Mr and Mrs Twins Return

পর্ব - ১

🟢

"দিল ডাকিয়া কয় মোরে..এক নজর তোরে দেখি বসিয়া...

দিল আমার কিছু বোঝে না, দিল আমার.."

পক্ষীকূলের মধ্যে সুরেলা পক্ষী তোতা কিংবা ময়নাকে ধরা হলেও আজকের এই কান্ঠিক গানখানা গাইলো আমাদের চড়ুই পাখি। এ কোনো সত্যিকারের পাখি নয়, বরং পাখির মতোই উড়তে থাকা চঞ্চল মনের এক রমনী। যার অবস্থান বর্তমানে বিশ্বের নামকরা সফটওয়্যার কম্পানি 'মায়োগ্রেট ইন্ডাস্ট্রিজ' এর ঢাকার ব্রাঞ্চের মূল ভবনের ছয় তলায়। এমপ্লয়িদের মধ্যমণি হয়ে বসেই নেকি সুরে মনের দুঃখ ফুটিয়ে তুলতেই গানটা গাইতে নিলো সে। হঠাৎ চোখের সামনে দু জোড়া কালো সু যুক্ত পা দেখে থেমে গেলো চড়ুই পাখির বুলি। চোখ তুলে তাকালো উপরে দাঁড়িয়ে থাকা সুঠাম দেহের দুজন পুরুষের দিকে।

চড়ুইয়ের মাথা ঘুরে উঠলো। কি দেখছে সে? অবাকতার রেশ থেকেই মাথায় হাত দিয়ে বলে উঠলো...

"ও আল্লাহ,,দুই দুইটা স্যার,তাও একই রকম। এখন আমার বর কোনটা? দুইটাই কি আমার বর?"

"Who are you?"

গম্ভীর নির্জনতা নিয়ে পুরুষালী কন্ঠটি বেশ কঠিনই লাগলো চড়ুইয়ের কাছে। সামনে থাকা দুজন লোকেরই ভাবভঙ্গি একই রকম।তীক্ষ্ণ নজরে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে চড়ুইকেই। এখন কি উত্তর দিবে চড়ুই? মেয়েটা যে ঘাবড়ে গেছে দুটো জীবকে দেখেই। কিন্তু তাকে তো এমন কিছু বলে দেওয়া হয়নি? ছবিতে তো একজনই ছিলো।

"স্যার, এই মেয়েটা কোনো প্রকার এন্ট্রি কার্ড শো না করে জোর করেই ভেতরে ঢুকে গেছে। আর এসেছে ধরে বলছে সে নাকি এই অফিসের বড়স্যারের, আই মিন.. আপনাদের মধ্যেই কেউ একজনের বিয়ে করা বউ। "

অফিসের একজন কর্মকর্তা একটু এগিয়ে কথাখানা বলতেই সামনে থাকা দুজনের মধ্যে একজন মুখ টিপে হেঁসে উঠলো। আস্তে করে পাশের জনের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো...

"এটা নিশ্চয়ই তোর কাজ?"

রাগে রি রি করতে তার দিকে তাকালো পাশের জন। গাম্ভীর্যের শীর্ষে গিয়ে ধমকে উঠলো....

"ভাই..!"

"ওয়াট ভাই? তুই কি এই নিবিড় বিন চৌধুরীকে বোকা ভাবছিস? তুই লুকিয়ে বিয়ে, বাসর সব সেড়ে লিটেল আবির ডাউনলোড দিয়ে দিবি, আর আমি জানবো না?"

আবির ফের চোখ গরম করে তাকালো নিবিড়ের দিকে। পরক্ষণেই সামনে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে বসে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো...

"কে তুমি?"

মেয়েটি আস্তে করে ফ্লোর ছেড়ে এতক্ষণে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তর্জনী আঙুল তাক করে বললো...

"আমিইই?"

"হ্যা তুমিই?"

"আমি তো.. ছোটপাখি.."

বোকার মতো কথাটা বলেই দাত বের করে হাসতে লাগলো চড়ুই। এদিকে তার এমন আজব পরিচয় শুনে সামনে থাকা আবির নিবিড়ের ভ্রু কুঁচকে গেলো।আবির কিছুটা বিরক্তই বটে।কন্ঠের তীব্রতা আরেকটু বাড়িয়ে বললো...

