Mr and Mrs Twins Return

পর্ব - ৫৭

🟢

সন্ধ্যার সময়টা বেশ আরামদায়ক ভাবেই কাটছে চৌধুরী পরিবারের। দোয়েলের হাতের মুড়িমাখা আর গরম চায়ের আমেজ ছড়িয়েছে পুরো ড্রয়িং রুমটায়। সামনেই কালকের দিনের জন্য করা শপিং গুলো সবাই একে একে খুলে দেখছে।বিয়েটা সম্পূর্ণ ঘরোয়া ভাবে হলেও সবার জন্যই নতুন জামা কাপড় কেনা হয়েছে।

অতিথি আত্মীয় কাউকে না জানালেও নিজের মায়ের পেটের বোনকে বাদ দিতে পারেন নি আজমল চৌধুরী। বিথী বেগমকে একবার বলতেই বিকেলের দিকে হাজির হয়েছে তিনি, সাথে ইরিনও। দোয়েল চড়ুই দুটোর একটাকেও সহ্য হয় না ইরিনের। তবে সেদিনের সেই ঘটনার পর থেকে চড়ুই যেন দু চোখের বিষে পরিনত হয়েছে তার। এসেছে ধরেই চড়ুইয়ের দিকে হিংসাত্মক দৃষ্টি দিচ্ছে, যা চড়ুই বেশ বুঝতে পারছে।

কলিংবেলের শব্দে সকলে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দরজার দিকে। চড়ুই এক মুঠো মুড়ি মুখে দিতে দিতে এগিয়ে যায় দরজা খুলতে।

ছিটকিনি খুলতেই চোখ বরাবর পরে রক্তমাখা শার্ট। দৃষ্টি উঁচু করে চোখের দিকে তাকাতেই চোখ গোলগোল করে চেঁচিয়ে ওঠে সে....

"আম্মু দেখো,তোমার ছেলে আবার হাত পা কেটে এসেছে কোথা থেকে।"

কথা বলার সময় চড়ুইয়ের গালভর্তি মুড়ি গুলো বেরিয়ে পরতে নিচ্ছিলো। সে দিকে তাকিয়েই আবির বা হাতটা এগিয়ে চড়ুইয়ের থুতনি ধরে উঁচুতে ঠেলে দিয়ে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো...

"আগে ঠিক মতো গিলতে শিখো,তারপর বিচার দিও। সামান্য মুড়ি গিলতে পারে না, সে নাকি আবার রোজ রোজ বরকে খাবে। "

বিড়বিড় করতে করতেই এসে উপস্থিত হয় সবার সামনে। দুপুরে চড়ুইয়ের হাতে তৃপ্তি করে খাওয়ার পর পরই কোথায় যেন বেরিয়ে যায় আবির, সেই ফিরলো এখন, তাও আবার সারা গায়ে র'ক্ত লেপ্টে।

চড়ুইয়ের কথা শুনেই উদ্বিগ্ন হয়ে কিছুটা ছুটে আসে সাবিহা। যতই অভিমান হোক না কেন, ছেলের এমন অবস্থা দেখে মায়ের মন তো বিচলিত হবেই।আবিরের গায়ে রক্ত দেখে সাবিহা চিন্তিত কন্ঠে বলতে লাগলো....

"কি হলো? কোথায় কেটে এলি আবার?"

আবির মাকে সামলে নিয়ে বললো....

"কিচ্ছু হয় নি আমার,,আ'ম ওকেয়..."

ততক্ষণে চড়ুইও এগিয়ে এসে আবিরের শার্ট টেনেটুনে দেখতে দেখতে বলে...

"কিচ্ছু হয়নি মানে কি হ্যা? আমরা কি অন্ধ নাকি, এত র'ক্ত...."

"এটা আমার রক্ত না, রিল্যাক্স..."

চড়ুই হাত থামিয়ে দেয়। চোখ ছোট ছোট করে আবিরকে পর্যবেক্ষণ করে সাবিহার দিকে তাকিয়ে বলে....

