পুকুর ঘাটে পানিতে পা ডুবিয়ে বসে আছে চড়ুই। পাড়ে বসেই কাঁচা আমের ভর্তা করছে জেসি, তারা, রুবা আর দোয়েল মিলে। একটু পর সেখানে এসে বসলো ছেলেরাও। চড়ুইকে নিচে দেখে আবির হালকা ধমকের সুরে ডাকে...
"ওখানে কি করো মেয়ে? পা পিছলে পড়বে তো। উঠে এসো..."
চড়ুই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় একবার। আমের ভর্তা প্রায় হয়েই এসেছে দেখে আবিরের কথায় আর তর্ক করলো না। পানি থেকে পা উঠিয়ে সিঁড়ি ডিঙিয়ে উঠতে লাগলো সে।
আবিরের চোখ থমকে যায়। মন্ত্রমুগ্ধের ন্যয় তাকিয়ে থাকে চড়াই পাখিটির দিকে। পড়নের লালছে পাড়ের শাড়িটি গ্রামীন খাচে আটপৌরে করে পড়া। সিল্কি চুলগুলে ছেড়ে দিয়েছে মেয়েটি। তার প্রতিটি চরনের উদয়ের সাথে সাথে নুপুরের ঝুম ঝুম আওয়াজ, আর রেশমি চুলের দোল যেন অপূর্ব এক মহাচ্ছায় ভরপুর। গয়নাগাটি তেমন কিছুই নেই, হাতে রেশমি কাঁচের চুড়ি গুলোও আওয়াজ তুলছে থেকে থেকে। চার দিকের টুকটাক গুঞ্জন ছাড়িয়ে হঠাৎই আবির গান ধরলো চড়াই পাখির পানে চেয়ে....
'সোনা বউ শুনছোনি গো.. সোনা বউ শুনছোনি..
নিতে আইলে, নায়ওর যাইবা নি..
ও বউ গো বউ.....
সাড়ে তিন হাত মাটির ঘরে, বাসর কাঁদিবে সাজিয়ে
যে ঘরে থাকবা দিন রজনী..
নাই বিছানা, নাই মশারী, সঙ্গে নাই তোর সোয়ামী.
নিতে আইলে নায়ওর যাইবা নি?'
-------
মাহৈয়াপুরে এক এক করে মোট ছয় দিন কেটেছে সবার। চার দিনের পরিকল্পনা করে আসলেও পাখিদের মন টিয়ে যাওয়ায় আরো দুটো দিন থাকা হয়েছে গ্রামে। তার উপর কাকলি বেগমদের আপ্যায়নও মনে ধরার মতোই।
গ্রাম ছেড়ে বাস স্টেশনে অপেক্ষমান সকলে। আবির টিকিট কাউন্টারের দিকে যাওয়ার সময় চড়ুই ডেকে বলে তার পানির পিপাসা পেয়েছে। আহিশ বললো...
"তুই যা ছোটপাখির জন্য পানি নিয়ে আয়। আমি টিকিট কেটে নিচ্ছি। "
আবির রাজি হয়,আহিশ টিকিট কেটে ফিরলে একে একে সকলের হাতে টিকিট দিতেই বাঁধলো বিপত্তি। গাধাটা দুটো টিকিট কম এনেছে। নিবিড় বিরক্ত হয়ে এবার নিজেই যায় কাউন্টারে। কিন্তু দূর্ভাগ্যবসত বাসটি পুরো হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই পরের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
ফিরে এসে নিবিড় বলে...
"তোরা না হয় চলে যা, আমি আর আহিশ পরের গাড়িতে আসছি.."
এমন ভেবেই বাকি দুটো টিকিট পরের গাড়িতেই কাটা হয়। সীটে হেলান দিয়ে বসে মাত্রই ফোনটা হাতে নিলো আবির। মিনিট খানেক পরেই পাশ থেকে নিজের শার্টের হাতায় টান পড়তে ফিরে তাকায় সে চড়ুইয়ের দিকে। ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে...