"কি ছোটপাখি? তোমার নাম কি? কোথায় থাকো, ডিটেইলস বলো মেয়ে.. "

হাসি বন্ধ হয়ে গেলো তার। এতক্ষণ এলোমেলো ভাবে দুলতে থাকা শরীরটাও স্ট্যাচু হয়ে গেলো যেন। বাধ্যের ন্যয় উচ্চারণ করলো...

"চ্ চ্ চড়ুই। আমার নাম চড়ুই। থাকি আমার বরের মনে। হিহি.."

নিবিড় আবারো হেঁসে দিলো। তবে সেই হাসি বেশিক্ষন টিকলো না আবিরের কড়া চোখের দৃষ্টি দেখে। আবির আবার সামনে তাকালো। তীক্ষ্ণ চোখে মেয়েটার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে হিসাব মিলাতে লাগলো যেন কিছু একটার। জিজ্ঞেস করলো...

"তো কে তোমার বর?"

চড়ুই বোকার মতোই বলে উঠলো...

"আপনাদের মধ্যে যে কোনো একজন হলেই হবে।"

কথাটা শুনেই নিবিড় আবিরের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বললো...

"তাহলে একে বানিয়ে নাও। "

চড়ুইও বা দিকে মাথা কাত করে উত্তর দিলো...

"আচ্ছা, তাহলে উনিই আমার বর.."

নাক কুঁচকে এলো আবিরের। সচল মস্তিষ্ক বলে দিচ্ছে মেয়েটা প্ল্যান মতো এগোতে পারছে না, তাই বোকার মতোই উত্তর দিচ্ছে। জিজ্ঞেস করলো...

"বয়স কতো তোমার?"

"আঠেরো।"

বাঁকা হাসলো আবির, মাথা ঢুলিয়ে বলে উঠলো..

"গুডড"

তারপর হঠাৎই চড়ুইয়ের দিকে এক কদম এগিয়ে এসে বললো...

"তো আমি তোমার বর হুম?"

চড়ুই উপর নিচ মাথা ঝাকালো হাসি মুখেই। সাথে সাথেই আবির খপ করে চড়ুইয়ের ডান হাত চেপে ধরে গলা উঁচিয়ে বললো...

"এভরিওয়ান.. নিজের কাজে যাও,রাইট নাও।আই ওয়ান্ট টু স্পেইন্ড সাম কোয়ালিটি টাইম উইথ মাই সো কল্ড ফা'কিং ওয়াইফ।"

চড়ুই হতভম্ব নয়নে একবার নিজের হাতের দিকে তো আরেকবার আবিরের মুখের দিকে তাকায়। বলে উঠলো...

"এই এই হাত ধরেছেন কেন হ্যা? এটা তো স্ক্রিপ্টে ছিলো না?"

আবির শুনলো না। বড় কদম ফেলে এগিয়ে যেতে লাগলো চড়ুইকে সাথে নিয়েই। নিবিড়ের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় বললো...

"পুলিশে কল কর দ্রুত। "

চোখ দুটো রসগোল্লার মতো হয়ে গেলো চড়ুইয়ের। বলে উঠলো...

"পুলিশ কেন?"

আবির স্থির দৃষ্টি সামনে রেখেই হাঁটতে হাঁটতে বলল..

"স্বয়ং আবির বিন চৌধুরীর অফিস বয়ে এসে নিজেকে তার ওয়াইফ দাবি করছো মেয়ে। বাট ইউ নো ওয়াট,আমি ভুলেই গেছি আমাদের কবে বিয়ে হয়েছিলো। দ্যাটস ওয়াই এখন পুলিশের কড়া সিকিউরিটি দিয়ে কাজি আসবে,আমাদের বিয়ে পড়াবে। "

প্রচন্ড অবাক চড়ুই। কি থেকে কি হয়ে যাচ্ছে? এই লোক কি এবার সত্যি সত্যিই বিয়ে করবে নাকি তাকে? কিন্তু চড়ুই তো একে চেনেও নাহ।।এটা কি হচ্ছে?

চড়ুইয়ের ভাবনায় এতটুকুই যথেষ্ট ছিলো না যেন,তার উপর আবিরের আরো কয়েকটি বাক্য নিসৃত হলো পুরুষালি কন্ঠনালি দিয়ে...