"আম্মু, নিশ্চয়ই তোমার ছেলে মারামারি করে এসেছে।"

সাবিহাও যখন বুঝতে পারে যে আবিরের কিছু হয়নি, তখন সে আবার তার চিরপরিচিত গাম্ভীর্যে রূপ নেয়। চড়ুইয়ের কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে নীরবে রান্নাঘরে চলে যায়।

আবির একবার সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জামাকাপড় গুলো দেখে নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতে এগোতে বলে....

"আমায় এক কাপ কফি দিও তো আম্মু .... "

সাথে সাথেই সাবিহা রান্না ঘর থেকে উত্তর দেয়...

"যার হাতে ভাত খাওয়ার শখ হয়েছে তাকেই বল কফি দিতে। আমাকে কেন বলছিস..."

আবিরও কম নাহ, কদম না থামিয়েই রুমে যেতে যেতে বলে ওঠে....

"চাইলে ওর হাত দিয়ে কফিটা আমার রুমে পাঠিয়ে দিতে পারো, তবে খবরদার যেন কফি বানাতে না যায় সে, হাত পুরিয়ে ভ্যা ভ্যা করে কান্না করলে আরো দু ঘা দেবো আমি তখন।"

---------

দুপুরেও যেই ঘরটা তছনছ করে গিয়েছিলো আবির এখন সেটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রূপ ধারন করেছে। ধীর পায়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় আবির।একটু আগেই চড়ুইপাখি কতো বিচলিত ভঙ্গিমায় তার এখানে ওখানে ছুয়ে ছুঁয়ে দেখেছে। আবিরকে নিয়ে মেয়েটার এমন উদ্বিগ্নতা বেশ ভালোই লেগেছে তার। এই যে এখনো কেমন মুচকি হাসছে একা একা।

সরল ভঙ্গিতে শার্টের বাটন গুলো খুলে শার্টটা শরীর থেকে আলাদা করতে করতেই কারোর পায়ের শব্দ কানে এলো তার। আবিরের রুমের সামনে এসেই থেমে যায় শব্দটি। আবির বুঝে যে চড়ুই এসেছে হয়তো কফি নিয়ে। তাই পেছনে না ফিরেই আস্তে করে আদেশ করে....

"কাছে আসো?"

পেছনের মানবটি হয়তো খুব সহজেই বুঝতে পেরেছে আবিরের কথাখানা। আবারো পায়ের শব্দ তুলে এগিয়ে এসে দাড়ায় ঠিক আবিরের পেছন বরাবর। হঠাৎ পেছন থেকে এগিয়ে আসে দুটো মেয়েলি হাত। দু পাশ দিয়ে আবিরের পেশিবহুল এবসের একদম পেটের জায়গাটায় ছুঁয়ে দেয়।

চমকায় আবির, ভ্রু জোড়া কুঁচকে নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে অনুভব করতে লাগে শরীরের ছোঁয়া গুলো। দু পাশ থেকে হাত দুটো ধীরে ধীরে উপরে উঠতে থাকে আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে। উদাম শরীরে, শক্ত বক্ষপেশিতে এসেই হাত গুলো এলোমেলো পরশে ভরিয়ে দিতে চায় আবিরকে।

এটা চড়ুই পাখি নয়, এতো কামুকতা মিশ্রিত কাজ তার দ্বারা সম্ভব নয়।কথাটি মাথায় আসতেই পেছনে ফিরতে নেয় আবির, আর তখনই দরজার দিক থেকে ঝনঝনিয়ে কিছু ভাঙার শব্দ আসে।

সাথে সাথেই চমকে ইরিন সরে আসে আবিরের থেকে। আবিরও দরজার দিকে তাকিয়ে হতভম্ব চোখে তাকিয়ে থাকা চড়ুইকে দেখেই ধ্যান হারিয়ে ফেলে। চড়ুইকে কিছু বলার আগেই সে ছুটে পালায় সেখান থেকে। দরজার সামনে পড়ে রয় শুধু ছড়িয়ে থাকা কফির কাপটার ভাঙা টুকরো।

আবির যেতে নিলেই পেছন থেকে ইড়িন তার হাতটা চেপে ধরে, সাথে সাথেই আবির এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে চিৎকার করে ওঠে...

"হাউ ডেয়ার ইউ টু টাচ মি লাইক দ্যাট রাবিশ...?"

ইরিন কিছুটা ভয় পেলেও উত্তর দেয়....

