ব্যকুলতার এক তীব্র তাড়না যেন আছড়ে পড়ছে কাঠের দরজায় আঘাতের পর আঘাতে। অপেক্ষার বাধন ছিড়ে সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছে প্রতিটি মুহূর্ত। এমনকি কপাট খুলে দেওয়ার সময়টুকুও অসহ্য ঠেকছে যেন।
অবিরত প্রয়াসের শেষে ঘরে ফিরল। তার কিছুক্ষণ পূর্বেই সাবিহা কোনোমতে অস্থির চড়াইকে শান্ত করে খাইয়ে ঘরে পাঠিয়েছে। কিন্তু অন্তঃপুরে বিরাজ করছে এক চাপা অস্থিরতা। নিবিড়ের ফোন আসার পর থেকেই সকলের হৃদয়ে উদ্বেগ দোয়েলের খোঁজ জানতে চেয়েছিল সে। এরপর থেকে দোয়েলের ফোনে অবিরাম কল করা হচ্ছে।কিন্তু ফোন বন্ধ। মেয়েটি এখনও বাড়ি ফেরেনি। এমন অস্বাভাবিক দীর্ঘ অনুপস্থিতি প্রত্যাশিত ছিল না কারোরই, দোয়েল যে এমন হেলাফেলা করার মেয়ে নয়।
তাই দোয়েল এসেছে ভেবেই জুলেখা দ্রুত গতিতে দরজা খুলে দেয় । কিন্তু সেখানে দোয়েলের কোনো চিহ্ন নেই। দ্বারপ্রান্তে দাড়িয়ে আবির, তার দেহ অস্বাভাবিক ভাবে টলছে, চক্ষুযুগল রক্তিমাভায় টকটকে।
সাবিহা এগিয়ে আসে আবিরকে এমন বেহাল দশায় দেখে। আবির তখন এক ক্লান্ত, যেন আঘাতপ্রাপ্ত কণ্ঠস্বরে শুধু উচ্চারণ করে....
"ওয়াইফি কোথায়?"
কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই ভেসে আসে এক বিদঘুটে, উগ্র গন্ধ। সম্মুখস্থ সাবিহা ও জুলেখা নাক কুঁচকে নেয় সেই গন্ধে। সাবিহা কিছুটা হতবাক স্বরে ধমকে প্রশ্ন করে....
"আবির, তুই ড্রিঙ্ক করে এসেছিস?"
আবির প্রশ্নটিকে যেন কর্ণপাতই করল না। স্বরের রেশ আরও চড়িয়ে, অস্বাভাবিক ভাবে টলতে টলতে সে ঘরপ প্রবেশ করে আবার বললো...
"আমার ওয়াইফি কোথায়?"
তার দৃষ্টি নিবদ্ধ দোতলার সেই নির্দিষ্ট কক্ষটির দিকে। পা-দুটিও যেন এক অনিবার্য তাড়নায় সেই দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। আবিরের এমন বেপরোয়া ভঙ্গিতে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাওয়া দেখে সকলের হৃদয়ে এক তীব্র আশঙ্কা জেগে ওঠে । যাওয়ার সময় ছেলেটি যে ভয়াবহ কথাগুলো বলে গিয়েছিলো, এখন যদি তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে? তাহলে যে চড়ুইয়ের সম্মান হানি হবে!
সাবিহা বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে গিয়ে পেছন থেকে আবিরের বা হাতের কব্জি আঁকড়ে ধরল। শঙ্কার্ত কণ্ঠে আবিরকে নিবৃত্ত করার জন্য সে বলল.....
"আবির বাবা, থাম তুই। এভাবে তোকে আমি ছোটপাখির কাছে যেতে দেবো না। তুই স্বাভাবিক নেই।"
আবিরের মুখমণ্ডল চরম বিরক্তি ও ক্রোধে কঠিন হয়ে উঠছে ধিরে ধিরে। সাবিহার হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে সে সজোরে হাত ঝাঁকায়। সাবিহা একা পেরে উঠছে না দেখে আহিশ এবং জিসানও দ্রুত এসে আবিরকে জাপটে ধরে আটকানোর চেষ্টা করল। জিসান বারংবার তাকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে বলতে লাগে....
"আবির ভাই, ভাই শোনো একটু। ছোটপাখির ক্ষতি কোরো না প্লিজ। ও অবুঝ, এই আঘাত মেনে নিতে পারবে না। ভাই, দয়া করে..."
