হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস

পর্ব - ১২

🟢

ঘড়ির কাঁটা দুপুর তিনটার ঘরে পৌঁছেছে। সূর্যের উত্তাপ কিছুটা কম। অল্প-স্বল্প বাতাস বইছে বাইরে। ভীষণ স্নিগ্ধ পরিবেশ।

বাইরের থেকে বাড়ির ভেতরের দৃশ্য অনেকটাই আলাদা। উত্তাল অবস্থা সেখানে। বিয়ে উপলক্ষে আজ সকাল থেকেই শায়রা ও ফাইজানকে বাড়ির বাইরে যেতে দেয়া হয় নি। যতবার ফাইজান দরজার কাছে গিয়েছে ততবার ওকে টেনেটুনে রুমে পৌঁছে দিয়ে আসা হয়েছে। বেচারা বিয়ে থেকে পালানোর কোনো সুযোগই পায় নি৷

শুধুমাত্র আকদের আয়োজন হয়েছে বলে অল্প কিছু মানুষ এসেছে বাইরে থেকে৷ কাছাকাছি থাকা শায়রার একজন খালা এসেছে আর আশেপাশের দু-চারজন প্রতিবেশী। এছাড়া কোনো মানুষ নেই। এতেই যেন উত্তেজনার শেষ নেই।

শায়রা নিজের রুমে চুপচাপ বসে আছে। তার ঠিক সামনে ড্রেসিং টেবিলের বিশাল আয়নাটা। তবুও মুখ তুলে তাকাচ্ছে না সেদিকে৷ আনুসা খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে তাকে। লাল টুকটুকে একটা শাড়ি পড়িয়েছে। হালকা সাজ, মাথার উপরে লাল রঙের একটা ওড়না। ব্যস, এতেই বিয়ের সাজ সম্পূর্ণ। আনুসা নিজের কাজে যথেষ্ট সন্তুষ্ট। এটা তার চেহারায় খুশির ঝলক দেখেই বুঝা যাচ্ছে। সে বারবার ঘুরে ঘুরে দেখছে শায়রাকে৷

বেশ কিছুক্ষণ পর আনুসা বলল,

"আপু...সরি সরি! ভাবি, একটু আয়নায় তাকিয়ে দেখো বউ সাজে কত সুন্দর লাগছে তোমাকে!"

শায়রা ভ্রু কুঁচকে চোখ ছোট ছোট করে চাইল আনুসার দিকে। গমগমে গলায় বলল,

"আমি তোর ভাবি লাগি না। আপু ডাকবি আমাকে।"

আনুসা হেসে বলল,

"হ্যাঁ, ভাবি লাগো না। তবে আগামী এক ঘন্টার মধ্যে নিশ্চিত ভাবি হয়ে যাবে। তাই আগে থেকেই প্র‍্যাক্টিস করছি। ভা-বিই!"

শায়রা চোখ সরিয়ে নিলো৷ মাথা নিচু করে বিড়বিড়িয়ে বলল,

"সব ওই বাউন্ডুলের জন্য হয়েছে। ও গতকাল রাতে আমাকে শান্তিতে পালাতে দিলেই এই বিয়েটা করতে হতো না। এখন ওর সাথে সারাজীবন থাকবো কি করে আমি?"

শেষের কথাটায় কাঁদোকাঁদো হয়ে এলো কন্ঠস্বর। চোখ-মুখের ভাব-ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুনি ভ্যা করে কেঁদে ফেলবে৷ বারবার নাক টানছে কান্না আটকে রাখতে।

*********

"জিজু, আপনাকে কিন্তু এই পাঞ্জাবিটা বেশ মানিয়েছে। শায়রা দেখলে নিশ্চিত ফিদা হয়ে যাবে! এমনও হতে পারে যে অজ্ঞান হয়ে গেলো!"

দুষ্টুমির সুরে বলল সুজান। সম্পর্কে সে শায়রার খালাতো ভাই। আজ সকালে মায়ের সাথেই এই বাড়িতে এসেছে শায়রার বিয়ে খেতে। এসেছে থেকে ফাইজানের আশেপাশেই ঘুরঘুর করছে। এক মুহুর্তের জন্যও চোখের আড়াল করেনি। ফলাফল ফাইজানকে এখনো এই বাড়িতেই আটকে থাকতে হচ্ছে।

সুজানের কথা শুনেও হাসি পেলো না ফাইজানের। গোমড়ামুখে উত্তর দিলো,

"অজ্ঞান না হওয়াই ভালো। নাহলে ওই মুটকিকে কোলে কে তুলতে যাবে?"

