নিশীথের প্রহর কাটছে ধীরে। সঙ্কটাপন্ন পরিস্থিতিতে আজ ঘুম পালিয়েছে কয়েকটি মানবের। এই যেমন আবির... রাত্তির দুটো পাড় করেছে সময়। এই সময় বেজার মুখে কিচেনে আসতেই সেথায় আগে থেকেই নিবিড়ের উপস্থিতি পেলো। তাকে দেখে আবির সর্বপ্রথম যেই প্রশ্নটা করলো সেটি হলো...
"বড় পাখি ঠিক আছে? "
সিং থেকে বোলে পানি ভরতি করতে করতে নিবিড় ঘুরে তাকালো আবিরের দিকে। উত্তরে বললো...
"ছোট পাখির কাছে যাওয়ার জন্য পাগল পাগল করছিলো। হালকা পাওয়ারের ঘুমের মেডিসিন দিয়েছি। ঘুমাচ্ছে, তবে শরীরের কান্ডিশন বুঝতে পারছি না। জ্বর জ্বর ভাব... "
আবির মাথা নোয়ালো। নিবিরের কথার প্রেক্ষিতে কি বলা যায় তা ভেবে পেলো না। নিবিড়ই উল্টো প্রশ্ন করলো....
"ছোট পাখির কি অবস্থা? জ্ঞান ফিরিছে? "
আবির নির্মল চোখ তুলে তাকায় নিবিড়ের দিকে। কঠিন পুরুষটার চোখ দুটিও আজ ছলছল করছে। নিবিড় নিমেষেই বুঝতে পারে ভাইয়ের মনোভাব। দ্রুত হাতের বোলটা পাশে রেখে এগিয়ে এসে জাপ্টে ধরে আবিরকে। হুরহুর করে কেঁদে দেয়,তখনই আবিরের মতো পাষণ্ড হৃদয়ধারী ব্যক্তিটাও। নিবিড় এমন কিছুরই আছ করেছে। আবিরকে বুকে আগলে ধরে ভরসা জুগিয়ে বললো...
"নিজের প্রতি গিল্ট ফিল কেন করছিস তুই ভাই? ইট’স যাস্ট আ এক্সিডেন্ট.... "
"আমার তখন রাগের মাথায় চড়াইকে ইরিনের কাছে একা ফেলে আসা উচিত হয়নি। সবটা আমার জন্য.... মেয়েটা বিছানায় কাতরাচ্ছে ভাই, আমি চেয়েও ওর যন্ত্রণা কমাতে পারছি না..."
নিবিড় আবিরকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে বলে...
"ডক্টর আঙ্কেলকে আসতে বলি..."
"নাহ, ফিমেল ডক্টর প্রয়োজন। চড়াইয়ের পিঠের ক্ষতটা...."
"ওহ, তাহলে তো সকালের আগে পাওয়া সম্ভব না। "
আবির মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। মুখে বললো...
" বড়পাখিকে পারলে একটা পেইনকিলার দিস। আর চড়াইকে দেখতে চাইলে পাঠিয়ে দিস। "
" তা এই সময় কিচেনে কেন এলি? "
"পানি নিতে.. জলপট্টি দিবো,প্রচন্ড জ্বর ওয়াইফির."
রুমের ভেতর পা রাখতেই বিছানার দিক থেকে গোঙানির আওয়াজ কানে আসে আবিরের। দরজায় ছিটকিনি দিয়ে পানির বোলটা নিয়ে এগিয়ে যায় সেদিকে। উন্মুক্ত পিঠখানা দৃশ্যমান চড়ুইয়ের। এলোমেলো ভাবে দুটো হাত দু দিকে ছড়িয়ে কাতর হয়ে পড়ে আছে বিছানায়।
পাশ থেকে পাঞ্চক্লিপ নিয়ে তার এলেমেলো চুল গুলো গুছিয়ে খোপা করে দেয় আবির। চড়ুইয়ের পাশে বসে মেয়েটাকে নাড়াতে গেলেই চোখ মেলে তাকায় চড়ুই। আবিরের প্রচেষ্টা বুঝতে পেরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চায় সে। তা দেখে আবির বললো...