কিন্তু সেই উন্মত্ত মুহূর্তে কে শোনে কার কথা, আবির নিজেকে মুক্ত করতে না পেরে সর্বশক্তি দিয়ে উপরের তলায় কদম ফেলে চলছে। যেন এক আসুরীয় শক্তি তাকে আচ্ছন্ন করেছে, কোনো বাঁধাই সে মানতে চাইছে না....
"আমাকে যেতে হবে চড়াইয়ের কাছে, ছাড়ো।"
বারবার চেষ্টা করেও তাকে থামানো যেন অসম্ভব। চরম রাগে আবির ক্ষিপ্র গতিতে এক ঝাড়া মারতেই সাবিহা, জিসান প্রমুখ দিক-বিদিক ছিটকে পড়তে গিয়েও কোনোমতে নিজেদের সামলে নিল। এক মুহূর্তের সুযোগ পেয়েই আবির টলমলে পায়ে ছুটতে শুরু করে উপর তলায়, লক্ষ্য চড়ুই পাখির কক্ষ।
আবিরকে থামানোর উদ্দেশ্যে কক্ষের বাইরে অপেক্ষমাণ সকলে ত্বরান্বিত পদক্ষেপে তার পিছু করল। ততক্ষণে আবির দরজায় ধাক্কা দিয়ে প্রবেশ করেছে চড়ুই পাখির ঘরে। তখন মুহূর্তটিতে দীর্ঘক্ষণ ধরে লালিত তার অস্থির প্রাণ যেন সহসা এক অস্বাভাবিক প্রশান্তি লাভ করে। ঐ তো চড়াই, সুরক্ষিত, গভীর ঘুমে মগ্ন। টলতে টলতে সে এগিয়ে গেল, পতনোন্মুখ শরীরটাকে সামলে নিয়ে বসলো চড়ুইয়ের শয্যাপার্শ্বে। স্থির, অথচ ঘোলাটে দৃষ্টিতে সে চড়ুইয়ের দিকে তাকায়। ঘুমন্ত মুখটিতে মায়া আর নিষ্পাপতার যে আভা, আবির তার কারণ জানে না।
আবিষ্ট চোখে মেয়েটিকে দেখতে গিয়েই সে লক্ষ্য করে কম্বলের নিচে চড়ুইয়ের বক্ষের কাছে কিছু একটার মৃদু নড়াচড়া। হঠাৎ তীব্র টানে আবির কম্বলটি সামান্য সরিয়ে দেয় চড়ুইয়ের উপর থেকে। যা উন্মোচিত হলো, তাতে তার আপাত শান্ত মন আবারও তীব্র ক্রোধে রগরগে হয়ে উঠল। কপালের পাশে রগগুলো ফুলে নীলচে আকার ধারণ করেছে যেন শিরায় শিরায় রক্ত ফুটছে।
চড়ুইয়ের গায়ে তখন ঢিলেঢালা নাইটস্যুট। গেঞ্জির উপরিভাগের নিচে লিও এর অস্তিত্ব। ছানাটি উষ্ণতার মোহে যেন চড়ুইয়ের স্নিগ্ধ দেহের সঙ্গে মিশে আছে। বাইরে থেকে তার কেবল লেজটিই সামান্য দৃশ্যমান। আবিরের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ ছুরির ফলার মতো লিও'র দিকে স্থির হয়। আকস্মিকভাবেই সে চড়ুইয়ের গেঞ্জির ভেতরে নিজের পেশিবহুল ডান হাতখানা প্রবেশ করায়.
