সকাল বেলাতেই নিবিড় বাইরের পোশাকে রেডি হয়ে হাজির দোয়েলের ঘরে। সারাটা রাত নির্ঘুম দোয়েল, সমীকরণ মিলাতে মিলাতে কিভাবে যে একটা দীর্ঘ রাত পাড় হয়ে গেলো ঠাওরই করলো না সে। একটু আগেই উঠে ফ্রেশ হয়ে বিছানা গুছাতে লাগলো সে। পেছন ফিরে নিবিড়কে দেখেই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠে তার। চোখে ঘনিয়ে আসে আঁধার। লোকটার চাল সে বুঝে উঠতে পারছে না যে একদমই। কাল কেন তাকে সবার সামনে এঙ্গেজম্যান্টটা বাতিল করতে দিলো না সে?
"মিস এটম? "
নিবিড়ের উজ্জ্বল হাসি মুখের উচ্ছাসিত স্বরে ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে দোয়েল। চোখ আরেকটু দৃঢ় করে তাকায় তার দিকে।
" যাক ভালোই হলো জেগে গেছো৷ উমম, রেডি হয়ে তারপর নিচে এসো। আমরা একটু বেরোবো। "
নিবিড়ের কথায় ভ্রু কুঁচকায় দোয়েল। জিজ্ঞেস করে....
"কোথায়? "
নিবিড় হেঁসে বলে..
"উমমম,ওটা সারপ্রাইজ। তুমি এসো, নাস্তা করেই বেরোবো আমরা ওকে? লেট করো না কিন্তু। "
বলতে বলতেই চলে যায় নিবিড়। দোয়েলের মনে সুপ্ত এক আশা জেগে ওঠে নিবিড় তাকে সারপ্রাইজ দেবে। কিন্তু কি? নিশ্চয়ই বলবে গতকাল মুনিয়ার ব্যপারটা মজা করেছিলো সে।
দোয়েলের মুখে সে এক চমৎকার হাসি খেলে যায়। আপন মনেই বিড়বিড় করতে করতে কাবার্ড থেকে জামা খুঁজে বের করতে থাকে..
"আমি জানতাম, নিবিড় ভাইয়া আমাকেই ভালোবাসে। উনি শুধু আমারই। আমি জানতাম। "
পছন্দের একটি সুতির গাউন খুঁজে নেয় সে। খুশিতে আত্মহারা মেয়েটা যত দ্রুত সম্ভব তৈরি হয়ে নেয়। নিবিড় তাকে সারপ্রাইজ দেবে, আজ সে নিবিড়ের জন্য একটু সাজবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। জামার সাথে মিলিয়ে কানে ছোট্ট ঝুমকা ঝুলিয়েছে সে। চোখের নিচে কাজল দিয়েছে, ঠোঁটে হালকা পিংক লিপস্টিক দিয়ে নিজের ঢেউয়ের মতো চুলগুলো পিঠ জুড়ে ছাড়িয়ে দিলো।
ঠোঁটের কোনের মিষ্টি হাসিখানা আজ যেন একটু বেশিই ফুটে উঠেছে দোয়েল পাখির। ভেতরের জমিয়ে রাখা ইচ্ছে গুলো ভীষণ ভাবে ডানা মেলতে চাইছে। আজ আর কোনো চিন্তা নেই,একটি সু শৃঙ্খল জিবনের তাগিদে এদিক ওদিক চাতকের ন্যয় তাকানোর ধকল নেই।
আজ এক মুক্ত পাখির মতো সিঁড়ি বেয়ে লাফাতে লাফাতে নেমে আসে দোয়েল। রান্না ঘর থেকে এভাবে নামতে দেখে সাবিহা এগিয়ে এসে বললো...
"কিরে আম্মু? আজ এত তারাতাড়ি উঠে গেলি যে? "
আজমলও হেঁসে জিজ্ঞেস করলেন..
"ছোট পাখি, কোথাও বের হবি নাকি? "
দোয়েল টেবিলে বসতে বসতে হেসেই বলে..
"আব্বু আমি দোয়েল৷ "
চমকে তাকায় সকলেই। চুলের দিকে খেয়াল করে দেখে আসলেই এটা দোয়েল৷ কিন্তু চঞ্চলায় যেন আজ ছোটপাখির রূপ ধারণ করেছে সে। নিবিড় আগের মতোই হেঁসে তাকায় দোয়েলের দিকে। কপালের পাশে এসে পড়া চুল গুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে লাজুক হেঁসে মাথা নুইয়ে নেয় দোয়েল।
আবিরও তাকিয়ে দেখে আসলেই দোয়েল কি না। চড়ুই পাখি আবার কোনো দুষ্টুমিতে মজেনি তো সকাল সকাল?
