Mr and Mrs Twins Return

পর্ব - ২৯

🟢

রুমটার ভেতর শুনশান নীরবতা। আবির দু হাটুতে হাত ভর দিয়ে মাথা নুইয়ে বসে আছে বিছানায়। সামনেই সাবিহা বুকে হাত গুঁজে তার দিকেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে। এই নিয়ে দ্বিতীয় বারের মতো একই প্রশ্ন করলেন তিনি...

"আমার প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছি না কেন আবির? ছোট পাখিকে কেন তুই নিয়ে এসেছিস? নিবিড়ের সাথে দিস নি কেন? "

আবির আবারও উত্তর দিলো..

"বললাম তো এমনিই.."

কন্ঠের রেশ এবার একটু জোরেই ছিলো তার। বিছানায় ঘুমন্ত চড়ুই একটু মুখ কুঁচকে নড়েচড়ে উঠলো। এক পাশ ঘুরে আনমনেই পেছন থেকে আবিরের কোমড়ের দিকে গেঞ্জিটা মুঠ করো ধরলো। সাবিহা সেদিকে একবার তাকিয়ে আবিরকে বলে উঠলো...

"ওর থেকে দূরে থাকতে বলেছি তোকে..."

আবির পেছন ফিরে চড়ুইয়ের বদ্ধ হাতের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো..

"এটাও কি আমার দোষ? "

সাবিহার কাছে উত্তর নেই। তাই কথার প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করলো...

"তা রাগ নিয়ে তো গিয়েছিলি, এখন হুট করে দেশে ফিরার কারন? তোর বাবা খোঁজ নিয়ে জানলো তুই নাকি ইমিডিয়েট টিকিট কেটে এসেছিস? কি এত জরুরি ছিলো দেশে? "

আবিরের ভেতরটা যেন এর উত্তর আজ সহজেই পেয়ে গেলো। চড়ুই পাখিকে দেখতে এসেছে সে। দূরে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না বলেই এসেছে৷ কিন্তু এই কথা আম্মুকে কি করে বলে?

আবির চুপ রয়, সাবিহাও অপেক্ষা করে আবিরের উত্তরের। নীরবতা ভেঙে দরজার দিক থেকে লিও ডেকে উঠলো। তাকে দেখেই আবির হাতের ইশারায় কাছে ডাকলো। লিও শান্ত বাচ্চার মতো এসে আবিরের পায়ের কাছে দাঁড়াতেই আবির এক হাতে তাকে কোলে তুলে নিলো। সাবিহা জিজ্ঞেস করলো ...

"হঠাৎ ওকে দেশে আনার কারন? "

আবির একটু ভেবে বললো...

"ওয়াইফি চেয়েছিলো। এখন থেকে ওর সাথেই থাকবে লিও। "

সাবিহাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে লিওকে চড়ুইপাখির মুখের সামনে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো...

"ডু ইউ নো হার? "

লিও মিয়াওও করে ডাকলো, বুঝালো সে চেনে চড়ুই পাখিকে।আবির হাসলো আলতো, আবার লিওর সাথে নিজের মতো কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে বললো...

"সি ইস ইউর মাম্মাহ।ওকেয়? "

লিও আবারও ডাকলো মিয়াওওও করে।

"নেভার হার্ট হার। সি অলসো সফ্ট লাইক ইউ। "

লিও ও ডেকে সম্মতি জানালো যেন।

"ওর কাছে যাও। "

বলেই লিওকে বিছানায় নামিয়ে দিলে লিও একদম চড়ুইয়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পরে শান্ত বাচ্চার মতো। আবির এবার একটু ঝুঁকে আস্তে আস্তে লিওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে..

"রিমেম্বার, সি ইজ ওনলি মাই প্রপার্টি, আই গ্র্যান্ট ইউ দা পার্মিশন টু টাচ হার, বাট নট এনি ব্যাডলি টাচ ওকেয়? "

লিও কি বুঝলো কে জানে? আবিরের কথা মনোযোগ সহকারে শুনা শেষ হলে মাথা নামিয়ে চড়ুইয়ের হাতের কাছেই বসে থাকে সে কোনো নড়চড় ছাড়া।

সাবিহা একটু কন্ঠ উঁচু করে ডেকে ওঠে...

"আবির.."

