Mr and Mrs Twins Return

পর্ব - ৪৩

🟢

আজমল চৌধুরীর বাসভবন আজ এক শৈল্পিক ঔজ্জ্বল্যে মোড়া। আলোকসজ্জায় আয়োজিত এনগেজমেন্ট থিমটি রয়্যাল ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট উইথ গোল্ড অ্যাকসেন্ট ড্রয়িং স্পেসের প্রতিটি কোণে যেন এক ক্লাসি ভাইব ছড়িয়ে দিয়েছে। আজ কোনো বহিরাগতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি তবে পারিবারিক আত্মজনের সমাগমে উষ্ণ হয়ে আছে পরিবেশ। সন্ধ্যের এই আপাত-সাধারণ পারিবারিক অনুষ্ঠানে, মৃদু আলোর সাথে মিশেছে স্লো মিউজিকে ভেসে আসা রোমান্টিক সুরের লহরী।

উপস্থিত সকলের মধ্যেই এক আভিজাত্যের ছাপ। কনে ছাড়া পরিবারের সকল মহিলা, বড়রা পরিপাটি গোল্ডেন শাড়িতে এবং ছোটরা একই রঙের গর্জিয়াস গাউনে সজ্জিত। পুরুষরাও সেই রাজকীয় মেজাজ ধরে রেখেছেন, প্রত্যেকেই পরেছেন ক্লাসি ব্ল্যাক স্যুট। সকলের চোখ আজ সেই দুই নবীন জুটির দিকে, যাদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে, বাড়ির মূল সিঁড়ির উপর দৃষ্টি স্থির হলো সকলের। ম্যানলি স্টাইলে নেমে এলেন আবির এবং নিবিড়। দু'জনেরই পরনে ক্লাসি ব্ল্যাক-হোয়াইট ম্যাচিং স্যুট, জেল দিয়ে সেট করা চুলগুলো পুরুষালি ভঙ্গিমায় কপাল থেকে ব্যাকব্রাশ করা। কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রাখা শার্টের হাতা ভেদ করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাঁদের সুঠাম বাহুর শিরাগুলো , যা দুই সুদর্শন পুরুষের রাজকীয় গরিমাকে আরও দৃঢ়ভাবে জানান দিচ্ছে।

আবির আর নিবিড়কে একই রকম পোশাকে দেখেই আজমলের পরিবারের সদস্যরা একে অপরের দিকে আড়চোখে চাইলেন। লক্ষ্য করলেন, আবিরের মুখে বিন্দুমাত্র বিষণ্ণতা বা কষ্টের ছাপ নেই। বরং এক সাবলীল, অপ্রতুল ভঙ্গিমায় তারা নিচে এসে দাঁড়াতেই, জিসান দ্রুত হাতে ক্যামেরায় দু'ভাইয়ের কয়েকটি ক্যান্ডিড মুহূর্তের ছবি তুলে নিলেন।

অল্প দ্বিধা নিয়ে সাবিহা এগিয়ে এলেন। বিস্মিত কণ্ঠে, প্রায় ফিসফিস করে আবিরকে জিজ্ঞেস করলেন...

"তোর গায়ে আহিশের স্যুট কেন? এটা তো শুধু বরদের জন্য আনা হয়েছিল। আহিশ কোথায়?"

আবির একটি পেশাদার ভঙ্গিতে নিজের সুগঠিত হাতটি উঁচিয়ে চুলে ব্যাকব্রাশ করে নিলো। তার কণ্ঠে ছিল এক ধরনের নিরাসক্তি ও সাবলীলতা...

"আহিশের গায়ে এটা লুজ হচ্ছিল, আর আমার জন্য আনা স্যুটটা আমার গায়ে টাইট হচ্ছিল। তাই এক্সচেঞ্জ করে পড়েছি, দ্যাটস ইট।"

হৃদও এগিয়ে এসে কপালে চিন্তার ভাঁজ রেখে বলে...

"সাইজ গড়মিল হলো কি করে? আমি, আহিশ, আমরা সবাই মিলে তো মেপেই নিয়েছিলাম সবার জন্য।"

আবির ভাবলেশহীনভাবে উত্তর দেয়...

"সেটা আমি কিভাবে জানবো?"

