শীতল রোদের আলো চোখে পড়তেই বিরক্ত হয় আবির। ঘড়ির কাটায় তখন বেলা প্রায় ১১ টা। অফিসে কাজের চাপ কম, তাই তারাতারি অফিসে যাওয়ার তাড়নাও নেই আজ। এমনিতেও এই কয়েকদিন বাড়িতে থাকাই ভালো মনে হচ্ছে তার কাছে। কখন কি হয়ে যায় আবার।
বিছানা ছেড়ে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে আবির। বালিশের পাশে অনবরত বাজতে থাকা ফোনটা এবার রিসিভ করে কানে ধরতেই ও পাশ থেকে রাতুলের চিন্তিত কন্ঠ ভেসে আসে...
"স্যার, রায়হান পালিয়েছে। "
আবিরের শান্ত মস্তিষ্ক হঠাৎই ত্বরান্বিত হয়ে ওঠে।..
"ওয়াট.... পালিয়েছে মানে কি হ্যা? "
"আজ সকালেই ওর বাড়িতে গিয়ে তুলে আনার কথা ছিলো স্যার। কিন্তু ওর বাড়ির লোক জানালো যে ও কোথায় তা কেউ জানে না। পরে ড্রাইভারকে একটু চাপ দিতেই স্বীকার করলো আজ ভোরে ভোরে রায়হানকে এয়ারপোর্টে ছেড়ে এসেছে। বেটা দেশ ছেড়েছে এটা শিউর। কিন্তু কোথায় গেছে তা জানা নেই।"
আবির দাঁতে দাঁত পিষে বাঁকা হাসে। চেপে বলে ওঠে...
"পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে ওকে আমি খুঁজে বের করবোই। আরো সোর্স লাগাও, ঐ রাসকেলটাকে আমার চাই..."
আর কোনো প্রকার বাক্য ব্যয় না করে কল কেটে দিলো আবির। অশান্ত মনটা কোনো ভাবেই সামলাতে পারছে না। যেই হাত তার পাখিটার শরীর ছুঁয়েছে বাজে ভাবে, সেই হাত তো কিছুতেই রাখবে না আবির। রায়হানকে তার লাগবেই....
ক্ষিপ্ত গতিতে বিছানা ত্যাত করে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায় সে।বের হতে হবে তাকে, প্রয়োজনীয় কিছু কাজ না করলেই নয়।
ওয়াশরুমে প্রবেশ করতেই থমকে যায় আবির। হুট করেই এক রাশ অদ্ভুত অনুভূতি খেলে যায় বুকে। এইনা ছেলেটা ভীষণ রেগে ছিলো? কিন্তু এখন দেখো, হাসছে আবির। মনের আনন্দে হাসছে।
সামনেই ফ্লোরে এলোমেলো ভাবে পড়ে আছে গতকাল রাতে পরিধানকৃত চড়ুইয়ের শাড়িটা। রাতের কথা চিন্তা করতেই ফিক করে হেঁসে ফেলে আবির। মেয়েটা ঘুমে এতটাই মগ্ন ছিলো যে কার ওয়াশরুমে গোসল করছে তাও একবার খেয়াল করে নি। ভেজা কাপড়গুলো না ধুয়েই এলোমেলো ফেলে রেখে চলে গেছে।
আবির এগিয়ে যায়, ফ্লোর থেকে চড়ুইয়ের ফেলে রাখা শাড়ি, ব্লাউজ সহ যাবতীয় সব কিছু হাতে নিয়ে কিছু মুহুর্ত তাকিয়ে রয় সে। পরক্ষণেই হেসে আপন মনেই বলে ওঠে....
" শুধু নামেই নয় ওয়াইফি, সাইজেও সব ছোট্ট তোমার....... "
চাইলেই ওয়াশিং মেশিনে দিয়ে দিতে পারতো কাপড় গুলো। কিন্তু আজ আবির তা করে নি। শাওয়ার শেষ করে নিজের সাথে সাথে খুব যত্ন করে চড়ুইয়ের প্রতিটি কাপড়ও ধুয়েছে আবির। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে নিজ বারান্দায় চড়ুইয়ের কাপড়গুলো মেলে দিতেই পেছন থেকে সাবিহার কন্ঠ ভেসে আসে কানে....
