এঙ্গেজম্যান্টের আরো টুকটাক অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে রাত প্রায় দু'টো। শেষ মুহুর্তে দোয়েল যখন সাবিহার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো তখন নিবিড় তার সামনে এসে দাঁড়ায়। আড়চোখে দোয়েলের দিকে তাকিয়ে আলতো হেঁসে অনুমতি চাওয়ার ভঙ্গিতে সাবিহার দিকে চায়। দোয়েলের বা হাত খানা আলতো স্পর্শে টেনে বলে...
"আমরা একটু বেরোবো আম্মু... "
সাবিহা আলতো হেঁসে অনুমতি দেয়, চড়ুই এসে লাফিয়ে জিজ্ঞেস করে...
"কোথায় ভাইয়া? লং ড্রাইভে হুম?"
নিবিড় হেঁসে চোখের পাতা ফেলে হ্যা বোঝায়। চড়ুই এগিয়ে গিয়ে দোয়েলের কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলে....
"বেস্ট অফ লাক বোন..."
হাইরোডে গাড়ি চলছে নিরিবিলি, গাড়ির ভেতর স্লো মিউজিকে গান বাজছে মুহুর্তটাকে আরো একটু রোমাঞ্চকর করে দেওয়ার জন্য। নিবিড় একহাতে সুচারু দক্ষতায় ড্রাইভ করছে, আরেকটি হাতে নিবন্ধ দোয়েলের ছোট্ট কোমল ডান হাতটি। আলতো করে স্লাইড করছে সেথায় নিবিড়।
দোয়েল তো লজ্জায় রাঙা মুখখানা নিচু করে বসে আছে পাশে, মুখ ফুটে কিছু বলছে না মেয়েটি। এরকম সুনশান রাতে প্রিয় মানুষটির সাথে লং ড্রাইভে যাওয়া যেন প্রতিটি মেয়েরই সুপ্ত একটি স্বপ্ন। দোয়েলের যে আজ সেই স্বপ্নই পূরণ হচ্ছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামে রাস্তার এক পাশে। দোয়েল এবার আস্তে করে মুখ তুলে তাকায় নিবিড়ের দিকে। কিছু বলতে যাবে তার আগেই নিবিড় এক হাত বাড়িয়ে হেঁচকা টানে দোয়েলকে টেনে নিজের কোলের উপর বসায়। দোয়েল অপ্রস্তুত হয়, নিবিড়ের বুকের কাছের শার্ট খামছে ধরে বিরবির করে ওঠে...
"ক্ কি করছেন? "
তড়িঘড়ি করে নিবিড় নিজের তর্জনী ঠেকায় দোয়েলের ঠোঁটের উপর...
"হুশশশশশশ, নো মোর ওয়ার্ড, যাস্ট এগ্রি উইথ মি... "
দোয়েলের কণ্ঠস্বর থমকে যায়। নিবিড়ের নেশা ধরানো দৃষ্টি ধীরে ধীরে দোয়েলকে সম্পূর্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে, যেন সে এক দুর্লভ শিল্পকর্ম।
নিবিড় তার পুরুষালী হাতের আঙুলের ডগা দিয়ে দোয়েলের কপালের পাশ থেকে আলতো করে স্লাইড করে নিচে নামিয়ে আনল। এই শীতল স্পর্শে দোয়েলের চোখ বুঁজে আসে, তার সর্বাঙ্গ এক শিহরণে কেঁপে ওঠে।
গভীর, মাদকতাময় কণ্ঠে নিবিড় ফিসফিস করে ওঠে.....
" তোমায় আজ একটু বেশিই সুন্দর লাগছে এটম "
লজ্জার উষ্ণ আবেশে দোয়েলের অন্তর তখন কাঁপছে, যেন সে এক মোহের জালে আটকা পড়লো বলে। নিবিড়ের স্পর্শে তার মনে এক মধুর আত্মবিস্মৃতি। নিবিড়ের হাত আলতো করে নেমে আসে তার কোমরের দিকে। লেহেঙ্গার সূক্ষ্ম ফাঁক গলে সেই খসখসে হাতের উষ্ণতা তার পেটের অনাবৃত অংশে স্লাইড করে।
দোয়েল এক চাপা শিহরণে মোচড় দিয়ে ওঠে, এই আকস্মিক উষ্ণতা তাকে অস্থির করে তুলছে। তবু সে এই মুগ্ধতা এড়াতে পারে না। নিবিড়ের নেশাতুর চোখ তখন স্থির হয়ে আছে দোয়েলের লিপস্টিকে রাঙানো ঠোঁট দুটিতে, যেন সমস্ত পৃথিবী এক মুহূর্তে সেখানেই এসে থেমে গেছে। নিবিড় থেমে যায় না। তার কণ্ঠস্বরে তখন এক গভীর মোহ, যা দোয়েলের সমস্ত দ্বিধাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়। ফিসফিস করে বলে....
