তারা ঝলমলে আকাশে এক টুকরো চাঁদের আধিপত্য। রাত্রি তখন দশটা বাজতে কিছু সময় বাকি। সবার খাওয়া-দাওয়া শেষ, এখন ঘুমাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। খাওয়া বাকি শুধু শায়রার। মেয়েটা বেঘোর ঘুমে তলিয়ে।
আজকে দুপুরে ভার্সিটি থেকে এসে কোনো এক বিষয়ের নোট তৈরি করতে গিয়ে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। সারাদিনের ক্লান্তিতে সন্ধ্যার পরপরই ঘুমিয়ে গিয়েছে। এখন সবার খাওয়া শেষে সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে।
শায়রা ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে দেখলো ডাইনিং রুমের লাইফ অফ। অর্থাৎ সবাই যার যার রুমে চলে গিয়েছে। এখন তাকেই খাবার গরম করে খেতে হবে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল মেয়েটা। চুলগুলোকে হাতখোঁপা করে ঢুকলো রান্নাঘরে৷ মালেকা বেগম বলেছিলেন, শায়রা উঠলে তাকে যেন ডাক দেয়। কিন্তু শায়রা এত রাতে আর কাউকে ডিস্টার্ব করতে চাইলো না। নিজের কাজ নিজে করাই যথোপযুক্ত মনে হলো তার কাছে।
শায়রা তরকারির পাতিলটা চুলায় বসিয়ে ঘুরলো। তৎক্ষনাৎ কিচেনের দরজার কাছে ফাইজানকে চোখে পড়লো। সে দু'হাত বুকে গুজে একপাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে শায়রাকেই দেখছে।
এত রাত্রে ফাইজানকে এখানে আশা করে নি শায়রা। ভ্রু কুঁচকে শুধালো,
"এত রাত্রে তুমি এখানে কি করছো?"
ফাইজান নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিলো,
"ভাবলাম এত রাতে আবার বাড়িতে চো*র ঢুকলো কি না, তাই দেখতে এসেছি। এখন তো দেখি খাবার চো*র ঢুকেছে।"
শায়রা তৎপর বলে বসলো,
"রাত্রিবেলা চো*র ধরার নতুন চাকরী নিয়েছো বুঝি? যাক ভালো, অন্তত এই বাউন্ডুলে জীবন থেকে অবসর নিচ্ছো তাহলে! নাহলে তোমার ভালো হওয়ার আশা তো ছেড়েই দিয়েছিলাম। আচ্ছা শুনো, চো*র ধরতে গিয়ে আবার নিজে ডা*কাত হয়ে যেও না। কেমন?"
ফাইজান চিবুক শক্ত করলো স্পষ্ট খোঁচাটায়। বিপরীতে বলল,
"নিজে ডা*কাতের মতো আচরণ করে অন্যকে ডা*কাত বলতে মুখে বাঁধে না?"
শায়রা ফাইজানের অনেকটা কাছে এগিয়ে এসে চোখে চোখ মিলিয়ে বলল,
"তোমার কিছু ডা*কাতি করেছি আমি?"
ফাইজান সঙ্গে সঙ্গে মুখটা ঘুরিয়ে নিলো। অন্যদিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে মাথা চুলকে বলল,
"কি করছিলি সেটা কর! আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার দরকার নেই। রাত্রে না খেয়ে ঘুমিয়েছিস, গিয়ে খেয়ে নে আগে।"
শায়রা হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। আজ হয়তো প্রথমবার ফাইজান শায়রার কাছে ভালোভাবে একটা বাক্য ব্যয় করেছে৷ বিস্মিত হওয়ারই কথা!
"কি হলো? যা!"
উঁচু আওয়াজের একটা ধমকেই হুশে আসলো শায়রা। মাথা নিচু করে এলোমেলো পল্লব ঝাপটালো কয়েকবার। অতঃপর বলল,
"যাচ্ছি। তোমার বলা লাগবে না। তুমি নিজেও নিজের কাজে যাও। আমার উপর নজরদারি করতে হবে না।"
বলেই রান্নাঘর থেকে বের হলো শায়রা। ফাইজান পেছন থেকে বলল,
"হ্যাঁ, খাওয়ার ব্যাপারে এমনিতেও তোকে কিছুই বলা লাগে না। সাধে তো মুটকি বলি না আমি!"