সাবিহার মনে সন্দেহ দানা বাধল, নিশ্চয়ই আবির কিছু একটা মতলব আঁটছে, কিন্তু কী? চোখ সরু করে তিনি ডেকে উঠলেন....

"আবিররর?"

আবিরও একদম সুচারু ও আত্মবিশ্বাসী স্বরে উত্তর দিলেন....

"ওয়াট? এভাবে তাকাচ্ছো কেন? আমি তো শপিংয়ে যাইনি, তোমরাই সব করেছো।"

সাবিহা আর কিছু বলতে পারলেন না। গলা নামিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করলেন:

"আহিশ কোথায়?"

আবির ধুরন্ধর হাসে মাথা সামান্য নুইয়ে। সেই হাসির অর্থ কেউ বুঝতে পারে না। তারপর ধীরে-সুস্থে একটু সরে দাঁড়ায় সে। আবিরের পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলো আহিশ। সাবিহা যখন আহিশের দিকে তাকায়, দেখতে পায় তার মুখের উৎফুল্লতা যেন কোনো এক অজানা কারণে কমে গেছে। একটু আগেই তো ঠিক ছিলো, ড্রেস চেঞ্জ করতে গিয়ে এই দশ মিনিটে কী এমন হয়ে গেল?

এই বিশেষ মুহূর্তে আর এসব নিয়ে ঘাটতে চাইলো না সাবিহা। কাউকেই কোনো প্রশ্ন না করে, চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগলো পাখিদের জন্য।

কিছুক্ষণের মধ্যেই জেসি আর তারার হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো দুই পাখি, দোয়েল ও চড়ুই।

দুই কনেকে দেখেই আজমল, আসমত এবং সাবিহার মুখ থেকে একই সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে এলো...

"মাশাল্লাহ!"

শব্দটি কর্ণ কুহর হতেই আবির ও নিবিড় পেছন ফিরে তাকায়। চড়ুই নিজের মুখের হাসি আরেকটু চওড়া করে লেহেঙ্গার নিচের অংশ দু'হাতে তুলে ধরে কদম বাড়ালো আজমল আর সাবিহার দিকে। সামনে এসেই নিজেকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানোর ভঙ্গিতে, একরাশ উৎফুল্লতার সহিত জিজ্ঞেস করলো..

"আম্মু, আব্বু কেমন লাগছে আমায়?"

চড়ুইকে দু'হাতে উষ্ণ আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে সাবিহা। আবেগে তাঁর কণ্ঠস্বর তখন উৎফুল্ল, যেন বহুদিনের লালিত স্বপ্ন আজ পূর্ণ হতে চলেছে...

"মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ! আমার দুই দুইটা হুর! আল্লাহ আমায় এতো লক্ষ্মী দুটো মেয়ে দিয়েছেন! আম্মুরে, তোদের অপরূপ লাগছে মা। কারোর যেন নজর না লাগে আমার দুটো ফুলের ওপর..."

বলতে বলতেই তিনি চোখ থেকে আলতো করে কাজল নিয়ে চড়ুইয়ের কানের পেছনে একটি টিকা পরিয়ে দেয়। তারপর হাত বাড়িয়ে ডাকে দোয়েলকে...

"কিরে? আয় এদিকে?"

চড়ুই মিচকে হেসে বললো...

"আম্মু, বোন লজ্জা পাচ্ছে দেখো।"

দোয়েল আলতো হেসে এগিয়ে এলে সাবিহা তার কানের পেছনেও কাজলের টিকা পরিয়ে দিলেন। ধীরে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বুকে টেনে নিয়ে আদুরে স্বরে বললেন..

"আমার মা... আমি আজ খুব খুশি রে আম্মু। তোরা আমার ঘরের লক্ষ্মী হয়ে আসবি—আমার কতগুলো বছরের চাওয়া রে মা! খুব আনন্দ হচ্ছে আজ, খুব..."

দোয়েল আলতো দু'হাতে সাবিহাকে জড়িয়ে ধরলো। মেয়েটার বুকের গভীরে তখন যে ঝড় বইছে, তা প্রকাশ করার মতো নয়। এই বিশেষ দিনটির আপাত সৌন্দর্য রক্ষার জন্য সে ঠিক কতটা পাপের পথ পেরিয়েছে, তা কখনোই কাউকে বলা সম্ভব না। বুক ভার হয়ে এলো তার। সাবিহার বুকে মুখ গুঁজে অজান্তেই চোখ ছাপিয়ে জল গড়িয়ে এলো। ফিসফিস করে বললো..

