Mr and Mrs Twins Return

পর্ব - ৩০

🟢

চৌধুরী বাড়ির ফটকে আজ একটু বেশিই শোরগোল। পাখিদের বাবা আর ছোটমা এসেছেন পুলিশ নিয়ে। অভিযোগ তুলেছেন তাদের মেয়েদের অপহরণ করে নিয়ে আসা হয়েছে বলে। চৌধুরী বাড়ির নাম যসের কারনে আর টুইনস ব্রাদার্সের পরিচিত হওয়ার কারনে পুলিশ অফিসার আহসান বরাবরই ভদ্রতা বজায় রাখছেন। সাবিহা অনুরোধ করেছে বাড়ির কর্তারা আসার অপেক্ষা করতে। আজমলদেরও খবর দেওয়া হয়েছে, তারা আসছে। এই স্থিরতা অফিসার আহসান আর পাখিদের বাবা আজিজ রাহমান মেনে নিলেও চিল্লাফাল্লা করছে তাদের ছোট মা।

-----

মিডিয়াম অডিও স্পিকারে কড়া আওয়াজে গান বাজছে। তারই তালে তালে হাত পা ছড়িয়ে নাচছে স্বয়ং আবির বিন চৌধুরী। আজ তার মুখে চকচকে হাসি। অফিস, মিটিং সব ছেড়ে নাচছেই সে। খুশির কারনটা মুখে বলে প্রকাশ করার মতো নয়। কিন্তু সে প্রচন্ড খুশি। কিছু মুহুর্তের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপের কথাও ভাবছে না সে। কিছুটা সময় তার নিজের জন্য থাক। নাচার সাথে সাথে একটু পর পর আনন্দে চিল্লাচ্ছেও সে।

তীব্র আওয়াজের কারনে দরজায় কড়াঘাতের শব্দটাও শুনতে পায়নি আবির। নাচতে নাচতে পেছনে ঘুরতেই দেখলো আহিশ দাঁড়িয়ে দরজা বরাবর। থেমে যায় আবির, এতক্ষণের হাসি হাসি মুখটা মুহুর্তেই গম্ভীর হয়ে যায়। রিমোট নিয়ে স্পিকার অফ করে জিজ্ঞেস করে..

"কি চাই? "

আহিশ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে...

"তুই এমন নাচছিস কোন খুশিতে? "

আবির নিজের গালের ভেতর একবার দক্ষ ভাবে জিহ্বা ঘুরিয়ে নেয়, তারপর সামনে আহিশের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বাঁকা হেঁসে বলে...

"কারন তোর ভালোবাসার মানুষ খুব শিগগির আমার হতে যাচ্ছে। "

আহিশ ভ্রু কুঁচকায়। আবির ভাই বরাবরই বিপদ নিয়ে খেলতে পছন্দ করে। এমন কিছু করা তার পক্ষে অসম্ভব নয়।কিন্তু হৃদের সাথে কি আবির ভাইয়ের যোগাযোগ আছে কোনো ভাবে? আর থাকলেও হৃদ কম করে হলেও আবির ভাইয়ের থেকে দশ - এগারো বছরের ছোট হবে। যেখানে আবির ভাই চড়াইকেই মেনে নিতে পারে না সেখানে হৃদ আসাটা নিছকই মজা মনে হলো আহিশের কাছে। আবির ভাই হেয়ালি করেই বলছে ভেবে আহিশও একটা শয়তানি হাসি দিয়ে বললো...

"হুমম,দেখা যাক, কে কার হবে। এখন মন চাইলে একটু নিচে আয়। "

"হোয়াই?"

"পুলিশ এসেছে, অফিসার আহসান তোদের দু জনের কথা জিজ্ঞেস করছিলো, আছিস কি না।"

আবির ভ্রু কুঁচকায়, জিজ্ঞেস করে..

"এই সময় অফিসার আহসান এখানে কেন? "

"পাখিদের বাবা মা নিয়ে এসেছে। বড় আব্বুর নামে তারা কেইস ফাইল করেছে, বড় আব্বু নাকি পাখিদের জোর করে বাড়ি থেকে তুলে এনেছে। "

আবিরের ভ্রু শিথিল হয়, তীর্যক হেঁসে বাইরের দিকে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলে..