এক দৃষ্টিতে দোয়েলের দিকে তাকিয়ে থাকে আবির। খুব একটা বেশি সময় লাগলো না চিনতে। এটা আসলেই দোয়েল। তবে সচরাচর এমন প্রাণখোলা হাসি খুব একটা দেখাই যায় না দোয়েলের মুখে।
"আমার আম্মাকে আজতো বেশ খুশি খুশি দেখাচ্ছে, কি ব্যপার বলো তো গিন্নি? "
আজমলের কথায় সাবিহাও এগিয়ে এসে নাস্তা বেড়ে নিয়ে দোয়েলের মুখে পুরে দিতে দিতে বলে..
"আমি ও তো তাই ভাবছি। কোথায় বেরোচ্ছিস আম্মু এত মিষ্টি করে সেজে? "
দোয়েল লজ্জায় রাঙা হয়। বলবে কি করে সে এত সেজেগুজে নিবিড় ভাইয়ের সাথে বেরোচ্ছে?
তার আর কষ্ট করতে হয়নি। নিবিড়ই বলে ওঠে...
"আমার সাথে যাচ্ছে আম্মু। একটু ঘুরে আসবো এই আর কি৷ "
জেসি টেনে টেনে বলে..
"ওওও তা হলে এই ব্যপার? ডেটে যাচ্ছে বলে বড় পাখি আজ সেজেগুজে বেরিয়েছে? বাবাহ!!! "
দোয়েল পারে না লজ্জায় মাটির নিচে লুকিয়ে যেতে। আমতা আমতা করে বলে ওঠে..
"ত্ তুই চুপ করবি? এমন কিছুই না। "
আহিশ এবার দোয়েলের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে..
"তা হলে কেমন কিছু? আমাদের বল? "
দোয়েল চোখ গরম করে বলে..
"আহিশসার বাচ্চা... "
আহিশ সহ বাকিরাও হেঁসে ওঠে৷ একটু থেমে আহিশ আড় চোখে আবিরের দিকে তাকায়। পরক্ষনেই দৃষ্টি সরিয়ে ব্রেডে কামড় দিয়ে টেনে টেনে বলতে থাকে...
"নিবিড় ভাইয়ের তো ভাগ্য ভালো, বড় পাখিকে নিয়ে ডেটে যাচ্ছিস।আর আমার বিবিকে দেখ, পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে এখনো। কোথায় আমরাও একটু রোমান্টিক ডেটে যাবো, তা নয়... "
আহিশের কথা সম্পূর্ণ না হতেই আবির ভারিক্কি কন্ঠে বলে ওঠে...
" শুনলাম আজকাল নাকি খুব ক্লাস বাংক দিচ্ছিস তোরা? পাখিরা না হয় অসুস্থ, তোর কি সমস্যা? "
হ্যা, বিষয়টা সম্পূর্ণই সত্য। এই কয়েকদিন জেসি ছাড়া মোটামুটি বাকি তিনজনই ক্লাসে রেগুলার নাহ। জেসি ও যায় কেন তা আহিশ বেশ বুঝতে পারে। ভার্সিটির সিনিয়র ক্রাশ হয়েছে যে তার। তাকে দেখার জন্য হলেও তো জেসিকে যেতে হয় ভার্সিটিতে। কিন্তু আহিশের নাগা যখন এখানে, তাহলে আহিশ ভার্সিটি গিয়ে কি আঙুল চুষবে নাকি একা একা? নো ওয়ে..
আড়চোখে একবার হৃদের দিকে তাকিয়ে দেখে মেয়ে আপন মনে গিলতে ব্যস্ত। এদিকে মেয়ের একটা মাত্র প্রেমিক পুরুষ যে বড় ভাইয়ের দমক খাচ্ছে তার যেন কিছুই যায় আসে না হৃদের। মনে মনে হৃদকে নতুন করে ' বেদ্দপ বেডি ' উপাধি দিয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে ক্যাবলা হাসলো আহিশ।ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে থাকে..
