ঘরভর্তি মানুষের মাঝে কেউ একজন এসে পরিবারের একজনকে উদাম কেলিয়ে বেরিয়ে গেলো, অথচ কেউ পারলো না তাকে আটকাতে। কথাটি অদ্ভুত শোনালেও এটাই ঘটিছে রায়হানের সাথে। আবিরের রাগ ও শক্তির কাছে টিকতে পারে নি সে কোনো ভাবেই। চড়ুই না এলে হয়তো এতক্ষণে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার টিকিট হাতে ধরিয়ে দিতো আবির তাকে।
আবিরের হাত থেমেছে, বুক পাজরে চড়ুইয়ের কম্পিত দেহ খানা আস্থার হাতে জড়িয়ে নিলো সে। দৃষ্টি নিবদ্ধ নেতিয়ে পড়া রায়হানের দিকে। ঘন ঘন শ্বাস ফেলে একটা কথাই বললো শুধু....
" কোনো এক্সপ্লেনেশন নয়,আমি তোর প্রাণটাই নেবো শুধু।বেঁচে গেলি আজ, কাল আর এই মেয়েটা থাকবে না তোর আর আমার মাঝে, তৈরি হয়ে নে...."
তারপর আর এক মুহুর্তও না দাঁড়িয়ে হাত নামিয়ে চড়াই পাখির পাতলা কোমড় চেপে কাঁধে তুলে নেয় তাকে। আগুনের ন্যয় দৃষ্টি সরিয়ে দরজা ধরে বেরিয়ে আসে বাড়িটি থেকে, যেন একটি ছোট্ট তান্ডবের সমাপ্তি.....
নীরব রাতের রাস্তায় এপাশ থেকে ওপাশ ছুটছে গাড়ি গুলো, তারই মাঝে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটির পেছন সীটে এনে ফেললো চড়াইয়ের ছোট্ট দেহটি। চড়ুই ভেবেছিলো আবির হয়তো সামনে বসে গাড়ি স্টার্ট দিবে, কিন্তু আবিরের মাঝে তেমন কোনো তাড়া দেখা গেলো না। শরীরের ভারী জ্যাকেটটা খুলে সামনের সীটে ছুঁড়ে ফেলে চড়ুইয়ের পাশেই উঠে বসে সে। সর্বপ্রথম গাড়ির দু পাশের জানালার গ্লাস গুলো বন্ধ করে নেয় সে নীরব ভঙ্গিমায়। তারপর বভাবনার বাইরে গিয়ে হঠাৎ চড়ুইয়ের কাঁধে ধাক্কা মারে আবির। টাল সামলাতে না পেরে হাওয়ায় উড়ার মতো সীটে হেলে পড়ে মেয়েটা। এক ন্যানো সেকেন্ডের মাথায় চড়ুইয়ের উপর নিজের শরীর ছেড়ে দেয় আবির। চড়ুই টের পেতে না পেতেই মেয়েটার ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দেয় আবির। পিনপতন এক শব্দবিহীন আর্তনাদ বয়ে যায় ঐ একটি মুহুর্তে, ছটফটায় চড়ুই, দু হাতে আবিরের বুকে পেটে ধাক্কা দিতে থাকে, কিন্তু আবির ছাড়ে না। বরং আরো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নেয় চড়ুইকে। আবিরের অবাধ্য হাতটি যখন চড়ুইয়ের শাড়ির ভাজ গলিয়ে পেটের নরম চামড়া স্পর্শ করে তখনই চড়ুই চোখমুখ কুঁচকে নেয় যন্ত্রণায়। হাত নামিয়ে আবিরের জামার হাতা টেনে সরাতে চায় শুধু।
দক্ষ ভঙ্গিতে চড়ুইয়ের সেই হাত খানা নিজ হাতের দখলে নিয়ে মাথার উপরে চেপে ধরলো আবির। চড়ুইয়ের ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকায় মেয়েটির তনুর দিকে। হাঁপাচ্ছে মেয়েটা,বেশ হাঁপাচ্ছে, হয়তো আর একটু হলেই দম আটকে যেতো।
" কি হলো এমন করছিস কেন? আমার ছোঁয়া ভালো লাগছে না? ঐ রায়হানের ছোঁয়া বেশি ভালো লেগেছে?"
