মিষ্টি পাখিটা ঘুমিয়ে আছে নিবিড়ের বাহুডোরে। ঘুমিয়ে নয় বরং জ্ঞান হারিয়ে নির্জীবতায় নিবন্ধ রয়েছে যেন। একটু আগেই অতিরিক্ত চিন্তাগ্রস্ত হয়ে নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়ে নিবিড়ের উপরই। জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টায় নিবিড় তার চোখে মুখে জল ছিটিয়ে ধীর কন্ঠে ডাকতে থাকে...
" এটম? শুনছো পাখি? তাকাও? আমি ঠিক আছি। "
বেশ অনেকক্ষণ পর জ্ঞান ফেরে দোয়েলের। পিট পিট করে চোখ খুলে নিবিড়কে নিজের সামনে আবিষ্কার করে চমকে উঠে বসে সে। উতলা হয়ে নিবিড়ের গালে মুখে হাত ছুইয়ে বলতে থাকে....
"আ্ আপনি ঠিক আছেন? ক্ কিছু হয় নি তো আপনার?"
নিবিড় কোনো প্রত্যুত্তর দেয় না। তার স্তব্ধ দৃষ্টি নিবদ্ধ কেবল বাহুডোরে আবদ্ধ ওই বিষণ্ণ দোয়েলের পানে। মেয়েটির কোমল করতল তখনও নিবিড়ের রুক্ষ দাড়িতে মাখানো গালে পরম নির্ভরতায় আটকে আছে। সেই অশ্রুসজল চোখের অতল চাহনি যেন জানান দিচ্ছিল এক চিলতে কোমলাপাখি আজ কতটা অস্থিরতায় নীল হয়ে আছে। দোয়েলের এই ব্যাকুলতা নিবিড়ের হৃদয়ে প্রগাঢ় কোনো জলধির ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়তে লাগলো। আজ আর কোনো দ্বিধা নয়, কোনো জড়তা নয়, কন্যার শীতল ও উদ্বিগ্ন চোখের গভীরে ডুব দিয়ে নিবিড় অনুচ্চ স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল.....
"তুমি আমার জন্য এতটা উতলা কবে থেকে হলে পাখি?"
দোয়েল বরাবরই পাষাণ, কঠিন এক নারীত্বের প্রতিচ্ছবি। অথচ আজ সেই কাঠিন্য চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে এক ভীরু কিশোরীর রূপ নিয়েছে,নিবিড়ের হৃদয়ে এক অদ্ভুত আলোড়ন সৃষ্টি করছে তার সেই প্রতিরূপ । দোয়েল এক অবুঝ শিশুর মতো নিবিড়ের গ্রীবাদেশ জাপ্টে ধরেছে। এই আলিঙ্গনে মিশে আছে হারানোর এক তীব্র আতঙ্ক। যেন হাত ফসকালেই নিবিড় এই পৃথিবীর ওপারে কোথাও মিলিয়ে যাবে। ভাঙা গলায় কান্নার নোনা সুরে দোয়েল আর্তনাদ করে উঠল.......
"আমি যে আপনাকে ভালোবাসি, খুব বেশি ভালোবাসি। কেন ওসব খেতে গেলেন আপনি? একবারও আমার কথা মনে পড়ল না আপনার?"
নিবিড়ের ওষ্ঠাধরে তখন এক পরম তৃপ্তির রেখা। দীর্ঘদিনের জমানো সব হাহাকার যেন এই একটি বাক্যে মুছে গেল। আজ সে সার্থক, মহাবিশ্বের সমস্ত সুখ যেন তার এই ক্ষুদ্র নিড়ে এসে ধরা দিয়েছে। বাহুডোরে নিজের প্রিয়কে আরেকটু নিবিড়ভাবে পিষে নিয়ে ভাঙা কণ্ঠে সে সুধায়....
"আমি ম'রে গেলে,সবার সামনে চক্ষুলজ্জা বিসর্জন দিয়ে ঠিক এভাবেই বলতে পারবে কথাটা?"