" আহিশ কেন কাল গাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলো?"
আবির পেছনে ফিরে তাকায় এমন মিষ্টি মূহুর্তে সাবিহার আগমন মোটেও কাম্য ছিলো না আবিরের। তবুও নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলে...
"সেটা আমি কি করে জানবো?"
সাবিহার দিক থেকে কোনো উত্তর আসে না। আবির ব্যস্ত ভঙ্গিতে সাবিহার দিকে তাকাতেই খেয়াল করে সাবিহা কিছু একটার দিকে দৃষ্টি স্থির করে রেখেছে। সাবিহার দৃষ্টি অনুসরণ করে আবিরও নিজের পেছনে তাকাতেই চোখ আটকায় মাত্রই মেলে দেওয়া নারী দেহের একটি অন্তর্বাসের উপর। বেশ লজ্জায় পড়ে যায় আবির, তড়িঘড়ি করে পাশ থেকে শাড়িটা দিয়ে ঢেকে দেয় সেটি।
আবিরের কাজ সাবিহা সূক্ষ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে বলে ওঠে....
"এটা ছোটপাখির?"
আবির সত্য লুকায় না, উত্তর দিলো...
"হুম.."
"ছোটপাখির প্রয়োজনীয় পোশাক তোর বারান্দায় কেন?"
আবির এবার একটু প্রতিবাদী হয়ে বলে ওঠে...
"তুমি শুধু ওটাই দেখতে পেলে? পাশে যে শাড়ি, বাকি সব আছে সেগুলো দেখো না?"
" সবই দেখছি, কিন্তু এগুলো তোর বারান্দায় কেন?"
"শুকাতে দিয়েছি.."
"এখানেই কেন?"
"এমনি।"
"রাতে কি তুই ছোটপাখির সাথে কিছু... "
"আম্মু.... ভুলভাল বলো না তো। আমি কি পাগল যে ওর সাথে.... "
"তাহলে কাল কি হয়েছিলো আবির? উত্তর দে তুই?"
"সাবিহার ঝাঁঝালো কন্ঠের রেশে আবির শুধু চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে থাকে। সাবিহা আবার চেঁচিয়ে বলে ওঠে....
" আহিশ একটু আগে ঘরে ঢুকলো, ও নাকি কখন গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছে ও নিজেও জানে না,, ছোট পাখি সবটা বলেছে আমায় আবির। কাল ও কোনো ছবি তুলতে আহিশের সাথে যায় নি বরং তোর সাথে পার্টিতে গিয়েছিলো..."
এবার আর আবির চুপ রইলো না। হুংকার দিয়ে উঠলো.....
"হ্যা গিয়েছিলো ও আমার সাথে, আমি নিজেই নিয়ে গিয়েছি ওকে। আহিশের ঘুমও আমার কারনে এসেছে। আমিই ওকে ঘুমের মেডিসিন খাইয়েছি কৌশলে, তোমাদের ভাগ্য ভালো ওকে আমি মে'রে ফেলিনি..... "
"আবির....!!"
"কি আবির আবির করছো? আমাকে সত্যি করে বলো তো, তুমি আমায় আদেও জন্ম দিয়েছো? নিজ চোখের সামনে তুমি আমার ভালোবাসার মানুষটার বিয়ে দিতে চলেছো আমারই ছোট ভাইয়ের সাথে। কি চাও তুমি? আমি মরে যাই? চলে যাই এই বাড়ি থেকে? আমি আর পারছি না আম্মু... বিশ্বাস করো আমি আর পারছি না। আমার ভেতরকার যন্ত্রণা না তোমরা বুঝো আর না ঐ মেয়েটা। আমার চড়াই তো বাচ্চা, ও না হয় ভালোবাসা বোঝে না, তুমি মা হয়েও কি বুঝতে পারছো না ছেলের অবস্থা? কেন আমার শত্রু হয়ো যাচ্ছো তোমরা সবাই? কেন???"
