমাদের পরিবারে ঝামেলা হবে বলে কিচ্ছু বলে নি। যাই হোক, কবে আসছিস? একা একা ভালো লাগছে না এখানে।"
"একা কোথায় তুই? বাড়িতে সবাই তো আছেই.."
নিবিড়ের কন্ঠ নরম হয়, আলতো করে বলে..
"তোকে ছাড়া কখনো থেকেছি একা? "
"অভ্যাস করে নে। "
একটু থেমেই আবার বললো..
"আমি আর ফিরছি না। বায়..."
কল কেটে দিয়ে আলিশান সোফায় কিছুক্ষণ থ মেরে বসে রইলো আবির। এপার্টমেন্টে আপাতত সে একা। আগে নিবিড়ও থাকতো তার সাথে।
নিউইয়র্ক সময় এখন সকাল সাড়ে ছয়টা। প্রায় সতেরো ঘন্টা জার্নি শেষে আবির কিছুক্ষণ আগেই এপার্টমেন্টে এসে উঠেছে। ফ্লাইটে ঘুমানোর অভ্যাস নেই আবিরের। তাই সকাল হলেও চোখে ঘুম ধরা দিচ্ছে। বেশি কিছু না ভেবেই ফ্রেশ হয়ে গায়ে আরামদায়ক কম্ফর্টার মুড়িয়ে শুয়ে পড়ে আবির।
গুনগুনিয়ে কান্নার আওয়াজ বেশ কানে লাগছে আবিরের৷ ঘুমের মাঝেই অনুভব করছে কেউ কাঁদছে, বিরক্ত হয় আবির, মেয়েটা আবার সেদিনের মতো এসে কান্না জুড়ে দিয়েছে?
বিরক্তিতে ভ্রু যুগল কুঁচকে নেয় আবির। ঘুমের মাঝেই বিরবির করে চড়ুই পাখিকে প্রশ্ন করে...
"কি হলো? কাদছো কেন?"
কানে ভেসে আসে চড়ুইপাখির কান্নার সাথে তুতলিয়ে বলা কথাটি...
"ভ্ ভয় করছে খ্ খুব.."
কম্ফোর্টারের ভেতর থেকে এক হাত বাড়িয়ে দেয় আবির। ঠোঁট নাড়িয়ে আর্জি জানায়...
"কাছে আসো? ভয় পায় না,আমি আছি তো.. "
চড়ুই পাখি বিছানার এক কোনা থেকে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসে আবিরের কাছে,আবিরও তাকে এক হাতে টেনে শুইয়ে দিয়ে নিজের বুকে জড়িয়ে নেয়। অনুভব করে একটা পরিচিত ঘ্রাণ নাকে লাগছে খুব। চড়ুই পাখির শরীরের উষ্ণ ঘ্রাণটা কবে এত পরিচিত হয়ে গেলো তা টেরও পেলো না আবির। মুহুর্তেই এক তীব্র আকাঙ্খা জাগে তার। ঘ্রাণটি আরেকটু কাছ থেকে নিতে ইচ্ছে করছে তার। বিলম্ব না করে আবির মুখটা এগিয়ে নেয় চড়ুই পাখির গলায়, কিন্তু কিছু একটার খোঁচা লাগছে তার। ভ্রু কুঁচকে আসে, এটা কি?
ঘুম ঘুম চোখ মেলতেই ভীষণ রকম ঝটকা খেলো আবির। চড়ুই পাখি নেই তো? আবির দ্রুত নয়নে আশ পাশে তাকিয়ে বিরবিড়িয়ে একবার ডেকে ওঠে..
"ওয়াইফি? আর ইউ হিয়ার?.."
নাহ, চড়ুই পাখির কোনো আওয়াজ আসে না, তবে পাশ থেকে মিহি স্বরে ভেসে আসে...
"মেওও.."