"কি?"
চড়ুই চোখ পিটপিট করে তাকায় আবিরের দিকে। আবির জিজ্ঞেস করে....
"কি হলো বলো? কিছু খাবে? নিয়ে নিবো? বাস কিন্তু আর সহজে থামবে না..."
এবার মিনমিনিয়ে চড়ুই বলে ওঠে...
"ও্ ওয়াশরুম যাবো..."
আবিরের মুখটা দেখার মতো ছিলো যেন। এদিকে বাস ছাড়ারও সময় হয়ে গিয়েছে। আবির একটু দেনামনা করে জিজ্ঞেস করে...
"বাস তো ছাড়লো বলে... খুব ইমার্জেন্সি? "
চড়ুই উপর নিচ মাথা ঝাকায়।হাফ নিশ্বাস ফেলে আবির। এই মেয়েটা এমন এমন কাজ করে থেকে থেকে। এতক্ষণ বলতে পারলো না..
"চলো নামো.."
বলতে বলতে নিজেই চড়ুইকে নিয়ে নেমে নিচ থেকে নিবিড় আর আহিশকে এই গাড়িতেই যেতে বললো।টিকিট চেঞ্জ করে বললো সে আর চড়ুই পরের গাড়িতে আসবে।
নিবিড়রাও আর দ্বিমত না করে উঠে গেলো বাসে। রয়ে গেলো শুধু আবির আর চড়ুই। পরের গাড়ি ছাড়তে আরো প্রায় আধঘন্টা সময় পাড় হয়ে গেলো। সন্ধ্যা ঘনিয়েছে চারদিকে। গাড়ি চলার সাথে সাথে চড়াই ব্যস্ত হলো পাশের জানালাটি খোলার উদ্দেশ্যে। বেশ কয়েক বার টেনেও লাভ হলো না যখন, তখন ঠোট উল্টে তাকায় আবিরের দিকে। আবিরও এতক্ষণ মেয়েটার অবস্থা দেখে পিটপিট করে তাকিয়ে আছে তারই দিকে। চড়ুই বিরক্ত হয়ে বললো...
" তাকিয়ে দেখছেন কি? জানালা টা খুলে দিন না? গরমে তেল ছাড়া ভাজি হয়ে যাচ্ছি আমি..."
আবির এক হাত বাড়িয়ে জানালা খুলতে খুলতে বললো...
"আরো আসো শাড়ি পড়ে। এত লং জার্নিতে শাড়ি কে পড়তে বলেছে তোমায়?"
"চাচি নতুন শাড়ি হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে পড়ে যেতে। এখন তাকে মানা করলে মন খারাপ করবে না বলুন?"
আবির নীরব থাকে। এমনিতেই এই মেয়ে শাড়ি পড়লেই আবির কুপোকাত হয়ে যায়। তা কি আর মেয়েটা বুঝবে? এর থেকে কথা কমিয়ে অন্য দিকে মনোযোগ দেওয়াই ভালো।
ভাবনা অনুযায়ী কাজ করার উদ্দেশ্যে আবির পকেট থেকে ফোন বের করে তাতে মনোযোগ দেয়। মেয়েটাকে এই সময়টা এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
"ঢাকায় পৌঁছাতে কতক্ষণ লাগবে?"
"চার ঘন্টার কাছাকাছি.. "
" তাহলে এই চার ঘন্টা আমি কি করবো?"
চড়ুইয়ের এমন প্রশ্নে আবির মোবাইল থেকে চোখ তুলে তাকায় তার দিকে। চড়ুই নিজ থেকেই আবার বলে ওঠে....
"আপনি কি আমার সাথে বসতে অসুবিধাবোধ করছেন? তাহলে অন্য সীটে গিয়ে বসতে পারেন..আমি কাউকে বলবো না আপনি যে আমার হাসবেন্ড.... "
ভ্রু কুঁচকে তাকায় আবির, হালকা মেজাজে বলে...
