খা খা রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে থেকে চরম বিরক্ত চড়ুই পাখি। মনে মনে সুহাস ভাইকে গা'লি দিচ্ছে আর রাগে ফুঁসছে। সুহাসকে বলেছে এই পার্সেলটা পৌঁছে দিতে। কিন্তু তার কি এমন মহৎ কাজ পড়েছে যে আজ সারাদিনে একটুও ফ্রী হতে পারবে না। দোয়েলকে গত কাল থেকেই মন মরা দেখে আর জোর করেনি চড়ুই। নিজেই পার্সেলটা নিয়ে কাস্টমারের দেওয়া ঠিকানায় এসে পৌঁছেছে একটু আগেই। কিন্তু অর্ডারকারীর কোনো খোঁজ নেই। চরম বিরক্ত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।
হঠাৎ পরিচিত একটি গাড়ি সামনে এসে থামতেই তাকায় চড়ুই। গারি থেকে নেমে এক হাতে ডোর লক করে এগিয়ে আসে সে। চোখে সানগ্লাস থাকায় চড়ুই পাখি বুঝে উঠতে পারছে না এটা আবির নাকি নিবিড়।
চকচকে হাসি নিয়ে সে সামনে এসে দাঁড়ায় চড়ুইয়ের। কিছু বলার আগেই চড়ুই প্রশ্ন করে...
"আপনি কোন ভাইয়া? "
চোখ থেকে চশমা খুলে নিতেই সবুজ মনি জোড়া স্পষ্ট হয়, ব্যস মেজাজ তুঙ্গে উঠে চড়ুইয়ের। কোনো প্রকার বাক্য বিনিময় না করে পেছনে ঘুরে হাটা ধরতেই আবির ডেকে ওঠে..
"আরে পার্সেলটা তো দিয়ে যাও। আমার গার্লফ্রেন্ডের সাথে ডেট আছে আজকে। "
পা থেমে যায় চড়ুইয়ের। হাতের ছোট্ট বক্সটার দিকে তাকিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় আবিরের দিকে। ততক্ষণে আবির তার কাছে চলে আসে৷ ফোন বের করে অর্ডার ডিটেইলস দেখাতেই ক্ষেপে যায় চড়ুই..
"আপনি কেন গিফট অর্ডার দিয়েছেন? "
"আমি কি আমার গার্লফ্রেন্ডের জন্য অনলাইন থেকে কিছু কিনতে পারি না? "
চরম বিরক্ত নিয়ে বাক্সটা এক প্রকার হাতে গুঁজে দেয় আবিরের।
"ইচ্ছে করেই যখন আমাদের পেজ থেকে দিয়েছেন তাহলে বাড়ি থেকে নিয়ে আসলেই তো হতো, আমি আর কষ্ট করে এতদূর আসা লাগতো না।"
আবির হাফ নিশ্বাস ফেলে, মনে মনে বলে..
"বাইরে বের করার জন্যই এত কিছু করেছি ম্যাম। "
সামনে তাকাতেই দেখে চড়ুই চলে যাচ্ছে, আবির আবার ছুটে তার পিছু..
"আরে পেমেন্টটা তো নাও.."
"লাগবে না। অসহ্য.. "
"আচ্ছা চলো, আমি বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি.. "
বলতে বলতে আবির গাড়ির ডোর খুলে বক্সটা রেখে তাকাতেই দেখলো চড়ুই ইতোমধ্যেই সামনে একটি সিএনজিতে উঠে যাচ্ছে। আবির বেচারা দ্রুত ডোর লক করে ছুটে যায় সেদিকে, কিন্তু সিএনজি প্রায় ছেড়েই দিয়েছে।
আবিরের থেকে বাচার কারনে চড়ুইও আর কিছু না ভেবে সিএনজিতে উঠে বসে। সিএনজি ছাড়তেই হাফ নিশ্বাস ফেললো সে। কিন্তু হায় একটু গিয়েই সিএনজি থামিয়ে দেয় ড্রাইভার। পেছন থেকে এক প্রকার কুকুর দৌড়ানি দিয়ে আসে আবির, লুকিং গ্লাসে এই কাহিনি দেখেই মূলত ড্রাইভার গাড়ি থামিয়েছে।
হাফাতে হাফাতে আবির এসে থামে চড়ুইয়ের পাশে।
"চড়াই পাখি, জেদ করে না। গাড়িতে চলো। "
চড়ুই সাথে সাথেই বলে ওঠে..