"আসলে ভাইয়া, বাড়িতে বিয়ের আমেজ, আর ছোটপাখি অসুস্থ, ওর খেয়াল তো রাখতে হবে তাই না? "
কথার উপর আবির আবার বলে ওঠে...
" ছোট পাখি একা না, বড় পাখিও তো অসুস্থ, খেয়াল রাখলে ওর ও রাখ? "
"বড় পাখির খেয়াল রাখার জন্য তো নিবিড় ভাই আছেই। আর ছোট পাখির জন্য আমিই... "
আবিরের আর সহ্য হয় না। খাওয়া পুরোপুরি শেষ না করেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। টিস্যু নিয়ে হাত মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে যেতে যেতে নিবিড়ের উদ্দেশ্যে বলে...
" অফিস আমি সামলে নেবো, টেক ইউর টাইম.. "
---------
কিজ কক্ষে আরামদায়ক চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে আবির। অফিসে আজ খুবটা কাজ নেই বললেই চলে। রাতুল সামলে নিচ্ছে টুকটাক।
এঙ্গেজম্যান্টের আর মাত্র তিনদিন বাকি। আবির এখনো জানে না কিভাবে কি করবে। সবার সামনে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টায় নিমগ্ন থাকলেও ভেতর ভেতর যেন সে চূড়মাড় হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কোনো ভাবেই নিজেকে বুঝ দিতে পারছে না চড়াই পাখি তার ছোট ভাইয়ের বউ হবে।
অস্থির মন নিয়ে চোখ বন্ধ করে আবির। নিত্য দিনের অভ্যাস হিসেবে আজও চড়াই পাখির উজ্জ্বল হাসি মাখা মুখটা তার চোখের পাতায় ভেসে ওঠে। আবির চোখ খোলে না, আরো আরো শতবার দেখে যেতে চায় তার প্রণয় পাখিকে। কিন্তু এভাবে কতক্ষণ। হুট করেই আবিরের মনে পড়ে গতকাল রাতের কথা। চটপটে মেয়েটা আবিরের সংস্পর্শে এলেই বিড়াল ছানার মতো গুটিয়ে যায়।
আবির বরাবরই একজন পারদর্শী মেয়ে চেয়ে এসেছে। আবিরের প্রতিটি মুভমেন্টের বিপরীত যে নিজেও সাড়া দিবে। নিজ থেকে আবিরকে সিডিউস করবে, নিজের যৌবনের জৌলুশে মাতিয়ে রাখবে আবিরের প্রতিটি রাত।
অথচ চড়াই পাখি পুরোই ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। মেয়েটা কখনোই আবিরের স্পর্শে নিজ থেকে সাড়া দেয়নি। আর না কখনো আবিরকে সিডিউজ করার মতো কোনো কাজ করেছে। কিন্তু আবির সিডিউস হয়ে যায়। কোনো কারন ছাড়াই সে চড়ুই পাখির প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে, অথচ মেয়েটা কিছুই জানে না। আবির যতবারই চড়াই পাখির ঠোঁটে উষ্ণ পরশ দিয়েছে ততবারই চড়ুই নির্বাক ছিলো। আবিরের তালে তাল মেলাতে পারে নি সে কখনোই৷ কিন্তু বার বার ছাড়া পাওয়ার যেই প্রচেষ্টাটা ছিলো তা আবিরকে আরো বেশি আকৃষ্ট করে দেয় যেন। বোকা পাখিটা বুঝতেও পারে না তার প্রতিটি প্রত্যঙ্গের ভাজে আবির ঠিক কতটা বিলীন হতে চায়।
হাফ নিশ্বাস ফেলে আপন মনেই বিরবির করে উঠলো আবির...
"মাই লাভ ল্যাঙ্গুইজ ইজ ফিজিক্যাল টাচ বেইবি৷ ইউ হ্যাভ টু হ্যান্ডেল মি স্মার্টলি। আদারওয়াইজ উই কান্ট টলারেট মাই র্যাশেনাল লাভ।"
" স্যার? "
এমন একটা সময়ে কারোর ডাকে একটুখানি বিরক্তই হলো আবির।চোখ খুলে সামনে সুহাসকে দেখে সোজা হয়ে বসলো সে।
"বলো?"
"স্যার, লাঞ্চ টাইম তো হয়ে গেছে। ওয়ার্ক সাবমিশন আজকের মতো শেষ। সিডিউলে আর কোনো মিটিং নেই। আমি কি যেতে পারি এবার?"
