আবির নেমে আসতেই নিবিড় ম্যাগাজিন ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। সাবিহার দিকে তাকিয়ে 'আসছি' বলে বেরিয়ে যায় দু জনই।
দোয়েলের দৃষ্টি এখনো দরজার দিকেই সীমাবদ্ধ। বুকের ভেতর দামামা বাজানোর অনুভূতির মানেটা বুঝে সে। নিবিড় তাকে ইগ্নোর করছে, চালাক দোয়েল তা বেশ বুঝে গেছে। তবে কি লোকটা আর তাকে ভালোবাসে না?
কাঁধে কারোর স্পর্শ পেতেই মুখ তুলে তাকায় দোয়েল। সাবিহা মাত্রই পাশে এসে বসেছে তার।
"আমার ছেলেটাকে কি বলেছিস বল তো? কাল সকাল থেকে দেখছি কেমন করে আছে। "
সাবিহার এহেন প্রশ্নে থেমে যায় দোয়েল, বার কয়েক ঢোক গিলে ভাবতে থাকে কি উত্তর দেওয়া যায়। হাতের ছুরিটা রেখে উঠে যেতে নিয়ে বলে...
"বোনকে জাগিয়ে আসি আম্মু। আর কতক্ষণ ঘুমাবে..."
সাবিহা খপ করে তার হাত চেপে ধরে বসিয়ে দেয়..
"আমার থেকে কথা লুকানোর জন্য পালিয়ে যাচ্ছিস মেয়ে? বড্ড বেশি অবাধ্য হচ্ছিস তো আজকাল। "
দোয়েল নীরব রয়, সাবিহা তার ক্যানোলা যুক্ত হাত খানা নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলে..
"নিবিড়ের কথায় মন খারাপ হয়েছে? "
"তেমন কিছু নয় আম্মু..."
"ও তো তোর ভালোর জন্যই বলছে। ভীষণ ভালোবাসে কি না... "
দোয়েল চমকে তাকায় সাবিহার দিকে। উনি কি করে জানে? সাবিহা হাতের দিকে নজর দিয়েই বলতে থাকে...
"আজকের ইনজেকশনটা দিলেই শেষ, তারপর এটা খুলে ফেলবে। ছোট পাখিটার বেশ কষ্ট হয় এই ক্যানোলার কারনে। উল্টো পাল্টা ঘুমের অভ্যাস কিনা। "
দোয়েলের কানে আদেও কিছু গিয়েছে কিনা কে জানে। সে তো আটকে আছে আগের ঐ কথাটিতেই। তার থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে সাবিহা মুখ তুলে তাকায়। এভাবে স্তব্ধ হয়ে থাকতে দেখে হালকা হেঁসে একটু শাসনের সুরে বলে ওঠে...
"এখন থেকেই আমার ছেলের উপর মান অভিমান করা শুরু করেছিস, বিয়ের পর কি তোর কথায় নাচাবি নাকি নিবিড়কে? "
দোয়েলের কথা আটকায়, আমতা আমতা করে বলতে নেয়...
"এমন কিছুই না আ্ আম্মু... "
"তাহলে কেমন কিছু শুনি? বেশ দেখতে পাচ্ছি তো আমি। ছেলেটা তোর জন্য পাগল বলে যেভাবে ইচ্ছে কষ্ট দিচ্ছিস। কোন দিক দিয়ে ফেলে দেওয়ার মতো আমার ছেলে? ওকে বিয়ে করলে কি তোর জাত যাবে নাকি? "
দোয়েল কি বলবে বুঝে পায় না। সংকোচ নিয়ে বলে...
"উনি আরো ভালো মেয়ে ডিজার্ভ করে আম্মু। আমি তো.. "
"তুই কি হুম? "
দোয়েলের গলা কাপে। তবুও বলে...
"আমি তো অ্ অনাথ... "
সাথে সাথেই ঠাস করে একটা থাপ্পড় এসে পড়ে তার গালে। সাবিহাই দিয়েছে। বেশ লেগেছে ও থাপ্পড়টা।
রান্না ঘর থেকে এমন দৃশ্য দেখে ছুটে আসে জুলেখা আর তারা। জুলেখা দ্রুত দোয়েলের মাথাটা নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে সাবিহার উপর হালকা চেচিয়ে ওঠে...