আবির পাশ ফিরে তাকায়। পরিপাটি বিড়ালটির শরীরে হলদে কমলায় মিশেল ঘন লোম, আলোর দ্যুতিতে থেকে থেকে সেই লোমগুলো সোনালী আভা ছড়াচ্ছে। আবির এক হাতে জড়িয়ে পার্সিয়ান বিড়ালটিকে কোলে তুলে নেয়, বিরালটিও শান্ত ভাবে আবিরের কোলে গুটিয়ে নেয় নিজেকে, হ্যা একটু আগে বিড়ালটির নাকের পাশের টান টান গোঁফ গুলোরই খোঁচা লাগছিলো আবিরের। আবির আলতো হেঁসে বিড়ালটিকে জড়িয়ে নিয়ে বললো...
"ইউ নো ওয়াট লিও, বাংলাদেশে আমি তোর মতোই একটা নরম ছানা খুঁজে পেয়েছি। উমম.. নাহ, ও তোর থেকেও বেশি নরম.. "
লিও কি বুঝলো কে জানে, আবিরের কথায় সম্মতি জানিয়ে আবারও 'মিয়াঁওও ' ডেকে ওঠে।
কিছু একটা ভেবেই আবির বালিশের পাশ থেকে ফোন নিয়ে গ্যালারি থেকে একটা ছবি বের করে লিওর মুখের সামনে ধরে বলে...
" see, she is absolutely gorgeous, Isn't she?"
লিও আবারও 'মিয়াঁও ' ডেকে উঠলো। যেন সে আবিরের কথা বেশ বুঝছে, সম্মতিও জানাচ্ছে আবার।
আবির তাকিয়ে থাকে ছবিটার দিকে। চড়ুই পাখির ছবি, জিসানের বিয়ের দিন কনে বিদায়ের সময় যখন মেয়েটা নাক টেনে টেনে কাদছিলো তখনই আবির এই ছবিটা তুলে। ছবিতে চড়ুইয়ের লালছে নাকের ডগায় চোখ যেতেই ঢোক গিলে সে।
লিও নিজের ঘন বাদামী লোম যুক্ত হাতটা ফোনের দিকে বাড়িয়ে দিতে গেলেই আবির দ্রুত ফোনটা সরিয়ে নিয়ে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় লিওর দিকে, লিও যেন বেশ বুঝছে, আবিরের থেকে কিছু শুনার আশায় নিজের সোনালী রঙের মনি যুক্ত চোখ গুলো বড় বড় করে তাকায় আবিরের মুখের দিকে। আবির শীতল কন্ঠে বলে...
"You can see her, but you don't have the right to touch her... "
লিও যেন বেশ অভিমানে মুখ নামিয়ে নেয়। তাকিয়ে থাকে দূর থেকে চড়ুই পাখির ছবিটির দিকে। হঠাৎ আবার মুখ উঁচু করে আবিরের দিকে তাকিয়ে বার কয়েক ডেকে ওঠে। এবারের ডাকটা কোমল নয়, বেশ জোর দিয়েই ডাকে সে। যেন নিজের ভাষায় বোঝাতে চাইছে
"আমি ওকে ছুঁয়েই ছাড়বো। "
আবির ঠোঁট এলিয়ে হেঁসে বলে ওঠে...
"ওকেয়, চ্যালেন্জ এক্সেপটেড..."
লিও আরো একবার ডেকে বুঝিয়ে দেয় যে সেও রাজি।
আবির একটুখন পর কিছু একটা ভেবেই ফোন নিয়ে কাউকে ছোট্ট একটা মেসেজ পাঠায় গুটি গুটি অক্ষরে।
--------
সকালে ঘুম ভাঙতেই আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে চড়ুই। দোয়েল রেডি হচ্ছে ভার্সিটির জন্য। একটু পর পর জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে নিবিড় আছে কিনা দেখতে। দোয়েল জানে একটু পরেই সে চলে যাবে, অফিস টাইমে নিবিড় চাইলেও পারে না এখানে দাড়িয়ে থাকতে। সে চলে গেলেই পাখিরা বের হয় বাড়ি থেকে। চড়ুইকে তাড়া দিয়ে বলে ওঠে দোয়েল..