সাবিহা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে নিজের ছেলেটার দিকে। মায়ের মন বোঝে, সবটা বোঝে। এই যে আবির এখন চক্ষু লাল করে ঘন শ্বাস ফেলে কথা গুলো বললো, প্রকাশ্যে তার ক্ষোবটা থাকলেও ভেতরে যে ছেলেটা ভেঙে গুড়িয়ে যাচ্ছে তা তো বেশ বোঝে মায়ের মন।
আবির উতলা হয়ে এদিক ওদিক পায়চারি করছে, নিজের চুল নিজেই খামছে ধরেছে। দু হাতে মুখটা ঢেকে ঘন ঘন শ্বাস ফেলচে শুধু। একটা মিনিটলর নীরবতা, পরক্ষণেই আবির নেতিয়ে পড়া ভঙ্গিতে এসে দাঁড়ায় সাবিহার সামনে। ভঙ্গুর হৃদয় নিয়ে দু হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে সাবিহার সামনে। নিজের রুক্ষ হাত দুটি আজ মেলে ধরে মায়ের কাছে।
"আমার চড়াইকে ভিক্ষা দাও আম্মু, বিশ্বাস করো পৃথিবীর সমস্ত সুখ আমি ওর পায়ের নিচে এনে ফেলবো। এত টুকু দুঃখ ছুঁতে দিবো না ওর গায়ে। দাও না আম্মু... আমি আর কিচ্ছু চাইবো না তোমার কাছে, তুমি চাইলে আমি ওকে নিয়ে এই বাড়ি, এই পরিবার, কম্পানি, সম্পত্তির ভাগ সব ছেড়ে দূরে চলে যাবো, তাও দাও না আমার চড়াইকে। মেয়েটাকে আমি অন্তরে ঠাই দিয়ে দিয়েছি আম্মু, মেয়েটাকে আমি ভালোবাসি, ঐ দস্যি মেয়েটার থেকে আমি নিজেকে আলাদা করলে মৃত্যু আমার নিশ্চিত... আমায় ভিক্ষা হিসেবেই দাও না চড়াই পাখিটা.."
সাবিহা স্তব্ধ, ছেলেটার দাম্ভিকতা নেমেছে। ও মেয়ে এই পাষণ্ড হৃদয়ের ছেলেটাকে পাগল করে দিয়েছে। প্রেমে পড়লে বুঝি মানুষ নিজের আত্ম সম্মানও খুইয়ে ফেলে? এই যেমন এক নামে চেনা আবির বিন চৌধুরীও আজ প্রিয় মানুষটাকে ভিক্ষুকের মতো করে দু হাত পেতে চাইছে...
" এই তুই-ই কিছু মাস আগে বলেছিলি ছোটপাখিকে তুই ঘৃণা করিস, আজ এতো পরিবর্তন কি করে আবির?"
আবির মাথা নুইয়ে ফেলে। ভাঙা ভাঙা কন্ঠে নুইয়ে পড়ার মতো করে বলে ওঠে.....
"মেয়েটা কালোজা'দু করেছে আম্মু। এই জীবনে আমি আর ওকে ছাড়া থাকতে পারবো না।"
দরজার আড়ালেই দু জোড়া আঁখির সন্ধান মিলে। নিবিড় আর দোয়েল সবটাই দেখেছে, সবটাই শুনেছে। আবিরের করুন অবস্থা দেখে নীরবেই দোয়েলের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রুকণা। উপরওয়ালা তাকে দিয়েছে, তার এত বছরের দুঃখের অনেকাংশই পুষিয়ে দিয়েছে৷ অবুজ বোনটাকে নিয়ে চিন্তার শেষ ছিলো না দোয়েলের। কিন্তু আজ বুঝতে পারলো আবির ভাই তার চিন্তার রেশ কাটাতেই এসেছে। চড়ুইকে সামলানোর জন্য কেউ তো আছে।
দাঁড়ানোর আর সাধ্য হয়নি দোয়েলের। দু হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি মুছে প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। দোয়েলকে ছুটতে দেখে নিবিড়ও চিন্তিত হয়ে পেছন পেছন দৌড়ালো।
নিজের রুমে এসে শব্দ করে কেঁদে উঠলো দোয়েল। নিবিড় চমকায়, বুকটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে তার। কেন কাঁদছে মেয়েটা? নিবিড় কি আবার তাকে কোনো বড় সড় আঘাত করে ফেললো?