সুজানের হাসি থামলো। সন্দিহান দৃষ্টিতে চেয়ে শুধালো,

"কি বললেন ভাইয়া?"

ফাইজান বলল,

"কিছু বলি নি। আচ্ছা, তুমি রেডি হবে না? এসেছো থেকে তো আমার সাথেই চিপকে আছো।"

সুজান দন্তপাটি মেলে দিয়ে বলল,

"আমাকে কাজই দেয়া হয়েছে আপনার সাথে চিপকে থাকার। আর রেডি? সেটা তো আমি হয়েই এসেছি। এখন আপনাদের পালা।"

*********

বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ কাজি নিয়ে হাজির হলেন আফজাল সাহেব। বাড়িতে ঢুকেই হাঁক ছুড়েছেন,

"দ্বীতি, কই তুমি? কাজি নিয়ে এসেছি।"

দ্বীতি ও মালেকা বেগম ছুটে এলেন রান্নাঘর থেকে। শাড়ির আঁচল টেনে মাথায় ঘোমটা টেনে সসম্মানে কাজিকে নিয়ে বসালেন ড্রইংরুমের সোফায়। কিছুক্ষণ বাদেই ডাক পড়লো ফাইজান ও শায়রার।

দ্বীতি বেগম মেয়ের রুমে গেলেন শায়রাকে নিয়ে আসতে।

অন্যদিকে ফজল সাহেব ঢুকেছেন ছেলের রুমে। এতক্ষণ বাইরে হাসিমুখে কথা বললেও ছেলের রুমে ঢুকতেই সে হাসি গায়েব। তিনি বেশ কর্কশকন্ঠে বললেন,

"আরেকটু পর বিয়ে তোমার। একজন মেয়েকে তার বাবা খুব ভরসা করে তোমার হাতে তুলে দিচ্ছে। তাদের ভরসার মর্যাদা রাখবে। ভালোবাসা-যত্নে আগলে রাখবে তাকে। আর কলেজ-ভার্সিটিতে এতদিন যা করেছো, যথেষ্ট করেছো। এখন সব ভন্ডামি ত্যাগ করো। যার দায়িত্ব নিচ্ছো, তাকে আগলে রেখো।"

ফাইজান ঘাড় চুলকে মাথা নিচু করলো। নিম্ম আওয়াজে বলল,

"মেয়ে নিতে চাইলাম কই? সবাই তো জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। আমার কথা কেউ শুনে? এজন্যই বাবা এতদিন বলতো ব্যবসা বা চাকরী করে ছেলেদের একটা শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে হয়। নাহলে এইভাবেই বাঁশ খেতে হয়।"

হাজার অসম্মতি থাকলেও এবার আর বিয়ের হাত থেকে পালানোর উপায় নেই। বর-কনে দু'জনকেই হাজির করা হয়েছে ড্রইংরুমে। একটি সোফায় পাশাপাশি দু'জনকে বসিয়ে অতি আহ্লাদে অনেকগুলো ছবি তুলল আনুসা৷ এরই মাঝে ফাইজান শায়রার কানে কানে জিজ্ঞেস করলো,

"তোর কোনো প্রেমিক নেই?"

বিয়ের আগ-মুহুর্তে এমন একটা প্রশ্ন শুনে হতভম্ব শায়রা। তবে বউ সেজে বসে থাকায় ঝগড়ার মতো পরিস্থিতি হলো না। মাথা নিচু রেখেই বলল,

"না, নেই। কেন?"

ফাইজান বিরক্তির সুরে বলল,

"ধুর! একটা প্রেমিকও নেই তোর? জীবনে করেছিসটা কি? একটা প্রেমিক থাকলে না কাজে দিতো!"

এবার নিজের বিস্ময় চাপা দিয়ে কোনোমতেই বসে থাকতে পারলো না শায়রা। চোখ বড়বড় করে তাকালো ফাইজানের দিকে। এ কেমন ছেলে? যে বিয়ের আগ-মুহুর্তে বউয়ের প্রেমিক আশা করছে?

শায়রা জিজ্ঞেস করলো,

"আমার প্রেমিক দিয়ে তোমার কি কাজ?"

ফাইজান বুঝিয়ে বলল,

"কি কাজ মানে? দেখ শায়রা, আজ তোর প্রেমিক থাকলে কি হতো? সে যদি কোনোভাবে জানতো আজ তোর বিয়ে, তাহলে ছুটে আসতো এই বিয়ে আটকাতে। আমিও নিজের মহানুভবতার পরিচয় দিয়ে সবাইকে মানিয়ে নিতাম তোদের বিয়ের জন্য। তারপর তোর বিয়ে তোর প্রেমিকের সাথে হয়ে যেত। আমি যেমন আছি, তেমনই থাকতাম। তুইও খুশি, আমিও খুশি। ব্যাপারটা ভালো হতো না?"

