নিরব করিডোরে ধীরগতিতে হেঁটে মনোয়ারা বেগমের কেবিনের দিকে যাচ্ছে শায়রা। মন-মস্তিষ্ক ছেঁয়ে গেছে অদ্ভুতরকম অস্বস্তিতে। দু'হাতের তালু কঁচলাচ্ছে সমানে। মনে মনে দোয়া করছে, তার মা-বাবা যেন এই বিয়েতে রাজি না হয়!
কেবিনের দরজায় হাত রাখতেই ভেতর থেকে খুলে গেলো সেটা। মুখোমুখি ফাইজানকে দেখেই তৎপর হাত পেছনে নিয়ে এলো শায়রা। ফাইজানের সাথে বিয়ের কথা বলায় এখন ওর চোখে চোখ মেলাতেও অস্বস্তি হচ্ছে। শায়রা দ্রুত চোখ নামিয়ে এলোমেলো পল্লব ঝাপটালো আশ-পাশ চেয়ে।
ফাইজান বুঝতে পারলো শায়রার অবস্থা। তাতে ও স্বান্ত্বনা দেবে কোথায়, উলটো টিপ্পনী কেটে বলল,
"মাত্র বিয়ের কথা উঠেছে, বিয়ে করবো বলি নি। কিন্তু তুই তো এমন ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছিস যেন বিয়ে করে বাসরঘরের দরজার সামনে তুই দাঁড়ানো। অদ্ভুত!"
শায়রা ইতস্ততা ভুলে মাথা উঁচু করলো। ফটাফট জবাব দিলো,
"নিজের ঘরের যেই অবস্থা করে রেখেছো, কোনো মেয়েই বাসর ঘরে ঢুকবে না।"
ফাইজান তৎপর বলল,
"তুই ঢুকিস না। তাহলেই হবে!"
ফজল আহমেদ তৎক্ষণাৎ বের হলেন কেবিন থেকে। দু'জনকে কাছাকাছি অবস্থায় দেখে থতমত খেলেন ভদ্রলোক। মনে মনে ভাবলেন,
"এই কালও তো দু'জন দু'জনকে সহ্য করতে পারছিলো না। আবার আজ বিয়ের কথা বলতেই এত কাছাকাছি? একদিনেই এত্ত পরিবর্তন?"
ফজল সাহেবকে দেখেই দু'জন দু'দিকে সরে গেলো। ফাইজান আকস্মিক ঘটনাটা সামলাতে চুলে হাত বুলিয়ে বলল,
"আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। তোমরা থাকো নানুর কাছে।"
বলেই দ্রুত সরে পড়লো সেখান থেকে। শায়রাও কোনোমতো পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলো। এতে ফজল সাহেবের সন্দেহ আরও প্রগাঢ় হলো। মনের মধ্যে একটা প্রশ্নই বারংবার উঁকিঝুঁকি মারতে লাগলো,
"ওদের মধ্যে কিছু চলছে না তো?"
*******
শায়রা মাথা নিচু করে ঢুকলো কেবিনে৷ এর কিছু পরেই মালেকা বেগমও বেরিয়ে গেলেন। অসুস্থ মনোয়ারা বেগমের পাশে তখন শায়রা ও আনুসা। দু'জনেই পাশাপাশি দাঁড়ানো। সুযোগ পেতেই আনুসা শায়রার কানে কানে বলল,
"তুমি তো বলেছিলে ভাইয়ার রুমে লাখ টাকা দিলেও থাকবে না। এখন কি করবে গো? দেনমোহরে কত টাকা নির্ধারণ করলে ভাইয়ার রুমে থাকবে? নাকি বিয়ের পর আমার রুমেই থাকবে?"
শায়রা চোখ রাঙালো। ওরই মত চাপা স্বরে বলল,
"গাছে কাঁঠাল, গোফে তেল। বিয়ে হলে তো থাকার প্রশ্ন আসবে? এসব অবাস্তব কল্পনা বাদ দে।"
মনোয়ারা বেগম ধীর-স্থিরভাবে বললেন,
"আমাকে সামনে রেখে দু'জনে একা-একা কি ফুসুরফাসুর করছিস? আমাকেও বল একটু!"
