ইরিনকে নিয়ে আবির বের হওয়ার সময় থেকেই বাড়ির প্রতিটি সদস্য চিন্তিত শুধু বিথী বেগম ছাড়া।তিনি বেজায় খুশি মনে মনে, মেয়েটাকে আবির একবার বিয়ে করলে এই বাড়ির, কম্পানির মালকিন হবে তারই মেয়ে। এমনটাই তো প্রতিদিন মোনাজাতে চাইতেন তিনি, আজ তাই যেন সত্যি হচ্ছে।
ড্রয়িং রুমে উপস্থিত প্রতিটি সদস্য। নিবিড় বার বার করে আবিরের নম্বরে কল দিয়েই যাচ্ছে, নো রেসপন্স। কোথায় গেছে তাও জানা নেই। এদিকে একটু আগেই দোয়েলকে বেশ বকেছে সাবিহা। কারন চড়ুই ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে সকালেই। দোয়েলকে বলে গিয়েছে দুপুরের আগেই চলে আসবে। এই বিষয়ে সাবিহা কিছুই জানে না। আহিশ কল করে খবর নিয়েছে চড়ুই ভার্সিটিতেই আছে কেয়া, রাবতিদোর সাথে। তাই তাকে নিয়ে এখন খুব একটা চিন্তা না হলেও আবিরকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে সকলেরই। সাবিহার মাথায় হাত, পাশ ফিরে আজমলের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে হতাশার কন্ঠে বললো...
"ছেলেটাকে শায়েস্তা করতে গিয়ে কি বেশি করে ফেললাম আমরা? "
আজমল নিজেও চিন্তিত, হ্যা সেও সাবিহার সাথে তাল মিলিয়ে অতিরিক্তই বলে ফেলেছে। ইরিন তার নিজের বোনের মেয়ে হলেও তিনি কখনোই চায়নি ইরিনের মতো মেয়ে তার ঘরে বউ হয়ে আসুক। এখন যদি আবির রাগের মাথায়ও ইরিনকে বিয়েটা করে ফেলে তাহলে বিথী বেগম যে কোন পর্যায় পর্যন্ত বিষয়টা টেনে নিতে পারে সেটা আজমল চৌধুরীরা ভালো করেই জানে।
একটু পরেই নিবিড়ের ফোনে কল এলো।নম্বরটা দেখেই সে হুলুস্থুল করে বলে ওঠে.....
"ভাই ভিডিও কল করছে..."
প্রতিটি মুখে এক নতুন আকাঙ্খা দেখা দেয় নড়ে চড়ে উঠে সকলে এগিয়ে এসে একত্রিত হয় নিবিড়ের পাশে। আজমল চৌধুরী তাড়া দিয়ে বলে...
"রিসিভ কর, রিসিভ কর..."
নিবিড় তাই করলো। ওপাশ থেকে ভেসে উঠলো আবিরের চমৎকার হাসি মাখা মুখটি। প্রথমেই নিবিড় দ্রুততার সহীত বলতে লাগলো...
"ভাই কোথায় তুই,ইরিনকে নিয়ে কোথায় গেলি,, "
আবির ও পাশ থেকে হালকা হেঁসে বললো....
"রিল্যাক্স ব্রো। আগে বল বাড়ির সবাই কোথায়?"
"এইতো এখানেই আছে। "
"আম্মু আব্বু?"
নিবিড় একবার সাবিহা আর আজমলের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললো....
"আছে"
"ও্ ওয়াইফি?"
"ছোটপাখি ভার্সিটি গেছে।"
আবিরের মুখের হাসি মলিন হয়, ও পাশ থেকে কেমন দীর্ঘ এক নিশ্বাসের আওয়াজ ভেসে আসে। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে আবির বলে ওঠে....
"আমরা কাজী অফিস আছি,,বিয়ে করছি আমি আর ইরিন। "
চিৎকার করে ওঠে নিবিড়....
"ওয়াট দা হেল ভাই? ইরিনকে বিয়ে করছিস মানে কি হ্যা? তুই তো ছোটপাখিকে...."