শায়রা হা করে ফাইজানের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুপল। মস্তিষ্ক হাতড়ে ভাষা খুঁজে ফিরলো উত্তর দেয়ার। সময়মাফিক সেটা খুঁজে পেতেই বলল,

"শুধু আমার প্রেমিকই কেন? এই বিয়ে থেকে বাঁচার জন্য আমিও তো তোমার প্রেমিকা আশা করতে পারি। যে বিয়ের আগ-মুহুর্তে এসে বলবে, ফাইজান তুমি আমাকে ছেড়ে অন্য কারো হতে পারো না! আমি তোমার বাচ্চার মা হতে যাচ্ছি!"

শায়রার খুব করে ইচ্ছে করলো এমন মুহুর্তটাকে অভিনয় করে দেখাতে। কিন্তু লক্ষ্মী বউয়ের মতো বসে থাকায় সেই শখ পূর্ণ হলো না। শান্তভাবে বসে থেকেই নিচু আওয়াজে ঝগড়া করতে হচ্ছে!

"বাচ্চার মা?"

শায়রার বলা বাক্যগুলো অদ্ভুতরকম বিকট ঠেকলো ফাইজানের কাছে। ছেলেটা কপাল কুঁচকে বলল,

"শায়ু, তুই একটু বেশিই মশলা অ্যাড করে ফেললি না? আমার কোনো প্রেমিকাই নেই আবার বাচ্চার মা! এতদূর তো কোনোদিনও হওয়া সম্ভব না!"

শায়রা ভীষণ আফসোসের সুরে বলল,

"আচ্ছা তাই? তার মানে তোমারও প্রেমিকা নেই। আমার কোনো প্রেমিক নেই, তোমার কোনো প্রেমিকা নেই। সুতরাং এই বিয়েটা আটকাতে কেউ-ই আসবে না। করতেই হবে বিয়ে। আর সব তোমার দোষ!"

"উহু উহু!"

আনুসার অভিনয় করা কাশির শব্দ পেয়ে সামনে তাকালো দু'জনেই। লক্ষ্য করলো আনুসা ও সুজান দু'জনের চোখে-মুখেই দুষ্টুমির ঝিলিক। মুচকি হাসি লেগে আছে উভয়ের ঠোঁটের।

কারণটা ধরতে বেগ পেতে হলো না। আনুসা নিজেই বলল,

"বলছিলাম, তোমাদের সব কথা কি এখানেই সেরে ফেলবে? বাড়িতে গিয়ে আজ রাতে না হয় সারারাত গল্প করো। এখন থেকে অবাধ সময় পাবে দু'জন। বিয়ের সময়টা চুপ থাকো।"

মাথা নিচু করে ফেলল শায়রা। পরমুহূর্তেই আড়চোখে চাইল ফাইজানের দিকে। ফাইজানের প্রতিক্রিয়াও তাই। সুজান ননস্টপ বলে যাচ্ছে,

"আপু আর জিজুর কি ভালোবাসা! আজ সকাল থেকে তোমরা কেউ ওদের কথা বলতে দাওনি। এজন্য এখনই সব বলে নিচ্ছে। ছবি তোলার সময়ও কথা থামাথামির নাম নেই। হাউ সুইট কাপল!"

মুখ বাঁকাল শায়রা। মনে মনে বলল,

"সুইট না ছাঁই! আমরা বিয়ে নিয়ে আফসোস করছি আর ওরা দেখে রোমান্টিকতা! সবক'টার চোখের চিকিৎসা করতে হবে।"

**********

"বলো মা, কবুল।"

কাজীর বলার সাথে সাথে আগ্রহী সবকটা দৃষ্টি চারপাশ থেকে যেন ঘিরে ফেলল শায়রাকে। ফাইজান একটু আগেই কবুল বলেছে। যেহেতু বিয়েটা করতেই হবে তাই আর ঘটনা প্যাঁচায় নি। স্বাভাবিকভাবেই কবুল বলেছে। বাকি রয়েছে শায়রা। মাত্র কিছু সেকেন্ডের ব্যবধানে কবুল বলে ফেললেই দু'জনের পুরো জীবনটা জড়িয়ে যাবে একে-অপরের সাথে।

সবার আগ্রহী দৃষ্টির সামনে ঢোক গিলল শায়রা। একপলক তাকিয়ে নিলো ফাইজানের দিকেও। সে ছেলে নির্বিকার বসে। যেন বিয়ে করা বা কবুল বলা তেমন কোনো ব্যাপারই না। শায়রা ঘুরলো কাজির দিকে। মাথা নিচু করে বলেই ফেলল,

