বিছানার কোনে হাঁটুতে দু হাত ঠেকিয়ে বসে আছে আবির। ডিভানে বসে ফোনে গেইম খেলছে নিবিড়। আবিরকে এভাবে থম মেরে বসে থাকতে দেখে আড়চোখে একবার তাকায় সে। ফের ফোনের দিকে দৃষ্টি নামিয়ে বলে...
"আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবি? তোর পাখি তো আসবে না। "
আবির চোখ উঁচিয়ে দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে সবল কন্ঠে বলে ওঠে...
"ওয়াইফি ঠিক আসবে। "
"এত ঢং করার কি দরকার ছিলো আম্মুর সামনে? ছোটপাখির জন্য হাত কেটেছে, তাই ছোট পাখিই তোর মুখে তুলে খাইয়ে দিতে হবে, না হলে সোনা খাবে না..এহ,, এখন দেখছিস তো? আম্মু তো ভুলেও আসতে দিবে না ছোটপাখিকে এখানে। বারন করে দিয়েছে আরো। "
হ্যা, নিবিড় ভুল কিছু বলে নি। তখন বাড়ি ফেরার পর আবিরের মাথায় কি খেললো কে জানে? সবার সামনে বলে বসেছিলো চড়ুই যেন তাকে খাইয়ে দেয়।কারন তাকে বাচাতে গিয়েই আবিরের হাত কেটেছে। সাবিহা সাথে সাথেই মানা করে দেয়, আবিরও জেদ ধরে বলে এসেছে যতক্ষণ না চড়ুই খাইয়ে দিবে ততক্ষণ সে খাবে না ব্যস।
ব্যান্ডেজ করার হাতের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে আবির।চড়াই পাখির কি আদেও কিছু যায় আসে না তার ব্যপারে?
"যে তোকে উদাসীন রেখেই শান্তিতে ঘুমাতে চলে যায়, বুঝে নে সেখানে আর যাই হোক, ভালোবাসা নেই।"
নিবিড়ের এরূপ কথায় নাক মুখ কুঁচকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় আবির। শান্ত স্বরে বলে...
"ভালোবাসা আছে, আমার পাখি তা বুঝে উঠতে পারছে না ঠিক। তুই আমার ঘর থেকে বিদায় হ তো, নিজে বড় পাখিকে কষ্টে রেখে আমায় জ্ঞান দিতে এসেছে। "
নিবিড় উঠে দাঁড়ায়, আবিরের কথায় মনে পড়লো তার দোয়েলের কাছে যাওয়া উচিৎ একটু। দেখেই আসুক একটু, মেয়েটা তাকে ভালোবেসে ঠিক কতটা পুড়ছে।
উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই সামনে পড়লো চড়ুই। হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে, মাত্রই হয়তো কড়া নাড়তে যাচ্ছিলো। নিবিড় ঘাড় ফিরিয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে দেখলো তার মুখে বিশ্ব জয়ের হাসি। নিবিড় এবার চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বোঝায় কি..
"আসলে ভাইয়া, দানাবলটা তো কিছু খায়নি তখন থেকে। আম্মুকে বলবেন না প্লিজ আমি যে উনার জন্য খাবার নিয়ে এসেছি। প্লিজ ভাইয়া, আমি আপনার ছোট বোন না?"
নিবিড় চেয়েছিলো চড়ুইয়ে একটু ভয় দেখাবে। কিন্তু মেয়েটার কন্ঠ এত আদুরে যে সে চেয়েও আর পারলো না তা।
"আচ্ছা, যাও রুমে.. "
বলতেই চড়ুই চমৎকার হাসি উপহার দিয়ে আবিরের রুমে প্রবেশ করে। নিবিড় সামনে এগোতেই থেমে যায় সাবিহাকে দেখে। দু জনই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসে।
"আম্মু? কি বুঝ?"
নিবিড়ের মাথা নাড়িয়ে বলা কথায় সাবিহা হেসে বলে...
