" রায়হান ধরা পড়েছে স্যার। এখন কি করবো? খুলি বরাবর মেরে দিই?"
"উহুম... ওকে আমার জ্যান্ত চাই, ওর ঐ হাত দুটো চাই আমার। ও গুলো আমি নিজ হাতে ওর শরীর থেকে আলাদা করবো রাতুল..."
ঘুমঘুম কন্ঠ, তবুও যেন বি'ষের মতো বাক্যের তোপে কাঁপছে তা। রাতুল কানে ফোন চেপেই এক হাতে কলার চেপে ধরে রাখা রায়হানের নেতিয়ে পড়া মুখশ্রীর দিকে তাকায়। শুকনো ঢোক গিলে বলে...
" টুইন্স ব্রাদারের সাথে পাঙ্গা নিলি রায়হান, সবে তো শুরু তোর কষ্টের। চল... ক'দিন না হয় আমাদের বেজমেন্টের ধুলোময় বাতাস গায়ে লাগা, তারপর তোকে জাহান্নামে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে স্যার নিজেই...."
---
ভালো খবর ভালো ভাবে আসে না, এই যেন এত দিন পর আবির আজ একটা শান্তির ঘুম দিলো, এরই মাঝে রাতুলের কল। কথা শেষ হতেই কান থেকে ফোন নামিয়ে নিজের গুটিয়ে রাখা পা জোড়া একটু নেড়েচেড়ে নিলো। ডিভানে কি আর এত লম্বা মানুষ আরাম করে ঘুমাতে পারে,তাও প্রায় পিঠের অর্ধেক বাইরে আবিরের।
ঘাড় উঁচু করে একবার বিছানার দিকে তাকায় চড়ুইকে দেখার জন্য। কিন্তু এমাহ.. চড়ুই তো নেই বিছানায়। কোথায় গেলো মেয়েটা? আবিরের ঘর ছেড়ে পালায়নি তো আবার?
মাথা তুলে একটু ওপাশে দেখতেই সুস্থির নিঃশ্বাস ফেললো আবির। নাহ, এখানেই আছে মেয়েটা।যে দিকে ঘুমিয়েছে তার উল্টো দিকে আছে এখন। দীর্ঘ এক নিশ্বাস ফেলে আবির,এই মেয়ের ঘুমের ধরন এমন কেন,ভয়ই পেয়ে গেছিলো আবির।
ঘড়ির কাটা দুইটা ছুইছুই, আবির ডিভান ছেড়ে উঠে বসে। এখানে ঘুমানো তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না উঠে গিয়ে আস্তে করে বিছানায় উঠে বসে এক কোনায় সে। এবার সম্পূর্ণ চড়ুইকে দেখা যাচ্ছে ভালো ভাবেই। হঠাৎ আবির লক্ষ্য করলো মেয়েটা ঘুমের মধ্যেই কেমন কুঁকড়ে উঠছে বার বার। চিন্তিত আবির এগিয়ে গিয়ে বেশ কয়েক বার ডাকে চড়ুইকে....
"ওয়াইফি? আর ইউ ওকেয়? এমন করছো কেন?"
বেশ অনেকক্ষণ পর চড়ুইয়ের হয়তো একটু হুশ ফিরে। নড়েচড়ে আবার পা দুটো গুটিয়ে শুয়ে ঘুমঘুম কন্ঠে উত্তর দেয়....
"ব্ ব্যাথা অনেক..."
থেমে যায় আবির। এক পলক সম্পূর্ণ চড়ুইকে পর্যবেক্ষণ করে উঠে গিয়ে ড্রয়ার থেকে হট ওয়াটার ব্যাগটায় চার্জার কানেক্ট করে। তারপর ফিরে এসে চড়ুইকে টেনে ঠিক করে শুইয়ে দিয়ে গায়ে কম্বল টেনে দেয় সে। মাথার কাছে বসে চুলে হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করে....
"খিদে পেয়েছে পাখি? কিছু খাবে?"
চড়ুই ওভাবেই উত্তর দেয়...