"ডোন্ট বি সায় বেইবি , তোমার দেহ আমার ছন্দেই সাড়া দিক।"
পর মুহূর্তে কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই নিবিড় তার ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় দোয়েলের অধরে। এক দৃঢ়, তীব্র আবেগের সঙ্গে সে চুষে নিতে থাকে দোয়েলের ঠোঁটের মিষ্টতা, যেন সে আজন্ম তৃষ্ণা মেটাতে চাইছে। তার হাতের বিচরণ তখন আরও বেপরোয়া, আরও স্বাধীন। দোয়েলের পেট, মসৃণ পিঠ এবং ক্ষীণ কোমর, সবকিছুকেই যেন সে আজ একান্ত নিজের করে নিতে চায়। দোয়েল এই মুহূর্তে দিশেহারা। নিবিড়ের এই উদ্দাম স্পর্শ, এই আকস্মিক তীব্রতা যেন তার কাছে নতুন, অচেনা। সে বিস্মিত হয়, নিবিড় আগে কখনোই এমন ব্যাকুলভাবে তাকে স্পর্শ করেনি। আজ তবে কী হলো এই মানুষটির?
দোয়েল প্রবল অস্বস্তিতে মোচড়ামুচড়ি করতে থাকে, নিবিড়ের উন্মাদনা থেকে নিজেকে মুক্ত করার এক মরিয়া প্রয়াস। এই মুহূর্তে তার ডাকে সাড়া দেওয়া মানে এমন কিছু ঘটতে দেওয়া, যা দোয়েল কোনোভাবেই চায় না। নিজেকে শান্ত করে, ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে সে উচ্চারণ করে....
"ন্ নিবিড়, কী করছেন? প্লিজ থামুন, এ এটা ঠিক হচ্ছে না।"
নিবিড়ের মনোযোগে ছেদ পড়ল। দোয়েলের গলার কাছ থেকে মুখ তুলে সে অত্যন্ত বিরক্তিকর ভঙ্গি করে চাপা, গম্ভীর স্বরে সে মনে করিয়ে দেয়....
"We are engaged now"
দোয়েল মিনতি জানায়...
"তবুও... এ এখন না, প্লিজ?"
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিবিড় প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়...
"তাহলে কখন?"
দৃঢ়তা ফিরে আসে দোয়েলের কণ্ঠে..
"বিয়ের পরে। হালাল ভাবে।"
নিবিড় স্থির হয়ে যায়। সে চোখ বন্ধ করে এক গভীর শ্বাস নেয়, তারপর চোখ খুলে তাকায় দোয়েলের করুণ মুখের দিকে। তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে এক আলতো হাসি।
"Okay, I'm waiting for you."
দোয়েল যেন এই মুহূর্তে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। তার চোখে কৃতজ্ঞতা, আর ঠোঁটে ফুটে ওঠে এক স্বস্তির হাসি।নিবিড় পরম মমতায় দোয়েলের মাথাটি নিজের বুকের উষ্ণ আশ্রয়ে টেনে নেয়, আর তার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। দোয়েল কোনো বাধা দেয় না।সে শুধু চোখ বুজে নেয় এক গভীর প্রশান্তিতে। ঠিক এটাই তো তার আকাঙ্ক্ষা ছিল। একটি নির্ভরতার হাত, একটি প্রশস্ত বুক, যেখানে মাথা রাখলে সমস্ত দুশ্চিন্তা কর্পূরের মতো উবে যাবে, শুধু শান্তি আর নিরাপত্তা বিরাজ করবে।
এই আবেগময়, শৈল্পিক মুহূর্তের মাঝে নিবিড়ের কণ্ঠস্বর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে ওঠে। তার প্রশ্নটি ছিল সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত...
"মুনিয়া কোথায়, মিস এটম?"