"মাথায় সমস্যা আছে? কি সব বলে যাচ্ছো? আমি আমার ওয়াইফের সাথে আছি, এতে অসুবিধার কি আছে?"
"আপনার কাজ কর্ম দেখে তো মনে হচ্ছে না আপনি আমার হাসবেন্ড। যেভাবে ফোনে মুখ ডুবিয়ে বসে আছেন যেন মনে হচ্ছে পাশে একটা অপরিচিত মেয়ে বসেছি আমি।"
আচ্ছা.. ম্যাডাম এই নিয়ে রাগ দেখাচ্ছে তাহলে। বুঝতে পেরেই আবির ফোন বন্ধ করে পকেটে রাখলো। বা হাত এগিয়ে চড়ুইয়ের পিঠ জড়িয়ে আরেকটু কাছে এনে বসালো। আস্তে করে বললো...
"সরি বউ... আ'ম কম্ফোর্টেবল উইথ ইউ... ইভেন ইউ আর মাই বেস্ট কম্ফোর্টজোন..."
চড়ুই আদুরে ছানার মতো আবিরের বুকে মাথা ঠেকায়। আবির কন্ট্রাক্টরকে বলে বাসের লাইট গুলো নিভায়।
চার দিকে অন্ধকারের আভাসে এখন আর তেমন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। চড়ুই এবার নিঃশঙ্কোচে আরো শক্ত করে জড়িয়ে নেয় আবিরকে। আবিরও ঠিক তাই।
"পিঠে ব্যাথা পেলে বলো পাখি..."
"ব্যাথা নেই, শুকিয়ে গেছে। "
"ওকেয়..."
চড়ুই আর কিছু বললো না। বেশ খানিকটা সময় পর আবিরের বুকে তার ভারী নিশ্বাস আছড়ে পড়তে লাগলো। মেয়েটা ঘুমিয়ে গেছে, আবিরকে সময় দিতে বলে নিজেই ঘুমাচ্ছে আরাম করে। আস্ত বজ্জাত তো..!
রজনীর সময় পাড়ি দিচ্ছে। প্রায় আড়াই ঘন্টা পথ অতিক্রম করার পর বাস আচমকা থেমে যায় পথে। প্রতিটি যাত্রীর কৌতূহল বাড়ে,কেউ কেউ আবার বিরক্ত হয়ে ড্রাইভার, কন্ট্রাক্টরকে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে। যতটুকু বুঝলো তার মর্ম এই যে ইঞ্জিনে সমস্যা, খুব সহজে ঠিক হওয়ার নয়। প্রতিটা যাত্রী যখন বিরক্ত হয়ে উঠে তখন ড্রাইভার তাদের শান্তনা দেয় একটু অপেক্ষা করার জন্য। আধ ঘন্টার মধ্যে আরেকটা বাস এসে সবাইকে নিয়ে যাবে আবার। লোকজন কিছুটা শান্ত হয়।
হাইরোডের শুনশান নীরবতায় এক সাইডে বিশালাকৃতির বাসটি দাড়িয়ে। কিন্তু সমগ্র প্রকৃতি আবছা অন্ধকারাচ্ছন্ন। বাসের ভেতরটায় গুমন আবহাওয়ায় ভ্যাপসা গরমের আভাসে সকলেই ঘেমে যাচ্ছিলো বারংবার। তাই একে একে প্রায় সব যাত্রীই বাস থেকে নেমে দাঁড়ায় বাইরে। শুধু রয়ে গেলো আবির আর চড়ুই।
আবিরও ঘেমে নেয়ে একাকার। কিন্তু ঘুমন্ত চড়ুইকে এখন আর জাগাতেও ইচ্ছে করছে না, মুখটায় যে সমগ্র রাজ্যের মায়া, মায়া আর মায়া..
