Mr and Mrs Twins Return

পর্ব - ৪৫

🟢

শহরের নিয়ন আলোয় সিক্ত ছাদের কার্নিশ। আবির সেখানে বসে আছে। তার ভঙ্গিতে আজ কোনো হা-হুতাশ নেই, নেই কোনো সময়ের হিসেব কষার চিন্তা। সে সফল।

নিজের হাতে জ্বলজ্বল করতে থাকা প্লাটিনাম রিংটির দিকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ। জোরাজুরি করে হোক বা না বুঝেই হোক তার প্রেয়সী তাকে পরিয়ে দিয়েছে এই রিংটি। আবির কারো কথাকে গ্রাহ্য করেনি, আর করবেও না। সে কখনোই পারবে না চড়াই পাখিকে আহিশের স্ত্রী রূপে মেনে নিতে। চড়াই শুধু তারই।

রাত গভীর হচ্ছে, কিন্তু ঘুম যেন আজ তার চোখ স্পর্শ করবে না বলে পণ করেছে।

একটু দূরে পায়ের আওয়াজ পেয়েই আবির সতর্কতা ও শীতলতার সঙ্গে সোজা হয়ে বসলো। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল একটি নারী অবয়ব। অন্ধকারে মুখ স্পষ্ট না হলেও আবিরের চিনতে দেরি হলো না এটি ইরিন। তার উচ্চতা, আর কাঁধ ছুঁয়ে থাকা চুল, এইটুকুতেই যথেষ্ট।

আবিরের অবস্থান খুঁজে ইরিন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। উচ্ছাসিত কন্ঠে বলে.....

"হেই আবির, এখনো ঘুমাওনি যে? রাত তো অনেক হলো।"

আবির এক পলক চেয়ে দেখলো, তারপর ধীর, ভারিক্কি স্বরে উত্তর দিল....

"এমনি।"

ইরিন এসে আবিরের ঠিক পাশে, রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। আড়চোখে সে আবিরের স্থির মুখাবয়ব পর্যবেক্ষণ করে নেয় যেন একবার। একটু মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করে, যেন মন্তব্যটি খুব ক্যাজুয়াল....

"নিবিড় চাইলে আরও ভালো মেয়ে ডিজার্ভ করে, তাই না আবির?"

আবিরের ভ্রু কুঁচকে উঠে। চোখে এক ধরনের প্রশ্নাত্মক শীতলতা এনে জিজ্ঞেস করে....

"What do you mean?"

ইরিন সামান্য হাসে....

"নাহ, মানে দোয়েলের তো বয়স খুবই কম। নিবিড়ের সাথে কম করে হলেও ছয়-সাত বছরের ব্যবধান। আর ও তো তেমন সুন্দরও নাহ..."

আবির মুখ ফিরিয়ে নেয় সাথে সাথে ইরিনের দিক থেকে। তার কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট বিরক্তি, কিন্তু দৃঢ়তা নিয়ে বলে...

"She is much beautiful."

ইরিনের আর বলার কিছু রইল না। সে বুঝে যায় এসব বলে আবিরের মন টলানো যাবে না। সে দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টে বলে....

"তোমার তো এবার বিয়ে করা দরকার।"

ইরিনের কথায় আবির কোনো উত্তর দিলো না। ইরিন নিজের থেকেই আবার এগিয়ে এসে বলে...

"তুমি রাজি থাকলে আমি আম্মু, মামার সাথে কথা বলতে পারি..."

আবির ভাবলেশহীন, প্রায় যান্ত্রিকভাবে উত্তর দেয়....

"For what?"

"আ... আমি আর তুমি তো মোটামুটি একে অপরকে চিনি। আমরা চাইলেই বাকিটা জীবন হাজবেন্ড ওয়াইফ হিসেবে থাকতে পারি। সো আমরা বিয়েটা করে নিলে..."

এইবার আবির রেলিং থেকে নেমে দাঁড়ায়। টাউজার্সের পকেটে দু'হাত গুঁজে তার সেই চিরচেনা নিস্পৃহ ভঙ্গিমায় সে দরজার দিকে হেঁটে যেতে শুরু করল। দরজার কাছাকাছি পৌঁছে ইরিনের দিকে না তাকিয়েই সে শেষ বাক্যটি উচ্চারণ করল, যা ছিল এক চরম প্রত্যাখ্যান....

