"হ্যা রে আবির, ছোট পাখির শরীর ঠিক আছে তো? এত ভোরে এলি, কখন এলি জানলামও তো না।ডাকতে পারতি কাউকে..."
জুলেখার কথায় আবির নিরলস ভঙ্গিতে কফির কাপে চুমুক দিয়ে উত্তর দেয়...
"শরীর ঠিক আছে, রাতে ঘুমাতে পারে নি তো বাসে। তাই এখন ঘুমাচ্ছে, চিন্তা করো না তোমরা।"
সাবিহা প্লেটে খাবার বেড়ে নিয়ে এগিয়ে যেতে নেয় সিঁড়ির দিকে...
"আমি বরং যাই, ওকে খাইয়ে দিয়ে আসি। তারপর না হয় ঘুমাবে...."
সাবিহার হঠাৎ এমন প্রস্থান দেখে ঘাবড়ে যায় কয়েকটি প্রাণ। দোয়েল দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে এক প্রকার দৌড়ে গিয়ে সাবিহার পথ রুখে দাঁড়ায়..
"আম্মু.. ত্ তুমি এদিকটা সামলাও,আমি দিয়ে আসি বোনের খাবার..."
সাবিহা খুব একটা ঘাটায় না, দোয়েলের হাতে দিয়ে দেয় খাবারটি। দোয়েল সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে। তখন পাশে আবির এসে হাত বাড়িয়ে বলে...
"আমায় দাও। "
দোয়েল কোনো প্রকার প্রশ্ন ছাড়াই খাবারটা আবিরকে দিয়ে নিচে চলে যায়।
রুমে ঢুকতেই আবিরের চোখ আটকায় কান্নারত চড়াই পাখিটির দিকে। খাটের বোর্ডে হালকা হেলান দিয়ে সাদা ব্ল্যাঙ্কেটে নিজেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে বাচ্চাদের মতো কেমন হিচকি তুলে কাঁদছে মেয়েটি। আবিরের হৃদয় হতে এক দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে আসে। আস্তে করে দরজায় খিল দিয়ে এগিয়ে গিয়ে খাবারের বাটিটা টেবিলে রেখে খাটের কোনে বসলো।
আলতো করে চড়ুইকে নিজের দিকে টানতে গেলেই চড়ুই সরে যায় একটু৷ আবির আবারো একটু এগিয়ে চড়ুইকে কাছে ডাকে...
"ওয়াট হ্যাপেন্ড ওয়াইফি? ভয় পাচ্ছো কেন?.."
চড়ুই উত্তর দেয় না, নিরবে গুনগুন করে কাঁদতে থাকে। আবির আস্তে করে তার বাম হাতটা ধরে আবার কোমল কন্ঠে শুধায়...
"কষ্ট হচ্ছে বউ?"
চড়ুই নাক টেনে উত্তর দেয়...
"দ্ দূরে থাকুন.. আপনি অ্ অনেক ডেস্পারেট... "
আবির ঢোক গিলে সহসা। হয়তো সত্যিই সে একটু বেশি উন্মাদ হয়ে পড়ছিলো। এতটা করা হয়তো উচিত হয়নি।
আলতো করে চড়ুইয়ের গালে হাত ডুবিয়ে আবেশে বলে...
"কি করবো বলো? তোমাকে দেখলেই আমি কন্ট্রোললেস হয়ে যাই। "
"কন্ট্রোললেস কি হ্যা? মনে আছে আমায় কি কি বলতেন? আমাকে বিয়ে করা ইম্পসিবল, এখন কেন আপনি...."
"আবার ওসব কেন টানছো এখন? আ'ম সরি তো না? ভালোবাসি বুঝো না?"
চড়ুই পিটপিট চোখে তাকায় আবিরের দিকে। সন্দেহ কন্ঠে বলে ওঠে...
"এবার কি আমায় ডিভোর্স দিয়ে দিবেন? "
আবিরের চোখ বড় বড় হয়ে যায়।এই মেয়ে কি বলে এই সব।
"ব্যাথা কি পেটে করছে নাকি মাথায়? পাগল হলে? ডিভোর্স কেন দিবো আজব। এত কষ্ট করে বিয়ে করেছি কি ডিভোর্স দেওয়ার জন্য?"
"তো কি করবেন?"
"অন্যরা যা করে..."
"বউ পিটাবেন?"
