ঝড়ের গতিতে আবির বিছানা থেকে লাফিয়ে পড়লো নিচে। বলিষ্ঠ শরীরে সোপিসের কোনায় লেগে কনুইতে একটু ব্যথাও লাগলো মুহুর্তেই। ভুতের মতো চোখ করে তাকিয়ে আছে বিছানার দিকে। দোয়েল দ্রুত উঠে এগিয়ে এসে আবিরকে তুলতে নেয়...
" ভাইয়া আস্তে, লেগেছে হাতে? "
আবির বসা অবস্থাতেই পিছিয়ে যায় একটু। দু হাত সামনে তুলে বলে..
" আ'ম সো সরি বড় পাখি। আমি আসলে.. ওয়াইফি ভেবে... আ'ম রিয়েলি সরি.. "
দোয়েলের ভেতরে ভেতরে বেশ হাসি পাঁচ্ছে আবিরের এমন অবস্থা দেখে। কিন্তু এই মুহুর্তে হেঁসে দেওয়া মানে মহা বিপদ। তাই নিজেকে সামলে বলে উঠলো..
"ইট’স ওকেয় ভাইয়া, আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি আগে উঠুন ফ্লোর থেকে৷"
আবির দিক বিদিক খুজে পায় না, তবুও লজ্জায় নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কি বিচ্ছিরি সিচুয়েশনে পড়লো রে বাবাহ।
" ত্ তোমার গায়ে ওর পারফিউমের স্মেল.."
"বোনের থেকে লাগিয়েছিলাম ঘুমানোর আগে। "
আবির ক্যাবলার মতো তাকায়। উঠে দাঁড়িয়ে নিজের গা ঝাড়তে ঝাড়তে বলে...
"ঠিক আছে পাখি। তুমি র্ রুমে যাও, আর এটা সত্যিই একটা মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং, প্লিজ এটা নিয়ে... "
"সমস্যা নেই ভাইয়া। আমি কি গিয়ে বোনকে পাঠিয়ে দেবো? "
"না না নাহ, তার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি কাল কথা বলে নিবো। তুমি যাও প্লিজ, আর সরি.. "
দোয়েল আর দাঁড়ায় না। মুখ টিপে হেঁসে দ্রুত এগিয়ে দরজা খুলতেই দেখতে পায় নিবিড় দাঁড়িয়ে আছে। হাসি গায়েব হয়ে যায় দোয়েলের৷ এদিকে নিবিড়ও দোয়েলকে এভাবে আবিরের ঘর থেকে বের হতে দেখে ভ্রু কুঁচকে যায় তার। একবার ঘরের ভেতর আবিরের দিকে তো একবার সামনে দোয়েলের দিকে তাকায় সে। এত রাতে এমন অবস্থা মাথায় আসতেই নিবিড়ের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। দোয়েলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দ্রুত কদমে আবিরের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয় সে।
এগিয়ে এসে আবিরের বুকে শক্ত হাতের থাবা বসিয়ে হিসহিসিয়ে বলে ওঠে...
"তুই আমার এটমের সাথে কি করেছিস? "
আবির প্রথমে বুঝতে পারেনি নিবিড় যে তাকে এভাবে আক্রমন করবে। একটু পিছিয়ে গিয়ে হাত সামনে এনে বলতে নেয়...
"ওয়ে দাঁড়া.. বলতে.... "
পুরো কথা শেষ করার আগেই নিবিড় এগিয়ে এসে আবিরের কলার চেপে ধরে বা গালে একটি ঘুষি মেরে দেয়। রাগের বশবর্তী হয়ে বলতে থাকে...
"এত রাতে দোয়েল তোর রুমে কেন? কি করেছিস তুই? আমার দোয়েলের দিকে হাত বাড়িয়েছিস কেন... রাসকেল.."
