Mr and Mrs Twins Return

পর্ব - ১৭

🟢

সামান্য খাবারের বিল পরিশোধ করতেই হিমসিম খেয়ে গেলো জিসান। মাত্র ছয় জন মিলে কি আর কখনো বিশ হাজার টাকার খাবার খেতে পারে? কিন্তু যেখানে নিবিড় আহিশের মতো খাদক উপস্থিত সেখানে তা অবশ্যই সম্ভব। বেছে বেছে সব থেকে দামী খাবারগুলোই অর্ডার দিয়েছে দুটো মিলে। বেশিরভাগ খাবারই প্যাকিং করে নিয়েছে । সেগুলো দেখে জিসান করুন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো...

"কিরে, বাড়িতে কি এক সপ্তাহ খাবার তৈরি করবে না? এখান থেকেই সব নিয়ে যাচ্ছিস? "

আহিশ দু হাত ভর্তি খাবারের প্যাকেট নিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে হতে বললো...

"আবে, তুই বিল পে কর গিয়ে। এসব পথ শিশুদের জন্য নিয়েছে "

নিবিড় পকেটে দু হাত গুঁজে আস্তে করে জিসানের পাশে দাঁড়িয়ে বললো...

"ইয়ে মানে... ভাইয়াআআ... কোনো হেল্প লাগবে? "

জিসান ভোতা মুখে তারার দিকে তাকিয়ে দেখে মিটিমিটি হাসছে সে। মুখ ফিরিয়ে নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বললো...

"বিপদে ফেলে ভাইয়া বলে টান দিচ্ছিস নিবিড় ভাই? আবির ভাই থাকলে মোটেও এমন করতো না। "

নিবিড় ভাব নিয়ে বললো..

"কিন্তু আমি তো আবির না,নিবিড়। নিবিড় তো এমন করতেই পারে। "

জিসান মুখ ভোতা করে তারার দিকে তাকিয়ে বললো...

"আআ,তুমি জেসি আর পাখির সাথে যাও, গাড়িতে বসো। আমরা আসছি। "

তারাও হাসতে হাসতেই বেরিয়ে গেলো দোয়েল আর জেসির সাথে। নিবিড়ও হাসছে মিটি মিটি জিসানের অবস্থা দেখে। জিসান বলে উঠলো...

"বিশ হাজার টাকা বিল আসছে ভাই। ঝিল পাড়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম, পকেটে যাস্ট চার হাজার নিয়েই বেরিয়েছিলাম, কার্ডও বাড়িতে। "

নিবিড় হাসতে হাসতে পকেট থেকে ফোন বের করে বিল পে করতে করতে বললো...

"ভেবেছিলাম অন্তত দশ হাজার নিয়ে আসবি। তুই তো আমার চিন্তার থেকেও বেশি কিপ্টা।"

জিসান মাথা চুলকে তাকায় নিবিড়ের দিকে। নিবিড় এবার হাসি থামিয়ে বললো...

"ভাবির জন্য কিছু নিয়ে এসেছিস? "

"হ্যা, ফুল এনেছিলাম তো। "

নিবিড় বের হতে হতে বললো...

"ইডিয়েট। ফোন চেক কর.."

জিসান চেক করতেই দেখলো নিবিড় মাত্রই তার একাউন্টে দশ হাজার টাকা ট্রান্সফার করেছে।

"ভাবিকে এমন কিছু গিফট কর যাতে তোদের ফার্স্ট ডেটের চিহ্ন হিসেবে সব সময় রাখতে পারে।"

জিসান হেঁসে বলে ওঠে...

"থ্যাংকস ব্রো, আমার তো মাথায়ই ছিলো না এসব।"

"এত থ্যাংকস দিতে হবে না, এই দশ হাজার বাড়ি গিয়ে রিটার্ন করবি,বউকে নিজের টাকায় গিফট করতে হয়। আর.... খাবারের বিলটা... ওটা আমার পক্ষ থেকেই ট্রিট, ঐ টাকা দেওয়া লাগবে না যা। "

জিসান হেঁসে বলে..

"ওকেয় ওকেয় ভাই। তোরা দুটো ভুল করেই আমার থেকে পাঁচ মাস পরে এসেছিস দুনিয়ায়, তোদের আগে আসার কথা ছিলো। "

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতেই গাড়িতে দোয়েলকে অচেতন অবস্থায় দেখে হাসি উভে গেলো নিবিড়ের। দ্রুত কদমে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো...