"আ'ম ওয়েটিং ফর নাইট ওয়াইফি, বি প্রিপেয়ার্ড ইউর সেলফ।আই ওন্ট বি সফ্ট এট অল। ইট’স উইল সো র‍্যাশেনাল।"

--------

"আহিশসার বাচ্চা, তুই এখনো চুপ করে আছিস কেন? কিছু একটা তো করতে হবে। বোন ফোন তুলছে না কেন? তিনটে বাজতে চললো। বাড়িতে আজ তুলকালাম কান্ড হবে। "

দোয়েল চিন্তিত কন্ঠে আহিশকে কথা গুলো বলছে আর অনবরত চড়ুইয়ের নম্বরে কল দিয়েই যাচ্ছে। রিং হচ্ছে তবে চড়ুই ফোন তুলছেই না। আহিশ টেবিলের উপর পা তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে আপেল চিবোচ্ছে। দোয়েলের কথার পরিপ্রেক্ষিতে বললো...

"বড় পাখি চিলল,,ছোটপাখি ঠিক চলে আসবে। আরে কাছেই তো কোনো একটা অফিসে গেছে। তুই এত টেনশন নিস না। "

দোয়েল এগিয়ে এসে আহিশের হাত থেকে আপেলটা ছুড়ে ফেললো। চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে আছে যেন তার। রিরি করতে করতে বললো...

"তোর জন্য,, শুধু তোর জন্য লাফাঙ্গা গুলোর চক্করে পড়তে হলো আজ।কি দরকার ছিলো ওদের সাথে তর্ক করতে যাওয়ার?"

আহিশ কোনা চোখে দোয়েলের দিকে তাকালো। এইবার যেন তারও ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলো। হালকা চেঁচিয়ে বললো....

"ওরা তোদের টিজ করছিলো পাখি। এমনি এমনি ছেড়ে দিতে বলছিস? আজকের দিনটাই সই, কাল যদি আমার ভাইদের দিয়ে শু'য়োরের বাচ্চা গুলোর একটা ব্যবস্থা না করতে পেরেছি তাহলে আমার নামও আহিশ নয়। এহ, আমাদের টিসি দিয়ে বের করবে না ভার্সিটি থেকে। দেখবো কেমন পারে। "

দোয়েল দমে এলো। তর্কিত নিঃশ্বাস ফেলে নিজেও এসে মাথায় হাত ঠেকিয়ে বসলো আহিশের পাশে। হালকা স্বরে বলে উঠলো...

"জানি না বোন কি করছে না করছে। কু'ত্তা গুলোর ওকেই পাঠাতে হলো। "

সুহাস এগিয়ে এসে দোয়েলের কাঁধে হাত রাখলো৷ বললো...

"বড়পাখি শান্ত হ। আরেকবার কল দে ছোটপাখিকে। "

দোয়েলও তাই করলো। দুবার, তিনবার, ঠিক চার বারের সময় কল রিসিভ হতেই দোয়েল উৎকন্ঠিত হয়ে আহিশ আর সুহাসের দিকে তাকিয়ে বললো...

"এই এই, বোন কল ধরেছে। "

কারোর কথার অপেক্ষা করলো না আর,, ফোন কানে নিয়েই বললো...

"বোন,,তুই ঠিক আছিস? কোনো সমস্যা হয়নি তো? এখনো আসছিস না কেন?"

"নিবিড় বিন চৌধুরী বলছি...."

ফোনের ওপাশ থেকে আশানুরূপ কন্ঠ না পেয়ে এক পুরুষালী কন্ঠ পেলো দোয়েল। কিন্তু চড়ুইয়ের ফোন কে রিসিভ করলো? আর কেন?চিন্তা যেন বেড়েই গেলো একটু করে। স্বরের তীব্রতা হালকা হলো। আস্তে করে জিজ্ঞেস করলো...

"কে আপনি? আ্ আমার বোন কোথায়? ওর ফোন আপনি রিসিভ করেছেন কেন?"

ওপাশ থেকে যেন হালকা হাসির স্বর ভেসে এলো। লোকটা যেন দোয়েলের উৎকন্ঠায় বেশ মজা পাচ্ছে... খুশি মনেই রসিকতার সহিত উত্তর দিলো...

"আআআ, আপনার বোন? আসলে সে তো এখানে নিজের বরকে খুঁজতে এসেছিলো। তাই এখন তাকে স্ব-সম্মানে শশুড় বাড়ি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে.. "

"মানে? "

চওড়া হাসলো নিবিড়। হাসি থামিয়ে বললো...

"ঐ আরকি, পুলিশ স্টেশন। সেখানেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আপনার নাটকবাজ বোনকে। ছাড়া পাওয়ার কোনো চান্সই নেই, কার সাথে পাঙ্গা দিতে এসেছে বাচ্চাটা নিজেই বুঝলো না। পারলে মাঝেমধ্যে গিয়ে একটু দেখা করে আসবেন তার সাথে। বায় মিস..."