হঠাৎ আবিরের এমন কথায় মুখ কুঁচকে যায় চড়ুইয়ের। এতক্ষণের সব কিছুর রেশ কেটে গিয়ে হঠাৎ তীব্র রাগ ভীড় করে মস্তিষ্কে। লোকটা এমন কেন?
চোয়াল শক্ত করে আবিরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় চড়ুই,কঠোর স্বরে বলে....
"আপনি আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিবেন নাকি আমি একাই চলে যাবো?"
চড়ুইয়ের এমন বিপরীতমুখী কথায় আবির চোখ সরু করে নেয়। বা হাতে চড়ুইয়ের থুতনি চেপে ধরে নিজের দিকে ঘোরায়....
"তেজ দেখাচ্ছিস তুই আমার সাথে? পার্টিতে এত কিছু হয়ে গেলো তুই বান্দি আমাকে বলেছিস তখন?"
" আপনি নিজের ঐ সেক্সি বান্ধবী না কি তার কাছেই থাকুন,আমার কথা শোনার মতো সময় ছিলো আপনার? ওখানে আমি কাকে চিনি আপনাকে ছাড়া? আর আমি তো প্রথমেই বলেছিলাম আমি যাবো না ভেতরে, আপনি জোর করেছেন। আপনার কি দায়িত্ব ছিলো না আমাকে একটু সময় দেওয়া?"
"তুই চাস আমি তোকে সময় দিই?"
"চেয়েছিলাম,বার বার করে আপনাকে বলতে চেয়েছিলাম ঐ লোকটার কথা। আপনি চোখ রাঙিয়েছেন, অন্যদের সাথে ব্যস্ত ছিলেন। আমাকে সময় দিবেন কেন, কে হই আমি? পড়ে আছি তো আপনাদের বাড়ির আশ্রিতার মতোই। আশ্রিতাকে কি কেউ সময়......"
"চড়াই...!!!"
আবিরের ধমকে চুপ হয়ে যায় চড়ুই। অস্থির চিত্তে ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে লোকটা। চড়ুই অভিমান নিয়ে শুধু তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে।
আবিরের মুখ ভঙ্গি চেনার উপায় নেই। তবুও চড়ুইয়ের ইচ্ছে হয় চেয়ে থাকতে, লোকটার এই রক্তিম মুখটাও দেখার প্রবল ইচ্ছে দমায় না সে। আবির তো আর বারণ করছে না দেখতে, চড়ুই না হয় সুযোগটা লুফেই নিলো একটু।
হুট করেই আবির চড়ুইয়ের গলায় মুখ গুঁজে দেয়, চড়ুই হত-বিহবল হয়ে তার চুল খামছে ধরে সরাতে চায়, পরক্ষণেই অনুভব হয় আবির কিছু করছে না, শুধু তার ঘন গরম নিশ্বাস চড়ুইয়ের গলায় চামড়া ভেদ করে শিরা গুলোকেও উষ্ণ করে তুলছে। চড়ুই আর সরায় না আবিরকে, লোকটার মাথায় সিল্কি চুলের ভাঁজে হাত রেখেই স্থির থাকে। প্রতিক্ষমান সময় কাটছে যেন, এই ভর রাতের আধারি খেলায় সাক্ষী বিহীন এক কাব্যের উৎপত্তি। বারিধারার মতো ভিজে যাচ্ছে চড়ুইয়ের কোমল গ্রীবাদেশ, ঠিক যেখানটায় আবির এখনো মুখ গুঁজে আছে। একটু পরেই সরু করে নাক টানার শব্দ, তারপর আবিরের ভঙ্গুর কন্ঠের মিনমিনে স্বর....
"বাড়ি গিয়ে একবার গোসল করে নিও পাখি.... "
আবিরের গলার স্বর স্পষ্ট না হলেও চড়ুই বুঝে তার কথা, সাথে এটাও বুঝে যে পাষণ্ড হৃদয়ের ব্যক্তিটা আজ কাঁদছে। কিন্তু কেন?
"এ্ এখন? "
"হুম..."
"শীত লাগবে তো এত রাতে গোসল করলে... "
"আমি গরম পানি করে দিবো, একটুও শীত লাগবে না... "
চড়ুই চিন্তা করলো কিছু, তারপর আস্তেধীরে প্রশ্ন করলো....
"আপনি কাঁদছেন কেন?"
"তোমার খেয়াল রাখতে পারি নি তাই.. "
"বাবাহ, আমার জন্য কাঁদছেন?"
