বিছানার কোনে হেলান দিয়ে বসে আছে দোয়েল, মুখে রাগ প্রকাশ্য, সামনেই খাটের নিচে নিবিড় দু কান ধরে করুন চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। টকটকে লাল লাল চোখ দুটো দেখে দোয়েল এবার রাগে ক্ষোভে দু হাতে নিবিড়ের চুল গুলো মুঠোয় নিয়ে টানতে লাগলো..
নিবিড় ব্যথায় আর্তনাদ করে বলে ওঠে...
"ইয়া আল্লাহ.. বাঁচাও... "
দোয়েলও এবার হিশহিশিয়ে বলে ওঠে...
"বাঁচাবে না? তুমি যে অপকর্ম করেছো সেটার থেকে আল্লাহ বাচাবে?.."
"আরেহ আমরা তো যাস্ট একটু সেলিব্রেশনের জন্যই.. রেগুলার তো খাই না ওসব "
"কিসোর সেলিব্রেশন হ্যা?"
"আরেহ,তুমি মা হতে চলেছো এটা সেলিব্রেট করার মতো না?"
"তো আমাকে নিয়েই যখন সেলিব্রেশন আমায় ছাড়া খেলে কেন ওসব? আমাকেও দিতে..."
"আস্তাগফুরিল্লা এটম... এই সময় ওসব ছাইপাস খাওয়ার নামও মুখে নিবা না। তুমি না মা হতে চলেছো?"
" তো তুমিও তো বাবা হতে চলেছো... খেয়েছো কেন ওসব?"
"আরে বাবা আর খাবো না, মাফ করে দাও না এবার?"
দোয়েল কিছু মুহুর্ত নীরব থাকে। তারপর হঠাৎ বিছানায় উঠে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতে নিতে নিবিড়ের দিকে তর্জনী তুলে বলে....
"আজ রাতে তুমি আমার পাশে ঘুমাবে না। বিছানা ছুবেও তুমি। কথার খেলাপ হলে আমিই বেরিয়ো চলে যাবো আম্মুর কাছে, আর আসবো না৷ "
হতভম্ব হয়ে নিবিড় বলে ওঠে...
"আরে তো আমি ঘুমাবো কোথায়?"
দোয়েল গায়ে পাতলা চাদর টেনে ওপাশ ফিরে সুয়ে বলে...
"জাহান্নামে... "
দীর্ঘ এক নিশ্বাস ফেলে নিবিড়। ভেতরকার সব দুঃখ উজার করে দিয়ে হতাশ হয়ে বলে ওঠে....
"আল্লাহ... এমন এটম বোমের মতো বউতো আমি চাইনি....আমার এটমকে ভালো করে দাও আল্লাহ... ওকে ছাড়া অন্য মেয়ের কাছেও যেতে পারবো না আমি।ওকেই আমার মন মতো করে দাও..."
-----------
রুমে ঢুকতেই আবিরের চোখ আটকায় চড়ুইতে। ভারী পেটে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে রুমের মধ্যেই পায়চারি করছে মেয়েটা। আবির জিজ্ঞেস করে...
"ঘুমাও নি কেন এখনো? এত রাত হলো..."
চড়ুই কিঞ্চিৎ ধীর স্বরে বলে...
"কি করে ঘুমাবো? আপনিই তো আসেন নি এতক্ষণ... "
আবির দুষ্টুমির স্বরে বলে...
"আমার জন্য অপেক্ষা করে কি আর হবে বলো, এখন তো আর ওসব কিছুই হবে না ওয়াইফি, তোমার কি খুব ইচ্ছে করছে ওসবের জন্য? করলে বলো, আমি সফটলি একটু আদর করে দিই তোমায়...
মুখ কুঁচকে নেয় চড়ুই। বলে...
" ছিহ,কি সব বলছেন... আর কি বললেন যেন? আপনি আর সফট? হুহ.. এখন আপনাকে অনুমতি দিলে আমার মৃত্যু নিশ্চিত হবে... "
"ওসব বলে না পাখি আমার। ঠিক আছে এখন থাক ওসব,আমাদের বেবিরা আসার পর না হয় আবার স্টার্ট করবো কেমন? চলো শুয়ে পড়ো..."