"এদিকে এসো, ওভাবে শুলে পিঠে ব্যথা পাবা তো পাখি... "
চড়ুই ক্লান্ত চোখে চেয়ে এক হাত দিয়ে নিজের লজ্জা স্থান ঢেকে নিতে নিতে বলে...
" দানাবল?"
"বলো পাখি? "
"আমার এখানে কিছু নেই, ল্ লজ্জা লাগছে তো। "
আবির ঢোক গিলে, মেয়েটার করুন অবস্থা দেখে ক্লান্ত আদুরে স্বরে বলে...
"আমি তো তোমার হাসবেন্ড চড়াই, কিচ্ছু হবে না। আসো এদিকে একটু, আমিই তো। "
"কিন্তু... "
"এভাবে থাকলে তুমি ব্যথা পাবা তো, এদিকে আসো, আমি একদম তাকাবো না ওসবে। আসো... "
বেশ বুঝিয়ে সুঝিয়ে উপুর থেকে নিজের দিকে এক পাশ ফিরিয়ে শোয়াতে সক্ষম হলো চড়ুইকে আবির। তবুও চড়াই পাতলা ব্ল্যঙ্কেট দিয়ে নিজের বক্ষ পর্যন্ত টেনে রেখেছে। আবির আর বাঁধা দেয় নি এসবে। আস্তে ধীরে চড়ুইয়ের কপালে জলপট্টি দিতে লাগে সে।
"আপনি আমায় ভ্ ভালো বাসেন না কেন দানাবল? আ্ আমাকে একটু ভালোবাসলে কি এমন হয়? আমি না আপনার বউ? "
আবিরের হৃদ কম্পন হয় মেয়েটার ঘুমু ঘুমু কন্ঠের তীব্রতায়। জ্বরের ঘোরে মানুষ মনের কথা বলে, চড়াই পাখিটিও কি তবে আজ তাই করছে?...
"হুম,তুমিই তো আমার বউ। তোমাকেই তো ভালোবাসি আমি চড়াই.. "
"ম্ মিথ্যা কথা, ভালোবাসলে কি আমায় তখন মারতেন?"
"ভালোবাসি বলেই তো মেরেছি বউ, ডিভোর্স পেপারে সই করে দিলে তুমি? সেটা আবার গিফট করে আমায়ও পাঠালে? কেন চলে যেতে চাও দুরে?"
"আপনি আমায় ম্ মারলেন,, ব্যথায় আদরও করে দেন নি। "
আবির কোমল হাত খানা চড়ুইয়ের গালে ঠেকিয়ে বলে...
"এইতো আদর করে দিচ্ছি বউ,... "
"চুমু দিয়ে দিন? একশোটা চুমু দিয়ে দিন..? "
আবির আলতো হাসলো, মেয়েটার হুশ ফিরলে হয়তো মনেও থাকবে না এমন বেপরোয়া কথা গুলো। কিন্তু এই মুহুর্তের সুখটাকে আবির নাকোচ করে নি, বউয়ের আদেশ মেনেই ঘন ঘন চুমুতে ভরিয়ে দিলো চড়ুইয়ের টসটসা গালখানা। হিসেব বিহীন চুমু দেওয়ার পর জিজ্ঞেস করলো...
"আর আদর দেবো পাখি?"
চড়ুই ঘুমঘুম চোখ দুটি একবার মেলছে তো আবার ঘুমের তীব্রতায় বন্ধ করে নিচ্ছে। এভাবেই আবিরের কথার উত্তর না দিয়ে হঠাৎ ঠোঁট উল্টে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে ওঠে...