শায়রা ডাইনিং টেবিলের কাছ থেকে শুনলো পুরোটাই। তবে জবাব দিলো না। ব্যস্ত হলো প্লেটে ভাত বাড়তে।
ফাইজান এতক্ষণ এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলো। শায়রা বের হতেই গুড়ো মরিচের বক্সটা হাতে নিয়ে বেশ অনেকখানি মরিচ ঢেলে দিলো চুলোয় থাকা তরকারির পাত্রটায়। এরপর চামচ দিয়ে সেটাকে ভালোমতো নেড়েচেড়ে মিশিয়ে দিলো তরকারির সাথে। একটুখানি তরকারি, তারমধ্যে অতগুলো মরিচ! ঝালে শায়রার অবস্থা কি হবে, সেটা ভেবেই শয়*তানি হাসি ফুঁটলো ফাইজানের অধরকোণে।
কাজ শেষে ফাইজান খুশিমনে বেরিয়ে গেলো রান্নাঘর ছেড়ে। তবে বাইরে বের হয়ে শায়রার মুখোমুখি হতেই মুখ-ভঙ্গি পরিবর্তন। কর্কশ কন্ঠে বলল,
"ঠান্ডা পানি খেতে এসেছিলাম। খাওয়া শেষ, ঘুমাতে যাচ্ছি। গুড নাইট।"
প্রতিত্তোরের অপেক্ষা নেই। তার আগেই রুমে গিয়ে দোর ঠেলেছে ফাইজান। শায়রা আর ওকে নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামালো না। কিছুক্ষণের মধ্যে প্লেটে খাবার সাজিয়ে গিয়ে বসলো ডাইনিং টেবিলে।
ভাত মাখিয়ে এক লোকমা মুখে তুলতেই ঝালে জিভ পুড়ে গেলো যেন! সঙ্গে সঙ্গে পাশে থাকা পানির গ্লাসটা তুলে ঢকঢক করে পানি খেলো। এক গ্লাস খালি করে উঠে ছুটলো ফ্রিজের কাছে। ঠান্ডা পানির বোতল নিয়ে গোটা একটা বোতল খালি করার পর ঝাল একটু নিয়ন্ত্রণে এলো। সেখানে ফ্রিজে হেলান দিয়েই হাঁপাতে লাগলো শায়রা।
ইতিমধ্যে ঘাম ছুটে গেছে ঝালের কারণে৷ ঠান্ডা পানি খেয়ে একটুখানি শান্ত হলো শায়রা। তৎক্ষনাৎ আচমকা মস্তিষ্কে হানা দিলো, তরকারি এত ঝাল হলো কি করে? কিছুক্ষণ ভাবতেই উত্তর ধরা দিলো। কাজটা ফাইজানের!
শায়রা রেগে আগুন! বুঝে গেলো, একটু আগে ফাইজানের ভালো ব্যবহারের কারণ। এই ক'দিনের কাহিনির জন্য প্র*তিশোধ নিতেই যে ফাইজান এই কাজ করেছে, এটা পরিষ্কার শায়রার কাছে। তার ইচ্ছে করলো সেই মুহুর্তে গিয়ে বক্সভর্তি মরিচ ফাইজানের মুখে ঢেলে দিতে। কিন্তু এটা সম্ভব নয়!
শায়রা কিচেন থেকে বেরিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো নিজের চেয়ারটার সামনে। প্লেটে থাকা ভাতগুলো দেখে ভীষণ মায়া লাগলো তার। এত ঝাল খাবার সে খেতে পারবে না। অন্যদিকে ফেলে দিতেও খারাপ লাগছে। এই খারাপ লাগার কারণে বাধ্য হয়ে আরও দুই লোকমা খাবার কষ্টে-সৃষ্টে গিলে নিলো। আবারও সেই একই কাহিনির পুনরাবৃত্তি। দু'বোতল ঠান্ডা পানি শেষ করেও আর খাওয়া সম্ভব হলো না। অগত্যা! ভাতগুলো ফেলে দিতে হলো তাকে।
আস্তে-ধীরে শায়রা সব গুছিয়ে একরাশ মন খারাপ নিয়ে ঢুকে গেলো নিজেদের রুমে।
আনুসার রুমের দরজা আটকানোর শব্দ পেতেই রুম থেকে বের হলো ফাইজান। চুপিসারে পা টিপে-টিপে রান্নাঘরে গিয়ে হাজির হলো সে। দেখলো ভাত পুরোটাই ফেলে দিয়েছে শায়রা। যদিও ফাইজান কাজটা ইচ্ছে করেই করেছে, তবুও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ওরও মনটা খারাপ হয়ে গেলো। নিজমনে বিড়বিড় করে বলল,
"ভাত তো পুরোটাই ফেলে দিয়েছে। বেশি ঝাল দিয়ে দিয়েছিলাম? এই মেয়ে তো খালি পেটে একদম থাকতে পারে না। রাত্রে আবার ক্ষুধায় কাঁদবে না তো?"