"ছাড় ইয়ার, ওসব কিছুই না। চেষ্টা করেছি, হয়নি, শেষ। বিরহে ডুবে থাকার মতো ছেলে আমি না সেটা তোর থেকে ভালো কেউ জানে না। তাই আমিও বিয়ে করছি, সেটা তোর আগেই। ভাবলাম সবার সামনেই করি, তাই ভিডিও কল।।কাজী সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করবে এক্ষুনি, তোরা সবাই সাক্ষী হয়েই থাক..."
বলতে বলতেই আবির হাত থেকে ফোনটা হয়তো সামনের টেবিলে সেট করলো, এবার আবিরের পাশে ইরিনকেও দেখা যাচ্ছে, শোনা যায় ইতোমধ্যেই কাজী বিয়ে পড়ানো শুরু করে দিয়েছেন।
এদিক থেকে সাবিহা, আজমল সহ প্রত্যেকে আবিরকে অনুরোধ করেই যাচ্ছে বিয়েটা না করার জন্য, সেসব কিছুই আর আবির কানে তুলছে না। সে বিয়েতে মনোযোগ দিয়েছে সম্পূর্ণ ভাবে।
সময় কাটছে, বাড়িতে উপস্থিত প্রতিটি সদস্যের হৃদয়ের শঙ্কা বাড়ছে। আবির যে একটা অঘটন ঘটাতে যাচ্ছে তা যেন বুঝতে বাকি রইলো না কারোরই। সাবিহা শরীর ছেড়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছে এক কোনে, ছেলেটার জীবনটা ধ্বংস হতে যাচ্ছে চোখের সামনেই। কি করে ফেললো সে, কি করে ফেললো...
ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসে কাজীর গলা....
" বাবা, আপনি যদি এই বিয়েতে রাজি থাকেন তাহলে বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল....!"
চরম মুহুর্ত, এমন সময় পাশ থেকে কানে ফোন চেপে ভীড় ঠেলে সামনে এসে থামে আহিশ। বিচলিত ভঙ্গিতে চিৎকার করে বলে ওঠে.....
"ছোটপাখির এক্সিডেন্ট হয়েছে, ভাইয়া..."
সকলের মনোযোগ ভ্রষ্ট হয় আবিরের থেকে। কম্পমান বুক নিয়ে চমকে তাকায় আহিশের দিকে। সাবিহার বুক ছলকে উঠে, ছুটে এসে আহিশের বাহু টেনে ঘুড়িয়ে জিজ্ঞেস করে...
"এসব কি বলছিস তুই আহিশ,,আমার চড়ুই আম্মু.... "
আহিশের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু।ভঙ্গুর কন্ঠে বলে ওঠে.....
"ভার্সিটির সামনে রোড ক্রস করতে গিয়ে একটা ট্রাক এসে চড়ুইকে পিষে......"
আর বলতে পারে না আহিশ, কান্নায় ভেঙে পড়ে ছেলেটা। নিবিড় মাত্রই আবিরকে বলতে নেয় কিছু, তবে ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখে ইতোমধ্যেই কল কেটে দিয়েছে আবির। আর এতশত ভাবার সময় নেই। দ্রুত কদমে বাড়ির বাইরে ছুটতে নিলেই দোয়েল এসে পথ আটকায় নিবিড়ের....
"কোথায় যাচ্ছেন, দাঁড়ান এখানে.."
নিবিড় চিন্তিত কন্ঠে বলে....
"দোয়েল আমায় যেতে হবে, শুনতে পাও নি ছোটপাখির এক্সিডেন্ট.... "
দোয়েল নাক কুঁচকায়, বিরক্তিকর কন্ঠে বলে ওঠে....
"আরে ধুরর,বোন ঠিক আছে। "
"ঠিক আছে মানে? আহিশ যে বললো...."
"আরে বুদ্ধু, আমায় দেখুন, বোনের কিছু হলে আমি আপনার সামনে ঠিক থাকতে পারতাম?"
নিবিড়ের মাথায় আসে মাত্রই বিষয়টা,সাথে বাকিদেরও। ভ্রু কুঁচকে সবাই আহিশের দিকে তাকাতেই আহিশ চোখ মুছে সোজা হয়ে দাঁড়ায়.....