"কি হয়েছে ওর.. "

আহিশ ঘন ঘন দোয়েলের মুখে পানি ছিটিয়ে দিতে দিতে বললো..

"হঠাৎ করেই সেন্সলেস হয়ে গেলো। বুঝতে পারছি না... "

নিবিড়ের মুখে চিন্তার ছাপ পড়ে।এগিয়ে গিয়ে বার কয়েক ডাকে দোয়েল কে। একটু পরে জ্ঞান ফিরতেই সস্থির নিঃশ্বাস ফেলে তারা। নিবিড়, দোয়েলের ডান হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে ইমিডিয়েট ট্রিট হিসেবে হাতের তালু ডলতে ডলতে জিজ্ঞেস করে...

"এটম.. ঠিক আছো? খারাপ লাগছে বেশি? "

বেখেয়ালি নিবিড়ের হাত দোয়েলের কব্জিতে লাগতেই দোয়েল ব্যথায় ' আহ' করে হাত ছাড়িয়ে নেয়।নিবিড় তাকায় তার দিকে চিন্তিত দৃষ্টিতে। দোয়েলও নিজের হাতের দিকেই কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে। নিবিড় জিজ্ঞেস করে...

"কি হয়েছে হাতে? দেখি?..."

"ব্।বোন? বোনের নিশ্চয়ই হাতে আঘাত লেগেছে। এখানটায়... সেন্স হারালো কেন ও... "

দোয়েল উতলা হচ্ছে, এতক্ষণে সবাই বুঝতে পারে যে চড়ুইয়ের কারনেই দোয়েল হঠাৎ জ্ঞান হারিয়েছে। আহিশ তাকে থামানোর চেষ্টা করে বলে...

"আমি দেখছি কল করে। তুই শান্ত হ। "

আহিশ দ্রুত ফোন করে আয়েশার নম্বরে। রিসিভ হতেই আহিশ জিজ্ঞেস করলো...

"আম্মু, ছোট পাখি বাড়ি ফিরেছে? "

"হ্যা, একটু আগেই ফিরেছে.. "

"ও ঠিক আছে? কিছু হয়নি তো? বড় পাখি বলছে... "

" হ্যা, চুড়ি ভেঙে হাতে গেছে গিয়েছিলো। ব্লিডিং হয়েছিলো অনেক, তাই রক্ত দেখে জ্ঞান হারিয়েছিলো। তোরা চিন্তা করিস না, জ্ঞান ফিরেছে ওর। আবির হাত ড্রেসিং করেও দিয়েছে। দোয়েল ঠিক আছে? "

"হুম, আচ্ছা আমরা আসছি। "

"" ঠিক আছে, আস্তে ধীরে আয়, তারাহুরোর কিছু নেই। "

আহিশ সবাইকে সবটা জানাতেই একটু নিশ্চিন্ত হয় সবাই। কিন্তু দোয়েল চেয়েও নিজেকে শান্ত করতে পারে না, চড়ুইয়ের কিছু হলে যে মেয়েটা ভিষণ অস্থির হয়ে যায়। নিবিড় বুঝতে পেরে দোয়েলের মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে...

" এত চিন্তা করে না পাখি। শান্ত হও। আমরা বাড়ি যাচ্ছিই তো। "

দোয়েল মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিতেই নিবিড় গিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়, জিসানকে বলে...

"তুই ভাবিকে নামিয়ে দিস যা,.."

----------

হাতে ব্যান্ডেজ করে দিলেও আসেপাশে ছড়িয়ে যাওয়া রক্ত শুকিয়ে রয়েছে চড়ুই পাখির হাতে। আবির মাত্রই ভেজা তুলো দিয়ে রক্ত গুলো মুছে দিচ্ছিলো। সাথে জুলেখা দাঁড়িয়ে। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে সাবিহা। কিছুটা শান্ত হয়েছে সে,জিজ্ঞেস করে...

"কি অবস্থা ওর? "

আবির নিজের কাজে ব্যস্ত থেকেই উত্তর দেয়,

"জ্ঞান ফিরেছিলো,ঘুম পারিয়ে দিয়েছি, ক্লান্ততা কেটে যাবে। "

সাবিহা এগিয়ে গিয়ে চড়ুইয়ের আরেক পাশে বসে। ক্লান্ত মুখশ্রীতে আদুরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শান্ত স্বরে বলে...

"মেঝো.."