ছুটে গিয়ে দোয়েলকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে চোখ মুছিয়ে দিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে ওঠে....
"এই মেয়ে, কাঁদছো কেন তুমি? কি হয়েছে আমায় বলো? কোথায় কষ্ট হচ্ছে? "
দোয়েল নাক টানছে ঘন ঘন। ভেজা চোখ নিয়ে নিবিড়ের সেই ভীত চোখের দিকে তাকায়। নিবিড় অপেক্ষা করে মেয়েটা কিছু বলার। হলোও ঠিক তাই। মিনিট খানেক পর দোয়েল কান্নারত কন্ঠে কেমন বাচ্চাদের মতো আবদারের সুরে বলে ওঠে...
" আপনি আমায় আবির ভাইয়ের মতো করে ভালোবাসবেন তো?"
থেমে যায় নিবিড়, শীতল নেত্রে মেয়েটার লাল হয়ে যাওয়া মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ এক টানে নিজের কাছে এনে বুকে জড়িয়ে নেয় তাকে। মেয়েটা কি ভয় পাচ্ছে? নিবিড়ের ভালোবাসা নিয়ে সন্দেহ করছে? কেন এতটা টানাপোড়েন চলে মেয়েটার মনে? এতটা বুঝদার হলো কেন তার এটম? না হলেই কি হতো না?
" আমি তোমাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি এটম..."
দোয়েলের কান্না কমে আসে, নিবিড় নিদারুণ ভঙ্গিতে আদুরে হাত বুলিয়ে দেয় দোয়েলের কোঁকড়ানো চুলের ভাঁজে। মেয়েটা বড্ড আদুরে, প্রকাশ্যে নয়, তবে নিবিড় বুঝে গেছে, এই মেয়েটা নিবিড়ের সান্নিধ্যে এলেই একটা বাচ্চা মনা হয়ে যায়। কারোর কাছে বলতে না পারা কথা গুলো নিবিড়কে বলতে চায়। নিবিড় একটু আশকারা দিলেই মেয়েটার ভেতরকার সবটা উগলে দিবে নিশ্চিত তার কাছে। আর নিবিড় তাই চায়, একটা খোলস বিহীন দোয়েলকে চায়। যার কঠোরতা নিবিড়ের কাছে থাকবে না, যার দূর্বলতা কেউ না জানলেও নিবিড় জানবে, যে মেয়েটা নির্দিধায় নিজের সব কথা নিবিড়কেই বলবে।
নিবিড় মুখ নামিয়ে দোয়েলের কপালে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে বলে ওঠে....
"আমার কিন্তু কান্না করা এটম একদমই পছন্দ নাহ। আমি আমার এটমের মুখে সব সময় হাসি দেখতে চাই, যেই হাসিটা মন থেকে আসে।"
দোয়েল আদুরে বাচ্চার মতো নিবিড়ের বুকে মুখ ঘষে বলে ওঠে....
"এক বেলা না খেয়ে আমি দিব্যি কাটিয়ে দিবো দিনের পর দিন, কিন্তু এক চামচ ভালোবাসার কম হলে আমি নিরেট দুঃখ নিয়ে চলে যাবো সব ছেড়ে। "
নিবিড় আরো গভীর ভাবে জড়িয়ে নেয় দোয়েলকে...
"ছেড়ে না যাওয়ার পায়তারাটাও করছি আমি মিস এটম... আর তো মাত্র আজকের দিন। তারপর তুমি চাইলেও আমার থেকে দুরে যেতে পারবে না, একদম নিজের সাথে বেঁধে রাখবো তোমায়।"
দোয়েল মুখ তুলে তাকায় নিবিড়ের দিকে।বেশ মনোযোগ নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করে যায়....
"আমার লাল গোলাপ পছন্দ নয়, আমি কি মাঝেমধ্যে আপনার থেকে একটি সাদা গোলাপ পাওয়ার আশা রাখতে পারি? "
নিবিড় আলতো হেঁসে মাথা নাড়িয়ে বলে....