প্রশ্নে চমকে ওঠে দোয়েল, দ্রুত চোখ খুলে নেয়। তড়িৎ গতিতে নিবিড়ের বুক থেকে মাথা সরিয়ে সোজা হয়ে বসে, বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে।
নিবিড়ের শান্ত দৃষ্টি তখনও দোয়েলের উপর নিবদ্ধ। কোনো অস্থিরতা নেই, শুধু দৃঢ়তা। সে আরো একবার সেই চাঞ্চল্যকর প্রশ্নটি করে...
"কোথায় রেখেছো তুমি মুনিয়াকে?"
এই শীতের মাঝেও দোয়েলের কপাল বেয়ে চিকন ঘামের রেখা নেমে আসে। ভয়ে তার শরীর কাঁপছে। সে যেন নিজের কাছেই গুলিয়ে যাচ্ছে, কী বলবে বা কী বলবে না কিছুই ভেবে পাচ্ছে না। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে সে বলতে শুরু করে...
"আ্ আমি কী করে জানব ম্ মুনিয়া আপুর..."
নিবিড় তাকে থামিয়ে দেয়, কণ্ঠস্বরে শীতল দৃঢ়তা...
"মুনিয়ার লোকেশন এই এরিয়াতেই দেখাচ্ছে। এবার চুপচাপ বলে ফেলো, কোথায় আছে ও?"
বিস্ময়ে চোখ বড় করে দোয়েল জানালার বাইরে তাকায়। স্থানটি তার চেনা। নিবিড় এতক্ষণ এই পরিচিত স্থানটিতেই গাড়ি থামিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল যা সে ঘোরের মধ্যে খেয়ালই করেনি। নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করে সে বলে...
"আ-আপনি আমায় কেন..."
নিবিড় যেন এবার তার খেলার সমস্ত তাস বের করে আনে....
"সেটা তুমিও জানো, আমিও জানি। আমার গার্লফ্রেন্ড মুনিয়াকে সেদিন ফোনে তুমি থ্রেট দিয়েছিলে মিস অ্যাটম, আমার কাছে সেই কল রেকর্ড আছে। আর আমি এটাও জানি, গতকাল থেকে মুনিয়ার নিখোঁজ হওয়ার পেছনে তোমারই হাত। আমি আশা করব, তুমি আমাকে আর মিথ্যা বলবে না।"
দোয়েলের বুক তখন তীব্র কম্পনে অস্থির। সে দ্রুত হাতে গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু নিবিড়ের কঠিন বাঁধনে তা ব্যর্থ হয়। দোয়েলের সমস্ত মস্তিষ্ক যেন ক্রোধ আর হতাশায় রুদ্ধ। তার রাগ হয়, এই বিশেষ দিনেও লোকটির সমস্ত চিন্তা মুনিয়াকে ঘিরে? তবে এতক্ষণ যা ঘটল, সবটাই কি নিছক নাটক ছিল? লোকটা তাকে নয়, ভালোবাসে কেবল মুনিয়াকেই। রাগে ও দুঃখে সে নিজেকে মুক্ত করতে মরিয়া হয়ে ওঠে...
"ছাড়ুন আমাকে, আমি নামব! বাড়ি যাব আমি!"
নিবিড় বাঁধন আলগা না করে, এক চূড়ান্ত অস্ত্র ব্যবহার করে যেন। তার কণ্ঠস্বর ছিল শীতল, কিন্তু তাতে এক অলঙ্ঘনীয় আবেদন...
"তোমাকে আমার কসম, এটম। মুনিয়া কোথায় বলো?"
দোয়েল থমকে যায়। স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকায় নিবিড়ের মুখের দিকে। এই একটি কসম তার মিথ্যা বলার সমস্ত পথ বন্ধ করে দিয়েছে, কারণ দোয়েল তা কখনোই অমান্য করতে পারবে না। নিবিড়ের চোখে তখন তীক্ষ্ণ আগুনের ঝলক। দোয়েলের এই অসহায় আত্মসমর্পণ যেন তারই প্রতীক্ষিত ছিল।
হঠাৎ করেই দোয়েল শান্ত হয়ে যায়। সে নিবিড়ের দিক থেকে চোখ নামিয়ে নেয়। রিনরিনে চুড়ির শব্দ তুলে হাত দিয়ে দু'চোখ মুছে নেয় মেয়েটি। এরপর ধীরে সুস্থে গাড়ি থেকে বাইরে পা বাড়াতে গেলেই নিবিড় স্বভাবতই তাকে আটকাতে চাইল।
দোয়েল প্রথমবারের মতো নীরবতা ভেঙে নিবিড়ের দিকে না তাকিয়েই শুধু বলল..