শায়রা ক্ষ্যাপাটে সুরে বলল,
"তোমাকে কি আর বলবো? আসল ভেজাল তো তুমিই লাগিয়ে দিয়েছো, দাদি। এই বাউন্ডুলেকে বিয়ের কথা কেন বলতে গেলে? ও সংসার করার যোগ্য? আমার মতো ইনোসেন্ট বাচ্চা মেয়েকে এই ব*দমেজাজি বাউন্ডুলের হাতে তুলে দেয়ার কথা ভাবতে গিয়ে একটুও বুক কাঁপলো না তোমার? কেমন নি*ষ্ঠুর দাদি তুমি!"
মনোয়ারা বেগম দমে গেলেন কিছুটা। মিনমিনিয়ে বললেন,
"আমার কত শখ, মরার আগে তোদের বিয়ে দেখবো। আর তোরা এরকমভাবে বলছিস? আমার শখটা পূরণ করার ইচ্ছে নেই তোদের, তাই না?"
চুপসে গেলো মেয়েটা। আবেগী কথা-বার্তার বিপরীতে ভাষা হারিয়ে ফেলল কিছু বলার। আনুসা বলল,
"ওদের অনুমতিই বা নিতে যাচ্ছো কেন, নানু? তোমরা চাইলে ওদের ধরে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিবো। ওরা তো না করবেই! যাদের বিয়ে তারা মুখে না করেই। চক্ষুলজ্জার একটা ব্যাপার আছে না? তাই ওদের কথা ধরতে নেই। শুধু ধরে বিয়ে দিয়ে দিবো!"
শায়রা ভ্রু কুঁচকে ওর দিক চেয়ে খেঁকিয়ে উঠলো,
"এই, তুই এত পাকা-পাকা কথা শিখেছিস কবে থেকে? এমনিতে তো সবসময় একদম ভদ্র মেয়ে সেজে থাকিস। আর পেটে পেটে এতকিছু?"
আনুসা বলল,
"বাহ রে! সবসময় চুপ থাকি বলে এখনও চুপ থাকতে হবে? আজও বলার সুযোগ হবে না?"
শায়রা সাফ-সাফ বলল,
"না। একদম সুযোগ হবে না। এজন্যই বলে শান্ত-শিষ্ট মেয়েদের পেটে-পেটে শ*য়তানি থাকে। এই ব্যাপারে যদি ঘোঁট পাকানোর চেষ্টা করেছিস, তাহলে ওইদিন তোর ভাইয়ের সাথে কি করেছিলাম মনে আছে তো? দু'ঘন্টা বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলাম। এরপর তোকে আর তোর ভাইকে, দু'জনকে একসাথে দাঁড় করিয়ে রাখবো। সুতরাং সাবধান।"
মনোয়ারা বেগম চোখ বড়বড় করে সকল দৃশ্য অবলোকন করে বললেন,
"বাপরে! এ তো জনসম্মুখে হু*মকির মতো ব্যাপার। বিয়ের কথাটা তো আমি বলেছি। এখন ওদের সাথে কি আমাকেও দরজার বাইরে রেখে দিবি নাকি শায়রা?"
শায়রা প্রতিত্তোরে বলল,
"তুমি অসুস্থ না থাকলে সেটাই করতাম। অসুস্থতার জন্য বেঁচে গেছো!"
বৃদ্ধা মুচকি হেসে বললেন,
"আমার উপর রাগ দেখিয়ে লাভ নেই। জোড়া থাকলে বিয়েটা ফাইজানের সাথেই হবে। ভাগ্যের লিখন খন্ডানো যায় না।"
"আর মুখে বললেই শুধু বিয়ে হয়ে যায় না!"