"চলো,সো কল্ড শশুর শাশুড়ীর সাথে সাক্ষাৎটা করেই আসি।"

আবিরের কথা আহিশের কানে যায় না।রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে...

"তুই যা, আমি পাখিদের নিয়ে আসছি৷ "

আবির কিছু বলে না এগিয়ে যায় ড্রয়িং এর দিকে।

সিঁড়ি বেয়ে আবিরকে নামতে দেখেই অফিসার আহসান এগিয়ে গিয়ে হাত মেলায়। আড় চোখে একবার আবিরকে পর্যবেক্ষণও করে নেয় তিনি। পড়নে তার সাদা টু কোয়াটার প্যান্ট আর ছাই রঙা ট্যাংক টপ। হাতের মাসাল গুলো হালকা ফুলে আছে তার। দু হাত আবার পকেটে গুঁজে ধীর কদমে এগিয়ে এসে বসে সোফায়। ঘাড় কাত করে পেছনে সাবিহার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে...

"আব্বু কি আসছে? "

সাবিহা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। আবির আবার জিজ্ঞেস করে...

"চা কফির ব্যবস্থা হয়েছে গেস্টের জন্য? "

সাবিহা কিছু বলতে যাবে তার আগেই পাখিদের সৎ মা আমেনা বেগম খেঁকিয়ে ওঠে বলে...

"আমরা এখানে চা খেতে আসি নি। যেই কাজে এসেছি সেটা কেন হচ্ছে না? "

আবির নিরবে তাকায় আমেনা বেগমের দিকে। পাশ ফিরে একবার আজিজের দিকে তাকিয়ে দেখে সে চুপ চাপ বসে আছে। আবির আবার মুখ ফিরিয়ে আমেনা বোগমকে বলে....

"হু আর ইউ? আমার গেস্ট অফিসার আহসানের জন্য চা কফির ব্যবস্থা করতে বলেছি, আপনার জন্য তো নয়। "

আমেনা বেগমের মুখ চুপসে যায়, পরক্ষণেই আবার গরম হয়ে বলতে নেয়...

"এই ছেলে তুমি বড়দের মাঝে কেন আসছো? তোমার কথা বলার প্রয়োজন নেই..."

আবির কিছু বলতে হলো না, অফিসার আহসানই আমেনা বেগমকে থামিয়ে দেয়...

"আহ, আপনি চুপ করবেন একটু? কার সাথে গলা উঁচু করে কথা বলছেন জানেন? "

কথার মাঝেই নিবিড় এসে উপস্থিত হয়, অফিসার আহসানের সাথে কুশল বিনিময় করে এগিয়ে এসে আবিরের পাশে বসতে বসতে আস্তে করে বলে...

"শালার জিন্দেগী, আহিশ ব্যটা একবার বললোও না আমার হবু শশুর শাশুড়ী এসেছে। জানলে তো অন্তত একটা ফুল প্যান্ট পড়ে আসতাম,সম্মান ফালুদা করে দিলো ব্যাটা আমার।"

আবির চোখের ইশারায় অফিসার আহসানকে বসতে বলে..

"এসব কি, একটু এক্সপ্লেইন করুন অফিসার। "

অফিসার আহসান সুশীল কন্ঠে বলে...

"স্যার, আপনাদের বাবা মানে জনাব আজমল চৌধুরীর নামে উনারা কেইস ফাইল করেছে, উনি নাকি ওনাদের দুই মেয়েকে জোর করে বাড়ি থেকে তুলে এনেছে। "

আবির মাথা নাড়িয়ে বললো..

"দ্যাটস ওকেয়, কেইস ফাইল করেছে ভালো কথা। আপনি বা আপনার টিম ইনভেস্টিগেশনের জন্য আসতেই পারেন। তবে উনাদের কেন বাড়িতে নিয়ে এসেছেন? আপনি জানেন না এটা ভদ্রলোকের বাড়ি? এখানে এমন উগ্র কথাবার্তার মানুষ আসা যাওয়া করতে পারে না।"

অফিসার কিছু বলার আগেই আমেনা বেগম সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে এক কদম এগিয়ে এসে আঙুল তাক করে বলে...