বলেই আরেকটা ঘুষি বসাতে গেলেই আবিরও তাকে প্রতিহত করতে দ্রুত হাত চেপে ধরে নিবিড়ের। তারপর হাত পেঁচিয়ে পেছনে ঘুরিয়ে পিঠে একটা লাথি মেরে সরিয়ে দেয় নিজের থেকে। নিবিড় গিয়ে পড়ে বিছানার উপর। দ্রুত উঠে আবার এগিয়ে আসতে নেয় আবিরের দিকে।...
"আমার কথা শোন তো আগে। ইট’স যাস্ট আ মিসটেক..."
বলতে বলতেই আবির পাশ থেকে একটা কাঁচের ফ্লাওয়ারভাস তুলে নিবিড়ের বাহুতে আঘাত করে। শক্ত ফুলে ফেঁপে ওঠা পেশিতে লেগে কাঁচের ফ্লাওয়ারভাসটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছিটিয়ে পড়ে ফ্লোরে। নিবিড় তাও হার মানে না এগিয়ে আসতে গেলেই আবির আবার তার বুকে ধাক্কা দিয়ে বিছানার উপর ফেলে দেয় নিবিড়কে। রাগে হিসহিস করতে করতে নিজেও উঠে চড়াও হয়ে বসে নিবিড়ের উপর। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া করতে করতে একবার নিবিড় এলোপাতাড়ি মারছে আবিরকে তো আবার আবির মারছে নিবিড়কে। কেউই কারোর থেকে কম না। আঘাত? যে যাকেই আঘাত করছে, ব্যাথা দু জনেই পাচ্ছে। কিন্তু কেউই থামছে না। আবির মারতে মারতে চেচিয়ে বলে ওঠে...
"আমি কি করবো ড্যামিড। চড়াইয়ের সাথে একটা মিনিট একা থাকতে গেলেই সবাই চলে আগে। একটু কাছে যেতে গেলেই সারা এলাকায় খবর হয়ে যায় আবির বিন চৌধুরী চড়াইয়ের নাকের শ্লেষা খেয়েছে, মুখের লালা খেয়েছে। এই খেয়েছে, সেই খেয়েছে। আমি ওকে খেতে গেলেই কেন সবাই জেনে যায়? হোয়াই?? "
নিবিড়ও এবার ল্যাং মেরে আবিরকে বিছানায় ফেলে নিজে উঠে বসে তার উপর, গালে বুকে ঘুষি মারতে মারতে বলে..
" তুই প্রাইভেসি বজায় রাখতে পারিস না বলে আমার পাখিকে খাওয়ার প্ল্যান করবি শা'লা? "
আবির একটু চান্স পেয়েই নিবিড়ের হাতের মুষ্টি রুখে বলে ওঠে...
"আরেহ আমি আমার পাখিকেই আনতে চেয়েছিলাম। ভুল করেই তোরটা নিয়ে এসেছি। "
নিবিড় আরেকটা ঘুষি বসিয়ে বলে ওঠে...
"এনে কি করেছিস তুই? কিস করেছিস? সত্যি করে বল আবিরের বাচ্চা... "
"আবে মাদারবোর্ড... চুমু খাওয়ার জন্য আনি নি। রাগ ভাঙানোর জন্য এনেছিলাম। কিন্তু... "
বলতে বলতেই নিবিড়কে ধাক্কা মেরে জোরে বিছানার উপর ফেলতেই আর সহ্য করতে না পেরে বিছানার ছানি ভেঙে পড়লো নিচে।
অবশেষে বিছানার ইন্তেকাল করিয়েই ক্ষান্ত হলো দু জনে। ভাঙা বিছানাতেই হাত পা ছড়িয়ে পাশাপাশি শুয়ে হাপাতে লাগলো দু জন। নিবিড় সিলিং এর দিকে তাকিয়েই হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠলো...
