দোয়েল ফিরেছে নির্জনে। আজ বাড়ি ফেরার তাড়া নেই যেন তার। বিকেল হয়েছে, সেই সাথে তার বিরহেরও কয়েক প্রহর। দিঘীর পাড়ের জায়গাটা মোটামুটি মানব চারনে শূন্য। হাতে গোনা কয়েকটা কাপল নিজেদের প্রেম বিনিময় করে হেঁটে চলছে সুখের ঠিকানায়। আর সাদা পোশাকের মিষ্টি দেখতে একটি পাখি দু হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে দিঘীর কলকলে পানির একদম সামনে। সময় অতিবাহিত হয়, পাশ থেকে কয়েকবার যে কেউ একজন তাকে নাম ধরে ডাকছে তা যে অন্তরাতে পৌছাতেই পারে না তার। হঠাৎ মাথার উপর কারোর হাতের স্পর্শ পেতেই প্রকম্পিতে চোখ তুলে তাকায় দোয়েল। পরিচিত মুখটা উজ্জল হতেই দোয়েল যেন দেহে প্রান ফিরে পায়। এলোমেলো পা ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে... "আ্ আপনি এসেছেন? আ্ আমি জানতাম আপনি আসবেন, আমাকে এতটা কষ্ট দিবেন না আপনি আমি ঠিক জানতাম। আমায় তো আপনি ভালোবাসেন তাই না? ম্ মুনিয়ার সাথে সবটা মিথ্যা ছিলো তাই না? আপনি শুধু আমার, আ্ আপনি আমাকেই বিয়ে করবেন তাই না বলুন? " "বড়পাখি কুল ডাউন, কি হয়েছে তোমার? " দোয়েল উতলা হয়, চোখের পানি আজ বাঁধ ভেঙেছে। সামনের পুরুষটির একটি হাত নিজের দু হাত দিয়ে আগলে ধরে সে.. "কি হয়েছে মানে? আপনি নাটক করছেন? জানেন না কি হয়েছে? আ্ আমি আপনাকে ভালোবাসি বুঝেও কেন আমাকে কষ্ট দিয়েছেন হ্যা? দ্ দেখুন? আমার কি অবস্থা হয়েছে? আ্ আমাকে এমন দেখতে ভালো লাগছে আপনার? আ্ আমি ভালোবেসে কি অপরাধ করেছি? আমি তো আপনাকে চেয়েছি, আমাকে বুঝার মতো কাউকে চেয়েছি। আপনি প্লিজ আমায় এভাবে ছেড়ে দিবেন না। দেখুন না? আজ আমি আত্মসম্মানবোধ হারিয়ে আপনার কাছে আপনাকে ভিক্ষা চাইছি। আমার একটু যত্ন নিন না? একটু চোখের পানিটা মুছে দিন? আমার মাথায় একটু হাতটা বুলিয়ে দিন না নিবিড় ভাইয়া? বিশ্বাস করুন আ্ আমি সব করবো আপনার জন্য। আপনার যোগ্য বউ হবো৷ ম্ মুনিয়ার মতো হট ড্রেস পড়বো, সাজবো, চুলে রং করবো সত্যি বলছি। আমাকেও আপনার সাথে মানাবে, বিশ্বাস করুন না আমায়? আমি সব কিছু করবো যা যা আপনি চাইবেন, তবুও আমায় একটু ভালোবাসুন না নিবিড় ভাইয়া? আমি আপনার একটু ভালোবাসা চাই, আমি আপনার বউ হতে চাই। আমার আর সহ্য হচ্ছে না প্লিজ, আমাকে একটু যত্ন নিন, আমি যত্নের অভাবে নিজেকে হারিয়ে ফেলছি। প্লিজ আমায় ভালোবাসুন না নিবিড় ভাইয়া, প্লিজ....." বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে আজ মেয়েটি। থরথর করে কাপতে থাকা হাত দুটি দিয়েও চেপে ধরে আছে সামনের লোকটির হাত। চোখ থেকে রোদচশমাটা