"এই ছেলে, তুমি কি আমাকে অপমান করছো?"

আবির নিবিড় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আমেনা বেগমের হাতের দিকে। নিবিড় সেভাবেই তাকিয়ে বলে...

"অফিসার, এই মুহুর্তে যদি আমি এই মহিলার আঙুলটা শরীর থেকে আলাদা করে ফেলি তাহলে কতটাকা জরিমানা হবে আমার?"

অফিসার আহসান পেছনে ফিরে আমেনা বেগমকে হালকা ধমক দিয়েই বললো..

"আপনি নিজেকে কন্ট্রোল করবেন নাকি আমি বাইরে থেকে লেডি কনস্টেবল ডাকবো?"

আমেনা বেগম রাগে কটমট করতে করতে বসে পড়ে সোফায়। অফিসার আহসান বলে...

"আসলে স্যার। উনারা উনাদের মেয়েদের নিতে এসেছেন।"

আবির বোঝার মতো করে মাথা ঝাকায়। নিবিড় একটু এগিয়ে বসে বলে...

"আপনি স্টেটমেন্ট নিন অফিসার। ফার্স্ট অফ অল, ওদের বাড়ি থেকে আমি তুলে এনেছি, আমার বাবা না। তাই যদি কেইস ফাইল করার হয় তাহলে নাম চেঞ্জ করুন।"

অফিসার আহসান বলে ওঠে...

"আজমল স্যারের নামে যেভাবে সেভাবে ফাইল লিখতে পারি না, তাই এখনো ফাইল করা হয়নি। আমরা আপাতত উনাদের মেয়েদের হস্তান্তর করতে এসেছি। কোনো প্রকার এরেস্ট ওয়ারেন্ট নিয়ে না।"

আবির জিজ্ঞেস করে...

"আর আমাদের করা ফাইল টা?"

"সেটার জন্য সলিড প্রুভ লাগবে স্যার। "

নিবিড় বলে..

"ওহ, রেকর্ড নেওয়া হয়েছে, সন্ধ্যার দিকেই আপনার কাছে পাঠিয়ে দিতাম।এখন বাড়ি বসে যেহেতু এসেছেন, তাহলে নিজের মুখেই ভিক্টিমের শিকারোক্তি শুনে নিবেন, আশা করি এর বেশি কিছু আর প্রয়োজন পড়বে না। "

অফিসার সম্মতি জানায়। আহিশ আর জেসি নেমে আসে পাখিদের নিয়ে, চড়ুই পাখির কোলে লিও, বিরবিরিয়ে লিওর সাথেই বক বক করতে করতে নেমে আসে সে। দোয়েলের চোখ নিজের বাবা আর সৎ মায়ের দিকে পরতেই বুকে ভয় বাসা বাঁধে। উনারা এখানে কেন? তাদের নিয়ে যেতে এসেছে? যদি এবার বাড়ি যাওয়া হয় তাহলে তো আর আস্ত রাখবে না ছোট মা।

শরীর আগের তুলনায় কিছুটা সুস্থ হলেও বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে দূর্বল লাগে পাখিদের, তাই চড়াই পাখি পাশে একটা চেয়ার খালি দেখে লিওকে নিয়ে সেদিকেই বসতে যায়।হঠাৎই আমেনা বেগম ঝড়ের গতিতে এগিয়ে গিয়ে তার চুল টেনে ধরতে নিয়ে বলে ওঠে...

"বেয়াদপ মেয়ে, এত সাহস বেড়েছে তোদের। বাড়ি থেকে পালানোর জন্য এদের সাথে ভাব জুগিয়েছিস হ্যা? আজ তোদের একদিন কি আমার একদিন... "

বলতে বলতেই চড়ুইয়ের চুলের মুঠি চেপে ধরতেই ব্যাথায় কুঁকড়ে ওঠে চড়ুই। অফিসার আহসান, সাবিহারা এগোতে নিলেইআবির দ্রুত হাতের ইশারায় থামতে বলে তাদের। আর না নিজে সোফা থেকে এক কদম সামনে আগায়, শুধু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে সামনের দৃশ্য।