জুলেখা উত্তর দেয়..

"জ্বী ভাবি? "

"আবিরের সাথে একটু আলাদা করে কথা বলবো আমি। "

জুলেখা বুঝতে পারে, মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে দরজা ভিড়িয়ে বেরিয়ে যায়। সাবিহা আবিরকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে...

"ওর হাতটা ছাড় আবির... "

থমকে যায় আবিরের হাত। সাবিহার কথাটা যেন কানে এসেও আসতে চাইছে না। চমকে মায়ের দিকে তাকায় সে। সাবিহা আবারো চড়ুইয়ের হাতের দিকে ইশারা করে বলে...

"হাতটা ছেড়ে দে। "

আবির নীরবে মায়ের কথাই মেনে নিলো। চড়ুইয়ের হাতটা বিছানায় রেখে পাশ থেকে উঠে দাঁড়ায় সে। সাবিহা মুখ ঘুরিয়ে তাকায় চড়ুইয়ের ঘুমন্ত মুখশ্রীর দিকে। ওভাবেই ভিষণ শান্ত স্বরে বলে...

" মা নিয়ে ওর মাথায় উল্টোপাল্টা কথা কেন ঢুকিয়েছিস তুই? "

আবির বলতে নেয়..

"আম্মু আমি তো যাস্ট..."

"কেন ওকে বলেছিস আমি ওর কেউ না?ওর মা না? আমি ওকে বিশ্বাস করবো না?"

আবির তাকিয়ে থাকে শুধু সাবিহার দিকে। সাবিহার চোখে পানি ভীর করে। ঘন ঘন চড়ুইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে...

"প্রায় আট বছর ধরে এই মেয়ে দুটোকে আমি দেখছি। ক্লাস সিক্সে যখন প্রথম আহিশের সাথে স্কুলে মারামারি করেছিলো, স্যার ভিষন বকেছিলো এই মেয়ে দুটোকে। সেদিন জেদের বসে আহিশের পিছু পিছু লুকিয়ে এই বাড়িতে আসে ওরা প্রথমবার। এই ছোট পাখি ইচ্ছে মতো বিচার দিয়ে গেছে আহিশের নামে। বাচ্চা দুটো এতো মিষ্টি ছিলো, আমরা বিচার শুনবো কি, চড়ুই পাখির পাকা পাকা কথা শুনেই হেঁসে কুটি কুটি হচ্ছিলাম। সেদিন আমি যদি ওদেরকে বকে দিতাম, তাহলে আজ এতটা জড়িয়ে যেতো না মেয়ে দুটো আমাদের সাথে। আমি বুকে জড়িয়ে ধরেছিলাম ওদের। মেয়ে দুটো এতো আদরের কাতর, ইচ্ছে করে আহিশের সাথে ঝগড়া করে বাড়ি আসতো বিচার দেওয়ার নাম করে শুধু আদর খেতে। আমারও ভীষন মায়া লাগতো ওদের। নিজেই আহিশকে বলতাম নিয়ে আসতে ওদেরকে। মাঝেমধ্যে আমি স্কুলে গিয়েও দেখে আসতাম মন চাইলে। তোদের বাবা চাচারাও যেতো এই মেয়ে দুটোকে দেখতে। তোরা যেই বয়সে আমার থেকে দূরে গিয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার বেছে নিয়েছিলি, এই মেয়ে দুটো ওদের সেই বয়স থেকে আমার কাছে আসে। কেন আসে জানিস? কারন ওদের মা নেই, দ্বিতীয় বিয়ের পর বাবাও আর ওদের নেই। স্কুলে বাচ্চারা ওদের নিয়ে হাসতো মা নেই বলে। লাঞ্চ টাইমে ওদের কেউ এসে টিফিন দিয়ে যেতো না, ছুটি হলে বাড়ি থেকে কেউ নিতে আসতো না। স্কুলে কোনো বাচ্চার সাথে মারামারি হলে অন্য বাচ্চাদের মা বাবা এসে টিচারকে বিচার দিতো, এই মেয়ে দুটোর পক্ষ হয়ে কেউ কখনো যায় নি বলে দোষ না থাকলেও বকা শুনতো, মার খেয়ে নিতো। স্কুল ছুটির দু ঘন্টা পাড় হয়ে গেলেও বাড়ি থেকে খোঁজ নিতো না কেউ এই মেয়ে দুটোর। ওরা মায়ের আদর পায় নি, সেই একটু আদরের লোভে মেয়ে দুটো বন্ধুত্ব করেছে আহিশ জেসির সাথে। যাতে এই বাড়িতে যখন তখন বন্ধুত্বের খাতিরে ছুটে আসতে পারে, একটু সময় আদরে থাকতে পারে যেন। একদিন তোর ফুপি ওদের এই বাড়িতে আসা নিয়ে বেশ বকেছিলো। তারপর মেয়ে দুটো আর এক সপ্তাহে এই বাড়ি মুখো হয় নি। আমার মন মানে নি, নিজে গিয়ে স্কুল থেকে নিয়ে এসেছি ওদের, দোয়েল কথা বলতে ভেবে চিন্তে বলতো প্রথম থেকেই। কিন্তু এই চড়ুই সেদিন আমায় আপন মনে বলেই বসলো.. " আমরা যে বারবার তোমাদের বাড়িতে আসি, তুমি কি রাগ করো? আসলে আমাদের আম্মু নেই তো, তুমি আমাদেরকে আম্মুর মতো করে ভালোবাসো তো তাই আসি। তুমি বারণ করে দিলে আর আদর খেতে আসবো না। '... আর আজ তুই এই মেয়েটাকে বুঝিয়েছিস আমি ওর কেউ না? আমি ওর মা না? "

