"এই মেয়ে, ছাড়ো আমাকে।একদম আছাড় মেরে ফেলে দেবো কিন্তু. "
চড়ুই কিটকিটিয়ে হেঁসে দেয় আবিরের কথায়।হেঁসে আরেকটু গলা জড়িয়ে ধরে আবিরের..
" ফেলে দিবেন বলেই তো আপনাকে চেপে ধরেছি। এবার ফেলে দেখান দেখি। "
আবির চড়ুইয়ের পিঠের দিকের এক হাত ছেড়ে দেয়, কিন্তু তাতে কোনো লাভই হয় না, কারন চড়ুই আবিরের গলা জড়িয়ে ধরে একপ্রকার ঝুলে আছে।
আবির আপন মনেরই বিড়বিড় করে ওঠে..
"এই মেয়েটা বড্ড পাঁজি। "
একটু পরেই বাড়ি থেকে দোয়েলকে নিয়ে বেরিয়ে এলো নিবিড় আহিশ আর জেসি। কয়েকবার বলেও দোয়েলকে কোলে তুলতে পারে নি নিবিড়। মেয়েটা আহিশ আর জেসির হাত ধরেই খুরিয়ে খুরিয়ে আসছে গাড়ির কাছে। গাড়িতে উঠার সময় পায়ে চোট লাগতেই দোয়েল ব্যথায় হালকা কুঁকড়ে ওঠে, তাকে ধরতে ধরতে নিবিড় বললো..
"আরে সাবধানে। বললাম কোলে ওঠো,নিজেও দোল খেতে খেতে আসবে আর আমিও আরাম পাইতাম। এমন অফার কয়টা মেয়ে পায় বলো? "
নিবিড়ের কথার ধরন একটুও পছন্দ হয় না দোয়েলের। এই লোকটাকে যতটা ভদ্রলোক ভেবেছিলো ততটাও নয়, এমনিতেই দোয়েল আছে চিন্তায়, তার উপর এই নিবিড় একটু পরপরই উল্টো পাল্টা কথা বলে যাচ্ছে। দোয়েল এবার চোখ রাঙিয়ে তাকায় নিবিড়ের দিকে বিরক্তির সহীত।তা দেখে নিবিড় মিথ্যা ভয় পাওয়ার ভান করে বললো..
"ওরেহ বাবাহ, চোখ তো নয় যেন ভ্যাম্পায়ারের দৃষ্টি। গরম হইও না এটম বোম।বি কুলল.."
দোয়েল বিরক্ত হলেও কথা বাড়ায় না, আস্তে করে গাড়িতে উঠে বসে। বাইরে তাকিয়ে চড়ুইকে বলে..
"বোন? তুই গাড়িতে বসিস নি কেন? নেমে আয়? "
দোয়েলের কথায় এবার চড়ুই আবিরের দিকে তাকিয়ে বলে..
"আমাকে গাড়িতে দিয়ে আসুন? "
আবির চোখ গরম করে তাকায়, সাহস কত এই মেয়ের, আবির বিন চৌধুরীকে অর্ডার করছে। একে তো পরে মজা বোঝানো যাবে।
কথা না বাড়িয়ে আবির চড়ুইকে গাড়িতে বসিয়ে দেয়। আহিশ আর জেসিও উঠে বসে পেছনে। আবির ড্রাইভিং সীটে বসে আর নিবিড় তার পাশে।
"আপনাদের মধ্যে দানাবলটা কে?"
চড়ুইয়ের কথায় আবির নিবিড় দুজনই পেছনে ফিরে তাকায়। দোয়েল আস্তে করে চড়ুইকে সতর্কতার সহীত হাত চেপে বোঝায় এমন করে না বলতে। চড়ুই বুঝতে পেরে আবার বলে উঠলো..
"আচ্ছা আচ্ছা সরি। আপনাদের মধ্যে দানাবলটা নয় কে? "
নিবিড় ফিক করে হেঁসে দেয়, বা হাত উপরে তুলে বলে...
"আমি, আমি দাবানল, থুরি দানাবল নই। "
চড়ুই ঠোঁট গোল করে বলে..
"ওহহো। তার মানে ড্রাইভার দানাবল আঙ্কেল, গাড়িটা একটু স্লো চালাবেন ওকেয়? পাখিরা হাই স্পিডে ভয় পায়। "
আবির পাত্তা না দিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়, তবে নিবিড় জিজ্ঞেস করে..