"ওঠ বোন , রেডি হয়ে নে দ্রুত। আজ প্রথম ক্লাস মিস দেওয়া যাবে না।"
চড়ুইয়ের কানে কথাটা গেলেও মনে যেন গেলো না। নিজের মতো করেই রোজকার নিয়মে পাশ থেকে ফোনটা হাতে নিলো সে। এই ফোনটি আজমল চৌধুরী জিসানের হলুদের আগের দিনই কিনে দিয়েছে। দোয়েলকেও দিয়েছে তবে সে এখনো ব্যবহার করে না সেটা।
নেট চালু করে রেগুলার চেক দিতেই দেখলো মেসেনজারে বেশ কয়োকটি মেসেজ। প্রথমেই চড়ুই হৃদির মেসেজটা চেক দিতেই খুশিতে লাফিয়ে উঠলো সে। চোখে মুখে ঝলক নিয়ে বললো...
" চাচ্চু আসছে বোন। সাথে হৃদিও। "
দোয়েল আয়নায় তাকিয়েই বললো...
"আসছে নয় এসে গেছে। একটু পরেই কলেজে ভর্তি পরিক্ষা আজ। মনে নেই? এক্সাম দিবে ও। "
চড়ুই খুশি হযে বলে...
"চাচ্চু রাজি হয়েছে ওকে এখানে দিতে? "
"হচ্ছিলো না তো। হৃদি কান্নাকাটি করে যা তা অবস্থা। আমিও বুঝিয়ে বললাম চাচ্চুকে। উনি তো থাকার সমস্যার কথা ভেবেই ওকে দিতে চাইছে না। "
"সমস্যা কেন? আমাদের সাথেই থাকবে? "
দোয়েল ফিরে তাকায় চড়ুইয়ের দিকে। আস্তে করে বলে...
"ছোটমা কে চিনিস না? কয়েক দিনের জন্য বেড়াতে আসলেও কেমন মুখ ভোতা করে রাখে, আর যদি শুনে যে দু বছর হৃদি এখানে থাকবে তখন কি হবে ভাব?"
চড়ুই বোকা মনেই বলে উঠলো...
"কিন্তু আব্বু তো হৃদিকে বেশ আদর করে। মানা করবে না নিশ্চয়ই। "
দোয়েল আনমনা হয়ে বলে ওঠে...
"আব্বু তো আমাদের থাকতে দিয়েছে। কিন্তু... "
চড়ুইও মুখ নামিয়ে নেয়। দোয়েল দীর্ঘ এক নিশ্বাস ফেলে বলে ওঠে...
"যাই হোক, চাচ্চুকে বুঝিয়েছি আপাতত এক্সামটা দিক, টিকে গেলে পরেরটা পরে দেখা যাবে। দরকার হলে গার্লস হস্টেলে থাকবে। আমরা তো আছিই আর।"
চড়ুই পাখি আর কিছু বলে না।।মনোযোগ দেয় আবার ফোনে।অপরিচিত একটা আইডি থেকে মেসেজ দেখে একটু অবাক হলো সে। প্রায় এক ঘন্টা আগে মেসেজ এসেছে। হাই হ্যালো কিচ্ছু নাহ,শুধু একটাই মেসেজ....
" Do you like pet?"
চড়ুই ভাবার অবকাশ দিতে চাইলো না।ঠোঁট প্রসারিত করে হেঁসে রিপ্লাই দিলো...
"I love it.."
মেসেজটা সেন্ড করেই মোবাইল ছেড়ে বিছানা থেকে নামলো চড়ুই। রেডি হতে হবে। হঠাৎ কিছু একটা মাথায় আসতেই চোখ বড় বড় করে মাথায় হাত দিয়ে বলে উঠলো...
"এই যাহ, ছোট মা কাল বার বার বলেছিলো সকালে উঠে ফ্লোর ক্লিন করতে। আমিতো..."
দোয়েল উত্তর দেয়...