***********
আফজাল সাহেব ও দ্বীতি বেগম বেশ চিন্তায় পড়ে গেছেন ব্যাপারটা নিয়ে। শায়রা কথা-বার্তায় দুর্বলতার আভাস পেয়েছেন দ্বীতি বেগম। মনে মনে ভাবছেন, নিশ্চিত ফাইজান যত্ন দেখিয়ে কাবু করতে চাইছে তার মেয়েকে। আর শায়রা এখন ওদের বাড়িতে থাকা মানেই দিনে দিনে এই দুর্বলতা বেড়ে যাওয়া। এর থেকে কিভাবে পরিত্রাণ পাবেন, কোনোভাবেই সেটা বুঝতে পারছেন না।
আফজাল সাহেবের চিন্তা আবার ভিন্নকিছু নিয়ে। ফাইজানের এই গুন্ডামী ও ছন্নছাড়া স্বভাব বাদে কোনো খারাপ দিক তার নজরে পড়ছে না। হতেও পারে বিয়ের পর ছন্নছাড়া জীবন থেকে বেরিয়ে এলো। একবার সংসারী হয়ে গেলে গুন্ডামী আপনা-আপনি ছুটে যাবে৷ একদিকে মা-বোনের আবদারের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে মেয়ের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে রাজিও হতে পারছেন না। তার বউয়ের দুশ্চিন্তাও যথোপযুক্ত। সবদিক মিলিয়ে ভীষণরকম দোটানায় পড়ে গেলেন ভদ্রলোক।
উনাদের নানারকম চিন্তার মাঝে এসে হাজির হলেন মালেকা বেগম ও ফজল আহমেদ। তাদেরকে দেখেই নিজেদের যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো আফজাল ইসলাম ও দ্বীতি বেগম। ভদ্রমহিলা কিছুই হয় নি এমন ভান করে সামান্য হেসে বললেন,
"আপা, আপনারা সূদুর ঢাকা থেকে এসেছেন অনেকক্ষণ। নিশ্চয়ই অনেক ক্লান্ত। আপনাদের বাসায় গিয়ে রেস্ট নেয়া উচিত।"
মালেকা বেগম প্রতিত্তোরে বললেন,
"কিন্তু মা তো এখানে। উনাকে রেখে কি করে... "
আফজাল বললেন,
"মা-কে কাল হসপিটাল থেকে ডিসচার্জ করে দেয়া হবে। আজ রাতের জন্য কোনো সমস্যা হবে না। এমনিতেও হসপিটালে সবাইকে থাকতে দিবে না। এরচেয়ে ভালো শায়রা আপাতত থাকুক, আমি গিয়ে তোদের সবাইকে বাড়িতে ছেড়ে আসি। রেস্ট নে সবাই। এরপর আমরা কাল সকালেই চলে যাবো।"
অগত্যা রাজি হয়ে গেলেন তারা। শায়রাকে মনোয়ারা বেগমের কাছে রেখে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলেন সকলে। যাওয়ার আগে ফজল সাহেব ফোন করলেন ছেলেকে। কিছুক্ষণ বাদে ফাইজান কল রিসিভ করে জিজ্ঞেস করলো,
"হ্যাঁ, বাবা বলো।"
"কোথায় তুই?"
ফাইজান সাবলীল ভঙ্গিতে জবাব দিলো,
"সিলেটে আছি, বাবা।"
এক মুহুর্তে ভদ্রলোকের মেজাজ চড়ে গেলো। দাঁতে দাঁত পিষে বললেন,
"সিলেটে আমিও আছি। আমি মঙ্গলগ্রহ থেকে জিজ্ঞেস করিনি বাংলাদেশের কোথায় অবস্থান করছো? হসপিটাল থেকে বেরিয়ে কোথায় গিয়েছো সেটাই জানতে চেয়েছি। সোজাসুজি কথা বলতে পারো না?"
ফাইজান বলল,
"এই একটু ঘোরাঘুরি করছিলাম বাইরে। এসেছিলাম তো অসুস্থ রোগী দেখতে। কিন্তু তিনি সুস্থ হয়ে নাতবউ খোঁজা শুরু করেছেন। তাই বাইরের হাওয়া খাওয়াই বেটার মনে হলো।"
ফজল সাহেব ছেলের মুখের লাগাম ভালো করেই জানেন। ত্যাড়া জবাব যেন তার রক্তে মিশে আছে। এজন্যই কথা বলার আগে সাইডে সরে গেছেন। নাহলে ওর ত্যাড়ামীর এত সুন্দর নমুনা দেখলে মেয়েপক্ষ আরও বেঁকে বসার সমূহ সম্ভাবনা। খানিক দূরে গিয়েই চাপা স্বরে বললেন,
"উনি তোমার নানু হয়, ফাইজান। নাতবউ দেখার শখ করতেই পারে। তোমার উচিত তার শখ পূরণ করা। নাতি হিসেবে সেটা তোমার দায়িত্ব। আর তুমি সবসময় এমন ত্যাড়ামীই করে যাও।"
ফাইজান আচমকা চেঁচাল,
"বাবা!"
ভদ্রলোক হকচকিয়ে গিয়ে শুধালেন,
"কি হয়েছে?"