আবির নীরব রয়,উত্তরটা তার জানা থাকলেও দেওয়ার প্রবনতা নেই। হঠাৎ চড়ুই দু হাতে আবিরের দু গাল ধরে মুখ নিজের মুখোমুখি ধরে।
আবির তাকায় ভেজা চোখ নিয়েই, চড়ুই চেয়ে দেখে, প্রথম বারের মতো লোকটার রাগবিহীন চেহারা। লোকটা অনুতপ্ত কি?...
হঠাৎ চড়ুই নিজের মুখ উঁচিয়ে নিয়ে আবিরের ভেজা চোখের পাতায় নিশব্দ চুমু খায়, প্রথমে ডান চোখ, তারপর বা চোখ....
"আমার জন্য বোন ছাড়া কাউকে কাঁদতে দেখিনি।ও যখন আমার জন্য কান্না করে তখন আমি এভাবেই ওর চোখে আদর দিয়ে দিই। আপনি স্বীকার না করলেও আমি জানি আপনি আমার জন্যই কাঁদছেন, তাই আপনাকেও আদর দিয়ে দিলাম। এবার স্মাইল করুন তো?"
আবির অবাক হয়ে চেয়ে রয় তার বাচ্চা হৃদয়ের মেয়েটির দিকে। আজ নিজের অনুভূতির প্রতি কোনো দ্বিধা রইলো না তার, সে ভুল কাউকে বেছে নেয় নি। এইতো চড়াই, আবিরের কান্না থামানোর প্রচেষ্টায় যে তার তথাকথিত আদর দিয়েছে আবিরকে, আবিরের আর কিই বা চাই।
"কি হলো স্মাইল করুন?"
চড়ুইয়ের কথায় আবির না হাসলেও মুখ নামিয়ে চড়ুইয়ের কপালে শব্দ করে একটা চুমু খেয়ে চড়ুইয়ের উপর থেকে উঠতে উঠতে বলে...
"আদরের রিটার্ন গিফট এটা..."
------------
বাড়িতে প্রবেশ করার সাথে সাথেই সাবিহার প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় নিবিড়দের...
"আহিশ-চড়ুই কোথায়?"
তখন চড়ুইয়ের কথায় ইচ্ছে করে নিবিড়কে কল না দিলেও একটা টেক্সট করে দিতে ভুলে নি।
" ওয়াইফি আমার সাথে আছে, আর আহিশের অপেক্ষা করারও দরকার নেই, তোরা নিজেদের মতো এনজয় কর।"
এরপর নিবিড় আবিরকে প্রায় বিশটার উপরে টেক্সট,কল করলেও আবির কোনো প্রকার রেসপন্স করেনি। কিন্তু রাত প্রায় ১ টায় বাড়ি ফিরেও যখন দেখলো আবির এখনো ফিরেনি তখন বেশ বড়সড় ধাক্কাই খেলো নিবিড়।সাথে আহিশকে কি করেছে তাও জানে না কেউ। দোয়েলেরও একই অবস্থা, এতক্ষণ বোন আবির ভাইয়ের সাথে আছে ভেবে খুশি মনে নিবিড়ের সাথে নিজের মতো সময় কাটালেও এখন চিন্তা হচ্ছে বেশ। এখনো কেন ফিরলো না তারা?
দোয়েলের মুখে চিন্তার ছাপ দেখে নিবিড় পরিস্থিতি সামলাতে সাবিহাকে বলে....
"আ্ আহিশ আর ছোটপাখি... ওরা আসছে। আ্ আসলে এটমের টায়ার্ড লাগছিলো বলে আমরা চলে এসেছি, ছোটপাখি ওখাননার মার্কেট থেকে খুটিনাটি কেনাকাটা করছে। আহিশকে বললেছি ওকে নিয়ে আসতে। বাকিরা কোথায় আম্মু?"
"সবাই ঘুমাচ্ছে, আমিই তোদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম কখন আসবি এই ভেবে.. "
"ওহ, ভাই কি ঘরে?"
"নাহ, ও তো কার জানি বার্থডে পার্টিতে গেলো। "
"আচ্ছা, তাহলে তুমি ঘুমিয়ে পড়ো যাও, রাত অনেক হয়েছে। ভাইয়ের কাছে তো চাবি আছেই, আর আহিশরা ফিরলে আমি খুলে দেবো দরজা।"
নিবিড়ের সাথে তাল মিলিয়ে দোয়েলও বললো...