খুলে নেয় আবির। দূর্লভ তাকিয়ে থাকে দোয়েলের ভঙ্গুর মূর্তির দিকে। দৃঢ়, বুঝদার মেয়েটাকে আবির এই প্রথমবার এতটা কাঙাল হতে দেখছে। মেয়েটা একটু সাহারা চাইছে, আর কারোর কাছে নয়, নিজের মনের মানুষটার কাছে। হায় আপসোস, তার কথা গুলো যে ভিন্ন মানুষে বর্তন করে ফেলেছে। "বড় পাখি, আমি আবির। " আবির, শব্দটা কানে যেতেই চমকে তাকায় দোয়েল। চোখে চোখ পড়তেই চকচক করে সবুজ রঙের নেকড়ে মনিজোড়া। নাহ, এটা তো তার নিবিড় নাহ? তড়িৎ গতিতে হাত ছেড়ে দিয়ে দু কদম পিছিয়ে পড়ে দোয়েল। ভেতরঘর থেকে একটি প্রশ্নই বার বার প্রতিধ্বনি হয় 'নিবিড় ভাইয়া আসে নি? একবার ও আসে নি লোকটা তার কাছে? লোকটা সত্যিই তবে তার নয়? ' ভারি পাথর চাপা দেয় বুকে। কোমল দু হাতে কাজলে ল্যাপটানো চোখ দুটো বাচ্চাদের মতো করে ডলে ডলে মুছে নেয়। কম্পমান গলার স্বরে পরিবর্তন আনতে চায়। আমতা আমতা করেই বলতে চায়... "আ্ আবির ভাইয়া। আ্ আমি আসলে... আপনি প্লিজ কিছু মনে করবেন না, আমি বুঝতে পারি নি এটা যে আপনি।। প্লিজ ভাইয়া.. " " চলো বাড়ি যাবে।" "হ্ হ্যা, যাবো। ব্ বাড়ি যাবো, আমি যাচ্ছি ভাইয়া। " বলেই তড়িঘড়ি করে কদম বাড়ায় মেয়েটা। সে যে অপ্রস্তুত হয়ে পরেছে এমন অবস্থায় আবিরের সামনে তা বুঝতে আর দেরি নেই আবিরের। দায়িত্বশীল মেয়েটা আজ নিজের ব্যাগটাও সবুজ ঘাসের উপর ফেলে রেখে চলে গেছে। আবির শুধু যাওয়ার পানে দেখে দোয়েলের। তারপর নীরবে ঝুকে দোয়েলের ব্যাগটা তুলে নিয়ে নিজেও বেরিয়ে পড়ে জায়গাটি থেকে। দোয়েলকে রিক্সার দিকে যেতে দেখে ডেকে বলে... "তোমার ব্যাগ এখানে। " ফিরে তাকায় দোয়েল। মেয়েটা এতটা অপ্রস্তুত হয়েছে যে নিজের দিক দিশাই হারিয়ে ফেলছে বারবার। হাতের কোনা দিয়ে নাক মুছে এগিয়ে এসে বলে.. "ও্ ওহ, ভ্ ভুলে গেছিলাম ভাইয়া। ধন্যবাদ। " আবির ব্যাগটা হাতে দেয় দোয়েলের। শান্ত স্বরে বলে... "গাড়িতে বসো যাও। " "ন্ নাহ ভাইয়া। আমি রিকশা নিয়ে চলে যেতে পারবো। " "আমার কথা শোনো বড় পাখি। গাড়িতে বসো। " আবিরকে সে সম্মান করে,কিছুটা ভয়ও পায়। তাই আর কথা না বাড়িয়ে আবিরের কথা মতোই গাড়িতে গিয়ে বসে সে। আবিরও আর প্রশ্ন করে না।ড্রাইভিং সীটে বসে একবার তাকিয়ে দেখে দোয়েল পাখির কাজল লেপ্টানো, চোখ লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে। তারপর নীরবে পকেট থেকে ফোন বের করে নিবিড়কে একটা টেক্স পাঠায়.. "যেখানেই থাকিস, ২০ মিনিটের মধ্যে বাড়িতে দেখতে চাই আমি।" তারপর আর একটি টু শব্দও না করে গাড়ির স্টেয়ারিংয়ে হাত চালিয়ে ছুটে