"শেষ চেষ্টা করলাম,,জানি না কি হবে পরে... "
-------------
সময় কাটছে তার মতো করেই। আবির কল কাটার পর তিন ঘন্টা অতিবাহিত হয়েছে, আর তার খোঁজ পাওয়া যায় নি। সন্ধ্যায় কাজী আসবে নিবিড় দোয়েলের বিয়ে পড়াতে, আর এখন এই ঘোর দুপুরে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে আছে আবির কি করছে কারোরই জানা নেই, এমন কি নিবিড়েরও না।তখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আশপাশের কাজি অফিস গুলোতে খোঁজ নিয়েও এসেছে নিবিড় আর জিসান মিলে, তবে পাওয়া যায়নি আবির, ইরিনকে কোথাও। তাই অপারগ হয়ে আবার বাড়িতেই ফিরে এসেচে ওরা।নিজেদের সোর্সকে কাজে লাগিয়েছে নিবিড়, তবে এতে যে কোনো লাভ হবে না তা নিশ্চিত সে,,আবিরের বুদ্ধির কাছে নিবিড় কিছুই না।
দুপুরের খাওয়া হয়নি কারোরই। চিন্তায় কি আর খাওয়া যায়? আজমল চৌধুরী টেনশনে ঝিমিয়ে গেছেন, তাই দোয়েল জোর করে তাকে অল্প কিছু খাইয়ে রুমে পাঠিয়েছে বিশ্রাম করার জন্য। বাদ বাকি সবাই এখনো আগের অবস্থানেই রয়েছেন।
সময় দুপুর চারটে প্রায়....
সদর দরজায় কলিং বেল বাজতেই সকলের মনে একটু আশার রেখা দেখা দেয়।কে এলো, কে এলো একটা উদগ্রীব ভাব। আহিশ গিয়ে দরজা খুলে দেয় দ্রুত। সাথে সাথেই সকলের নজর বন্দী হয় আবির আর ইরিন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। এটা দেখেই সকলের মনের একটুকরো আশাও ভেঙে যায় এবার। আর কিচ্ছু বাকি রইলো না, সবটা শেষ, সবটা....
আবিরের মুখে বাঁকা হাসি। দৃষ্টি তার আহিশের দিকে নিবদ্ধ রেখেই এক অদ্ভুত তাচ্ছিল্য স্বরে বলে ওঠে.....
"কিরে... তোর নতুন ভাবিকে সালাম কর?"
আহিশ হতবাক হয়ে একবার আবিরের দিকে, তো আরেকবার পাশে থাকা ইরিনের দিকে তাকিয়ে ওভাবেই বলে ওঠে....
"আ্ আসসালামু আলাইকুম ভ্ ভাবি...."
সাথে সাথেই ঠোঁট বাকিয়ে মুখটা ফিরিয়ে নেয় ইরিন, যেন আহিশের এই টুকু কথায় সে খুবই বিরক্ত।
" চ্.... ভুল জায়গায় ঢিল ছোড়ার অভ্যাসটা তোর আর গেলো না আহিশ.... "
বলতে বলতেই আবির আহিশকে পাশ কাটিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। আর সাথে এক প্রকার টেনে নিয়ে আসে এতক্ষণ নিজের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কান্নারত চড়ুইকেও।
সাবিহার সামনে দাঁড়িয়ে যায় সটান আবির। ঠোঁটে তার এক তীর্যক হাসি। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাবিহা কিছুই বুঝতে পারছে না, সকলের মতো সেও শুধু হা করে তাকিয়ে দেখে যাচ্ছে আবিরকে।
একের পর এক যেন ধামাকা দিয়ে চলেছে আজ আবির। এই যে এক্ষুনি আরেকটা কল্পনাতীত কাজ করে বসলো সে।
মনিমুক্তার মতো তীর্যক চোখ দুটি সাবিহার দিকে স্থির রেখেই পাশে থাকা চড়ুইয়ের মাথার পেছনে এক হাত দিয়ে নিজের কাছে টেনে আনে। তারপর আরেক হাতে মেয়েটার থুতনি ধরে ছোট্ট ভেজা মুখটা উঁচু করে ধরে সারাটা মুখে অনবরত ছোটছোট চুমুতে ভরিয়ে দেয় আবির।
সাবিহার চোখ বড় বড় হয়ে যায় আবিরের এহেন কান্ডে, ছেলের মাত্রাতিরিক্ত কাজগুলো যেন সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে তার।বাকিদের ও মুখে হাত, এ কি করছে আবির.....