"আমি করে নিয়েছি। তুই দ্রুত রেডি হয়ে আয় তো। "
--------------
আমেরিকান এসোসিয়েশনে আজ আবার ক্লায়েন্ট মিটিং এ যোগ দিয়েছে টুইনস ব্রাদার্স এর এক জন। ফেইস টু ফেইস এটেন্ড করবে শুনে অনেকেই বহু দূর থেকে হিমসিম খেয়ে ছুটে এসেছে বলতে গেলে। কারন এই টুইন্স ব্রাদার্সের টাইমিং সেন্স প্রখর। একটা সেকেন্ড লেট হলেও মিটিং রুমে ঢুকতে পারবে না। আর সেখানে না থাকা মানে মায়োগ্রেট কম্পানি থেকে একটি বিগ প্রজেক্ট হাত ছাড়া করা।
চার দিকে নীরবতা, প্রজেক্টরে একের পর এক স্লাইড প্রদর্শন করা হচ্ছে, আর বড় বিজনেসম্যানরা নিজেদের প্রজেক্ট বুঝিয়ে বলছে।
হেড চেয়ারে আবির বসে আছে রাজকীয় ভঙ্গিতে। মুখের হাবভাব বোঝার মতো নয়।সব সময়ের গম্ভীর ভাব।তবে দৃষ্টি তার সামনে থাকার কথা থাকলেও সেদিকে নেই। তার দৃষ্টি আটকে আছে টেবিলে রাখা ফোনের দিকে।
প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে ফোনের স্ক্রীন জ্বলে উঠতেই আবির হাতে তুলে নিলো সেটি। দু ঘন্টা পর রিপ্লাই দিয়েছে মেয়েটি। আবির সাথে সাথেই গুটি গুটি হাতে আবার মেসেজ দিলো।তাকে ব্যস্ত দেখে সামনের লোকটি একটু চুপ রইলো। আবির ফোনে দৃষ্টি রেখেই ভারী গলায় বললো...
"কান্টিনিউ মি.আলবার্ট.. "
----
ক্লাসে টাকলু স্যারের পড়ায় কখনোই মন দিতে পারে না চড়ুই। তাই নীরবে ফোন বের করে গেমস খেলছে সে লাস্ট বেঞ্চে বসে। সামনেই আহিশ জেসি আর রাবতি এক টেবিলে। আহিশ ইশারা দিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো..
"ছোট পাখি ডাটা অন কর। "
চড়ুই ঠোঁট চেপে একটু ভেবে বললো..
"হটস্পট দিবি?"
আহিশ রাজি হয়, চড়ুই নেট অন করতেই আহিশের মেসেজ পায়। সে লিখেছে...
"একটা জোড়ে হাঁচি মার তো, পারলে গিফট আছে।"
চড়ুইও টাইপ করে পাঠালো...
"কি গিফট দিবি আগে সেটা বল? "
আহিশ তার উত্তর দেওয়ার আগেই একটা ছবি পাঠালো। সামনের টাকলু স্যারের ছবি। তার মাথাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আহিশ ইডিট করে সেই ফাঁকা জায়গাটায় একটা খেলার মাঠ বানালো।তা দেখেই চড়ুই ফিক করে হেঁসে দিলো।
আহিশ তার নিচে লিখে পাঠালো...
"এই মাঠে ক্রিকেট খেলার সুযোগ করে দিবো তোকে। "
চড়ুইও লিখলো...
"ধুর শালা, এইডায় আমি করমু? "
আহিশ আবার লিখলো...
"আচ্ছা বোইন, ভালো গিফট দিবো,আগে হাঁচিটা মার। তোর হাঁচির সাথে নাক থেকে রসা বেরিয়ে আসলে সেই অযুহাতে স্যার বেরিয়ে যাবে। মার না বোইন.. "
চড়ুই একটা রাগের ইমোজি পাঠিয়ে বলে...
" আল্লাহকে বলে দিছি, তোর জন্য যেন আইক্কাওয়ালা বাঁশ রেডি করে। "
তারপরই আহিশের ইনবক্স থেকে বের হতেই খেয়াল করে সকালের সেই আইডি থেকে আরেকটা মেসেজ...
"why not me? "
চড়ুই সন্দেহ নিয়ে আইডিটার প্রোফাইল চেক করলো, আইডিটায় নাম নেই, শুধু দুটো ডট দেওয়া। তবে ভেতরে চেক করে দেখলো ঠিকানাটা আমেরিকার নিউইয়র্কের। এমন কি ইউনিভার্সিটি থেকে শুরু করে বাকি সবও। একটা বিড়ালের কয়েকটি ছবিও আছে, আশপাশের ব্যাগরাউন্ড দেখে চড়ুই বুঝেই নিলো লোক হোক বা লোকিনি, সে আমেরিকার মানুষ।
মিচকে হেঁসে চড়ুই শুদ্ধ বাংলায় টাইপ করলো...