"আবির ইট’স মি, ইরিন... তুমি এভাবে রিয়েক্ট করছো কেন? "

"আমি রিয়েক্ট করার যথেষ্ট কারন আছে ইরিন, তুমি আমাকে এভাবে টাচ করলে কেন হ্যা? আমি সম্পর্কে তোমার মামাতো ভাই হই, ভুলে যেও না এটা..."

ইরিন এগিয়ে বলে ওঠে....

"কিন্তু আবির, আই লাভ ইউ। আমি তোমাকে ভাই হিসেবে নিতে পারি না, আই নিড ইউ আবির।"

"বাট আই ডোন্ট নিড ইউ... "

"কেন আবির? কি কমতি আছে আমার মধ্যে দেখো? আমি সুন্দরী, স্মার্ট, ওয়েল এডুকেটেড সব কিছু একদম পার্ফেক্ট আবির। আমাকে পছন্দ না হওয়ার একটাও কারন নেই।"

"ইরিন তোমার বাকোয়াজ বন্ধ করে যাও এখান থেকে, ফারদার আর যেন এসব না দেখি কখনো, আমি কিন্তু ভুলে যাবো তুমি আমার ফুফুর মেয়ে, মাইন্ড ইট..."

"আবির আমি তোমাকে বিয়ে...."

"যাস্ট গেট আউট অফ মাই রুম ইরিন,যাও..."

আবিরের চিৎকারে ইরিন আর পেরে ওঠে না।পরাজিত সৈনিকের মতো করে বেরিয়ে যায় তার রুম থেকে।

-------

ডিনার শেষে মাত্রই চড়ুই নিজের রুমের দিকে এগোয়।তবে রুমে প্রবেশের আগেই কিছু একটা দেখে দরজার সামনেই থেমে যায় সে৷ ভেতরে আবির আর হৃদ দাঁড়িয়ে। কিছু একটা নিয়ে কথা বলছে বেশ, একটু পরেই আবির হাতে থাকা একটা শপিং ব্যাগ এগিয়ে দেয় হৃদের হাতে, হৃদও হেঁসে সেটা নেয়। এসব দেখেই ভ্রু কুঁচকে নেয় চড়ুই। আবির বের হতে নিলেই দু হাত টান টান করে তার সামনে পথ আটকে দাঁড়ায় সে, মুখে রগরগে ভাব নিয়ে তাকিয়ে থাকে আবিরের দিকে।

আবির বোঝার চেষ্টা করে মেয়েটার ভাবগতি, হঠাৎ এমন পথ আটকানোর কারন কি? মেয়েটার মুখে রাগের লক্ষণ দেখা গেলেও আবিরের মোটেও ভয় লাগছে না, দু হাত ভাজ করে বুকে গুঁজে নিয়ে আস্তে করে বললো....

"হুমমম, কিউট লাগছে, ক্যারি অন... "

আবিরের এই ছোট্ট কথায় চড়ুই যেন আরো তেতে উঠলো,রাগে রিরি করতে করতে বললো....

"দেখুন দানাবল, আপনি যেমনটা ভাবছেন হৃদ কিন্তু তেমন মেয়ে নয়। "

ভ্রু কুঁচকায় আবির, এইমেয়ে আবার কোন সূত্র মিলিয়ে ফেললো এর মধ্যে?...

"তো হৃদ কেমন মেয়ে?"

"ও আমার বোন, আর আমার মতোই ভদ্র একটা মেয়ে। "

আবির বেশ স্বাভাবিক ভাবেই বোঝার ভান করে বললো...

"ওকেয়.."

"তাই আপনাকে একটা কথা এখনই বলে দিই, আপনি যদি ভেবে থাকেন যে ইরিন আপুর মতো হৃদকেও আপনি এটা ওটা গিফট দিয়ে নিজের কাছে আনতে পারবেন তাহলে আপনার ধারণা ভুল।"

আবির সোজা হয়ে দাঁড়ায় এবার।এতক্ষণে এই মেয়ের আসল কাহিনী মাথায় আসলো তার। তবুও নিজেকে কিছুটা শান্ত রাখার চেষ্টা করে বললো....