"হুম, ঠিক আছে যাও। "
সুহাস হালকা হেঁসে যেতে নিয়ে বলে..
"থ্যাংস স্যার.."
"শোনো?"
"ইয়েস স্যার?"
আবির মুহুর্ত চুপ থেকে জিজ্ঞেস করে...
" পাখিদের গিফট কাস্টমাইজড নিয়ে প্ল্যান কি? জানো কিছু? "
সুহাস উত্তর দেয়...
"প্ল্যান বলতে, ওদের হাতের কাজ ভালো। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকে নিজেদের পড়ালেখার খরচ চালাতে হয় ওদেরই। বড়পাখি চেষ্টা করেছিলো কোনো সো রুমে সেলস ওমেন এর চাকরি নেওয়ার, কিন্তু বয়স কম, উচ্চতা কম, এসব নানা অযুহাতের কারনে কোথাও চাকরি পায় নি। তাই আমরা সবাই মিলে বলায় এই গিফট কাস্টমাইজিং এর কাজটা শুরু করে। যেহেতু ওদের হাতের কাজ ভালো তাই ঐ মুহুর্তে এর থেকে বেস্ট আর কিছু খুজে পাই নি আমরাও৷ ওদের বাবা বরাবরই ওদের পড়াশোনার খরচ চালাতো না, স্কুলে স্কলারশিপে পড়তো। ওদের কাজ ভালো তাই মোটামুটি ভালোই চলছে কাজটা। আমরা ফ্রেন্ডরাও খুব একটা স্টেবল ছিলাম না। আহিশ সব সময় ফিন্যানসিয়ালি হেল্প করতে চাইতো ওদের,তবে বড় পাখি আত্মসম্মানের কারনে তেমন নিতো না। তাই টুকটাক কাজ করে দিয়ে আমরা যতটুকু পারি হেল্প করি আরকি।"
আবির শুনে। টেবিল থেকে ফোন হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করে..
"পেইজের নামটা বলো তো?"
সুহাস বলতেই আবির পেইজ ভিজিট করে। মোটামুটি পর্যায়ে আছে বোঝা যায়। সুহাস হালকা হেঁসে বলে...
"ওদের স্বপ্ন একদিন নিজেদের শপ দিবে। জানি না আল্লাহ তেমন ভাগ্য ওদের দিয়েছে কি না।"
আবির নীরব থাকে। সুহাসকে চোখের ইশারায় যেতে বললে চলে যায় সে। আবির হাসে।কিছু একটা মাথায় আসতেই পেইজে মেসেজ দিয়ে একটা সোপিস এর অর্ডার দেয়। ভাবনায় ছিলো এই বাহানায় চড়াই পাখিকে বাড়ি থেকে বের করে একটু দেখা করবে। বাড়িতে তো সাবিহা এখন পাহারায় রাখে যেন। বাইরে দেখা করা ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই তার।
কিন্তু ওপাশ থেকে মেসেজ আসলো আজ হবে না,কাল ডেলিভারি দিতে পারবে৷ আবির আর কি করবে, আজ না হোক, কাল অন্তত একটা সূক্ষ্ম ডেট করা যাবে তার চড়াইয়ের সাথে।
------
রেস্টুরেন্টের প্রবেশদাড় থেকে শুরু করে ফ্লোরে লাল গোলাপের পাপড়ি ছেটানো। নিবিড়ের সাথে প্রবেশ করতেই দোয়েলের মনটা উৎফুল্লতায় ভরে ওঠে। ভেতরে আর তেমন কেউই নেই। দোয়েল বুদ্ধিমতী, বুঝতে পারলো আগে থেকেই হয়তো নিবিড় রেস্টুরেন্ট বুক করে রেখেছে পুরোটা। ভাবতেই বুকের ভেতর প্রশান্তির হাওয়া বয়ে যায় দোয়েলের৷
" মিস এটম? বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলে হবে? আসো? "
বলতে বলতেই দোয়েলের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় নিবিড়। মুচকি হেঁসে তার হাতে কাঁপা কাঁপা হাতটা রাখে দোয়েল। মেয়েটা আজ ভিষণ চঞ্চল হয়েছে, হাসি খানা মুখ থেকে সরছেই না যেন তার। প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য বুঝি এভাবেই কাউকে পরিবর্তন করে দিতে পারে?