" শা'লা আবা'লের পুত। নিজের জিনিসই চিনে উঠতে পারিস না এখনো। বা'লের প্রেম করো তুমি? "
"দুইটা পুরো পুরি একই রকম হলে কেমনে চিনবো? সব কিছু ভাগাভাগি করতে কে বলে ওদের? "
নিবিড় নিচের চোয়াল নাড়িয়ে ব্যথা প্রশমন করার চেষ্টা করে বললো...
"কেন? আমরা করি না? সেদিন ও তো মার্কেট করার সময় আমি সেইম সেইম দুইটা আন্ডারওয়্যার এনেছি, একটা আমার একটা তোর। "
আবির বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বলে...
" তোর জোর বেরে গেছে রে ইয়ার... দারুন মেরেছিস... "
নিবিড়ও বলে ওঠে...
"তুইও কি কম মেরেছিস আমায়? "
আবির তাকায় নিবিড়ের দিকে। বাকা হেঁসে বলে....
"তোর বউকে কোলে করে এনেছি রুমে।"
নিবিড় চোখ গরম করে তাকাতেই আবির বলে ওঠে...
"ভাগ্যিস মাথা গরম ছিলো। মুড ভালো থাকলে তো নিজের মনে করে এখানে ওখানে ছুয়েও দিতাম। "
নিবিড় সন্দেগি দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করে...
"সত্যিই কিছু করিস নি তো? "
আবির বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে চোখ বন্ধ করে দু পাশে মাথা নাড়িয়ে বোঝায় সে কিচ্ছু করে নি।
নিবিড় হাফ নিশ্বাস ফেলে আবার সিলিং এর দিকে মুখ করে বলে...
"পরের বার থেকে সাবধান, তুই আমার বউয়ের দিকে হাত বাড়ালে আমিও কিন্তু ছোটপাখিকে..."
আবির হালকা গলা উঁচিয়ে বলে...
"এএএ, মুখে লাগাম টান। নেহাত হানি রাগ করে ছে কেন জানি। কথা বলছে না আমার সাথে ইয়ার... "
নিবিড় বাঁকা হেঁসে বলে..
"সে তো ভালো কথা। তুই-ই তো চাইতি ছোটপাখি যেন তোর সাথে কথা না বলে। তোর ইচ্ছে পূরণ হলো।"
আবিরের মুখটা কেমন মলিন হয়ে যায়। বলে ওঠে...
"চাইতাম। কিন্তু এখন আর ওকে এভাবে ভালো লাগে না। আমার সামনে সবার সাৎে স্বাভাবিক থাকছে মেয়েটা, অথচ আমি কিছু বললে কানেও নিচ্ছে না সে। আমার ভেতরটা ভার লাগছে ভাই। ওর এমন নীরবতা সহ্য হচ্ছে না আমার। "
নিবিড় বলে ওঠে...
" এসব আর আমাকে বলে লাভ নেই, নিজের রানী মানাইতে পেছন দিয়ে হাওয়া বের হইতাছে আমার, তোমার সমস্যা তুমি বুঝে নাও গা। একটু না মারলে একটু চিন্তা করে দেখতাম।"
আবিরও বলে ওঠে..
" হ্যা, তুই মারতি আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকতাম। নিজে শুরু করেছে তা না... "
"হয়েছে, মার খেয়ে ক্লান্ত আমি, "
"গাল ফেটে গেছে তোর,ওঠ ফাস্টএইড করে দিই।"
নিবিড় এক হাত বাড়িয়ে নিচ থেকে শুভ্র ব্ল্যাঙ্কেটটা তুলে নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিতে নিতে বললো...
"কাল সকালে করবো, ব্যথা তুই ও পাইতে থাক। এখন শান্তির ঘুম দে। সবাই ঘুম থেকে উঠার আগে এই ভাঙা বিছানার ব্যবস্থা করতে হইবো। "
আবির হাফ ছেড়ে বলে..