"You are not my type of girl."

আবিরের বাক্যটি যেন ইরিনের মস্তিষ্কের প্রতিটি স্নায়ুতে বিদ্যুতের আঘাত হানল। ক্রোধে রিরি করতে করতে সে তার হাতের দামি স্মার্টফোনটি ছুঁড়ে ফেলল। ছাদের ওপর পড়ে ফোনটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়, যেন চূর্ণ হলো তার অহংকার।

আবিরের প্রতি তার দুর্বলতা আজকালের নয়। সেই শৈশব থেকে, যখন থেকে প্রেম কী তা সে বুঝতে শিখেছে। আবির কোনো দিক দিয়েই কম নয়। তাকে এক কথায় পারফেক্ট পুরুষ বলা চলে

।আভিজাত্য, বুদ্ধি, আর সেই শীতল ব্যক্তিত্ব।

ইরিন বিদেশী সংস্কৃতিতে বড় হয়েছে। তার কাছে ক্যাজুয়াল ডেট, ইন্টিমেসি এসব কোনো বড় বিষয় ছিল না। সে এসবের তোয়াক্কা করেনি। কিন্তু আবিরের সুঠাম দেহাবয়বের প্রতি তার আকর্ষণ চিরদিনই ছিল অন্যরকম, তীব্র। আবিরকে তো তার চাই-ই, যে কোনো মূল্যে।

আজ সন্ধ্যায় আবিরের করা সেই ছেলেমানুষী কাণ্ড দেখেই ইরিন বুঝে গেল, সেটা কোনো ছেলেখেলা ছিল না। আবির ইচ্ছে করেই এসব করেছে। নিবিড়ের মতো আবিরও সেই লো ক্লাস, রাবিশ পাখির প্রতি দুর্বল। আর এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না ইরিন। বড়সড় কোনো বাড়াবাড়ি হওয়ার আগেই তার আবিরকে চাই।

রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ইরিনের চোখ দুটো যেন অন্ধকারেও জ্বলে উঠল। তার চাপা কণ্ঠস্বর যেন ফিসফিস করে শপথ নেয়....

"চড়ুই, তোকে তো আমি দেখে নেব। এবার তুই হাড়ে হাড়ে টের পাবি এই ইরিন কী..."

তার হাতে চূর্ণ ফোনটি ছিল কেবল এক শুরু। ইরিনের মাথায় তখন ঘুরছে এক বিপজ্জনক পরিকল্পনা।

-------

উন্মাদ রাত্রির শর্বনাশা রাস্তায় তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে দুটো গাড়ি। নিবিড়ের চোখ জোড়া তীক্ষ্ণ, শিকারী বাজপাখির মতো সামনের গাড়িটার দিকে নিবদ্ধ। সেই গাড়ির ধাতব খোলসের ভেতরেই যে রয়েছে তার প্রাণ ভোমরা। কে বা কারা এই সাহস দেখিয়েছে, তা এই মুহূর্তে তার জানার দরকার নেই। এই মুহূর্তে তাকে এক হিংস্র বাঘের মতো দেখাচ্ছে, যার একমাত্র লক্ষ্য শিকার উদ্ধার।

স্পিড মিটারে তরতর করে বাড়ছে গাড়ির স্পিড। শতকের ঘর ছাড়াতেই নিবিড়ের গাড়িটা পাশে এসে সেই আতংককারীদের গাড়ির সমান তালে ছুটতে লাগল।

ডান হাতে সূক্ষ্ম ভঙ্গিতে স্টিয়ারিং সামলে নিয়ে নিবিড় হঠাৎই তার বা হাতটা তাক করল পাশের গাড়ির বরাবর। হাতে তার ব্যক্তিগত পিস্ত'ল খানা, অন্ধকারেও যার কালো রঙ চকচক করছে।

প্রথম গুলিটা ছুঁড়তেই পাশের গাড়ির পেছনের কাঁচ ভেঙে গুড়ো গুড়ো হয়ে বাতাসে মিশে যায়। নিবিড়ের চোখে পড়ে দোয়েলের পরনের সেই সাদা লেহেঙ্গার কিছু অংশে, রোড লাইটের আলোতে থেকে থেকে যা চকচক করছে যেন জীবনের এক ক্ষীণ সংকেত।