দোয়েল তৎক্ষণাৎ নিবিড়ের প্রশস্ত বুক থেকে মুখ তুলে তাকাল। অশ্রুসজল চোখে বিষাদ আর অসীম মায়ার এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ। নিবিড় যেন আরও গভীরে যেতে চায়। আবারও প্রশ্ন করে....
"কী হলো বলো? শত মানুষের ভিড় ঠেলে আমার লা'শটাকে জাপ্টে ধরে এই একই স্বীকারোক্তি দিতে পারবে তো? বলতে পারবে. 'নিবিড় আমি তোমায় ভালোবেসেছি?"
নিবিড়ের এই অমৃতসমান বাক্যগুলো দোয়েলের কাছে তখন কালকূটের মতো বিষাক্ত মনে হচ্ছে। কেন লোকটা এমন অশুভ কথা বলছে? সে কি দোয়েলের বুক চিরে আসা এই যন্ত্রণাটুকু অনুভব করতে পারছে না? দোয়েল কোনো উত্তর দিলো না, বরং আদুরে অভিমান আর অদম্য অধিকারে নিবিড়ের বাঁধন আরও শক্ত করল। নিবিড়ের বুকের গভীরেই মুখ লুকিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ল সে। উত্তরের প্রতীক্ষায় থেকে নিবিড় অবশেষে এক টুকরো ম্লান হাসি হাসল। আলতো স্বরে বললো.....
"মুনিয়াকে কিডন্যাপ করার মতো দুঃসাহসী কাজ যে মেয়ে অবলীলায় করে ফেলল, সে আজ সামান্য একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে এত কুণ্ঠিত কেন, পাখি?"
দোয়েলের মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে চায় কিছু অপ্রাসঙ্গিক বাক্য। কিন্তু মেয়েটা দূর্বলতায় আজ এতটাই ক্ষয়েছে যে বলে উঠতেই পারে না কিছু, পাছে যদি নিবিড় আবার তার প্রতি অভিমান করে বসে...
"আপনি কেন ওকে ভালোবাসলেন নিবিড় ভাই? কেন আমায় ভালোবাসলেন না?"
নিবিড়ের বুকটা হুহু করে ওঠে। কতটা নীরব যন্ত্রণার রেশে মেয়েটা এ কথাটি বললো? কতটা?.... নিবিড়ের শক্ত দুটো হাত নৃভীতে আগলে ধরলো দোয়েলের নরম কোমল গাল দুটি। আদুরে স্বরে বললো....
" এই বোকা মেয়ে, তুমি বুঝোনা এসব যে নাটক ছিলো? আই লাভ ইউ... ওনলি ইউ..."
"তাহলে সেদিন কেন আপনি মুনিয়াকে ভালোবাসেন বলেছেন? রেস্টুরেন্টে আমাকে ছেড়ে ওর হাত কেন ধরেছিলেন আপনি? "
"তোমায় জ্বালানোর জন্য। একটাবার তোমার মুখ থেকে শুনার জন্য যে তুমি আমায় ভালোবাসো। "
"আপনি আমায় সত্যিই ভালোবাসেন তো নিবিড় ভাই? "
"তুমি বুঝো না মেয়ে? "
"আমায় আগলে রাখবেন তো? "
"রাখবো.. "
"সারাজীবন?"
"এই জনমের মৃত্যু পর্যন্ত তুমি শুধু আমারই মিস এটম। উপরওয়ালা ব্যতীত আর কারো সাধ্যি নেই তোমায় আমার থেকে আলাদা করা।"
------------
সকালের এলার্মে ঘুম ভাঙে আবিরের রোজ। কিন্তু আজ তার প্রয়োজন হয়নি। বাইরে থেকে চেঁচামেচির আওয়াজেই যেন মাতোয়ারা পুরো বাড়িটা। কিছু একটা নিয়ে বেশ আওয়াজ তোলা হচ্ছে নিচের হল ঘরে। চোখ মেলে বসে আবির। চড়াই ঠিক আছে তো?