"আর শান্তির ঘুম। যে দিন থেকে বুঝছি আমি ওই পেঙ্গুইনটার প্রেমেই পড়লাম,সেদিন থেকেই আমার ঘুম হারাম।"
" ওরা ঘুমাইতেছে না? রাইতের জন্য প্রেমের গুষ্টি মারছে, কাল সকালে আবার প্রেমিক সত্তা জাগাইয়া নিস। ঘুমা ভাই, প্রচুর মাইর খেয়েছিস... "
-----------
পরিকল্পনা অনুযায়ী আবির আর নিবিড় পারলো না সবার অগোচরে ঘর গুছিয়ে ফেলতে, তার আগেই ফজরের নামাজের সময় সাবিহা এসে আবিরের রুমের লাইট অন দেখেই দাঁড়িয়ে যায় সেখানটায়। ভীরানো দরজাটা হালকা ধাক্কা দিতেই খুলে যায় তা। ভেতরে গিয়ে রুমের অবস্থা দেখেই সাবিহার চক্ষু চরক গাছ।
কারোর ডাক কানে আসতেই পিটপিট করে চোখ খুলে নিবিড়। সামনে নিজের মা, চাচি, ভাবিকে দেখেই হুড়মুড়িয়ে উঠে বসে সে। তাকে বসতে দেখেই সাবিহা প্রশ্ন করে...
"এই, তোরা এভাবে ভাঙা খাটে শুয়ে আছিস কেন? আর খাট এরকম ভাঙলোই বা কি করে? "
নিবিড় মাথা চুলকায়, তাদের দুই হাতির ভার সহ্য করতে না পেরেই যে এই খাট ইহ মায়া ত্যাগ করেছে তা কি আর সবাইকে বলা যায়? এক হাতে আবিরকে ঠেলতে ঠেলতে উঠাতে লাগলো সে।
সাবিহার চোখ পড়ে নিবিড়ের গালে, সারা মুখে কালসিটে দাগ আর গালের কোনায় চিকন করে ফেটে রক্ত জমাট বেঁধে আছে বলতে গেলে৷ সাবিহা এগিয়ে এসে নিবিড়কে আগলে নিতে নিতে বলে...
"এই, তোর গালে কি হলো? রাতে তো ঠিকই ছিলো৷ "
নিবিড় সুযোগ পেয়ে বলে ওঠে..
"ভাই মেরেছে আম্মা।"
আবির মাত্রই হামি তুলে উঠে বসে, নিবিড়ের কথা কানে যেতেই প্রতিবাদি কন্ঠে বলে ওঠে...
" ঐ, তুই মারিস নি? "
নিবিড় বলে..
"বেশ করেছি, বউ চুরি করতে গেছিলি ক্যান? "
তারা, সাবিহা, আয়েশারা বুঝতে পারে না। ভ্রু কুঁচকে বলে..
"বউ চুরি মানে? "
গেলো সব, আবির নিবিড় পড়ে মহা ফ্যাসাদে। আবির আমতা আমতা করে বলে..
"ব্ ব্ বই, বই চুরি করার কথা বলছে।"
নিবিড় ও হাসার চেষ্টা করে তাল মিলিয়ে বলে..
"হ্যা হ্যা, বই। ভাই কাল আমার রুম থেকে একটা বই না বলে নিয়ে এসেছিলো। তাই একটু... "
তারা অবাক হয়ে বলে..
"বই নিয়েই আপনারা মারামারি করে এই হাল করেছেন ভাইয়া, সত্যি সত্যি বউ হলে কি করতেন কে জানে।"
আবির নিবিড় কোনা চোখে একে অপরের দিকে তাকায়।আবির চোখ তুলে এবার জিজ্ঞেস করে...
"তোমরা এত ভোরে এখানে কি করছো? "
সাবিহা বলে..
"নামাজের জন্য উঠেছিলাম। লাইট অন দেখে এসে দেখি তোদের দুটোর এই হাল। যাক বাবা, এখন দু জন নিবিড়ের রুমে গিয়ে ঘুমা, সকালে এই খাট সরানোর জন্য ব্যবস্থা করছি আমি। "
আবির ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে আবার শুয়ে পরতে পরতে বললো...