"আ... আম্মু, আমি শাশুড়ি চাই না, আমার আম্মু লাগবে।"

সাবিহা অবাক হলেন। মেয়েটা কাঁদছে? বুক থেকে আলতো করে তুলে তার চোখের দিকে তাকায় তিনি। বিস্মিত কণ্ঠে বললেন..

"এই মেয়ে কাঁদছিস কেন তুই? আজকের দিনে কাঁদতে হয় পাগল মেয়ে? আর আমি তোর আম্মুই তো! ভয় পাচ্ছিস কেন?"

সাবিহা আলতো করে দোয়েলের চোখের জল মুছে দিলেন।

হঠাৎ কাঁধে কারো স্পর্শ পেতেই পাশ ফিরে তাকালো দোয়েল। নিবিড়ের হাস্যোজ্জ্বল মুখটি দেখে সে ইতস্তত হয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ালো। নিবিড়ের হাত কাঁধ থেকে উঠে মাথার একপাশে স্থান নেয়। ধীরে দোয়েলের মাথাটা নিজের বুকের পাশে চেপে ধরে মুখ নামিয়ে তার চুলের ভাঁজে গভীর চুমু খেয়ে লো ভয়েজে শুধু বললো..

"মায়াবী লাগছে..."

দোয়েল লজ্জায় যেন নুইয়ে যায়। লোকটি তার প্রশংসা করেছে! এভাবে আগলে ধরেছে! এতটুকুতেই যে দোয়েলের চিত্তে এক বিরল প্রশান্তির হাওয়া বইছে, সেই গভীর অনুভূতি কি লোকটি বুঝতে পারছে?

চড়ুই ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো তার চাচা অনুজ রাহমানকে। লোকটির মুখেও হাসি। এই অভাগা মেয়ে দুটি যে অবশেষে সুখের মুখ দেখতে চলেছে, তাতেই তিনি আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া জানালেন।

সকলের সাথে কুশল বিনিময়ের পর্ব শেষ হতেই শুরু হলো প্রতীক্ষিত রিং সেরেমনি।

সকলের মধ্যমণি হয়ে দাঁড়ালো দুই জুটি। নিবিড়–দোয়েল এবং আহিশ–চড়ুই। একটি সিরামিকের ট্রেতে ফুলের পাপড়ির মাঝে দুটো আংটির বাক্স নিয়ে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সাবিহা, আয়েশা সহ বাকিরা।

সাবিহা প্রথমে নিবিড়ের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বললো...

"নিবিড় বাবা? আংটি পরিয়ে দে বড়পাখির আঙুলে..."

নিবিড়ের মুখে সেই চিরচেনা চমৎকার হাসি। দোয়েলের এতটুকুতেই শান্তি যে লোকটি তাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন না, মুনিয়ার কথা ভাবছেন না, কোনো প্রকার সংকোচও দেখাচ্ছেন না। দোয়েলের অটুট বিশ্বাস, নিবিড় তাকেই ভালোবাসে—শুধু তাকেই।

বক্স থেকে চকচক করতে থাকা আংটিটি তুলে নিলো নিবিড়। এক আবেশিত নয়নে দোয়েলের দিকে তাকিয়ে সে নিজের বাঁ হাতটি বাড়িয়ে দেয় । দোয়েলের মনে অনুভূতিরা তখন প্রবল ভাবে দোলা দিচ্ছে। অজানা এক প্রাপ্তির সুখে তার সারা শরীরে যেন এক শীতল হাওয়া বইছে। গলা শুকিয়ে কাঠ।

উপস্থিত সকলে বারবার তাকে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে নিবিড়ের হাতে হাত রাখতে বলছে। কিন্তু মেয়েটা যেন সুখের প্রলেপে ভেসে গিয়ে কূল হারিয়েছে। একদিকে ভয়, অন্যদিকে নতুন কিছু পাওয়ার এক তীব্র জড়তা নিয়ে সে হাত তুলতে পারছিল না। পাশ থেকে চড়ুই চঞ্চল হাতে তালি দিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে নিজের বোনকে চিয়ার আপ করছিল। বোনটিও যে আজ ভিষণ খুশি, তা তার আচরণেই স্পষ্ট।

