ভোরে এক বিরক্তিকর কান্ডে ঘগম হালকা হয়ে আসে নিবিড়ের। কাল রাতে ওয়াশরুমে যাওয়ার সময় ফোনের ফ্ল্যাস জ্বালানোর জন্য সুইচঅন করেছিলো। এখন এই ভোরে একের পর এক টুং টুং নোটিফিকেশনের আওয়াজে কান পঁচে যাচ্ছে যেন। চোখ খুলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই বুঝলো সূর্য উদিত হয়েছে। এতটাও ভোররাত নয়। কিন্তু এই সকালে কে এত মেসেজ করছে?
চোখ ডলে ফোন হাতে নিয়ে বসলো নিবিড়। ফ্রেন্ডস গ্রুপে একের পর এক সকলে নিবিড়কে ম্যানশন দিচ্ছে। আসল কাহিনি বোঝার জন্য একটু উপরে স্ক্রল করতেই পেয়ে যায় একটি ভিডিও। তা দেখেই চোখ কপালে তার। দ্রুত হাতে একটা টেক্স দিলো...
"আরে ইয়ারর,এটা আমি নাআআ।এসব আমি করি নাই"
নিবিড় বরাবরই এমন কিউট একটা চরিত্র বন্ধু মহলের কাছে। তাই উক্ত ভিডিওর ছেলেটি যে সে ছাড়া অন্য কেউ ও হতে পারে তা যেন কেউই বিশ্বাস করতে পারছে না। গ্রুপে কল এলো,নিবিড় রিসিভ করেই সাথে সাথে হালকা চেচিয়ে বলে ওঠে...
"আবে ভাই, তোরা আমায় কেন টানছিস। এটা আমি নাহ.. এটা ভাই.. আবির ভাই... আইডির নাম দেখ, লিটেল বার্ড.. আমার বউ বড়টা... প্লিজ ইয়ার...."
তার কথার রেশে পাশ থেকে হঠাৎ দোয়েল নড়েচড়ে ওঠে.. মুখ কুচকে হালকা গোঙানির আওয়াজ ভেসে আসে তার থেকে। নিবিড় নজর দেয় দোয়েলের দিকে৷ মেয়েটার এমন অস্বাভাবিক নড়াচড়া দেখে সাবধানি কন্ঠে ফোনে বলে...
"এই আমি গেলাম, বউ কান্না করছে আমার..."
ওপাশ থেকে আর কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কল কেটে দোয়েলের দিকে ঝুকলো সে। দোয়েল মৃদু আর্তনাদ করছে থেমে থেমে। নিবিড় ঝুঁকে আলতো হাতে তার গাল স্পর্শ করে ডাকে...
"এটম? কি হয়েছে? কাঁদছো কেন পাখি?"
দোয়েল পাতলা নকশিকাঁথার ভেতর থেকে উন্মুক্ত একটি হাত বের করতে চায়, বুঝতে পেরে নিবিড় নিজেই মেয়েটির হাত ধরে আলতো করে৷ কপালে, গালে, থুতনিতে একে একে চুমু খেয়ে আবার জিজ্ঞেস করে...
"বলো না? কাঁদছো কেন? "
"ব্ ব্যাথা করছে.. নিবিড়... "
নিবিড় হাফ নিশ্বাস ফেলে। দোয়েলের কথার মানে বুঝতে আর দেরি হয়নি তার। তার জন্যই তো মেয়েটা এমন কুকরে যাচ্ছে ব্যাথায়।
"আ'ম সরি পাখি... খুব ভুল হয়েছে আমার। এই দিকে আসো... "
বলতে বলতেই দোয়েলকে টেনে নিজের বক্ষপটে মিশিয়ে নেয় নিবিড়। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে....
"সবে ভোর হয়েছে, তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। "
বেশ কসরত পুষিয়ে দোয়েলকে ঘুম পাড়িয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে আসে নিবিড়। দ্রুত গোসল সেরে নিয়ে তৈরি হয়ে বেরিয়ে যায় রুমের দরজা ভিরিয়ে দিয়ে।
গ্রাম্য বাজার এখান থেকে প্রায় হেঁটে গেলে আধঘন্টার পথ। এত ভোরে রিক্সা ও পাওয়া সম্ভব হয় নি নিবিড়ের দ্বাড়া। অগত্যা হেটের গিয়ে আবার ফিরে এলো বাড়িতে। গেট পেরিয়ে কল পাড়েই দেখা মিললো আবিরের সাথে। নিবিড়কে দেখেই ব্রাশ করতে করতে এগিয়ে এলো সেও৷ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলে ওঠে....