"কোন পাখিরা? "
চড়ুই উত্তর দেয়..
"এই যে আমি ছোটপাখি, আর আমার বোন বড় পাখি। "
"কিন্তু তার মধ্যে বড় কি আছে? সবই তো ছোট,আই মিন সেইম সেইম। "
জেসি বলে..
"আসলে দোয়েল চড়ুইয়ের থেকে এক মিনিটের বড়, তাই দোয়েল হলো বড়পাখি আর চড়ুই হলো ছোট পাখি।"
নিবিড় বিজ্ঞদের মতো মাথা নাড়িয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে বলে..
" ভাই, তুই ও আমার থেকে ২৮ সেকেন্ডের বড়, তার মানে তুই বড়পাখা আর আমি ছোট পাখা। "
নিবিড়ের কথায় বাকিরা হেঁসে দিলেও আবির ধমকে ওঠে..
"স্যাট আপ ইডিয়েট।"
"আহিশসার বাচ্চা, কাল কি ভার্সিটি যাবি? আমি তো ভাই ভুলেও যাবো না,আমার সেই ঘুম দিতে হবে একটা। "
চড়ুইয়ের কথায় আহিশ পেছন থেকে তার মাথায় গাট্টি মেরে বলে..
"বোইন, আগে তোদের বাড়িতে ঢুকতে দেয় কিনা সেই চিন্তা কর, ঢুকতে না দিলে কি রাস্তায় ঘুমাবি সারাদিন তুই? "
আহিশের কথা শুনে চড়ুই তুড়ি বাজিয়ে বলে ওঠে..
"এই আমার কাছে একটা বুদ্ধি আছে।"
তার কথা শুনে পেছনের তিনজনই একটু আগ্রহ নিয়ে তাকায় তার দিকে। জেসি জিজ্ঞেস করেই ফেলে..
"বল বল কি বুদ্ধি? "
"ছোটমা যদি আমাদের বাড়িতে ঢুকতে না দেয় তাহলে আমরা মেনে নেবো। "
এতটুকু শুনতেই দোয়েল হালকা চেঁচিয়ে বলে..
"বোন তুই পাগল হলি? বাড়িতে ঢুকতে না দিলে যাবি কোথায় এত রাতে? "
"আরে পুরো কথা শোন না? "
"কি? "
"আমরা ছোটমাকে বলবো, ঠিক আছে আমরা চলে যাবো, তার আগে আমাদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে দাও।ছোটমা যখন রাজি হবে, তখন আমরা ব্যাগ গুছানোর নাম করে রুমে ঢুকে দরজা আটকে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়বো। ছোটমা কে বোকা বানাবো আমরা কি বলিস? "
আহ কি মজার বুদ্ধিই না দিলো চড়ুই। তার এমন বুদ্ধি শুনে পেছনের তিনজন চোখ গুটি করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তাদের এমন দৃষ্টি দেখে চড়ুই বলতে লাগলো..
"কি হলো? তোরা চুপ করে আছিস কেন? বল কেমন লাগলো বুদ্ধি টা? দারুন না? দেখেছিস আমি কত্তো বুদ্ধিমান, না নাহ বুদ্ধিমতী, হায়, এই বুদ্ধি যদি পরিক্ষার হলে একটু কাজে লাগাতে পারতাম, তাহলে সূত্র ছাড়াই সব অঙ্ক মিলে যেতো। ওহ সরি আমরা তো ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট, অঙ্ক কোথা থেকে আসবে। "
চড়ুইয়ের এমন ফাউল বকবকানি আর সহ্য হয়না আবিরের, একটা রাম ধমক দিয়ে বলে..
"এই মেয়ে, চুপ করো। "
চড়ুই শুনেও না শুনার মতোই আপন মনে বকবক করতে থাকে। আবির চেয়েও তাকে সারাটা পথে চুপ করাতে পারে না।
পাখিদেরকে আহিশ আর জেসি মিলেই বাড়িতে দিয়ে আসে। আবির নিবিড় বাইরেই গাড়িতে বসে ছিলো,তাদের আর যাওয়ার প্রয়োজন হয় নি। আহিশ আর জেসিকে বাড়িতে পৌছে দিয়ে আবির নিবিড় পাড়ি দেয় নিজস্ব একটি গন্তব্যে।
জঙ্গলের পথ ধরে এগিয়ে যায় গাড়ি, আবিরের চক্ষুদ্বয় কুঞ্চিত আর কিছুটা রঞ্জিত। নিবিড় পাশেই সীটে হেলান দিয়ে মনের সুখে সিটি বাজাচ্ছে। নিজের শরীর থেকে নতুন একটি গন্ধের অস্তিত্ব পেয়ে নিবিড় শার্টের কলার উঁচিয়ে নাক টানে তীব্র ভাবে। চোখ বুঁজে আবেশে বলে ওঠে...