দোয়েলের শ্বাস ঘন হলো। কম্পমান বাঁ হাতটি একটু তুলতেই আর বেশি কষ্ট করতে হলো না তাকে। তার মন-আঙিনায় ফুল ফোটানো পুরুষটি নিজেই উদ্যোগ নিয়ে দোয়েলের হাত তুলে নিলেন নিজ হস্তে। ঠোঁটের কোনের হাসিখানা আরেকটু প্রসারিত করে দোয়েলের অনামিকা আঙুলে পরিয়ে দিলো সেই রাজকীয়, নান্দনিক কারুকার্যের বিশেষ আংটিটি।

মুহূর্তেই চারদিকে হাততালির জোয়ার বইল।

এবার সকলে উচ্ছাসিত হয়ে দোয়েলের দিকে তাকালো। তাকে বলা হলে, সেও কম্পিত হাতে আংটি তুলে নিল। তার সেই কাঁপা হাতেই নিবিড়ের আঙুলে পরিয়ে দিল সেই বিশেষ রিংটি। মুহূর্তেই আবার হাততালির উষ্ণ ঢেউ আছড়ে পড়ল ড্রয়িং স্পেস জুড়ে।

এরপরের পালা—আহিশ ও চড়ুই।

আবির নীরবে, তার সেই সূক্ষ্ম, স্থির দৃষ্টিতে চারপাশ দেখতে দেখতে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো ঠিক আহিশের পাশাপাশি। চড়ুই পাখি তখন আনন্দের উচ্ছ্বাসে হাসছে। সে হালকা লাফাচ্ছে, আর বারে বারে দু'হাতে তালি বাজাচ্ছে। তার হাতের চুড়ির রিনঝিন আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠেছে চারপাশ, যা সকলের কানে এক মিষ্টি সুরের মতো বাজছে। চড়ুইয়ের এমন প্রাণখোলা আনন্দ দেখে সকলে এক প্রশান্তির হাসি হাসলো।

আহিশ আর চড়ুইকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হতেই চড়ুই ডান হাত তুলে, প্রায় লাফিয়ে উঠে বললো...

"এই, এই! আমি আগে রিং পরাবো আহিশকে, লেডিস ফার্স্ট!"

তার এই বালিকা সুলভ আবদারে সকলে হেসে দেয়। আজমল চৌধুরী এগিয়ে এলেন, স্নেহমাখা কণ্ঠে বললেন...

"ঠিক আছে আম্মু, তুই-ই আগে পরা।"

এই মুহূর্তে সাবিহা সহ মোটামুটি সকলের দৃষ্টি আবিরের দিকে নিবদ্ধ হলো। তাদের ধারণা ছিল, এই পরিস্থিতিতে তার রাগে মুখ লাল হয়ে থাকবে, কিন্তু আবির মোটেও সেভাবে নেই। সে একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আহিশের পাশে দাঁড়িয়ে। যেন ছোট ভাইয়ের এনগেজমেন্টের প্রতিটি মুহূর্ত সে দারুনভাবে উপভোগ করছে। চড়ুইয়ের এমন তীব্র উচ্ছ্বাস দেখে সে শুধু নীরবে একটি বেকার হাসি হাসলো। সেই হাসিতে কোনো ক্লেশ ছিল না, ছিল এক শীতল প্রশ্রয়।

চড়ুইকে বলার প্রয়োজন হলো না। সে নিজেই দ্রুত হাতে বাক্স থেকে পুরুষের আংটিটি তুলে নিল এবং আহিশকে উদ্দেশ্য করে তার নিজস্ব চঞ্চলতায় বললো...

"এই আহিশসার বাচ্চা, হাত দে তাড়াতাড়ি।"

সকলে হাসিমুখে আহিশের দিকে তাকালো। আবিরও কেবল মুখের ভেতরে জিভ ঘুরিয়ে এক গুপ্ত হাসির আভাস দেয়। আহিশের কোনো পরিবর্তন দেখতে না পেয়ে আবির এবার একটু গুরুতর হওয়ার ভান করে জোর দিয়ে বললো..