ভেবেই আর একটি মুহুর্ত ও ঘরে ঠেকলো না সে। দ্রুত বিছানা ত্যাগ করে বেরিয়ে এলো রুম থেকে, সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতেই নজর বুলিয়ে দেখলো চারদিকে। কিছু একটা খুশির খবর, তা সবার মুখের হাসি দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কি সেটা কি?
এরই মধ্যে হুট করে চড়াই পাখি ছুটে আসে আবিরের নিকট.....
"এইতো দানাবল এসে গেছে.... উফ দানাবল, ইদ মুবারক, ইদ মুবারক এই নিন মিষ্টি খান...."
বলতে বলতেই মেয়েটা এগিয়ে এসে হাতে থাকা বাক্স থেকে একটি মিষ্টি দু হাতের ডগায় তুলে প্রায় ঠেসে ধরলো আবিরের মুখে। আবির মাথাটা একটু পিছিয়েও কুল পেলো না চড়ুইয়ের কাছে। মিষ্টি লেগেই গেলো ঠোঁটে। চড়াই পাখির হাসি মুখ দেখে ইচ্ছে করে না ধমকাতে। তাই আলতো কামড়ে একটু পরিমান মিষ্টি মুখে নিয়ে নিজেই চড়াই পাখির হাতের কব্জি ঘুরিয়ে বাকি মিষ্টিটুকু চড়াইয়ের মুখে পুরে দিতে দিতে স্বাভাবিক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো....
"কিসের জন্য মিষ্টি? "
চড়ুই নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আবিরের একটু খাওয়া মিষ্টিটা মুখে নিয়ে চিবোতে চিবোতে বললো....
"বোন আর নিবিড় ভাইয়ের বিয়ের মিষ্টি। আর মাত্র তিনদিন পর বাদ জুম্মা ওদের আকদ.....ইয়াহু.... "
চড়ুইয়ের বলার ভঙ্গি এতটাই উচ্ছাসিত ছিলো, আবিরের মনেও একখানা প্রশান্তির হাওয়া বয়ে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে নিবিড়ের দিকে একবার, আবার দোয়েলের দিকে তাকিয়ে যখন দেখলো মেয়েটা লাজুক হাসছে তখন আবিরের সচল মস্তিষ্ক বলে দেয় যে এদের মনমালিন্য মিটেছে তবে। বেশ....
"সাথে আমার আর ছোট পাখিরও আকদ...."
ব্যাসস, এতক্ষনের শীতল মস্তিকে হঠাৎই আবার আগুনের লেলিহান বইলো যেন আহওশের এই একটি কথায়। আবির তৎক্ষনাৎ মুখের রং পরিবর্তন করে ঘুরে তাকায় আহিশের দিকে। ছেলেটা কি দারুন হাসছে নিজের বিয়ের আনন্দে। চড়ুইও হাসছে আহিশের সাথে তাল মিলিয়ে। মেয়েটা আবারও মিষ্টি তুলে এগিয়ে দেয় আবিরের দিকে...
"ডাবল বিয়ে ডাবল মিষ্টি,, এই নিন দানাবল...."
আবির চরম বিরক্ত নিয়ে এক প্রকার ঝারি মারে চড়ুইয়ের হাতে। মেয়েটার হাসি এখন আর সহ্য হচ্ছে না তার। রগরগা কন্ঠে উচ্চারণ করে....
"তোর বিয়ে মানে? বয়স কত তোর??"
আবিরের ধমকানো কথায় সাবিহা এবার এগিয়ে এসে বলে....
"আমরা জানি আহিশের এখনো একুশ বছর হয়নি, তো এখন তো আর রেজিষ্ট্রি ম্যারেজ হচ্ছে না, ধর্মীয় মতে আকদটাই করিয়ে রাখবো। পরে তোর বিয়ের সময় একসাথে তিন জোড়ার অনুষ্ঠান করে রেজিষ্ট্রিটা করা যাবে, আর ততদিনে আহিশেরও বয়স হয়ে যাবে। "
সাবিহার কথায় আবির হতভম্ব নয়নে তাকিয়ে বলে ওঠে....