"ভাই, মেয়েরা শরীরে কোন পারফিউম মাখে বলতো? আমরা বেছে বেছে এতো এক্সপেনসিভ পারফিউম চুজ করি, তবুও দেখ এই মেয়েদের পারফিউমই শেষমেশ মাতাল করে দেয় আমাদের পুরুষ জাতিকে। আহাহ, আমি তো আর দু দিনেও এই শার্টটা খুলবো না। "
আবির ঠোঁট বাকিয়ে হাসে।বলে ওঠে...
"ওদের পারফিউম গুলোতেই আমাদের সিডিউজ করার ক্যামিকেল থাকে। এন্ড দে নিড দ্যাট.. "
আবিরের কথায় নিবিড় হুহা করে হেঁসে দেয়, বলে..
"ওয়াট আ ফা'কিং জোক ইয়ার ভাই। ঐ হাড্ডি গুলাও ছেলেদের সিডিউজ করবে? দে কান্ট ব্রো। "
আবিরও হাসে, বললো..
"তাও ঠিক, দে কান্ড ম্যানেজ। সামলাতে পারবে না, আর না সময় উপভোগ করতে পারবে। "
নিবিড় মাথা নাড়িয়ে নাকোচ করে বলে..
"নো নো ভাই। এটা ভুল বললি। চিকনা মেয়েগুলোই আকর্ষণ করে বেশি.. "
"তোর রুচিতে সমস্যা, ওদের শরীরে হাড্ডি ছাড়া আর কিছু থাকে নাকি ইয়ার? আই লাইক চবি গার্ল।"
নিবিড় কথা বাড়ানোর চেষ্টা করে না, স্বাভাবিক ভাবেই বলে..
"সে তুই যাই পছন্দ কর, আমার তো ঐ এটম বোমটাকেই মনে ধরছে। আম্মুকে বলে দেখবো একবার, আফটার অল ওরাও তো টুইনস, আম্মু রাজি হলেও হতে পারে.. "
আবির কোনা চোখে তাকায় নিবিড়ের দিকে, সতর্ক বার্তা দিয়ে বলে..
"তুই যা ইচ্ছে কর, তবে তোর চক্করে যদি আমার ঘাড়ে ঐ আধ পাগলা মেয়েটাকে ধরিয়ে দিতে চায় আমি কিন্তু যা তা করে ফেলবো। এমন পাগলকে অন্তত বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নাহ। আর তুই কি হ্যা? বাচ্চা মেয়ে বিয়ে করবি? লোকে কি বলবে? আমাদের সার্কেলে মুখ দেখাবি কি করে ভাই? নো ওয়ে.. "
" প্রেমে পড়ার সময় মন কি আর লোকের কথা চিন্তা করে রে পাগলা,মন তো ধপাস করে পড়ে যায়। "
------------
অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে হাত পা বাঁধা অবস্থায় বসে হাঁপাচ্ছে একটি লোক। হ্যা, এটাই সেই লোক, যে তখন চড়ুইকে নিয়ে যাওয়ার ফন্দী আটছিলো। আবির নিবিড় ঘরটায় প্রবেশ করতেই রাতুল এগিয়ে আসে,
"বস, এটাই তো নাকি? "
আবির এক পলক তাকিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝায় এটাই সেই লোকটা। নিবিড় হাসতে হাসতে পকেটে হাত গুঁজে এগিয়ে যায় লোকটির দিকে, নিবিড়কে আবির ভেবে লোকটি ভয়ে বলতে লাগলো...
"আমায় ছেড়ে দিন স্যার, আমি মাফ চাইছি।"
নিবিড় একবার আবিরের দিকে তাকিয়ে দেখলো আবির আস্তে ধীরে নিজের শরীরে এটে থাকা সফেদ শার্টটি খুলছে। রাতুল হাত বাড়িয়ে দিতেই শার্টটি তার হাতে দিলো আবির। নিবিড় জিজ্ঞেস করলো লোকটিকে..