হঠাৎই লিও লাফিয়ে সবল হয়ে ওঠে। হুঙ্কার স্বরে ডাকতে ডাকতে নিজের নখ দু হাতের নখ দিয়ে খামছে আচড় কাটতে থাকে আমেনার বেগমের হাতে, ঠিক যেই হাত দিয়ে তিনি চড়ুইয়ের চুল খামছে ধরেছে।

এসেছে ধরে এত শান্ত স্বভাবের লিওকে এভাবে খেপে যেতে দেখে ভয় পায় চড়ুইও। চঞ্চল দু হাত ছাড়িয়ে নেয় লিওর তুলতুলে নরম শরীর থেকে। ছাড়া পেতেই লিও এক প্রকার ঝাপিয়ে পড়ে আমেনা বেগমের উপর, এবার নিজের চার হাত পাই কাজে লাগাচ্ছে সে।

বাঁকা হাসে আবির। এমন কিছু হবে তা সে আগেই ধারণা করে রেখেছিলো। লিও যথেষ্ট শান্ত হলেও প্রিয়দের প্রটেক্টিভ প্রানী সে। আবিরের কথা সে মান্য করে, ভীষণ পোষ্য। আবির যখন একবার তাকে বলেছে

" Don't hart her"

তখন সে বুঝে নিয়েছে চড়ুইকে সে আ'ঘাত করতে পারবে না, শুধু তাই নয়, বরং চড়ুইকে কেউই আঘাত করতে পারবে না। সেই ক্ষিপ্রতা থেকেই আমেনার উপর আক্রমন করে বসে লিও।

আমেনা হাত দিয়ে বার বার সরানোর চেষ্টা করছে লিওকে..

"ছুহ, এই বিড়াল, যা এখান থেকে। ছাড়, ছুহ ছুহ... "

কিন্তু তার সাৎে পাল্লা দিয়ে লিওর গর্জন আরো বাড়ছে। আমেনা বেগমের হাতে গলায় মুখে বেশ কয়েক জায়গায় আচড় পড়ে রক্ত বের হতে শুরু করেছে। লিও এবার নিজের মুখ খুলে তড়িৎ গতিতে আমেনা বেগমের গায়ে কামড় বসাতে গেলেই আবির স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই হাক পাড়ে..

"লিও স্টপ। "

ব্যস, এই টুকুই যথেষ্ট ছিলো লিওকে থামানোর জন্য। আবিরের দিকে এক পলক তাকিয়ে লাফিয়ে নেমে যায় আমেনা বেগমের থেকে। হেঁটে এসে চড়ুইয়ের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে সামনের দু হাত তুলে চড়ুইয়ের দু পা জড়িয়ে রাখে। আমেনা বেগমের দিকে তাকিয়ে আরো কয়েকটা ক্ষিপ্ত ডাক ছুড়ে তবেই শান্ত হয় সে।

চড়ুইয়ের পা কাঁপছে, এই মুহুর্তে সে লিওকেই প্রচুর ভয় পাচ্ছে। আমেনা বেগমের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না বলতে গেলে, এমন অবস্থা করেছে লিও তার। যদি লিও তাকেও এভাবে আক্রমণ করে তো? চড়ুইয়ের কাঁপা-কাঁপি দেখে আবির উঠে দাঁড়ায়। পকেটে দু হাত গুঁজে নিবিড়ের পায়ে একটা লাথি মেরে সরে যেতে যেতে বলে...

"ওদের বসতে দে। "

নিবিড়ও উঠে দাঁড়ায়। জেসি দোয়েলকে এগিয়ে এনে বসায়, কিন্তু চড়ুই ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নিচে তাকিয়ে আছে। পা নড়লেই যদি লিও তাকে আঁচড় দিয়ে বসে তো?

আবির এগিয়ে এসে এক হাতে লিওকে ছাড়িয়ে নেয় চড়ুইয়ের কাছ থেকে। ছাড়া পেতেই চড়ুই ছুটে সরে গিয়ে বসে দোয়েলের পাশে।

আজিজ রাহমান উঠে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবি ঠিক করতে করতে দোয়েলের দিকে তাকিয়ে বলে...