সাবিহা কাঁদছে, আবিরের বুক ভার হয়ে আছে। ছেলেটা তেজিয়ান, কিন্তু নিজের ভুলকে সঠিক বলে চালিয়ে দেওয়ার মতো শিক্ষা নিয়ে বড় হয়নি সে। তাইতো এই সময়ে সে নীরব ভুমিকাই পালন করছে, হয়তো প্রশ্ন গুলো তার জন্যই তৈরী।

" যে মেয়েটা সেই ছোট্ট থেকে আমার হাতে খাবে বলে আবদার করতো, সেই মেয়ে ঐ দিন প্রথম আমার হাতে খেতে চায়নি। আমার ঠিক কতটা কষ্ট লাগছিলো ঐ মুহুর্তে তুই বুঝতে পারছিস একটুও? পুরোটা রাত আমি এটা ভাবতে ভাবতেই কেঁদেছি, তোর আব্বু আমায় বুঝিয়েছে ঘুমের ঘোরে মানা করেছে, কিন্তু আমার মন মানছিলো না একটুও। গত কয়েকদিনে একটিবারও মেয়েটা আমার কাছে কোনো কিছু নিয়ে আবদার করে নি। একটিবার নিজ থেকে এসে জড়িয়ে ধরে নি। জন্মদিনের সারপ্রাইজ পাওয়ার পর আমার আশা ছিলো সবার আগে চড়ুই এসে জড়িয়ে ধরবে আমাকে, কিন্তু সেদিনও ও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে আমার থেকে। দোয়েল আসলেও ও আসেনি একটিবারও আমার কাছে। এই দিন গুলো আমার ঠিক কেমন লেগেছে তুই কি আদেও বুঝতে পারবি কখনো? ও নিজেকে আমার থেকে সরিয়ে নিচ্ছিলো ধীরে ধীরে, কারন কি? তুই ওকে বুঝিয়েছিস আমি ওর কেউ না, ওর মা না। কেন এমনটা করলি বাবা তুই? কেন এই বোকা মেয়েটাকে তুই এসব বুঝাতে গেলি? মা নিয়ে কেন খোঁটা দিলি ওকে তুই? "

আবির এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে চড়ুই আর সাবিহার দিকে। এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর সে দিতে পারে না। কিন্তু এতটুকু সে বুঝতে পারে তার মা তার থেকেও বেশি এই মেয়েটাকে ভালোবাসে। কেন যেন আজ নিজের প্রতি রাগ হচ্ছে আবিরের। সেদিন যদি নিজের একটি ভালো ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আমেরিকার পথে পা না বাড়াতো, তাহলে আজ সেও তার মায়ের এতটা আদর পেতো, বুঝতো মাকে। তার থেকেও বেশি এই মেয়েটা প্রিয় হয়ে যেত না তার মায়ের কাছে।

আবির পিছু হটে,, দ্রুত কদমে বেরিয়ে যেতে চায় ঘর থেকে, অসহ্য লাগছে তার। ভীষণ রাগ লাগছে, কিন্তু কার প্রতি এই রাগ? মায়ের প্রতি, চড়ুইয়ের প্রতি নাকি নিজের প্রতি? সে জানে না। শুধু এতটুকুই জানে পরিস্থিতি তাকে তার মায়ের থেকে দূর করে দিয়েছে। যেটা এই ষোলো বছরে বিদেশে থেকেও অনুভব হয় নি, সেটা আজ মায়ের এতটা কাছে থেকেই অনুভব করছে সে। ভীষণ ভাবে...