"উহু... ব্যথা... "
আবির নির্লিপ্ত তাকিয়ে রয় মেয়েটার কুঁকড়ে ওঠা মুখ খানার দিকে। বিষয়টা স্বাভাবিক, কিন্তু আবিরের মনে কেমন যেন ভয় লাগছে, ইশশ মেয়েটার এই টুকু কষ্টও কি আবির সহ্য করতে পারে না? এতটা মায়া কবে থেকে এলো এই আবিরের মনে?
হট ওয়াটার ব্যাগটা গরম হতেই সেটা নিয়ে আবির চড়ুইয়ের পেটে আলতো চেপে ধরলো। একটু পর ধীরে ধীরে চড়ুই স্বাভাবিক হয়ে আবার ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমায়।
------
"গুড মর্নিং ব্রো..."
সিড়ি বেয়ে নেমে আসতেই নিচ থেকে নিবিড়ের উচ্ছাসিত কন্ঠে তার দিকে ফিরে তাকায় আবির। ছোট্ট করে উত্তর দেয়...
"গুড মর্নিং "
"ভাবি কোথায় ভাই?"
আবির চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করে...
"ভাবি?"
নিবিড় তার বিশ্ব বিখ্যাত হাসি রেখে বলে....
"হ্যা, শালি, ভাবি, ছোটপাখি যা ইচ্ছে তা।।কোথায় সে?"
আবির এসে আরামসে বসে নিবিড়ের পাশে। গলা ছেড়ে কিচেনের দিকে ডেকে বলে....
"কেউ এক কাফ কফি দিয়ে যেও..."
নিবিড় বেশ আগ্রহ নিয়ে ঘুরে বসে আবিরের দিকে। আহিশ ও এসে হাজির হয় সে সময়।নিবিড় বেশ কৌতুহল নিয়ে প্রশ্ন করে....
"কাল রাতটা কেমন কাটলো ভাই?"
আবির বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বলে...
"আর রাত,, এক ফোটা ঘুমাতেও পারিনি রাতে..."
আহিশ এসে পেছনে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নিজেও উচ্ছাসিত হয়ে বলে ওঠে....
"কেন ঘুমাতে পারিস নি?? সারা রাত ছোট পাখিকে জ্বালিয়েছিস নাকি?"
আবির ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় আহিশের দিকে।চোখ মুখ কুঁচকে বলে ওঠে....
"এই তোর কষ্ট হচ্ছে না? তোর প্রেমিকাকে আমি বিয়ে করে নিয়েছি যে? আবার এসে দেখো কেমন হাবলার মতো জিজ্ঞেস করছে রাতে কি কি করেছি..."
আবিরের কথায় হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা আহিশের।...
"আমার প্রেমিকা, ছোটপাখি? আল্লাহ বাচাইছে। ঐ মাইয়ারে সামলানো আমার কাম না ভাই, বিপদ কান্ধে নিলি সারা জীবন সামলা,,আমি আমার নাগা মরিচ নিয়াই ভালো আছি..."
হৃদ মাত্রই নিজের ব্যাগ পত্র নিয়ে ড্রয়িং রুমে এসে উপস্থিত হয়। আহিশের কথা শুনে পিন্চ মেরে বলে ওঠে....
"এহ, উঠলো না এখনো দাড়ি... মুখে শুধু নারী আর নারী। আমারে নিয়ে ভালো আছেন মানে কি? আপনার সাথে প্রেম করার চাইতে কোকিলের ঘু খাওয়াও ভালো। "
আহিশ এবার এগিয়ে যায় হৃদের কাছে, নেকি সুরে বলতে থাকে....
"আমি কি কোকিলের থেকে কম নাকি বলো,,আমার ঘু খেও তুমি...."
হৃদও টেনে টেনে বলে ওঠে....
"আহা হা... আপনি কোকিল হলেন কিভাবে,,আপনি তো আস্ত কাক... সারাদিন শুধু কা কা করেন... "
সাবিহা এগিয়ে এলেন আবিরের জন্য কফি নিয়ে। আবির সেটি নিজ হাতে তুলে নিতে নিতে ভিষণ সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললো....
"আহিশের থেকে হৃদকে দূরে রাখো। ওর চরিত্রে একটু সমস্যা দেখা দিয়েছে, একটা গেলে আরেকটা ধরে। চড়ুইকে হারিয়েছে, তাই এবার হৃদকে পটানোর চেষ্টা করছে.... "
আবিরের এই কথা শুনেই আহিশের মুখটা ফুটুস করে নিভে গেলো শুধু। নিজের আধিপত্য স্থাপনের লক্ষ্যে দু হাত কোমড়ে গুজে জোর কদমে এগিয়ে এলো আবিরের সামনে। তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলে ওঠে....