"বাড়ি চলো তোমরা। "

বুক কেঁপে ওঠে পাখিদের। দোয়েল কুঁকড়ে গেলেও চড়ুই পাখি, অভিমান, জেদ আর কিছু অতীতের স্মৃতির রেশে বলে ওঠে...

"আমরা যাবো না।"

আজিজের পা থেমে যায়, ঘুরে দাঁড়িয়ে চড়ুইয়ের দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকাতেই ভয়ে সিঁটিয়ে যায় মেয়েটা। আজিজ নিজের কন্ঠস্বর আরেকটু উঁচু করে বলে...

"এখানে কোনো সিনক্রিয়েট করতে চাইছি না আমি চড়ুই। নাটক না করে চলো বাড়িতে। "

"আমার মেয়েরা অসুস্থ রাহমান সাহেব। এই মুহুর্তে আমি অন্তত আমার মেয়েদের দূরে রাখতে পারবো না। "

দরজার দিক থেকে আজমল চৌধুরীর কন্ঠ ভেসে আসতেই সেদিকে দৃষ্টি দেয় সকলে। আজমল চৌধুরী স্বাভাবিক ভাবেই হাত ভর্তি বাজার নিয়ে ঘরে ঢুকলেন মাত্র। তার পেছন পেছন মুরুব্বি গোছের একজন লোকও প্রবেশ করলেন, গায়ে পরিধানরত কালো কোর্ট আর হাতে ব্রিপকেস দেখে কোনো সরকারী কর্মকর্তাই মনে হলো তাকে। তিনিও এসে আবির নিবিড়ের সাথে কুশল বিনিময় করলেন, আজমল চৌধুরী তাকে বসলে বলে এগিয়ে যায় সাবিহার কাছে।হাতের ব্যাগ গুলো তার হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে বলে...

" গরম গরম রসগোল্লা এনেছি, ফ্রীজে রেখো না যেন। আমি আম্মুদের রুমে পাঠিয়ে দিচ্ছি একটু পর, তখন ওদের দিও। আর ফল আছে কয়েক রকমের।.. "

সাবিহাও ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে স্বাভাবিক ভাবেই বলে...

"সকালেই তো তোমার ছেলে দুটো গিয়ে এক গাদা ফল নিয়ে এসেছে পাখিদের জন্য। এখন আবার শুধু শুধু... "

আজমল এগিয়ে এসে সোফায় বসতে বসতে উত্তর দেয়..

"সব খাবে ওরা, সুস্থ হতে হবে তো নাকি। "

কথোপকথনের সবটাই কর্ণগোচর হয় আজিজ রাহমানের। নীরবে একবার আজমল চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি নামিয়ে নেয় তিনি।

আজমল চৌধুরী এইবার অফিসার আহসানের দিকে তাকিয়ে বলে...

"অফিসার, আপনি শুনলেন তো আমার আম্মুরা উনাদের সাথে যেতে চাইছে না।আর প্রতক্ষ প্রমাণ চাইলে... "

আজমলকে থামিয়ে নিবিড় এগিয়ে আসে। হাতে কিছু রিপোর্ট এগিয়ে দেয় আহসানের দিকে। তারপর বলে..

"এখানে পাখিদের হসপিটাল রিপোর্ট রয়েছে। দু দিন আগের। যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে স্টমাসের কারনে উইক হয়ে পরেছে ওরা, সেন্সলেস অবস্থায় বদ্ধ ঘর থেকে উদ্ধার করা হয় ওদের। "

অফিসার আহসান এবার পাখিদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে...

"উনি যা বলছেন তা কি সত্য? এমনটা হওয়ার কারন কি? "

দোয়েল ভীত চোখে তাকায় আমেনা বেগমের দিকে, যিনি চোখ গরম করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আজমল তা বেশ লক্ষ্য করে, হালকা হেঁসে বলে ওঠে...

"দোয়েল আম্মু, তোকে আমি সাহসী মনে করি, কারোর চোখ দেখে ভয় পেয়ে গেলে হেরে যাবি। "

দোয়েল দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। আমেনা বেগম রয়ে সয়ে বলতে নেয়...