" হারামির রুমে যেতে পারবো না।সকালে কথা হবে। গুড নাইট।"
-------------
রান্না ঘরের খট খট শব্দ যেন প্রতিদিনের নিয়ম। সামনেই দোয়েল বসে সালাদ কাটছে। অনেক বারন করার পরও সে শুনে নি, তাই বাধ্য হয়ে সহজ কাজ গুলোই দিলো তাকে, যাতে অসুস্থ শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে না হয়। আবির নিবিড় রেডি হয়ে নেমে এলো। এক্ষুনি বের হবে তারা অফিসের উদ্দেশ্যে। আবির চার দিকে এক বার চোখ বুলিয়ে খুঁজলো চড়ুইকে। নেই কোথাও, সাবিহা রান্না ঘরে আছে দেখেই নিবিড়কে আস্তে করে বললো...
"তুই পাঁচ মিনিট আম্মুকে পাহারা দে, আমি আসছি। বিপদ বুঝলেই মেসেজ দিবি আমায়।"
নিবিড়কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই দ্রুত আবার সিঁড়ি ডিঙিয়ে উঠে গেলো আবির।কারোর পায়ের আওয়াজ শুনেই সিড়ির কাছে নজর দেয় সাবিহা আর দোয়েল। সাবিহা জিজ্ঞেস করে..
"কিরে? আরেকজন কই?"
নিবিড় এগিয়ে গিয়ে সোফায় বসতে বসতে বলে..
"ভাই রেডি হচ্ছে আম্মু। "
সোফায় বসেই আড়চোখে একবার দোয়েলের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নেয় নিবিড়।সেন্ট্রাল টেবিল থেকে একটা ম্যাগাজিন হাতে তুলে নিতে নিতে বলে....
"আম্মু, অতিথিকে বলো অতিথির মতোই থাকতে। বাড়ির বউ নয় সে যে ঘরের কাজ করবে। এসব করে কারোর মনে আশা জাগানোর প্রয়োজন নেই। "
দোয়েলের হাত থেমে যায়। ছলছল চোখে নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে এক দৃষ্টিতে। সাবিহা আড়চোখে দু জনেরই ভাব গতি লক্ষ্য করে। তারপর উত্তর দেয়...
"বড় পাখি আমার মেয়ে হয়ে কাজ করছে, তোর এত সমস্যা কোথায়? "
নিবিড় উত্তর দেয়..
"কোনো সমস্যা নেই, তবে অসুস্থ মানুষ এসব থেকে দুরে থাকাই ভালো কিছুদিন। "
-------
ছোটপাখির রুমে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দেয় আবির। বিছানায় ছোটপাখি গুটিশুটি মেরে ঘুমাচ্ছে। আবির নিজের গায়ের কোর্টটা খুলে ডিভানে ছুড়ে ফেলে, এগিয়ে গিয়ে আস্তে করে এক পাশ থেকে ব্ল্যাঙ্কেট উঠিয়ে দেখে মেয়েটার মাথা কোন দিকে পা কোন দিকে, ঘুমানোর স্টাইল কি কি রকম তা আর বলে দিতে হবে না নিশ্চয়ই। এদিক ওদিক খুঁজে আবির বুঝলো চড়ুই বুকের নিচে বালিশ দিয়ে উপুর হয়ে ঘুমাচ্ছে। গত কাল রাতের খোঁপা করা চুল গুলো বাধন হারা হয়েছে বেশ। এগিয়ে গিয়ে নিজেও আধো ব্ল্যাঙ্কেটের ভেতরে ঢুকে আবির। বিছানায় কনুই ঠেকিয়ে তার উপর হাতে গাল রেখে আরাম করে ফিরে শোয় সে