আবির দ্রুত সরে আসে লিওর কাছ থেকে। আর কিছু না বলেই রুম ত্যাগ করে সে। সাবিহা তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে ভাবতে থাকে কি করে এই ছেলেটার গতি করা যায়।

----------

"বাড়ি থেকে পালাতে গিয়ে ধরা খেয়ে গেছিলাম বুঝলেন নিবিড় ভাইয়া, তাই বেঁধে রেখেছিলো ছোট মা।"

সাবিহা নিজ হাতে খাবার তুলে দিচ্ছে চড়ুইয়ের মুখে। আর চড়ুই নিজের ক্যানোলা যুক্ত হাতটা নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখতে দেখতেই উত্তর দিলো নিবিড়ের প্রশ্নের৷ কিন্তু এমন উত্তর উপস্থিত কেউই আশা করেনি যেন। নিবিড়ের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো, যদি সত্যিই এমন টা হয় তাহলে তো কোনো সলিড প্রমানই থাকবে না কেসটা চালিয়ে যাওয়ার। আহিশ এগিয়ে এসে এক হাটু ভাজ করে বসে চড়ুইয়ের পাশে।জিজ্ঞেস করে...

"ছোট পাখি, ঠিক করে বলতো কি হয়েছে? "

চড়ুই সাবিহার হাত থেকে আরেক লোকমা মুখে পুড়ে কৃতজ্ঞতার সহীন আপন মনেই বলে উঠলো..

"খুব খিদে পেয়েছিলো গো আম্মু, খিদের চোটে মাথা ঘুরছিলো আমার জানো?"

সাবিহা করুন চোখে তাকায় চড়ুইয়ের দিকে। কতটা,সরল মনে কথা গুলো বলছে সে। চড়ুই এবার বলে..

"ছোটমা তার ভাইয়ের ছেলে দুটোর সাথে আমাদের বিয়ে ঠিক করেছে। অসভ্য গুলোকে একটুও সহ্য হয় না আমার। ঐ যে যাদের থেকে দূরে থাকার জন্য তোমাদের বাড়িতে এসেছিলাম, ওরাই।

আমরা জানি ছোট মা বা বাবাকে বুঝিয়েও লাভ নেই। তাই ঠিক করেছি পালাবো বাড়ি থেকে। কিন্তু ধরা খেয়ে গেছি ঐ সময়ই।"

নিবিড় ঠোঁট গোল করে নিশ্বাস ফেললো।যাক ইহা একটা প্রমাণ হতেই পারে। জিজ্ঞেস করলো..

"তার পর? "

"তারপর আর কি, আমার আর বোনের ফোন নিয়ে গেলো। "

নিবিড় বলে..

"আমি তো তোমাদের হাত পা বাধা অবস্থায় পেয়েছিলাম।"

চড়ুই স্বাভাবিক কন্ঠে বলে..

"ওহ ওটা? হ্যা আমরা আবার পালিয়ে যাবো বলে ছোট মা আমাদের দু বোনকে দুই রুমে বেঁধে রেখেছে। বলেছে যতক্ষণ না তারা ফিরবে আমরা বাঁধা অবস্থায়ই থাকবো। তারপর কোথায় চলে গেলো কে জানে। আর আসেনি। আমাদের একটু খাবার বা পানিও দিয়ে যায় নি জানো? আমি এতটা সময় বেঁচে আছি কি করে বলোতো? "

সাবিহা করুন চোখে তাকিয়ে থাকে মেয়েটার দিকে। কত সরল মনে সে কথা গুলো বলছে, অথচ কি ভয়াবহ অবস্থা হয়েছিলো দু জনের তা কল্পনা করতে গেলেও শরীরে কাটা দিয়ে ওঠে সবার। দরজার আড়ালে দাড়িয়ে থাকা আবিরের হাত মুষ্টি বদ্ধ হয়ে যায়। আরো একটি প্রাণ নাশের নেশা চেপে ধরে মাথায় তার।কিন্তু......

-------

দোয়েল বিছানার বোর্ডে হেলান দিয়ে বসে। নিবিড়কে রুমে আসতে দেখে একটু নড়েচড়ে বসলো সে। নিবিড় এগিয়ে এসেই কাটা ফলের প্লেটটা টেবিলে রাখলো। জানালার দিকে এগিয়ে গিয়ে পর্দাটা সরানোর সময় পেছন থেকে দোয়েল আর্জি জানায়....

"বোনের কাছে যাবো আমি।"

নিবিড় এগিয়ে আসে। ফলের প্লেটটা হাতে তুলে নিয়ে বলে...