যায় সে। ----- আবিরের মেসেজ পাওয়ার মাত্র ছুটে এসেছে নিবিড়। ঘড়িতে সময় দেখে নিলো উনিশ মিনিট তেইশ সেকেন্ড। পার্ফেক্ট টাইমিং। দ্রুত কদমে সিঁড়ি বেয়ে উপর তলায় পৌঁছায় সে। নিজের ঘরে যাওয়ার আগে পায়ের আওয়াজ কমিয়ে এগিয়ে যায় দোয়েলের ঘরের দিকে। না দেখার মতো করে ভেতরে উঁকি মেরে দেখে দোয়েল নেই৷ বিছানায় চড়ুই বসে গুনগুনিয়ে গানের সাথে কিছু একটায় রং করছে তুলির সাহায্যে। নিবিড় গলা খাখারি দিতেই চড়ুই চোখ তুলে তাকায়। এটা যে নিবিড় তা বুঝতে পেরে চমৎকার এক হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করে.. "নিবিড় ভাইয়া।কিছু লাগবে? " "আআআ তেমন কিছু নয়, তোমার বোন কোথায়? " "ওয়াশ রুমে গেছে। বের হলে আমি বলে দেবো আপনার কথা ওকেয়? " নিবিড় বাঁধা দিয়ে বলে.. "না না, তার দরকার নেই। আমি পরে কথা বলে নেবো। " "ওকেয়" চড়ুই আবার নিজের কাজে মন দেয়।নিবিড়ও বেরিয়ে আসে রুম থেকে। যাক এটম বাড়ি ফিরেছে ঠিক মতো তাহলে। রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে নেয় নিবিড়৷ ভেজা চুল গুলো মুছতে মুছতেই খেয়াল করে ডিভানে পায়ের উপর পা তুলে বসে ফোন টিপছে আবির। পেছনে ঘুরে তাকায় নিবিড়। এগিয়ে আসতে আসতে সুধায়... "হঠাৎ এত জরুরি তলব কেন ব্রো? এনিথিং রং? " আবির শান্ত স্বভাবের প্রতিবিম্বের ন্যয় এক পলক নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে দৃশ্য ফিরে ড্রেসিং টেবিলের দিকে চায়। জিজ্ঞেস করে.. "এঙ্গেজম্যান্টের রিং নিয়ে এসেছিস? " "হ্যা, পেমেন্ট করে দিয়েছি চারটারই। " আবির আবার চোখ নামায় ফোনে, কিছু একটা দেখতে দেখতে রয়েসয়ে বলে ওঠে.. "ভাবছি আম্মু আব্বুর সাথে চূড়ান্ত কথা বলবো আজ। " নিবিড় খুশি হয়ে এগিয়ে এসে ধপাশ করে বসে আবিরের পাশে। উৎফুল্ল কন্ঠে জিজ্ঞেস করে... "ছোটপাখিকে বিয়ের কথা বলবি? শোন, হার মানিস না। চেষ্টা করে যা তুই, যদিও আহিশ ছোটপাখিকে একটু বেশিই ভালোবাসে তবে... " "তোর আর বড়পাখির ব্যপারে বলবো। " থেমে যায় নিবিড়, প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে.. "মানে? আমাদের আবার কি? সব তো ফাইনাল.. " "তোদের বিয়েটার জন্য আমিই তো কনভেন্স করেছিলাম আম্মুকে৷ এবার ভাবছি বিয়েটা ভাঙার জন্যও আমিই কনভেন্স করবো । কি বলিস? " একলাফে উঠে দাঁড়ায় নিবিড়৷ চোখ মুখে ইলায়াতিম ভাব এনে বলে.. " এ গৌড়স্থান কি ঝাউড়া, তোর মগজ কি জায়গায় আছে? নাকি পু'টকিতে ট্রান্সফার হয়ে গেছে? শা'লা গা'ঞ্জাখোরের মতো ডেট ওভার খাইয়া আইছস নাকি? আমার বিয়ে ভাঙবি কোন দুঃখে? তোর