"পালাচ্ছি না। আসুন..."
দোয়েলের এই কথা শুনে নিবিড় তৎক্ষণাৎ তার হাত ছেড়ে দেয়। দোয়েল নেমে এসে এক রোবটের মতো নীরবে সামনে তাকিয়ে হাটতে শুরু করে। নিবিড়ও নেমে এসে তার নীরব অনুসারী হয়। এতটা সময়ে দোয়েল আর একটিবারের জন্যও মুখ তুলে তাকায় না নিবিড়ের দিকে। তাদের মাঝে তৈরি হয় এক ভারী, অলঙ্ঘনীয় দূরত্ব।
কয়েক কদম দূরে গিয়েই দোয়েল একটি দরজার সামনে থমকে দাঁড়ালো। তার আঙুল ছুঁয়ে দিল কলিংবেল।
"কার বাড়ি এটা?"
নিবিড়ের প্রশ্নটি শীতল, কৌতূহলী। রাতের নিস্তব্ধতায় সে স্বর সামান্য গমগম করে ওঠে।
কিন্তু দোয়েল যেন এক অচল মূর্তি। তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তি পাথরের মতো স্থির। সে উত্তর দিল না। উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করলো না। তার মনোযোগ শুধু এই দরজার দিকে, আর হয়তো সেই ভেতরের নীরবতার দিকে যা ভাঙার অপেক্ষায়। নিবিড়ের প্রশ্নটি বাতাসে মিশে যায়, যেমন মিশে যায় রাতের শিশির।
দীর্ঘ নীরবতার পর, দরজা খুলে কেউ। ঘুমের আবেশে চোখ ডলতে ডলতে বাইরে তাকায় রাবতি। ডোর হুক দিয়ে দোয়েলকে দেখেই তার চোখ বিস্ময়ে সামান্য প্রসারিত হলো।
"কী, পাখি? এত রাতে তুই..."
কথা শেষ হলো না। ভালো করে তাকাতেই তার কণ্ঠনালী রুদ্ধ হয়ে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই টুইনস ব্রাদার্সদের একজন। তার চেহারায় প্রশ্নচিহ্নের চেয়েও বেশি কিছু, এক শীতল সতর্কতা।
রাবতি কিছু বলার আগেই, দোয়েল একটি নীরব রোবটের মতো তাকে পাশ কাটিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে । তার গতি মসৃণ, উদ্দেশ্যমূলক। রাবতি হতভম্ব। দোয়েল ঠিক কী করতে চাইছে, তা বুঝে উঠতে না পেরে, সে যান্ত্রিকভাবে নিবিড়ের দিকে ফিরে এলো।
"আ... আসুন ভাইয়া,"
তার স্বর ফিসফিসানির মতো শোনালো।
নিবিড় একবার রাবতির বিভ্রান্ত মুখভঙ্গি লক্ষ্য করে সতর্ক পদক্ষেপে সেও ভেতরে প্রবেশ করলো।
দোয়েল নিরবে এগিয়ে চললো একটি কক্ষের দিকে। সেই পথ অনুসরণ করলো নিবিড় ও রাবতি। করিডোরের বাতাসে এক অশুভ পূর্বাভাস ভাসছে
দোয়েল রুমটির দরজায় হাত রাখে। তার আঙুলগুলোর স্পর্শ বরফের মতো ঠান্ডা। নিঃশব্দে সে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে, যেন সে আসছে কোনো গভীর গোপন রহস্য উন্মোচন করতে। আলো জ্বালিয়ে সে এগিয়ে যায় ভেতরের দিকে। নিবিড়ও ভেতরে পা রাখলো।
আলো পড়তেই নিবিড়ের চোখ দুটো স্থির হয়ে যায়।
বিছানায় গুটিয়ে শুয়ে আছে মুনিয়া। লাইটের আকস্মিক ঝলকে তার ঘুম ভাঙলো। চোখ-মুখ কুঁচকে সে উঠে বসার চেষ্টা করে।
ঠিক তখনই, দোয়েল ড্রয়ার থেকে এক গোছা চাবি বের করে। ধাতব চাবিগুলোর টুংটাং শব্দে ঘরের নিস্তব্ধতা আরও গাঢ় হয় যেন। সে বিছানার দিকে এগোয়।
দোয়েল কম্বলটি সরাতেই, নিবিড়ের চোখ ছানাবড়া।তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
মুনিয়ার সরু হাত-পা গুলো শক্ত শিকল দিয়ে খাটের পায়ার সাথে বাঁধা। এটি কোনো সাধারণ শৃঙ্খল নয়, যেন কোনো গোপন বন্দিত্বের সাক্ষ্য।
দোয়েল একে একে তালা খুলে শিকলগুলো মুক্ত করে দেয়। প্রতিটি তালা খোলার শব্দ যেন নিবিড়ের কানে হাতুড়ির মতো আঘাত করে যাচ্ছে ।
শিকলমুক্ত মুনিয়ার দৃশ্য দেখে নিবিড় যেন আকাশ থেকে পড়ল। তার কণ্ঠে চরম অবিশ্বাস আর ধাক্কা।
"এসব কী, এটম?"