কলটা কেটে গেলো। এদিকে দোয়েল স্তব্ধ নয়নে তাকিয়েই রইলো ফোনের দিকে। কথা আটকে গেছে তার। এটা কি করে হয়ে গেলো, এখন কি করবে সে? বোন পুলিশ স্টেশনে কিভাবে থাকবে?

দোয়েলকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আহিশ জিজ্ঞেস করলো...

"কিরে, এমন খাম্বার মতো দাঁড়াই আছিস ক্যান?"

"ব্ বোনকে পুলিশে দিয়েছে ও্ ওরা..."

---------------

স্বচ্ছ ও নান্দনিক কাঁচের টেবিলটায় রাজকীয় ভঙ্গিতে পকেটে দু হাত গুঁজে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আবির। ঠোটের কোনে অদ্ভুত বাঁকা হাসি,তীক্ষ্ণ দৃষ্টি জোড়া সামনেই মেয়েটার দিকে। যাকে এক প্রকার টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে লেডি কন্সটেলেবল দুজন মিলে।

মেয়েটা কান্না করছে না বরং রাগে ইচ্ছে মতো চেচাচ্ছে আবিরের দিকে তাকিয়ে...

"আপনাকে দেখে নেবো আমি, এই চড়ুইকে চেনেন না আপনারা। আমাকে পুলিশে দেওয়া না? ঠিক বেরিয়ে আসবো আমি। ভালো বউ জুটবে না আপনার কপালে শয়তান লোক। আপনার মতো দামড়া গন্ডারকে কেউ বিয়ে করবে না। আমি কিচ্ছু করিনি বলছি, আমাকে যেতে দিন... "

আবিরের কোনো প্রকারে মন গললো বলে মনে হলো না। বরং হাসিটা আরেকটু বাড়িয়ে বললো...

"গুড বায় ওয়াইফি."

চড়ুই দৃষ্টির আড়াল হতেই পুলিশ অফিসার আহসান এগিয়ে এসে দাঁড়ালো আবির নিবিড়ের সামনে। আস্তে করে বিনয়ী স্বরে বললো...

"স্যার,আপনারা চিন্তা করবেন না। আমি দেখছি এই বিষয়টা। আপডেট জানাবো সময় মতো।"

আবিরের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। দৃষ্টি সামনে রেখেই গম্ভীর কন্ঠে বললো...

"একে কে বা কারা পাঠিয়েছে তদন্ত করুন। স্বীকার করতে না চাইলে রিমান্ডে দিন আজই.. আমি সত্যতা জানতে চাই। "

অফিসার মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে প্রস্থান করলো। নিবিড় চোখের ইশারা দিতেই সকল এমপ্লয়িরা নিজেদের ডেস্কে চলে গেলো।

"এটা একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে না ভাই? না মানে বাচ্চা মেয়ে, রিমান্ডে নিলে..."

নিবিড়ের কথা কানে যেতেই আবির আঁড়চোখে তাকালো তার দিকে। নিবিড় কি বলতে চাইছে তা বেশ বুঝতে পারছে আবির। কঠিন কন্ঠে আওড়ালো..

"She already age of 18, Nibir.."

নিবিড় এক কদম এগোলো,রয়েসয়ে বলতে নিলো..

"I know vai, কিন্তু দেখিস নি মেয়েটা একদম বাচ্চাদের মতো, শরীরে হাড্ডি ছাড়া কিছু আছে বলে তো মনে হয় না। "

আবিরের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের কেবিনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললো...

"আমি ঐ মেয়ের সাথে বেড পারফরম্যান্স করতে যাচ্ছি না যে ভালো ফিল নেওয়ার জন্য শরীরে নরম মাংস খুঁজবো। "

"কিন্তু ভাই..."

"নো মোর ওয়ার্ড নিবিড়.."

থেমে গেলো নিবিড়। আবিরের দিকটাও সে বুঝতে পারছে,কে বা কারা আবার নতুন করে শত্রুতা করতে চাইছে নাকি পুরোনো কোনো শত্রুর কাজ এটা তা জানা জরুরি। তবুও কোথাও যেন মেয়েটাকে দেখে নিবিড়ের একটু দয়া হলো। বাচাল মেয়ে, কথার দিক মান কিছুই ঠিক নেই, কেমন যেন বাচ্চা স্বভাবের। কিন্তু এসব ভেবে তো কাজ নেই, মেয়েটা সত্যিই একটা অপরাধই করেছে বটে..