" ভাবতাম যে এক দিক থেকে। এখন তো দেখছি আমার মেয়েটাও ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। দেখলি এত রাতে কেমন আমার থেকে লুকিয়ে খাবার নিয়ে এলো।ভাবছে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। "
" এবার কি করবে? "
নিবিড়ের কথায় সাবিহা শয়তানি হেঁসে ঠোঁট বাকিয়ে বলে....
"মনে রাখিস তোরা ছেলে মেয়েরা যতই চালাক হোস না কেন, আমি তোদের আম্মা। চুল তো আর এমনি এমনি পাক ধরেনি। আহিশের সাথেই ছোটপাখির বিয়ে দেবো আমি। "
"তো এখন কি ওদের ঘরে যাবে? "
"নাহ, আমি আগেই ধারনা করেছিলাম চড়ুই আসবে, তাই আবিরকে আর খাওয়ার জন্য নিজ থেকে ডাকিনি।।খেয়ে নিক ছেলেটা।,আমি যাই।তুই পারলে কিছুক্ষণ পরে গিয়ে চড়ুইকে আলাদা করবি। "
"ওকেয় আম্মু।"
আবিরের রুমে ঢুকে চোরের মতো দরজা চাপিয়ে চড়ুই এগিয়ে আসে আবিরের কাছে। আবিরের মুখে অদ্ভুত হাসি দেখে জিজ্ঞেস করে....
"এমন হাসছেন কেন? খিদায় কি পাগল হয়ে গেলেন? "
আবির বিরবির করে উচ্চারণ করে....
"My heart smiles when you're around."
"কি বললেন? "
"Nothing "
চড়ুই তড়িঘড়ি করে আবিরের সামনা সামনি বসে প্লেটের ভাত মাখাতে মাখাতে বললো...
"তারাতারি খাবেন ওকেয়? আম্মুর থেকে লুকিয়ে এসেছি। কি হতো আম্মুর হাতেই খেয়ে নিলে আপনার?"
বলতে বলতেই আবিরের মুখে এক লোকমা ভাত তুলে দেয় চড়ুই। আবিরকে আর পায় কে, নীরবে মনের আনন্দে সে প্রেয়শীর হাতে খেতে লাগলো।
চড়ুই এমন ভাবে ফিসফিস করে কথা বলছে যেন কেউ শুনে ফেললেই বিপদ।
"তখন কি খুব লেগেছে গালে? "
চড়ুই করুন সুরে কথাটি বললো,কিন্তু আবির বুঝতে পারলো না ঠিক কিসের কথা বলছে। মুখ ভর্তি খাবার নিয়েই জিজ্ঞেস করলো...
"কখন? "
"ঐ যে আপনাকে মেরেছিলাম যে? "
আবিরের হাসি পায়, মেয়েটার এটা নিয়েও যে চিন্তা হচ্ছে তা ভেবেই সুখ সুখ অনুভব হয়। চড়ুইয়ের ছোট্ট হাতের থাবায় আবিরের গালের চামড়াও নাড়াতে পারে নি, উল্টো হয়তো চড়ুই নিজেই হাতে ব্যথা পেয়েছে। কিন্তু আবির তো এখন ভুলেও সত্যটা স্বীকার করবে না, চড়াই পাখিকে ঢের চেনে সে। এই মুহুর্তে যদি আবির বলে যে সে ব্যথা পায়নি তাহলে মেয়েটা আর কোনো প্রকারই আগ্রহ দেখাবে না বিষয়টা নিয়ে। কিন্তু আবির চায় মেয়েটা তাকে নিয়ে আরেকটু ভাবুক, আরেকটু মায়া দেখাক।
বাচ্চাদের মতো মুখ করে আবির উপর নিচ মাথা ঝাকায়, অর্থাৎ তার খুব লেগেছে। চড়ুই যেন এবার কেদেই ফেলবে। কাপা কন্ঠে আবিরের গালের দিকে তাকিয়ে বলে...