চোখ খিঁচে বন্ধ করে নেয় চড়ুই। হুট করে আবিরের এমন কাজে সেও অপ্রস্তুত সম্পূর্ণই। তাই বিরক্তি,ঘৃণায় নাক মুখ কুঁচকে আবিরের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টায় নিয়োজিত হয় সে। আবির যেমন এলোমেলো চুমুতে ভরিয়ে দিচ্ছে চড়ুইয়ের সারাটা মুখমণ্ডল, তেমনি চড়ুইও ছটফটিয়ে আবিরের হাতে মুখে এলোমেলো থাবা, খামছি দিচ্ছে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য। একটু পরে আবির থামলে চড়ুই ঘৃণায় মুখ থেকে বিকৃতি ভঙ্গিতে....
"ছিহ!!!"
বলে আবিরকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে চায়, তখনি আবির এক হাতে দ্রুত চড়ুইয়ের পাতলা কোমড় জড়িয়ে নিজের সাথে টেনে চেপে ধরে সাবিহার চোখে চোখ রেখে বলে ওঠে......
"লুকিয়ে চুমু খেতাম, আর ধরাও পড়তাম তোমার কাছে। আজ থেকে চুমু খাওয়া সব বাকি সব কিছুর অফিসিয়াল সার্টিফিকেট নিয়েই এসেছি। আমার একমাত্র বিয়ে করা বউ, পৃথিবীর সবার সামনে ডেইলি হাজারটা চুমু খেলেও কারোর সাধ্যি নেই আমাকে বাঁধা দেওয়ার.... "
---------------
ভার্সিটি ক্যাম্পাসে মাঠে গোল করে বসে ছিলো কেয়া, রাবতি, চড়ুই।খুটিনাটি বিষয় নিয়ে আড্ডা জুড়ে দিয়েছে তারা। তখনই হঠাৎ কোথা থেকে উদ্ভ্রান্তের ন্যয় ছুটে এসে চড়ুইকে জাপটে ধরে আবির। ক্যাম্পাসে উপস্থিত প্রতিটি সদস্য চমকায়। চারদিকে গুঞ্জন ওঠে টুইনস ব্রাদার্সদের একজনের কান্ড নিয়ে। এদিকে হঠাৎ এমন অতর্কিত হামলায় কেয়া আর রাবতি ছিটকে দূরে সরে যায়।
চড়ুইও চমকায়, হুট করে একটা লোক এভাবে তাকে জড়িয়ে ধরায় চরম বিরক্ত নিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা চালায় সে, সাথে তার চলমান মুখ তো আছেই....
"এই, কেরে,,, কোন বান্দরের এত সাহস আমায় এমনে ধরে আছিস, এই ছাড়, ছাড় বলছি... "
পরক্ষণেই মুখটা একটু নামাতেই লক্ষ্য করে পরিচিত মুখটি। তখনই তার কথা থেমে যায়। খেয়াল করলো লোকটা ভীষণ হাঁপাচ্ছে, ঘন ঘন শ্বাস এসে পড়ছে চড়ুইয়ের কাঁধে। চোখ মুখের ভাব খানা পরিবর্তন হয় চড়ুইয়ের। এতক্ষণ টানা টানি করা হাতটা কোমল রুপ নেয়। চোখ বন্ধ থাকায় বুঝতে পারছে না এটা আবির নাকি নিবিড়, তাই তাকে নিজের থেকে উঠানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে বলে ওঠে....
"ক্ কি হলো আপনার? কে আপনি? নিবিড় ভাই? নাকি দানাবল? এই? কাঁদছেন কেন? "
উত্তর আসে না কিছুতেই।কিছুটা সময় ওভাবেই কেটে যায়।তারপর হঠাৎ আবির মুখ তুলে তাকায় চড়ুইয়ের দিকে। চড়ুই চোখ দেখে বুঝতে পারে এটা আবির। তাই কৌতুহল নিয়ে আবারো জিজ্ঞেস করলো....