ভাবতে ভাবতে নিজের রুমে ফিরে এলো ফাইজান। শায়রার জন্য তার মনে ভীষণ খারাপ লাগা কাজ করছে। ফাইজান ভালো করেই জানে শায়রা কতটা খাদ্যপ্রিয় মানুষ! সেখানে এত বড় একটা রাত পেটে ক্ষুধা নিয়ে কাটানোটা হয়তো দুঃসাধ্য হবে!
মনের এই ভাবনায় মস্তিষ্ক বিরুদ্ধাচারণ করে বসে। জানান দেয়, এতটুকু শা*স্তি শায়রার দরকার ছিলো। গত কয়দিনে বেশিই জ্বা*লাতন করছে সে। প্র*তিশোধের ক্ষেত্রে এতটুক কষ্ট দেয়া তেমন কোনো বিষয়ই না!
মন ও মস্তিষ্কের দোলাচলে ভুগে অবশেষে মনই জিতলো। ফাইজান নিজের ঘরের ইতি-উতি তাকয়ে বুকসেল্ফের উপর বিস্কুটের বক্স দেখতে পেলো। মনে পড়লো, গত কিছুদিন আগে সে-ই এটাকে এনে বেখেয়ালবশত নিজের রুমে রেখে দিয়েছে।
ফাইজান উপর থেকে সেই বক্সটা নামিয়ে গেলো আনুসার রুমের কাছে। দরজায় দাঁড়িয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলো, নক করবে কি না! একবার মনে হয়, এই কাজটা করা মানে শায়রার কাছে নত হওয়া। পরমুহূর্তেই আবার মনে হয়, প্র*তিশো*ধ প্র*তিশো*ধ খেলার চক্করে মেয়েটাকে কষ্ট দেয়া ঠিক না।
দু'রকম ভাবনা ভাবতে ভাবতে ফাইজান দরজায় নক করলো। অল্প কিছু সময় পরই দরজা খুলল শায়রা। ফাইজানকে দেখে বিস্মিত হয়ে শুধালো,
"তুমি আবার এখানে?"
ছেলেটা ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল,
"ভার্সিটির বাইরে ইচ্ছামতো কাচামরিচ, শুকনো মরিচ গুড়ো দিয়ে ফুচকা খেতে ঝাল লাগে না তোর? ফুচকায় ঝাল হলে তো নাচতে নাচতে খেয়ে নিস। আর তরকারির ঝাল খেতে পারিস না? অদ্ভুত মেয়েজাতি তোরা!"
শায়রা এমনিতেই ফাইজানের উপর প্রচন্ড রে*গে আছে। তবুও মধ্যরাত এবং সবাই ঘুমিয়ে আছে বিধায় ভদ্রতা দেখিয়ে চেঁচামেচি করে নি। কিন্তু এই কথায় আর রাগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলো না। চাপা কন্ঠে ক্রোধ প্রকাশ করে বলল,
"ঝালের একটা মাত্রা আছে, বাউন্ডুলে। তুমি আমার উপর প্র*তিশোধ নিতে মাত্রাতিরিক্ত মরিচ মিশিয়েছো তরকারিতে। বুঝি না ভেবেছো? নিজে অঘটন ঘটিয়ে আবার আমার উপর চেঁচাতে এসেছো? লজ্জা বলে কিছু আছে তোমার?"