"ভাবি, কি করছো তুমি? কেন মারছো মেয়েটাকে হ্যা?"
সাবিহাকে বলেই ক্ষ্যান্ত হয় নি সে। গলা উঁচু করে আজমলকেও ডাকতে থাকে।
"ভাইয়া? ভাইয়া এদিকে আসুন তো একবার, দেখে যান ভাবি কি করছে। "
সাবিহা ত্রস্ত হাতে জুলেখার থেকে দোয়েলকে আবার টেনে নিয়ে আরো দু তিনটে থাপ্পড় মারতে মারতে বলে ওঠে...
"বেশ করেছি মেরেছি, আরো মারবো। এই মেয়ের কত বড় সাহস, বলে কিনা ও অনাথ। এমন কথা কি করে বলে এই মেয়ে। "
আজমল মাত্রই চোখের চশমাটা ঠিক করতে করতে নেমে আসছিলো। শরীরটা অসুস্থ থাকার কারনে আজ অফিসে যায় নি তিনি। এমন দৃশ্য দেখে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সাবিহার হাত সরিয়ে দিয়ে দোয়েলকে টেনে সরায়। সাবিহার দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে চেচিয়ে বলে ওঠে..
"সাবিহা!! আমার আম্মাকে কেন মারছো তুমি? এত বড় স্পর্ধা কে দিয়েছে তোমায়?"
সাবিহা দোয়েলের দিকে আঙুল তাক করে বলে..
"ওকেই জিজ্ঞেস করো না কেন মারছি। এত আদর, ভালোবাসার পরেও এই মেয়ে বলে কিনা সে অনাথ। এসব শুনার জন্য ওদের কে আগলে রাখছি আমরা? হ্যা? "
আজমল কুঞ্চিত ভ্রু নিয়ে নিজের হাতে দোয়েলের চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলে...
"তাই বলে ওকে মারবে তুমি? দেখো আঙুলের ছাপ পড়ে গিয়েছে গালে। কি হাল করেছো তুমি? আমার মেয়েরা অসুস্থ জানো না তুমি? "
দোয়েল এক হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আস্তে করে বলে...
"আম্মুকে বকো না তোমরা।"
বুক ভেঙে আসে সাবিহার। চোখের কোনে জল ভীড় করে তার। এক হাতে সাবধানে দোয়েলকে টানতে নিলেই আজমল দ্রুত সরে বলে...
"একদম নেবে না আমার আম্মাকে.।। "
সাবিহা আস্তে করে বলে..
"মারবো না,দেখি, এদিক আয়.."
দোয়েল এগিয়ে গেলেই সাবিহা দু হাতে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে। তিনি নিজেও কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে। দোয়েলের চুলের ভাঁজে ঘন ঘন হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে...
" আর কি করলে আমাদেরকে নিজের আপন করবি তুই আম্মু? দেখ আজ তোর মায়ের মতো করে শাসন করেছি তোকে, মেরেছি আমি আমার মেয়েটাকে৷ কেন তুই নিজেকে অনাথ ভাবিস? আমরা তোর কেউ না? আমি কি তোকে মায়ের মতো ভালোবাসতে পারছি না আম্মু? আমার ছেলেটা তোকে চোখে হারায় রে মা। আমি যে সেই কবে থেকে মনে মনে তোদের আমার ঘরের লক্ষী করার ইচ্ছে পুষে রেখেছি তা তোদের আব্বু বেশ জানে, জিজ্ঞেস কর একবার। আল্লাহর প্রতি আমার হাজার শুকরিয়া যে আমি যাকে পছন্দ করেছি আমার ছেলেও ঠিক সেই মেয়েকেই ভালোবেসেছে। তুই রাজি হয়ে যা না আম্মু, আমার সাথে থেকে যা না বাকিটা জীবন। "
দোয়েল অঝোর ধারায় কাঁদছে সাবিহার বুকে মুখ লুকিয়ে। কাঁদতে কাঁদতেই বলে..
"আমায় তুমি জোর করো না আম্মু, আমার সাথে তো উনার যায় না। উনি যথেষ্ট সুন্দর, শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত। উনার জন্য কত ভালো ফ্যামিলির মেয়েরা আসবে, আমি তো তাদের ধারে কাছেও নেই আম্মু।গাছে মাছে সম্পর্ক যে বড্ড খারাপ। "
আজমল এগিয়ে আসে, দোয়েলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে...