ততক্ষণে নিচ থেকে ছুটে আসা বাকিরা কক্ষের ভেতরে পৌঁছে গেছে। কক্ষের ড্রিম লাইটের ক্ষীণ আলোয় আবিরের এই বিপজ্জনক কাজখানা স্পষ্ট চোখে পড়ল সকলের। সাবিহা এক অনিবার্য দুর্ঘটনার আশঙ্কায় ব্যাকুল চিত্তে আবিরকে বাধা দিতে চাইল। কিন্তু দু-কদম এগোতেই তার পা থেমে যায়। আবির চড়ুইয়ের পবিত্র স্থানে স্পর্শ করার অভিপ্রায়ে হাত বাড়ায়নি, বরং এক ঝটকায় সে লিওকে সম্পূর্ণ টেনে বের করল চড়ুইয়ের পোশাকের ভেতর থেকে।
এরপর যা ঘটল, তা ছিল উপস্থিত সকলের কল্পনার পরিসীমার বাইরে। লিও আবিরের অত্যন্ত আদরের, এই কথাটা সকলেরই জানা। লিও’র গায়ে সামান্য আঁচড়ও যে আবির সহ্য করত না, সেই আবির আজ উন্মাদের মতো লিও’র গলা চেপে বিছানার সঙ্গে চেপে ধরল।
"How dare you lay a finger on my property? Only my touch is permitted on that spot of Choraai. How did you touch there even after the warnings? A place that even I have not yet earned the right to touch? আজ তোকে আমি মে'রেই ফেলবো..."
হিসহিসিয়ে বলা কথাগুলো কর্ণগোচর হতেই সকলের চক্ষু চরম বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে যায়। আবির যেন এক দানবে রূপান্তরিত হয়েছে। আহিশ ঢোক গিলে দুই কদম পিছিয়ে গেল। যেখানে এক অবুঝ প্রাণীকে পর্যন্ত আবির এমন হিংস্রতার সঙ্গে গলা চেপে ধরেছে, সেখানে তাকে তো চড়ুইয়ের কাছে যাওয়ার অপরাধে নির্ঘাত কুপিয়ে মারবে।
কেউ এক কদমও অগ্রসর হওয়ার সাহস পাচ্ছে না, এমনকি আবিরের জননী সাবিহা পর্যন্ত। আবিরের এমন ভয়ংকর রূপ তারা আগে আর কখনো দেখেনি। ভয়াতুর দৃষ্টিতে সাবিহা চেয়ে দেখল ঘুমন্ত চড়ুইয়ের মায়াময় মুখটির দিকে। যেন এক শিশু হরিণী বাঘের থাবায় অবস্থান করছে, আবিরের সঙ্গে তার দূরত্ব মাত্র কয়েক ইঞ্চি। আজ কি তবে এই বালিকাটি আবিরের হিংস্রতার শিকার হবে?
কম্পিত হস্তে সাবিহা পাশে দাঁড়ানো জিসানের বাহুতে ঠেলে দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বলল....
"নি...নিবিড়কে কল দে। ও না এলে আবির আজ অঘটন ঘটিয়ে ফেলবে, ও মে'রে ফেলবে ছোটপাখিকে..."
ওদিকে লিও'র কণ্ঠনালী চেপে ধরায় বাচ্চাটির শ্বাস-প্রশ্বাস যায় যায় অবস্থা। সে আর্তনাদ করছে, চোখগুলো তার বিস্ফারিত। আবিরের হিংস্রতার এই প্রতিচ্ছবি যেন তার আত্মাকেও কাঁপিয়ে দিচ্ছে। আবির যেন আজ লিও’কে শেষ করেই ছাড়বে।
পাশ থেকে এমন তীব্র শব্দের তাড়নায় চড়ুইয়ের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে। মুখ কুঁচকে সে হালকা বিরক্তির স্বর বের করে নড়েচড়ে পাশ ফিরে পুনরায় ঘুমিয়ে পড়ে । এই সামান্য নড়াচড়াতেই আবিরের ধ্যান ফিরে। ঘাড় ঘুরিয়ে চড়ুইয়ের দিকে তাকাতেই সাবিহা দ্রুত হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল। চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো ভয়ে। এই বুঝি মেয়েটির শেষ...
তবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে আবির তেমন কিছুই করল না। লিওকে হুট করে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে দ্রুত ঘুরে বসলো চড়ুইয়ের দিকে। চড়ুইয়ের গেঞ্জিটি এক হাতে টেনে ঠিক করে দিয়ে আবার সযত্নে কম্বল টেনে ঢেকে দিল তার গলা পর্যন্ত। তারপর হঠাৎই চড়ুইয়ের বুকের উপর মাথা রাখল সে। বিড়বিড় করে নানা রকম কথা বলতে লাগল....