ফাইজান বিরক্তির শ্বাস ঝাড়লো। বিস্কুটের বক্সটা শায়রার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
"আমি ছেলে মানুষ। তাই আমার লজ্জা নিয়ে তোর গবেষণা না করলেও চলবে! রাতে খাস নি বলে মায়া দেখিয়ে এটা দিতে এসেছিলাম শুধু। নাহলে এই মধ্যরাতে তোর সাথে ঝ*গড়া করে মুড খারাপ করার ইচ্ছা বিন্দুমাত্র নেই আমার।"
বলতে বলতে নিজের বাম হাতে শায়রার ডান হাতটা স্পর্শ করলো ফাইজান। একটানে উঠিয়ে এনে হাতে বিস্কুটের বক্সটা ধরিয়ে দিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো। দু'কদম এগিয়ে আবার পিছু ফিরে বলল,
"খেয়ে নিস।"
ফাইজান গটগট করে হেঁটে গিয়ে নিজের রুমে ঢুকেই দরজা আটকে দিলো। শায়রা সেখানেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। অতঃপর বিদ্বিষ্ট চিত্তে আওড়ালো,
"নিজের এমন যত্নশীল স্বভাব কেন সবার থেকে আড়াল করে রাখো তুমি?"
*********
রৌদ্রজ্জ্বল দুপুর। সূর্য ঠিক মাথার উপর নিজের উত্তাপ ছড়াচ্ছে। গরমে অতীষ্টপ্রায় জনজীবন।
এমন ভরদুপুরে ভার্সিটি থেকে বের হলো শায়রা। সাথে তার বান্ধবি আশা। ক্যাম্পাসের বাইরে বেরিয়ে শায়রা সর্বপ্রথম বলল,
"বাউন্ডুলেটা কোথায়? এই মুহুর্তে নিশ্চিত মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছে। চল তো দেখে আসি।"
উত্তরে আশা মাথা নাড়লো শুধু। পরপর দু'জন এগিয়ে গেলো মাঠের উদ্দেশ্যে।
মাঠের কাছাকাছি আসতেই ছোট-খাটো জটলা লক্ষ্য করা গেলো। শায়রা কৌতুহলী হয়ে সেদিকে যেতে নিলেই পেছন থেকে হাত চেপে ধরলো আশা। আত*ঙ্কমিশ্রিত কন্ঠে বলল,
"মা*রামা*রি হচ্ছে বোধহয়! যাস না ওদিকে।"
শায়রা 'চ' সূচক শব্দ করে বলল,
"গিয়ে দেখিই না কি হচ্ছে! আগেই ভয় পাস কেন?"
শায়রা আশার বাঁধা অগ্রাহ্য করে এগিয়ে গেলো সেখানে। বাধ্য হয়ে আশাও গেলো পেছন পেছন।
যা ভেবেছে, তাই! জটলা পেরিয়ে সামনে যেতেই দেখা গেলো সেই দৃশ্য। আশা শায়রার কানে কানে বলল,
"গরিবের কথা বাসি হলে ফলে! দেখলি তো? চল এখন ভাগি এখান থেকে।"
শায়রা বলল,
"না। দেখছিস না সামনে কে মারামারি করছে? ওই বাউন্ডুলেটাই লেগেছে কারো সাথে। ওকে ছাড়িয়ে আনি।"
আশা আঁতকে উঠে বলল,
"পাগল তুই? উনি তোর কথা শুনবে?"
শায়রা আত্মবিশ্বাসী সুরে বলল,
"ও না শুনলে ওর ঘাড় শুনবে। না শুনলে ওর কান টেনে নিয়ে আসবো না?"
তৃতীয়বারের মতো ঘু*ষি বসাতে গিয়ে হাতে কোমল নারীস্পর্শ পেতেই থমকালো ফাইজান। ছেড়ে দিলো সামনে থাকা ছেলেটার কলার। তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপদ দূরত্বে সরে গেলো ছেলেটা। এহেন দৃশ্য ফাইজানের সব রাগ ঠিকড়ে পড়লো শায়রার উপর। ক্ষুধার্ত বাঘের ন্যায় গর্জে উঠে বলল,
"তুই মাঝে ঢুকলি কেন, শায়রা? তোর জন্য ও ছাড়া পেয়ে গেলো। তোকে বলেছি না, আমার ব্যক্তিগত কাজ-কর্মে নাক গলাবি না?
প্রতিত্তোরে শায়রা উঁচু আওয়াজে বলল,
" এই মাঠটা তোমার ব্যক্তিগত জায়গা নয় যে এখানে ব্যক্তিগত কাজ-কর্ম হবে! মা*রামা*রি করে কোনো বিশ্ব উদ্ধার করছো না তুমি। শুধু শুধুই নিজের ক্ষ*তি করছো। এই যে হাত-পা কে*টে, ছুঁ*লে একাকার হয়ে যায়, এটায় নিজের ক্ষ*তি দেখতে পাও না তুমি? এসব না করলে হয় না?"