আবার তাকে বাসের ভেতর একা রেখেও বের হওয়ার সাধ্যি নেই আবিরের। অগত্যা ওভাবেই চড়ুইকে আগলে ধরে বসে আছে সে।
ভ্যাপসা গরম ভাবটা ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করছে চড়াই পাখিকেও৷ উত্তাপে মেয়েটা একটু পর পর বিরক্ত হয়ে নড়েচড়ে উঠছে। গলা ঘাড় ইতোমধ্যেই স্বেদজলে ভিজে উঠেছে তার। পকেট থেকে নিজের রুমালটা বের করে আবির চড়ুইয়ের গলা ঘাড় মুছে দিলো আলতো করে। তবে এতে খুব একটা কাজ হয়েছে বলে মনে হয় না। চড়ুইয়ের উতলা ভাব বাড়ে। নড়চড় করতে করতে এলোমেলো ভাবে আচলটা সরানোর চেষ্টা করে ঘুমের মাঝেই। অসাবধানতায় কাঁধের দিকের পিনখানা ছুটে গিয়ে আচলখানা সরে যায় বুকের উপর থেকে।
আবিরের চোখ আটকায় মেয়েটার বক্ষমধ্যিখানে। একখানা সরু রেখা যেন ধীরে গিয়ে মিলিয়ে গেলো সেথায়। ঢোক গিললো আবির। এই মেয়েকে বারন করেছিলো শাড়ি না পড়তে, তার উপর এখন এই অবস্থা।
গলা শুকিয়ে আসছে বারবার আবিরের। চড়ুইয়ের শাড়ির আচল ঠিক করার উদ্দেশ্যে হাত উঠাতেই লক্ষ্য করলো হাতখানা অসম্ভব হারে কাঁপছে তার। হৃৎস্পন্দনের এক একটি তীব্র আন্দোলন যেন টানছে আবিরকে। বিরবির করে মাথা ঝাকায় সে...
'নো নো নো আবির... বাড়ি যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর, প্লিজ.... "
কিন্তু মন মস্তিষ্কের দ্বন্দ্বে সব সময় মনই জিতে যায়। কম্পমান হাত খানা মেয়েটার সম্মোহনী অংশ খামছে ধরে তীব্র গতিতে ঠোঁট দখল করে নেয় আবির নিজের ঠোঁট দ্বারা।
তারপর শুরু হয় এক অদ্ভুত, অরোধিত যুদ্ধ, প্রায়ত আকাঙ্খার সেই যুদ্ধের তোপে এলোমেলো ভাবে ঘুম ছুটে যায় চড়াই পাখিটির। বুঝতে পারে দানাবলটি দিশা হারিয়েছে। কিন্তু হঠাৎ কেন?
একদিকে ভ্যাপসা উত্তাপ আরেক দিকে আবিরের এমন অঘোষিত কার্যক্রম সয়ে উঠতে পারছে না ঠিক মেয়েটি। আবিরের শরীরের শার্ট খামছে ধরে স্বহস্তে। বার বার করে দুরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টায়ও সে ব্যর্থ হয়।এবার না পেরে মুখ দিয়ে অদ্ভুত গোঙানির শব্দ বের করে ওঠে সে৷ আবিরের ভ্রু কুঁচকায় হালকা,ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে কিঞ্চিৎ বিরক্তির স্বরে জিজ্ঞেস করে....
"কি সমস্যা? আ'ম ইউর হাসবেন্ড নাও.. ইউ কান্ট ডু দিস..."
"এ্ এটা বাস, দানাবল... আপনি এভাবে...."
"আমি আর তুমি ছাড়া কেউ নেই এখন.. প্লিজ... আ'ম ডায়িং বেইবি...."