চড়ুইয়ের দিকে। বা হাত এগিয়ে নিয়ে আলতো করে মুখের উপর আছরে পরা চুল গুলো সরিয়ে দেয় সে। হুট করেই কেন যেন আবিরের মনে প্রশান্তির হাওয়া বয়ে যায়। শুভ্রতায় আচ্ছাদিত মুখটা বেশ মায়াবী। চড়াই পাখি দু ঠোঁট আলগা করে শ্বাস নিচ্ছে ঘুমের মাঝেই। আবির হাসলো, এক আঙুল দিয়ে মেয়েটার নিচের ঠোঁট উচিয়ে দূরত্ব ঘুচাতে চাইলো দুই ওষ্ঠের। কিন্তু লাভ হয় না, চড়াই পাখি আবার মুখ খুলে নেয়।
আবির নিরলায় তাকিয়ে থাকে একটি মায়া মুখের দিকে৷ মেয়েটার তার সামনে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। বাচ্চামো ছেড়ে দিচ্ছে, অভিমান জমাচ্ছে মনে। একটা সময় আবির তো তাই চাইতো, কিন্তু মন পরিবর্তনশীল। আবির এখন আর চড়াই পাখির অভিমান সহ্য করতে পারে না। সারা জীবন ঝামেলা এড়িয়ে চলা ছেলেটা আজ আস্ত একটা ঝামেলাকেই বাকিটা জীবনের জন্য নিজের করে চাইছে। আসলেই মন পরিবর্তনশীল৷
"তোমার প্রতি আমার অনুভূতি আর পরিবর্তন হবে না ওয়াইফি। আই নিড ইউ, নিড ইউ ফরএভার। আমার প্রতিটা শিরায় তোমার অস্তিত্ব চাই পাখি।তোমার শরীরের প্রতিটি লোমকূপে আমার ছোঁয়া রাঙাতে চাই। আই ডিডেন্ট লাইক থিন গার্ল, বাট ইউ আর ডিফরেন্ট। জানি না কখন থেকে, কিভাবে আমি তোমাতে মত্ত হয়েছি। দূরত্ব না হলে হয়তো অনুভবই করতে পারতাম না আমি এতটা ডেস্পারেট তোমার জন্য। এন্ড নাও, আমি তোমাকে যেকোনো ভাবেই চাই, তুমি চিকন হও বা মোটা, লম্বা খাটো আই ডোন্ট কেয়ার, আমার তোমাকেই চাই। আমার মনের বিরুদ্ধে গিয়েও কি করে তোমায় এতটা চেয়ে ফেলেছি তা আমি জানি না। আর কখনো জানতেও চাই না এতটা ভিন্নতায় আমার মন কিভাবে আটকেছে। শুধু এটুকুই জানি আমার রব চেয়েছে বলেই আমি তোমায় ভালোবেসেছি। আমার রব চেয়েছে বলেই তোমার মনেও আমার জন্য সুপ্ত বাসনা জন্মেছে, আর আমার রব চাইলে আমি ঠিক তোমায় পেয়েও যাবো। আল্লাহর কাছে যতটা চাইতে হয় আমি চাইবো তোমায়। আমি পাপী, কিন্তু যদি জীবনে একটাও পূন্য করে থাকি সেই পূন্যের ফল হিসেবে এই জনমে আমি তোমায় চেয়ে নিবো। আমার আখিরাতের জন্য কিচ্ছু জমা করতে চাই না, আমি শুধু তোমায় চাইবো আমার রবের কাছে। "
আবিরের প্রতিটি কথা যেন নীরব কক্ষটায় বারি খেয়ে ফিরে আসতে লাগলো। যাকে এত গুলো কথা বললো সে কি আদেও শুনেছে কিছু? আবির জানে তার ছোট্ট পাখিটা কিছুই শুনে নি। তবুও যেন প্রশান্তি। আবির আলতো হাসে।
মুখ এগিয়ে নিয়ে শব্দহীন চুমু খায় তার হৃদয় হরিণীর কপালে। একটা, দুটো, তিনটে...