কোন ভরা খড়ে আগুন লাগাইছি আমি? " আবির কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া দেখায় না। না একটিবার নিবিড়ের মুখের দিকে চায়। শুধু নীরবে হাতে থাকা ফোনে একটি ভিডিও প্লে করে টেবিলের উপর রাখে নিবিড়কে দেখিয়ে। থেমে যায় নিবিড়, দৃষ্টি নামিয়ে এক পলক তাকাতেই স্ক্রীনে ভেসে ওঠে এলোচুলের এক কন্যার বিম্ব। সাদা গাউনের এই রমনীটাকে এক নিমিষেই চিনে ফেলে নিবিড়৷ চুম্বকের ন্যয় খাবলে হাতে তুলে নেয় ফোনটি। দিঘীর পাড়ের সবুজ ঘাসের উপর রাজত্ব চলছে মেয়েটির। পা থেকে জুতো ছুড়ে, ব্যাগ ছুড়ে ফেলে তীব্র অভিমানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাদতে কাদতে বসে পড়ে দোয়েল। পাগলের মতো পা ছোড়াছুড়ি করছে একা একাই, কখনো কখনো আবার ভেতরের জমা কষ্ট গুলো সইতে না পেরে মাটি থেকে তরতাজা ঘাস খাবলে তুলে ছুঁড়ে ফেলছে এদিক ওদিক। কাঁদতে কাঁদতে একাকার অবস্থা করছে নিজের। হাতে পড়া রিনরিনে চুড়ি, কপালের টিপ, কোমল ঠোঁটের লিপস্টিক সব উদ্ভ্রান্তের মতো সরিয়ে ফেলছে দোয়েল পাখি। বিজারিত কান্বার সাক্ষী ছিলো শুধু তখন সামনের কলকলে দিঘীর পানি। আর সুরক্ষার জন্য লাগানো এই সিসি টিভি ফুটেজ খানা। তারপর বেশ অনেকক্ষণ পর ক্লান্ত হয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলে মেয়েটি, ঠোট ফুলিয়ে বাচ্চাদের মতো হিচকি তুলে কাদতে থাকে সে। কাঙালিনীর ন্যায় দু হাটু একত্রিত করে মুখ গুঁজে দেয় সেথায়। তার কিছুক্ষণ পর আবিরের আগমনের দৃশ্যটি ভাসমান হয়। নিবিড় স্তব্ধ নেত্রে শুধু দেখে যায়, দেখেই যায়। মুখ দিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারে না সে। "সকালে ও তোর জন্য সেজেছিলো। বাড়ির সবাই অবাক হয়েছিলো ওর চঞ্চল হাসি মাখা মুখ দেখে, ইভেন আমি নিজেও। আগে কখনো বড় পাখিকে এতো উৎফুল্ল হতে দেখেছিস? আমি তো দেখি নি এতটা। " বলতে বলতেই নিবিড়ের দিকে তাকায় আবির। একটু থেমে শান্ত, শীতল অথচ গম্ভীর কন্ঠে আবার উচ্চারণ করে... "অথচ সন্ধ্যে পর্যন্ত সময় টুকুও তুই ওর হাসিখানা স্থায়ী রাখতে পারলি না।" নিবিড় এবার চোখ ঘুরিয়ে তাকায় আবিরের দিকে। আবির বলে ওঠে... " ভেবেছিলো তুই এসেছিস ওকে ফিরিয়ে নিতে। তুই মনে করেই আমাকে আজ অনেক গুলো কথা বলে ফেলেছে মেয়েটি। যেগুলো হয়তো তুই আশাও করিস নি শুনবি বলে। " নিবিড় ভাঙা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো.. "ক্ কি বলেছে ও? " আবির ডিভান ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় আবির। আস্তে করে নিবিড়ের হাত থেকে নিজের