একটি ধ্বংসস্তুপের মাঝে যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাইছে আবির। এই তো বেলার দ্বিপ্রহর চলমান, আজকের দিনটা পাড় হয়ে গেলেই তো কাল সন্ধ্যায় সেই পরিক্ষার মুহুর্ত। আহিশের জন্য বউ সাজবে তার পাখিটা। আহিশের নামে কবুল পড়বে সে। আবির শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে? কি করবে সে? কি করে এই বিয়েটা আটকাবে? চড়াই পাখিকে যে কোনো ভাবেই আহিশের বউ হতে দেওয়া যাবে না। আচ্ছা, আহিশকে চিরকালের জন্য গুম করে ফেললে কেমন হয়?......
ভাবনার মাঝেই কারোর পায়ের আওয়াজ কানে এলো আবিরের। কেউ একজন বেশ সতর্কতার সহীত এগিয়ে আসছে আবিরের রুমের সামনেই।
ভেতরটা বেশ অন্ধকার, আবির নীরবে মাথাটা একটু তুলে চেয়ে থাকলো দরজার দিকে।
একটুক্ষণ পর দরজার একপাশ হতে নিচ দিয়ে খয়েরী রঙের জামার অংশ চোখে পড়লো আবিরের। তারপর পরই ধীর ধীর দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিলো একটি চোখ, হেলে থাকার কারনে ঝুঁটি বাঁধা চুল গুলোও এক পেশে হয়ে দেখা যাচ্ছে। ওখানেই আবিরের সমস্ত চিন্তার অবসান ঘটে। সকাল থেকে মেয়েটি একবারও আসলো না তার সামনে, আর এখন এসে এভাবে উঁকি দিয়ে দেখছে। ভাবা যায়,এই বাচ্চা মতো দেখতে মেয়েটার কাল বিয়ে...
আবির দৃষ্টি নামিয়ে দরজার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মেয়েটার পায়ের দিকে তাকায়, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না দেখে আবির নিজের সেই রুক্ষ স্বরে আস্তে করে বলে ওঠে....
"পায়ে জুতো আছে?"
সাথে সাথেই দরজার পাশ থেকে সরে যায় মেয়েটি। চোখ খিঁচে বিড়বিড় করে বলে ওঠে...
"এই যাহ,দেখে ফেললো?"
চড়ুই সরে দাঁড়ালেও আবির বুঝে যায় মেয়েটি এখনো দরজার পাশেই রয়েছে। তাই গলাটা আরেকটু উঁচু করে আবারো বললো.....
"কি হলো? কি জিজ্ঞেস করলাম? পায়ে কি জুতো পড়ে এসেছো?"
চড়ুই বুঝে যায় সে ধরা পড়ে গেছে। আর এখান থেকে পালিয়ে গিয়েও লাভ নেই, আম্মুর কথাও তো রাখতে হবে নাকি।
তাই নিজের গলা পরিষ্কার করে মিনমিনিয়ে নিজেই উল্টো প্রশ্ন করলো...
"জুতো থাকলে বুঝি, আমার জুতো দিয়েই আমাকে পেটাতেন?"
আবির ভ্রু কুঁচকায়, এই মেয়ের মাথায় এতো আজগুবি চিন্তা আসে কোথা থেকে?...
"সামনে এসে দাঁড়াও দেখি?"
আবিরের কথা বাড়াতে হয় না। গুটিসুটি পায়ে দরজা বরাবর এসে দাঁড়ায় চড়ুই। আবির নিচে তাকিয়ে এবার সরাসরি লক্ষ্য করে মেয়েটার পায়ে জুতো নেই। ওদিক থেকে চড়ুই ভেতরটায় অন্ধকার দেখে প্রশ্ন করলো....
"আপনি কোথায়? দেখছি না তো..."
"দু পা এগিয়ে আসে লাইটের সুইচটা দাও?"
চড়ুই বুঝলো, আবির তার কথাতেই হয়তো লাইট দিতে বলছে। তাই তার কথা মতোই দু কদম এগিয়ে রুমে ঢুকে ডান পাশের দেওয়াল হাতরিয়ে লাইট অন করে, আবিরের দিকে তাকিয়ে বলতে নেয়....
"সব দরজা, জানালা বন্ধ করে রেখেছেন দানাবল,,দিনের বেলাতেও রোদের ছিটে নেই.."
পরক্ষনেই রুমের দিকে চোখ পড়তেই চমকে ওঠে সে...
"ও আল্লাহ, এ কোন জাহান্নাম বানিয়ে রেখেছেন আপনি ঘরটাকে!!!"