দোয়েল উত্তর দিল না। তার নীরবতা এক কঠিন দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে রয়।
ওদিকে, মুক্তি পাওয়া মাত্রই মুনিয়া বিদ্যুৎ স্পৃষ্টের মতো উঠে দাঁড়ালো। তার দৃষ্টিতে ক্ষোভের আগুন, রুদ্ধ ক্রোধ...
"ইউ ব্লাডি বাস্টার্ড!"
মুহূর্তের মধ্যে অপ্রত্যাশিতভাবে মুনিয়ার হাত উঠে গেল এবং সপাতে একটি চড় বসিয়ে দিল দোয়েলের গালে।
এই আকস্মিক সহিংসতায় নিবিড় যেন হতভম্ব হয়ে যায়।সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দোয়েলকে হেঁচকা টানে মুনিয়ার সামনে থেকে সরিয়ে আনে। নিজের চোখে সে মুনিয়াকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করে।,হয়তো সংযত হওয়ার ইশারা।
কিন্তু মুনিয়া তখন থামার পাত্রী নয়। তার শ্বাস-প্রশ্বাসে তীব্র উত্তেজন নিয়ে বলে...
"তোকে আমি পুলিশে দেব! আমাকে কিডন্যাপ করেছে এই মেয়েটা, নিবিড়! আমায় মেরে ফেলতো!"
রাবতি এবার আর নীরব থাকতে পারলো না। সে ভ্রু কুঁচকে, তীক্ষ্ণ ধমকের সুরে এগিয়ে এসে বলে ওঠে...
"এই মেয়ে! এসব উল্টোপাল্টা কী বলছেন? মেরে ফেলতো মানে কী? আপনাকে তো ও বলেই দিয়েছে কাল সকালে ছেড়ে দেবে। আর কিডন্যাপ করেছে মানে কী? এ বাড়িতে আপনার কী অসুবিধা ছিল? খাওয়া-দাওয়া, গোসল, ভিডিও গেম সবই তো ঠিকঠাক ছিল! এখন নাটক করছেন কেন?"
মুনিয়া নাটকীয় ভঙ্গিতে, প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে নিবিড়ের দিকে ফিরল। তার কণ্ঠে অভিযোগের ধার....
"নিবিড়, এই মেয়েটা আমাকে তোমার থেকে আলাদা করতে চায়!"
নিবিড় এবার মুনিয়ার দিক থেকে মুখ ঘোরালো। তার চোখ গিয়ে পড়লো দোয়েলের দিকে। মেয়েটি তখনো দাঁড়িয়ে, যেন সমস্ত অনুভূতিশূন্য হয়ে গেছে। তার দৃষ্টি স্থির, সরাসরি নিবিড়ের দিকে নিবদ্ধ। সেই দৃষ্টিতে কোনো জড়তা নেই, কেবল একরাশ গভীর হতাশা আর ক্লান্তির ছাপ। এমন এক ছাপ, যেন সে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় কিছু একটা চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে।
নিবিড়ের কণ্ঠস্বর কঠিন, বিষাক্ত হয়ে উঠে। সেই স্বর ছুরির ফলার মতো দোয়েলের বুকে বিঁধলো...
"তোমার মন-মানসিকতা এতটা নিচু, দোয়েল?"
নিবিড়ের কন্ঠে তীব্র ঘৃণা। সেই ঘৃণার ভারে দোয়েলের বুক ভেঙে যায় বার বার। যেন এক মুহূর্তে পৃথিবীর সব আলো নিভেছে তার। দুনিয়ার সবকিছু তার কাছে দুলে উঠল। তার মনে তখন কেবল একটাই প্রশ্ন,
সে কী করল? কার জন্য এই চরম পথ বেছে নিল?