"কে চড়াই? আমি কোনো চড়াই টড়াই নাহ। আমি আপনাকে চিনি না। "
"চড়াই রাগ উঠিও না আমার, চলো গাড়িতে৷ "
চড়ুইও জোর গলায় বলে ওঠে..
"আরে বললাম তো আমি আপনাকে চিনি না। "
আবির কিছু বলতে যাবে তার আগেই চড়ুইয়ের পাশে বসা লোকটি বলে ওঠে...
"কি ভাই? কচি মেয়ে দেখলেই উক্তত্য করতে মন চায়? "
আবির রক্ত গরম চোখে তাকায় লোকটির দিকে, চড়ুইয়ের দিকে তাকাতেই দেখে মেয়েটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আবির সরে আসে নীরবে। চড়ুইয়ের সামনে ড্রাইভারের পাশে খালি সীটে বসে বলে..
"চলুন.. "
ড্রাইভারও গাড়ি স্টার্ট দেয়। চড়ুই পাখি আড়চোখে তাকায় নিজের বরাবর বসা আবিরের চওড়া পিঠের দিকে। পুরুষালী দেহের গড়ন খানা বেশ আকর্ষণীয়ই বটে। কালো রঙের শার্টটের উপরি ভাগ দিয়ে আবিরের ফর্সা ঘাড় খানায় নজর আটকায় তার। সাথে সাথেই কেমন শিরশির করে কেঁপে ওঠে চড়ুই পাখির তনুমন খানা।
অবাধ্য হাত খানা একটু খানি ছুঁয়ে দিতে চায় যেন আবিরকে। কিন্তু চড়ুই পাখিতো এখন চেনে না তাকে। তাহলে?
নিজের মনের অদম্য ইচ্ছে খানা কৌশলে পূরণ করতে চাইলো দুষ্টু চড়াই।হাত দিয়ে শিকল ধরার বাহানায় ছুয়ে দেয় আবিরের পিঠ। দু আঙুলের মাথায় চেপে টানতে চাইলো আবিরের শার্টটা। কিন্তু পিঠের সাথে এতোটা চিপকে থাকার কারনে চিমটে ধরতেই পারলো না সে৷ তবুও নিজের ঘাড়ের শয়তান গুলো তাকে উসকাচ্ছে যেন। মাথার ভেতর থেকে কেউ যেন তীব্র হামলার প্রকোপ দিয়ে বলে উঠছে..
"চড়ুই, জোরে একটু গুঁতা মার তো এই দানাবলটার পিঠে, তোর ইঁদুরের মতো তীক্ষ্ণ নখগুলো দিয়ে খামছে পিঠের ছাল তুলে ফেলতো এই লোকটার। "
দুষ্টু চড়ুই খোঁচাখুচি করতে লাগলো পেছন থেকে আবিরকে। কিন্তু তার বিরক্ত লাগছে, দানাবলটা কিছু বলছে না কেন? আজব তো, এখনো পেছনে ফিরে ধমক দিচ্ছে না কেন উনি?
বিরক্তিতে ঠোঁট মুখ কুঁচকে আরো জোরে জোরে খোঁচাতে লাগলো সে। কিন্তু আবিরের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, এতেই চড়ুই পাখি বিরক্ত।
হঠাৎ নিজের থাইয়ের উপর কিছু একটা অনুভব করতেই চোখ নামিয়ে তাকায় সে।পাশের লোকটির একটি হাত তার উরুর উপর। ভ্রু কুঁচকায় চড়ুই। লোকটির মুখের দিকে তাকাতেই দেখতে পায় বিচ্ছিরি এক লালসা পূর্ণ হাসি।
ভয় কাজ করে চড়ুইয়ের, লোকটার ইঙ্গিত সে বেশ বুঝতে পারছে। আবিরের পিঠে থাকা হাতটা দিয়ে তাকে জাপ্টে ধরতে চায় সে, কিন্তু পারে না।অপর হাতে পাশের লোকটির হাত সরানোর চেষ্টা করে সে, কিন্তু আসুরিয় পুরুষ শক্তির সাথে পেরে ওঠে না সে। লোকটির হাত ধীরে ধীরে আরো উপরে উঠতে থাকে থাই বেয়ে।
চড়ুইয়ের ঠোঁট কাপে,গলা দিয়ে স্বর বের হতে চায় না, সব যেন আটকে আসছে। চোখ ডিঙিয়ে পানি গড়িয়ে পরে তার। ত্রস্ত হাতে আবিরের শার্ট ধরে টানছে সে ভয়ে। মুখ দিয়ে বহু চেষ্টার পর আলতো কুঁকড়ে ওঠে আওয়াজ করে সে, কিন্তু চলন্ত গাড়ির আওয়াজের কাছে চড়ুই পাখির ডাক নিতান্তই সূক্ষ্ণ। যার কারনে কেউই ঠাওর করতে পারে না ঠিক মতো।
"থামান এখানে..."