" আপনি শুইয়ে না দিলে একা একা তো পারছিও না ঠিক করে। "
পেট ভার হতে হতেই এই ছোটখাটো সমস্যা গুলো দেখা দিয়েছে চড়াই পাখিটির। কোনো মতে বিছানার কোনে বসলেও পা তুলে আর বসতে পারে না একা একা, পায়ের নিচ থেকে চাদরটাও টেনে গায়ে দিতে গেলে পেটে চাপ পড়ে তার। এসব আবিরই সামলায়।
দরজায় খিল দিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বললো...
"সরি বউ,দেরি হয়ে গেলো একটু...ভাইয়ের সাথে কথা বলছিলাম তাই..আসো তোমায় শুইয়ে দিই এবার..."
এই বলেই আবির চড়ুইয়ের পাশ ঘেসতেই গা গুলিয়ে ওঠে চড়ুইয়ের। বমি আসছে ভেবে মুখে হাত চেপে ধরে সে। আবির কিছু বুঝে ওঠার আগেই চড়ুই তাকে ঠেলে কয়েক কদম দূরে সরিয়ে দেয়।
আবির চমকায়, চড়ুইয়ের কি হলো দেখার জন্য এগিয়ে আসতে নিলেই চড়ুই দ্রুততার সহীত বলে ওঠে.....
"দূরে থাকুন আপনি, বমি আসছে আমার..."
হা হয়ে যায় আবির, নিজের দিকে আঙুল তুলে ক্যাবলার মতো বলে ওঠে...
"আমায় দেখে বমি আসছে?"
"হ্যা, আপনি আবার ম'দ খেয়েছেন না? গন্ধ সহ্য হচ্ছে না আমার "
আবির হাফ ছেড়ে বললো...
"ওহ, এক মিনিট ওয়েট করো, আমি মুখ ধুয়ে আসছি।"
চড়ুই বিরক্ত নিয়ে বলে ওঠে...
"চেঞ্জ করবেন আপনি, পারলে গোসল করে নিবেন ভালো করে... "
"ওকেয় ওকেয়, আ'ম গোয়িং..."
আবির আর দেরি করে না। দ্রুত জামা কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। পাঁচ মিনিট যেতে না যেতেই বাইরে থেকে চড়ুই দরজায় বারি দিয়ে ডাকতে থাকে তাকে...
"আর কতক্ষণ? "
"দু মিনিট পাখি..."
"তারাতাড়ি বের হন... "
"আসছি... "
একটু নিরবতা, তারপর একটা মিনিট পাড় হতে না হতেই আবার চড়ুইয়ের ডাক...
"কি হলো, বের হচ্ছেন না কেন? "
"দু মিনিট বললাম তো.... "
"আপনি আমায় বকছেন কেন? "
"আরে বাবা, বকছি কোথায়? নর্মালিই তো বললাম.."
চড়ুইয়ের দিক থেকে আর কোনো শব্দ কানে আসে না। আবির জানে মেয়েটা এবার গাল ফুলিয়ে বসে আছে৷ বের হয়ে এবার বউ মানাতে হবে তার।
একটু পরেই আবির বেরিয়ে আসে গোসল সেরে। ভেজা তোয়ালেটা বারান্দায় মেলে দিয়ে এসে বসে চড়ুইয়ের পাশে। মেয়েটা নাক টেনে কাদছে। আজকাল যেন খুব সামান্য কিছুতেই চড়াইয়ের মুড সুইং হয়। আবির এক হাত এগিয়ে চড়ুইয়ের চোখ মুছে দিয়ে আস্তে করে বলে...
"কি হয়েছে আমার বউপাখিটার? আমি বের হয়েছি তো... "
চড়ুই হিচকি তুলে বলে...
"আপনি আমার একটুও খেয়াল রাখেন না। আমার কথা একটুও ভাবেন না আপনি। "
"কে বলেছে খেয়াল রাখি না? এই যে খেয়াল করছি... "
"তাহলে আমার এমন সময়ে আপনি কেন আজ ম'দ খেতে গেলেন? আমার বাচ্চাটা এসবের গন্ধ পেলে ক্ষতি হবে না? ওসবে এত নেশা কেন আপনার? "
আবির এক হাতে চড়ুইকে টেনে বুকে জড়িয়ে নেয়... টানটান সুরে বলে...