"এই মেয়ে, তোমার বয়স কত? এখনো আঠারোর গণ্ডি পার হওনি। এতটুকু বয়সে এতটা নোংরা কাজ করলে তুমি? কিডন্যাপ করলে?"
দোয়েল উত্তর দিতে পারল না। তার ভেতরের সমস্ত উৎসাহ, সমস্ত উদ্দামতা যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে। তার কণ্ঠনালী রুদ্ধ, শব্দ উৎপাদনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে সে।
নিবিড়ের কন্ঠস্বর আরও কঠিন হলো, যেন পাথর কেটে বের হচ্ছে.....
"এসব করার কারণ কী, বলো? তোমাকে তো আমি সেদিনই বলেছি এই এনগেজমেন্ট, এই বিয়ে, এসব সত্যি নয়! তাহলে কেন এসব? নিজেকে ভাবোটা কী তুমি, হ্যাঁ? লুক অ্যাট ইউ... অলসো মুনিয়া। শি ইজ পারফেক্ট। অ্যান্ড ইউ?"
নিবিড়ের মন তখন চিৎকার করে চাইছিল দোয়েল একবার বলুক, সে তাকে ভালোবাসে। একটিবার উচ্চারণ করুক, সে এসব করেছে শুধু তার নিবিড়কে পাওয়ার জন্য, তাকে ভালোবাসে বলে। শুধু একবার..
কিন্তু তাকে হতাশ করে দিয়ে দোয়েল এবারও উত্তর দিল না। নীরবে, এক ভগ্ন হৃদয় নিয়ে সে দরজার দিকে পা বাড়ালো। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন শরীরের শেষ শক্তিটুকু নিংড়ে নেওয়া।
নিবিড় দ্রুত এগিয়ে এসে রাগী কন্ঠে জিজ্ঞেস করল....
"কথার উত্তর না দিয়ে যাচ্ছো কোথায় তুমি?"
দোয়েল ধীর গতিতে প্রায় ফিসফিস করে বাইরের দিকে যেতে যেতে উত্তর দেয়...
"পুলিশে দিবেন তো? আমি নিজেই যাচ্ছি আত্মসমর্পণ করতে। নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেবো। আপনাকে চিরকালের জন্য মুক্তি দিলাম, নিবিড় ভাইয়া।"
বলতে বলতেই দোয়েল তার বাঁ হাতের অনামিকা আঙুল থেকে সেই বিশেষ আংটিটা খুলে নিল। ধীর গতিতে, যেন সময়ের প্রবহমানতাকে তোয়াক্কা না করে আংটিটা সে মেঝের শীতল টাইলসের ওপর ফেলে দেয় মেয়েটি।
একটা তীক্ষ্ণ, ধাতব শব্দ 'টং'.... নিবিড়ের কানে শুধু সেই আংটি পড়ে যাওয়ার আওয়াজটাই বাজতে লাগে বারবার। আওয়াজটি মিলিয়ে যাওয়ার আগেই দোয়েল ঘর থেকে বেরিয়ে যায় অজানায়।
নিবিড়ের কানে তখনো বাজছে মেয়েটার বলা কথাগুলো।
'মুক্তি দিলাম' এই কথাটার মানে কী? নিবিড় তো তা চায়নি। কেন এই মেয়েটা সবসময় উল্টো বোঝে? কেন একটিবার নরম হয়ে ভালোবাসার কথাটা স্বীকার করে না? কেন?
সেই প্রশ্ন তার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে ঢেউ তুলল।
ঘরের মধ্যে রাবতি বিচলিত হয়ে পেছন থেকে দোয়েলকে গলা চড়িয়ে ডাকে...
"আরেহ বড়পাখি! এত রাতে একা একা যাচ্ছিস কোথায়?"
মুনিয়া নিবিড়কে তখনো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দ্রুত তাগাদা দিয়ে বলে...
"নিবিড় ভাই। হা করে দেখছো কী? ওকে আটকাও..."
মুনিয়ার কথায় যেন নিবিড়ের ঘোর কাটলো। মুহূর্তেই সে মেঝে থেকে দোয়েলের ফেলে যাওয়া আংটিটা তুলে নেয়। সেই ধাতব বৃত্তটি এখন তার হাতের মুঠোয়, এক ভাঙা প্রতিশ্রুতির প্রতীক।
ছুটে বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। রাবতিকেও বের হতে দেখে নিবিড় তাকে থামায়...