"দানাবল,কি হলো আপনার? কাঁদছেন কেন? কেউ মেরেছে আপনাকে? চলুন তাকে আচ্ছা করে বকে দেবো।"
আবির লম্বা করে নাক টানে। ঢোক গিলে উঠে দাঁড়িয়ে চড়ুইয়ের হাত টেনে তুলে বললো...
"চলো..."
চড়ুইও আপন মনে উঠে দাঁড়ায় অজ্ঞাত লোকটিকে বকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে কেয়া আর রাবতির দিকে তাকিয়ে বলে...
"এই আমি গেলাম রে, কোন ছাওয়াল দানাবলকে মেরেছে দেখে আসি বুঝলি। টাটাহ... "
চড়ুইকে নিয়ে আবির চলে গেলেও কেয়া রাবতির যেন ঘোর কাটে না। আবিরের মতো লোককে কেউ মেরেছে আর সে এভাবে এসে মুখ লুকিয়ে কাঁদবে তা তো অসম্ভব ব্যপার।.....
গাড়িতে বেশ ফুরফুরে মনেই বসে ছিলো চড়ুই। একটু পর পর আবিরকে প্রশ্ন করছে...
"কেন মেরেছে আপনাকে? আপনার কি বেশি ব্যথা লেগেছে? আচ্ছা, কি কি বলে বকা যায় তাকে বলুন তো? সে কি আপনার থেকেও বেশি শক্তিশালী? "
একটা প্রশ্নেরও উত্তর আসে না আবিরের থেকে। নীরবে ড্রাইভ করে যায় সে। বেশ অনেকক্ষণ পর গাড়ি থামতেই আবির নেমে দাঁড়ায়, পাশ ঘুরে এসে চড়ুইকেও নামায়। চড়ুই আশপাশে দেখে জিজ্ঞেস করে....
"কোথায় সে?"
আবির উত্তর দেয় না,নীরবে চড়ুইয়ের হাত ধরে এগিয়ে যায় একটি বিল্ডিং এর দিকে। চড়ুইয়ের কৌতুহলী দৃষ্টি এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখছে শুধু। একটু পরেই এসে প্রবেশ করলো একটি ঘরে। সামনেই বয়স্ক মতো একজন লোক বসে আছে সামনে খাতাপত্র মেলে। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা সুহাস আর রাতুলকে দেখে চড়ুই উচ্ছাসিত হয়ে বলে ওঠে....
"আরে সুহাস ভাই? তুইও কি ঢিসুব ঢিসুব করতে এসেছিস এখানে?"
সুহাস করুন চোখে তাকায় আবিরের দিকে। আবির সুহাসের হয়ে উত্তর দেয়....
"নাহ, তোমার বিয়ের সাক্ষী হতে এসেছে। "
বলতে বলতেই একটা চেয়ার টেনে এক প্রকার ঝাড়ি মেরে বসায় চড়ুইকে। সেও বসে পাশের চেয়ারে। চড়ুই কিছুটা অবাক হয়ে বলে ওঠে...
"আমার বিয়ে? সেটা তো সন্ধ্যায় হওয়ার কথা বাড়িতে। এখানে কেন.... "
আবির অথবা সুহাস কেউই উত্তর দেয় না। সামনে থাকা কাজিকে উদ্দেশ্য করে আবির রুদ্ধ কন্ঠে বলে ওঠে....
"শুরু করুন... "
কাজী আমতা আমতা করে চড়ুইয়ের দিকে ইশারা করে বলে ওঠে....
"ইয়ে মানে পাত্রী কি আর পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা আছে বাবা? তাহলে নিকানামাটা একবারই লিখি..."
"নাহ, এটাই ফাইনাল। নতুন করে নিকানামা লিখুন, পাত্রী জনাব আজিজ রহমানের কন্যা চড়ুই রহমান।
আর পাত্র জনাব আজমল চৌধুরীর পুত্র আবির বিন চৌধুরী মানে আমি....."
এতটুকু বলতেই চড়ুই চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়....
"আসতাগফুরিল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ..... আপনি মা'ল খান জানতাম, কিন্তু অভাবে পড়ে যে ডেট ওভার মা'ল খাওয়া শুরু করেছেন সেটা তো জানতাম না দানাবল..."
আবির হাত টেনে চড়ুইকে আবার চেয়ারে বসাতে বসাতে বলে.....