এতটুকু বলেই চড়ুইকে আর কিচ্ছুটি বলার সুযোগ না দিয়ে আবারো তার ঠোঁট আঁকড়ে ধরে আবির। এলোমেলো হাতের স্পর্শ অনুভুত হয় চড়ুইয়ের শাড়ির ভাজ গলিয়ে পাতলা কোমরে..
মেয়েটা চেয়েও পারছে না বাঁধা দিতে। আবিরের এমন কান্ডে নিজেও যেন বার বার করে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে সে। চাইছে, আবিরের কাজখানাকে সেও যেন চাইছে.. কিন্তু এভাবে....
" ভাই, গাড়ি আইসা পড়ছে.. চলেন... "
কন্ট্রাক্টরের কন্ঠ কানে আসতেই আবির ছিটকে সরে যায় চড়ুইয়ের থেকে৷ ভাগ্য ভালো লোকটা বাসের দরজায় দাঁড়িয়েই ডাকছে আবিরকে। ভেতরে আসলে কি অঘটনটাই না ঘটতো।
চড়ুই লজ্জায় নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে আচল দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে শক্ত করে। ভয়ে, সংকোচে অদ্ভুত ভাবে কাপতে থাকে মেয়েটি। আবিরও হাঁপাচ্ছে, ভীষণ আনাড়ি লাগছে নিজেকে আজ, কিন্তু আর নয়। চড়ুইয়ের ছোট্ট গুটিয়ে নেওয়া দেহটির দিকে এক পলক তাকিয়ে উঠে আসে সে। চড়ুই তাকে দেখে নামতে নিলেই আবির যেতে যেতে বলে...
"স্টে হিয়ার, আ'ম কামিং..."
চড়ুই বোকার মতো তাকিয়ে রইলো, কিছু বলতে নিয়েও পারলো না, তার আগেই আবির নেমে গেলো বাস থেকে। মেয়েটি আর কোনো উপায় না পেয়ে জানালা দিয়ে মুখ এগিয়ে দেখতে লাগলো, বাইরে আবির দাড়িয়ে তিনজন লোকের সাথে কথা বলছে, সম্ভবত ড্রাইভার আর কন্ট্রাক্টর হবে। দুর থেকে কথা শোনার উপায় নেই বলতে গেলে। কিন্তু আবির কথার ফাঁকে ফোনেও কি সব দেখাচ্ছে লোকগুলোকে। প্রায় ১৫/২০ মিনিট পর লোকগুলো সামনের বাসটায় চলে গেলো।বাসটি রওওনা করলো বরাবর। আবিরকে দেখলো আবার এদিকেই ফিরে আসছে।
চড়ুই দাঁড়িয়ে যায়। আবির বাসে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে লক করলো সামনে গিয়ে কি সব টিপেটুপে লাইট গুলো বন্ধ করে দিলো বাসের।তা দেখে চড়ুই জিজ্ঞেস করে ওঠে...
"ওমাহ,লাইট নেভাচ্ছেন কেন? আর সবাই চলে গেলো.. আমরা বাড়ি যাবো কি করে..."
সম্পূর্ণ কথা সমাপ্ত হওয়ার আগেই আবির এগিয়ে এসে হ্যাচকা টানে নিয়ে বাসের পেছনের লম্বা সীট খানায় ছুড়ে ফেলে চড়ুইকে। মেয়েটা উঠতে নিলেই আবার ধাক্কা মেরে ফেলে আবির চড়ে বসে তার উপর। দ্রুত ভঙ্গিতে নিজের শরীরে জড়ানো শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে হাস্কি স্বরে বলে...
"ডোন্ট টক এনি রাবিশ ওয়াইফি৷ দিস ইজ মাই টাইম। কনসিডার টু মি... আয়দার ইউ হ্যাভ টু রিগরেট...."
চড়ুইয়ের চোয়াল ঝুলে যায়। কি বলবে খুঁজে পায়না। লোকটাকে এত উতলা লাগছে, কি করবে সে এখন.. এই অবস্থায় যদি কেউ এসে পড়ে তো...