"আমি না খুব সরি। আমি আর করবো বলুন? আপনি এত জেদ করছিলেন তখন। খুব বেশি ব্যাথা পেয়েছেন দেখি?"
চড়ুইয়ের বলতে দেরি, আবির আগ বাড়িয়ে নিজের গাল এগিয়ে আনতে দেরি নেই। চড়ুইয়ের মায়া হয়, কোলের উপর প্লেটটা রেখে বা হাত খানা বুলিয়ে দিতে থাকে আবিরের গালে...
" মন খারাপ করবেন না হ্যা, এই যে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি, ব্যথা কমে যাবে। "
"এভাবে কমে না ব্যথা।"
"তো কিভাবে কমবে বলুন? "
"উমমম, কেউ যখন ব্যথা পায় তখন ব্যথার স্থানে কিসি দিয়ে দিলে ব্যথা চলে যায়। "
চড়ুই অবাক হয়ে বলে..
"সত্যি? "
"হুম.."
"তাহলে আপনিও আপনার ব্যথায় কিসি দিয়ে দিন?"
চড়ুইয়ের এমন বাচ্চামো কথায় আবির হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারে না। মেয়েটার চোখে ঘুম,এতটা রাত পর্যন্ত না ঘুমিয়ে আবিরের খাওয়ার জন্যই হয়তো অপেক্ষা করছিলো। আর এখন ঘুমের কারনে এমন অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে যাচ্ছে। এমনিতেই তো মাথামোটা, এখন যেন তা আরেকটু পাল্লা দিয়ে বেরেছে। আবির মুখ ফুলিয়ে বলে...
"আমি কিভাবে আমার গালে কিসি দেবো ওয়াইফি? তুমিই দিয়ে দাও? "
"আমিইই?"
"হ্যা, তুমি চাও না আমার ব্যথা সেরে যাক? "
"চাই তো, "
"তাহলে দাও? "
চড়ুই পাখি ইতস্তত করে। বেশ কিছুক্ষণ পরে বলে..
"আচ্ছা, দিবো। আগে খাওয়াটা শেষ করে নিন।"
আবির কথা বাড়ায় না, এমন অপ্রত্যাশিত কিছুতে যে মেয়েটা রাজি হয়েছে তাই তো অনেক। মনে মনে জয়ের হাসি হাসে আবির। তার মা যার থেকে আবিরকে দুরে থাকতে বলেছে, আজ সে নিজেই আবিরের কাছে এসেছে, নিজ থেকে চুমু খানাও আয়ত্ত করবে আবির। আল্লাহ, এত সুখও আমার কপালে লিখা ছিলো?
খাওয়া শেষ করে চড়ুই নিজ হাতে আবিরের মুখ ধুইয়ে দিলো, তারপর নিজেও হাত মুখ ধুয়ে আবার ফিরে এলো আবিরের কাছে।
"দিন এবার কিসি দিয়ে দিই? "
আবির এক হাতে চড়ুইয়ের কোমড় জড়িয়ে ধরে নিজের কোলের উপর বসায়..
"এভাবে দিতে সুবিধা হবে। "
চড়ুই বুঝতে পারে না আবিরের চালাকি। তাই আর এত শত না ভেবে নিজের ছোট হাতে আবিরের গাল আগলে ধরে মুখ এগিয়ে নেয়। দ্বিধাহীন মনে আবিরের গালে শব্দ করে একখানা চুমু খেয়ে বসে। আবির ওখানেই থমকে যায়। ভেতর দিয়ে বয়ে যায় এক খুশির স্রোত। চড়ুই সরতে নিলেই আবির নিজেকে সামলে বলে ওঠে...
"বেশি করে দাও, তাহলে তারাতাড়ি সেরে যাবে। "
চড়ুই আসলেই বোকার মতো এক টানা চার পাঁচটা চুমু খেয়ে নিলো আবিরের গালে। হঠাৎ কি মনে করে যেন নিজ হাতেই আবিরের ব্যান্ডেজ করা ডান হাতটা তুলে আলতো করে ব্যন্ডেজের উপরই বার কয়েক চুমু খেয়ে নিলো। আবির লুকিয়ে হেসে ফেলে। মেয়েটা কি করছে...