"আগে এগুলো শেষ করো, তারপর। হা করো?"

মুখের সামনে আপেল ধরে আছে নিবিড়। দোয়েল নীরবে তাকিয়ে তার দিকে। নিবিড় আবার চোখের ইশারা দিতেই দোয়েল আপেলের টুকরোটি মুখে পুরে নিলো।

"আমার আরো আগেই তোমার কাছে যাওয়া উচিৎ ছিলো। পারি নি আমি। "

নিবিড়ের কথার মানে বুঝতে একটু সময় লাগলো দোয়েলের।বুঝতে পেরেই আস্তে করে বললো...

"আপনার কোনো দোষ নেই, আমাদের ভাগ্যটাই এমন।"

নিবিড় চোখ তুলে তাকায় দোয়েলের দিকে। দৃঢ় কন্ঠে বলে...

"স্থান পরিবর্তন হয়েছে, উপরওয়ালা চাইলে ভাগ্যটাও পরিবর্তন হবে এবার। "

" বোনের কান্ডিশন ভালো থাকলে আমরা আজই চলে যাবো।"

নিবিড়ের হাত থেমে যায়।মেয়েটার উপর যথেষ্ট রাগ আসছে তার। এত্তো বেশি বুঝে সে, কি বলবে আর।চুপ রয় নিবিড়। দোয়েল খেতে না চাইলেও প্লেটের সব গুলো ফল তাকে খাইয়েই ছাড়লো নিবিড়।তারপর ধীরে সুস্থে ধরে বিছানা থেকে নামাতে নামাতে জিজ্ঞেস করে..

"হাতে কি খুব ব্যথা করছে? "

দোয়েল আস্তে করে উত্তর দেয়..

"কিছুটা।"

"বিয়ের জন্য প্রেশার দিচ্ছিলো, একটা বার জানালেও তো পারতে।"

দোয়েল মুখ তুলে তাকায় নিবিড়ের দিকে। তারপর আবার মুখ নামিয়ে হাটা ধরে। চড়ুইয়ের রুমে এসে দেখলো তারও একই অবস্থা। আহিশ আর জেসি মিলে ঠেসে ঠুসে খাওয়াচ্ছে তাকে। দোয়েল এসে বিছানার এক কোনে বসতেই কম্বলের ভেতর থেকে লিও ডেকে উঠলো। কারন দোয়েল খেয়াল না করেই লিওর পায়ের উপর বসতে নিচ্ছিলো। লিও ডেকে উঠে কম্বলের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে চড়ুইয়ের কোলের উপর ঠাই নিলো। চড়ুই চমকায়, এতক্ষণ যে তার পাশে বিড়ালটা শান্ত শিষ্ট হয়ে বসে ছিলো তা খেয়ালই করে নি সে। এইবার ভালো করে নজর দিতেই অবাক হয় সে। বলে ওঠে...

"ও মাই লিও, ও এখানে কি করে? মনে হয় আমাকে দেখতে আমেরিকা থেকে চলে এসেছে। "

চড়ুই ব্যস্ত হয় লিও কে আদর করতে। তার কথার প্রেক্ষিতে দরজার দিক থেকে পুরুষালি কন্ঠ ভেসে আসে..

"দেখতে লিও আসে নি, লিও'র বাপ এসেছে।"

চড়ুই লিও কে পেয়ে এতটাই খুশি যে এই মুহুর্তে কে তার কথার উত্তর দিচ্ছে সেদিকে না তাকিয়েই আপন মনে বলে ওঠে...

"ওহ, লিও'র বাপ ও আছে? আমি তো ভেবেছিলাম ও শুধু আমারই বাচ্চা। "

আবির হাফ ছাড়ে, বলে উঠে...

"হ্যা, উইদাউট ইটিস পিটিসে তুমি বাচ্চা পয়দা করেছো তো। "

চড়ুই ভাবুক হয়ে বলে..

"তাহলে লিও'র জন্মও ইটিস পিটিস করেই হয়েছে।কিন্তু ইটিস পিটিস করে কিভাবে? "

আবির দরজার পাশেই হেলান দিয়ে দাঁড়ানো অবস্থায় জিজ্ঞেস করে...

"আসবো? করে দেখাবো তোমার সাথে ইটিস পিটিস?"