" কি এমন করেছিস বলতো?যে এই আবির বিন চৌধুরীর চোখে পড়ে গেলি? মারতে গিয়েছিলি নাকি ওকে? "
লোকটি দ্রুত দু দিকে মাথা নাড়ায়। নিবিড় বলে..
"তাহলে? "
আবির নিরবে রাতুলের দিকে তাকাতেই একটি চকচকা সোনালী রঙের ধারালো একটি ছু'রি তুলে দেয় আবিরের হাতে। মুখে বলে..
"বস, একদম নতুন, হাতল থেকে আগা পর্যন্ত একদম পার্ফেক্ট। "
আবির ছু'রিটা ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে এগিয়ে আসে লোকটির দিকে। মুখে নাটকীয় ভঙ্গীতে বলতে থাকে..
"সরি ইয়ার.. তোকে তখন মেরেছিলাম খুব, ভেবেছিলাম আর কিছু করবো না। কিন্তু, ঘুমাতে গিয়ে চোখ বন্ধ করতেই ভেসে উঠলো তুই ওয়াইফির কোথায় কোথায় যেন ছুঁয়েছিস। আর তোর চোখগুলোও নিশ্চয়ই ওর এদিক সেদিক দেখেছিলো, তাই না? আর এটাই আমার সহ্য হচ্ছিলো না। তাই একটা শান্তির ঘুম দেওয়ার জন্য হলেও তোর এই হাত আর চোখ দুটো আমার লাগবে। ভেরি সরিইই.. "
বলতে বলতেই আবির ছু'রিটা দিয়ে লোকটির ডান হাতটি কনুই থেকে আলাদা করে নেয় এক কোপেই। গগনবিদারী চিৎকার করে ওঠে লোকটি। আবির থেমে থাকে না। সাথে সাথেই আরেকটি হাতও আলাদা করে ফেলে সে। তারপর দুহাতের তর্জনী একত্রে ঢুকিয়ে দেয় লোকটির দু চোখে। কোটর ভেদ করে রক্তের সাথে সাথে চোখের সাদা গলিত অংশ বেরিয়ে আসে ছিটে। কালো মনি দুটে টেনে বের করে নিয়ে দু হাতের তালুতে চেপে ধরে আবির। সাথে সাথেই তরল ছিটকে পরে আবিরের পেশিবহুল বক্ষপটে, তৈলাক্ত শরীরের এব্স গুলো ফুলে ফেঁপে ওঠে তার, গড়িয়ে পরা শরীরের সেদজলের সাথে সাথে ছিটকে আসা তরলও গড়ায় নিচের দিকে।
সামনের লোকটি চিৎকার করতে করতে গলা ফেটে গেছে। তবুও যেন প্রাণ তাকে ছাড়তে চাইছে না। আবির নীরবে মাথা ঘুরিয়ে তাকায় নিবিড়ের দিকে। নিবিড় এতক্ষণ অবাক চোখে তাকিয়েই আচে আবিরের দিকে। আবির চোখের ইশারায় কিছু বোঝায় নিবিড়কে, কিন্তু নিবিড়ের ধ্যান নেই সেদিকে। আবির বিরক্ত হয়ে রুষ্ঠ কন্ঠে ডাকে তাকে..
"নিবিড়... "
ধ্যান ভাঙে নিবিড়ের। আবিরের ইশারা অনুযায়ী তার কোমরে গুজে রাখা পি'স্তলটা নিয়ে সাথে সাথে একটা গুলি করে দেয় লোকটির বুক বরাবর। ব্যাস থেমে যায় চিৎকার, আর লোকটির প্রাণ পাখিও খাঁচা ছেড়ে পালায়।
আবির ঘন ঘন শ্বাস নিয়ে রাতুলের দিকে তাকিয়ে বলে...
"এর হাত গুলো প্রিজার্ভ করে রাখো। আর বাকি বডিটা.. "
রাতুল দ্রুত বলে..
"আ্ আমি সামলে নিবো বস। "
আবির তাকায় নিজের দু হাতের দিকে, তারপর এক ভয়ঙ্কর হাসিতে প্রসারিত করে নেয় নিজের ঠোঁট।
নিবিড় হাসতে হাসতে বলে..
"হাহ, ব্যাপারটা কি হলো? মানে, আমি মাছের গন্ধও সুকি না, কিন্তু মাছ খাই.. "
আবির আড়চোখে তাকিয়ে বলে উঠলো..
"ঐ হাড্ডিগুলোকে তোর কোন দিক দিয়ে মাছ মনে হলো? ওরা তো শুঁটকি। "