থামে চড়ুই, আবিরের কোল থেকে নামার প্রস্তুতি নিয়ে বলে...
"যাই নিবিড় ভাইয়াকোও কিসি দিয়ে আসি, উনারও তো গালে, হাতে ব্যাথা করছে তাই না? "
ব্যস হয়ে গেলো। এতক্ষণের পরম সুখময় মুহুর্তটায় চড়ুই এক নিমেষেই পানি ঢেলে দিলো, এই মেয়ে গিয়ে নিবিড়কে চুমু খাবে নাকি, আল্লাহ!!
"ওয়াইফি ওয়াইফি ওয়েটট..."
বলতে বলতেই টেনে ধরে চড়ুইকে। চড়ুই মুখ কুঁচকে বললো...
"কি হলো? "
"নিবিরকে.. নিবিড়কে আমি কিসি দিয়ে দেবো, তোমাকে আর কষ্ট করতে হবে না। "
চড়ুই মানলো, চুপটি করে নড়েচড়ে আরাম করেই বসলো আবিরের কোলে।
"ভাগ্যিস আপনার হাতের আঙুলে কাটেনি। নাহলে তো নিবিড় ভাই পরশু আংটিই পড়াতে পারতো না বোনকে। এঙ্গেজম্যান্টটাই থেমে যেতো। "
আবিরের তড়াৎ করে দৃষ্টি পরে নিজের হাতের দিকে, আসলেই তো। আঙুলে চোট লাগলেই তো আংটি আর পড়ানো যাবে না।
আবির বুঝে যায় তার ঠিক কি করতে হবে। ভাবতেই ঠোঁট বাকিয়ে আপন মনেই হেঁসে ওঠে সে। মনে মনে বিরবির করে..
"সরি ওয়াইফি, একটু তো কষ্ট পেতে হবে তোমায় আজ। "
"কি হলো? হাসছেন কেন আপনি? "
আবির স্বাভাবিক হয়, চড়ুইকে জড়িয়ে নিয়ে তার মাথাটা নিজের বুকে ঠেস দিয়ে ধরে বা হাতে তার সিল্কি চুলের ভাঁজে আঙুল চালাতে চালাতে বলে...
"আচ্ছা, তুমি তখন কাঁদছিলে কেন বলো?লোকটা যখন সিএনজিতে ছুঁয়েছিলো? "
"পঁচা ভাবে ছুঁয়েছে যে তাই, আমার ভয় করছিলো, ঘৃণা লাগছিলো খুব। "
"তাই? তো এখন ঘৃণা লাগছে না? "
"এখন কেন ঘৃনা লাগবে? "
"এই যে আমি তোমায় ছুয়ে আছি? "
"আপনি তো ব্যাডটাচ করছেন না, ঐ লোকটা তো ব্যাড টাচ করেছে। "
"তো আমি কি করছি? "
" আপনি তো আদর ভাবে ছুঁয়েছেন, এই যে আমার তো গা ঘিনঘিন করছে না, আপনি ব্যথাও দিচ্ছেন না। জানেন ঐ লোকটা আমার পায়ের উপর এখানটায় চেপে চেপে ধরছিলো। তারপর হাতটা আরো উপরের দিকে নিচ্ছিলো, আমি তো মেয়ে তাই না? আর মেয়েদের এসব জায়গায় তো এভাবে হাত দিতে পারে না সবাই, তাই না বলুন?"
চড়ুই পাখির চোখে ঘুমের জোয়ার, নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে আবিরকে কথা গুলো এমন ভাবে বলছে আবির চেয়েও মায়া কাটাতে পারে না চড়াই পাখির প্রতি। নিজেও তাল মিলিয়ে প্রশ্ন করে...