"দাঁড়া আবির... "

মায়ের কন্ঠে থেমে যায় আবিরের পা। সাবিহা চোখ মুছে নিজেকে শান্ত করে উঠে দাঁড়ায়। এগিয়ে আসে আবিরের সামনে। আলতো হাতে আবিরের চুলের ভাঁজে হাত বুলিয়ে দেয় তিনি। বলে ওঠে...

"তুই তো আমার রাজপুত্র বাবা,এতগুলো বছর মায়ের থেকে দূরে ছিলি। কিন্তু আমি তো তোদের সব সময় দূর থেকে হলেও ভালো শিক্ষা দিয়ে এসেছি। ঐ দিন তোর সাথে ছোটপাখিকে দেখে আমি ভেবেছিলাম তুইও হয়তো ওকে পছন্দ করিস, তোদের দুটোর একসাথে একটা ভবিষ্যৎ হবে।"

আবির বিরস মুখে বলে...

"এমন কিছুই না আম্মু,আমি ওকে হেইট করি, বিরক্ত লাগে ওকে দেখলেই আমার। ঐ দিন তো শুধু মাত্র সামান্য একটা......"

"সামান্য। আমেরিকায় এসব খুব সামান্য বিষয় আমি জানি বাবা, তোর কাছেও সামান্যই। আমাকে তোরা কেউ না বললেও আমি এটা কখনোই বিশ্বাস করবো না যে ছোটপাখি নিজ থেকে তোর কাছে এসেছে। ও খুব বোকা ধাঁচের মেয়ে, আজকালকার যুগে এসব লাভ গেইমে কত কত বুদ্ধিমতী মেয়েরাও ফেঁসে যায়, সেখানে এই চড়ুইতো দুধভাত। তুই ওকে পছন্দ করিস না,কিন্তু তোর কাজ গুলোর কারনে ও তোর প্রতি দূর্বল হয়ে পড়বে, তোর প্রতি ওর মায়া জন্মে যাবে, ভালোবাসাও। আমার মেয়েটা অনেক কষ্ট পাবে তখন বাবা। তোর মনে যেহেতু ওর প্রতি কোনো অনুভুতিই নেই, তুই ওকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করিস না বাবা। ওকে নিজের এতটা কাছে টানিস না। ধরে নে এটা তোর মায়ের অর্ডার। "

আবির নিরবে তাকায় ঘুমন্ত চড়ুইয়ের দিকে। রাগ, ক্ষোব নাকি ক্লান্তি বুঝা গেলো না তার স্বরে, বলে উঠলো..

"ওকে নিজের কাছে টানার কোনো ইচ্ছেও নেই আমার। আই হেইট হার..."

আর থামে না আবির। গটগট পায়ে বেরিয়ে যায় রুম থেকে।

----

নিবিড় সহ দোয়েল, জেসি, আহিশ ফিরে আসে। বেশ কিছুক্ষণ আগেই। এসেছে ধরেই দোয়েল বসে আছে চড়ুইয়ের পাশে। এসেছে ধরেই সাবিহাদের একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে..

ও কি হাতে খুব ব্যথা পেয়েছে? বেশি রক্ত বেরিয়েছে বোনের? তোমরা বলছো ফ্লোরে পড়ে গিয়েছিলো। মাথায় আঘাত লাগে নি তো ওর?...

আহিশ তাকে থামানোর জন্য বলে..

"আর কোথাও ব্যাথা পেলে তুই তো বুঝতিই বড়পাখি৷ শান্ত হ না একটু। ফ্রেশ হয়ে আয়,ছোটপাখি তো ঘুমাচ্ছে এখন৷ "

দোয়েল শোনে না, বোনের ঘুম ভাঙার আগে এক চুলও নড়বে না বলে জানিয়েছে। হলোও তাই। চড়ুইয়ের ঘুম ভাঙতেই বোনকে দেখে নিজেকে গুটিয়ে নেয় মেয়েটা। সাবিহাকে নিজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দেখে আস্তে করে মুখ তুলে প্রশ্ন করে...