"হ্যা আম্মু, তুমি যাও। আমিও আছি।"
সাবিহাকে কোনো মতে রুমে পাঠাতেই দোয়েলের চিন্তিত কন্ঠ ভেসে আসে নিবিড়ের কানে...
"ভাইয়ারা এত দেরি করছে কেন? আমার কিন্তু ভয় হচ্ছে খুব। "
"টেনশন নিও নাহ এটম,,ভাইয়ের উপর ভরসা রাখো। আমি ওকে কল করছি, তুমি রুমে যাও, ফ্রেশ হয়ে নাও। হৃদকে নিয়ে যাও... "
লাগাতার কল করার পর আবির কল রিসিভ করলো।সাথে সাথেই নিবিড়ের ধমক ভেসে আসে ফোনের ওপাশ থেকে...
"এই শা'লা, আক্কেল জ্ঞান পকেটে ভরে রেখেছিস?ফোন রিসিভ করছিস না কেন?"
"আক্কেল জ্ঞান নয়,ফোন পকেটে ভরে রেখেছিলাম। "
"আছিসটা কোথায়?"
"যেখানে থাকার কথা..."
"যেখানে থাকার কথা মানে?"
"কেন, মনে নেই? বিকেলে দুটো জিনিস দিয়ে বলেছিলি একটা টেম্পোরারি, আরেকটা পার্মানেন্ট। "
নিবিড় একটু ভাবতেই চোখ বড় বড় হয়ে যায় তার। আশপাশে তাকিয়ে দেখে নেয় কেউ আছে কিনা। অতি সতর্কতার সহীত মৃদু ধমকে বলে....
"ভাই তুই সত্যিই ছোটপাখির সাথে ওসব.... ও কোথায়?"
ড্রাইভিং করতে করতে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার বা পাশের সীটে তাকায় আবির। ছোট্ট চড়াই তার কাঁধে মাথা হেলিয়ে দিয়ে আরামসে ঘুমাচ্ছে কেমন..
"আমার কাছেই।"
" কি হাল করেছিস ওর? তোকে আমার সন্দেহ হচ্ছে ভাই..."
"সন্দেহ হলে নিজের হবু বউকে দেখ সা'লা... রাতুলকে বল, ঐ রায়হানের একটা ব্যবস্থা করতে। ওয়াইফির জন্য বেচে গেলো রাসকেলটা..."
"কোন রায়হান, কি হয়েছে আবার?"
"রায়হান তপোদার, আমাদের সোরেসেন্ট প্রজেক্টের মেইন ক্লায়েন্ট।"
" ওর ব্যবস্থা করবে মানে? ভাই.. কম্পানি থেকে অলরেডি তেরো কোটি টাকা ঐ প্রজেক্টে ইনভেস্ট করে ফেলছি আমরা..."
" চুলোয় যাক আমার তেরো কোটি টাকা, দরকার হলে তোর ঠ্যাং ভেঙে রাস্তায় বসিয়ে ভিক্ষা করাবো, তাও ঐ রায়হানের দুটো হাত আমার কালেকশনে দেখতে চাই।"
"আরে ও করেছে টা কি?"
"আমার কলিজা ছুঁয়েছে, আর কিছু জানতে চাস?"
আবিরের কথা মোটেও স্বাভাবিক লাগছে না নিবিড়ের কাছে। হঠাৎ কিছু একটা মাথায় আসতেই বলে ওঠে....
"আহিশ কোথায়?"
"মে'রে দিয়েছি..."
"আর ইউ আউট অফ ইউর মাইন্ড ভাই? কি বলছিস এটা? আহিশ আমাদের চাচাতো ভাই..."
"আমার পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করার সাধ করেছে কেন ও? ওর বোঝা উচিত ছিলো না আগে? "
"ভাই, সত্যি করে বল আহিশ কোথায়? চাচি জানতে পারলে কিন্তু..... "
"পার্কিং লটে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। ভুলেও ওকে আনতে যাবি না বলে দিলাম। "
"তারাতাড়ি ফিরে আয়, মিস এটম চিন্তা করছে.."