আবিরের কোনো ভাবান্তর নেই। নিজ মতো করেই শান্ত স্বরে চড়ুইকে সতর্কতার সহীত বলে ওঠে....
"সাবধানে, দেখে পা ফেলে এসো এদিকটায়।"
চড়ুই হা হয়ে তাকায় এবার আবিরের দিকে। সোজা বরাবর খাটের সাথে হেলান দিয়ে ছড়িয়ে বসে আছে আবির। ডান হাত থেকে এখনো চুইয়ে চুইয়ে রক্ত ঝড়ছে অনবরত। তা দেখেই চমকে এগিয়ে যেতে নেয় চড়ুই...
"একিহ!! হাতের কি অবস্থা করেছেন আপনি..."
চড়ুইকে বেপরোয়া ভাবে এগিয়ে আসতে দেখে আবিরও একটু নড়ে চড়ে বলে ওঠে...
"সাবধানে পাখি...."
বলতে না বলতেই মাত্রই চড়ুইয়ের পা একটা কাঁচের টুকরার উপর পড়তে যাবে তখনই আবির একটু সামনে ঝুঁকে চড়ুইয়ের হাত ধরে হেঁচকা টান মেরে নিজের উপর এনে ফেলে। চড়ুইয়ের ধ্যান নেউ সেদিকে, কোনো মতে নিজেকে সামলে আবিরের হাত খানা তুলে ধরলো চোখের সামনে...
"এত র'ক্ত ঝড়ছে? হাতটা কাটলেন কি করে আপনি?"
চড়ুইয়ের বিগলিত মুখটির দিকে আবির তাকিয়ে থাকে এক দৃষ্টিতে। মেয়েটার অস্তিরতায় আবির বেশ সুখ সুখ অনুভব করছে। চড়াইয়ের কি কষ্ট হচ্ছে তার ক্ষত দেখে? মেয়েটা তার বুকের ক্ষতটা দেখে না কেন একটিবার?
"আ্ আপনি এক্ষুনি উঠুন, হসপিটালে যেতে হবে আপনার, চলুন..."
বলতে বলতেই চড়ুই আবিরের হাত টেনে দাঁড় করাতে নিলে আবির হাত ছাড়িয়ে নেয়...
"লাগবে না..."
চড়ুই আবার কিছুটা উচ্চস্বরে বলে...
"কি লাগবে না হ্যা? হাতের কি অবস্থা করেছেন দেখছেন না?আচ্ছা আমি আম্মুকে ডাকছি..."
বলতে বলতেই চড়ুই পেছন ফিরে বের হতে নিলে আবির বা হাতে চড়ুইকে আটকায়...
"কাউকে ডাকা লাগবে না।"
চড়ুই ধমক দিয়ে বলে ওঠে...
"একটা আছাড় মারবো বেয়াদপ লোক। এসব রাগ কাকে দেখাচ্ছেন আপনি? চড়ুই এসবে ভয় পায় না। "
চড়ুই রাগী ভঙ্গিতে কথা বললেও তার মুখের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেঁসে দেয় আবির। মেয়েটা ধমকালেও কি মিষ্টি করে ধমকায়। এই মেয়ে থাকলে নিশ্চিত আবির দু মিনিটের জন্যও চিন্তাগ্রস্ত থাকবে না।
বা দিকে ইশারা করে আবির বলে....
" ড্রয়ারে ফার্স্টএইড আছে, এনে দাও?"
চড়ুই শুনলো, হসপিটালে না যাক, প্রাথমিক ভাবে রক্ত পড়া গো আটকাতে হবে নাকি...
আবিরের ইশারাকৃত জায়গায় গিয়ে ড্রয়ারটা খুলতেই মাথাটা চটে উঠে চড়ুইয়ের। ড্রয়ারে কোনো ফার্স্টএইড বক্স নেই, সেই জায়গায় করেছে দুটো আ্যল'কোহলের বোতল। চোখ গরম করে আবিরের দিকে তাকিয়ে চড়ুই বলে ওঠে....
"এসব কি?"
আবির ভাবলেশহীন ভাবে বলে...
"নিয়ে আসো যা পেলে..."
চড়ুইয়ের রাগ তিরতির করে বাড়তে থাকে। ড্রয়ার থেকে একটি বোতল তুলে নিয়ে আবিরের দিকে তেড়ে আসতে আসতেই বলে....
"এটা দিয়ে মাথা ফাটাবো আপনার..."
আবির উত্তর দেয় না, সূক্ষ্ম ভঙ্গিতে বা হাতে পেঁচিয়ে চড়ুইয়ের থেকে কেড়ে নেয় বোতলটি। চতুরতায় বোতলের ছিপি খুলে রক্তমাখা হাতের উপর ঢেলে দেয় বেশ কিছুটা তরল। তা দেখে চড়ুই চমকে বলে...