"এখানে শুধু আমার জায়গা, আর কারো না। আর কাউকে ছুঁতে দেবো না তোমায় চড়াই। তুমি শুধু আমার। সম্পূর্ণ আমার। ওরা কেন ছুঁবে তোমায়, হ্যাঁ? কেন? দেবো না, দেবো না... একদম মেরে ফেলব তোমায় ছুঁতে এলে, একদম মেরে ফেলব।"
ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছে আবির। এক হাত উঁচু করে চড়ুইয়ের সিল্কি চুলে ঘন ঘন হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সে, অপর হাতটি চড়ুইয়ের কম্বল চেপে ধরে আছে। ছেলেটির এমন অবস্থা দেখে সাবিহার চোখ শীতল হয়। বুকের ভেতর তীব্র আশঙ্কা যেন কিছুটা কমতে শুরু করল। যা ভেবেছিলেন তা নয়, আবির চড়ুইয়ের ক্ষতি নয়, বরং এই মাতাল অবস্থাতেও তাকে সযত্নে আগলে রাখছে, অধিকারবোধের তীব্রতায়। ছেলেটাকি তবে সত্যিই ভালোবাসায় ফেঁসে গেলো?
ধীরে ধীরে আবিরের আওয়াজ মিলিয়ে যায়, চোখ দুটোও বন্ধ হয়ে আসে, ঘুমিয়ে পড়ছে উন্মাদ ছেলেটা, যেন মাত্রই সে নিজের একমাত্র ভরসা,আরামের স্থান খুঁজে পেয়েছে। আশপাশের এতগুলো মানুষকে তোয়াক্কা না করেই নরম ভাবে শুধু মাথাটা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে চড়ুইয়ের বুকে। যেখান থেকে স্পষ্ট শুনতে পায় সে একটি হৃদয়ের ছন্দিত স্পন্দন। আবিরের একমাত্র প্রশান্তির সুর।
সাবিহা হাফ নিশ্বাস ফেলে বলে...
"ওকে এখন এখান থেকে নিয়ে যাওয়াটা সম্ভব হবে না। তোরা বরং যা,নিবিড় আর বড়পাখির খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা কর,কখন ফিরে কে জানে। আমি এখানেই আছি। "
-----------
"লাশ তিনতলায় আছে"
শোকার্ত কথার রেশে পরিবেশ থমথমে। এই যে সুস্বাস্থ্যের যুবক নিবিড়, তার প্রশস্ত বক্ষের বাম পাশে আজ কেবলই এক শূন্যতার হাহাকার। প্রতিটি স্পন্দন যেন দোয়েলের অনুপস্থিতির সাক্ষ্য দিচ্ছে। তার পৃথিবী থমকে গেছে সেখানেই। হৃদয় কোনোভাবেই মানতে রাজি নয় যে দোয়েল এখন আর নেই।
ক্ষীণ এক আশার মরিচিকা তাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। সে বিশ্বাস করতে নারাজ সবটা। মেয়েটা এভাবে চিরতরে মিলিয়ে যেতে পারে না। সেই অবিশ্বাসের ভারে বা হাতে বুক আঁকড়ে ধরে সে এলোমেলো পায়ে সিঁড়ির দিকে ধীর গতিতে এগোয়। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক একটি বোঝা।
সিঁড়ি বেয়ে প্রথম ধাপে ওঠার সময় অসহনীয় যন্ত্রণায় চোখ দুটি শক্তভাবে মুদে আসে। নিবিড় কখনো সহজে টলতো, না আজ সে বেদনায় কম্পমান।
ঠিক সেই মুহূর্তে উপরের সিঁড়ি থেকে পায়ের কাছে যেন কিছু একটা গড়িয়ে এলো। যন্ত্রণার কুয়াশা সরে যেতেই নিবিড়ের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়। সে কি তবে বিভ্রম দেখছে? না, ভুল নয়। এই তো তার এটম। তার দোয়েল পাখি।
নিবিড়ের মুখাবয়বে এক চমকপ্রদ হাসি ফুটে উঠল, যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান ধন খুঁজে পেয়েছে। বুক থেকে তার হাত দ্রুত নেমে এলো। সে নত হয়ে এক ঝটকায় দোয়েলকে জাপটে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠল। স্থান বা কাল কোনো কিছুই তার চৈতন্যে রইল না যেন। প্রবল হাহাকার করে সে তার এই দুঃপ্রাপ্য অস্তিত্বটিকে আঁকড়ে ধরে রইলো নিমিষে....