"বড় পাখিকে বল ঘুমাতে। আমি ওয়াইফিকে ঘরে পৌঁছে দিবো।"
---------
বাড়িতে পৌঁছে গাড়ি পার্ক করে আবির সযত্নে ঘুমন্ত চড়ুইকে পাঁজা কোলে তুলে ভিতরে প্রবেশ করলো। সূক্ষ্ম ভঙ্গিতে অন্ধকার ড্রয়িং রুমের এপাশ থেকে ওপাশ পরখ করে নিলো কেউ আছে কি নেই। নীরবতা বুঝে চড়ুইকে নিয়ে সোজা নিজের রুমে এসে দরজা লক করে দেয়। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সর্বপ্রথম গিয়ে গিজারের সুইচটা অন করে আসে।
চড়ুইয়ের এলোমেলো ভাবে ঘুমানোর ভঙ্গি দেখে নাক কুঁচকায় আবির, ভেতর থেকে গভীর এক হাহাকার বেরিয়ে আসে নিজের জন্য, বিয়ের পর হয়তো ঘুমের মাঝে এই মেয়েটার লাথি খেয়েই বিছানা থেকে ছিটকে পরতে হবে আবির বিন চৌধুরীকে,কি কপাল....।
চড়ুইয়ের ঘুম নষ্ট করার কোনো ইচ্ছে না থাকলেও বার কয়েক ডাকে আবির। মেয়ের হুশ নেই৷ বাধ্য হয়ে এবার আবির ঝুঁকে চড়ুইয়ের গলায় থাকা হার আর কানের দুল গুলো খুলে এক পাশে টেবিলে রেখে আবারো পাজা কোলে তুলে নেয় মেয়েটাকে।
ওয়াশরুমে ঢুকে কুসুম গরম পানিওয়ালা বাথটবে চুবিয়ে দিতেই ধরফরিয়ে উঠে বসে চড়ুই...
"এই.. কি হলো.. আগুন লাগছে.. আগুন , আগুন.. আমার গা জ্বলে গেলো..."
চড়ুইয়ের হঠাৎ এমন কান্ডে আবির নিজেও চমকায়, জ্বলছে মানে? বাথটবে হাত চুবিয়ে দেখে নেয় পানি ঠিক পরিমাণ মতোই গরম,এর বেশি নয়। এই মেয়ে কবে না জানে মেরে ফেলে তার এমন উদ্ভট কথায়।
"চড়াই!!!, থামো পাগল মেয়ে... কোনো আগুন নেই, এটা গরম পানি। তুমি না আমায় কথা দিয়েছিলে বাড়ি এসে গোসল করবে? "
চড়ুই ঘুম জড়িত ফোলা চোখ নিয়ে হাবলার মতো আবিরের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাকায়। এতেই আবির হাফ নিশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যায় ওয়াশরুমের অন্য প্রান্তে, যেখানে থাকে থাকে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন সরোন্জাম। সেখান থেকে নিজের পছন্দের একটি শাওয়ার জেল তুলে নিলো সে, পরক্ষণেই পটের গায়ে 'ম্যান' লিখাটা চোখে পড়তেই আবার রেখে দেয় সেটি আগের জায়গায়। চড়ুইয়ের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে নিজ থেকেই বলে....
"থাক, জেল লাগবে না। এমনিই গোসল সেরে নাও.. "
বলতে বলতেই বাথটাবের পাশের একটা সুইচে চাপ দিতেই কয়েক সেকেন্ডের মাথায় বাথটবটি সুভ্র সাবানের ফেনায় ভরে উঠলো। চড়ুই দু হাতে একটু খানি ফোম তুলে বোকার মতো তাকিয়ে রইলো সেদিকে।...
"ঐ যে টাওয়াল রাখা আছে,তোমার নাইট সুট এনে দিয়েছি, পাঁচ মিনিটের মধ্যে বেরিয়ে আসবে। "
চড়ুই ঘুমঘুম ভাব নিয়েই হামি তুলতে তুলতে বলে...
"আচ্ছা.. "
চড়ুই হুশে আছে, এই দেখে আবির নিশ্চিন্ত হয়ে বেরিয়ে যায় ওয়াশরুম থেকে।
কিছুক্ষণ পরেই আবিরের কথা মতোই চড়ুই চেঞ্জ করে ভেজা চুলে আবিরের প্রতিদিনের ব্যবহৃত টাওয়ালটা পেচিয়ে বেরিয়ে আসে। ততক্ষণে আবিরও রুমেই চেঞ্জ করে নিয়েছিলো। চড়ুইকে বের হতে দেখে মাত্রই এগিয়ে গিয়ে বলতে নেয়...