"কি করছেন..."
আবির নিজের কাজে মগ্ন থেকেই আবার আদেশ করে....
"এবার নিচেরটা খুলো..."
আবিরের এমন কথায় চড়ুই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে নাক কুঁচকে বলে ওঠে...
"এ্যা!! "
ঘাড় ফিরায় আবির, চড়ুইয়ের বিকৃত মুখের দিকে তাকিয়ে একবার তাকে সম্পূর্ণ উপর নিচ দেখে নিয়ে বলে.....
"ড্রয়ার...."
চড়ুইয়ের স্তম্ভিত ফিরে, এলোমেলো দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছোট্ট করে 'ওহ' বলে পেছন ফিরে নিচের ড্রয়ার খুলে আবিরের কথা মতোই। এইবার সেই কাঙ্ক্ষিত ফার্স্টএইড বক্সটির দেখা মিলে। চড়ুইকে আর কিছু বলতে হয় না, দ্রুত হাতে বক্সটা নিয়ে এগিয়ে এসে বসে আবিরের পাশে। তুলা নিয়ে নিজে নিজেই আবিরের ক্ষত স্থান পরিষ্কার করতে থাকে।
আবির বাঁধা দেয় না, নীরবে তাকিয়ে দেখতে থাকে মেয়েটার মুখের কুঁচকানো ভাবখানা। আবিরের হাতের প্রতিটি যন্ত্রণার লেশে মেয়েটা বারে বারে চোখ মুখ কুঁচকে নিচ্ছে। বারে বারে নিচের ঠোঁট দিয়ে উপরের ঠোঁট চেপে চেপে ধরছে, পরক্ষণেই আবার গোল করে নিশ্বাস ফেলছে ভারী।
আবির ঢোক গিলে, মেয়েটার এমন এমন মুখভঙ্গি মোটেও তার কাছে ভালো লাগছে না, এসব যে অঘটনের সংকেত....
"মুখটা স্বাভাবিক করো, আমার ব্যথা নেই হাতে। "
আবিরের ভারিক্কি কথা কানে যেতেই চড়ুই এক পলক তাকিয়ে আবার নিজের কাজে মত্ত হয়। এন্টিসেপ্টিক লাগানোর পরে কাটা স্থানে ব্যান্ডেজ মোড়াতে মোড়াতে বলে....
"এবার আপনি হাত দিয়ে খাবেন কি করে? এক্ঝুনি তো যেতে হবে ভাত খাওয়ার জন্য... "
সাথে সাথেই আবির উত্তর দেয়....
"খাবো আমি এখন। "
চড়ুই বলে...
"তা বললে হয় নাকি, আপনি খাননি বলে আমিও তো না খেয়ে আছি এখনো। "
আবির চমকায়, এই মুহুর্তে কথাখানি বেশ অপ্রত্যাশিত ছিলো যে তার কাছে। তার চড়াই তার জন্য না খেয়ে আছে? ইশশ, আবির যেন হাওয়ায় ভাসছে। বিশ্বাস করতে পারছে না চড়ুই কথাটি বলেছে, বুকের ভেতর তীব্র সুখের ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার, এ কেমন অনুভুতি তার?
বেচারা আবির জানতেও পারে না তার চড়াই কথাটি নিজ থেকে বলেনি, তাকে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে।....
"আমায় খাইয়ে দেবে?"
কি মিষ্টি আবদার, রুক্ষ মেজাজের আবিরও বুঝি এমন আবদার করতে পারে? চড়ুইয়ের মনে অতশত বুঝ আসে না। শুধু উত্তর ফের প্রশ্ন করে....
"খাইয়ে তো দিতেই হবে আপনাকে। এই হাত দিয়ে কি আর নিজে খেতে পারবেন নাকি।"
"তুমি খাইয়ে দেবে?"
চড়ুই চঞ্চল দৃষ্টিতে তাকায় আবিরের দিকে। চোখ ছোট ছোট করে দুষ্টু হেসে বলে....
"খাইয়ে দিলে আমায় কি দিবেন?"
"কি চাও তুমি? "
চড়ুই একটু ভেবে হঠাৎ হাসি মুখে বলে ওঠে....