"আমি জানতাম, আমি জানতাম তোমার কিচ্ছু হয়নি। এত সহজে সব শেষ হতে পারে না। আমার দুনিয়া, আমার মন চুরি করে তুমি এভাবে পালিয়ে যেতে পারো না, পাখি। কিচ্ছু হয়নি তোমার। আল্লাহ আমার সঙ্গে এতটাও খারাপ করেননি..."
দোয়েল জীবিত , কিন্তু তার অবস্থা সংকটাপন্ন। মেয়েটির সারা অঙ্গে রক্তের চিহ্ন, চুল এলোমেলো। জামার ওড়নাটি কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে। অস্থিরভাবে টলছে আর হাঁপাচ্ছে মেয়েটা। নিজের অজান্তেই নিবিড়ের বাহু জাপটে খামচে ধরল। তার কণ্ঠস্বর ক্ষীণ প্রায় নুইয়ে পড়া...
"ব্ বাইরে যাবো, আর প্ পারছি না..."
নিবিড় নিমেষেই নিজের বুকের তীব্র ব্যথাটি ভুলে গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে সে দোয়েলের নেতিয়ে পড়া মুখের দিকে তাকাল।এমন অবস্থা দেখে কণ্ঠে দ্রুত উদ্বেগ নিয়ে বলে উঠলো...
"কী হলো এটম? এমন করছো কেন?"
"ফ্ ফিনাইলের গন্ধ, অ্ অসহ্য..."
নিবিড়ের মনে পড়ে পাখিদের ফোবিয়ার কথা। অনুমান করলো সেই তীব্র গন্ধের কারণেই হয়তো মাথা ঘুরে সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছে দোয়েল। নিবিড় আর দেরি করে না। শক্ত হাতে পাঁজা কোলে তুলে নিলো মেয়েটিকে, নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে। তারপর দ্রুত কদমে সে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গিয়ে দোয়েলকে গাড়িতে বসিয়ে দেয় সে। তার নিজের হৃদস্পন্দন তখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। দোয়েল এলিয়ে পড়ে মাথা রাখল ঠিক সেই বক্ষে, যেখানে কিছুক্ষণ আগেও যন্ত্রণার ঘূর্ণিপাক চলছিল। নিবিড় এক হাতে দোয়েলের মাথা ধরে আলতো চেপে ধরে আরেকটু নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় একটু স্বস্তির উদ্দেশ্যে। মেয়েটাকে শান্ত করার প্রয়াশ,চালায়.....
"রিল্যাক্স, এটম। শান্ত হও এবার একটু। কিছু হয়নি।"
দোয়েল ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে, আবিষ্ট ভঙ্গিতে আকড়ে ধরতে চাইছে নিবিড়কে। নিবিড়ও যেন ভীষণ ভাবে দু:প্রাপ্য কিছু পেয়েছে মাত্রই। দু হাতের আজলে মেয়েটাকে আগলে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল.....
"আমি তোমায় হারাতে পারবো না এটম। আমি ম'রে যাবো।"
দোয়েল শান্ত হচ্ছে ধীরে ধীরে, কিন্তু তার শরীর মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে। নিবিড়ের বুকের শার্ট ভিজে উঠল তার উষ্ণ অশ্রুতে। কম্পিত মস্তিষ্কে নিবিড় দু হাতে মেয়েটির মুখটি তুলে ধরল বুক থেকে। তার কণ্ঠে স্পষ্ট উদ্বেগ....
"কাঁদছো কেন? কী হলো?"
আর্তনাদের মতো উত্তর এলো দোয়েলের থেকে.....
"আমি বাঁচাতে পারলাম না ওকে। পারলাম না..."
নিবিড়ের ভ্রু কুঁচকে আসে। সে দোয়েলকে আরেকটু চেপে ধরে, জিজ্ঞেস করল.....
"তুমি এখানে এলে কী করে, এটম? তোমার এই অবস্থা কেন? আর... ওরা যে রাস্তার ধারে এক্সিডেন্টের কথা বলছিল?"
"এ-একটা বাচ্চা... আমার চোখের সামনে ট্রাক এসে ওকে পিষে দিলো, নিবিড়। আ-আমি কিচ্ছু করতে পারলাম না, কিচ্ছু না..."