আবিরের কথায় ড্রাইভার সাইড করে সিএনজি থামাতেই আবির নেমে ঘুরে তাকায়, সুযোগ পেয়ে চড়ুইও চঞ্চল পায়ে নেমে ভীত সতন্ত্র হয়ে আবিরের শার্টের হাতা খামছে ধরে।
আবির বিরক্তিকর মুখ নিয়ে বলে...
"কি সমস্যা?"
চড়ুই পাখি মুখ তুলে চায় আবিরের পানে। ভেজা চোখ দুটো নজরবন্দি হতেই আবিরের পঞ্চইন্দ্রীয় টগবগিয়ে ওঠে, নেত্র সরু হয় সহসা।
"এই পঁচা লোকটা আমার দিকে কেমন করে তাকাচ্ছিলো,আবার আমার এখানটায় হাতও দিয়েছে.. "
ঠোঁট ফুলিয়ে কথাটা বলে আবিরের পানে চায় চড়াই। তার ইশারাকৃত স্থানে চোখ ঘুরিয়ে তাকায় আবির। মাথায় এক সেকেন্ডের মধ্যে খেলে যায় ঠিক কোথায় হাত পড়েছে ঐ লোকের।
ব্যস, শান্ত লোকটি হুট করেই রনমূর্তি ধারন করে।
এক ক্ষিপ্ত অথচ স্থির দৃষ্টিতে আবির লোকটির প্রতিটি গতিবিধি নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করে নেয়, যেন কোনো চিত্রশিল্পী তাঁর ক্যানভাসের ত্রুটি দেখছেন। এরপর, বাম হাতের একটি সপ্রতিভ ঝটকায় চড়ুইয়ের আকড়ে ধরা ছোঁয়া থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে।
পরবর্তী মুহূর্তে দ্রুততা ও নিপুণতার এক ঝলকে, চোখের পলকে, সে সিএনজি-র ভেতরে ঝুঁকে লোকটির নাম-পরিচয় কোনো কিছুর অনুসন্ধান না করেই এলোপাথাড়ি ঘু'ষি মারতে লাগলো । তার মুখমণ্ডল এক শীতল, পৈশাচিক মেজাজ ধারণ করেছে, যেন সে কোনো সামান্য ঝগড়ায় লিপ্ত নয়, বরং স্বয়ং আবির বিন চৌধুরী এক মহৎ পূর্বনির্ধারিত অন্তিম মুহূর্তের মঞ্চায়ন তৈরি করছে।
সিএনজি-র বাকি যাত্রীরা এই অপ্রত্যাশিত, নরকীয় তান্ডব দেখে আতঙ্কে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। আবিরের সেই হিংস্র, নিয়ন্ত্রিত ক্রোধ এতই তীব্র ছিল যে, ভয়ে কেউই এগিয়ে আসার সাহস পেল না।
আবিরের শীতল নিয়ন্ত্রণ এবং প্রলয়ের প্রভাব
আবিরের সেই বেপরোয়া, বুনো উন্মত্ততা দেখে চড়ুইয়ের কোমল চিত্তেও ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে গেল। কিন্তু তার স্বভাবসুলভ কোমল চিত্ত তাকে পিছু হটতে দিল না। সে দ্রুত অগ্রসর হয়ে আবিরের পিঠের দিকের শার্ট টেনে ধরে ভীত কণ্ঠে ডেকে উঠলো...