"তোর মতো বেহেন""দ আমি আর দুইটা দেখি নি৷ রাতে এমন আগ্নেয়গিরির তাপের মতো গরমেও তুই..... "
নিবিড় ঠোঁট এক পাশে বাকিয়ে একটু ঝুকলো আবিরের দিকে। দূরে কাকলি বেগমকে দেখা যাচ্ছে টুকটাক কাজে ব্যস্ত। তাই আস্তে করেই বললো....
"আমার খবর তো তুই জানিস শুধু, তোর খবর পুরো দুনিয়া জেনেছে। "
আবির বুঝলো না এমন কথার মানে,ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে...
"কি বলতে চাইছিস?"
"সকাল থেকে ফোন চেক করিস নি? "
"না কেন? "
নিবিড় দুষ্টু হেঁসে বলে...
"থাক, এই জীবনে আর করিস ও না... "
আর থামে না নিবিড়। হেলেদুলে এগিয়ে যায় নিজের রুমের দিকে। আবির পেছন থেকে তাকিয়ে থাকে তার যাওয়ার পানে।
রুমে এসেই নিবিড় দেখে দোয়েল বিছানায় হেলান দিয়ে নাক মুখ কুঁচকে বসে আছে। দরজা ভিড়িয়ে দিতে দিতে করুন মুখে জিজ্ঞেস করে সে...
"বেশি কষ্ট হচ্ছে জান?"
নিবিড়ের গলার আওয়াজ পেয়ে দোয়েল চোখ তুলে তাকায়।বুক পর্যন্ত থাকা নকশিকাঁথা খানা টেনে নিজেকে আরেকটু আবৃত করে নেয়।
নিবিড় এগিয়ে গিয়ে জগ থেকে পানি নিয়ে দোয়েলের দিকে একটি ঔষধ এগিয়ে দেয়।
"এটা নাও... "
দোয়েল ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে...
"ক্ কিসের ঔষধ এটা? "
"পেইন কিলার.. "
"সত্যি তো?"
"তুমি কি ভাবছো?"
নিবিড়ের প্রশ্নে মাথা নুইয়ে নেয় দোয়েল। হাত বাড়িয়ে মেডিসিনটা নিয়ে খেয়ে নেয় নীরবে।
নিবিড় গ্লাসটা রেখে এগিয়ে এসে বসে দোয়েলের সাথে। বা হাতে মেয়েটার গাল আগলে ধরে ধীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে...
"আদর কি একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিলো কাল রাতে? "
দোয়েল লজ্জায় মাথা নুইয়ে নেয়। আস্তে করে বলে...
"এ বাড়িতে রুমে ওয়াশরুম ও নেই। আ্ আমি এখন কল পাড়ে কিভাবে যাবো? ঠ্ ঠিক মতো হাটতে ও তো... "
"এখন যাওয়া লাগবে না। রেস্ট নাও কিছুক্ষণ। একটু পর ব্যাথা কমে গেলে গিয়ে গোসল সেড়ে নিও। "
" চাচি ডাকলে...."
"আমি সামলে নেবো। ঘুমাও তুমি। "
দোয়েল রাজি হয়, এ ছাড়া যে আর কোনো উপায় নেই বলতে গেলে।
-----
গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন চড়ুই। টেবিলের উপর তার ফোনে একের পর এক কল, মেসেজ এসেই চলেছে। রুমে ঢুকে এমন হুলুস্থুল কান্ড দেখে বিরক্ত হয় আবির। এত সকালে এই মেয়েকে কে এত মিস করছে?
সন্দেহ নিয়ে চড়ুইয়ের ফোনটি হাতে নিতেই দেখতে পায় অনেকের মেসেজ। সবই যেন একই ধারার কথা...
' তোর বর এত্তো হ্যান্ডসাম?'
' এমন জামাই কই পেলে তুমি?'
' শহরের টপ বিজনেসম্যান টুইন ব্রাদার্সদের বিয়ে করেছিস তোরা? এতদিন বলিসও নি?'
'বিশ্বাস হয় না, টুইন ব্রাদার্সের মতো এতো স্ট্রং একটা লোক বউয়ের গোলাম হয়ে গেলো? কিভাবে?'