"আরেহ স্টুপিড.. খেয়ে দেয়ে কাজ নেই আমার না? এত মিষ্টি একটা বউকে মা'রতাম আমি? জান চলে গেলেও তোমার গায়ে টোকা দিবো না... "
"আগে তো ঠিকই মারতেন...সেদিন ও তো ছাঁদে ইরিন আপুর সামনে থাপ্পড়.... "
"তোমার জন্যই মেরেছি। এখন ওসব বাদ... আজীবনের জন্য আমার হয়ে থাকবে তুমি আমার হয়েই।আর না কখনো ডিভোর্সের কথা মুখে আনবে, না ছেড়ে যাওয়ার কথা। মনে থাকবে?"
------
সন্ধ্যার দিকে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো চড়ুই। সবার সাথে সোফায় এসে বসতেই আয়েশার প্রশ্ন...
"ছোটপাখি, তোর শরীর এখন কেমন? "
চড়ুই ভ্রু কুঁচকে তাকায় আয়েশার দিকে। চাচি কি ওসব জেনে গেলো? এমাহ, ছি ছিহ...
"আ্ আমার শরীর..."
চড়ুই কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই সাবিহাও রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে...
"হ্যা তোর শরীর। জানিস বাসে উঠলে বমি হয় তোর, মেডিসিন নিয়ে নিতে পারলি না আগে থেকে? আর আবির নিবিড়, তোদেরও বলিহারি। বাড়ির গাড়িতে গেলে কি হতো? এত টা পথ বাস জার্নি করে দেখছিস তো আমার মেয়েটার কি হাল হলো? আজ পুরোটা দিন বিছানায়...."
চড়ুই ভ্যাবলার মতো আবিরের দিকে তাকাতেই দেখলো আবির তার দিকে তাকিয়েই মিটমিট হাসছে। ভ্রু কুঁচকায় চড়ুই, এই দানাবলটা তার অবস্থার মজা নিচ্ছে? একে তো মজা দেখাবে পরে....
"তুমি বকাবকি পরে করবে সাবিহা। বড় খবরটা শুনেছো?"
আজমল চৌধুরীর কথায় সাবিহা সহ বাকিরাও তার দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকায়।
"বড় খবর কি আবার?"
আজমল চৌধুরী নিউজপেপার খানা চোখের সামনে থেকে নামিয়ে বলে ওঠে...
"ওমাহ, তোমার গুনধর ছেলের কান্ড শুনো নি এখনো? "
"কে কি করলো আবার?"
আজমল চৌধুরী স্বাভাবিক হয়ে আবিরের দিকে ইশারা করে বলে ওঠে...
"গতকাল রাতে চৌষট্টি লক্ষ টাকা দিয়ে বাস কিনেছে কম্পানি থেকে তোমার এই ছেলে। "
সাবিহা হালকা হেঁসে বলে ওঠে..
"ওমাহ সে তো ভালো কথা। নতুন ব্যবসার কাজ করবি নাকি আবির? বাসের..."
আজমল চৌধুরী সাবিহাকে থামিয়ে দিয়ে বলে ওঠে...
"আগে পুরো কথাটা তো শোনো.."
"আবার কি? "
"গতকাল রাতে বাস কিনেছে সে। আর আজ সকালে সেই বাসটি পুরিয়ে এসেছে। কেন করেছে জিজ্ঞেস করো তো..."
চড়ুইয়ের চোখ গোল গোল হয়ে যায়। ভিতু দৃষ্টিতে একবার আবিরের দিকে তো আবার আজমল চৌধুরীর দিকে তাকায় মেয়েটি। দানাবলটা কাল রাতে ওসব করার জন্য পুরো বাসটাই কিনে নিয়েছিলো?
"আমি বুঝতে পারছিলা এভাবে কোনো প্রয়োজন ছাড়া ও এতগুলো টাকা কেন খরচ করলো। শোন আবির, বিয়ে করেছো তুমি। যাচ্ছেতাই ভাবে টাকা না উড়িয়ে নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাবো।... "
আবির মাথা নুইয়ে বিরবির করে বলে ওঠে...
"ভবিষ্যতকে আনার জন্যই তো খরচ করেছি আব্বু, তুমি আর কিই বা বুঝবে ওসব...."
কথাখানা কারোর কানে না গেলেও পাশে বসে থাকা নিবিড় ঠিকই শুনে নিলো। আবিরের কথায় মুখ ফসকে উত্তরে বলতেই নিচ্ছিলো চেঁচিয়ে...