ফোনটা নিয়ে বলে.. " যা আমরা আমাদের প্রিয় মানুষটার মুখ থেকে শুনতে চাই। যা শোনার মতো পরম সৌভাগ্যবান পুরুষ এই জগতে বিরল। যা অনুভব করানোর জন্য আমার মতো পুরুষও কাঙাল হয়ে পিছনে পড়ে থাকে একটি চঞ্চলা হরিণীর। তাই বলেছে।" নিবিড়ের বুকের ভেতর তোলপাড় করে যায় এক অদৃশ্য প্রবাহ। লম্বা শ্বাস টেনে রুক্ষ কন্ঠে জিজ্ঞেস করে... " আমায় ভালোবাসে বলেছে? " " বলেছে। আরো বলেছে মেয়েটি একটি সংসার চায়, বউ হতে চায়, একটি বটবৃক্ষের ন্যয় ছায়া হয়ে থাকার মতো আস্থা চায়। সে নিবিড় ভাইয়াকে চায় " নিবিড় অবিশ্বাস্য চাহনি নিক্ষেপ করে বলে.. "ও এসব বলেছে? " "হুম, কাঙালের মতো চেয়েছে তার নিবিড় ভাইয়া যেন একটু তার চোখের পানি মুছিয়ে দেয়, একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, একটু ভালোবাসা দেয়, যত্ন নেয়, এসব চাওয়ার বিনিময়ে সারা জীবনের জন্য নিবিড় ভাইয়ের সব কথা মানতে সে প্রস্তুত। " নিবিড় ঘন ঘন মাথা নাড়ায়৷ উদ্ভ্রান্তের ন্যয় বলে ওঠে.. " না না নাহ।এটমের বুক ফাটলেও মুখ ফুটে না। ও এসব বলার মেয়ে নয়, ও তখন রেস্টুরেন্টে চুপ ছিলো, আমি বার বার চেয়েছিলাম ও তখন একবার বলুক সে আমায় ভালোবাসে, শুধু একটি বার। কিন্তু ও বলে নি। আমি, মুনিয়া বার বার ওকে কথার আঘাত দিয়ে গেছি, ওর মুখ ফুটেনি। একটিবার বলে নি সে আমায় চায়। " "তুই তো এতটা বোকা ছিলি না নিবিড়।বড় পাখির জেদ, রনমূর্তির ভাব, ম্যাচিউরিটি ওর স্বভাবে মিশে গেছে। ছোট বেলা থেকে নিজেকে সবার সামনে কঠিন খোলসে আবৃত করে রেখেছে সে বেচে থাকার লড়াইয়ে। সবই তো জানিস তুই। ও তোকে একা চেয়েছিলো, বলতো সবটাই, হয়তো বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ই বলার প্রস্তুতি নিয়েছিলো। মুনিয়ার সামনে কেন, ও আর কারোর সামনেই পারতো না এসব তোকে বলতে। ও একান্ত শুধু নিজের মানুষটির কাছে নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করতে চেয়েছিলো, আর কারোর সামনে নাহ। কিভাবে আশা করিস মুনিয়া থাকা অবস্থায় ও তোকে প্রথমবারের মতো নিজের সমস্যা আত্মমর্যাদা খুইয়ে মনের কথা বলবে? তুই তো ওকে ঠিক মতো চিনেই উঠতে পারিস নি এখনো পর্যন্ত, ভালোবাসিস বলিস কি করে? " নিবিড় নীরব রয়, নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে আদেও সে দোয়েলকে তার প্রাপ্ত সম্মানটুকু দিতে পারবে তো? বিলম্বনায় ক্ষয়ে যায় সময়, নিবিড় সুদীর্ঘ এক নিঃশ্বাস নিয়ে বলে... "আমি নিবিড় বিন চৌধুরী, নিজের মন এবং মস্তিষ্ক দু দিক থেকেই শতভাগ নিশ্চিত যে আমার মনে আমার দোয়েল