চড়ুই ভ্রু কুঁচকে তাকায় এবার কথার উৎস খুঁজতে। প্রথমেই সামনে নিবিড়ের দিকে চোখ পড়তেই দেখে নিবিড় মিটিমিটি হাসছে। পরক্ষণেই তার পেছনে আবিরের দিকে চোখ পড়তেই থমকে যায় চড়ুই।

সরল দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে থাকে আবিরের মুখের দিকে। ঠিক কতগুলো দিন পর সে এই লোকটাকে দেখছে? তার এমন মনে হচ্ছে যেন বহু অপেক্ষার ফসল তার সামনে দাঁড়িয়ে। চড়ুই পাখি কি তাহলে নিজের অজান্তেই তার দানাবলটাকে মিস করেছে এই ক'টা দিন?

চড়ুই মুখ ফিরিয়ে নেয় আবিরের থেকে অভিমানে। অতীতের কথা গুলো ভুলে যায়নি সে। নিজের মনেই নিজে প্রতিজ্ঞ বদ্ধ হয়েছে, এই লোকটার সাথে আড়ি। কোনো কথা নেই তার। কিন্তু অনুভুতি গুলো এমন কেন?

চড়ুই চোখ তুলে তাকায় দোয়েলের দিকে। নিজের মনের খবর সে বুঝতে পারে না, তাই জানার আগ্রহ নিয়েই দোয়েলকে বলে...

"বোন? দানাবলকে দেখার পর আমার বুকটা ধুকধুক করছে। "

উপস্থিত সবাই চমকায়। দোয়েলের দৃষ্টি আপনা আপনিই চলে যায় নিবিড়ের দিকে। ঠিক এমন অনুভুতিই তো হয় যখন সে অনেক সময় পর নিবিড়কে দেখে। তাহলে কি?

জেসি চড়ুইয়ের কাঁধে হাত রেখে বলে..

"কি বলছিস পাখি?"

চড়ুই চোখ গোল গোল করে সামনে তাকিয়েই এক প্রকার ঘন নিশ্বাস নিতে নিতে বললো...

"হ্যা, মনে হচ্ছে যেন আমি উনাকে অনেক মিস করেছি। কিন্তু কখন? "

নিবিড় পেছনে ঘুরে তাকায় আবিরের দিকে। ছেলেটার ভাব গতি বোঝা দায়। কি এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে চড়ুইয়ের দিকেই। অসময়ে এমন একখানা কথা যে সে মোটেও আশা করে নি। একদমই নয়। এত বিশাল দেহি আবিরেরও মনে হতে লাগলো যেন সে হাওয়ায় উড়ছে। এমন কেন লাগছে তার, এতটা কেন সুখ দেখছে সে? ইশশ, মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মূল্যবান কথাটা সে শুনে ফেলেছে।

কি ভেবে যেন আবির ছুটে গেলো নিজের ঘরের দিকে। নিবিড় ভাবে তার মনোভাব কি হতে পারে? কিন্তু বুঝে পায় না। এদিকে দোয়েল ভীত চোখে তাকিয়ে আছে নিবিড়ের দিকে। তার ভয় হচ্ছে খুব, তার বোনটাকে নিয়ে ভয় হচ্ছে।

নিবিড়ের প্রতি নিজের অনুভুতি গুলো যে ঠিক কিভাবে দোয়েল চেপে আছে, তার যন্ত্রণাটা তো দোয়েলই জানে শুধু। এতো অসহ্য যন্ত্রণা বোন সইবে কি করে? ভালোবাসা যে বিষ, তার জ্বালা তো তার কোমল অবুজ বোনটা সইতে পারবে না। আবির যে তাকে দু চোখে দেখতে পারে না। এমন অনুভুতি যে ভুল পথে যাচ্ছে।

-------

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের সময় চলমান। নিবিড় একবার আবিরের মনোভাব বুঝতে চাইলো। তাই নিজেকে প্রস্তুত করে এগিয়ে গেলো আবিরের ঘরের দিকে। হয়তো এতক্ষণে পুরো রুম তছনছ করে রেখেছে সে।

বুকে সাহস নিয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে উঁকি দিতেই চোখে পড়লো আবির জায়নামাজে বসে নামাজ আদায় করছে। মাথায় শুভ্র টুপির ভীড়ে হালকা চুল কয়েক গোছা উড়ছে তার। চোখে মুখে চাকচিক্য ফুটে রয়েছে তার।

নিবিড় সবটা বুঝে যায়, ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে ওঠে তার। আবির আল্লাহর কাছে যে শুকরিয়া আদায় করছে এত বিশাল প্রাপ্তির জন্য। বুকটা ভরে ওঠে নিবিড়ের। না দেখার মতোই দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে সে রওনা দেয় মায়ের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যেই কারোর গুনগুনিয়ে কান্নার আওয়াজ পেয়ে থেমে যায় তার পা। শব্দের উৎস খুঁজতে খুঁজতে দোয়েলের ঘরের সামনে এসে থামে সে।

ও কাঁদছে? কিন্তু কেন?