"ইরিনের ব্যপারে যা দেখেছো সেটা একটা মিসআন্ডারস্যান্ডিং যাস্ট.... "

চড়ুই এক হাত তুলে আবিরকে থামিয়ে দেয়। চোয়াল শক্ত করে বলে ওঠে....

"হৃদ অনেক ছোট, ওকে এসবে জড়াবেন না প্লিজ।ওর হস্টেলে সীট বুক করা হয়ে গেছে। কাল বিয়েটা হয়ে গেলেই পরশু ও হস্টেলে শিফট করবে৷ তাই এই দুটো দিন আপনি ওর থেকে দুরে থাকুন প্লিজ..."

আবির একটুখানি নীরব থেকে সূক্ষ্ম ভঙ্গিতে চড়ুইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে...

"তুমি কি জেলাস? "

চড়ুই কথাটির উত্তর দিতে এক মুহুর্ত ও দেরি করলো না....

"একদমই নাহ, আমি শুধু বলতে চাইছি হৃদ ইরিন আপুর মতো নয়। ইরিন আপুর সাথে আপনি যা ইচ্ছে করুন আমার কোনো সমস্যা নেই, সেটা সম্পূর্ণই আপনাদের বিষয়, তবে হৃদকে নয়। ইরিন আপুকে আপনি জড়িয়ে ধরুন, কিস করুন, একসাথে একই বিছানায় রাত কাটান, তাতে আমার কোনো...."

কথাখানা সম্পূর্ণ করার আগেই একটা কষে থাপ্পড় পড়ে চড়ুইয়ের গালে। ঘাড় বেকে ঢলে পড়ে যেতে নিয়েও নিজেকে সামলে নেয় কোনো মতে সে। কানের ভেতর শোঁশোঁ শব্দ হচ্ছে, বা পাশের গালটার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছে না যেন সে, থাপ্পড়টা এতটাই জোরে লেগেছে৷ গালে হাত দিয়ে ছলছল চোখে আবিরের দিকে তাকাতেই দৃশ্যমান হয় আবিরের শক্ত চোয়ালখানা। রক্তচক্ষুর ভয়াবহ দৃষ্টি নিবদ্ধ চড়ুইয়েরই দিকে। চড়ুইয়ের ঠোঁট কাপছে অনবরত, কিছু বলতে নিয়েও পারছে না যেন সে। ঠিক তখনই পেছন থেকে সাবিহার কিঞ্চিৎ তাচ্ছিল্যের স্বর ভেসে আসে....

"মায়ের হাত ছেড়ে যার হাতে ভাত খাওয়ার তীব্র ইচ্ছে মনে, তাকেই এভাবে মারলি আবির? এটা তো আশাই করিনি কখনো..."

সাবিহার কন্ঠ শুনে চড়ুই করুন চোখে তাকায় তার দিকে। চোখের ভাষাই যেন বলে দেয় মেয়েটা ঠিক কি চাইছে, একটু আদর, একটু আগলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরা,একটু শান্তনা। তবে সাবিহার আজ তাতে আর মন গলেনি। ভ্রু কুটি করে মুখের উপর বলে দিলো....

"ওভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? আমি কিচ্ছু বলতে পারবো না এখানে, যাকে আদর সোহাগ করে খাইয়ে দিস তাকেই বল চোখ মুছিয়ে দিতে। "

চড়ুইয়ের ছোট্ট মনের আশাটিও ক্ষুন্ন হলো যেন। বন্ধুর মতো মায়ের থেকে এমন তীরের ফলার ন্যয় কথা গুলো নিতে পারে না মেয়েটা। রাগে, দুঃখে চোখ কচলে নিতে নিতেই দ্রুত পায়ে নিজ কক্ষে ঢুকে শব্দ করে দরজা আটকে দেয় ভেতর থেকে।

"আমার প্রতি তোমার যত রাগ, চড়াইয়ের সাথে এমন ব্যবহারের কারন কি? "

আবিরের প্রশ্নে সাবিহা মুখ ঘুরিয়ে উত্তর দিলো...

"যে মেয়ে আমার থেকে আমার ছেলেকে আলাদা করার ফন্দি আটে, তার সাথে আর কেমন ব্যবহার করবো.. "

"ও যে নিজ থেকে আমার কাছে আসে না সেটা তোমার অজানা নয় আম্মু। আর যেভাবে ফন্দি আটার কথা বলছো ওর মাথায় যে ততটা বুদ্ধি নেই সেটাও আমার থেকে ভালো তুমিই জানো। "

সাবিহা নিজের জেদ বজায় রেখে বলে...