"কিরে আহিশ... হাত বাড়িয়ে দে? ওয়াইফি ওয়েট করছে তো তোকে আংটি পরানোর জন্য।"

আহিশ করুণ চোখে একবার মুখ তুলে নিজের চেয়ে দীর্ঘদেহী আবিরের দিকে তাকালো। এরপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে সবার দিকে একবার তাকিয়ে অত্যন্ত মন্থর গতিতে নিজের বাঁ হাতখানা তুলে ধরলো।

মুহূর্তেই সকলের মুখভঙ্গি যেন আতঙ্কিত বিস্ময়ে পাল্টে গেল। চড়ুই তো ভয়ে প্রায় লাফিয়ে এক কদম পিছিয়ে চিৎকার করে উঠলো....

"ও আল্লাহ! এটা কী..."

আহিশের তখন কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা। সে স্বপ্নেও ভাবেনি যে নিছক একটি নাটক করতে গিয়ে এভাবে মা'রাটা খাবে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুঠামদেহী চাচাতো ভাই নামক জন্তুটিকে সে মনে মনে তখন 'কিলার আবির' নামেই আখ্যা দিচ্ছে।

সকলে চিন্তিত হয়ে আহিশের হাতখানা ধরে দেখছে। ছেলেটির বাঁ হাত অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যেন কলাগাছ হয়ে আছে। প্রতিটি আঙুল কদলী কলার মতো মোটা হয়ে গেছে। পোড়া হাতের তালুতে যত্নসহকারে কোনো বার্নিং অয়েন্টমেন্ট-এর প্রলেপও দেওয়া হয়েছে।

আয়েশা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো...

"এমন অবস্থা কী করে হলো আহিশ? একটু আগেও তো ঠিক ছিল।"

সকলে আহিশকে কারণ বলার জন্য চাপ দিতে লাগলো। আবিরও এবার টিপ্পনি কেটে বললো...

"কিরে, বল? এমন অবস্থা কী করে হলো?"

আহিশ গোমড়া মুখে একবার আবিরের দিকে তাকিয়ে মুখ নামিয়ে বললো...

"হেক্সিসেল লাগানো ছিল... ভুলে আগুন লেগে পুড়ে গেছে।"

সকলেই এই আকস্মিক দুর্ঘটনা দেখে চিন্তিত হয়, তবে একজন ছাড়া। সাবিহা আহিশকে ছেড়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আবিরের ওপর চোখ রাখলেন। তিনি নিশ্চিত যে এই ঘটনার নেপথ্যে আবিরের নীরব কারসাজি রয়েছে।

"আচ্ছা, তাহলে ডান হাত দে। ও হাতেই রিং পরাক।"

সাবিহা একটি দ্রুত সমাধান দেয় যেন।সাবিহার এই কথায় আবিরও সহমত জানিয়ে আহিশকে বললো...

"হ্যা হ্যা, ডান হাত দে।

আহিশ করুণ মুখে এবার তার ডান হাতটিও সামনে আনলো। সকলে দেখলেন, এই হাতেও ঠিক একই অবস্থা।আঙুলগুলো ফুলে একই রকম অস্বাভাবিক।

আবির এবার অত্যন্ত সহানুভূতি ও করুণার ভান করে বললো...

"ইশশ! দুটো হাতই তো পুড়ে ফুলে গেলো। এই ফোলা আঙুলে তো ভুলেও এইটুকুন রিং ঢুকবে না।"

চড়ুই ঠোঁট উল্টে হতাশ কণ্ঠে বললো...

"এবার আমি রিং পরাবো কাকে?"

পরক্ষণেই আহিশের দিকে তেড়ে গিয়ে, কণ্ঠে এক হিংস্রতা এনে বললো...

"জাউরা! তুই অন্য কোনো দিন আর হাত পোড়াতে পারলি না!"

তাকে সামনে থেকে থামিয়ে ধরলো আবির..

