"চড়াই পাখি আবিরকে ভুলে গিয়েছে।
এই কঠিন সত্যটা মেনে নিতে কষ্ট হলেও কিছুই করার নেই আবিরের। তার চড়াই পাখি তাকে সত্যি সত্যিই ভুলে গিয়েছে। এই যে আবিরকে একা করে দিয়ে গেলো সে দূরে।
রুফটপের দারুণ ওয়েদারে রেস্টুরেন্টটার সাজসজ্জা বেশ চোখে পড়ার মতো। আবিররা এখন সেখানেই বসে আছে৷ রেস্টুরেন্টের সব থেকে লার্জ সাইজের টেবিলটা বুক করেছে সে। যেটায় এক সাথে চব্বিশ জন বসা যায়। কিন্তু হায়, আজ আবিরেরই জায়গা হলো না সেথায়৷ তখন নার্সিং হোম থেকে বের হওয়ার পর অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে আবিরকে ছেড়ে রাস্তার দিকে ছুটে যায় চড়ুই৷ আবির খেয়াল করে ডাকতে গেলেই দেখে চড়ুই এমনি এমনি যায় নি। ছোট্ট একটি বাচ্চা হামাগুড়ি দিতে দিতে প্রায় রাস্তার মাঝখানে চলে এসেছিলো। চড়ুই পাখি ছুটে গিয়ে তাকেই তুলে নিলো কোলে৷ ছোট্ট বাচ্চাটার পড়নে কোনো জামা কাপড় নেই। ধূলো বালিতে আবৃত শরীরখানা কোলে তুলে নিতে একবারও দ্বিধাবোধ করলো না চড়াই পাখি৷ কোলে নিয়েই ক্ষ্যান্ত হয়নি সে, চিন্তিত হয়ে বারবার বাচ্চাটিকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরছিলো, চুমু খাচ্ছিলো সে। আবির ওপারে যেতে যেতে আরো ভিন্ন বয়সের কয়েকটি পথশিশু ছুটে আসে চড়ুইয়ের কাছে৷ ছোট্ট বাচ্চাটি তাদেরই সাথে।এদের মতে মিনিট তিনেকের মধ্যে কি এমন ভাব হয়ে গেলো আবির এখনো তা বুঝে উঠতে পারেনি।তখন আবির পৌছাতেই চড়ুই তাকে বললো...
"আপনি কি চান আমি আর আপনার সাথে রাগ করে না থাকি?"
হুট করে এমন কথার মানে আবির খুঁজে না পেলেও চাঁদ হাতে পাওয়ার মতোই আনন্দ হতে লাগলো তার। গত কয়েকটা দিন এই মেয়েটার এড়িয়ে চলাটার প্রভাব যে আবিরের উপর কিভাবে পড়েছে তা একমাত্র আবিরই জানে। এখন তো আর ভুলেও এই সুযোগ মিস করা যাবে না। যাক, ডেটে আসাটা সার্থক।
আবির তৎক্ষনাৎ রাজি হয়, চড়ুই ভাব নিয়ে বলে...
"উমমম, এমনি এমনি তো হবে না। "
"ওয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট? "
"আপনার মানিব্যাগ। "
হঠাৎ চড়ুইয়ের এমন কথার মানে বুঝতে পারলো না আবির। ভ্রু কুঁচকাতেই চড়ুই নিজেই বলে ওঠে..
"মানে আজকের জন্য আপনার মানিব্যাগটা আমায় দিতে হবে। আমি যত ইচ্ছে খরচ করবো। "
আবির একটা বারের জন্যও জানতে চাইলো না কেন, কি নিবে, না নিবে। আলতো হাসি ঠোঁটে উজ্জল রেখেই ডান হাতে পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে চড়ুইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিলো। ব্যস তাতেই যেন চড়ুই চাঁদ হাতে পেয়ে গেলো। চওড়া হেসে আবিরের দু গাল টেনে বলে ওঠে..
"ইউ আর সো সুইট দা...সরি সরি আবির ভাইয়া..."
বলেই হাত বাড়িয়ে মানিব্যাগটা হাতে নিতে গেলেই আবির কৌশলে সরিয়ে নেয় হাত খানা। চড়ুই বোকার মতো তার মুখের দিকে তাকাতেই আবির বলে ওঠে...
"সেয় দা ফার্স্ট নেইম..."
চড়ুই আবারও হাসলো, বললো..
"ওকেয় ওকেয়, ইউ আর সো সুইট,দানাবল..."
বলতেই আবির হাত সামনে আনতেই চড়ুই মানিব্যাগটা কেড়ে নিয়ে পথশিশুগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে..