"তোমার যাওয়া লাগবে না। ভেতরে যাও। মুনিয়া তোমায় সবটা বলবে।"
এরপর আর পেছন ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করল না নিবিড়। তার মনোযোগ শুধু সামনের দিকে। সে মূল সড়কে উঠে দোয়েলের পিছু ছুটতে লাগল। ততক্ষণে দোয়েল অনেকটা পথ এগিয়ে গেছে। ভাঙাচোরা বুক নিয়ে মেয়েটি ছুটে চলেছে শুনশান সরল রাস্তা ধরে। বুকের ভেতর তীব্র ঝড়। সে কী হারালো? কিসের জন্য এই চরম কাজ করল? কার জন্য এত নিচু হতেও তার একবার বুক কাঁপল না?
সেই মানুষটাই তো তার নয়। সে তো মুনিয়ার। দোয়েলকে তো নিবিড় ভালোবাসে না। কেন সে জোর করে নিবিড়ের ভালোবাসা চেয়েছিল? কেন তার মধ্যে এতটা লোভ জন্মালো? বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়াতে চাওয়াটাই যে দোয়েলের অপরাধ। একটি সামান্য ভালো থাকা, এক বুক ভালোবাসার এই লোভটাই আজ তাকে প্রাণবন্তের বিপরীত দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার যে আর কিছুই নেই। যেই মানুষটাকে ভেবে সে স্বপ্নে নিজের সংসার সাজিয়েছিল, সেই মানুষটাই তো তার নয়।
তিক্ত অনুভূতি আর জমাট রাগের সংমিশ্রণে মেয়েটি এক উন্মাদ বেগে ছুটে চলে। রাস্তার শুনশান নীরবতা ভাঙতে লাগে তার প্রতিটি পদক্ষেপে। রাগে নিজের হাতের কাঁচের চুড়ি, গলার ডিজাইনার হার, কানের দুল, কপালে পরা টিকলি, সব একে একে টেনে হিঁচড়ে খুলে রাস্তায় ছুড়ে ফেলতে লাগলো দোয়েল। সম্পর্কের প্রতীক এই অলংকারগুলো যেন তার ব্যর্থ ভালোবাসার বোঝা, যা সে দ্রুত ত্যাগ করতে চাইছে.
নিবিড় পেছন থেকে গলা ফাটিয়ে ডাকছে, কিন্তু দোয়েল একবারও পিছনে ফিরে তাকায় না। নিবিড় দেখতে পায়, মেয়েটি কীভাবে নিজের অলংকার ছুড়ে ফেলছে, কীভাবে নিজের লক্ষ্মীশ্রী মুখটার সমস্ত সাজ এলোমেলোভাবে মুছে দিচ্ছে। লিপস্টিক, কাজল সব হাতের তালু দিয়ে জোরে ঘষতে ঘষতে লেপ্টে দিচ্ছে।
নিবিড় ডেকেই যায়, কিন্তু তার আর্তনাদ শোনার মতো অবস্থায় ছিল না দোয়েল। তার সামনে তখন কেবল মুক্তি আর অন্ধকারের পথ।
নিজের গাড়ির কাছে এসে দোয়েলের দৌড়ের গতি কমতে দেখে নিবিড়ের হৃদয়ে সামান্য শান্তির ঝলক খেলে গেল। সে ভাবল, হয়তো এইবার দোয়েল থামবে, গাড়ির কাছেই। সে নিজেও গতি কিছুটা কমিয়ে দিল যেন দোয়েলকে সুযোগ দিচ্ছে।
কিন্তু দোয়েল তার সেই আশাতেও জল ঢেলে দেয়।
বারবার উঁচু হিলের জুতোর কারণে ছিটকে পড়ছিল সে। এবার পা থেকে সেই উঁচু পাথরের কারুকাজ করা স্টিলেটো জোড়া খুলে রাস্তার পাশে ছুঁড়ে ফেলে দেয় মেয়েটি রাগে। খালি পায়েই আবার উন্মাদ বেগে সামনে ছুটে চলে সে।
তা দেখেই নিবিড়ের বুক আবার কেঁপে উঠল। দূরত্ব তখনো অনেক। এভাবে আর সে পারবে না। দ্রুত তাকে অন্য উপায় নিতে হবে। সিদ্ধান্ত নিল গাড়ি নিয়ে তাকে ধরতে হবে।
ক্লান্ত চোখে সামনে তাকায় নিবিড়। তার চোখে পড়ল এক ভগ্ন হৃদয়ের কিশোরী, যে মেয়েটা নিবিড়ের ব্যক্তিগত সম্পত্তি , তার নিজের নারী। সাদা রঙের ছড়ানো লেহেঙ্গাটা উঁচিয়ে সে ছুটে চলেছে পিচের রাস্তার মাঝ বরাবর। দৌড়ানোর সাথে সাথে মেয়েটির হালকা কোঁকড়ানো চুলগুলো বাতাসের সাথে এক মোহনীয় ভঙ্গিমায় দুলছে।
নিবিড় ঘন শ্বাস নিল। তার ভেতরের সত্তা এবার চিৎকার করে ওঠে..