"আচ্ছা? কেন সবাই পারে না জানো? "
"হুম জানি তো, এসবে শুধু বরের অধিকার। আর কারোর না। "
আবির আলতো হাসে। চড়ুইও ঘুমের আভাসে মাথা ঠেকিয়ে মুখ গুঁজে দেয় আবিরের বুকে।
"গুড, কিন্তু চড়াই পাখি, এই যে তুমি এভাবে আমার কোলে আছো, এটা যদি অন্য কোনো পুরুষ করে তাহলেও এটি ব্যাড টাচ।এভাবে ব্যথা না দিয়ে ছুলেও সেটা খারাপ বুঝতে পেরেছো? "
"হুম"
"আর নিজের বর ছাড়া অন্য কোনো পুরুষকে কিসি দেওয়াও খারাপ, বুঝলে?"
"হুম। "
"আর তুমি তো খারাপ করবে না, কারন তুমি তো লক্ষ্মী মেয়ে, তাই না? "
"হু.."
"এক্সাক্টলি, তাই এই যে একটু আগে তুমি নিবিড় ভাইয়াকে কিসি দিতে যাচ্ছিলে, সেটাও খারাপ , বুঝতে পেরেছো? "
"হু..."
"আর কখনো এভাবে কোনো ছেলেকে কিসি দিবে না ওকেয়? আহিশকেও না.. "
আর উত্তর আসে না চড়ুইয়ের দিক থেকে। আবিরের হাসি গায়েব হয়ে যায়, মেয়েটাকি তবে এই কথায় এক মত হয় নি? চোয়াল শক্ত হয়ে আসে আবিরের, আহিশের নাম উঠলেই কেন চুপ করে যাবে চড়ুই? তার মানে কি চড়ুই আহিশের প্রতি...
দাঁতে দাঁত চেপে চড়ুইয়ের থুতনি চেপে নিজের দিকে ঘুরাতে ঘুরাতে রেগে বলে ওঠে...
"এটার উত্তর দাও ওয়াইফি... "
হায়, দেবে কি করে? আবিরের কম্ফোর্টারের ভেতর উষ্ণ আবেশে যে সে ছানার মতো ঘুমিয়ে পড়েছে, তার উপর আবির তার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছিলো।
আবির হাফ নিশ্বাস ছাড়ে। এতক্ষণ এই মুহুর্তটারই অপেক্ষা করছিলো সে। ঢোক গিলে নিজেকে প্রস্তুত করে একটা সূক্ষ্ণ কাজের জন্য। যা এই মুহুর্তে করতে মন না চাইলেও করতে হবে তাকে। একটু ঝুঁকে বেডসাইড কেবিনেট থেকে এক হাত বাড়িয়ে ফাস্ট এইড বক্সটা নিয়ে বসে সে। বক্স খুলে তুলো, ডেটল সহ অয়েন্টমেন্ট ব্যান্ডেজ রেডি করে এক পাশে রাখলো সে। তারপর নীরবে ভেতর থেকে ছোট্ট সার্জিক্যাল চাকুটা তুলে নিলো হাতে। চড়ুই পাখির কোমল বা হাত খানা এক হাতে তুলে নিলো সে।
"আ'ম সরি ওয়াইফি। এটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই আমার। তোমার হাতে আমি কিছুতেই আহিশকে আংটি পড়াতে দেবো না সোনা। তাই তোমাকে একটু কষ্ট পেতে হবে৷ তুমি তো শুধু আমার, আর তোমাকে পাওয়ার জন্য এটুকু তো করতেই হবে আমায়৷ প্রয়োজনে তোমার পুরো হাতটাই কেটে শরীর থেকে আলাদা করে ফেলবো আমি, তবুও আহিশকে আংটি পড়াতে দিবো না তোমার আঙুলে।"
নিজেকে প্রস্তুত করে ছুরি খানা এগিয়ে নেয় চড়ুইয়ের হাতের দিকে, এই কোমল হাত খানা থেকে রক্ত ঝড়াতে যাচ্ছে আবির। তাও ইচ্ছেকৃত ভাবেই।, ইশশ এমনটা তো করতে চায় নি সে, কিন্তু পরিস্থিতি তার পক্ষে নেই। করতেই হবে এটা তাকে। চোখ বন্ধ করে ছু'রির কোনা ঠেকায় চড়ুই পাখির অনামিকা আঙুলের গোড়ায়, তারপর চুম্বকীয় গতিতে লম্ব বরাবর একটা পোচ........