"যতদূর জানি তুমি এখনো ইনটেক আছো, ডেট ওভার হওয়ার প্রশ্নই আসে না।"
চড়ুই হাতের তুড়ি বাজিয়ে বলে ওঠে....
"ও ভাই... আমি আমার কথা বলিনি, মা'লের কথা বলছি..."
আবির বাঁকা হেঁসে চোখ মেরে বলে...
"তুমিই তো আমার মাল, আর তোমাকে তো খাবো আজ রাতে..."
"এই ছিহ!!!"
সুহাস আর রাতুল বেচারা মুখ চেপে দাঁড়িয়ে আছে। আবিরের সামনে হাসাও বারণ,এই মুহুর্তে তো একদমই নয়।ও দিকে কাজি সাহেব হা করে তাকিয়ে দেখছে এদের কাহিনি, তাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আবির তাড়া দিয়ে বলে....
"আপনি কি দেখছেন? নিজের কাজ করুন,,এ আসলে এমনই, মাথার ভেতরের মগজটা মাঝেমধ্যে গলায় চলে আসে।আপনি কাজ করুন দ্রুত...."
কাজী ব্যস্ত হয় নিকানামা তৈরি করতে। এদিকে চড়ুই কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আবিরের দিকে। কাজী কাজ শেষ পেপার এগিয়ে দেয় আবিরের দিকে। আবির সাথে সাথেই সাইন করে পেপারটা দেয় চড়ুইয়ের সামনে....
"সাইন করো এখানটায়... "
চড়ুই কটমট করে বলে ওঠে .....
"করবো না... "
" থাপড়াবো ধরে এখন... করো সাইন.."
দাঁত কিড়মিড় করছে চড়ুইয়ের, তবুও আবিরের হাত থেকে কলমটা ছো মেরে নিয়ে পেপারটাও টেনে নিজের কাছে আনে। তারপর টেবিলের উপর অনেকটা ঝুঁকে সাইন করার জায়গাটায় গুটি গুটি অক্ষরে লিখে দেয়...
তারপর সুন্দর মতো পেপারটা এগিয়ে দেয় কাজীর দিকে। কাজী মুখের সামনে পেপারটা ধরে একবার চড়ুইয়ের দিকে, তো আবার আবিরের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে....
"কয়বার খেয়েছেন বাবা?"
আবির থতমত খায় হঠাৎ এমন প্রশ্নে। মস্তিষ্কের টানে কিছু একটা আন্দাজ করে এলোমেলো দৃষ্টিতে চড়ুইয়ের দিকে চেয়ে আবার কাজীকে প্রতিবাদী স্বরে বলে ওঠে...
"কি যা তা বলছেন. এখনো একবারও খাই নি, আজ খাবো আরকি..."
কাজীও নিজের মতো ফের প্রশ্ন করে...
"তা... কোথায় পাবেন?"
"কোথায় পাবো মানে?"
"মানে হাতির ঘু... কোথায় পাবেন?"
"ওয়াট...!"
কাজী এবার পেপারটা ঘুরিয়ে দেখায় আবিরকে। যেখানে চড়ুইয়ের সাইন করার জায়গাটায় স্পষ্ট লিখা...
"আবির হাতির ঘু খায়..."
কটমটিয়ে চড়ুইয়ের দিকে তাকাতেই খিলখিলিয়ে হেঁসে ওঠে চড়ুই। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা তার। ধমকে ওঠে আবির....
"এই মেয়ে চুপ...! একটা দেবো কানের গোড়ায়.."
চড়ুই মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করে। আবির নিজেকে সামলে কাজিকে দিয়ে আবার নতুন করে পেপার রেডি করায়। তারপর আবার নিজে সাইন করে চড়ুইয়ের সামনে দেয় কাগজটা।চড়ুই এবার খুশি মনেই আবারো আগের কাজ করতে গেলেই আবির বলে ওঠে....
"ওকে দেখেছো?"
আবিরের ইশারা অনুযায়ী রাতুলের দিকে তাকায় চড়ুই। তারপর উত্তর দেয়...
"হ্যা দেখছি তো। "
"দেখে কি মনে হয়..."
"ভালো মানুষ..."