" ওসব ছাইপাসে আর কিই বা নেশা, সত্যিকারের নেশা তো আমার চড়াইপাখির মায়া মুখে। যে নেশায় আমি আজন্ম কালের জন্য ডুবেছি। সে নেশার কাছে ওসব ছাইপাঁশ কিচ্ছু না, কিছুই না..."
"তাহলে কথা দিন আর ওসব খাবেন না আপনি? "
"নেশা করার ক্রেভিংস যখন হবে তখন তোমাকে খেতে দিলে ওসব খাবো না প্রমিস..."
"আবার শুরু করলেন? "
"আচ্ছা সরি... আসুন আপনাকে শুইয়ে দিই..."
----------
রজনী প্রায় আড়াইটা। আবিরের চোখে ঘুম নেই,এটা আজ নতুন নয়, প্রতিদিনই একটু পর পর চড়াইয়ের জন্য জাগতে হয় তার। কখনো পানি খাবে, কখনো ওয়াশরুমে যাবে, আবার কখনো মাথা ব্যাথা, পায়ে ব্যাথা, কোমড়ে ব্যাথা এইসব। এই যে এখনো এক হাতে ঘুমন্ত চড়ুইকে বুকে জড়িয়ে অন্য হাতে তর কোমড়ে আলতো করে ম্যাসাজ করছে সে। থামলেই আবার চড়ুইয়ের গোঙানি শুরু হবে, তা বেশ জানা আছে আবিরের।
এভাবেই একটু পরে চড়ুই বেশ নড়চড় করে ওঠে।হঠাৎ আবিরের পিঠে রাখা হাতটা দিয়ে খামছে ধরে সে আবিরকে। আবির মুখ নামিয়ে দেখে চড়ুইয়ের কুঁচকে আসা মুখখানা। আলতো করে শুধায়..
"ওয়াইফি? জেগে আছো? কি হয়েছে পাখি?"
চড়ুইয়ের কানে যায় আবিরের ডাক। পিটপিট করে চোখ খুলে কাতর কন্ঠে ডেকে ওঠে...
"দানাবল.."
"কি হয়েছে পাখি? কিছু লাগবে? বলো আমায়?"
"পেটে খুব ব্যাথা করছে.. "
আবিরের শরীরে হিম হাওয়া বয়ে যায়। কিছু একটার আশঙ্কা। ডেলিভারির সম্ভাব্য তারিখ আরো প্রায় দু মাস পরে। এখন হঠাৎ ব্যাথা কেন? নিজেকে শান্ত করতেই চড়ুইকে বলে ওঠে...
"হয়তো বেবিরা কিক করছে পাখি। তুমি শান্ত হও কেমন? এই টুকু হয়ে নাও... সকালে ডক্টরকে আসতে বলবো..."
চড়ুইও মেনে নেয় আবিরের কথা। মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সেটি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। একটু পরেই চড়ুইয়ের চোখ ভিজে ওঠে। কাতর হয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে...
"আ্ আমি আর পারছি না দানাবল.... "
মেয়েটার গোঙানি ধীরে ধীরে চিৎকারে পরিনত হয়। আবিরের পাগল পাগল লাগছে, কি করবে না করবে বুঝে উঠতেও যেন কষ্ট হচ্ছে তার। চড়ুইকে ছেড়ে বিছানা থেকে নামতে গেলেই চোখে পরলো মেয়েটার পায়ের দিকটায় বিছানা সম্পূর্ণ ভেজা। আবিরের বুঝতে বাকি রয়না আর কিছু। সময় যে ঘনিয়েছে।
ছুটে গিয়ে দরজা খুলেই চিৎকার করে ডাকতে লাগলো নিবিড়, আহিশ, জিসানকে। আবিরের ডাক শুনেই আহিশ রুম থেকে ছুটে আসে সাথে সাথে....
"কি হয়েছে ভাই? "
"জলদি এম্বুলেন্স কল কর... না নাহ এম্বুলেন্স আসতে দেরি হয়ে যাবে। পার্কিং থেকে গাড়ি বের৷ কর দ্রুত... "
নিবিড়, দোয়েল সহ বাকি সবাইও হঠাৎ ঘুম ছুটিয়ে বের হয়ে এসেছে। দোয়েল কম্পিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে...
"কি হয়েছে ভাইয়া? ব্ বোন ঠিক আছে তো?"
