কথা মতোই নিবিড় সত্যিই আজ বাড়ির বাইরে এক পা ও রাখেনি। দোয়েল উঠেছে ধরে তার পিছু পিছু ঘুরছে। কখন জানি মেয়েটা বাড়ির সবাইকে বিয়েটা ক্যান্সেল করার কথা বলে ফেলে। একবার তার মুখ থেকে এই কথা শুনলে নিশ্চিত সাবিহা আবিরকে ছেড়ে নিবিড়ের পিছে লাগবে।
রান্নাঘরে সাবিহাদের কাজে টুকটাক সাহায্য করছে দোয়েল। সামনেই ডায়নিংয়ে বসে আছে নিবিড়। সকাল থেকে তার এমন উদ্ভট আচরণ যেন সবারই বেশ চোখে পড়ছে, সাবিহা এগিয়ে আসে দোয়েলের কাছে। আস্তে করে জিজ্ঞেস করে......
"জাদুটো'না করেছিস নাকি কিছু?"
ঘাবড়ে যায় দোয়েল, হঠাৎ এমন কথার মানে সে বুঝে উঠতে পারলো না ঠিক। ভ্যাবলার মতো সাবিহার দিকে তাকাতেই সাবিহা ঠোঁটের কোনের হাসি প্রসস্থ করে বলে...
"নিবিড় তো আজ পিছুই ছাড়ছে না দেখি। বিয়ের দিনটা কি এবার ফেলবো?... "
"ইয়ে মানে আ্ আম্মু... "
"একই ছাঁদের তলায় থেকেও আলাদা রুমে থাকতে আমার ছেলেটার কষ্ট হচ্ছে বুঝলি? আর দেরি করা ঠিক হবে না মনে হয়। "
দোয়েল মাথা নুইয়ে নেয়, আস্তে করে বলে....
"আমার তোমাকে কিছু বলার আছে আম্মু... "
সাবিহা একটু সরে গিয়ে কাজে হাত লাগিয়ে বলে...
"বল না?"
" আম্মু, এ্ এই বিয়েটা...."
এতটুকুর মাঝেই ডায়নিংয়ের দিক থেকে নিবিড়ের ঘনঘন কাশির আওয়াজ ভেসে আসে। কথায় বিঘ্ন ঘটে তাদের, সাবিহা গলা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে...
"কি হলো?"
নিবিড় অপ্রস্তুতভাবে হাত নেড়ে কী যেন বোঝাতে চাইলো, কিন্তু সে চেষ্টা বৃথা। সাবিহার কাছে তা দুর্বোধ্যই রয়ে যায় তা। তবে দোয়েলের শীতল, কাঠিন্য মেশানো মুখশ্রী স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে নিবিড়ের অভিনয় তার চোখ এড়ায়নি। সেই রোষ রাঙা চোখের দিকে চোখ যেতেই নিবিড়ের ভেতরের সব তেজ যেন কর্পূরের মতো উবে যায়।
তাদের এই লুকোচুরি, এই নাটকীয়তা দেখে সাবিহা ঠোঁটে হাসি চেপে আটকায়। এই ছেলেটি আবিরের সম্পূর্ণ বিপরীত, নিশ্চিতই সে তার হবু বউকে সাংঘাতিক ভয় পায়, ভাবতেই সাবিহার মুখে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠে। এদের মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে।
নিবিড় আমতা আমতা করে কোনোমতে উচ্চারণ করে.....
"ক... কফি? এক কাপ কফি হবে? হ্... হবু বউয়ের হাতের কফি?"
কথা শেষ হতেই সাবিহা আর আয়েশা উচ্চস্বরে হেসে উঠল। ওদিকে দোয়েলের অবস্থা এমন যে সে যেন এখনই নিবিড়ের গলা টিপে দিতে পারে। লোকটার এত নাটক করছে কেন?
"কিরে বড়পাখি? যা, কফিটা করে দে নিবিড়কে।"
আয়েশার কথায় দোয়েল চোখ নামিয়ে নেয়। নীরবে, গোমড়া মুখে সে কফিমেকারের দিকে এগিয়ে যায়। দূর থেকে নিবিড় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দোয়েলকে দেখছে, প্রতিটি কাজ নিপুণভাবে লক্ষ্য করছে। মেয়েটা রাগে ফুঁসছে, কিন্তু তার এই তেজস্বী রূপেই তো নিবিড় বারবার আটকে যায়।
কফির ট্রে হাতে দোয়েল তার দিকে এগিয়ে আসছে দেখেই নিবিড় দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে ঘোষণা করে....
"রুমে নিয়ে এসো, ওখানেই খাবো।"
নিবিড়ের এমন কাণ্ডে কফি হাতেই দোয়েল রাগে ঝলসে উঠে। যেখানে ছিল, সেখানেই থমকে দাড়ায়। তীক্ষ্ণ চোখে নিবিড়ের চলে যাওয়ার পথ অনুসরণ করে রাগে। পেছন থেকে সাবিহা মৃদু হেসে আদেশ করলো...
"কী রে, দাঁড়িয়ে গেলি কেন? যা, কফিটা দিয়ে আয়। ঠান্ডা হয়ে যাবে তো।"
গুরুজনের কথা উপেক্ষা করার মতো মেয়ে দোয়েল না। তাই দাঁতে দাঁত চেপে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে আজ সে এই লোকটিকে উচিত শিক্ষা দেবেই।
ঘরে এসে দোয়েল নিঃশব্দে নিবিড়ের পাশের টেবিলে কফির কাপটি রেখে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়। ঠিক তখনই ড্রয়ারে কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে নিবিড় উচ্চারণ করল...