--------
দোয়েলের ঘরে আসার উদ্দেশ্য হলো মুনিয়াকে নিয়ে কয়েকটি প্রেমময় কথা বলে মেয়েটিকে উষ্কাবে নিবিড়। কিন্তু হায়, সমস্ত চিন্তা ভাবনার উপর পানি ঢেলে দিয়ে মেয়েটা শান্তিতে গালের নিচে হাত দিয়ে ঘুমাচ্ছে। নিজের মাথায় নিজেই চাপড় দেয় নিবিড়।
হায়রে কপাল, ভেবেছিলো নিবিড়কে হারানোর দুঃখে মেয়েটা ঘুম হারাম করে কাঁদতে কাঁদতে রাত পাড়ি দিবে, কিন্তু এতো পুরো উল্টো। শুধু ঘুমাচ্ছে বললেই হবে না, পাশে আবার ফোনে স্লো মিউজিকে রোমান্টিক এক গান শুনতে শুনতে ঘুমাচ্ছে। কোনো দিক দিয়েই বোঝার উপায় নেই ম্যাডাম যে ছ্যাকা খেয়েছে বড় আকারে।
নিবিড় এগিয়ে গিয়ে বসে দোয়েলের পাশে৷ ছোপাখির মতো এতটাও ভারি নয় দোয়েলের ঘুম, তাই একটু সাবধানেই থাকতে হয় নিবিড়কে। ক্লান্ততা না থাকলেও মেয়েটার ঘুমন্ত মুখটায় এক রাশ মুগ্ধতা, মন জুড়িয়ে যায় নিবিড়ের। কবে যে নিজের পাশে রেখে এমন মায়াময় মুখটার দিকে তাকিয়ে সারাটা রাত পাড় করতে পারবে সে? দীর্ঘ এক নিশ্বাস ফেলে নিবিড়। মেয়েটাকে কি জাগাবে একটু? নাহ থাক, এভাবেই ভালো লাগছে দেখতে।
নিবিড় প্রায় দশ মিনিটের মতো চুপচাপ বসে থাকে দোয়েলের মাথার কাছে। তারপর উঠতে নিলেই অসাবধানতার ফলে পাশ টেবিল থেকে একটি সো পিস পরে ঝনঝন আওয়াজ করে ওঠে।
গেলো, এই বুঝি ধরা খেয়ে গেলো নিবিড়, দ্রুততার সহিত সোপিসটা তুলে খরগোশের হতিতে পালাতে গিয়েও থেমে যায় আবার। কিছু একটা ভেবেই পেছন ফিরে দেখে দোয়েলের কোনো হেলদোল নেই, আগের মতোই ঘুমিয়ে। মেয়েটার ঘুম ভাঙেনি এত আওয়াজেও?
দুষ্ট বুদ্ধি খেলে নিবিড়ের মাথায়, সুযোগ পেয়েছে সে, বহুদিন তার এটমকে চুমু খায় না সে৷ আজ এই সুযোগ মোটেও হাত ছাড়া করবে না। ভেবেই আবার এগিয়ে গিয়ে ঝুকে দোয়েলের কপালে চুমু খায় সে, একে একে দু চোখের পাতায়, নাকের ডগায় গালে চুমু খেয়ে ঠোঁটে আলতো ঠোঁট ছোয়ায় সে। গা শিরশির করে ওঠে নিবিড়ের৷ নেশাতুর দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ দোয়েলের টসটসে ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে থেকে, এগিয়ে গিয়ে ঠোঁট ঠোঁট পুরে নেয় তার। আস্তে আস্তে চুষতে থাকে দোয়েলের ঠোঁট জোড়া। ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে চুম্বনের তাল, কিন্তু বাঁধা প্রাপ্ত হয় নিবিড়। দোয়েলের মুখ থেকে এক অদ্ভুত গন্ধ আসছে। বুঝতে না পেরে নাক কুঁচকে নেয় নিবিড়৷ ওদের এখন তো আর কোনো মেডিসিন চলছে না, তাহলে এমন ঔষধের গন্ধ কেন?