"চলোওও.."
প্রায় ত্রিশ জনের মতে পথ শিশু নিয়ে শপিং মলে গিয়ে তাদের সবার জন্য জামা কাপর নিয়ে দেয় চড়ুই। নিজেই দেখছে, বাচ্চাদের সাথে মিলে পছন্দ করছে, সবটা নিজে নিজেই কেমন সামলে নিচ্ছে মেয়েটা। টাকার উৎস তো ইতোমধ্যেই আবির বেচারা তার হাতে তুলে দিয়েছে। কেনাকাটা শেষ করে সবগুলো বাচ্চাকে নতুন জামা পড়িয়ে এই দুপুর টাইমে রেস্টুরেন্টে এসে উঠেছে তারা। বড় টেবিলটায় সবাই বসার পর যখন দেখলো আর মাত্র একটি চেয়ার খালি তখন চড়ুই উজ্জল মুখে হেঁসে কি দারুন বলে দিলো...
"দানাবল? আপনি অন্য কোথাও বসুন, এখানে আর জায়গা নেই। "
হ্যা সেই থেকেই চড়ুই পাখি আবিরকে ভুলে গেছে। আবির যে এখানে একা বসে আছে সেদিকে চড়ুইয়ের কোনো খেয়ালই নেই। সে ব্যস্ত বাচ্চাদের সাথে।সবার জন্য কাচ্চি অর্ডার দিয়েছে সে। হ্যা এবারও আবিরকে আশাহত করেছে সে, সবার জন্য দিয়েছে শুধু আবিরের জন্য ছাড়া। পাশের টেবিলে যে কেউ একজন বসে আছে সেটাই যেন বেমালুম ভুলে গেছে চড়াই। আবির আর কি করার, এই মুহুর্তে বকাও যাবে না চড়ুইকে, যদি আবার কথা বন্ধ করে দেয়? না না বাবাহ, আবির আর সইতে পারবে না।
খাবারের বিল পরিশোধ করার সময়ই চড়ুই গোমড়া মুখো হাজির হয় আবিরের কাছে। আবির মুখ তুলে বুঝার চেষ্টা করে কি হয়েছে?
"আপনি নাকি অনেক টাকার মালিক? আপনার টাকা নাকি গুনেও শেষ করা যায় না? এই তার হাল? "
বলেই ক্ষিপ্র হাতে মানিব্যাগটা এগিয়ে দেখায় আবিরকে। এইবার বুঝতে পারে আবির তার বোকা পাখি কেন এসেছে। মায়া দেখিয়ে নয় বরং মা'রা খেয়েই এসেছে পাখি। মানি ব্যাগের সব টাকাই শেষ। হাতে গোনা দু- তিনটি হাজার টাকার নোট শুধু। খাবারের বিল নিশ্চয়ই আরো বেশি এসেছে। আবির হাফ নিশ্বাস ফেলে বলে...
"ভেতরে কার্ড আছে দেখো। "
চড়ুই তাই করলো, গুনে দেখলো মোট ছয়টি কার্ড। জিজ্ঞেস করলো..
"কোনটা দিবো?"
"যেটা মন চায় ইউজ করো।"
চড়ুই হালকা অবাক হয়ে বলে..
"সব গুলোতেই টাকা আছে? "
"হুম "
চমৎকার হেঁসে চড়ুই দ্রুততার সহীত বলে ওঠে..
"সরিহ, আপনি আসলেই বড়লোক।আপনি অনেক ভালো, দোয়া করে দিলাম, আপনার কপালে একটা সুন্দরী বউ জুটবে।"
-----------
দোয়েল পাখির সারা মুখে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিচ্ছে নিবিড়। অস্থির উন্মাদের মতো করছে সে, যেন ছেড়ে দিলেই তার এটম পালিয়ে যাবে৷ দোয়েল সামলে নিতে চায় নিবিড়কে। চুমু থামিয়ে নিবিড় দু হাতে ঝাপটে ধরে মুখ গুঁজে দেয় দোয়েলের কাঁধে। শীতল কন্ঠে লো ভয়েজে বলে ওঠে....
"আ'ম সরি মিস এটম, আ'ম রিয়েলি সরি। আমি তোমায় কষ্ট দিয়েছি, অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি তোমায়।আর কষ্ট দেবো না পাখি, আর তোমায় দূরে রাখবো না। আমি তোমাকেই ভালোবাসি, শুধু তোমাকে। বুঝেছো তুমি? একবার বলো ভালোবাসো আমায় তুমি? একটিবার বলো পাখি? "
"ভ্ ভালোবাসি, ন্ নিবিড়। আমিও আপনাকে ভালোবাসি.... ভ্ ভালোবা..."