"কাল সন্ধ্যায় বিয়ের সময় পড়ার জন্য আম্মু আমাদের দু বোনকে দুটো শাড়ি দিয়েছে। বিয়েটা ঘরোয়া ভাবে, তাই তেমন সাজবো না ভাবছি। শাড়ির সাথে মিলিয়ে একটু লিপস্টিক দিবো, আর একটু কাজল, আপনি আমায় কাজল পড়িয়ে দিবেন? "
আবিরের মেজাজ বিগড়ে যায়, এতোক্ষণের মৃদু হাসি হাসি মুখটা মুহুর্তেই কেমন বেজার হয়ে গেলো। কি পাজি মেয়ে, আহিশের সাথে বিয়ে করবে, আবির নাকি তাকে সাজিয়ে দিবে, তাও আবার আহিশের জন্য। এ হয় নাকি কখনো। ধূররর...
আবিরের বিগড়ে যাওয়া মুখ দেখে চড়ুই জিজ্ঞেস করে...
"কি হলো? "
আবির মুখ ফিরিয়ে বলে....
"লাগবে না তোমার খাইয়ে দেওয়া। যাও গিয়ে খেয়ে নাও নিজে।আমি খাবো না। "
চড়ুই বুঝতে পারে, কোনো কারনে আবিরের পছন্দ হয়নি চড়ুইয়ের শর্তটা।তাই তারাহুরো করে বলে ওঠে...
"আচ্ছা আচ্ছা, এটা বাদ তাহলে। কন্ডিশান চেঞ্জ করছি।"
আবার একটু ভেবে নেয় চড়ুই। চড়ুইকে ভাবতে দেখে আবিরও এবার রাগ ছেড়ে ফিরে তাকায় তার দিকে। এই মেয়ের প্রতিটা কথাই আতশবাজি। কে জানে এখন আবার কি না কি চেয়ে বসে অদ্ভুত।
চড়ুই এবার গাল থেকে হাত নামিয়ে নড়েচড়ে বসে বলে...
"ওকেয়, দুটো কন্ডিশন, একটা বড় আর একটা এট্টুখানি, রাজি? "
আবির বললো...
"আগে শুনি? "
"আচ্ছা,, ছোটটা হলো এই যে আপনি এখন আমার সাথে নিচে যাবেন, সবার সাথে বসে টেবিলে খাবেন.... "
"খাইয়ে দিতে হবে..."
"আরে হ্যা বাবাহ,খাইয়েই দিবো।"
" আর বড়টা? "
চড়ুই চঞ্চল হাসে।তার এমন রহস্যময় হাসি দেখেই আবির ভ্রু কুঁচকায়। নিশ্চয়ই এই মেয়ে কিছু একটা জটলা পাকানোর ধান্দায় আছে। আবির কিছু বলার আগেই চড়ুই নিজ থেকেই রয়েসয়ে বললো....
"আসলে আপনার তো দেখলাম অনেক ফ্যান ফলোয়ার, তো আপনি আপনার প্রোফাইল থেকে যে কোনো ভাবে আমাদের গিপ্ট সেলিং এর পেইজটা প্রমোট করে দিতে হবে ফ্রীতে। "
নাহ, এই মেয়েকে যতটা গাধা ভাবে ততটাও নয় তা বুঝলো আবির। হাসি পাচ্ছে তার, কম হলেও যায়গা মতোই বুদ্ধিটা কাজে লাগায় মেয়েটা। আবির প্রশ্ন করে....
"তো প্রমোট করে দিলে কি হবে?"
"আমাদের কাষ্টমার বাড়বে। প্রফিট বাড়বে,যেই প্রফিট দিয়ে মার্টেকে একটা দোকান ভাড়া করবো, অফলাইনেও আমাদের বিজনেসটা শুরু করবো।"
"এটা কি তোমার আইডিয়া?"
"নাহ, আমার আর বোনেরও।"
"গুড... তো চলো?"
বলতে বলতেই আবির উঠে দাঁড়ায়, চড়ুই উপর দিকে মুখ তুলে প্রশ্ন করে...
"আপনি কি আমার শর্তে রাজি?"
"রাজি, তবে পেইজের প্রোফাইল থেকে আপনাদের থোবড়ার ছবিটা ডিলিট করতে হবে, তারপরই প্রমোট করে দিবো। চলুন..."
---------
সিঁড়ি বেয়ে চড়ুইয়ের সাথে আবিরকে নামতে দেখে লুকিয়ে হাসলো সাবিহা। তার ধারণা ঠিকই প্রমাণ হয়েছে, এমনি এমনি তো আর চড়ুইকে পাঠায় নি।।
আবির এসে নীরব ভঙ্গিতে নিজের চেয়ারে বসে। পাশের চেয়ারে জিসান বসেছিলো এতক্ষণ, আবির এক পলক তার দিকে তাকিয়ে বলে...
"ওপাশে যা..."