"আম্মুরে, তোর মনে হয় আমরা কখনো তোর পরিবার, যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবো? তোর পরিবার তো আমরাই, আর তুই আমার নিবিড়ের যোগ্য। তোর মতো লক্ষী একটা মেয়েই তো চেয়ে এসেছি আমরা। তোরা ছাড়া আমার ছেলেদের যোগ্য কোনো মেয়ে হতেই পারে না আম্মু৷ আর যেখানে নিবিড় নিজেই তোকে পছন্দ করে, ভালোবাসে, সেখানে কেন তুই আমার ছেলেটাকে দিনের পর দিন কষ্ট দিবি মা? আমাদের এই কথাটা রাখ মা, অন্তত এতদিনের ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে তুই আমার ঘরের বউ হয়ে আয়। নিবিড়কে বিয়ে কর আম্মু।"
" আমি পারবো না আব্বু, আমি পারবো না। "
বলতে বলতেই মুখ তুলে তাকায় দোয়েল।হাতের পিঠে চোখ মুছে নিয়ে আবার নিজেকে শান্ত করে বলে..
"শোনো না তোমরা। আমার বোনটা ভিষণ অবুঝ জানোতো। আ্ আমি চাই না আমার বোনটা আমাকে ছাড়া একা চলুক।আ্ আমি ওকে একজন ভালো মানুষের হাতে তুলে দিতে চাই, ওর একটু যত্ন দরকার, একটু ভালোবাসা দরকার বুঝলে তো। ওকে এসব এনে দেওয়া আমার দায়িত্ব, আ্ আমি তো ওর বড় বোন তাই না? এক মিনিটের হলেও তো বড়। আল্লাহ আমায় জ্ঞান দিয়েছে তো আমার বোনকে দেখে রাখার জন্যই। আমি নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারি না। আমার বোনের জন্য ভালো কাউকে না পাওয়া পর্যন্ত আমি বিয়ে করতে পারবো না আব্বু, প্লিজ। আ্ আমি তোমাদের ভালোবাসি আম্মু, আ্ আমি তোমাদের সবাইকে ভালোবাসি , আ্ আমি ন্ নিবিড় ভাইয়াকেও ভ্ ভালোবাসি। কিন্তু সবার আগে আমার বোন, আমার বোন আমার সব, ওকে আমি একা ভাসিয়ে দিতে পারবো না। আমি নিজের সব ভালোবাসা ত্যাগ করতেও দু বার ভাববো না ওর জন্য, আমি আমার বোনকে ছাড়া বাঁচবো না আম্মু। আমি তোমাদের কাছে সুখে থেকে আমার বোনকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দিতে পারবো না। আল্লাহ নারাজ হবে আমার প্রতি, আমার জন্মদায়িনী আম্মু আমায় অভিশাপ দিবে। আমি বোনকে এড়িয়ে যেতে পারবো না। প্লিজ একটু বুঝো তোমরা... "
দোয়েল ডুকরে কেঁদে ওঠে। বয়সের কোঠায় মাত্রই উনিশে এসে ঠেকেছে এই মেয়েটার। কিন্তু উপরওয়ালা তার বিবেচনাবোধ ইতোমধ্যেই একানব্বইদের মতো করে দিয়েছেন৷ এতটা ম্যাচিউরিটি, এতটা ভবিষ্যৎ অন্বেষনী, কর্তব্য পরায়ন এই বাচ্চা মেয়েটা। যে কেউ তার বিবেচনার ধরন দেখে অবাক হতে বাধ্য। এই টুকুন বয়সেই মাথায় কত রকমের চিন্তা আর চিন্তা। ইশশ, সময়টা তার উড়ে বেড়ানোর, অথচ পাখিটা শিখছে কিভাবে ঘুরে দাঁড়ানো যায়,কিভাবে একটু ভালো থাকা যায়, কিভাবে নিজের অবুজ বোনটার জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করা যায়।