"এসব আমায় বলে কোনো লাভ নেই। "

"হুম লাভ নেই, তবে ভুলে যেও না ওর নিজের মা নেই। তোমায় ও সেই স্থানটা দিয়েছে, এখন এমন কিছু অন্তত করো না যে ও তোমায় আবার পরের মা ভাবতে শুরু করে দেয়। কাদামাটি একবার পোরালে কিন্তু ভাঙা ছাড়া আর গঠন পরিবর্তন করা যায় না,কথাটা মনে রেখো৷ "

--------

ঘন কুয়াশা সরে সকালের মিষ্টি রোদ হাতছানি দিচ্ছে চারদিকে। আজমলরা সবাই আজ বাড়িতেই, সন্ধ্যায় যে একটি বিশেষ কাজ রয়েছে আজ। আবিরকে সেই কখন থেকে নিবিড় খোঁচাচ্ছে এই সেই বলে। তার কথার বিশেষ প্রসঙ্গ হলো আজ চড়ুই পাখি, আহিশের বউ হবে। আহিশের নামে কবুল পাঠ করবে।

রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে আবিরের। এত চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুমানো যায় নাকি। আজ সন্ধ্যায়ই চড়াই পাখিটা অন্যের হবে, আর আবির এখনো কোনো উপায় খুঁজে পায়নি। পাগলপ্রায় ছেলেটাকে আরো উষ্কে দিচ্ছে নিবিড়। তখনই ড্রয়িংরুমে ডাক পড়ে আবিরের। আজমল চৌধুরী ডাকছে শুনে আবির নিবিড় দুজনই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো ড্রয়িংরুমে।চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিলো আপাতত নীরব। রান্নাঘরে সাবিহা, জুলেখা,আয়েশা রয়েছে। টেবিলে বসে আহিশ আর জেসি, জিসান সকালের নাস্তা করছে।

আর সামনেই আজমলরা তিন ভাই বসে। আবির নিবিড় নেমে আসতেই আজমল চৌধুরী চোখের ইশারায় বসতে বললো। আবির নিবিড় বসলো। আজমল চৌধুরী এবার আস্তে ধীরে গলা ছেড়ে বললো....

"আবির বাবা, ডেকেছি একটা বিশেষ কারনে। "

আবিরের মনে কিছুটা শক্তি সঞ্চার হয়। হয়তো চড়ুইকে আবিরের হাতে তুলে দেওয়ার সীদ্ধান্তটাই জানাবে এখন। তবে আবিরের আশাকে খন্ডিত করে আজমল চৌধুরী বলে ওঠে....

"তুই তো জানিসই আজ সন্ধ্যায় বাড়িতে পাখিদের সাথে নিবিড় আর আহিশের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে ছোটখাটো ভাবে। কিন্তু কম্পানির কাজে এক্ষুনি একজনকে রাজশাহী যেতে হবে, ঐ যে রেকিটেকলরের প্রজেক্টের কিছু কাজে। তো সন্ধ্যায় যেহেতু তোর তেমন কোনো কাজ নেই তাই ভাবলাম তুই-ই যা, দু তিনদিন যা সময় লাগে থেকে আয়...."

কম্পিত দেহের ভার নিতে পারে না আবির। বসা থেকে বিদ্যুৎ গতিতে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। তাকে সরানোর পায়তারা বেশ ভালোই হচ্ছে। বাবার মুখের উপর কথা না বলা আবিরটাও আজ মাথা নিচু করে ধীর কন্ঠে জবাব দিলো....

"আমি যেতে পারবো না আব্বু..."

আজমল চৌধুরী ভ্রু কুঁচকায়, কিছুটা বিচলিত কন্ঠে বলে...

"কেন? তোকে তো আমি বেশ পাংচুয়াল ভাবতাম আবির। কাজের প্রতি এত অনিহা হলে আমাদের এত দিনের গড়ে তোলা সাম্রাজ্য সামলাবি কি করে? তুই কি আমার সম্পত্তি জলে ডোবাতে চাইছিস?"