"তাহলে এখন আবার আকদ কেন?"
"দেখ আবির বাবা, ওরা তো একই বাড়িতেই থাকছে তাই না, তো আকদটা করিয়ে নিলে হয় কি...... "
"মানে ওয়াইফি এখন থেকে আহিশের ঘরে থাকবে?"
"হ্যা..."
"আহিশ আর ও একই বিছানায়...... ইম্পসিবল.....!! "
আবিরের মুখের লাগাম ছুটেছে যেন, চড়ুই এগিয়ে এসে আবিরের হাতে কনুই দিয়ে গুতা মেরে চোখ গরম করে ফিসফিসিয়ে বলে....
"আশ্চর্য দানাবল..আব্বুরা আছে দেখতে পারছেন না? কি সব বলে যাচ্ছে... আমার লজ্জা করে না বুঝি?"
আবিরের বিরক্তির রেশ আরো বেড়ে যায় চড়াই পাখির এমন লজ্জা লজ্জা মুখ দেখে। মেয়েটা আহিশের সাথে নিজেকে কি দারুণ কল্পনাও করে ফেলছে....
"তুমি যাস্ট দূরে থাকো রাবিশ..."
বলেই এক প্রকার ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলো সে চড়ুইকে। পড়তে নিয়েও কোনো মতে নিজেকে সামলে নেয় চড়ুই। আবিরের এহেন কান্ড মেয়েটা যেন মেনে নিতে পারে না, ঠোঁট ফুলিয়ে বলে ওঠে...
"আপনি আমায় মা'রলেন?"
মেয়েটার এমন অভিমানী কন্ঠস্বর আবিরের কানে পৌছায় না। আবির নীরবে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকায় শুধু আহিশের দিকে, আহিশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সোফায় গিয়ে বসতে বসতে বলে....
"ছোটপাখি সন্ধ্যার আগে আগে রেডি থাকবি কিন্তু, লেট হলে রেখে চলে যাবো।"
আহিশের সাথে তাল মিলিয়ে নিবিড়ও দোয়েলের দিকে তাকিয়ে বলে...
"আর তুমিও, যদিও আমি তোমাকে ছাড়া যাবো না...."
আবির বুঝতে পারে না এরা কিসের কথা বলছে, তাই চোখ কোনা করে জিজ্ঞেস করে....
"কোথায় যাওয়ার কথা হচ্ছে? "
নিবিড় হাসি মুখ নিয়ে এগিয়ে এসে আবিরের কাধ পেচিয়ে ধরে বলে....
"আজ রাতের ভ্যানুতে আমরা, মানে আমি -মিস এটম আর ছোটপাখি - আহিশ। এই দুই কাপলের প্রি-ওয়েডিং স্যুট করতে যাচ্ছি। "
ব্যাসসস, এমনিতেই টগবগে মস্তিষ্ক, তার উপর যেন ঝাঝা লঙ্কার গুঁড়ো ছিটিয়ে দেওয়ার মতো কাজ করলো কথাটি।
আবিরের বুক জ্বালা করছে। বাড়ির সবাইকে বিভীষিকাময় লাগছে, এমনকি নিজের সর্ব সময়ের সঙ্গী নিবিড়কেও। কাউকে যে কিছু বলেও লাভ নেই তা বেশ জানে সে। তাই অযথা মুখের বুলি খরচ করলো না সে। শুধু নীরবে ঘাড় ফিরিয়ে একবার তাকালো সামনে থাকা হাস্যজ্জল মুখের মেয়েটার দিকে। যার জন্য তার বুক পুড়ছে অহরহ, তার মনে কি আবিরের জন্য একটুও অনুভূতি জন্মালো না এতদিনে?
মেয়েটা কি নিদারুণ হাসছে, এই বিয়েটায় সে খুশি তা মুখ দেখেই বোঝা যায়, তবে কি আবির সত্যিই এক জোড়া প্রণয়া জুটিকে ভাঙার চেষ্টায় নেমেছে? হয়তো তাইই, কিন্তু এছাড়া যে আর কিছু করার নেই, এই মেয়েটা কবে এতটা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠলো এই রগরগা লোকটার জন্য? এই বাচ্চাসুলভ মেয়েটাকে না পেলে আদেও বেঁচে থাকবে তো আবির বিন চৌধুরী?