সাবিহা, জুলেখারাও একই সাথে জিজ্ঞেস করে..
"কি হলো ছোটপাখির?"
"ওয়াটার ব্রেক করেছে ওর, ব্যাথা সহ্য করতে পারছে না আমার চড়াই... হসপিটালে খবর দে ভাই, ইমার্জেন্সি ডক্টর লাগবে আমার.... "
সবাই দ্রুত নিজেদের মগো৷ ব্যস্ত হয়ে পড়লো, দোয়েল, সাবিহারা ছুটে গেলো চড়ুইয়ের কাছে। আবিরের বুক কাঁপছে, চড়ুইয়ের প্রতিটা চিৎকার যেন তার অন্তর ভেদ করে যাচ্ছে ক্ষনে ক্ষনে। এতো সবল মনোবলের লোকটারও আজ হাত পা কাঁপছে। মাথা ঘোরাচ্ছে তার। বিছানা থেকে চড়ুইকে পাঁজা কোলে তুলে নেওয়ার পরও অনুভব করলো সে সইতে পারছে না ভার। ভেতর থেকে সমস্ত শক্তি যেন হ্রাস পাচ্ছে অদ্ভুত ভাবেই। তবুও সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে চড়াইকে ধরে রাখার।
চড়ুইকে নিয়েই পা টলতে দেখে নিবিড় এগিয়ে এসে দ্রুত বলে...
"আমার কাছে দে ভাই..."
আবির কি আদেও কথা বুঝতে পারলো? ছেলেটার সেই আকর্ষণীয় তাকানোর ধরনটা কোথায় যেন হারিয়েছে হঠাৎ। এই মুহুর্তে তাকে দেখলে কেউই বিশ্বাস করবে না তার মধ্যে ঠিক কতটা হিংস্রতা বিদ্যমান। মনে হচ্ছে যেন ভীরু একটা পুরুষ। দুনিয়া সম্পর্কে যার কোনো ধারনা নেই৷ মুখে তোতলাচ্ছেও সে....
"ভ্ ভাই... আ্ আমার চড়াই...."
নিবিড় কাঁধে হাত রাখে আবিরের। দ্রুত বলে ওঠে....
"কিচ্ছু হবে না ভাই, আল্লাহকে ডাক। তুই টলছিস, আমায় দে ওকে প্লিজ... "
অন্য সময় হলে আবির ভুলেও পরপুরুষের ছোঁয়ায় আবৃত হতে দিতো না তার চড়াই পাখিকে। কিন্তু আজ যেন সে নিজের উপরই ভরসা হারিয়ে ফেলছে। সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় যদি চড়াইকে ফেলে দেয় আবির? নাহ... এর থেকে ভালো নিবিড়ই নিক...
দ্রুত নিবিড়ের দিকে বাড়িয়ে দেয় সে চড়াইকে। নিবিড়ও আর দেরি করে না, চড়ুইকে নিয়ে গাড়িতে তোলে। আবির এক প্রকার ছুটে এসে জাপ্টে ধরে চড়ুইকে। মেয়েটা জ্ঞান হারায় হারায় অবস্থা, তবুও যেন নিজের সাথে যুদ্ধ করে টিকে রয়েছে সে। আবিরের কান্নার বাঁধ ভাঙে। মেয়েটাকে ঠিক যতটা পারছে বুকে আগলে রাখছে। পুরোটা রাস্তা জুড়ে পাগলের প্রলাপ করছে। সেই তার কত কথা, কত শান্তনা, স্মৃতি.....