ভেতরে যেতেই একটা সাজানো টেবিলের দিকে এগিয়ে যায় নিবিড় দোয়েলকে নিয়ে৷ দোয়েল অপলক তাকিয়ে থাকে নিবিড়ের দৃঢ় হাতটার দিকে। কতটা আস্থা জন্মাচ্ছে তার এই লোকটার প্রতি? কতগুলো স্বপ্ন বাসা বাঁধতে শুরু করেছে এই মনে। একটা সুন্দর সংসার, একটা যত্নশীল, ভালোবাসা পরায়ন জীবন সঙ্গী কি তবে দোয়েলও পেতে যাচ্ছে? লোকটা তাকে সব সময় এমন করে আগলে রাখবে তো? ঠিক এভাবেই শক্ত করে হাতটা ধরে রাখবে তো?
চেয়ার টেনে দোয়েলকে বসিয়ে দেয় নিবিড় হাস্যোজ্জল মুখে। টেবিলে ভর দিয়ে দোয়েলের দিকে ঝুকে বললো..
"একটা মিনিট ওয়েট করো মিস এটম।আ'ম যাস্ট কামিং.."
বলেই রেস্টুরেন্টের ভেতরের দিকে চলে যায় নিবিড়। দোয়েল অপেক্ষা করে তার, নিবিড় তো আসবে বলেছে৷ এতক্ষণ ধরে রাখা হাতটার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে সে। ইশশ, নিবিড়ের স্পর্শ, কি এক অবান্তর তৃপ্তিময় অনুভূতি হচ্ছে দোয়েলের।
পায়ের ধ্বনি কানে আসতেই বুঝতে পারে নিবিড় ফিরে এসেছে৷ মুখের হাসি প্রগাঢ় করে লাজুক চোখে সামনে তাকায় সে। নিবিড় এগিয়ে আসছে৷ কিন্তু তার হাতের বেষ্টনীতে আবদ্ধ মেয়েটাকে দেখে দোয়েলের চিত্ত আকুল করা হাসিখানা আর রয় না। শূন্য মস্তিষ্ক নিয়ে কম্পমান পায়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সে। দৃষ্টিতে আটকায় সামনের দুটো মানুষের দিকে। তার প্রণয় পুরুষ আর....
আর তার প্রনয়পুরুষের প্রিয় রমনী মুনিয়া।
দোয়েল ঠিক দেখছে তো?
চোখের সামনে তুড়ি বাজায় নিবিড়। হাসি মুখে বলে ওঠে...
"মিস এটম? আমার হবু বউ, মুনিয়াকে কেমন মানিয়েছে বলো? "
দোয়েলের কি হলো ঠিক? বুকটা ভার লাগছে কেন এমন? মাথার ভেতর বোলতা উড়ছে যেন ভনভনিয়ে। দাঁতে দাঁত ঘর্ষণ করছে কেঁপে কেঁপে।
মেয়েটা বোকা হয়ে যায় যেন আজ। প্রশ্নটাও করে ফেলে বোকার মতোই...
"আ্ আমাদের এঙ্গেজম্যান্টের..."
"নাটক, সবটা হবে নাটক। "
মুনিয়ার ঐ একটা শব্দে দোয়েলের শব্দরা আটকে যায় গলায়। এই মুহুর্তে তার কি করা উচিৎ বুঝতে পারে না সে। শুধু ফ্যানফ্যাল করে তাকিয়ে দেখে সামনের মানুষ দুটোকে।
নিবিড়ের দৃষ্টি নামে দোয়েলের দিকে। কন্ঠনালী বার বার নড়ছে মেয়েটা, ঢোক গিলে কান্না থামানোর এই বৃথা চেষ্টাটা কতক্ষণ টিকবে তা যেন পাখির নিজেরও জানা নেই। মেয়েটা টেবিলের উপর ঠেকিয়ে রাখা বা হাতখানা কাপছে তীব্র গতিতে৷ সে পারছে না এই কম্পন থামাতে। নিবিড় আওয়াজ বিহীন পায়ে এক কদম এগিয়ে এসে নিজের শক্তপোক্ত হাতখানা দিয়ে দোয়েলের হাত চেপে ধরে। চোখে চোখ রেখে বলে...
" ভাই আর ছোটপাখিকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য আমাদের এই এঙ্গেজম্যান্টের নাটকটা করতে হবে মিস এটম। ওদের পথটা পরিষ্কার হয়ে গেলে.... আমি মুনিয়াকে বিয়ে করে নেবো, আর তুমি.... "