কারোর ধাক্কায় চমকে উঠে বসে দোয়েল। ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে ফেলতে সামনে তাকাতেই দেখতে পায় জেসি হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার দশা। কোনো মতে নিজেকে থামিয়ে বলে...
"ভিডিও করে রেখেছি বড়পাখি। বুঝলাম তুই নিবিড় ভাইয়াকে অনেক বেশি ভালোবাসিস। তাই বলে ঘুমের মধ্যেও একা একা ভালোবাসি নিবিড় ভালোবাসি নিবিড় করবি? তাও আবার এই ভর দুপুরে। "
বুকটা ভার হয়ে যায় দোয়েলের। তার মানে এটা স্বপ্ন ছিলো? নিবিড় আসে নি? তার মুখে চুমু খায় নি, দু হাতে আগলে ধরে নি তাকে, ভালোবাসি বলে নি? বলে নি নিবিড়?
"কিরে কোথায় হারালি? "
জেসির ধাক্কায় ধ্যান ভাঙে দোয়েলের। বুক কাঁপছে এখনো তার। আদেও তার ভেতরে কি চলছে যদি জেসি তা জানতো, তাহলপ হয়তো এভাবে হাসতো না।
নিজেকে সামলে নেয় দোয়েল। দু হাতে চোখ ডলে নিয়ে জিজ্ঞেস করে...
"বোন ফিরেনি এখনো? "
" নাহ..."
"কিহ! এখনে ফিরেনি ও? বলেছিলাম আমি যাই, না ও... "
"আরেহ টেনশন নিস না। ছোটপাখি আবির ভাইয়ের সাথে আছে, আর সেইফ আছে ইউ নো। কুল। "
দোয়েল সস্থির নিঃশ্বাস ফেলে। জেসি বলে...
"বিকাল হয়ে গেছে, আর ঘুমাস না। ওঠ, ছাঁদে আহিশ, হৃদ তারা ভাবি আছে। আমিও যাচ্ছি ক্যারাম খেলবো। তুই হাতমুখ ধুয়ে আয়। "
বলেই জেসি উঠে যেতে নিলে পেছন থেকে দোয়েল ডেকে ওঠে...
"শোন? "
"কি? "
"ন্ নিবিড় ভাইয়া কোথায়? "
"ভাইয়া তো অফিসে, এই সময় বাড়ি থাকে নাকি। সন্ধ্যার পরে আসবে। কেন? বেশি মিস করছিস? ফোন করে আসতে বলবো??"
ভ্রু নাচিয়ে কথাটা বলতেই দোয়েল বিরক্তিকর মুখ নিয়ে বলে...
"এমন কিছুই না, যা তুই আমি আসছি। "
জেসি হেসে চলে যায়। কিন্তু দোয়েল উঠে না, থ মেরে বসে থাকে বিছানায়। চারদিক থেকে শূন্যতা যেন গ্রাস করছে তাকে। নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে মেয়েটা,
"আদেও আমি বেঁচে থাকবো তো? আমি পারবো তো জীবনের প্রথম ভালোবাসার মানুষটিকে অন্যের সাথে সংসার করতে দেখতে? আল্লাহ? তুমি আমায় সেই সহ্য ক্ষমতা দেবে তো? "
দু হাটুতে মুখ গুঁজে রাখে দোয়েল, দুঃখরা যেন তাকে ঘিরে ধরছে শক্ত করে, ঠিক যেভাবে নিবিড় তাকে আগলে নিতো। মাথায় ভারি বোঝার অনুভুতি হচ্ছে, কিন্তু হাত বুলিয়ে দেওয়ার মতো নিবিড় নেই। কেন নিয়তি এতটা কঠিন হলো?
"ও ভাগ্য নির্ধারিতা, কেন বারবার তুমি আমার ভাগ্য লিখার সময়ই উছিলা খোঁজ? কেন তুমি আমার জীবনের প্রশ্ন গুলো একটু সহজ করে দাও না? কেন এতটা দায়িত্ব আমায় দিলে তুমি? দায়িত্ব পালন করতে করতে আমি ক্লান্ত দেখো না একবার চেয়ে। আমার বেঁচে থাকার কোনো তারিকা খুঁজে পাই না আমি। আমার ম'রে যাওয়ার পথটাও কেন বন্ধ করে দিলে তুমি? কেন আমাদের তুমি একই নাড়িতে বদ্ধ করলে? কেন এমন নিয়ম দিলে আমি মর'লে আমার বোনটাও ম'রে যাবে? কেন দিলে?