"এটা তুই আদেও ঠিক করছিস আবির ভাই? তোর জন্য এত নাটক করলাম,এত কষ্ট পাইলাম,এখন তুই আমার প্রেমে বাগড়া দিচ্ছিস..."
আবির কফির কাপে চুমুক দিয়ে চোখ উঁচিয়ে ধীর কন্ঠে বলে....
"মেয়ে মানুষের মতো কোমড় বেধে ঝগড়া করছিস কেন? লেসবিয়ান হবি তুই? সার্জারির ব্যবস্থা করে দিবো?"
নিবিড় পাশে বসে হাসতে হাসতে বলে...
"দে ভাই দে, এমনিতেও আহিশের ঐ টুকুন জিনিস দিয়ে কিচ্ছু হবে না ভবিষ্যতেও, এর থেকে ভালো কেটে ফেলে দিয়ে শরীর থেকে ভার কমাক একটু..."
আহিশ বেচারা আর শান্ত রইলো না, বিদ্রোহী কন্ঠে বলে ওঠে....
"তোর সাথে চড়ুইয়ের বিয়ে টা দেওয়াই উচিৎ হয়নি, ইরিনকে বিয়ে করতি, তারপর বুঝতি বিশাল সমুদ্রে হাবুডুবু কি করে খায়। "
আবির বাকা হেঁসে রয়েসয়ে বলে...
"ওসব আর এখন বলে লাভ নেই। ছোটখাটো একটা সার্পনার চেয়েছি, তাই পেয়েছি। তুই নিজের কথা বল, রাখবি না ফেলে দিবি ওটা?"
সাবিহা এবার এগিয়ে টসে সবাইকে থামিয়ে বলে...
"আহ, তোরা দুই ভাই মিলে কি শুরু করেছিস বলতো? ছেলেটাকে বের হতে দে৷ আহিশ, বার বার বলে রাখছি হৃদ মামনিকে কিন্তু সাবধানে পৌঁছে দিবি হস্টেলে। "
আয়েশা এগিয়ে এসে হৃদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো...
"আমোজ ভাইকে কত করে বললাম মেয়েটা এখান থেকেই কলেজে যাওয়া আসা করুক, শুনলোই না। আলাদা করে আবার হস্টেলে সীট নিলো। শোন মামনি, তোর যখনই মন চাইবে বাড়িতে চলে আসবি কিন্তু। এখন এটা তোর আপুদেরও বাড়ি বুঝলি? "
আহিশ হেঁসে বলে...
"হ্যা, হ্যা, ক'দিন পর তো নিজের বাড়ি হবে, তাই না নাগা?"
হৃদ মুখ ভেংচি কেটে বলে...
"হুহ.. কচুর ডাটা দিয়ে দাঁত মাজেন গিয়ে।"
"যতই বাহানা করো নাগা,, আর তো মাত্র দুটো বছর। কলেজটা পাশ করে নাও, তারপরই ছক্কা মেরে তোমায় বউ বানিয়ে নিয়ে আসবো। কারোর বারণ শুনবো না। "
আবির বুঝে পায় না আহিশের এত খুশির কারন, নিবিড়কে ধীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে...
"এই ছেলে এত খুশি কি করে বলতো? ওর তো শোকে শোকান্বিত হওয়ার কথা... "
নিবিড় মুখ টিপে হেঁসে বলে...
"ধুরর ইয়ার, ওসব নাটক ছিলো। ছোটপাখিকে হেট করিস বলেছিলি না? তাই ছোট্ট একটা শাস্তি ওটা। "
"নাটক মানে? আর কে কে জানতো?"