" থামুন দানাবল, আর নাহ। লোকটি ম'রে যাবে তো..।"
চড়ুই পাখির এই আকস্মিক স্পর্শ, যেন এক রোবটের কাজে বৈদ্যুতিক বিরতি ঘটিয়ে দিল। আবির সেই মুহূর্তেই থমকে যায়। তাঁর দৃষ্টি ঘুরে যায়, সামনে নেতিয়ে পড়া লোকটির দিকে একবার তাকায় সে। সেই দৃষ্টিতে ছিল না কোনো অনুশোচনা, কেবল এক বিরক্তিকর সমাপ্তির ছাপ।
কিন্তু নাটকীয়তা এখানেই শেষ হলো না। ন্যানো সেকেন্ডের সেই বিরতিতেই, আবির তাঁর শিকারের ডান হাতটি সুনিপুণ, শৈল্পিক ভঙ্গিমায় মুচড়ে দিলো। মুহূর্তেই লোকটির মুখ থেকে এক বিভীষিকাময় আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। আবিরের চোখে এতটুকু মায়া বা বিচলিত হওয়ার চিহ্ন দেখা গেল না।
সে সিএনজি থেকে নিজের পিঠটা সোজা করে বেরিয়ে আসে। রাগের সাথে সাথে তার চোখে ছিল এক উচ্চবর্গীয় বিরক্তি। পকেট থেকে চামড়ার মানিব্যাগটি থেকে এক গোছা নোট বের করে সিএনজি চালকের কম্পিত হাতে ধরিয়ে দেয় সে।
কণ্ঠস্বর শীতল আদেশাত্মক এবং হুমকি-স্বরূপ বলে ওঠে..
"মিডটাউনের কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে। একে ঠিক সেখানে ফেলে আসবি। আমার কথার সামান্য এদিক-ওদিক হলে, মনে রাখিস তোর পরিণতি এর থেকেও জঘন্য হবে।"
ড্রাইভারটি কাঁপা হাতে টাকাগুলো নিয়ে কপালে ঠেকালো, যেন সেটি অর্থ নয়, কোনো ভয়ংকর দেবতার প্রসাদ। সে একবার পিছনের সিটের দিকে তাকিয়ে বুঝল, লোকটির আঘাত এত গুরুতর যে সে পালানোর চেষ্টা করবে না। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে, এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে সিএনজি স্টার্ট দেয় সে এবং নীরবে সেই স্থান ত্যাগ করল।
গুনগুনিয়ে কান্নার আওয়াজে আবির রক্তচক্ষু নিয়ে পেছনে তাকায়। চড়ুই পাখি এখনো তার শার্টের কোনা চেপে ধরে আছে। সেদিকে নজর বুলিয়েই আবির হুংকার দিয়ে ওঠে...
"এখন কেন ধরে আছো আমায়? বেশ তো বলেছো আমায় চেনো না তুমি, এবার ভালো লাগছে? "
চড়ুই পাখি কেঁপে ওঠে আবিরের ধমকে। মাথা নুইয়ে নাক টেনে মিনমিনে স্বরে বলে ওঠে...
"আ্ আপনিই তো সেদিন বলেছেন রাস্তায় দেখলে যেন আপনাকে না ডাকি আমি।"
আবিরের চরম রাগ হয়, মেয়েটা এত বোকা কেন? বিরক্তির চরম পর্যায়ে গিয়ে এক হাত তুলে বলে ওঠে...
"একটা থাপ্পড় মারবো ধরে.. "
চড়ুই চোখ তুলে তাকায় আবিরের হাতের দিকে। আবিরের হাত বেয়ে রক্ত ঝরছে অনবরত। তা দেখেই বিচলিত হয় চড়ুই। এতক্ষণের সব রাগ, ভয় ভুলে গিয়ে দ্রুত হাতে আবিরের হাতটা টেনে ধরে সে..
"একিহ!! আপনার হাত তো কেটে গেছে। র'ক্ত পড়ছে.. "
আবিরের হাত টেনে নিয়ে ঘন গন ফু দিতে নিলেই আবির রাগে ঝামটি মেরে হাত ছাড়িয়ে নেয়। চড়ুই পাখি আবার লাফিয়ে আবিরের হাত টেনে ধরে বলতে থাকে...