"আরে ব্যাটা, তোর জন্য কি বাড়ি ঘর ছিলো না? বাসের মধ্যেই...."
নিবিড়ের এমন লাগাতার কথা শুনে চড়ুই পাখি চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো, আবিরও চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে থাকে নিবিড়ের দিকে। এই ছেলেটা যেখানে সেখানে উল্টোপাল্টা কথা বলে দেয়...
শেষ দিকে কথাটা অতটুকুতেই আটকাতে সক্ষম হলো দোয়েল। দিকবিদিক উপায় না পেয়ে পাশ থেকে পানির গ্লাস তুলে নিয়ে ছুড়ে মারলো নিবিড়ের মুখের উপর...
তার এমন কাজে সকলেই বিচলিত... দোয়েল এটা কি করলো? ও তো এমন দুষ্টুমি করার মেয়ে নয়.. তাও আবার সবার সামনে..
আজমল চৌধুরী হালকা রাগী স্বরেই বলতে নেয়...
"বড় পাখি.. এটা তুই কি করেছিস হঠাৎ? "
দোয়েল পড়লো বিপাকে। কাজটা তো করে ফেললো,এবার সবাইকে জবাব দিবে কে। নিবিড় দোয়েলের এমন ঘোলাটে অবস্থা দেখে মুখ মুছে এগিয়ে আসে গায়ের পানি গুলো ঝাড়তে ঝাড়তে। মুখে হাসি এনে বলে..
"আ্ আরে তোমরা কিছু মনে করো না। মিস এটম তো এমনিই... আ্ আসলে আমাদের মধ্যে একটা ডিল হয়েছিলো একটু আগে। র্ রাগ থেকে আরকি। যে আগে কথা বলে ফেলবে তাকে গভাবে পানি মারা হবে। অর নাথিং... তোমরা একটু শান্ত হও...".
সাবিহা হাফ নিশ্বাস ফেলে মাথা দুলিয়ে বলে ওঠে...
" ওহ, তোরা ছেলে মেয়ে গুলো যা দুষ্টুমি করিস না এই বয়সে এসেও... "
একটার পর একটা ঘটনায় ঢাকা পড়ে গেলো বাস কেনার কথাটা। সেটি আর প্রকাশিত হলো না কখনোই কারোর সামনে। তবে দুষ্টু চড়ুই বরাবরই বিষয়টা নিয়ে আবিরের মজা উড়িয়েছে। এই যে মাত্রই কল দিয়ে যাচ্ছে অনবরত।
অফিসের থাই গ্লাস দিয়ে রাস্তার বিপরীতে তাকায় আবির। পাখিদের শপ এখন মোটামুটি জমজমাট। সকাল সকালই দু জন আবির নিবিড়ের সাথে আসে আবার সন্ধ্যায় ফিরে যায়।
কিন্তু আজ মেয়েটাকে সামনে দেখা যাচ্ছে না। এই বিকেল সময়ে হঠাৎ কল কেন?
রিসিভ করে কানে তুলে আবিরই প্রথম প্রশ্ন করে...
"কোথায় তুমি, দেখতে পাচ্ছি না। সামনে আসো ওয়াইফি... "
"আমি তো... আহিশের সাথে বাড়ি চলে এসেছি। "
"কখন ফিরেছো, আমায় জানাওনি কেন?"
"ওসব বাদ, এখন শুনুন না? "
"বলুন না?"
"আজ একটু তারাতারি ফিরবেন?"
চড়ুইয়ের আবদার কন্ঠে আবির মিঠেল হেঁসে জবাব দেয়....
"কেন? মিস করছেন বুঝি? "
"হুহ... আপনার মতো নাকি? ডেস্পারেট, কন্ট্রোললেস কোথাকার... "
"ওয়াইফি..."
"কি? মনে নেই বাস কেনার কথা? ইশশ,কি লজ্জা কি লজ্জা... বান্ধবীদের জীবনেও তো আমি বাসরের গল্প বলতে পারবো না। জানেন এই চার মাসে আমার বান্ধবীরা কতবার আমার বাসরের গল্প জানতে চেয়েছে?"
আবির হাতের ল্যাপটপ খানা বন্ধ করে ফোন কানে চেপেই বেরিয়ে এলো নিজের কেবিন থেকে।
"তো বলো নি কেন? "
"কি করে বলি? আপনি কোনো সভ্য কাজ করেছেন সেদিন? ওদের যদি বলি যে আমার বর বাসর করার জন্য একটা ঘন্টাও ওয়েট করতে পারলো না, ডিরেক্ট বাস কিনে নিলো... এটা শুনলেই তো ওরা হাসবে.."