"কবুল।"

একে একে তিনবার কবুল বলার পর "আলহামদুলিল্লাহ" ধ্বনিতে মুখরিত হলো বাড়ি। দ্বীতি বেগম মিষ্টি নিয়ে এলেন। আনুসা প্লেট থেকে মিষ্টি তুলে প্রথমেই তার ভাই ও ভাবীকে খাওয়ালো। এরপর তার নানিকে। যার অসুস্থতার বাহানায় দ্রততম সময়ে হয়ে গেলো ফাইজান ও শায়রার বিয়ে।

অথচ ভদ্রমহিলাকে দেখে এখন বেশ সুস্থ মনে হচ্ছে। নাতি-নাতনীর বিয়ের খুশিতেই মনে হচ্ছে শরীরের অর্ধেক রোগ আবাসস্থল ছেড়ে পালিয়েছে৷ তার খুশির পরিমাণ দেখে মনে হচ্ছে যেকোনো মুহুর্তে আনুসার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে নাচা শুরু করবেন।

ফাইজান ও শায়রা হতাশ নয়নে চেয়ে আছে মনোয়ারা বেগমের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর ফাইজান বলল,

"শায়ু, আমরা উনাকে দেখতেই ঢাকা থেকে ছুটে এসেছিলাম তো?"

শায়রা জবাবে বলল,

"হ্যাঁ। আর উনিই অসুস্থতার জন্য হসপিটালে এডমিট ছিলেন। গতকালও সারাদিন কাটিয়েছেন শুয়ে-বসে।"

ফাইজান হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"আর এটা দেখেই আমাদের বিয়ে দিয়ে দিলো? কিন্তু নানুকে তো এখন সুস্থই মনে হচ্ছে।"

শায়রা বলল,

"হবেই তো! উনার কাজ তো হয়েই গেছে। দেখে নিয়েছে আমাদের বিয়ে। আর কিছু লাগে?"

**********

অনিচ্ছার বিয়েটা নিয়ে ফাইজান বা শায়রা, কারো মধ্যেই খুব বেশি অনুভূতি কাজ করেনি। স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে পড়াকালীন যেমন বছরে বছরে এক্সাম দিতে হয়, এটাকেও তেমনই ধরে নিয়েছে ওরা। একটা বি*পদ স্বরূপ। হাওয়ার বেগে এসেছে, হাওয়ার বেগেই বিয়ে সম্পূর্ণ করে গেছে। কিন্তু বিদায়ের সময়টাতে অন্যরকম খারাপ লাগায় ছেঁয়ে গেলো শায়রার মন।

সন্ধ্যা হতেই সময় ঘনিয়ে এলো ফজল সাহেবদের চলে যাওয়ার। গোছগাছ সকাল থেকেই করা আছে। এখন শুধু বের হবে তারা। এরপর কাল থেকে আবার অফিস, ভার্সিটি চালু।

শায়রা যাওয়ার আগে শাড়ি চেঞ্জ করে থ্রি-পিস পড়েছে। সব গুছিয়ে রুম থেকে বের হতেই সুজান এসে ধরলো ওকে। হন্তদন্ত হয়ে বলল,

"শায়রা, তোকে কিছু বলার আছে আমার!"

"হ্যাঁ বলো।"

অনাগ্রহে অল্প শব্দে এতটুকুই বলল শায়রা। তার মনের অবস্থা একদমই ভালো নেই। গলবিল অব্দি তিক্ততায় ছেঁয়ে আছে।

গতবার মায়ের বাড়ি থেকে ফুপুর বাড়ি গিয়েছিলো পড়াশোনার জন্য। তাই মন খারাপের থেকে উত্তেজনা কাজ করছিলো বেশি। নতুন ভার্সিটি, নতুন ফ্রেন্ড, শখের ভার্সিটিতে চান্স পাওয়া, সব মিলিয়ে অন্যরকম আনন্দ ভর করেছিলো মনে।

কিন্তু এইবার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মায়ের বাড়ি থেকে শশুড়বাড়ি যাচ্ছে৷ সব ছেড়ে-ছুড়ে স্থায়ী ঠিকানা হয়ে গেলো ওই বাড়িটাই। এখনো ঠিকঠাক বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না ওর বিয়ে হয়ে গেছে, তাও ফাইজানের সাথে! আগামী জীবনে কি হবে সম্পূর্ণটাই তার অজানা। তার উপর মা-বাবাকে ছেড়ে যাওয়ার বিদায় ব্যাথা৷ একদিনের ব্যবধানে পর-পর মনে হচ্ছে নিজেকে। কোনোমতো কান্না আটকে রাখাটা এখন তার কাছে যুদ্ধের সামিল।

সুজান খুব একটা খেয়াল করলো না শায়রার অবস্থা। নিজের মত বলল,

"ফাইজান ভাইয়াকে ওইসময় বললাম, আপনাকে পাঞ্জাবিতে সুন্দর লাগছে। শায়রা দেখলে অ*জ্ঞান হয়ে যাবে। ভাইয়া জবাবে কি বলল জানিস?"