"হসপিটাল চলুন, রক্ত পড়া বন্ধ করতে হবে। "
বলতে বলতেই আশপাশে তাকিয়ে একটু সামনেই একটা নার্সিংহোমের দেখা পায় চড়ুই,..
"ঐতো, এখানেই চলুন তো তারাতারি..."
আবির আবারো হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলে..
" দরকার নেই, ছাড়ো.. "
চড়ুই মানে না মোটেও। নিজের গলায় ঝুলানো ওড়নার কিনাড়া দিয়ে আবিরের হাতের কাটা স্থান চেপে ধরে জোর করতে থাকে...
"আরেহ লাগবে না মানে কি, অনেকটা কেটেছে, যেতেই হবে। চলুন তো.. "
আবিরও জেদ দেখিয়ে হাত ছাড়াতে লাগলো চড়ুইয়ের থেকে। চড়ুইও নাছোড়বান্দা, পন করেছে যেন আবিরকে আজ ডাক্তারের কাছে নিয়েই ছাড়বে সে।
"আপনি যাবেন মানে যাবেনই চলুন.."
"বলেছি আমার হাত ছাড়ো, আমি যাবো না। লিভ মি চড়াই.. "
হতাহতের এক পর্যায়ে গিয়ে হুট করেই আবিরের বা গালে সপাটে একটা থাপ্পড় এসে পড়লো।
মুহুর্তেই থমকে যায় আবির। এটা কি হলো?
হতভম্ব নয়নে সামনে মুখ তুলে তাকাতেই দেখতে পায় চড়ুই পাখির রাগী মুখখানা। ঠোঁট চেপে ঘন ঘন শ্বাস ফেলে তির্যক চোখে আবিরের দিকেই তাকিয়ে আছে সে। হুট করে যে কেউ এসে এই মুহুর্তে তাকে ঝাসের রাণী উপাধিটা দিয়েই দিবে।
হ্যা, আবির বিন চৌধুরীর গালে থাপ্পড় মারার মতো দূঃসাহস করেছে স্বয়ং তার ওয়াইফি। দুনিয়ার মানুষের কাছে একটি আদর্শ আতঙ্কের নাম এই আবির বিন চৌধুরী। যার গা ঘেঁষে যেতেও অনেকের আত্মা কাপে ভয়ে৷। আজ তাকেই ভরা রাস্তায় মানুষের সামনে৷ কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই ছোট্ট, কোমল হাতে থাপ্পড় মেরেছে চড়াই পাখি। আদেও সে বুঝতে পারছে না কি করে ফেলেছে সে ইতোমধ্যে। নিজের মতোই জোর গলায় নিজের তর্জনী আঙুল তুলে শাসনের ভঙ্গিতে বললো..
"হয়েছে শান্তি? এত জেদ কোথা থেকে আসে? চুপচাপ আমার সঙ্গে চলুন। বুঝতে পেরেছেন? "
আবিরের মুখে কথা নেই। এরূপ ভাব ভঙ্গির সাথে আগে কখনো সাক্ষাৎ হয়েছে কিনা মনে নেই তার। রাগ হওয়ার কথা তার, কিন্তু একটুও রাগ আসছে না কেন জানি। ধীর গতিতে মাথা উপর নিচ নাড়িয়ে শান্ত বাচ্চার মতো সম্মতি দিলো যেন চড়ুইকে। চড়ুইও রাগান্বিত ভঙ্গিমায় হাফ ছেড়ে আবিরের কেটে যাওয়া হাত চেপে ধরেই নিয়ে যেতে লাগলো নার্সিং হোমের দিকে।
আবিরের কি হলো কে জানে? চড়ুইয়ের থেকে তার দৃষ্টি সরছেই না যেন। এই বিরল দৃশ্যখানা যদি আবিরের শত্রু পক্ষ দেখে, তাহলে কি ভাববে? আর যদি একবার নিবিড় দেখে তাহলে হয়তো ছুরিকাঘাত ছাড়াই জায়গায় অক্কা পাবে সে।
চড়ুইয়ের প্রতিনিধিত্বে পেছন পেছন ভেজা বিড়ালের মতো নার্সিং হোমে প্রবেশ করে আবির। আবিরকে কিছু করতে হয় না, চড়ুইও ডেকে ডুকে আবিরের হাতের ড্রেসিং এর ব্যবস্থা করছে। করিডোরে কোনায় একটা চেয়ারে আবিরকে বসতে বলে চড়ুই তারই পাশে দাঁড়িয়েছে।
একটু পরেই একজন নার্স হাতে সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হয়। আবিরের হাত ধরে চড়ুইয়ের ওরনা সরিয়ে মাত্রই তুলায় সেভলন ভিজিয়ে রক্ত পরিষ্কার করতে উদ্ধত হয় নার্সটি।
চড়ুই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে তাকে, হঠাৎই লক্ষ্য করে নার্সটি নিজের কাজ করছে কম আবিরের বুকের দিকে শার্টের খোলা জায়গায় নজর দিচ্ছে বেশি। এটা দেখেই চড়ুই খেঁকিয়ে উঠলো...