দোয়েল আবার কান্নায় ভেঙে পড়ছে। নিবিড় তাকে দু হাতে আরও শক্ত করে বুকের কাছে টেনে নিল। তার বুক তখনও প্রবলভাবে কাঁপছে। এই কয়েকটি মুহূর্তই তাকে শিখিয়ে দিল, এই মেয়েটিকে ছাড়া তার জীবন কতটা অচল।
"আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম এটম। এই প্রথমবার আমি এতটা কেঁদেছি। আমি তোমাকে হারাতে পারবো না। আই রিয়োলি লাভ ইউ, পাখি। আর কষ্ট দেবো না তোমায়। মাফ করে দাও আমায়, তুমি..."
বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা, দুজনের শ্বাস প্রশ্বাস ছাড়া আর অপার্থিব কোনো শব্দ যেন কানে লাগে না নিবিড়ের। দোয়েল কিছুটা শান্ত হয়েছে। হঠাৎ দোয়েল ছটপট করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চায় নিবিড়ের শক্তপোক্ত বাহুডোর থেকে৷ নিবিড় ছাড়তে চায়না, করুন কন্ঠে অনুরোধের সুরে বলে ওঠে...
"প্লিজ স্টে হিয়ার, আমার ভেতরটা প্রচন্ড ব্যথায় জর্জরিত, আমায় একটু প্রশান্তি দাও। "
দোয়েলের বুকটা হুহু করে ওঠে। এই লোকটাকে সে কতটা ভালোবেসেছে তা যদি সে জানতো, মনে পড়ে যায় সেদিন রাতের সেই কথা গুলো, নিবিড়ের বলা প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ আরো একবার যেন চূর্ণ করে দিতে থাকে মেয়েটার মন। দু হাতে ঠেলে ছাড়িয়ে নেয় নিজেকে, গাড়ি থেকে নামার প্রয়াশ চালিয়ে বললো....
"সরুন, আ্ আমি নামবো। "
নিবিড় দোয়েলকে আটকানোর চেষ্টায় তার বাহু ধরতেই দোয়েল এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নেয় তাকে। চোখে আগুনের লেলিহান ঝড়ে যেন তার। তীব্র জোড়ালো কন্ঠে তর্জনী তুলে নিবিড়কে বলে...
"আপনি আমায় ছুবেন না একদম।"
দোয়েলের রাগ সম্পর্কে অবগত নিবিড়। মেয়েটাকে আজ যে করেই হোক নিজের মনের কথা ক্লিয়ার করে বলতে হবে.....
"এটম, এটম প্লিজ ফরগিভ মি। মুনিয়ার সাথে আমার কিচ্ছু নেই, সবটা নাটক ছিলো, আমি শুধু তোমার মুখ থেকে একটিবার ভালোবাসি শব্দটা শুনতে চেয়েছি। আমি সত্যিই তোমায় ভালোবাসি শুধু।... "
দোয়েল ত্রস্ত ভঙ্গিতে দু হাত জোড় করে তুলে ধরে নিবিড়ের সামনে, দৃঢ় কন্ঠে বলে....
"আর নাহ, আমি আর কোনো জটিলতায় পড়তে চাই না প্লিজ। আপনার সাথে আমার যায় না, আমি ব্যাগডেটেড, মুনিয়া যথেষ্ট স্মার্ট, সুন্দর, দারুন ফিগার। আপনার সাথে ওকেই মানাবে। আমি পাপ করেছি, আপনার মতো উচ্চ বংশীয় লোককে ভালোবাসার মতো পাপ করেছি। আপনাদের বাড়ির আশ্রিতা হয়েছি, কিন্তু আর নাহ। আ্ আমি আমার মতো কাউকে খুঁজে নেবো প্লিজ। আর কারোর প্রয়োজন নেই আমার, না আপনার আমার বিয়েটা হবে, আর না আমার বোনকে আপনাদের বাড়িতে বউ হতে দেবো আমি। অনুভুতি গাঢ় হওয়ার আগেই আমি সরিয়ে আনবো ওকে, আমার মতো কষ্ট আমি পেতে দেবো না। আপনি প্লিজ আমার সাথে আর কথা বলবেন না, আপনাদে দেখলে আমার বুকের ভেতরটা চুরমার হয়ে যায়, আপনি বুঝেন না। আপনি বুঝবেনও না আমায়। আমার কাছে আর আসবেন না প্লিজ...আপনার জীবনে আসার জন্য মাফ চাই আমি। গোলাকার পৃথিবী চতুর্থাকার ধারণ করলেও আমি আর ফিরবো না আপনার দারপ্রান্তে। "