আস্তে করে নিজের ওষ্ঠ ছোয়ায় চড়ুই পাখির নরম কানের লতিতে। ফিসফিসিয়ে ডেকে সুধায়....
"শুনছো মেয়ে? পৃথিবীর বুকে বেড়ে ওঠা এক রুক্ষ হৃদয়ের ব্যক্তি আবির বিন চৌধুরী বলছে। উপরওয়ালার কাছে সে তোমায় চেয়েছে, চাইবে বাকি জীবন ভর। রোজ সকালে চোখ মেলে তোমার মাঝে নিজের সৌভাগ্য দেখতে আর্জি করছে এই পাষণ্ড হৃদয়ের ব্যক্তিটা। দুনিয়ার সকল পরিচিতদের জানিয়ে দিতে চাইছে এই রাগী, বদমেজাজি, নীরবতা প্রেমী আবির এক চঞ্চলাকে নিজের বক্ষে ঠাই দিয়েছে। শুনলে তুমি? এই বার তো অভিমান ভেঙে আমায় নিজের চঞ্চলতার সাক্ষী করে নাও? "
কানের কাছে গরম আভা পেয়ে নড়েচড়ে ওঠে চড়ুই। কিন্তু তার ঘুম ছুটে না পুরোপুরি৷ আবির আবার হাসে, চমৎকার সেই হাসি। সহসা দেখা মিলে না এমন হাসির। দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় আসতেই নিজের ঠান্ডা হাত খানা ব্ল্যাঙ্কেটের ভেতর নিয়ে চড়ুই পাখির জামার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয় সে। পিঠের উপর হাত রাখতেই কেঁপে ওঠে চড়ুই পাখি। মুখ কুচকে গোঙানির শব্দ বের হয় মুখ দিয়ে। নড়েচড়ে পা গুটিয়ে আরেকটু আরামের খোঁজে সে এগিয়ে আসে আবিরের একদম কাছে। ক্যানোলা যুক্ত হাতটা দিয়ে চেপে ধরে আবিরের বুকের কাছের শার্ট।
আবির স্পষ্ট অনুভব করে নারী দেহে ইতোমধ্যেই শীত কাটা দিয়ে উঠেছে। আবিরের দুষ্টুমি বেড়ে যায়। গরম পৃষ্ঠ দেশে বুলাতে থাকে নিজের শীতল হাত খানা। যখন চড়ুই পাখির শরীরের তাকে আবিরের হাতও কিছুটা উষ্ণ হয়ে যায় তখন আর চড়ুই পাখির শীত লাগে না,মেয়েটা আবার পাড়ি জমায় ঘুমের দেশে। আবির নিজের তর্জনী আঙুল চেপে চেপে চড়ুইয়ের পিঠের মেরুদণ্ডের হাড় গুলো গুনতে থাকে, কি মজা পায় সেই জানে। তার পর হঠাৎই চড়ুই পাখির সারা মুখে ঘন ঘন চুমু খেতে থাকে। চোখে, নাকে, গালে, ঠোঁটে সবটা জুড়ে খেলে যায় আবিরের ওষ্ঠের ছোঁয়া। বেশ অনেকক্ষণ পর আবির থামে। চড়ুইয়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আপন মনেই বলে ওঠে...
"আল্লাহ এই মেয়েটা আমার সব রকম ভাবে চাই। প্রেমিকা, বউ, আমার আম্মুর বউমা, আমার বাচ্চাদের মা সব রূপে এই মেয়েটাকেই দেখতে চাই আমি। সে ফর্সা, কালো, চিকনি, ভুসকি যেমনই হোক তুমি একে আমার করে দাও আল্লাহ, এই মেয়েটাকে তুমি আমার করে দাও। একান্তই আমার করে দাও। আমি গর্ব করে বলতে চাই সে আমার, এই টুকু অহংকার করার সুযোগ আমায় দাও আল্লাহ। "