এই বাড়ির প্রতিটি মানুষ চেনে এই মেয়েটাকে। নিজের বাচ্চাসুলভ ইচ্ছে গুলোয় আস্তরণে ঢাকা দিয়েছে সে৷ বড়দের মতো ভাবতে শিখেছে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়ে। এতটা বুঝদার হতেও তো চায় নি সে, যতটা বুঝদার মানুষ হলে নিজের নিম্ন আকাঙ্খার ইচ্ছে গুলোও প্রকাশ করা যায় না। হুটহাট মুক্তমনাদের মতো একটু ঘুরে বেড়ানো যায় না, বাচ্চাদের মতো বায়না করা যায় না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে রঙিন শহর অনুভব করেও প্রকাশ করা যায় না। বৃষ্টি দেখলেই পরবর্তীতে জ্বর ওঠার চিন্তা না করেই দু হাত মেলে বৃষ্টিতে ভেজা যায় না।
দোয়েলের ও তো ইচ্ছে করে এসবের , ইচ্ছে করে রাস্তার ধারে হাওয়াই মিঠাই দেখলেই ছুটে যেতে, ইচ্ছে করে চৌরঙা চরকি হাতে এলোচুলে ছুটতে, খিলখিলিয়ে হাসতে, বাচ্চাদের মতো ডাঙায় জমা পানিতে লাফিয়ে সমস্ত ভিজিয়ে দিতে, ইচ্ছে করে মাটি থেকে ফুল কুড়িয়ে নিয়ে আকাশের দিকে ছু্রে মারতে। খোলা হাওয়ায় গলা ছেড়ে গান ধরতে। কিন্তু বাস্তবতা, ইচ্ছে গুলোকে কোথায় যেন লুকিয়ে দিলো দোয়েলের। ইচ্ছে গুলো কেউ জানে না, কখনো জানতেও চায় না। ধুলোর আস্তরন জমতে জমতে সেই ইচ্ছে গুলোর অস্তিত্বই বিলীন হয়ে গেছে কবে যেন। দোয়েল পাখি আর খুজে পায় না সে সব। পাওয়ার আশাও করে না।
আজমল এগিয়ে এসে দোয়েলের কাঁধ জড়িয়ে ধরে দাঁড়ায়। দৃঢ়তার সহীত বলে....
"ছোটপাখির বিয়ের আগে তোকে কেউ বিয়ের জন্য জোর করবে না। আসছে শুক্রবার সন্ধ্যায় আমার ছেলে নিবিড় বিন চৌধুরী আর আমার হবু বউমা দোয়েল রাহমানের আংটিবদল অনুষ্ঠানের আয়োজন করো সবাই। এই কথার উপর আমি আর কোনো কথাই শুনতে চাই না। দু পক্ষের হয়েই চূড়ান্ত সীদ্ধান্তটা নিয়ে নিয়েছি আমি। ব্যাস।"
দোয়েল চমকায়, দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে বলতে নেয়...
"কিন্তু আব্বু... "
"তুই চাইলেই আমার সীদ্ধান্তে আপত্তি জানাতে পারিস। কিন্তু মনে রাখিস, তোর সাথে আবার এই বাবা মেয়ের সম্পর্কটা আর স্থায়ী হবে না কোনোদিন। এবার তোর যদি এত দিনেও আমাদের প্রতি মায়া না জন্মায় তাহলে তুই না করে দিস। "
বলেই আজমল চৌধুরী থামলেন। দোয়েল আর কিছু বলতে পারে না। নীরবে ভাবতে থাকে ঠিক কি হতে যাচ্ছে তার জীবনে। নতুন শুরু? নাকি আরো একটি বিপদের আশঙ্কা, তার এমন সীদ্ধান্তে যদি তার চোনের কোনো ক্ষতি হয় তো? দোয়েল তো নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না কোনোদিন।
"বোনের বিয়ে? ইয়াহুউউ.. সক্কাল সক্কাল এত্তো দারুণ একটা খবর পাবো ভাবতেই পারি নি। আব্বু আব্বু আব্বু, কি শুনালে গো তুমি এই মাত্র, মেরা তো দিল খুস হোগেয়া...."
সিঁড়ির দোরগোড়া থেকে কথা গুলো বলতে বলতেই হাসি মুখে ছুটে আসছে চড়ুই পাখি। আজমল চৌধুরী হেসে সতর্কতার সহীত বলে..
"আরে আস্তে আস্তে, পড়বি তো রে আম্মা... "
কে শুনে কার কথা। চড়ুই এসেই জড়িয়ে ধরে আজমলকে। আজমলও হাসি মুখে আগলে নেয় চড়ুইকে। বলে উঠে...