------
অপারেশন থ্রিয়েটারের চিত্রখানা যেন বৈরী।ইমার্জেন্সির কারনে কেউই যেন কোনো দিন ঠিক মতো সামলে উঠতে পারছে না। হসপিটালে চরম পর্যায়ে ফোবিয়া পাখিদের। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আর কোনো উপায়ও নেই। দোয়েলকেও কোনো ভাবেই বাড়িতে আটকে রাখা যায় নি। তার জেদের কাছে হার মেনে নিয়েই আসতে হলো তাকে। এই তো একটু আগেই মাথা ঘুরিয়ে পড়লো, তাই তাকেও কেবিনে শুইয়ে রাখা হয়েছে। বাইরে ভীর করে আছে সকলে। আবির অপারেশন থ্রিয়েটারের সামনে বসে হাউমাউ করে কাদছে। শরীরের উপরিভাগ হতে চুইয়ে চুইয়ে ঘাম ঝড়ছে। রাতে ঘুমানোর আগে যে খালি গায়ে শুয়েছিলো এখনো সেভাবেই। বাড়ি থেকে যে খালি গায়েই ছুটে এসেছে সে, সে দিকে তেমন কারোর খেয়ালই নেই বলতে গেলে৷ ছেলেটাকে সামলানো যেন দায়। সাবিহা, আয়েশা মিলে তাকে থামানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই যেন থামে না আবির।
চড়ুইয়ের মাথার কাছ একজন বয়স্ক করে নার্স বার বার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এই সেই বলে শান্তনা দিয়ে যাচ্ছে যাতে জ্ঞান না হারায়। একেই এমন যন্ত্রণা, তার উপর হসপিটালের ফোবিয়ার কারনে মেয়েটা চেয়েও যেন টিকে থাকতে পারছিলো না। ঘোলাটে চোখে একটু পর পর তাকিয়ে দেখছিলো সামনে মানুষ গুলোকে। চিৎকার করার শক্তি খুইয়েছে সে, গলা ভেঙে গেছে। ঘন ঘন হাফানির সাথে যেন এক অদ্ভুত গোঙানির আওয়াজ। একটু পরেই ঘোলাটে চোখে আটকায় ছোট্ট রক্তমাখা একটি প্রাণ। নিস্তেজ দেহটির সাথে চড়াইয়ের সংযুক্তির নালিটিও চোখে পড়ে চড়ুইয়ের। কিন্তু কিছু সময় খুশির হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়ে উঠে না। বাচ্চাটিকে মুছিয়ে এনে চড়ুইয়ের বুকের উপর উপুর করে শুইয়ে দিয়ে নার্স বললো...
"দূর্ভাগ্যবশত আপনার কন্যাটি পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মৃত্যু হয়েছে। "
চড়ুইয়ের শরীর কেঁপে উঠলো। এতক্ষণের শরীরের সমস্ত যন্ত্রণা ছাপিয়ে হঠাৎ বক্ষ পিঞ্জরের যন্ত্রণাটাই তীব্র ভাবে বেড়ে গেলো। স্যালাইনের নল যুক্ত হাতটি তুলে নিজের বুকের উপর লেপ্টে থাকা শিশুটির পিঠে হাত রাখে চড়ুই। অনুভব করে তার সন্তানকে। তার গর্ভেী প্রথম সন্তানটির কান্না চড়াই শুনতে পারে না, মা ডাক শুনতে পারবে না কখনো। সইতে পারে না চড়াই, নিভু নিভু চোখে শেষ দেখতে পায় ডাক্তারের কোলে আরো একটি শিশু, কানে বেজে ওঠে বিড়াল ছানার মতো কান্নার আওয়াজ... সেই কান্না মিইয়ে যায়,চড়ুইয়ের চোখও অন্ধকার হয়ে আসে, চেষ্টা করেও যে আর সবল থাকতে পারলো না। জ্ঞান হারিয়ে ফেললো সহসা.....
-----------
চড়ুই- আবির, দোয়েল-নিবিড়ের আজ অষ্টম বিবাহ বার্ষিকী। চৌধুরী বাড়ির অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েও হয়নি এমন। সদস্য সংখ্যা বেড়েছে। সাজ সাজ রবে বাড়িটা ঝলমল করছে। ড্রয়িং রুমের সোফার চার দিকে ছোটাছুটি করছে অরুণাভ, নিরাভ, তাজ, পালক।চড়ুই আর আবিরের ছেলে অরুনাভ বিন চৌধুরী, বয়স আট বছর। তার থেকে হাতে গোনা এক বছরের ছোট দোয়েল ও নিবিড়ের ছেলে নিরাভ বিন চৌধুরী। ওহ.. নিবিড় দোয়েলের শুধু নিরাভই নয়, তিন বছরের ছোট্ট কন্যা পালকি বিনতে চৌধুরী। যাকে এখন চড়ুইয়ের জেরক্স কপি হিসেবেই গন্য করা হয়। কারন মেয়েটার ভাব ভঙ্গি যেন চড়ুইয়েরই মতো চঞ্চল। হবে নাই বা কেন? সেই ছোট্ট থেকেই তো চড়ুইয়ের কাছেই বেশি থাকছে মেয়েটা।
জিসান ও তারার ছেলে তাজ, বয়স তার পাঁচ বছরের কাছাকাছি। শুধু এরাই নয়, আরো একজনও রয়েছে যে আপাতত ছোটাছুটি করার মতো হয়ে ওঠেনি। আহিশ আর হৃদের ছোট্ট মেয়ে আরাত্রী গত পরশুই তার প্রথম জন্মদিন গেলো।
সব মিলিয়ে পরিবারটি এখন জমজমাট। এত কিছুর মাঝেও তারা তার কথা রেখেছে। শত বাধা বিপত্তির পরও পরিবারটাকে সে আগলে রেখেছে এক সুতোয়। কখনো আলাদা হওয়ার নামও নেয়নি। বাইরের কেউ বললেও তেমন আমলে নেয়নি সে। কেন আলাদা হবে? বোনের মতো জা পেলে কি আর আলাদা হতে মন চায়?