"ত্ তুমি কি আমার উপর রেগে আছো আন্টি? "

সাবিহাএকটু ভাব নিয়ে বলে...

"রেগে তো আছিই। শুধু তোর উপর না, তোদের দু বোনের উপরই। "

চড়ুই ভয় পায়, আন্টিকে এত করে অনুরোধ করার পরও কি তার সাথে সাথে বোনকেও খারাপ ভাবছে? করুন চোখে তাকায় মেয়েটা। এক্ষুনি হয়তো চোখ ভেঙে কান্না গড়িয়ে পড়বে।

এদিকে দোয়েল কিছু না বুঝতে পেরে প্রশ্ন করলো...

"কিন্তু আমরা কি করেছি আন্টি? "

"কি করেছিস মানে?শুনলাম আমার স্বামীকে বেশ আব্বু বলে ডাকা হচ্ছে দুজনার। আমি কোন দিক দিয়ে তোদের আদরে কমতি রেখেছি বলতো? এত কিছুর পরে আমার কি ইচ্ছে হয় না তোদের মুখে মা ডাক শুনতে? কই আমাকে তো একটাও একটু ভালোবেসে আম্মু বলে ডাকিস না তোরা। "

দোয়েলের বুক ভার হয়ে আসে৷ 'ড্রিমস কাম ট্রু ' কথাটা কি আসলেই প্রতিফলিত হয়েছে তার জীবনে? সাবিহার প্রতিটি কাজ দোয়েলের মন কাড়ে, মায়ের গায়ের মিষ্টি গন্ধটা কেমন ভুলে গেছে এই মেয়ে দুটো। কিন্তু এই যে এই মহিলাটার বুকে মুখ গুঁজলেই কেমন যেন মা মা গন্ধ পাওয়া যায়। আচরণ আবেগকে এগিয়ে দেয়, তেমনি এই মহিলাটার প্রতিটি আচরনও দোয়েলের মনে সুপ্ত এক ইচ্ছে জাগিয়েছে। বহু দিনের প্রতিক্ষ একটি ডাকের ইচ্ছে, একবার আন্টি থেকে সোজা আম্মু বলে ডাকতে। কিন্তু আর যাই হোক,মা ডাকার জন্য আবদার তো আর করতে পারে না দোয়েল, তাই মনের ইচ্ছেটা মনেই রয়ে গেছে এতগুলো দিন। আজ সাবিহা নিজ থেকে বলছে, হঠাৎ করে মনে হলো আন্টি দেখতে একদম তাদের মায়েরই মতো। হাসি কান্না সব একই রকম, কিন্তু এমন মনে হওয়ার কারন কি? ভাবতে চাইলো না দোয়েল, সে পূর্ণতা পেয়েছে নিজের স্বপ্নের৷ হুহু করে কেঁদে উঠলো সাবিহাকে জড়িয়ে ধরে। সাবিহাও আগলে নিলো তাকে৷

চড়ুই এগোয় না, শুধু নীরবে চেয়ে থাকে তাদের দিকে। সাবিহা তার দিকে এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে করুন কন্ঠে বললো...

"আর কত কষ্ট দিবি তুই আমায়? আর কত জ্বালাবি? এখন থেকে আমি আর তোদের মায়ের মতো না, মা-ই তোদের। আয় আমার বুকে আয় এবার? "

চড়ুই পারে না বারন করতে, ছোট্ট হৃদয়টা সাবিহার আবদারকে ফেরাতেও পারে না। ধীরে গিয়ে হালকা জড়িয়ে ধরে সাবিহাকে। সাবিহা লক্ষ্য করে তার পিঠে হাত দিয়ে বললো...

"শক্ত করে জড়িয়ে ধর? আমি তোকে বিশ্বাস করি তো মা। এত দূরত্ব কেন রাখছিস তুই আমার থেকে? আমার মেয়েদের আমি বিশ্বাস করবো না তো কে বিশ্বাস করবে আর? ভালো কাজে যেমন খুশি হই, খারাপ গুলোতে কি একটু ডাক দিতেও পারবো না আমি? আমার মেয়েদেরকে কি আমি শাসন করতে পারবো না নাকি বল? আমার থেকে দূরত্ব বাড়াতে চাইলে মারবোও তো আমি তোদের।বোকা মেয়ে আমার, দূরে সরতে চায়... "

Mr and Mrs Twins Return গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় টুইন রিলেটেড রোমান্টিক গল্প