মানুষটাকে যদি আমার নাই বানাবে, তাহলে কেন এই স্বল্প সময়ে আমার বুকের ভেতর একটা জায়গার মালিকানা তাকে দিলে তুমি? আমার শক্ত হৃদপিণ্ডে ভালেবাসার সুভাস কি না ছড়ালেই হচ্ছিলো না? আমি কি করবো? কার দোষ দিবো আমি? লোকটাকে তো আমি ভালোবাসি৷ তার আচরণ গুলো আমায় যে ভেতর থেকে মে'রে ফেলছে। তবুও আমার হৃদপিণ্ড তাকে ঘৃণা করতে পারছে না। এমন অদ্ভুত অনুভুতি কি না দিলেই হতো না? আমি তো আমার লক্ষ্যে ঠিক ছিলাম, আমার একটু সুখ কেন তোমার সহ্য হয় না বলো তো? "
প্রশ্ন গুলোর উত্তর পায় না দোয়েল। চোখ দুটিতে আজকাল সহজেই বাধ ভাঙে, এই যে মেয়েটা ডুকরে কাঁদছে। কেউ তো দেখছে না, কিন্তু সে তো চায় কেউ একজন দেখুক,একটু মায়া করুক, একটু বুকে টেনে নিক। কেন সে দেখলো না? কেন সে দোয়েলকে একটু খানি ভালেবাসলো না?
"আমায় পোড়াতে আপনি আগুন কেন ব্যবহার করলেন না নিবিড় ভাই? আপনার ভালোবাসায় নুইয়ে নুইয়ে পোড়ার চেয়েও আগুনে পুড়ে ছাই হওয়াই ঢের ভালো ছিলো।"
কতটা সময় পাড় হয় বুঝতে পারে না দোয়েল। সে ভাবছে, ভীষণ ভাবছে। হঠাৎই মুখ তুলে বসে চোখ মুছলো সে। নিজেকে কঠিন এক পাথর খন্ডে রুপান্তর করে পাশ থেকে ফোন হাতরে নিয়ে দম নিয়ে বসলো। কঠিন মুখ অবয়বে চলছে এক বিশাল ও সুনিপুন পরিকল্পনা, সে হেরে যাবে না এত সহজে। এবার আর দুনিয়ার কথা চিন্তা করবে না সে, একটু স্বার্থপর হবে এবার দোয়েল পাখি৷ নিজের জন্য বাচবে,নিজের খুশির জন্য পাপে জড়াবে। আর নাহ, কান্নাটা তাকে মানাচ্ছে না ঠিক।
খুঁজে খুঁজে মুনিয়ার আইডিটায় গিয়ে কল লাগায় সে৷ প্রথমবারেই মুনিয়া রিসিভ করে নেয়। চিনতে না পেরে শুধায়...
"কে? "
দোয়েলের দৃঢ় কন্ঠ। কান্নার লেশ মাত্র নেই সেথায়। মেরুদণ্ড সোজা রেখে ফোন কানে চেপে ধরে এক নিশ্বাসে বলে ওঠে ...
"দোয়েল রাহমান বলছি, উডবি মিসেস নিবিড় বিন চৌধুরী। যা বলছি মুখ বন্ধ রেখে, কান খুলে, মন দিয়ে শোনো। কাল বাদে পরশু পারিবারিক ভাবেই আবার আর নিবিড়ের এঙ্গেজম্যান্ট। এরপর যত দ্রুত সম্ভব আমরা বিয়ে করবো। তোমায় বলছি, আমার উডবি হাসবেন্ডের থেকে দূরে থাকো, আমাদের বিয়ে সংক্রান্ত কোনো অনুষ্ঠানে বা বিয়ের পরে আমাদের সুখের সংসারে যদি টিপনি কেটে আগুন লাগাতে আসো, তাহলে মনে রেখো,এই দোয়েল তোমায় গরাদের ওপারে বসিয়ে টিনের থালায় শুকনো আটার রুটি আর ছোলা কম পানি বেশি ডালের স্বাদ গ্রহণ করিয়ে ছাড়বে। ভেবোনা নিবিড় তোমার পক্ষ নেবে, যদি ও তোমার পক্ষ নেয় তাহলে তাকেও তোমার সাথেই লকাপের ভেতর ভরবো আমি। আমার কথা গুলো ফাঁকা আওয়াজ ভেবো না কিন্তু, তোমার সাথে যদি নিবিড় বিন চৌধুরী থাকে তাহলে আমার সাথে ওর বাপ আজমল চৌধুরী সহ পুরো খানদান আছে। তো, স্টে এওয়ে ফ্রম মাই লাভ,মাই উডবি হাসবেন্ড। "