নিবিড় দ্রুত হস্তে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখে দোয়েল জায়নামাজে মাথা ঠেকিয়ে কাঁদছে। কান্নার ফলে তার শরীরটা বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছে। নিবিড় ছুটে যায়...

"এটম? কি হয়েছে তোমার? ব্যাথা পেয়েছো কোথাও কাঁদছো কেন? "

এগিয়ে গিয়ে তুলে ধরে দোয়েলকে। তার কান্না ভেজা চোখ দুটো নিবিড়ের বুকে ছুরিকাঘাতে সিক্ত

করে দিচ্ছে যেন। এক হাতে আগলে ধরে দোয়েলের চোখের পানি মুছিয়ে দেয় সে, উদ্বিগ্ন কন্ঠে সুধায়...

"এই পাখি? কি হলো? নামাজে বসে কাঁদছো কেন? আমায় বলো বা প্লিজ? "

দোয়েল কান্নার তোপে ভেঙে পড়ে। বুকের ভেতর জমাটবদ্ধ কথা গুলো বলার মতো কেউ যে নেই ওর, আর আর সে নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। এই যে একটা শক্ত আশ্রয়স্থলের মতো লোকটা নিজের বুকে ঠাই দিয়েছে দোয়েলকে, ছায়ার মতো দু হাতে আগলে রেখেছে, এই লোকটাকে আজ নিজের ভিষণ আপন মনে হলো তার। ইচ্ছে হলো একটু কিছু বলুক, ভার হয়ে থাকা বুকটা একটু হালকা করার লোভ আর আটকাইতে পারে নি দোয়েল। কাঁদতে কাঁদতে বলে ওঠে...

"আমার বোনটা ফেঁসে যাচ্ছে নিবিড় ভাইয়া। ভালোবাসার জ্বালে ফেঁসে যাচ্ছে ও। ও অপূর্ণতার সাগরে ডুবে যাবে, এত কষ্ট আমার বোনটা সহ্য করতে পারবে না। ভালোবাসা না পাওয়ার যন্ত্রণা ও সইতে পারবে না কখনো। আল্লাহ কেন ভুল মানুষের প্রতি ওর অনুভূতি জন্ম দিচ্ছে? কেন আল্লাহ আমাদের একটু সুখ সহ্য করতে পারছে না। আর কত সইবে আমার বোনটা, আর কত? "

নিবিড় স্তব্ধ হয়ে যায়।চড়ুই পাখির ঐ একটি কথার পর থেকে যে দোয়েল দম বন্ধকর পরিস্থিতি পাড় করছে তা তো বুঝতেও পারলো না কেউ।এতো ভয়, এত সংকোচ মেয়েটা বুকে রাখছে কেন? সে কি ভালোবাসা বোঝে না? সে কি ভালোবাসে না নিবিড়কে? নিবিড়ের অনুভুতি কি তবে এক পাক্ষিক?

"ও নিবিড় ভাই, আমি বোনকে বোঝাবো কি করে বলুন না? আমি কি করে ওর অনুভুতির মাঝে দেওয়াল তুলবো? আবির ভাই তো ওকে সহ্যই করতে পারে না, আমার বোনটা যে খুব কষ্ট পাবে। এমন মেঘে মৃত্তিকায় ভালোবাসা যে ভুল?"

নিবিড় একদম শান্ত হয়ে যায়। তীব্র ঝড়ের দোটানায় সেও যে এক কূল হারা তরী। তাদের গল্পটা এত টানাপোড়েনে কেন পড়লো? কেন কেউ অপর দিকের মানুষটার অনুভূতি বুঝতে পারে না, কেন তারা সম্মতি দিতে চায় না? কেন? এই দুটো জোড়ার ভালোবাসা কি আসলেই মেঘে মৃত্তিকায় হয়ে গেলো?...