পাখি ছাড়া পর নারীর কোনো অস্তিত্ব নেই। আমি ওকেই ভালোবেসেছি, ভবিষ্যতেও জীবনের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার সময় টুকু পর্যন্ত ওকেই ভালেবাসবো। কিন্তু আমি শুনতে চাই ওর মুখ থেকে, তোর মাধ্যমে নয়, আমি নিজে শুনতে চাই যে ও আমায় ভালোবাসে। ও আমারই হবে, এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি চাই ও একবার আমায় ভালোবাসি বলুক, আমি পৃথিবীর সমস্ত সুখ ওর পায়ের কাছে এনে ফেলবো। আমাকে জোর করিস না ভাই, যা হচ্ছে হতে দে। " আবির শ্বাস ফেলে। মেনে নেয় সে নিবিড়ের কথা। বলে... "ঠিক আছে, যা ইচ্ছে কর। কিন্তু এসবের চক্করে আমার বোনের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। ওর কিছু হলে আমি প্রথম বারের মতো আমার নাড়ির সংযুক্ত ভাইয়ের বিপক্ষে যেতে বাধ্য হবো।" নিবিড় মুচকি হাসে। একই ভাবেই বলে ওঠে... " ছোটপাখি সব সময় হাসে বলে ভাবিস না ও খুব সুখে আছে। ও দারুণ ভাবে কষ্ট লুকাতে পারে। আমিও তোকে একই ভাবেই বলছি, তোর কারনে যেন আমার বোন অর্থাৎ ছোটপাখির কোনো ক্ষতি না হয়। তাহলে আমিও তোকে ছেড়ে আমার বোনের পক্ষে যেতে বাধ্য হবো। " "ঠিক আছে। মনে থাকবে আমার।আশা করি তুইও মনে রাখবি। " বলেই আবির আর এক মুহুর্তও দাঁড়ায় না। বেরিয়ে যায় নিবিড়ের ঘর থেকে। সে যেতেই নিবিড় এগিয়ে যায় ড্রেসিং টেবিলের কাছে। সেখানে থাকা একটি রিং বক্স হাতে তুলে নেয়। একটু আগে অর্ডার দেওয়া এঙ্গেজম্যান্টের আংটিগুলোই দোকান থেকে আনতে গিয়েছিলো সে। কনের আংটিটা নিরবে দু আঙুলের ডগায় তুলে নেয় সে। আর মাত্র দুটো দিনের অপেক্ষা, তারপর এই আংটি সে নিজে তার প্রেম নিবেদিনীর হাতে পড়িয়ে দিবে। মনে পড়ে আজ রেস্টুরেন্টের কথা। মেয়েটা ভেতর ভেতর ভেঙেছে, তবুও কতটা দৃঢ় ছিলো তার সামনে তখন, যেন খুবই সামান্য বিষয়। নীরবে মুনিয়ার সাথে দেখে গেছে নিবিড়কে। যা বুঝিয়েছে তাই হু হা করে বুঝেছে। শেষে নিবিড় হাস্যজ্জল মুখে বলেছিলো... "প্ল্যান সাকসেস হলেই আমরা একে অপরকে ভুলে যাবো মিস এটম। " দোয়েল নির্জীবের মতো উত্তর দিয়েছিলো.. "ভুলে যাবো " নিবিড় ফের প্রশ্ন করে.. "কবে?" পাখিটা নীরব দৃষ্টিতে কাঙালের মতো তাকিয়ে থাকে তখন তার দিকে। তারপর অনেকটা সময় পর রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার আগে উত্তর দিয়েছে.. "যেদিন টম-জেরিকে খেয়ে ফেলবে, যেদিন আগুনকে শীতল মনে হবে, যেদিন সূর্যকে পশ্চিম আকাশে উদিত হবে , যেদিন......... আমার পিঞ্জিরায় সিস্টোল আর ডায়াস্টোলের তীব্র যুদ্ধ শান্ত রনভূমিতে পরিণত হবে। "