"পালিও না, মেয়ে। পালিও না।পালিয়ে না তুমি বাঁচতে পারবে, আর না আমি তোমায় ছাড়া বাঁচতে পারবো।"
এই স্বীকারোক্তি, যা সে মুখে উচ্চারণ করতে পারেনি, তা তার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে অনুভব করলো। যে দোয়েলকে সে ভালোবাসার কথাটি বলতে পারেনি, সেই দোয়েলই আজ তার জীবন থেকে চিরমুক্তির পথে ছুটছে। আর সেই মুক্তিই হলো নিবিড়ের জীবনের সবচেয়ে বড় বন্দিত্ব।
নিবিড় দ্রুত গাড়ির দিকে পা বাড়ায়। তার চোখে তখন শুধু সেই সাদা লেহেঙ্গায় মোড়া, পাগলপ্রায়, মুক্ত কেশী বালিকা।
হঠাৎই পাশ থেকে তীব্র গতিতে একটি কালো ছায়া বিদ্যুৎবেগে ছুটে গেল। একটি গাড়ি....
সচল মস্তিষ্কে নিবিড় একবার সেদিকে তাকায়। মুহূর্তেই তার মুখ দিয়ে এক আতঙ্কিত চিৎকার বেরিয়ে আসে। মেয়েটা যে তখনো রাস্তার ঠিক মাঝ বরাবর দৌড়াচ্ছে।দোয়েল যেন তখনো শুনতে নারাজ। তার কান রুদ্ধ, চোখে শুধু সামনে পালিয়ে যাওয়ার উন্মাদনা। সে ছুটে চলে, শুধু ছুটেই চলে।
আর ইতস্তত না করে নিবিড়ও গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে করতে দোয়েলকে সরে যেতে বলে, দ্রুত ছুটে যায় তার দিকে। তার শিরায় শিরায় রক্ত হিম হয়ে আসে। একটু হলেই যে একটা ভয়াবহ অঘটন ঘটে যাবে।
কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। তবে যা হলো তা ছিল নিবিড়ের চিন্তারও বাইরে, কল্পনাতীত।
সামনে গিয়ে গাড়িটি দোয়েলকে পাশ কাটিয়ে নিল। গতিতে তারতম্য নেই একটুও। সেই একই তীব্র বেগ। হঠাৎ... পাশ থেকে গাড়ির দরজাটা খুলে যায়। সময় যেন থমকে গেল সেই মুহূর্তে। চোখের পলকের চেয়েও দ্রুত গতিতে, গাড়ির ভেতর থেকে কয়েকটি হাত বেরিয়ে এল। চলন্ত সেই গাড়ি থেকে দোয়েলকে টেনে তুলে নেয় হাহাকারের হাতগুলো।
শুনশান রাস্তা কাঁপিয়ে, বাতাসের বুক চিরে এক মর্মভেদী "আআআআআহ্" চিৎকার ভেসে আসে দোয়েলের। সেই আর্তনাদ দ্রুতগামী গাড়ির পেছনে মিলিয়ে যায় সহসায়।
নিবিড় তখনো দৌড়াচ্ছে। তার সামনে এখন শুধু শূন্য রাস্তা আর বাতাসে দোয়েলের আর্তনাদের প্রতিধ্বনি। যে মুক্তি সে দিতে চেয়েছিল, তা অন্য কেউ ছিনিয়ে নিয়ে গেল আলোর গতিতে। কিন্তু দোয়েল যে শুধু তার ব্যক্তিগত সম্পদ, অন্য কেউ কি করে দোয়েলের সেই নরম কোমল দেহ স্পর্শ করে....!!!!