আবিরের উত্তরের আশায় থাকে আজমল চৌধুরী, কিন্তু তার মুখ থেকে একটি কথাও বের হয় না, তবে হঠাৎ এক অপ্রত্যাশিত কাজ করে বসে আবির। ফ্লোরে বসে দু হাতে আজমল চৌধুরীর পা জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। আজমল চৌধুরী সহ উপস্থিত সকলে চমকায়।রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে সবাই, আজমল চৌধুরী ছেলের এহেন কাজে বাঁধা দিতে চেয়ে বলে ওঠে....

"আরে আরেহ, কি করছিস তুই...."

"আব্বু প্লিজ... আমি জানি তুমি আজ আমায় কেন পাঠাতে চাইছো। কিন্তু আমি যেতে পারবো না আজ কিছুতেই। আ্ আমার চড়াইকে চাই আব্বু, আমি কখনোই আহিশের সাথে আমার চড়াইকে দেখতে পারবো না, নেভার। আমি তোমাদের সবার পা ধরতে রাজি আছি , আ্ আমাকে আমার চড়াই দাও। বিয়েটা হতে দিও না, আহিশের সাথে চড়ুইয়ের বিয়ে হলে আমি বাঁচবো না আব্বু, প্লিজ প্লিজ আমায় দয়া করো, দয়া করো না আমায়।আমায় চড়াই পাখিটা দাও। "

"স্বয়ং আবির বিন চৌধুরী এভাবে পায়ে পড়ছে তাও একটা মেয়ের জন্য। "

সাবিহার কটাক্ষ সুর যেন আজ আবিরকে রাগায় না, বরং আরো উতলা হয় ছেলেটা। আজমলের পা আরে গভীর ভাবে জড়িয়ে নিয়ে পাগলের মতো বকতে থাকে সে.....

"দেখো আব্বু, ও্ ওকে আমি ভালে রাখবো, আমার জীবন থাকতে চড়াইয়ের গায়ে একটা আছ ও লাগতে দিবো না আমি৷ আ্ আমি ওকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ সুখ দেবো, তোমরা ওর চোখে কখনো পানি দেখবে না,একবার আমায় ওর দায়িত্বটা দিয়েই দেখো না আব্বু, আমি আমার মাথায় তুলে রাখবো ও মেয়েকে। ও আমার জান, ওকে না পেলে আমার ইহজনমের সকল পূর্ণ বৃথা যাবে, আমার প্রতিটি স্পন্দনে শুধু ওরই নাম, আমি তোমাদের কি করে বোঝাই, আমায় দাও না ওকে, একটুও কষ্ট দেবো না তো, কখনো দেবো না কষ্ট।"

আজমল চৌধুরী নিরেট ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে, সর্বদা হাসিতে মুখরিত থাকা মুখটাও আজ থমথমে, কাঠিন্যে ভরা কন্ঠে উচ্চারণ করলো...

" পা ছাড় আবির।"

" না না, আ্ আমি ছাড়বো না। আ্ আমার নিজেকে খুব অসহায় লাগছে আব্বু একটু বুঝো না তোমরা। আমার মনে হচ্ছে আমার সকল কিছু বৃথা, আমার এতদিনের গড়ে তোলা ব্যক্তিত্ব সব কিছু ফিকে। দেখো না কেমন করে তোমার পায়ে পড়েছি। যেই আমিটা ভুল করেছি জেনেও সরি টুকু পর্যন্ত বলতাম না নিজের ইগোকে ধরে রাখার জন্য, সেই আমি আজ সবার সামনে এভাবে ভিক্ষা চাইছি কাঙালের মতো। আমার প্রতিটা মুহুর্ত বি'ষের মতো কাটছে, আমার ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে, আমি কি করো বোঝাই বলো। আ্ আমি তোমার কাছে আমার শান্তির আমানত হিসেবে ও মেয়েটাকে চাইছি, দয়া করে দাও। তুমি বললে আমি আজই বিয়ে করবো ওকে, কোনো হারাম সম্পর্কে থাকবো না আমি ওর সাথে। বিয়ের আগে একটুও স্পর্শ করবো না সত্যি। তোমরা যা চাইবে সব, সব কিছুতে আমি রাজি, শুধু ওকে দাও। আমার ওকে চাই আব্বু প্লিজ।.... "