"এই গ
তো আমার আরেকটা আম্মাও চলে এসেছে।, এভাবে কেউ ছুটে রে আম্মা? অসুস্থ না তুই?"
চড়ুই কিটকিটিয়ে হেঁসে মুখ তুলে বলে...
"তুমি যা শুনালে, আমার সব অসুখ ইলাটিং বিলাটিং ছুহ হয়ে গিয়েছে বুঝলে। আল্লাহ আমার কি যে খুশি লাগতেছে। বোন আর নিবিড় ভাইয়ের বিয়ে।"
বলতে বলতেই মুখ তুলে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে চড়ুই..
"জানো তোমরা? নিবিড় ভাই তো বোনকে ভীষণ ভালোবাসে। আরেহ ঐ দিন ছাঁদে তো তোমরা ছিলে না। নিবিড় ভাই কি দারুন ভাবে বোনকে প্রপোজ করেছে। "
আজমল অবাক হওয়ার ভান করে বলে...
"তাই নাকি? বড় পাখি তো বললো না আমাূের কিছু। "
মাথা ঘুরিয়ে দোয়েলের দিকে তাকিয়ে বলে..
"এ তো ভারী অন্যায় আম্মা। "
চড়ুইয়ের লাগাম ছাড়া কথায় দোয়েল লজ্জায় মরি মরি অবস্থা। মেয়েটা আব্বু আম্মুর সামনে কি সব বলেই যাচ্ছে ইশশ...
সাবিহা হেঁসে বললো..
"হয়েছে থাক, আমার মেয়েটাকে আর লজ্জা দিতে হবে না। দেখো গাল দুটো লাল হয়ে যাচ্ছে তার। "
চড়ুই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললো..
" ওহ আসল কথা বলি। আমার ঘুম ভাঙালো কে বলো?"
জুলেখা বুঝতে না পেরে বলে...
"তুই তো নিজে নিজেই উঠে এসেছিস, কেউ তো ভাঙায় নি। "
চড়ুই পাখি দু হাত কোমড়ে ঠেকিয়ে নাক ফুলিয়ে বললো..
"উঠেছি কি আর সাধে? ঘুমের মাঝে মনে হলো কেউ যেন আমায় থাপড়িয়ে গাল লাল করে দিচ্ছে। উঠে দেখি কেউ নেই। তখনই বুঝলাম বোনকে মারছে। কে মেরেছে আমার বোনকে?"
সাবিহা এগিয়ে এসে চড়ুইয়ের থুতনি ধরে এদিক ওদিক চেয়ে বললো..
"ইশশ, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম আমার এক মেয়েকে মারলে আরেক মেয়েও ব্যথা পায়। আর মারবো না রে আম্মু.. "
কথাটা শুনেই চড়ুই দোয়েলের দিকে তাকিয়ে চোখ গোল গোল করে বলে ওঠে...
"এমাহ বোন, বিয়ের আগেই শাশুড়ীর হাতে থাপ্পড় খেলি? কি কান্ড কি কান্ড... "
সাবিহা বলে..
"ভাগ্যিস আমার ছেলে নেই এখানে,ও থাকলে মারতে পারতাম নাকি?"
আজমলও বলে..
" আর যেন আমার আম্মুদের গায়ে হাত তুলতে না দেখি। তোমরা কেনাকাটা শুরু করে দাও। আমি পাখিদের বাবা..... নাহ কাকাইয়ের সাথে কথা বলে নিবো।"
-----------
বিকেলের সময়টায় অফিসে কন্ফারেন্স মিটিংয়ে ব্যস্ত টুইনস ব্রাদার্স। রাতুল এসে নিবিড়কে আস্তে কিছু একটা বলতেই নিবিড় মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। পাঁচ মিনিটের মধ্যে মিটিং শেষ করে বেরিয়ে এলো দুজন।
" এনিথিং ইনপর্ট্যান্ট?"
আবিরের প্রশ্নে নিবিড় সামনে এগিয়ে যেতে যেতেই বলে...
"নাথিং, আহিশ এসেছে নাকি। "
আবিরের মেজাজ বিগড়ে যায়। বলে ওঠে...
"ওর জন্য মিটিং ক্লোজ করতে হয় ইডিয়েট?"
"নাহ, আব্বুও নাকি আসছে। তাই ক্লোজ করেছি। "
আবির ভ্রু কুঁচকে বললো..