এই পর্যায়ে আগ্রহ এলো শায়রার। শুধালো,

"কি বলেছে ও?"

সুজান কপাল কুঁচকে বলল,

"বলল অ*জ্ঞান হলে সমস্যা, ভাইয়া তোকে কোলে নিতে পারবে না ভুলেও! কিন্তু কেন বলল? তোর স্বাস্থ্য একটু ভালো। তবে এতও তো মোটা না!"

এই মুহুর্তে মন খারাপের সাথে রা*গও ভর করলো শায়রার মাথায়। ফুঁ*সতে ফুঁ*সতে বলল,

"আবার আমাকে মোটা হওয়ার খোঁ-টা দিয়েছে! একে একটা উচিত শিক্ষা না দিলে তো হচ্ছে না।"

দ্বীতি বেগমের ডাক আসতেই সুজান কথা রেখে ছুটে গিয়েছে ওইদিকে। আর শায়রা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফন্দি আঁটছে প্র*তিশোধের। মন খারাপটা ফিঁকে হয়ে রা-গটাই মনে ঘুরঘুর করছে শুধু। আর মস্তিষ্ক ভেবে চলেছে, কিভাবে একে একটা শিক্ষা দেয়া যায়?

**********

এতক্ষণ বেশ হাসি-খুশি থাকলেও বিদায়ের মুহুর্তে হাউ-মাউ করে কাঁদছেন দ্বীতি বেগম। সাথে কান্নারত মেয়েকেও জড়িয়ে ধরে রেখেছেন। আফজাল সাহেব পাশে দাঁড়িয়ে নিজের চোখ মুছছেন শুধু।

ফজল আহমেদ এসে আফজাল সাহেবের কাঁধে হাত রাখলেন। স্মিত হেসে বললেন,

"আজকেই সবাই কেঁ*দে উজাড় করে দিলে হবে? ধুমধাম করে বাড়ির বউ তুলে নেওয়া যে এখনো বাকি। মেয়েকে কিন্তু এখন ভাতিজি হিসেবেই নিয়ে যাচ্ছি। যেমন কিছুদিন আগে ফুপুর বাড়িতে গিয়েছিলো পড়াশোনার জন্য? আজও সেভাবেই নিচ্ছি। তাই মেয়ে বিদায়ের কান্নাকাটি বাদ দিন ভাই, ভাবি!"

ফাইজান গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে দেখছে এই কাহিনি। সে পাশে থাকা আনুসাকে বলল,

"শায়রা অনেক কান্নাকাটি করছে। এক কাজ করি, ওকে মামা-মামির কাছেই রেখে আমরা যাই।"

আনুসা চোখ বড়-বড় করে চাইল ফাইজানের দিকে। বলল,

"এসব কি বলছো ভাইয়া? ও এখন তোমার বউ হয়। কিভাবে রেখে যাই?"

ফাইজান কটমট করে তাকিয়ে বলল,

"নিয়ে গেলেও তো সারারাস্তা এভাবেই কান্নাকাটি করবে। এত কান্নাকাটি করলে মানুষ সুস্থ থাকে কি করে? এতক্ষণ তো ঠিকই ছিলো। এখন কেন কাঁদছে?"

ফজল সাহেব ও মালেকা বেগমের বিস্তর স্বান্ত্বনায় কাজ হলো। কান্না থামালেন তারা সবাই। ভার্সিটির ছুটি থাকলে শায়রা এসে সিলেটে থাকলে এরকম আশ্বাস দিলেন। এরপর সবাই গিয়ে উঠলেন ভাড়া করা মাইক্রোতে।

গাড়িতে শায়রা ও ফাইজান পাশাপাশি বসেছে। ফজল সাহেব সবার থেকে বিদায় নিয়ে গিয়ে সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছেন। সবাই ঠিকঠাক উঠে বসতেই বিদায় সম্পূর্ণ করে গাড়ি ছুটলো পিচঢালা রাস্তা দিয়ে।

হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস পর্ব ১২ গল্পের ছবি