নিবিড় আরেকটা গুলি ছুড়ে। এইবার তার নিশানা নির্ভুল। বুলেটটি দক্ষ ভঙ্গিতে গিয়ে লাগে অপর গাড়ির পেছনের সিটে বসা একটি লোকের মাথার খুলি বরাবর।

লোকগুলোর মাঝে তখন চরম অস্থিরতা। তারাও হয়তো ভাবেনি, এভাবে পেছন থেকে নিবিড় তাদের ধাওয়া করবে। নিবিড় গাড়ির স্পিড আরেকটু বাড়িয়ে নিয়ে পিস্তল তাক করল অপর গাড়ির ড্রাইভারের দিকে। ভয়ংকর দৃষ্টি দিয়ে যেন একটা কথাই বুঝিয়ে দেয় সে...

"গাড়ি থামা, নয়তো তুই শেষ।"

চরম বিপত্তিতে পড়ে লোকগুলো আর কোনো উপায় খুঁজে পায় না। বাচার শেষ চেষ্টা হিসেবে তারা গাড়ির অপর পাশের দরজা খুলে জ্ঞানহীন দোয়েলকে ছুঁড়ে ফেলে দিল রাস্তায়। ঠিক যেভাবে দ্রুততার সহিত তুলে নিয়েছিল, সেভাবেই দ্রুততার সাথে ফেলতে হলো।

নিবিড় তা খেয়াল করতেই মুহূর্তেই তার সমস্ত ধ্যান শুধু দোয়েলের ওপর নিবদ্ধ হলো। সে পিস্তল নামিয়ে দ্রুত ব্রেক কষলো। টায়ারের ঘষটানিতে পিচের রাস্তায় লম্বা কালো দাগ পড়ে। তার এখন শুধু দোয়েলকে লাগবে। লাফাঙ্গাগুলো জাহান্নামে যাক...

ভারী লেহেঙ্গায় মোড়ানো মেয়েটি রাস্তার ধারে তিনপাক ঘুরে যেন এক ঝরে পড়া ফুলের মতো এলোমেলোভাবে পড়ে রইল। নিবিড় দ্রুততার সহিত ছুটে আসে। তার গতিতে ভয়, অনুশোচনা আর এক গভীর টান। ত্রস্ত ভঙ্গিতে হাঁটু গেড়ে বসে সে। এই নীরব, নিথর শরীরটিকে আলতো করে তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে। উন্মাদের মতো ভাঙা গলায় ডাকতে থাকে সে দোয়েললকে....

"মিস এটম? শুনছো? কিচ্ছু হয়নি পাখি, আ-আমি আছি..."

দোয়েলের হুশ নেই। থাকবে কী করে? ক্লোরোফর্মের তীক্ষ্ণ প্রভাবে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। নিবিড় পাগলের মতো দোয়েলকে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল কোথাও গুরুতর আঘাত লেগেছে কি না। ভাগ্য ভালো আতঙ্ককারীরা একেবারে রাস্তার কিনারা ঘেঁষে ফেলেছিল। পিচঢালা রাস্তায় না পড়ে, মেয়েটি পড়েছিল নরম মাটিতে। তাই তেমন কোথাও ছিলে যায়নি। কিন্তু নিবিড়ের হৃদয়ের উতলা ভাব কমার নয়। বুকের তীব্র কম্পন যেন থামানো দায়। দু'হাতে পাগলের প্রলাপ করতে করতে সে মেয়েটাকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলো। এলোমেলো চুলগুলো অদক্ষ হাতে ঠিক করে দেওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালায় সে। দু'জনের বুকের ধিপ্ ধিপ্ শব্দ হচ্ছে। একটা আশঙ্কায় দ্রুত, অন্যটা অবসাদে ক্ষীণ দুটো হৃদয়ের স্পন্দন যেন মিলেমিশে একাকার হচ্ছে । নিবিড় স্পষ্ট অনুভব করছে মেয়েটার হৃৎস্পন্দনের সেই অস্বাভাবিকতা।

বুকে জড়িয়ে, চেপে ধরে সে চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল। তার কন্ঠস্বর তখন হাঁপানির মতো, যেন সে জীবনের সমস্ত শ্বাস উজাড় করে দিচ্ছে....