"ওও দানাবল? "
"বলো না ওয়াইফি? "
"ইরিন আপুকে তো আমি ক্ কিচ্ছু করি নি৷ উনি আমাকে ব্যথা দিয়েছে কেন? আমার যে খ্ খুব কষ্ট হচ্ছে। "
আবিরের বুকটা হুহু করে ওঠে। এই মেয়েটাকে নিয়ে কোথায় যাবে সে, এমন কথার তালে আবির যে আর চোখের বাঁধ মানাতে পারে না।
নীরবে চড়ুইয়ের কোমড় আর মাথার নিচে নিজের দুটো হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে আরেকটু নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো যেন। কথার উত্তর দিতে পারে না সে, কিই বা উত্তর দেবে? দোষটা যে তারই।
"ওও দানাবল.. আমি ক্ কি খুব দুষ্টামি করি? সবাই আ্ আমাকে এমন ব্যথা দেয় কেন? "
"না পাখি, তুমি তো লক্ষ্মী বউ আমার, তুমি একটুও দুষ্টামি করো না। যারা খারাপ তারাই তেমায় ব্যথা দেয়... "
"ত্ তাহলে কি আপনিও খারাপ? আমায় যে মারলেন? "
"হুম, আমিও খারাপ, আমিও খুব খারাপ পাখি, তুমি আমায় শাস্তি দিও,, "
------
খুব সকালে দরজায় ঠক ঠক আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় আবিরের। ভোরের আলো ফুটার পরেই চোখ দুটি লেগে এসেছিলো তার। পুরোটা রাত চড়াই পাখি না নিজে ঘুমিয়েছে আর না আবিরকে ঘুমাতে দিয়েছে। যন্ত্রণায় গোঙাতে গোঙাতেই পাড় করেছে সময়।
পাশ থেকে ফোন নিয়ে সময় দেখে নিলো সে, মাত্র ৬:২২ বাজে। এত সকালে কে ডাকে?
চড়ুইকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে পাশে একটা বালিশ দিয়ে তার উপর ভর দিয়ে শুইয়ে দিলো বিছানায়। এলোমেলো চুল গুলো হাতের আজলে গুছিয়ে দিলো নীরবেই। কোমড় থেকে টেনে সাদা ব্ল্যাঙ্কেট খানা পিঠের ক্ষত স্থানের একটু নিচ পর্যন্ত ঢেকে দিয়ে নেমে এলো সে৷ দরজা খুলতেই সামনে দেখতে পেলো নিবিড়কে। সাথে আহিশ, সাবিহা সহ আরেক জন মহিলা। হাতের ব্যাগ টি দেখেই বুঝতে পারলো উনি ডক্টর। আহিশ বলতে নিলো....
"ছোট পাখির নাকি কন্ডিশন ভালো নেই তাই.."
" আম্মু আসো ভিতরে উনাকে নিয়ে। তোরা যা এখন... "
আহিশ ভ্রু কুঁচকে বলতে নেয়...
"আমরা এলে কি সমস্যা? "
বুদ্ধিহীন আহিশকে নিবিড় টেনে নিয়ে গেলো...
"তুই আমার সাথে চল, মিস এটম উঠেছে কি না দেখি৷... "
সাবিহা সহ ডাক্তার মহিলাটি রুমে ঢুকতেই আবির দরজা আটকে দেয়। ফ্লোরে এক কোনে চড়ুইয়ের র'ক্ত মাখা ব্লাউজ আর ইনারটা চোখ এড়ায় না সাবিহার। চট করে বুঝে ফেললো আহিশদের ভিতরে ঢুকতে না দেওয়ার কারন।
আবির এগিয়ে গিয়ে আস্তে করে চড়ুইয়ের পিঠ থেকে ব্ল্যাঙ্কেট খানা একটু নিচে নামিয়ে দেয়। ড.মিনারা আড়চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে....
"আপনি রোগীর কে? "
আবির সহসাই উত্তর দিলো...