ফাইজানের উঁচু কন্ঠস্বর নেমে এলো পরপর। শান্তভাবে বলল,
"বিয়ের টপিক শেষ হলে আমাকে ডেকো। এখন রাখছি।"
ফজল সাহেব ব্যস্ত কন্ঠে বললেন,
"আচ্ছা আচ্ছা, বিয়ের কথা বলবো না। তুই আমার কথা শোন। তোর মামা রিকশা ডেকেছে আমরা সবাই তোর মামারবাড়ি যাচ্ছি। তুই আমাদের সাথে গেলে এখনই আয়।"
ফাইজান বিরস বদনে বলল,
"পরে যাবো। আজ তো...."
আকস্মিক কিছু একটা মনে পড়ায় থামলো ফাইজান। পরমুহূর্তেই চিন্তিত স্বরে বলল,
"শায়রা কই? ও কি তোমাদের সাথে বাসায় যাচ্ছে?"
ফজল সাহেব জবাব দিলেন,
"না। শায়রা তোর নানুর সাথে হসপিটালেই থাকছে। তোর মামা আমাদের বাড়িতে ড্রপ করে তারপর আসবে। কেন?"
ফাইজান সস্থির নিশ্বাস ফেলে বিড়বিড়িয়ে বলল,
"বেঁচে গেছি!"
ফজল সাহেব সেটা শুনতে না পেয়ে পুনরায় বললেন,
"কি হলো? হঠাৎ শায়রার কথা জিজ্ঞেস করলি যে?"
ফাইজান স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
"কিছু না। তোমরা বাড়িতে যাও। আমি মামার বাসা চিনি, একাই চলে যেতে পারবো।"
অগত্যা! ফজল সাহেব ফোন রাখলেন। কিছুক্ষণেই সবাই শায়রাকে সাবধানবানী শুনিয়ে বেরিয়ে গেলেন হসপিটাল থেকে।
**********
ঘড়ির কাঁটা দশটার ঘর পেরিয়েছে কিছু আগে৷ শায়রা কেবিনে থাকা বেডের একপাশে চেয়ার টেনে বসা। একে সকালে ভার্সিটির ক্লাস, এরপরই এতদূর জার্নিং করে আসা। দুইয়ে মিলিয়ে ক্লান্তিতে মুদে আসছে শরীর। ঘুমে ঢুলুঢুলু হয়েও বসে আছে তার বাবার অপেক্ষায়।
মনোয়ারা বেগম বেশ অনেকক্ষণ গল্প করেছেন শায়রার সাথে। এরপর ডক্টর এসে ইঞ্জেকশন দিয়ে যাওয়াতে ঘুমের রাজ্যে তলিয়েছেন। এরপর থেকেই একা একা বসে আছে মেয়েটা।
আফজাল সাহেব হসপিটালে ঢুকার আগ-মুহুর্তে ফাইজানকে দেখলেন। ছেলেটা তাকে লক্ষ্য করে নি। হন্তদন্ত হয়ে সোজা ঢুকে গেছে হসপিটালের ভেতরে। হাতে একটা প্যাকেট। কৌতুহলী মন চুপিচুপি পিছু করতে বলল ফাইজানের। আফজাল সাহেবও তাই করলেন। ফাইজান কেবিনে ঢুকতেই একপাশের ছোট্ট একটা কাঁচের জানলার মতো জায়গা দিয়ে ভেতরের কাহিনি দেখতে লাগলেন।
শায়রার অপেক্ষার প্রহরের সমাপ্তি ঘটিয়ে কেবিনের দরজা খোলার শব্দ এলো। ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি থাকা মেয়েটা মাথা তুলে চাইল। তৎপর সেখানে বাবার বদলে ফাইজানকে দেখে হতাশ হলো। পুনরায় মাথা নুঁইয়ে নিলো ঘুমের উদ্দেশ্যে।
ফাইজান কথা-বার্তাহীন প্যাকেটটা এসে বাড়িয়ে ধরলো শায়রার সামনে।
শায়রা অবাক চক্ষু মেলে একবার সামনে বাড়ানো প্যাকেট আরেকবার ফাইজানের দিক চাইলো। পরপর জিজ্ঞেস করলো,
"এটা কি?"
ফাইজান খ্যাঁক করে বলে উঠলো,
"নাকটা কি অকেজো হয়ে গেছে? গন্ধ পাচ্ছিস না বিরিয়ানীর? সার্জারি করে নতুন নাক লাগাতে হবে তোর?"
মিষ্টি মুহুর্তটা তেঁতো বানাতে ফাইজানের কথাই যথেষ্ট। শায়রা তিতিবিরক্ত হয়ে বলল,
"বিরিয়ানীর ঘ্রাণ পাচ্ছি আমি। কিন্তু তুমি হঠাৎ এটা কার জন্য আনলে, এটা নিয়েই তো কনফিউজড হয়ে গেলাম। নিজের জন্য এনেছো নাকি আমার জন্য?"