"দেখুন, যা হয়েছে হয়েছে। আমি মা হিসেবে আমার মেয়েদের একটু শাসন করতেই পারি, এতে এতো দোষের কি আছে... "

আমেনা বেগমের মুখের উপর চড়ুই পাখি অভিমানী সুরে বলে ওঠে...

"ওটাকে শাসন বলে? হাত পা বেঁধে মুখ বেঁধে অন্ধকার রুমে ফেলে চলে গেছো? তুমি জানো না আমরা দু বোন একা থাকতে পারি না, আর দু দিনে একটু পানিও তো দাও নি তুমি। আমি তো ভেবেই নিয়েছিলাম আমি আর বাচবো না, ওভাবেই মরতে.... "

"ওয়াইফি..."

আবিরের শীতল ডাকে থেমে যায় চড়ুই পাখি। আর কিছু না বলে মুখ নামিয়ে নেয় সে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে নীরবে অশ্রুকণা। দোয়েলেরও একই অবস্থা, চড়ুইয়ের হাত চেপে বসে আছে সে।

আজিজ রাহমান এগিয়ে আসে দোয়েল আর চড়ুইয়ের সামনে। তাকে সামনে দেখেই দোয়েল দাঁড়িয়ে যায়। সাথে চড়ুইকেও টেনে দাঁড় করায়।

"তোমরা কি তোমাদের বাবার সম্মান রাখতে চাইছো না নাকি? যার তার সামনে এভাবে আমাকে হেনস্তা করছো দুটো মিলে? কথার অমান্য করছো?"

দোয়েল মাথা নিচু করে বলতে নেয়...

"ব্ বাবা আ্ আমি.... "

তাকে কিছু বলতে না দিয়েই চড়ুই মুখের উপর কাঁদতে কাঁদতে বলে দেয়...

"কিসের বাবা তুমি? আম্মু মারা যাওয়ার পর থেকে বাবা হিসেবে কি করেছো তুমি আমাদের জন্য? এত গুলো বছরে আমাদের তুমি কয়টা জামা এনে দিয়েছো বলো তো? আমরা বাড়িতে দু বেলা ঠিক মতো খাবার পাচ্ছি কিনা তা জিজ্ঞেস করেছো কোনোদিন? আমরা মার খেয়ে কান্না করলে কোনোদিন এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছো? আমাদের কখনো এসে একবার জিজ্ঞেস করেছো কেমন আছি আমরা? এসব কি বাবা হিসেবে তোমার দায়িত্ব ছিলো না?"

আজিজ রাহমান বলে ওঠে...

"হ্যা আমি এসব করিনি। তাই বলে কি তোমাদের ফেলে দিয়েছি আমি? তাড়িয়ে দিয়েছি ঘর থেকে?"

চড়ুই এবারও থেমে থাকে না, বরাবরের মতোই হিচকি তুলে বলে...

"হ্যা দিয়েছো তো থাকতে, তাও কেমন করে? ভোরে ওঠে ঘর মুছা থেকে শুরু করে রাতে খাওয়ার পরে থালা বাসন ধোঁয়া পর্যন্ত একটা নিয়ম। তার বিনিময়ে থাকতে দিয়েছো, দুবেলায় ভাত খেতে দিয়েছো। কিছুদিন আগেও তো তরকারিতে ঝাল বেশি হয়েছিলো বলে শাস্তি হিসেবে আমাদের খেতে দেয়নি ছোটমা। তুমি এসে একবারও জিজ্ঞেস করেছো? আম্মু চলে যাওয়ার পরে কোনো ফ্যামিলি প্রোগ্রামে আমাদের নিয়ে গিয়েছো তুমি বলো? কোথাও নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দিয়েছো তুমি? আমাদের স্কুলের একটা টিচার তোমাকে চেনে আমাদের বাবা হিসেবে? কোন দিক থেকে তুমি বাবার সম্মান চাইছো বলো তো? "

আজিজ এবার চুপ রয়। চড়ুই যেন আজ নিজের মনের কথা গুলোই উগলে দিচ্ছে, আবারও বলে ওঠে...