হঠাৎ আজমল চৌধুরী ঝঙ্কার দিয়ে চিৎকার করে ওঠে.... পুরোটা ড্রয়িং পিনপতন নীরবতায় ছেয়ে যায়।

"পা ছাড় আবির। ছোটপাখিকে আমি কিছুতেই তোর হাতে তুলে দেবো না। তোর উপস্থিতি ওর জন্য কালো ছায়ার মতো হয়। তুই যতক্ষণ বাড়িতে থাকিস ততক্ষণ আমার ওর জন্য ভয় হয়, কখন যানি পশুর মতো আচরন করিস তুই। আমার মেয়ে, চড়াই একটা ফুল, ও একটা কোমল রত্ন। ওই রত্নটাকে আমি তোর হাতে তুলে দিয়ে ধ্বংসের প্রান্তে ঠেলে দেবো ভাবছিস? জীবনেও নাহ। তুই না থাকলেই বরং ওর জন্য মঙ্গলকর। তুই আর জ্বালাস না আমার মেয়েটাকে, সরে যা ওর জীবন থেকে, ওকে আহিশের সাথে সুখী থাকতে দে আবির।"

আজমলের প্রতিটি কথা যেন বিষবাক্যের মতো বুকে গেঁথে যায় আবিরের। থম মেরে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাবার দিকে। পরিবেশটা শীতল। সকলের মধ্যমনি হয়ে এখনো ফ্লোরেই হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে সেই দাপুটে আবির বিন চৌধুরী। যাকে এই মুহুর্তে দেখলে মনে হবে যেন তার সমস্ত সহায় সম্বল হারিয়ে রাস্তায় নেমেছে সে। ইশশ, কতটা পরিবর্তন.. ওসব লোককথার প্রেম ভালোবাসাকি আদেও মানুষকে এতটা বদলে দেয়?

আবির আর চিৎকার করে না, আর ভিক্ষুকের মতো চড়ুইকে পাওয়ার জন্য আকুল আবেদনও করে না। সে কেঁদেছে একটু আগে, ধীর হস্তে ভঙ্গুর পথিকের নেয় হাতের কব্জিতে চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায়। কারোর দিকে তাকায় না, মধ্যমেয় কদম ফেলে ভেতর ঘরে এগোয়। নাহ নিজের কক্ষে নয়, সে প্রবেশ করেছে গেস্টরুমে, যেখানে বর্তমানে ইরিন খাটের উপী আয়েশ করে বসে কানে ইয়ারফোন গুঁজে গান শুনছে।

দরজা দিয়ে হঠাৎ কোনো পূর্ব বার্তা ছাড়াই এলোমেলো আবিরকে প্রবেশ করতে দেখে চমকে উঠে দাঁড়ায় সে। কান থেকে ইয়ারফোন খুলে রেখে এগিয়ে আসে কিছুটা বিচলিত হয়ে....

"আবির? তুমি হঠাৎ এখানে?"

আবিরের কন্ঠ নিটল, ভাব বোঝার বিন্দু পরিমান উপায় নেই। তবে কন্ঠনালী বেয়ে বের হয়ে আসে তার কথা গুলো....

"তুমি তো আমায় ভালোবাসো তাই না ইরিন?"

ইরিন হতভাগ, আবির হঠাৎ এই কথা বলছে। চমকে, পুলকিত হৃদয়ে অদ্ভুত ভাবেই দ্রুত উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে বলে ওঠে...

"হ্ হ্যা... বাসিতো ভালো। ইউ নো না হাউ মাচ আই লাভ ইউ আবির...."

আবিরের মধ্যে তেমন পরিবর্তন দেখা যায় না। শুধু নিজের ডান হাত এগিয়ে হঠাৎ খপ করে চেপে ধরে ইরিনের হাতের কব্জি....

"তাহলে চলো আমার সাথে। "

" চলো মানে? ক্ কোথায় যাচ্ছি আমরা আবির?"

" কোথায় আবার, কাজি অফিস... "

Mr and Mrs Twins Return গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় টুইন রিলেটেড রোমান্টিক গল্প