--------------

চৌধুরী ভিলার আলিসান ড্রয়িংরুম আজও রোজকার মতো কিছুটা ভরপুর। বাড়ির তিন কর্তা আজমল চৌধুরী, আসমত চৌধুরী আর আলভী চৌধুরী একটু আগেই ফিরেছেন নীড়ে। আজমল চৌধুরীর স্ত্রী সাবিহা, তাদের দুই ছেলে আবির আর নিবিড়। মেঝো কর্তা আসমতের বিবি জুলেখার ছেলে জিসান আর মেয়ে জেসি। ছোট কর্তা আলভীর স্ত্রী আয়েশা, আর তাদের এক ছেলে আহিশ। আপাতত এই নিয়েই চৌধুরী পরিবার।

ট্রে হাতে এগিয়ে এসে চায়ের কাপগুলো সবার সামনে রাখলেই আজমল চৌধুরী সাবিহাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো...

"আজ তোমার ছেলেদের অফিসে নাকি কোন মেয়ে এসে নিজেকে তোমার কোন ছেলের বউ দাবি করেছে। এই বিষয়ে জানো কিছু? "

সাবিহার হাত থেমে গেলো। কি শুনলো তিনি? তার এক ছেলে বিয়ে করে ফেলেছে? কন্ঠ তীব্র হলো সাবিহার। হালকা চেঁচিয়ে বলে উঠলো...

"এসব কি বলছো তুমি? অসম্ভব, আমার ছেলেরা এমন করতেই পারে না। "

আজমল চৌধুরী চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললো...

"দেশে ফিরেছে এখনো একটা সপ্তাহ ও হয়নি। এরমধ্যে এমন একটা অকাজ করেছে তোমার ছেলে। কি ভাবলে এবার?"

আয়েশার চোখে ভয়, বড় ভাবি যে নিজের জমজ দুই ছেলের জন্য মনে মনে মেয়ে ঠিক করে রেখেছে তা আজমল সাহেব সহ বাড়ির বড়রা ঠিকই জানে। এরমধ্যে হঠাৎ এমন একটা কান্ড..

সাবিহা দ্রুত হাতে ফোন করলো নিবিড়ের নম্বরে। আজ নিজের হাতেই ছেলেটার পিন্ডি চটকাবে তিনি। তিনি মোটেও যেন তেন মেয়েকে মেনে নিবেন নাহ ছেলের বউ হিসেবে। আজমল,আসমত একে অপরের দিকে তাকিয়ে মিটমিটিয়ে হাসলেন। মূলত তারা জানে যে এটা একটা ভুল বুঝাবুঝি, তবুও সাবিহাকে একটু জ্বালানোর জন্যই এতো গম্ভীর নাটক।

"এসব আমি কি শুনছি নিবিড়? তোদের মধ্যে কে বিয়ে করেছিস? "

নিবিড় মুখ টিপে হেঁসে বললো..

"আমি না আমি না আম্মু,,আবির বিয়ে করেছে। ক'দিন পর ওয়া ওয়া ও আসবে,,তোমাকে দাদিমা দাদিমা বলে ডাকবে ওর ছেলে মেয়ে.."

সাবিহা তেতে উঠলো,,রাম ধমক দিয়ে বললো...

"চুপ কর বেয়াদপ। ঐ হতচ্ছাড়াকে ফোনটা দে তারাতাড়ি.. "

নিবিড় হাসতে হাসতে ফোনটা এগিয়ে দিলো আবিরের দিকে, বললো...

"নে আম্মুর সাথে কথা বল, তোর সো কল্ড ওয়াইফিকে বাড়িতে জায়গা দিবে কিনা জেনে নে.."

আবির বিরক্তিকর চোখ কুঁচকে বলতে নিলো...

"ওয়াট দা..."

"আরে নে নে কথা বল আগে..আম্মু সেই ক্ষেপেছে.."

বলতে বলতেই মোবাইলটা এক প্রকার ঠেসে দিলো আবিরের হাতে। মনে মনে নিবিড়কে একশো একটা গালি দিয়ে আবির ফোন কানে তুললো..

"হ্যালো আম্মু..."