ফাইজান পূর্বের ন্যায় বলল,
"আমাদের পাশের ফ্ল্যাটের আন্টিটা আছে না? তার জন্য এনেছি। তুই এখন গিয়ে উনাকে দিয়ে আয়।"
শায়রা বিরক্তিতে 'চ' সূচক শব্দ করে বলল,
"কোনো কথা সোজা বললে কি হয় তোমার? গোটা বাংলাদেশ অশুদ্ধ হবে নাকি?"
ফাইজানের ধমকের সুরে বলল,
"তুই এটা নিবি নাকি আমি খেয়ে ফেলবো?"
ফাইজানের সাথে তার হাজার ঝগড়া থাকলেও খাবারের ব্যাপারে শায়রা কখনোই কম্প্রোমাইজ করবে না। এমনিতে আজ ছুটোছুটির কারণে প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে। কিন্তু দাদির অসুস্থতার কথায় সেটা আর বলা হয় নি। এখন সামনে বিরিয়ানী দেখে কি সেটা ছেড়ে দেয়া যায়?
শায়রা সেরকম ভুল কখনোই করবে না। যদিও এতক্ষণ ফর্মালিটি দেখাচ্ছিলো, এখন সেসবের ধারও ধারলো না। ফাইজানের হাত থেকে একপ্রকার ছিনিয়ে নিলো প্যাকেটটা। নিজের ভাব বজায় রাখতে বলল,
"অগ্রিম বিরিয়ানী এনে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। কি ভেবেছো এটা বলবো? উহু, কোনো ধন্যবাদ না। তুমি বিরিয়ানী না আনলে আমি এখন তোমাকে আবার পাঠাতাম। ভালোই হয়েছে তুমি আগে আগেই এনে দিয়েছো। তোমারই খাটনি কম হয়েছে।"
ফাইজান নিঃশব্দে হাসলো। শায়রার মনোযোগ বিরিয়ানির প্যাকেটে থাকায় সেই একটুকরো হাসি লক্ষ্য করলো না। শায়রা তাকানোর আগেই ফাইজান দ্রুত হাসি থামিয়ে বরাবরের ন্যায় কাঠখোট্টা রূপে ফিরে গেলো। কর্কশ কন্ঠে বলল,
"জানি তো! সব আমাকে খাটানোর বুদ্ধি তোর মাথায়। এজন্য আগেই এনে দিয়েছি। হসপিটালে নাকি সারারাত থাকবি? না খেয়ে থাকতে পারতি? এক ঘন্টা পর অজ্ঞান হয়ে ঠুস! এমনিতেই এক রোগী নিয়ে ব্যস্ততা, আরেক রোগী ঘাড়ে চাপানোর ইচ্ছে নেই। দু'টো রোগীর ঝামেলা কে পোহাবে? এই ঝামেলা থেকে বাঁচতেই মানবতা দেখিয়ে বিরিয়ানী এনে দিয়েছি।"
শায়রা ইতিমধ্যে খাওয়া শুরু করেছিলো। ফাইজানের শেষ কথায় থামতে হলো ওকে। ফিরে চাইতেই দেখলো, লোক চেয়ার টেনে সেটায় বসে ফোনে ঢুকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শায়রা বলল,
"তুমি খেয়েছো?"
ফাইজান উত্তরে জানালো,
"মামা আসলে আমি বাড়িতে চলে যাবো। সেখানেই খেয়ে নিবো। আমার চিন্তা না করে তুই খা!"
ফাইজানের বিরিয়ানী এনে দেয়া মানবতা হোক কিংবা না হোক, শায়রা এক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র মানবতা দেখালো না। একবার জিজ্ঞেসও করলো না ফাইজানকে। একাই খেতে লাগলো বিরিয়ানী।
আফজাল সাহেব এতটুক দেখেই দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। কোনো এক কারণে মনে ভীষণ ভালো লাগা কাজ করছে। সিদ্ধান্ত নিলেন এই মুহুর্তে কেবিনে ঢুকবেন না তিনি। দূর থেকে যা দেখলো তা-ই কি যথেষ্ট নয়?
হঠাৎ-ই মনের মধ্যে হানা দিলো এক চিন্তা,
"ফাইজান সারাজীবন পারবে তো এইভাবে শায়রার খেয়াল রাখতে?"