আবির নিজের শার্টটি সম্পূর্ণ খুলে ছুড়ে ফেলে দেয় দিক বিবেচনা না করেই। তারপর আর এক মুহুর্ত ও দেরি নয়। ঝুঁকে এসে মুখ ডুবিয়ে দেয় চড়ুইয়ের গলায়। ছুয়ে দেয় সর্বাঙ্গে, নিজের সমস্ত সত্তাতে মিশিয়ে নেয় আজ মেয়েটিকে....
--------
ড্রয়িংরুমে উপস্থিত প্রতিটি মুখ হালকা চিন্তিত। রাতের এতটা সময় পাড় হয়ে যাওয়ার পরও আবির চড়ুই ফিরলো না। সাবিহা তো রীতিমতো বকা শুরু করেছে বাকিদেরকে...
"খুব কি দরকার ছিলো ওদের আলাদা দেওয়ার। সবাই এক সাথেই আসতি না হয় পরের বাসে। এখন একটাও কল তুলছে না। কোথায় আছে, কোনো বিপদ হলো কিনা তাও তো বুঝতে পারছি না। "
আজমল চৌধুরী একটু উঁচু স্বরেই বললেন...
"আহা সাবিহা, ওসব বলো না তো। হয়তো ফোন সাইলেন্ট করা তাই শুনতে পাচ্ছে না। "
দোয়েল এলোমেলো পায়ে এদিক ওদিক পায়চারি করছে। আহিশ, নিবিড় ঘন ঘন চড়ুই আর আবিরকে কল দিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু কোনো রেসপন্স নেই। বাকিরাও চিন্তিত হয়ে বসে আছে এদিক ওদিক।
কিছুটা সময় পাড় হয়ে আসে। নিবিড়ের মধ্যে হঠাৎ অদ্ভুত পরিবর্তন আসে। এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছে না ছেলেটি। ঘন ঘন পা নাড়াচাড়া করছে। বুদ্ধি কম হলেও আছে, আলগোছে একবার দুরে দাঁড়ানো দোয়েলের দিকে তাকায় সে৷ দোয়েলও কেমন কামুক চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছি৷ নিবিড় চোখের ইশারায় কি যেন জিজ্ঞেস করে, দোয়েল লজ্জায় মাথা নুইয়ে নেয় হঠাৎ। একটুপর আড়চোখে নিবিড়ের দিকে তাকাতেই নিবিড় আবার কিছু বোঝাতেই চোখ বড়বড় হয়ে যায় দোয়েলের। তা দেখেই নিবিড় মুখ লুকিয়ে হেঁসে ফেলে৷ দ্রুততার সহীত একটা বুদ্ধি বের করে নেয় সে।
ফোনের রিংটোন অপশনে গিয়ে নিজেই চালিয়ে দেয় একবার সেটি। তারপর অস্থির ভাবে অভিনয় করে সবার দিকে তাকিয়ে বলে...
"ভাই কল ব্যাক করেছে... "
সাবিহা সহ সকলের একটু আাশা দেখা যায়।আসমত চৌধুরী বলে ওঠে...
"রিসিভ কর তারাতারি... "
নিবিড় এবার রিংটোন অফ করে ফোন কানে ধরে আপন মনেই আবিরের সাথে কথা বলার নাটক করতে লাগলো....
"হ্যা ভাই, কোথায় তোরা. কতক্ষণ ধরে কল করছি... "
"কিহ.. "
"ওও, বলবি তো..."
সাবিহা অতিষ্ঠ হয়ে বলে...
"কি বলছে, ফোনটা লাউডে দে..."
নিবিড় খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে সাবিহাকে অপেক্ষা করতে বলে, এই সেই বলে ফোন নামায় কান থেকে।
আজমল জিজ্ঞেস করে...
"কি বললো?"