আজমল চৌধুরী, আর আসমত চৌধুরী ব্যবসায়িক দিক থেকে অবসর নিয়েছেন। আলভী চৌধুরীও নিবে নিবে ভাব,তবে তার আগে জিসানকে ভালো মতো ব্যবসায়িক ব্যপারটা বুঝিয়ে দিচ্ছে এখন। আবির নিবিড়ও নিজেদের ধারায় চলছে। পাখিদের ব্যবসাও এগিয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটা বিভাগেই তাদের ব্রাঞ্চ ছড়িয়েছে। বৈদেশিক দিকে অল্প কিছু এগোলেও সম্পূর্ণ নয়। সেই লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে পাখিরা। জেসি বৈবাহিক সূত্রে আপাতত কানাডায় বসবাস করছে। সেই সূত্রে সে দেশে পাখিদের ব্যবসার ফলনটাও সেই সামলে নিচ্ছে।
সেলিব্রেশন জমজমাট। প্রেস,মিডিয়ায় ভর্তি ড্রয়িংরুমেই কেক কাটা হয় টুইনস ব্রাদার্স আর পাখিদের। এরই ফাকে চড়ুই মুখ ফুলিয়ে আবিরের উদ্দেশ্যে আস্তে করে বলে...
"আপনি আমায় এই বার কোনো গিফট দিলেন না দানাবল..।ভুলে গেলেন নাকি এই আটটা বছরেরই ভালোবাসা কমে গেছে?"
আবির মুচকি হাসে। চড়ুইয়ের দিকে ঝুকে টেনে টেনে বলে ওঠে...
"শুধু আট কেন ওয়াইফি? আপনার সাথে আমি আমি আটশত বছর কাটিয়ে দিলেও আমার মন ভরবে না। ভালোবাসা তো দিন দিন বেড়েই চলেছে। কত ভাবেই যে ভালোবাসতে মন চায় আপনাকে..."
"কত ভাবে শুনি?"
"এই যে.....
দিলে ডাকিয়া কয় মোরে.. এক নজর তোরে দেখি বসিয়া...
দিল আমার কিছু বোঝে না... দিল আমার...."
চড়ুই ফিক করে হেঁসে দেয়। আবিরও হাসে....
"প্রথম বার এই গানটি গাওয়া পাখিটাকে ভালোবাসি। হুট করে এসে নিজেকে আমার বউ দাবী করা মেয়েটাকেও ভালোবাসি। এক মুখে এক সাথে আট পিস রসগোল্লা খাওয়া পেঙ্গুইনটাকেও ভালোবাসি। শীতের রাতে বাগান বাড়ির শিউলি তলায় আমার চাদরের ভাঁজে গুটিয়ে যাওয়া মেয়েটাকেও ভালোবাসি। ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে আমার বিয়ে করে নেওয়া বউটাকেও ভালেবাসি। আমার বাড়ির সবার প্রিয় লক্ষী বউ, আমার আম্মুর আদরের ছোট্ট মেয়েটাকেও ভালোবাসি। অন্ধকার রাতে বাসে লজ্জায় নুইয়ে পড়া লাজুকলতাকেও ভালোবাসি। সারা দুনিয়ার সামনে সফল বিজনেসওমেন মিসেস চড়ুই রাহমানকেও ভালোবাসি। একটু পান থেকে চুন খসলেই ডিভোর্স দিয়ে দিবো এই ভয়ে কেদে নাক লাল করে ফেলা পিচ্চি বউটাকেও ভালোবাসি। আমার অংশ পেটে ধারণকারী রমণীকেও ভালোবাসি। আর......"