" কিন্তু ও মোটেও তেমন নয়, ও হচ্ছে যে একটা লেডি কিলার, মানে বুঝছো তো? ঐ যে ইয়ে আরকি। "
কথাটা শুনেই রাতুল মুখ লটকিয়ে বলে ওঠে...
"স্যাররর... আমিই কেন?"
আবির পাত্তা দেয় না তাকে। চড়ুইকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলে.....
"এখন যদি তুমি এখানে সাইন না করে উল্টাপাল্টা কিছু লিখো তাহলে আমি, সুহাস আর কাজী সাহেব সাথে সাথে এখান থেকে বেরিয়ে বাইরে থেকে দরজা আটকে দেবো। তারপর ভেতরে কি হবে সেটা তুমি বুঝতেই পারছো বেশ....."
এতক্ষণের হাসিমাখা মুখটা মুহুর্তেই আঁধারে পরিনত হয় চড়ুইয়ের।ভীত চোখে একবার রাতুলের দিকে তো আবার আবিরের দিকে তাকায় মেয়েটি....
"ওর থেকে বাঁচার জন্যই কি আমরা এখন বিয়ে বিয়ে খেলছি?"
"হুম.."
"তাহলে এখান থেকে বেরিয়ে গেলে ডিভোর্সও হয়ে যাবে তাই না?"
"হুম..."
"তাহলে ঠিক আছে..."
বলতে বলতেই পেপারে সুন্দর মতো সাইন করে দেয় চড়ুই।তারপর ধর্মীয় মতে কবুলও বলে দেয় সে। বিয়েটা শেষ হলেই সবাই মিলে কাজী অফিস থেকে বেরিয়ে আসে, বুদ্ধিমতী চড়ুই বের হওয়ার সময় কাজীর টেবিল থেকে হাতে করে একটি কাচের পেপারওয়েট তুলে নিয়ে আসে। বাইরে এসে গাড়িতে উঠে বসলেই সুযোগ বুঝে জানালা দিয়ে টার্গেট করে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রাতুলের অন্ডকোষ বরাবর জোরসে ছুড়ে মারে পেপারওয়েটটি। জায়গা মতো লাগতে দেখেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওঠে সে...
"লেডিকিলার না তুই? সামনে থেকে লেডিকিলিং করার আগে এটার কথা মাথায় রাখবি, তাও যদি না ঠিক হোস তুই তাহলে পরের বার ওটা কেটে একদম হাতে ধরিয়ে দিবো বলে রাখলাম।"
গাড়ি চলতে শুরু করে নিজ গতিতে। চড়ুই এবার ফুরফুরে মনে বলে....
"তাহলে চলুন এবার ডিভোর্সটাও করে নিই?"
"রাতে বাসরটা সেরে নিই, তারপর ডিভোর্স নিয়ে ভাবা যাবে...."
---------
সেই তখন থেকে যে চড়ুইয়ের কান্না শুরু হয়েছে একনো থামছে না তা। আবির হাফ ছেড়ে গলা ছেড়ে বাড়ির সবার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে...
" আব্বু কোথায়? আসতে বলো তাকে..."
বাইরে চেচামেচি শুনে আজমল চৌধুরী নিজেই বেরিয়ে এসেছেন ঘর থেকে।...
"বলতে হবে না আমি নিজেই এসেছি। "
আবির এগিয়ে গিয়ে পকেট থেকে কিছু পেপার বের করে রাখলো আজমলের সামনে। তা দেখে আজমল জিজ্ঞেস করে.....
"কি এটা?"
"চড়াই আর আমার বিয়ের রেজিষ্ট্রি পেপারের কপি।"
বলতে বলতেই আরেকটা পেপারও সামনে রাখলো সে। আজমল চৌধুরী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই আবির কাঠকাঠ কন্ঠে বলে ওঠে.....
"আর এটা হলো সেই পেপার যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ করা আছে যে, আমি আবির বিন চৌধুরী স্বইচ্ছায় চৌধুরী ইন্ড্রাস্ট্রি এবং এই বাড়ির সকল প্রকার সম্পত্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি। আর আজ এবং এই মুহুর্ত থেকে আমি এই বাড়ির সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে যাচ্ছি,আমি আমার বিবাহিত স্ত্রী চড়ুই বিন চৌধুরীকে নিয়ে আজ থেকে আলাদা থাকবো। "