"এই, এই চড়ুই! রিল্যাক্স। কী করছো? সবাই দেখছে তো।"

চড়ুই মুখ গোমড়া করে আবিরের দিকে তাকালো। মেয়েটার বাচ্চাসুলভ মনটা যেন এই অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ে মুহূর্তে কালো মেঘে ঢেকে গেল। তার চোখে-মুখে তখন গভীর অভিমানের ছাপ।

আবির যেন এই মুহূর্তটির জন্যই মঞ্চ প্রস্তুত করে রেখেছে। তার ঠোঁটে এক রহস্যময়, বাঁকা হাসি। কণ্ঠস্বরে আলতো এক কর্তৃত্ব...

"ঠিক আছে চড়ুই। আমি তোমার ইচ্ছে পূরণ করছি। তুমি বরং এখন আমায় আংটিটা পরিয়ে দাও। আহিশের হাত ভালো হয়ে গেলে আমি ওকে ফিরিয়ে দেবো। দাও, দাও..."

কারো কোনো ধরনের মতামত বা প্রতিবাদ শোনার অপেক্ষাই করলো না সে। দ্রুত হাতে, প্রায় এক প্রকার ছিনিয়ে নেওয়ার ভঙ্গিতে, চড়ুইয়ের হাত থেকে পুরুষের আংটিটি টেনে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে নিজের বাঁ হাতের অনামিকা আঙুলে পরিয়ে দিলো।

সাবিহা বলতে নে...

"আবির, এটা তুই..."

আবির তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বললো...

"আম্মু, দেখো চড়ুই কেঁদে দেবে। ওর খুশিটাই তো আসল, তাই না? তুমিও তো চাও ও খুশি হোক।"

সাবিহা সম্পূর্ণরূপে হতবিহ্বল হয়ে গেলেন। তিনি কল্পনাও করতে পারেননি যে তার এই শান্ত ছেলেটি এতক্ষণ ধরে এই ধুরন্ধর চাল চেলে বসে আছে! সকলে যখন ভাবছিল আবির কেন রাগ করছে না, তখন আবির যে আগে থেকেই তার প্রতিশোধের ছক সাজিয়ে রেখেছে, তা কেউ টের পায়নি।

আবির এবার নিজের মতো করেই বক্স থেকে কনের আংটিটা তুলে নিয়ে আহিশের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো...

"নে, নিজের বাগদত্তাকে রিং পরিয়ে দে।"

আহিশ করুণ চোখে মুখ তুলে তাকালো। তার মুখমণ্ডলে তখন অসহায়ত্বের চূড়ান্ত অভিব্যক্তি। আবির পরিস্থিতি বুঝে নিজেই সমাধান দিলো...

"ওহ, তুই আংটিটা ছুঁতেও পারবি না? খুব জ্বালা করছে না রে ভাই? আচ্ছা, চিন্তা করিস না। তোর বাগদত্তাকে না হয় আমিই পরিয়ে দিচ্ছি। এটা আর এমন কী, বল? কাবিননামায় তো তুই-ই স্বাক্ষর করবি, ওতেই হবে যা..."

বলতে বলতেই আবির হা করে তাকিয়ে থাকা চড়ুইয়ের বা হাতটা আলতো করে তুলে নিয়ে বিদ্যুতের গতিতে তার অনামিকায় আংটি পরিয়ে দিলো। তারপর আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে, মাথা নিচু করে সেই আংটির ওপর দিয়ে চড়ুইয়ের হাতে নিজের ওষ্ঠ স্পর্শ করায়।

চড়ুই আগামাথা কিছু না বুঝে নাক মুখ কুঁচকে বলে উঠলো....

"এএএএ, কী হচ্ছে এসব??"

সাবিহাও চোখে বিরক্তি ও বিস্ময় নিয়ে আবিরকে ধমকে বললেন....

"আবির... হচ্ছেটা কী এসব? "

আবির এমন ভান করলো যেন সে মাত্রই কোনো ঘোর থেকে জেগে উঠেছে...

"ওহ হো, সরি সরিহ! আমি আসলে পুরোপুরি ক্যারেকটারে ঢুকে পড়েছিলাম, তাই পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে চুমুটাও আমিই দিয়ে দিয়েছি। আহিশ ব্রো... ডোন্ট মাইন্ড, হ্যাঁ? আরেহ, কবুল তো তুই-ই বলবি, তাই না? তোরই তো বউ.."

Mr and Mrs Twins Return গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় টুইন রিলেটেড রোমান্টিক গল্প