"তুমি বাইরের মানুষ কাকে বলছো? এদেরকে? এরা না আমাদেরকে খুব আদর করে। এই যে উনি বলেছে আমরা যেন তাকে আব্বু বলে ডাকি। যেখানে সেখানে কেউ আমাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করলে উনি সাথে সাথে বলে আমরা উনার মেয়ে। গর্বের সাথে বলে জানো তো? আমরা কেন ফিরবো তোমাদের কাছে? তোমরা তো শুধু আমাদের কষ্টই দাও, কখনো আমাদের বোঝার চেষ্টাও করো নি, বাবারা কি এমন হয়? তুমি তো আমাদের বাবাই না, তোমাকে আমি বাবা বলে মানিও না, মন থেকে উঠে গেছো তুমি আমার। আম্মু সব দেখছে, তোমাকে আম্মু কখনো ক্ষমা করবে না, কখনো নাহ... "

বলতে বলতেই ডুকড়ে কেঁদে ওঠে মেয়েটি। অজান্তেই ক্যানোলা যুক্ত হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছতে নিলেই আবির এসে খপ করে হাত হাত চেপে ধরে। নিজের বা হাগের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে চোখ মুছিয়ে দেয় চড়ুইয়ের। শীতল কন্ঠে বলে...

"হয়েছে, আর কাদে না চড়াই।থামো এবার। যাও রুমে যাও তোমরা। "

আবিরের কোল থেকে লিও ও ছুটে এসে গলা জড়িয়ে ধরে চড়ুইয়ের, যেন চড়ুইয়ের কান্না তারও সহ্য হচ্ছে না। নিজের সোনালী রঙের লোম যুক্ত মুখটা আলতো করে নাড়িয়ে ঘসে দিচ্ছে চড়ুইয়ের ভেজা গাল দুটোতে। আলতো করে ডেকে যেন সেও বুঝাচ্ছে..

"আর কাঁদে না.. "

নিবিড় এগিয়ে গিয়ে দোয়েলের বাহু ধরে সরিয়ে নিয়ে যেতে থাকে রুমের দিকে। আজমল চৌধুরী গলা খাখারি দিয়ে বলে ওঠে...

"মিসেস রাহমান, পাখিদের সৎ মা হিসেবে আপনি যেসব করেছেন, তার জন্য কেস করলে আপনার কত বছরের জেল হতে পারে ভাবতে পারছেন তো? "

আমেনা বেগমের বুক কেঁপে ওঠে, ঢোক গিলে আমতা আমতা করতে থাকে তিনি।

আবির বলে...

"এক সেকেন্ড আব্বু, পাখিরা যাক তারপর যা হবার হবে। "

চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে...

"যাও, লিওকে ভয় পেও না, ও না তোমার বাচ্চা? তোমার কোনো ক্ষতি করবে না। রুমে যাও, আম্মু তোমার জন্য রসগোল্লা নিয়ে আসছে।"

বলতে বলতে আরো একবার চড়ুইয়ের দু চোখ মুছিয়ে দেয় আবির। চড়ুই নাক টেনে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে যেতে নিয়েও আবার থেমে যায়। আজমলের কাছে এসে দাঁড়ায় চোখ ফ্যালফ্যাল করে। আজমল বুঝতে পেরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে..

"কিছু বলবি আম্মু? "

চড়ুই এক হাতে আজমলে একটু নিচু হতে বলে। আজমল তাই করে, আবির ভ্রু কুঁচকে এক কদম এগিয়ে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করে চড়ুই কি বলতে চাইছে। আজমলের কানের কাছে মুখ নিয়ে চড়ুই ফিসফিসিয়ে বলে...

"শোনো আব্বু, তুমি প্লিজ ছোটমাকে জেলে দিও না। উনি আমাদের পছন্দ করে না, কিন্তু আমাদের একটা ছোট ভাই আছে না অনুজ, ওকে খুব ভালোবাসে তো উনি। উনি জেলে গেলে অনুজ খুব কষ্ট পাবে। প্লিজ আব্বু?"

Mr and Mrs Twins Return গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় টুইন রিলেটেড রোমান্টিক গল্প