"আর কখনো কষ্ট দেবো না পাখি। কক্ষনো না। I know you love me. You live in me. আর বলতে হবে না পাখি, আমি বুঝে গেছি। তুমি শুধু আমার। আমি বুঝে গেছি।"

দীর্ঘ সময় ধরে বিড়বিড় করতে করতে নিবিড় অবশেষে শান্ত হয়। নিশুতি রাতের এই প্রহরে ফাঁকা রাস্তায় সে আর এই জ্ঞানহীন মেয়েটা ছাড়া যেন আর কেউ নেই।

নীরবে সে মনকে শান্ত করে চোখ রাখে দোয়েলের ফ্যাকাশে মুখের দিকে। সন্ধ্যার সেই লাবণ্য আর নেই। নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হতে থাকে তার। সে এবারও মেয়েটার সাজ ধরে রাখতে পারেনি। এবারও সে মেয়েটাকে কষ্ট দিয়েছে।

কিন্তু আর নয়। এরপর থেকে আর কোনো লুকোচুরি নয়। দোয়েল স্বীকার করুক আর না-ই করুক, ভালোবাসুক আর না-ই বাসুক সে নিবিড়েরই বউ হয়ে থাকবে বাকিটা জীবন।

--------

আবির - নিবিড় দু'জনই এখন অপেক্ষাকৃত শান্ত পরিবেশে অবস্থান করছে নিজেদের অফিস কক্ষল। আবির নিজের আরামদায়ক চেয়ারে আয়েশি ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে বসে ল্যাপটপে মুখ ডুবিয়ে আছে। নিবিড়ও তার সামনেই বসে...

"রুমে আসার সময় ওয়াইফিকে দেখেছিলাম ফ্লোরে পড়ে থাকতে। আমি তো ভেবেছিলাম ক্লান্ত হয়ে ওখানেই ভুলে ঘুমিয়ে গেছে। যা এলোমেলো মেয়ে সে..."

আবিরের কথায় নিবিড় চোখ উঁচু করে হাসলো। কিন্তু সেই হাসি ক্ষণস্থায়ী। পরক্ষণেই তার চেহারায় ফিরে এল সেই চাপা উদ্বেগ...

"ক্লোরোফর্মের প্রভাব। আমার ঐ লোকগুলোকে চাই, ভাই। যে করেই হোক।"

আবির হাতের কাছে থাকা পেপারওয়েটটি আলতো করে ঘোরাল। তার কন্ঠে এক ধরনের নির্লিপ্ত ভাব....

"এতটা বাড়াবাড়ি করার কী দরকার ছিল? কাল যদি বড় পাখির কিছু হয়ে যেতো?"

নিবিড় সেই সম্ভাবনার কথা ভাবতে চাইল না। দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টে সে অন্য দিকে মোড় টানক সে ..

"ভাবতে পারছিস ভাই, কী করে ফেলল এটম! মুনিয়ার মতো মেয়েকে..."

আবিরের ঠোঁটে এবার এক বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।বলে ওঠে...

"এটম ডাকিস না? এটমের মতোই কাজ করেছে। ভাগ্য ভালো বল, যে মুনিয়াকে মে'রে গুম করে দেয়নি।"

নিবিড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে..

"আমিই হয়তো বেশি করে ফেলেছি। আমার রানীর মুখ থেকে ভালোবাসার কথা এত সহজে বের হবে না। সব করবে, শুধু মুখ ফুটে বলবে না।"

আবির শরীরটা সামান্য এগিয়ে আনলো। তার কথায় যেন এক গোপন সতর্কবার্তা ভাসে...

"তোর জন্যই বলতে পারছে না। বড় পাখি ভীষণ স্ট্রেট ফরোয়ার্ড। একবার মন বদলে গেলে, তোর কপালে দুঃখ আছে শা'লা। আর আমি তাই তোর একটা শিক্ষা হওয়া উচিত।"

নিবিড় বাঁকা হাসে।আড়মোড়া ভাঙার ভঙ্গিমায় দু হাত উপড়ে তুলে বললো.....

"তুই আমার লাভ লাইফে ব্যগরা দিলে আমিও তোকে হেল্প করছি না আর, আম্মু আব্বুকে বলবো বিয়েট ডেট ফেলতে তারাতারি। শরীরের হাড়গোড়ে জং ধরে যাচ্ছে, এবার ডেইলি পুসআপ দেওয়ার জন্য হলেও নিজের রুমে বউকে পার্মানেন্ট আনা দরকার।"

Mr and Mrs Twins Return গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় টুইন রিলেটেড রোমান্টিক গল্প