জিসান আস্তে করে বলে...
"এটা ছোটপাখির জায়গা... "
আবির শান্ত থাকে। কিছু বলার আগে চড়ুই নিজেই কিচেনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে....
"জিসান ভাই, তুমি আমার চেয়ারটায় বসো। দানাবলটা গাধার মতো নিজের পায়ে... থুরি নিজের হাতে নিজেই কুড়াল মেরেছে দেখো, ওনাকে খাইয়ে দিতে হবে। "
চড়ুইয়ের কথা শুনে সকলে দৃষ্টি দেয় আবিরের হাতের দিকে। শুভ্র ব্যান্ডেজ করা হাতটায়। সাবিহা ও দেখলো। তবে অভিমানে আবিরের সাথে কথা না বলে চড়ুইকে জিজ্ঞেস করে...
"হাত কাটলো কিভাবে? "
চড়ুই উত্তর দেয়...
"কি জানি আম্মু, ঘরের অবস্থা তো নাজেহাল,ওসব করতে গিয়েই কেটেছে নিশ্চয়ই।"
আবির সবটাই শুনতে পায় তাদের কথা। ব্যান্ডেজ করা হাতটা উপরে তুলে নিজেই দেখতে থাকে। তারপর টেবিলে থাকা বাকিদের দিকে একবার তাকিয়ে একটু উচ্চ স্বরেই সাবিহাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে....
"এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন আহিশ?"
আহিশ ঢোক গিলে বলে...
"না মানে ভাইয়া...তুই এভাবে হাতটা কেটে.... "
আবির তার কথা কেঁড়ে নিয়ে বলে...
"ও কিছু না, ঠিক হয়ে যাবে। দেখছিস না ওয়াইফি ফার্স্টএইড করে দিলো যে।"
সাবিহা সবটাই বুঝতে পারে, ভেতরে ভেতরে ছেলের এমন কান্ড দেখে বেশ হাসি পেলেও উপরে মুখটা বেশ গম্ভীর করেই রাখে। চড়ুইকে বলে....
"তুই খেতে বস,ওকে আমি খাইয়ে দিচ্ছি। "
চড়ুই আবিরকে জিজ্ঞেস করে....
"আম্মু খাইয়ে দিলে হবে আপনাকে?"
আবির তাকায় না চড়ুইয়ের দিকে। তবে ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে বলে...
"সেটা তুমিই ভালো জানো।"
চড়ুই বুঝে আবির মূলত কি চাইছে। হাফ নিশ্বাস ফেলে সাবিহাকে বলে....
"আম্মু, দানাবলটার সাথে আমার একটা ডিল হয়েছে বুঝলে, তুমি আমাকেই দাও। আমি খাইয়ে দিচ্ছি উনাকে। "
সাবিহা আর কথা বাড়ায় না। খাবার বেড়ে চড়ুইয়ের হাতেই তুলে দেয়। চড়ুইও গিয়ে আবিরকে খাইয়ে দিতে থাকে। আবিরও কম নাহ, সাবিহাকে শুনিয়ে শুনিয়ে খাওয়ার মাঝেই বলে ওঠে...
"উমম ওয়াইফি। বেগুনের ঝোলটা দারুন লাগছে আজ। এতদিন আমি যাস্ট হেইট করতাম এই বেগুনটা, আজ যাস্ট অমৃত লাগছে.... I think it’s the magic of your touch....."
চড়ুই মিষ্টি হেঁসে মাথা দুলিয়ে নিজের তারিফের ভঙ্গিতেই বলে ওঠে...
"দেখলেন তো,এই চড়ুই ম্যাজিকও জানে... "
তখনই সাবিহা গোমরা মুখ নিয়ে আবিরের পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বলে ওঠে..
"এতদিন শুনতাম ছেলে বড় হলে মায়ের থেকেও পরের মেয়েকে বেশি প্রাধান্য দেয়, আজ তা নিজের চোখেই দেখে নিলাম।"
চড়ুইয়ের হাসিটা হুট করেই গায়েব হয়ে গেলো। আবির সহ কেউই আশা করে নি সাবিহা এই কথাটি বলবে। আবির চমকে সাবিহার দিকে তাকায়। চড়ুইও ব্যস্ত ভঙ্গিতে তার পানে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে ওঠে....
"আম্মু, তুমি কি রাগ করলে নাকি আমার ওপর? আম্মু...."
সাবিহা উত্তর না দিয়েই নিজের রুমে চলে যায়। চড়ুইয়ের বুকটা ধক করে ওঠে, ও কি কোনো ভাবে আম্মুকে কষ্ট দিয়ে ফেললো?...