"রাখতে পারো, যদি আমি প্রতিদিন বাড়ি ফিরে আপনার মুখ থেকে একবার করে 'ভালোবাসি' শব্দটা শুনতে পাই তবে।"
দোয়েল ফের প্রশ্ন করে......
"আমি কখনো নিজের প্রিয় খাবারের কথা কাউকে মুক ফুটে বলতে পারি নি।আপনি কি সেটা শুনবেন?"
"শুনবো যদি তার বিপরীতে আপনার থেকে একটা করে চুমু উপহার পাই তবে..."
"আমার প্রায়ই মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে যায়।তখন আমার খুব বিরক্ত লাগে একা একা। আমি কি তখন আপনাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে গল্প করতে পারবো?"
"পারবেন, যদি সেই সময়টা আপনি ঠিক এভাবেই আমার বুকের মাঝে লক্ষী বউয়ের মতো বসে থাকেন তবে..."
"আমি না সাজতে অনেক পছন্দ করি,হুটহাট সাজতে মন চায় আমার, তবে সবার সামনে অমন সেজেগুজে যেতে লজ্জা করে, কারন ছাড়া সেজেগুজে আপনার সামনে আসলে কি আপনি আমায় নিয়ে হাসাহাসি করবেন?"
"নাহ, আপনি সাজলে আমি হাসার মতো সময় পাই কোথায় বলুন? আপনি সাজলে তো আমার মন শুধু আপনাকে দেখে দেখেই রাত পাড় করে দিতে পারে।"
"অফিস থেকে ফেরার পর যদি বলি আমায় ভাত খাইয়ে দিন, তকন কি আপনি খুব বিরক্ত হবেন?"
"একদমই না, আমার প্রশান্তি আপনি ম্যাডাম, আপনার প্রতি আমার কখনোই বিরক্ত আসবে না, বরং আপনার যত্ন নিতে পারলে আমার সারা দিনের ক্লান্ততা দূর হয়ে যাবে নিমেষেই..."
"সত্যিই আমায় যত্ন করবেন তো?"
"খুব যত্ন করবো আমার প্রাণ, তুমি শুধু নির্ভয়ে, নিঃসঙ্কোচে আমায় ভালোবেসে যাও.... "
-----------
তখন আবিরকে কোনো প্রকার আশা দেখায় নি সাবিহা। নীরবে বেরিয়ে এসেছে সেই ঘর থেকে। তারপর আর শান্ত রইলো না আবির। ঘরের প্রতিটা জিনিস ছুড়ে ফেলে, চিৎকার করে পুরো বাড়িটায় এক ভয়ঙ্কর সারা ফেলে দিলো যেন। সাবিহার কঠিন হৃদয় গলেনি, কাছে গিয়ে একটি বারও দেখেনি আবিরের সেই বিভিষীকাময় অবস্থা। আয়েশা, জুলেখা সহ বাকিরা সবাই গেলে আবির আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। জিসান, নিবিড় ভেতরে ঢুকতে গেলে এটা ওটা ছুড়ে শুধু একটাই কথা বলে গেছে, তার কাছে যেন কেউ না আসে,, কেউ নাহ।
আবিরের রাগ সম্পর্কে অবগত সকলেই, সবচাইতে বেশি নিবিড়। তাই পরিস্থিতি বুঝে সবাইকে বলেছে চলে যেতে। সবাই মানলো নিবিড়ের কথা, নিবিড় নিজেও প্রস্থান করলো আবিরের ঘর থেকে। তবে একটু পর পর এসে দূর থেকে এসে এসে সবাই দেখে যাচ্ছে তাকে, পাছে উল্টোপাল্টা কিছু না করে বসে আবার।
প্রায় দেড়ঘন্টা পর আবিরের তান্ডব থামলো৷ তবে কেউই এখন আর ভয়ে তার কাছে যাওয়ার সাহস করছে না। দুর থেকেও এমন ভাবে এসে দেখে যাচ্ছে যেন আবিরের চোখে না পড়ে৷
দুপুর আড়াইটা সময়। চৌধুরী বাড়িতে শুনশান নীরবতা বইছে সকাল থেকেই। সাবিহাও বেশ চুপচাপ। দুপুরের খাবারটা আজ একটু দেরিতেই হচ্ছে যেন। একে একে সবাই এসে উপস্থিত হলেও আবিরের দেখা নেই। নিবিড়ও তখন অফিসের কাজে বেড়িয়েছে। খাবার রেডি করতে করতে তারা এসে আস্তে করে সাবিহা, জুলেখাদের বললো....