চড়ুইয়ের বুক জুড়িয়ে যায়, আলতো হেঁসে বলে..
"আরো আছে? "
"হুম, বর্তমানের জন্য সর্বশেষ আমার ছেলে- মেয়ের মাম্মামকেও আমি প্রচন্ড ভালোবাসি।। "
চড়ুইয়ের মুখের হাসি গায়েব হয়ে যায়। চোখ জোড়ায় হতাশা ভর করে, অচিন কন্ঠে বলে ওঠে...
"মেয়ে? আমার মেয়েটা তো...."
"দু মিনিট ওয়েট করো, তোমার গিফট নিয়ে আসছি।"
তারপর হঠাৎ আবির নিবিড়কে কিছু ইশারা করে সরে যায় ড্রয়িং এরিয়া থেকে। নিবিড়ও হাসি মুখে এগিয়ে গিয়ে মিডিয়ার লোকজনদের উদ্দেশ্যে বলে...
"আপনারা ডিনার করে নিবেন চলুন। আমরা আমাদের ফ্যামিলি টাইম স্পেন্ড করতে চাইছি কিছুক্ষণ... "
বাড়ি ফাকা হয় কিছুটা। বাইরে বাগান এরিয়ায় খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানেই পাঠানো হয়েছে সবাইকে। আপাতত ড্রয়িং রুমে নিজেদের বাড়ির লোকজন ছাড়া আর কেউই নেই।
একটু পরেই আবির ফিরে আসে। কিন্তু সে একা নয়, তার শক্ত বাহুডোরে শুভ্র তোয়ালে দিয়ে প্যাচানো একটি নবজাতক শিশু। সকলের মুখে প্রশান্তির হাসি। কিন্তু চড়ুইয়ের চোখে শুধুই অবাকতা। আবির সরাসরি এসে দাঁড়ায় চড়ুই বরাবর। কোলের বাচ্চাটিকে একটু এগিয়ে দেয় চড়ুইয়ের দিকে। শান্ত হেসে বলে...
"তোমার গিফট... "
চড়ুইয়ের হাত পা কাপে। কন্ঠ কাপে।জিজ্ঞেস করে...
"দ্ দানাবল,এটা.......এ্ এই বাচ্চাটা...."
"আমাদের মেয়ে চড়াই। এটা তোমার আর আমার মেয়ে চরকি বিনতে চৌধুরী। তোমার আর পালকির নাম মিলিয়ে চরকি।সুন্দর না? "
চড়ুইয়ের কান্না গুলো আজ খুশি হয়ে বর্ষিত হচ্ছে, আটটা বছর আগের সেই দিন চড়ুই শুধু নিজের গর্ভে জন্ম নেওয়া মেয়েটাকেই হারায়নি, হারিয়ে তার মা হওয়ার ক্ষমতাও। কতগুলো বছর সে কন্যা হারানোর যন্ত্রণায় ডুকরে কেঁদেছে। তারপর গত তিন বছর আগে যখন দোয়েলের কোল আলো করে পালকি এলো, তখন দোয়েল মেয়েটিকে চড়ুইয়ের কোলে তুলে দিয়ে বলেছিলো...
"দেখ এটা তোরও মেয়ে, তুই ওকে নিজের মতো মানুষ করবি বোন।"
সেদিনের পর চড়ুই কিছুটা স্বাভাবিক হয়, পালকির নাম রাখা থেকে শুরু করে প্রায় সবই চড়ুই করতো। ছোট্ট পালকি এখনো তার দুই মায়ের মধ্যে কোনো তফাত খুঁজে পায় না। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে "তোমার মায়ের নাম কি, তখন ছোট্ট পালকি আধো বুলিতে উত্তর দেয়..