"হাসবেন্ড, এনি প্রবলেম? "
ড. মিনারা চড়ুইয়ের উন্মুক্ত পিঠ অনুসরন করে আবিরকে জিজ্ঞেস করলো...
"আপনি এই অবস্থায়ও ওর সাথে ইন্টিমেট হয়েছেন? "
আবিরের মেজাজ হুরহুর করে বাড়তে থাকে। কাঠিন্য স্বরে বলে ওঠে....
"ওয়াট ননসেন্স, আমাকে দেখে কি আপনার ব্রেনলেস মনে হচ্ছে? এই অবস্থায় ওর সাথে আমি.... "
" তাহলে ওর শরীর উন্মুক্ত কেন? "
আবির পারছে না নিজের মাথায় নিজেই বারি মারতে। এগিয়ে এসে চড়ুইয়ের শরীর থেকে ব্ল্যাঙ্কেট খানা আরেকটু নিচে নামিয়ে পরিধানরত শাড়ি খানা দেখিয়ে বললো....
"উন্মুক্ত নয়, যাস্ট ব্লাউজটাই খুলেছি, সেখানটায় আঘাত বলে, আর আপনাকে কি আমাকে জেরা করার জন্য আনা হয়েছে? ওকে দেখুন... "
আবিরের এমন কর্কশ কন্ঠ শুনে সাবিহা তাকে থামানোর উদ্দেশ্যে বললো...
"আহ,, আবির উনি তো শুধু.... "
"নো আম্মু, আ'ম যাস্ট ফিড আপ... আমি আমার বউয়ের সাথে ইন্টিমেট হবো না হবো সেটাও জবাবদিহি করা লাগছে, আমাদের কি কোনো প্রাইভেসি নেই? ইরিটেটিং.... "
ড. মিনারা আড়চোখে একবার আবিরের দিকে তাকিয়ে চড়ুইকে দেখায় মনোযোগ দিলো। চেক করার পর একটা ইনজেকশন দিতে গেলেই আবির প্রশ্ন করে বসে...
"ইনজেকশন কেন দিচ্ছেন, ওয়াইফি ব্যাথা পাবে তো আরো.... "
"মরিচা জাতীয় কিছু দিয়েই আঘাত করেছে হয়তো,, ভিতরে ইনফেকশন যাতে না ছড়ায় সেই জন্য দিচ্ছি, না হলে পরে এটি আরো বিপদজনক হতে পারে।"
আবির চুপ হয়ে যায়। ড. মিনারা নিজের কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়ায়...
"ব্যাথা কমার মেডিসিন দিয়েছি। ঘা শুকানোর আগে পর্যন্ত পানি যেন না লাগে একটু খেয়াল রাখবেন। জায়গাটা খোলামেলা রাখলেই বেটার, কিন্তু এমন জায়গায় ক্ষত... "
ড. মিনারাকে থামিয়ে আবির বলে ওঠে...
"যতদিন ও সুস্থ না হয় ততদিন রুমেই থাকবে এভাবে। "
ড. মিনারা আর কিছু বলে না, সাবিহা বেকার হেঁসে বলে...
"আপনি বরং চলুন, আমার আরেক মেয়েকে একটু চেকআপ করে নিতে... "
সাবিহা এভাবেই ড. মিনারাকে নিয়ে বেরিয়ে আসে আবিরের ঘর থেকে। দোয়েলকে চেক করতে গেলেও নিবিড়ের সেই একই অবস্থা, হতাশ হয়ে ড. মিনারা সাবিহাকে বলেই বসলো...
"আপনার দুটো ছেলেই একদম বউ পাগল... "
সাবিহা হেঁসে উত্তর দেয়...
"কি আর করার বলুন,আমার মেয়েগুলোও যে এক একটা হীরা, ওদের একটু আদরে না রাখলে হয়?... "
সাবিহার কথায় ড. সাবিহাও হেঁসে দেয় আলতো।