"এই সময় কেন? "
"তুই যেকানে আমিও সেখানে। জানবো কি করে? আমার মাথায় কি এক্সট্রা সেন্সর লাগানো আছে? "
আবির কথা বাড়ায় না। এগিয়ে যায় ওয়েটিং রুমের দিকে। ভেতরে ঢুকতেই দেখে আহিশ বসে আছে। তার পাশেই মধ্য বয়ষ্ক একজন লোক আর একটি মেয়ে। আহিশ হেঁসে হেঁসে তার সাথেই কথা বলছে। আবির নিবিড় প্রবেশ করতেই লোকটি উঠে দাঁড়িয়ে বলে...
"আসসালামু আলাইকুম স্যার। "
আবির নিবিড় সালামের উত্তর দেয়। আবির আড়চোখে তাকায় আহিশের দিকে৷ নিবিড় লোকটিকে জিজ্ঞেস করে..
"আপনাকে তো চিনলাম না? "
লোকটি ইতস্তত বোধ করছে দেখে আহিশ এগিয়ে এসে বলে..
"উনি হলেন পাখিদের কাকাই। বড় আব্বু ডেকেছেন। আর এটা হলো হৃদ, পাখিদের চাচাতো বোন।"
নিবিড় আহিশকে গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে..
"উনি ও কি ওদের বাবার মতো নিয়ে যেতেই এসেছে? এমন কিছু হলে আ'ম সরি, কথা বলতে পারছি না।"
আহিশ এগিয়ে এসে বলে..
"আরে না নাহ, উনি তো বিয়ের ব্যপারে... "
আহিশের কথা শেষ হওয়ার আগেই হৃদ তাকে ধাক্কা দিয়ে সামনে থেকে সরিয়ে বলে..
"সরুন তো... "
আহিশ দু কদম সরে গিয়ে নিজেকে সামলে মুখ কুঁচকে বলে ওঠে..
"নাগা মরিচ করে কি.."
হৃদ তার কথায় পাত্তা না দিয়ে আবির নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে ভাবুক দৃষ্টিতে বললো...
"আপনাদেরকে কোথায় যেন দেখেছি আমি... "
বলেই থুতনিতে আঙুল ঠেকিয়ে ভাবতে থাকে সে। পরক্ষণেই তুড়ি বাজিয়ে বলে ওঠে...
"ওহ মনে পড়েছে, গুগলে হ্যান্ডসাম ম্যান লিখে সার্চ দিলে আপনাদের ছবি আসে। ও মাই গড, পাখিদের বর আসলেই আপনারা হবেন? "
নিবিড় হেঁসে ফেলে, বলে ওঠে...
"তুমি ছোটপাখির জেরক্স মনে হচ্ছে। "
হৃদকে থামিয়ে আমোজ রাহমান বলে ওঠে...
"দুঃখীত স্যার৷ আমার মেয়ের কথায় কিছু মনে করবেন না।"
আহিশ বলে..
"ঠিক ভাই, একে তো আনার কথা ও ছিলো না। কলেজে ভর্তি হতে এসে ড্যাং ড্যাং করে নাচতে নাচতে চলে এসেছে। "
আবির হাত উঁচিয়ে আহিশকে থামিয়ে দিয়ে আমোজকে সোফার দিকে ইশারা করে বলে...
"বসুন। "
আবির নিবিড়ও গিয়ে বসলো সোফায়। আমোজও বেশ সংকোচ নিয়ে বসলো। আবিরের ফোনে কল আসতেই দেখে সাবিহার কল। আবির রিসিভ করে কানে দেয়।
" শোন পাখিদের চাচা নিবিড়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছে, উনি কিন্তু যথেষ্ট ভালো মানুষ। রুড কথা বলিস না যেন। "
সাবিহার কথার উত্তরে আবির বলে..
"ওকেয়.. "
"আর শোন, তোদের বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আগামী শুক্রবার পাখিদের এঙ্গেজম্যান্টটা করিয়ে রাখবে। সময় করে চার জনের আংটি বানানোর জন্য দিয়ে দিস, আমার মেয়েদের আংটিতে যেন কোনো খুঁত না থাকে। সাথে আহিশকেও নিয়ে যাস, ওর বউ, মানে ছোটপাখির আংটি ও পছন্দ করেই কিনুক না হয়... "