-----------
অফিসের কোনো কাজেই যেন আজ মন নেই আবিরের। সেই সকাল থেকেই চরম বিরক্তি নিয়ে কাজ করছে আর কোনো না কোনো গড়বড় করছেই। একটু আগে তো মাথা গরম করে অর্ধেক মিটিং থেকেই উঠে চলে এলো সে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। নিবিড় এসে উপস্থিত হয় আবিরের কেবিনে। টেবিলে দু হাত ঠেকিয়ে চোয়াল শক্ত করে চেপে বসে আছে সে। নিবিড় গোপনে হাসে। জমজ হওয়ার দরুন বেশ বুঝতে পারে আবিরের মনের বর্তমান পরিস্থিতি। তবুও একটু না জ্বালালেই নয় যেন......
"ভাই, তুই কি এখন যাবি?"
আবির নীরবে চোখ তুলে তাকায়। নিবিড় আবার বলে....
"আমার তো যেতে হবে এবার। ঐ যে... প্রি ওয়েডিং স্যুট?পাখিরা তো এতক্ষণে রেডি হয়ে গেছে নিশ্চই..."
আবির চরম বিরক্ত নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বিড়বিড় করে বলে.....
"ফা'কিং কাজ কর্ম সব। আমার সেটার স্যুট...."
নিবিড়ের কান এড়ায় না কথাখানা।মিচকে হেঁসে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে....
"তুই কি জেলাস ভাই?"
আবির আবার মুখ তুলে তাকায়, জিজ্ঞেস করে...
"ফর ওয়াট?"
"এই যে তোর আগে তোর ছোট ভাইয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, তারপর বাসর হবে... আহিশ আর ছোটপাখির যৌথ প্রচেষ্টায় ফুটফুটে বাচ্চা আসবে। যাস্ট চিন্তা কর ভাই, বাচ্চা আসবে ছোটপাখির পেট থেকে, কিন্তু দেখতে হবে একদম আহিশের মতো।...."
নিবিড়ের কথায় ঐ টুকুতেই ইতি টানতে হলো। কারন মাত্রই আবির হাতের কাছ থেকে শক্ত জলরঙা পেপারওয়েটটি তুলে আক্রমণের উদ্দেশ্যে ছুড়ে মারলো নিবিড়ের দিকে।
সচকিত দৃষ্টিতে পেপারওয়েটটি নিজের দিকে ধেয়ে আসতে দেখে কৌশলে বা দিকে ঘাড় সরিয়ে নেয় নিবিড়, সাথে সাতে পেপারওয়েটটি গিয়ে লাগে পেছনে দেওয়ালে লাগানো একটি ফটোফ্রেমে।চূর্ণ হয়ে ভেঙে ফ্লোরে পড়ে তা।
নিবিড় চোখ বড় বড় করে বুকে হাত দিয়ে অবাক মতো বলে ওঠে.....
"পাগল হলি ভাই? আর একটু হলেই তো আমার বউটা বিধবা হতো...."
আবির চরম ক্ষেপেছে, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হুংকার দিয়ে ওঠে সে...
"তুই জানিস আমি ওয়াইফিকে ভালোবাসি। আমার ওকে লাগবে, তবুও কানের কাছে এসে বাজে বকছিস... "
নিবিড় হাতের ইশারায় তাকে শান্ত হতে বলে এগিয়ে আসে...
"ও মাই গড,ও মাই গড,, কুল ব্রো.... এতো হটনেস বাসর ঘরে দেখাইও তুমি... "
"আমার বা'লের বাসর..."
আবির রাগে ফুঁসছে। নিবিড়ের খারাপও লাগছে আবার এমন কান্ড দেখে হাসিও পাচ্ছে খুব।তবুও সিরিয়াস থাকার ভঙ্গিতে বললো....