"চিন্তা করো না তোমরা৷ বাসে চড়ুই একটু অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলো, জার্নির কারনে বমি করেছে দু বার। তাই আবির ওকে নিয়ে মাঝ পথেই নেমে গেছে। "
সাবিহা বলে ওঠে...
"কি বলছিস,,এখন কোথায় ওরা.. আর ছোট পাখির অবস্থা কেমন..."
"চিন্তার কিছু নেই আম্মু। ভাই ওকে নিয়ে একটা রিসোর্টে উঠেছে আজ রাতের জন্য। কাল ছোট পাখি একটু সুস্থ হলেই ফিরে আসবে৷ "
"তো কল ধরছে না কেন ওরা..."
"আরেহ, ছোটপাখি ঘুমাচ্ছে। আর ভাই ওয়াশরুমে ছিলো তাই... শুনতে পায় নি। যাই হোক, এবার সবাই যাও ঘুমিয়ে পড়ো, এটম চলো.. প্রচন্ড টায়ার্ড লাগছে..."
------
ভোরের আলো ফুটেছে মৃদু ভাবে। জালানা দিয়ে এক পলক তাকিয়ে আবির আবারো মন দেয় চড়ুইতে। আবিরের উপর উপুর হয়ে শুয়ে মেয়েটি।পুরোটা রাত অসহ কান্নার পর একটু আগেই চোখে ঘুম নেমেছে তার৷ আবির নীরবে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
একটু পরেই চড়ুইকে সীটে শুইয়ে দিয়ে উঠে আসে সে। জানালা দিয়ে বাইরের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে নেয় একবার। বাসের ঠিক পাশেই একটি কালো রঙের মার্সিডিজ দাঁড়িয়ে। আর তার ঠিক অনেকটা পথ দুরে আরেকটা গাড়ি।
আবির সরে আসে৷ চোখ বুলিয়ে খুঁজতে থাকে গতকাল রাতে ছুড়ে ফেলা নিজের শার্টটি। ঐতো একটি জানালার ধারে ঝুলছে। এগিয়ে গিয়ে সেটি নিয়ে আসে আবির। ঘুমন্ত চড়ুইয়ের শরীরে শার্টটি ভালো মতো জড়িয়ে বোতাম আটকে দেয়। শার্টটি চড়ুইয়ের হাটুর একটু খানি উপরে গিয়ে থেমেছে।
আলতো করে মেয়েটাকে পাঁজা কোলে তুলে বাস থেকে বেরিয়ে এসে সামনে থাকা গাড়িটার ফ্রন্ট সীটে বসিয়ে দেয় ঠিক মতো। তারপর সে বেরিয়ে এসে ফোনে কাউকে মেসেজ দিতেই দুরের গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে আসে চার- পাঁচ জন লোক। সবার হাতে ওজনি কয়েকটা বোতল।
আবিরকে আলগোছে সালাম জানিয়ে সবাই মিলে এগিয়ে যায় বাসটির দিকে। দক্ষ হাতে বোতলের ছিপি খুলে তরল ঢালতে থাকে বাসটির উপর চারদিক থেকে। তারপর একটি দেশলাই কাঠির ছোট্ট অগ্নিশিখা ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাসটিতে। ধাওধাও করে জ্বলে ওঠে সেটি। চারদিকে মৃদু ভোরের আলোতে সেটি যেন একটি লাল আভার উৎস। আবির তাকিয়ে থাকে নীরবে সেই জলন্ত বাহনটির দিকে। লোকগুলো নিজেদের কাজ শেষ করে চলে যায় নিজেদের গাড়িতে করে। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে আবির। তারপর আস্তে ধীরে মাথা কাত করে তাকায় নিজের গাড়িটির দিকে, যার কাচের অন্তরালে ঘুমিয়ে আছে আবিরের এই জনমের সম্পূর্ণ সুখ নামক জিনিসটি। তার একটি মাত্র ছোট্ট চড়াই পাখি...