" আবির ভাইয়ার খাবারটা কি ঘরে দিয়ে আসবে বড়আম্মু?"
জুলেখা কিছু বলার আগেই টেবিলে বসা জিসান বলে ওঠে....
" তুমি আবির ভাইয়ের রাগ সম্পর্কে জানো ও নাহ, মে'রে ফেলে দেবে একদম এখন গেলে..."
জেসি আস্তে করে টিপনি কেটে বললো...
"আহিশ, তুই যা ভাইয়াকে ডেকে নিয়ে আয়?"
জেসির কথাটা বলার প্রসঙ্গতই কারন রয়েছে। ইতোমধ্যেই সকলেই জেনে গেছে আবিরের রাগের মূল কারন আহিশ আর চড়ুইয়ের বলা কথা গুলোই। আহিশ সাথে সাথেই বলে ওঠে....
"পাগল আমি? জেনে শুনে বাঘের গুহায় যাবো? এমনিতেই আমার জানের রিস্ক আছে আবির ভাইয়ের থেকে। আমি ড্যাম শিউর সেদিন আবির ভাই ইচ্ছে করে আমার হাত পুরিয়েছে। কি সাংঘাতিক, একটুও মায়া দয়া নেই। "
টেবিলে বসে ওরা মজা করলেও রান্না ঘরে থাকা প্রতিটি ব্যাক্তিই চিন্তিত শুধু সাবিহা ব্যতিত।।সে নীরব তবে চিন্তিত কিনা তা বোঝার উপায় নেই। আয়েশা এগিয়ে এসে সাবিহাকে বলে....
" ভাবি, তুমিই একটু যাও না? তুমি তো ওর মা,তোমার উপর রাগ দেখাবে না নিশ্চয়ই। "
সাবিহা প্লেটে ভাত নিতে নিতেই বলে....
"আমার ছেলের সব চেয়ে বড় শত্রু এখন আমিই... "
এই কথার পর আয়েশা আর কিছুই খুজে পেলো না বলার মতো। বেশ কিছুক্ষণ পর সাবিহা মুখ তুলে সামনে থেকে চড়ুইকে রান্না ঘরে ডেকে পাঠালো। চড়ুইও এগিয়ে এসে বলে...
"বলো আম্মু..."
সাবিহা এবার সব ছেড়ে চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে....
" যা তো আম্মু। আবিরকে ডেকে নিয়ে আয়।"
কথাটা কানে যেতেই চড়ুইয়ের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। দু হাত নাড়িয়ে সাথে সাথেই বললো....
"না নাহ আম্মু,,আমি তো ভুলেও যাবো না। উনার যা রাগ বাবাহ... সকালে তোমাকে ওসব বলেছি বলেই তো উনি এভাবে রেগে আছে। আমার উপর তো রাত আরো বেশি, আমায় আছাড় মারবে একন উনার সামনে গেলে। "
সাবিহা আলতো হাসলো। মেয়েটা এতো বোকা, সে জানেও না আবির ঠিক কি কারনে এতটা পাগলামি করছে। আচ্ছা, ছোটপাখি যদি এখন একটিবার জানতে পারে ছেলেটা তাকে ভিক্ষা চেয়েও পায় নি বলে এতটা উতলা, তাহলে কেমন প্রতিক্রিয়া হবে তার...
আর ভাবে না সাবিহা সেসব। আস্তে করে হেঁসে চড়ুইকে আবদারের সহীত বলে....
"আম্মুর কথা রাখবি না তুই? "
চড়ুইয়ের মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে যায়।ঠোঁট উল্টে বলে...
"উনি যদি আমায় মারে?"
সাবিহা সাহস দেওয়ার ভঙ্গিতে চড়ুইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বলে....
"কিচ্ছু করবে না তোকে।তুই শুধু গিয়ে বলবি যে ও খায়নি বলে তুইও না খেয়ে আছিস এতক্ষণ। যা...."