"এই! নিজের কাজ ঠিক মতো না করে লুচুগিরি করছেন কেন হ্যা? "
আবির এক দৃষ্টিতে চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকার কারনে বিষয়টা লক্ষ্য করেনি এতক্ষণ, এখন এই রণচণ্ডীর ধমক শুনে দৃষ্টি নামিয়ে খেয়াল করে। নার্সটিও চড়ুইয়ের এমন কথায় থতমত খেয়ে যায়। আমতা আমতা করে বলতে নেয়...
"ইয়ে মানে ম্যাম.."
চড়ুই ত্রস্ত হাতে ঝুঁকে আবিরের বুকের দিকের খোলা স্থানটায় শার্ট টেনে টুনে ঢেকে দিতে দিতে আগের মতোই ধমকে বলে...
"ইয়ে মানে কি হ্যা? এরকম হ্যান্ডু, কিউট ছেলে দেখতেই পাগল হয়ে যান তাই না? ছাড়ুন ওনার হাত আপনি। ছাড়ুন বলছি... "
বলতে বলতে এক প্রকার টান মেরে আবিরের হাত ছিনিয়ে নেয় চড়ুই। নার্সটি লজ্জায় কি করবে বুঝে পায় না।
"যান এখান থেকে, আপনার কিছু করা লাগবে না। ছেলে কাউকে পাঠান, তারাতারি। আজকাল ছেলেরাও নিরাপদ না কোথাও এই আপনাদের জন্য "
নার্সটি লজ্জায় দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। তারপর একজন বয় স্টাফ এসে আবিরের হাতের ড্রেসিং করাতে লাগে।।
এদিকে চড়ুইয়ের এমন কান্ড দেখে আবির পুরো শকড। মেয়েটা যে রাস্তায় এত বড় একটা কান্ড ঘটিয়ে এসেছে তার জন্য বিন্দু পরিমাণ ভয়ও নেই তার চোখে মুখে, যেন কিছুই হয় নি। বোকা পাখিটা জেলাস হচ্ছে, কিন্তু আদেও কি ম্যাডাম তা বুঝতে পারছে?
হুট করেই আবিরের মনে এক প্রশান্তির হাওয়া দোলা দেয়। চড়ুইপাখির এসব বাচ্চামো গুলো কবে থেকে তারর এত প্রিয় হয়ে উঠেছে নিজেই বুঝতে পারে না সে। আর যাই হোক আবির পারবে না চড়ুই পাখিকে ছাড়তে। এভাবে বদমেজাজি, রাগী লোকটাকে শাসন করার জন্য হলেও তার চড়ুই পাখিকে চাই।
আবিরকে নিজের দিকে এমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে চড়ুই পাখি বাচ্চাদের মতো কোমল স্বরে বলে ওঠে...
"কি হয়েছে দানাবল? কষ্ট হচ্ছে আপনার? ভয় পাচ্ছেন এত রক্ত দেখে?"