"কারন আমি শুধু আমার জামাইকে ভালোবাসবো। হিহিহি.."
এই কথার প্রেক্ষিতে কোনো উত্তর এলো না। তবে সাথে সাথেই সেই আইডি থেকে আরেকটা মেসেজ এলো...
" how old are you baby girl? "
চড়ুই এবারও দুষ্টুমির ছলে বাংলায় লিখে পাঠালো...
" আপনি কি মেয়ে? সমকামী? আসেন আসেন, আপনাকে খেয়ে দিই.. আমি কিন্তু দেখতে ওয়াও ওয়াও.. "
"What are you talking about? "
চড়ুই এবার পারছে না শব্দ করে হেঁসে উঠতে৷ শা'লার আমেরিকান। তুই যতই আমেরিকান হোস না কেন? বাঙালির কথা বুঝতে পারবি না। চড়ুই আবারো টাইপ করলো...
"আমি কি বলছি তা আপনি বুঝতে পারবেন না। কারন আপনি হচ্ছেন আমেরিকান ইন্দুর। শা'লার ভোঁদাই, মদন কোথাকার। ভাষা না বুঝলে মেসেজ দাও কেন সোনা? চুলকায় হ্যা? আসো তোমাকে একটু চুলকে দিই, সাথে বান্দরের শলাও লাগিয়ে দিই... "
প্রায় দু মিনিট হলো অপর পাশের ব্যাক্তিটি সীন করেছে। তবে কোনো উত্তর আসে নি। চড়ুই এবার মুখে হাত চেপেই হেঁসে উঠলো। আচ্ছা করে দিয়েছে ব্যাটাকে। তখনই আবার ওপাশ থেকে মেসেজ এলো। এইবার অবাক করে দিয়ে ওপাশ থেকেও বাংলাতেই মেসেজ এলো...
"আমি বাংলা ভাষা লিখতে, পড়তে, বলতে এবল বুঝতেও পারি। মাই লিওর আম্মু.."
ব্যস হাওয়া ফুরিয়ে গেলো চড়ুইয়ের। তার মানে এতক্ষণ সে যা যা বলেছে অপর পাশের ব্যক্তিটা সব বুঝে ফেলেছে? ইশশশ। চড়ুই দ্রুত হাতে নিজের মেসেজ আনসেন্ট করতে গেলেই আবার মেসেজ আসে...
"এখন ভোঁদাইয়ের মতো মেসেজ ডিলিট করবে সোনা? লাভ নেই লাভ নেই, আমি তো সব পড়েই ফেলেছি। এখন আরেক ভোদাইকে বলো স্যারের মাথায় খেলার মাঠ না বানিয়ে নিজের লুঙ্গির গিট্টু সামলাতে।"
চড়ুই বোকার মাথায় এটা এলো না লোকটা স্যারের টাকলু মাথায় খেলার মাঠের কথা জানলো কি করে, তবে এত টুকু ঠিকই এলো যে সে আহিশের কথা বলছে। তাই বোকার মতো টাইপ করলো...
"কিন্তু আহিশ তো প্যান্ট পড়ে আছে। লুঙ্গি নেই তো? "
"ওহ, তাহলে এখন থেকে পড়ার অভ্যাস করতে বলো। কারন সে যা শুরু করেছে তার জন্য কখন আবার ছোট বেলার মতো ইয়ে কাটতে হয় তার তো কোনো গ্যারান্টি নেই। তখন তো ডাক্তার কেটেছে এখন না হয় আমিই কাটবো, নতুন কুড়াল দিয়ে"
চড়ুইও বুঝদার ব্যক্তির মতো উত্তর দিলো..
"আচ্ছা বলছি.. "
তারপর আহিশের কাঁধে টোকা মারে সে। আহিশ পেছনে ফিরে তাকাতেই চড়ুই ফিসফিসিয়ে ওকে বললো...
"তোকে বলেছে এখন থেকে লুঙ্গি পড়ার অভ্যাস করতে। তোর নাকি আবার ছোট বেলার মতো ইয়ে কেটে ফেলবে। তাও আবার ব্লে'ড দিয়ে না ডিরেক্ট কুড়াল দিয়ে.... "