"তুই কি ছোটপাখিকে বলেছিস এই কথা?"
"বলে কোনো লাভ হবে? ও মানে বুঝে এসবের? উল্টো আম্মুর কাছে গিয়ে বিচার দেবে, এমনিতেই ঝগড়ায় কাটে আমাদের।"
"তো বাড়িতে আব্বু আম্মুকে জানা?"
"তোর কি মনে হয় আমি জানাই নি? আমার ফিলিংসকে তো পাত্তাই দিচ্ছে না ইয়ার... আহিশ নাকি ভালোবাসে ওকে, আরেহ ওদের একসাথে মানায় না সেটা কে বোঝাবে বাড়ির সবাইকে। ওয়াইফিকে আজীবন সামলানোর মতো যোগ্যতাটাই নেই আহিশের।"
" ওরা ভালো ফ্রেন্ড...."
" ভালো ফ্রেন্ড হলেই ভালো হাসবেন্ড হওয়া যায় না। চড়াই পাখির যোগ্য হাসবেন্ড শুধু আমি, শুধু এই আবির বিন চৌধুরী ই..."
"হয়েছে হয়েছে, এবার মাথাটা ঠান্ডা কর। আজকের দিনটা যাক, তারপর না হয়...."
"কিসের আজকের দিন যাক? কোনো স্যুট হবে না আজ। "
নিবিড় মাথা দুলিয়ে বলে ওঠে....
"এএএ, আমার বিয়ে বাগড়া দিবি না বলে রাখলাম। এটমকে বহু কষ্টে পেতে যাচ্ছি, আর একটাও ঝামেলা নাহ। আমাদের প্রিওয়েডিং স্যুট তো হচ্ছেই, তোর দিক তুই সামলে নে। "
বলতে বলতেই বেরিয়ে যেতে নেয় নিবিড়। কিছু একটা ভেবেই আবার থেমে যায় সে। পেছনে ফিরে আবিরের কাছে এগিয়ে আসে আবার। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে পকেট থেকে কিছু একটা বের করে হাতে গুঁজে দেয় আবিরের।
কৌতূহল নিয়ে হাতের মুষ্টি খুলে তাকায় সে। ভিন্ন দুটো প্যাকেট। যার দুটোই চেনা তার। আবিরের ভাবাবেগে বোঝা গেলো না, অবাক হয়েছে নাকি রেগে আছে তা ঠিক ঠাওর করার মতো নয়। জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে নিবিড় নিজ থেকেই বলে....
" দুটো অপশন তোর হাতে। একটা শুধু আজকের দিনটার পরিকল্পিত কাজ বদলে দেওয়ার জন্য, আর আরেকটা.. আজ থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রতিটা মুহুর্ত বদলে দেওয়ার জন্য। "
চোখ সরু করে আবির জিজ্ঞেস করে...
"কি বোঝাতে চাইছিস তুই?"
"যা তুই ভাবছিস তাই.. কিছু পেতে হলে একটু খারাপ হতে হয়। হাতে যে মেডিসিন দিয়েছি তার একটা খেলে পেট ব্যাথা করবে প্রচন্ড। ছোটপাখি রসগোল্লা পছন্দ করে, সাথে এই মেডিসিনটা একবার পেটে গেলে আজ রাতে আর বাড়ি থেকে বের হওয়ার মতো অবস্থা থাকবে না ওর। আর দ্বিতীয় যে মেডিসিনটা আছে সেটার কাজ নিশ্চয়ই তুই জানিস। ছোটপাখিকে একবার ছুঁয়ে দে গভীর ভাবে, ওর নারীত্বে আঘাত পড়লে বাড়ির সবাই বাধ্য হয়ে তোর সাথে বিয়ে দেবে ওর। "
"তবে যদি বলি ঐ নারীত্বের জন্যই আমি ওকে বিয়ে করতে চাইছি? যদি বলি ওর শরীরটাই আমার মূল উদ্দেশ্য, সহজ ভাষায় যাকে বলে 'খেয়ে ছেড়ে দেবো এমন??"