আবিরের স্তম্ভিত ফিরে। চড়ুই পাখির এমন প্রশ্নের ধরন দেখে হাসি আসে তার, কিন্তু সে চেপে যায় তা। এই সামান্য আঘাতে তার কিছুই আসে যায় না। তবুও আজ যেন তার ইচ্ছে করলো এই মেয়েটার সাথে একটু বাচ্চামোতে সঙ্গ দিতে। তাই মুখের ভাব কাঁদো কাঁদো করে উপর নিচ মাথা ঝাকায় আবির, বোঝায় যে সে কষ্ট পাচ্ছে।
চড়ুইয়ের দৃষ্টি আরো করুন হয়, যেন ব্যথা আবির না সে নিজেই পাচ্ছে। এক হাতে হঠাৎই আবিরের মাথাটা জড়িয়ে নিয়ে নিজের পেটের সাথে চেপে ধরে বলে ওঠে...
"আচ্ছা আপনি এভাবে থাকুন, ওদিকে তাকানোর দরকার নেই। আর ভয় করবে না হ্যা? আমি আছি তো, কিচ্ছু হবে না আপনার.. "
ছোট্ট চড়াই এমন ভাবে বুঝাচ্ছে যেন আবির কোনো ছোট বাচ্চা ছেলে। আবির অনুভব করে চড়ুই কথার ফাঁকে ফাঁকে তার চুলের ভাঁজে নিজের ছোট্ট হাতখানা বুলিয়ে দিচ্ছে, আরেক হাতে আবিরের মাথা জড়িয়ে নিজের পেটের সাথে চেপে ধরে আছে, যেন আবির হাতের দিকে না তাকাতে পারে। ড্রেসিং করতে থাকা ছেলেটাকে বারবার করে সতর্ক করছে..
"সাবধানে, উনার যেন ব্যথা না লাগে। "
আবিরের নাক ঠেকে চড়ুই পাখির কোমল নরম পেটে। চেপে ধরার কারনে পেটের দিকের নরম অংশে মুখটা যেন গেথে যাচ্ছে তার। আবির শরীর শিরশির করে ওঠে। জামার ওপর দিয়েই সে অনুভব করতে লাগে তার ছোট্ট পাখির ছোট্ট কোমল উদরখানা। গায়ের শিউলির সুগন্ধি আর নিজস্ব এক ঘ্রাণ মিলে মাতাল করা সুভাস হানা দেয় আবিরের নাকে। এতটা তীব্র ঘ্রাণ মাথায় ধরে যাওয়ার মতো। ড্রা'গের মতো আরো আকৃষ্ট করছে যেন আবিরকে তা, আরো আরো আরো গভীর ভাবে অনুভুতির জোয়ারে ভেসে যেতে চাইছে আবির যেন। মেয়েটার এই সামান্য কার্যক্রম তার পৌরুষ চিত্তকে উন্মোচন করতে সফল, আবির চিন্তিত হয় , ভীষণ চিন্তা ভর করে তার মনে। এই মেয়ে এতটুকুতেই যদি তাকে এতটা তীব্র ভাবে আকৃষ্ট করতে পারে, তাহলে বদ্ধ ঘরে পালঙ্কের উন্মাদনায় আবির আদেও নিশ্বাস ফেলার ফুসরত পাবে তো? আর চড়ুই পাখিকেও দিবে ঐ নিশ্বাস ফেলার সময়টুকু? ইশশ, কি জ্বালা কি জ্বালা। আবির এখন নিজেকে সামলায় কি করে?
নিসপিস করতে থাকা ডান হাতটা আর স্থীর রাখতে পারলো না আবির। পেছন থেকে পেচিয়ে চড়ুইয়ের কোমড় ধরে আরেকটু কাছে টানে নিজের। মুখটা আরো গভীর ভাবে চেপে ধরে তার পেটে, চড়ুই অপ্রস্তুত হয়, জামার ওপর দিয়েই আবিরের খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলো তার পেটে শুইয়ের মতো বিঁধছে যেন। কিন্তু আবির ভয় পেয়ে এমন করছে ভেবে চড়ুইও কোনো মতে নিজেকে সামলে নিয়ে আবিরকে আস্থা দেওয়ার লক্ষ্যে নিজের সাথেই ওভাবে জড়িয়ে রাখে। আর তার অজান্তেই এমন উষ্কে দেওয়ার মতো কাজে আবির তো নাজেহাল...।নিজেকেই নিজে সামলাতে লাগলো ভেতর ভেতর....
"আবির, কন্ট্রোল ইউর সেল্ফ, এখানে কোনো অঘটন নাহ, আবির...."