"রুমে যাও, ঘুমিয়ে পড়ো..."
কিন্তু তার কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই চড়ুই হাঁটতে হাঁটতে মাথার টাওয়ারটা এক টানে খুলে ডিভানে ছুরে ফেলে আবিরের বিছানায় এক লাফে উপুর হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করেই আওড়ানো কন্ঠে বলে....
"আর কোনো কথা রাখতে পারবো না, এবার শুধু ঘুম..."
হা করে তাকিয়ে রয় আবির। আরে সেও তো এটাই বলতে নিচ্ছিলো।সে মেয়ে শুনলো কই আর।
আবির হাফ নিশ্বাস ফেলে এগিয়ে যায় বিছানার দিকে, চড়ুইয়ের কাঁধ ধরে ডাকে...
"এই চড়াই, নিজের রুমে গিয়ে ঘুমাও?"
কে শুনে কার কথা, চড়ুই তো মিনিটের মাথায়ই ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দিয়েছে।
"এই... "
বলতে বলতেই চড়ুইকে ঠেলে সোজা করতেই কথা আটকে যায় আবিরের৷ অসাবধানতায় চড়ুইয়ের পেটের দিক থেকে জামাটা সরে গিয়েছে। ফর্সা পেটে স্পষ্ট কয়েকটি লালছে দাগ জ্বলজ্বল করছে। আবির কম্পিত হস্তে জামাটা আরেকটু সরাতেই দাগ গুলো আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রক্ত জমাট বেঁধে আছে জায়গাটায়। আবিরের বুঝতে দেরি হয় না তখন রাগের মাথায় গাড়িতে করা কাজটিরই চিহ্ন এটা।
ঢোক গিলে আবির। কি করে ফেলেছিলো সে তখন, নিজের করা ভুলের জন্য এই মেয়েটাকেই আঘাত করেছে সে, অশান্তিতে বুকটা ভার হয়ে ওঠে তার। চড়াই পাখি যন্ত্রণায় ভুগছে তারই জন্য।
নিজের খসখসে হাতের আঙুল গুলো সেই ক্ষত স্থানে ছুঁইয়ে দিতেই নড়েচড়ে ওঠে চড়ুই। এলোমেলো হয়ে আবার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। মেয়েটার মুখের দিকে তাকাতেই কষ্ট হচ্ছে আবির। মনে মনে নিজেকেই নিজে বলাৎকার করতে লাগে সে....
"আবির... তুই একটা রাক্ষস।তুই একটা পাষণ্ড, কি করে পারলি নিজের প্রাণের সব চেয়ে কাছের মানুষটাকে এভাবে আঘাত করতে?"
ড্রয়ার খুজে এন্টিসেপটিক এনে স্বযত্নে চড়ুইয়ের ক্ষত স্থানে লাগিয়ে দিয়ে তাকে পাঁজা কোলে তুলে নেয় আবির। ঘুমন্ত চড়ুইয়ের নাকের ডগায় শব্দ করে একটা, দুটো, করে করে চারটা চুমু খেয়ে আপন মনেই বলে ওঠে....
"ঘুমাও প্রেম, তোমায় রেখে আমায় যেতে হবে ঐ কীটের কাছে, হাত ভেঙে তো আমার শান্তি হচ্ছে না। ঐ হাত শরীর থেকে আলাদা করবো আমি নিজ হাতে, তবেই আমার শান্তি... "
দরজা খুলে বেরিয়ে চড়ুইকে তার রুমে শুইয়ে দিয়ে আবারো কপালে ভালোবাসার পরশ একে দিয়ে রুম থেকে বের হতেই থমকে যায় আবির। তার সামনে দাড়িয়ে আছে সাক্ষাৎ তার জননী.....
"রাত দুটো বাজে.... কাজটা তুই আদেও ঠিক করছিস তো আবির? ছোটপাখির পবিত্র কপালখানা নোংরা করার অধিকার তোর নেই.... "
"যেটা আমার সম্পদ, সেটা আমি হাজার বার ছুলেও নোংরা হবে না আম্মু। আপনি শুধু দেখতে থাকুন, ঐ পবিত্র কপাল সহ পবিত্র নারীটিও একদিন আমার জন্য সম্পূর্ণ হালাল হবে, ইনশাআল্লাহ.... "