" আম্মু, আব্বু আমরা সবাই-ই। "
"ত্ তার মানে চড়াই পাখি বোঝে, আমি যে ওকে ভালোবাসি? "
"সেটা আমি কি করে জানবো? আমি ভাই যাই, নিজের বউয়ের খবর নিই গিয়ে একটু। "
বলতে বলতেই হেলেদুলে জায়গা ত্যাগ করলো নিবিড়।
দোয়েল মাত্রই গোসল সেরে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে টাওয়াল পেচাচ্ছিলো... তখনই পেছন থেকে নিবিড় এসে জড়িয়ে ধরে দোয়েলের কোমড়। থুতনিটা দোয়েলের উন্মুক্ত কাঁধে রাখতেই হালকা কেঁপে ওঠে মেয়েটা। মানুষটার ছোঁয়া আজ থেকে যে তার জন্য সম্পূর্ণ বৈধ.....
"গুড মর্নিং মিস এটম... নিবিড়ের বউ হিসেবে এটা আপনার প্রথম সকাল। অনুভূতি কেমন বলুন? "
দোয়েল লাজুক হাসে নিবিড়ের এমন দুষ্টুমির কথায়। আস্তে করে উত্তর দেয়....
"অনুভূতি ভালো ৮০% আর খারাপ ২০%... "
নিবিড় হাসে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত দিয়ে একটা ছোট্ট ডেইরিমিল্ক বের করে দোয়েলের সামনে ধরে বলে....
"সেই ২০% ভালো করার উপায়ও জানা আছে আমার। "
দোয়েল আলতো হেঁসে ডেইরিমিল্কটা হাতে নেয়। নিবিড় আরেক পকেট থেকে এক পাতা মেডিসিন বের করে রেখে বললো...
"শুধু চকলেট খেলে হবে না, নাস্তা করে নিয়ে এখান থেকে একটা খেয়ে নিবেন। ওখানটায় বক্সে আপনার প্রয়োজনীয় সব কিছু আমি এনে রেখেছি সকালেই, সো... বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ওকেয়? "
দোয়েলের ভীষন লজ্জা লাগছে নিবিড়ের কথার মানে বুঝতে পেরে। আমতাআমতা করে বলতে নেয়...
"আ্ আপনি কি করে বুঝলেন যে আমার... "
" কাল রাতে গল্প করার বাহানা না দিয়ে বললেই হতো পিরিয়ড হয়েছে। "
"আমার আসলে ব্ বলতে... "
দোয়েলের কাচুমাচু ভাব দেখে তার দু কাঁধে ভরসার হাত রাখে নিবিড়। চোখে চোখ রেখে শীতল কন্ঠে বলে...
"কি? বলতে লজ্জা লাগছিলো? আমি কি খেয়ে ফেলতাম তোমায় বললে? আর আমায় না বললে কাকে বলবে শুনি? আর যেন এই ভুল না হয়, ডোন্ট বি সায় ওকেয়? আ'ম ইউর হাসবেন্ড, ইউর ম্যান... তোমার ভালো খারাপ সব কিছু জানতে চাই আমি। "
দোয়েল নীরবে তাকিয়ে দেখে লোকটাকে। কি বলবে বুঝতে পারে না। লোকটার প্রতিটি কাজেই যে দোয়েল এখন শুধু মুগ্ধতা খুঁজে পায়।
" নিচে চলো নাস্তা করবে। ইচ্ছে হলে থাকবে আর শরীর খারাপ লাগলে রুমে এসে রেস্ট নেবে, তবে কিচেনে যেন কোনো কাজ না করতে দেখি এই ক'দিন। "
দোয়েল আস্তে করে বলে...
"তা বললে হয়? আম্মুরা তো কাজে হেল্প করতে হবে,, এত কিছু সামলানো যায় বলুন..."
" আমি সার্ভেন্ট হায়ার করবো প্রয়োজনে আরো কয়েকজন। আম্মুদের ও কষ্ট করতে হবে না, তোমাকেও না। আজ কোনো কাজ নয়, আমার এই টুকু কথা রাখো বউ। আর যখন যা লাগবে আমায় ফোন করবে সাথে সাথে।"
"কোথাও যাচ্ছেন? "
"উমমম অফিস,, তুমি বললে আজ না হয় যাবো না..."
"নাহ, যান আপনি। তবে...."
"তবে কি? "
"তারাতাড়ি ফিরবেন।"
"সে তো অবশ্যই ফিরবো। সদ্য বিয়ে করা বউ রেখে বেশিক্ষণ বাইরে থাকা যায় বলো সোনা?"