ঠোঁট ছাড়িয়ে নেয় নিবিড়, দোয়েলের কপালে হাত ঠেকিয়ে দ্রুত চেক করে জ্বর টর এসেছে কিনা আবার। না তো.. তাহলে ঔষধ খেলো কিসের?
সন্দেহ জাগে নিবিড়ের। কিছু একটা ভেবেই সরে এসে টেবিলের ড্রয়ার, আশপাশ চেক করতে থাকে। সন্দেহভাজন কিছুই নেই। শান্ত হয় সে, হয়তো মনের ভুল। ভেবেই আবারো চুমু খাওয়ার উদ্দেশ্য বালিশের দু পাশে হাত রেখে ঝুঁকতে গেলেই খচখচ করে ওঠে কিছু একটা৷ অনুধাবন করে বালিশের নিচ থেকে একটি ঔষধের পাতা বের করে নিবিড়। নামটা পড়তেই চোখ বড় বড় হয়ে যায় তার। চমকে একবার দোয়েলের মুখের দিকে তো আবার ঔষধের পাতাটার দিকে তাকায় সে।মাথা ধপ করে ওঠে তার। মেয়েটা এতো পাঁজি, এতো পাঁজি...
রাগে থুঁতনি চেপে ধরে নিবিড় তার, ঠেলে ঠুলেও কোনো লাভ হয় না, দিক দিশা ভুলে রাগে গজগজ করতে করতে দোয়েলের গালে এলোপাতাড়ি থাপ্পড় মারতে শুরু করে ছেলেটি...
"এই চুন্নি, এই? কি করলি এসব তুই হ্যা? ঐ তোর কি জামাই মর'ছে? কোন দুঃখে তুই ঘুমের ঔষধ খাইলি? এই বেয়াদপ চোখ খোল, থাপড়িয়ে কান লাল করে ফেলবো একদম। ঐ, ওঠ... "
হুট করেই মাথায় আসে নিবিড়ের, মেয়েটা কোনো ভাবে সুইসাইড করতে যায় নি তো? তড়িৎ গতিতে ঔষদের পাতা দেখে সে, নাহ মাত্র দুটো ঔষধই খেয়েছে৷ আল্লাহ বাচাইছে, কষ্টে থাকলেও বুদ্ধি লোপ পায়নি তার। শোকর আল্লাহ
ক্লান্ত হয়ে দোয়েলের গলা জড়িয়ে তার মুখের উপর মুখ রাখে নিবিড়, কপালে কপাল ঠেকিয়ে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলছে সে। ভেবেছিলো ম্যাডাম কষ্টের পিছনে লাল বাত্তি জ্বালিয়ে আরামে ঘুমাচ্ছে,কিন্তু হায়, সে তো নিবিড়ের কষ্ট আর সইতে না পেরে ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমাচ্ছে এখন।
"এতো ধান্দাবাজ মেয়ে আল্লাহ, নিজেতো সব ভুলে ঘুমাচ্ছে, কালকের আগে ভুলেও ঘুম ভাঙবে না এর। এদিকে আমার আর একটু হলেই হার্ট এটাক হয়ে যেত আল্লাহ। কি হচ্ছে এসব? আমি তো একে কষ্ট দিতে চেয়েছি, অথচ উল্টো আমি নিজেই কষ্ট পাচ্ছি এই মেয়ের এমন কান্ডে। পাঁজি, ধুরন্ধর মহিলা, মাইয়া জাতি মানেই ভং। আমার বাঘের মতো কলিজাকে ইদুর বানিয়ে ছাড়লো।...