"চামচটা?"
দোয়েল নীরব রইল, কোনো বাক্য ব্যয় না করে আবার এগিয়ে গিয়ে চিনির পাত্র থেকে সামান্য চিনি নিয়ে কফিতে ঢালতে যেতেই নিবিড় বাধা দিয়ে বললো...
"চিনি লাগবে না, শুধু চামচটাই দরকার।"
'শুধু চামচ দিয়ে কী করবে উনি ?' এমন একটি প্রশ্ন দোয়েলের মনে ঘুরপাক খেলেও রাগ, জিদ আর অভিমানে সে আর নিবিড়কে জিজ্ঞেস করল না। নীরবে চামচটা কফির কাপের পাশে রেখে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এগিয়ে যায়। দরজা পর্যন্ত যেতেই তার কানে আসে সিরামিকের কাপ আর স্টিলের চামচের সংঘর্ষের শব্দ। স্পষ্টতই কফিতে কিছু একটা মেশানো হচ্ছে। কিন্তু কী সেটা?
সন্দেহবশত সে ঘুরে দাঁড়িয়ে ঘাড় সামান্য কাত করে পেছনের দিকে তাকাতেই দেখলো লোকটি দ্রুত হাতে মনোযোগ দিয়ে কফিতে চামচ নাড়ছে। তার বাঁ হাতে একটি ছোট শিশি। কোনো এক ধরনের ওষুধ। কী সেটা?
দোয়েলের কুঞ্চিত ভ্রু নিবিড়ের দিকে স্পষ্ট প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো। জিজ্ঞেস করে উঠল.....
"কী মেশাচ্ছেন ওটা?"
নিবিড় চামচ নাড়ানো থামিয়ে এক ঝলক দোয়েলের দিকে তাকায়। পরক্ষণেই আবার কফির কাপটা নিজের মুখের কাছে তুলে নিতে নিতে অভিমানী কণ্ঠে বলল...
"এই মুহূর্তে প্রয়োজনীয় কিছু। যেটা খেলে সারা জীবনের জন্য আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে।"
দোয়েল বুদ্ধিমতী মেয়ে। প্যাচের কথা বুঝে উঠতে খুব একটা বেশি সময় লাগে না তার। নিবি্রের কথার মানে বুঝতে পেরেই বুকের ভেতর ধক করে ওঠে তার। লোকটা এসব কি বলছে?
অবচেতন মন আর মস্তিষ্কের দ্বন্দ্ব পেরিয়ে দ্রুত কদমে সে এগিয়ে যায় নিবিড়ের কাছে তারাতারি করে নিবিড়ের মুখের সামনে থেকে কফিকাপটা এক প্রকার ছিনিয়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে মেঝেতে। তবে খুব একটা গতি করা গেলো না যেন, নিবিড় ইতোমধ্যেই লম্বা এক চুমুক কফি মুখে পুরে নিয়েছে।
দোয়েল উন্মাদের মতো তার দিকে ঝুঁকে নিজের কোমল হাতে থুঁতনি চেপে ধরে নিবিড়ের। চিন্তিত কন্ঠে দ্রুত জোর করতে করতে বলতে থাকে...
"ওটা ফেলুন,,মুখ থেকে ফেলুন বলছি এটা... "
নিবির কি থামার পাত্র? জিম খিঁচিয়ে মুখ বন্ধ করে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে দোয়েলের পাগলামি গুলো। মেয়েটা উন্মাদলর মতো আচরণ করছে। শুধু পারছে না ড্রিল করে নিবি্রের মুখে ছিদ্র করতে তরল বের করতে।
নিবিড় নাছোড়বান্দা, আরো একটু জ্বালানোর উদ্দেশ্যে ইচ্ছে করে শব্দ করে ঢোক গিলে মুখে জমানো কফিটা গিলে ফেললো। ওমনি দোয়েলের উন্মাদনা চিৎকারে পরিনত হয়। নিবিড়ের গালে গলায় চেপে চুপেও যেন পারছে না ঐ তরলটা বের করতে সে। বিভৎস রকমের চিৎকার রুমটার দেওয়ালে দেওয়ালে বারি খায় বার বার....
"এটা কি করেছেন আপনি, আল্লাহ... কি করলেন আপনি। "
নিবিড় হঠাৎ গলায় নিজের হাত চেপে ধরে যন্ত্রণায়, নিশ্বাসের গতিবিধি বাড়ে তার। এতেই যেন দোয়েলের আত্মা শুকিয়ে কাঠ। মেয়েটা উন্মাদের মতো নিবিড়ের গালে, মুখে ছুয়ে দিচ্ছে, কান্নায় চোখ দুটি লাল হয়ে উঠেছে তার। হঠাৎ নিজের দুটো হাত দিয়ে নিবিড়ের গলা জড়িয়ে ধরলো সে। তীব্র প্রত্যাবর্তায় আবেশিত হয়ে নিবিড়ের সাথে মিশে কান্নারত কন্ঠে বলতে লাগলো....
"কেন এমন করলেন? আমি কি নিয়ে বাঁচবো, আমায় কেন একটু বুঝেন না আপনি, আমার ভালোবাসা কেন বুঝেন না? ভালোবাসি আপনাকে নিবিড় ভাই। আমার জীবন থেকে হারিয়ে যাবেন না,আমি ম'রে যাবো। আমি যে বেচে থাকার দিশা হিসেবে আপনাকেই চিনি। ও আল্লাহ... আমায় আর কষ্ট দিও না তুমি, আমার ভালোবাসাকে এভাবে কেড়ে নিও না।আমায় আরো কটা দিন বাঁচতে দাও,বাঁচতে দাও না আমায়...