" দোয়েল পাখি আর চড়ুই পাখি.. "
কন্যার আপসোস কমেছে চড়ুইয়ের। কিন্তু তবুও কোথাও যেন একটা খুত রয়েই যায়। ভিতর ভিতর মন খারাপেরা বাসা বাঁধলেও চড়ুই কোনোদিন মুখ ফুটে আবিরকে তার মনের খায়েশ জানাতে পারেনি এই ব্যপারে। কি করে জানাবে? আট বছর আগে তো চড়ুই নিজেই জোর করে বাচ্চা নিয়েছিলো।সেবার যদি আবিরের কথা শুনে আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতো তাহলে হয়তো এমন হতো না। তবে ভালোবাসলে মনের কথা গুলে বুঝে নিতে হয়। তেমনি আবিরও বুঝেছে চড়ুইয়ের গোপন অশ্রুর কল্প। তাইতো আজ একটি ফুটফুটে সন্তান এনে চড়ুইয়ের কোল ভরিয়ে দিয়েছে সে৷
নিরাভ এগিয়ে আসে, আবিরের কোলে থাকা বাচ্চাটাকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করে চড়ুইকে সিরিয়াস ভঙ্গিতে হঠাৎ বলে ওঠে...
"ছোট মা তুমি কি ওকে নিতে ভয় পাচ্ছো? শোনো, এখন ওকে তোমার কাছেই রাখো ক'বছর বুঝলে, আমি বড় হয়ে যখন চাকরি করবো তখন ওকে আমার কাছে নিয়ে নিবো। এখন তুমিই রেখে দাও প্লিজ..."
অরুনাভ এসে দু হাতে কোমর জড়িয়ে ধরে চড়ুইয়ের। বলে...
"ওকে নাও না মাম্মাম,তুমি কি ভাবছো? আমার হিংসা হবে ভাবছো যে? করবো না আমি ওকে হিংসা। ছোট্ট বোনকে কেউ হিংসা করে বলো? ভয় পেও না মাম্মাম। বোনকে কোলে নাও? "
চড়ুই ঘোরের মধ্যে থেকেই বলে ওঠে...
"ও্ ওকে কোথা থেকে এ্ এনেছো? আমার থেকে ছিনিয়ে নেবে না তো কেউ ওকেও? "
আবির সবল কন্ঠে বলে...
"কেউ নিবে না চড়াই। দু মাস আগেই ওর জন্মদাতা পিতা মারা গেছে। আজ সকালেই ওর জন্ম হয়, তার কিছুক্ষণ পরই ওর জন্মদাত্রী মাও মারা যায়। আজ থেকে তুমি ওর একমাত্র মা, আর আমি ওর বাবা। কেউ ওকে নিবে না তোমার থেকে পাখি৷ আমাদের মেয়েকে কোলে নাও?"
চড়ুই দু হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নেয় ছোট্ট চরকিকে। সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটির শরীরে এখনো সাদা আস্তরনে ভরা। এ যেন চড়ুইয়েরই সন্তান, মাত্রই ভূমিষ্ঠ হয়ে তার বুকে দেওয়া হয়েছে। ঠিক যেমনটি আট বছর আগে তার মৃত কন্যাকে রেখেছিলো তার বুকে। কোল জুড়িয়ে যায় চড়ুইয়ের। নিজেকে হঠাৎ সম্পূর্ণা মনে হয়। দুনিয়ার সমস্ত সুখ যেন এক জীবনেই পেয়েছে সে। আর কি লাগে? কিছু না, কিছুই না....
চড়ুইকে ঘিরে বাকি বাচ্চা গুলো আনন্দে গোল গোল ঘুরতে থাকে। সকলে এগিয়ে এসে ছোট্ট প্রাণটিকে আদর দিতে থাকে। আগলে নেয় একে অপরকে। একেকটি প্রাণ যেন পরিবারটির মূল কাঠামো। মিশেল অনুভুতির কতগুলো মানুষ চির জীবনের জন্য একটি মাত্র সুতোয় বাঁধা।
এভাবেই দীর্ঘ সফরের পর আমাদের কল্প ফুরিয়ে যায়। তবে স্মৃতির মাঝে প্রতিটি পাঠকের মধ্যে বেঁচে থাকে একান্নবর্তী পরিবারটি।বেঁচে থাকে আহিশের মতো বন্ধুরা, বেঁচে থাকে পাখিরা, টুইনস ব্রাদার্সরা,বেঁচে থাকবে জোড়া প্রেমিক Mr and Mrs twins.........