আবির হাসে। এই মেয়েটার এমন আজব কথা গুলোও শুনতে তার ভালো লাগে। কথা গুলো কোনো কাজের নয়, অন্যদের কাছে হয়তো অজথা সময় নষ্ট করার মতোই কথা। কিন্তু আবির শুনে যায় মনোযোগ দিয়ে সেসব কিছুই। যত গুরুত্বপূর্ণ কাজেই থাকুক না কেন সে চড়াই পাখির বুলি সর্বোচ্চে থাকে...
পথিমধ্যে নিবিড়ের সাথে দেখা হতেই নিবিড় প্রশ্ন করে...
"কোথায় চললি?"
"বউ ডেকেছে আর্জেন্ট...বাড়ি যাই "
নিবিড় মনে করার ভঙ্গিতে বলে ওঠে...
" ওহ, এটম তখন বলেছিলো ছোটপাখির শরীর খারাপ করছিলো তাই বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। তোকে বলতে ভুলে গেছি সরি...."
আবিরের ভ্রু কুঁচকে যায়..
"শরীর খারাপ?.."
এরপর হাটার গতি বাড়িয়ে ফোনে থাকা চড়ুইয়ের উদ্দেশ্যে হালকা ধমকের কন্ঠে বলে ওঠে...
"এ্যাই মেয়ে.. কি হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ কেন?"
চড়ুই দ্রুততার সহীত উত্তর দেয়...
"ও কিছু না। এমনিই একটু দূর্বল.. আপনি কি এখনই আসছেন?"
"ইয়েস, ইউ নিড সামথিং?"
"হ্যা, আসার সময় আমার জন্য দই ফুচকা নিয়ে আসবেন, ঝাল বেশি, টক কম... টাটাহ.. এখন রাখি, আস্থে ধীরে আসুন. আমার অনেক কাজ.."
"রেস্ট নাও এখন, কোনো কাজ নয়..."
কে শুনে কার কথা। চড়ুই চট করে ফোন রেখে দিলো। আবিরও আর দেরি না করে গাড়ি নিয়ে রওনা দিলো বাড়ির উদ্দেশ্যে।
বাড়ি ফিরেই নিজ কক্ষে এক প্রকার ছুটে গেলো আবির। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখে কয়েকবার কড়াঘাত করে ডাকে চড়াইকে। দরজা খুলে দেয় চড়ুই। মেয়েটা সেজেছে আজ অপরুপে। পড়নে নীলছে পাড় শাড়ি। সিল্কি চুলগুলো পিঠ জুড়ে ছড়ানো।
বিয়ের পর এই এতদিনে মেয়েটা আবিরের জন্য এমন করে সেজেছে কোনো না কোনো বিশেষ আয়োজনেই। আজ তবে কি আবার?
দরজা খুলে মেয়েটার মিষ্টি হাসি দেখে আবিরের ক্লান্ততা যেন দূর হয়ে যায়। এগিয়ে এসে আলতো করে জড়িয়ে ধরে তাকে। তারপর মেয়েটার দু গাল আকড়ে ধরে কপালে, গালে, মুখে চুমু খায় অনবরত। কোমল, মোহনীয় কন্ঠে বলে...
"খুব মিষ্টি লাগছে। একদম আমার বউয়ের মতো.."
চড়াই পাখি লাজুক হেসে মুখ নামিয়ে নেয়।
"শরীর খারাপ বললো,কি হয়েছে তোমার ওয়াইফি? আর অসুস্থতা নিয়ে সাজলে আজ?"
চড়ুই বুক ভরে দম নেয় একটা। আবিরের শক্তপোক্ত দু হাত আগলে ধরে রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। দু কদম, তিন কদম গিয়েই থেমে যায় চড়াই। আবির কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। কি করতে চাইছে মেয়েটি?
চড়ুই দীর্ঘ হেঁসে সরা দাড়ায় এক পাশে। আবিরের চোখের সামনে উন্মুক্ত হয় অদ্ভুত অর্থবহ দুটো বস্তু। বিছানার উপর ফুলের পাপড়িতে সাজিয়ে রাখা ছোট্ট এক জোড়া জুতা। পাশেই একটি প্রেগন্যান্সি কিট, সেখানে স্পষ্ট হয়ে আছে দুটো দাগ। অর্থাৎ.............