"এই বেয়াদপ,হতচ্ছাড়া,, এই দিন দেখার জন্য পেটে ধরেছি তোকে আমি? শুনে রাখ আবির,,আমি ঐ মেয়েকে কোনো মতেই মানবো না, তুইতো জানিসই আমি তোদের দুজনের জন্য একই রকম..."

"উফফ আম্মু, এসব তোমাকে কে বলেছে বলোতো? আজাইরা প্যাচালটা বাড়িতেও চলে গেছে। বিরক্ত লাগছে আমার.."

সাবিহার কন্ঠ করুন শোনালো,,কত আশা তার এই ছেলে দুটো নিয়ে, তা কি আদেও বুঝতে পারছে না ছেলেটা?

"দেখ আবির বাবা, এত শত বুঝি না আমি। তুই না জানিয়ে বিয়ে করে নিয়েছিস কাকে না কাকে..."

"আহ আম্মু, কোনো বিয়ে করিনি আমি। সবটা মিথ্যা। "

সাবিহার চোখ চকিত হলো। অস্থির হয়েই জিজ্ঞেস করলো..

"সত্যিই তুই বিয়ে করিস নি? তাহলে তোর আব্বু যে বলছে..."

"আমি বাড়ি ফিরে আসি তারপর সব বলবো।রাখছি।"

বলেই আর অপেক্ষা করলো না আবির, কল কেটে রাগী দৃষ্টিতে তাকালো নিবিড়ের দিকে। জিজ্ঞেস করলো...

"আব্বুদের ঐ কথাটা তুই বলেছিস?"

নিবিড় হু হা করে হেসে উঠলো। এগিয়ে এসে আবিরের কাধ পেঁচিয়ে ধরে বললো..

"ওমাহ,,তোর একটা ওয়াইফি হয়ে গেলো হুট করে,,আর এই খবরটা বাড়িতে জানাবো না?"

"নিবিড় বেশি বেশি করছিস তুই। বের হ এখন কেবিন থেকে, নাহলে আই সোয়ার তোর মাথা ফাটিয়ে দিবো আমি। "

নিবিড় হাল ছেড়ে দিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললো...

"ওকেয় রিল্যাক্স ব্রো।যাচ্ছি আমি। আর এমনিতেও,আমার মাথা ফাটাতে আসলে তোর নিজের মাথাও তো..."

"নিবিড়...."

আর থামলো না নিবিড়। দ্রুত হাসতে হাসতেই বেরিয়ে গেলো কেবিন থেকে। আবির ত্রস্ত হাতে নিজের সিল্কি চুলগুলো পেছনে ঠেলে এগোয় চেয়ারের কাছে। দুপুরের সেই ঘটনাটার পর থেকেই কেমন যেন অস্থির লাগছে তার। মনে হচ্ছে যেন কিছু একটা ভুল হচ্ছে, কিন্তু কি? নিবিড়ের কথাটা বার বার মাথায় আসছে তার, আদেও পিচ্চি মেয়েটাকে রিমান্ডে নেওয়া ঠিক হলো তো? আবির একবার ভাবলো অফিসার আহসানকে ফোন করে মানা করবে রিমান্ডে না দিতে, এমনিই যেন জেরা করা হয়। পরক্ষণেই আবার ভাবলো, নাহ,, মেয়েটার থেকে তো যত দ্রুত সম্ভব সত্যিটা জানতে হবে। কে পাঠিয়েছে তাকে তা জানা জরুরি। রিমান্ডে নিলেই এটা জানা সম্ভব।

ঘড়ির কাটায় ডংডং শব্দ হতেই আবির নড়েচড়ে উঠলো। রাত সাড়ে দশটা বেজেছে। এতক্ষণের সকল চিন্তা এক পাশে ফেলে আজকের মতো নিত্যকর্ম এখানেই শেষ করতে চাইলো সে। বাড়ি ফিরতে হবে। নিবিড় সহ এপার্টমেন্টের নিচে এসে গেটের বাইরে পা রাখতেই চোখ আটকে গেলো পাশে পায়চারি করা মেয়েটার দিকে। ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো..

"তুমি এখানে?"

মেয়েটি ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে এসে বাঁধহারা কন্ঠে বলতে লাগলো...

"হ্যা, আমি চড়ুই। আমার বোনকে জেলে নিয়ে গেছে ওরা। ওর কোনো দোষ নেই। প্লিজ ওকে ছেড়ে দিতে বলুন আপনারা..."

Mr and Mrs Twins Return গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় টুইন রিলেটেড রোমান্টিক গল্প