ভেবে পায় না নিবিড়, নিজেকে বোঝানোর মতো কোনো সঙ্গা খুঁজে পায় না সে। কিন্তু শান্ত ও তুরগ বুদ্ধিদীপ্ত ছেলেটি এই মুহুর্তে নিজের ধ্যান হারালো না। ভালোবাসা প্রকাশ না হোক,ভালোবাসার মানুষটিকে ভালো রাখার দায়িত্ব যে সে নিয়েছে নিজ ইচ্ছায়।সেই দায়িত্ব কিভাবে অবহেলা করে সে?

দু হাতে আগলে নেয় দোয়েলকে। নিজের বুকের সাথে আরেকটু চেপে ধরে শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে...

"নামাজ সম্পূর্ণ করেছো? "

দোয়েল হেঁচকি তুলতে তুলতেই উপর নিচ মাথা ঝাকায়। তা দেখেই নিবিড় আর অপেক্ষা করে না, পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় বসায় দোয়েলকে। আরো একবার নিজের হাতের পৃষ্ঠ দিয়ে দোয়েলের চোখ দুটি মুছে দিয়ে এক হাত আগলে ধরে সে। চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে...

" কে বলেছে ছোট পাখির অনুভূতি ভুল মানুষের জন্য জন্মেছে?"

দোয়েল করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে..

"আবির ভাইয়া যে ওকে একদম সহ্য করতে পারে না। "

নিবিড় নিরবে নিজের হাতে থাকা দোয়েলের হাতের পৃষ্ঠে চুমু খায়, শীতল কন্ঠে জিজ্ঞেস করে...

"আমায় ভালোবাসো তুমি? "

থমকে যায় দোয়েল। এই প্রশ্নটার উত্তর যে সে জানে। কিন্তু তা নিবিড়কে বলা যাবে না কখনোই। তাদের সাথে যে পাখিদের যায় না। নিবিড় অপেক্ষা করে দোয়েলের উত্তরের। কিন্তু নীরবতা ছাড়া আর কিছুই পায় না সে।

দোয়েল এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নিবিড়ের পানে। কত কিছু বলার আছে, কিন্তু পরিস্থিতিটা নেই। দোয়েল যে ভীষণ বুঝদার মেয়ে। বুঝে শুনে কি করে নিজেও ভালোবাসার জালে ফাঁসবে? কেন শুধু শুধু নিবিড়কে আসকারা দেবে?

নিবিড়ের হাতের বাঁধন আটেকটু দৃঢ় হয়। হুশিয়ারি স্বরে বলে ওঠে সে..

"I can read you every thinks, your eyes, nose, lips, tiars... Also your heart. "

কেঁপে ওঠে দোয়েল। নিবিড় তাকে কি বোঝাতে চাইছে? কেনই বা এতটা উতলা হচ্ছে সে?

নিবিড় দৃষ্টি নামিয়ে নেয়, আলতো করে অনুমতি ছাড়াই আরো একবার ঠোঁট ছোয়ায় দোয়েলের হাতে। তারপর নীরবে সেই হাতে নিজের নাক ঘষতে ঘষতে বলে...

" ভাই নামাজ পড়ে শুকরিয়া আদায় করছে এটম। কেন জানো? কারন ভাই যাকে ভালোবাসে, সেও ভাইকে অনুভব করে। নিজ থেকেই অনুভব করে। "

দোয়েল অবয়ক হয়, ভাঙা কন্ঠে বলতে নেয়...

"কিন্তু আবির ভাই তো বোনকে সহ্যই করতে পারে না.."

"পারতো না, কিন্তু এখন সে ভালোবাসে ছোট পাখিকে। হুট করে এতদিন পরে ইউএসএ থেকে ছুটে এসেছে কেন জানো? ছোটপাখির সাথে দু দিন কোনো প্রকার যোগাযোগ করতে পারছিলো না বলে। ভাই দূরে গিয়ে রিয়েলাইজ করছে সে ভালোবাসে, বিরক্তিকর মনে করা মেয়েটাকেই সে মন থেকে ভালোবাসে। "

"কিন্তু... "

"ভাই আজ না চেয়েও নিজের ভালোবাসার সম্মতি পেয়ে গেলো। আমি কবে মোনাজাতে ভাইয়ের মতো করে নিজের ভালোবাসা পাওয়ার শুকরিয়া আদায় করবো, মিস এটম?"

Mr and Mrs Twins Return গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় টুইন রিলেটেড রোমান্টিক গল্প