এমন আরো বহু মেসেজে ভরপুর। আবির বুঝে উঠতে পারে না হঠাৎ এই কথা গুলোর মানে। চড়ুইয়ের ফোনে লক নেই।তাই খুব সহজেই আবির চেক করতে লাগলো মেয়েটার ফোনের সব গুলো এপস। ফেইসবুকে ঢুকতেই দেখলো 99+ নোটিফিকেশন। কিসের এগুলো? চেক করার পর আবিরের মাথায় হাত। চোখ গোল গোল করে ঘুমন্ত চড়ুইয়ের দিকে একবার তাকিয়ে আবার ফোনের স্ক্রিনে নজর দেয় সে। গতকাল রাতে কান ধরে উঠবস করার ভিডিও এটি। মেয়েটা এটা সোশাল মিডিয়ায় আপলোড করলো কখন? সাথে সুন্দর করে করে ক্যাপশন দিয়েছে...
'pookie husband...'
ফোনটা ফেলে রেখে চড়ুইয়ের উপর ঝুকলো আবির। ডান হাতের তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলির সাহায্যে চড়ুইয়ের বোঁচা নাকটা চেপে ধরে রাখে সে...
নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে দেখে ঘুম ভেঙে যায় চড়ুই। তড়িৎ লাফে উঠে বসে হাফাতে হাফাতে বলে...
"কি সমস্যা আপনার? ঘুমের মধ্যে মেরে ফেলতে চাইছিলেন নাকি আমায়?"
"অ্যাই মেয়ে.. তুমি আমার ভিডিও পোস্ট করেছো কেন? এসব কেউ দেয়?"
"দিয়েছি তো কি হয়েছে? যা করেছেন তাই তো দিয়েছি। মিথ্যা কিছু কি করেছি?"
"তাই বলপ এটা পাবলিকলি দেবে পাখি? আমার মান সম্মান সব ধুলোয় মিশালে মেয়ে.."
"আমি না আপনার বউ?"
এতক্ষণের নাকোচ ভাবটা যেন কোথায় উভে গেলো আবিরের।মেয়েটা হুটহাট এমন টোনে কথা বলে আবির না চাইতেও মায়ায় পড়ে যায়।
"বউরা এমন কিছু করতেই পারে। আর মান সম্মান গেলো মানে কি হ্যা? বউকে ভালোবাসলেই তো শুদ্ধ পুরুষ হওয়া যায়।পৃথিবীর সব জ্ঞানী ব্যাক্তিরা বউয়ের কাছে নিজেকে সমর্পন করেই তো উন্নত হয়েছে। জানেন না?"
"এদিকে আসো.."
বলেই দু হাত বাড়ায় আবির। চড়ুই একবার সেদিকে তাকিয়ে, উৎসাহ নিয়ে বলে..
"কোলে নিবেন?"
"হুম আসো.."
"পিঠে ব্যাথা দিবেন না তো? "
"নাহ, আসো?"
চড়ুই চমৎকার হেঁসে ঝাপিয়ে পড়ে আবিরের কোলে। আবির পিছিয়ে পড়তে নিয়েও নিজেকে সামলে নেয়।চড়ুইকে জড়িয়ে ধরে তার এলোমেলো চুল গুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে কপালে পর পর তিনটে চুমু খায়। তারপর দু গালে আরো দুটো চুমু খেয়ে তাকে কোলে নিয়েই বিছানা থেকে নেমে বলে....
" যা ইচ্ছে করো বউ, বকবো না আমি৷ শুধু কখনো আমায় ছেড়ে যাওয়ার কথা ভেবো না লক্ষ্মী বউ আমার। তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি, নিজের হৃৎস্পন্দনের থেকেও বেশি। "
চড়ুই কথার মানে ঠিক কতটা গভীর ভাবে উপলব্ধি করলো কে জানে? কিটকিটিয়ে হেঁসে বললো...
"তা হলে আপনিও আমায় সব সময় এমন করেই আদর করবেন,আমার যত্ন নিবেন। আমাকে এভাবে কোলে নিয়ে হাটবেন, আমার কোলে উঠতে ভীষণ ভালো লাগে। করবেন তো?"
"সারাজীবন করবো পাখি। তুমি তো আমার বাচ্চা বউ একদম,তোমায় কোলে নিবো না তো আর কাকে নিবো বলো.."