ফাইজান ঝামটা মেরে শায়রার হাত সরিয়ে দিলো। কর্কশ স্বরে বলল,
"আমি কি করি না করি সেটা নিয়ে তোর মাথা ঘামাতে হবে না। বাসায় যা।"
শায়রা বিরুদ্ধাচারণ করে বলল,
"যাবো না। আজও হাত, থুতনি কে*টে একাকার করেছো। আমি..."
ফাইজান মাঝপথে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
"তুই কি? তুই এখন সিনেমার নায়িকাদের মতো ওড়না ছি*ড়ে কা*টা জায়গা বাঁধবি নাকি?"
শায়রা বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে বলল,
"আমি সিনেমার নায়িকাদের মত সস্তা ওড়না ইউজ করি না যেটা টান দিলেই ছিড়ে যাবে! আর এমনিতেও, নায়িকারা নায়কের জন্য ওড়না ছিড়ে। তোমার মতো ভিলেনের জন্য না। নিজেকে হিরো ভাবা বাদ দাও!"
ফাইজান মা*রামা*রি ভুলে ব্যস্ত হয়ে গেছে শায়রার সাথে তর্কা*তর্কিতে। সুযোগে মা*র খাওয়া ছেলেটা পালিয়েছে সেখান থেকে। আসল ক্লাইমেক্স হারিয়ে যাওয়ায় জটলাও কমেছে। ফাইজান তাচ্ছিল্যপূর্ণ স্বরে শায়রাকে বলল,
"বাহ! হিরোইনদের মানবতা শুধু হিরোদের জন্যই? বাকিদের প্রতি কোনো মানবতাই নেই? ভিলেন হলে মানবতা দেখাবে না? এ কেমন নিয়ম?"
শায়রা জোর গলায় বলল,
"এটাই নিয়ম। শুধু নায়কের প্রতি মানবতা দেখায় বলেই সে নায়িকা৷ পুরো জাতির প্রতি মানবতা দেখালে তাকে নায়িকা বলতো না। মানবতার ফেরিওয়ালা বলতো!"
ফাইজান কিছু বলার জন্য মুখ খুলল। তবে শায়রা বলার সুযোগই দিলো না৷ বলল,
"এখন চুপচাপ আমার সাথে ফার্মেসিতে চলো।"
ফাইজান ভালো মানুষের মতো জিজ্ঞেস করলো,
"ফার্মেসী কেন যাবো?"
শায়রা রে*গেমেগে চেঁচিয়ে বলল,
"তোমার কা*টা হাতে গুড়ো মরিচ লাগাতে যাবো।"
ফাইজান পূর্বের ন্যায় বলল,
"মরিচ তো মুদি দোকানে পাওয়া যায়। ফার্মেসীতে নয়।"
শায়রা চেঁ*তে গিয়ে পারে না নিজের চুল নিজেই ছিড়ে। কোনোরকম নিজেকে শান্ত করে বলল,
"এসব নকল ভালোমানুষি বন্ধ করো, প্লিজ। অ*সহ্য লাগছে।"
ফাইজান তৎপর বলল,
"অ*সহ্য লাগলে বাসায় যা। আমাকে আমার মতো থাকতে দে।"
শায়রা ওই মুহুর্তে ছাড়লো না ফাইজানকে। জোর করলো তার সাথে যাওয়ার জন্য। আজ কোনো এক কারণে ফাইজানের বাঁধাও অত জোড়ালো ছিলো না। কিছুক্ষণ বাক-বিতন্ডার পর ফার্মেসী গেলো শায়রার সাথেই।
*******
কিছুদিন আগেই একবার হাত কে*টেছে ফাইজান। গতকাল একটা ব্যান্ডেজ খুলতে আজ আবার সেই একই জায়গায় আ*ঘাত পেয়েছে। মা*রামা*রির স্বভাবের কারণে এখন এমন ছোট-খাটো আঘা*ত গা সওয়া গেছে ফাইজানের। শায়রার কাছে যেটা অনেককিছু, ফাইজানের কাছে সেই আ*ঘাত ডাল-ভাত। ফার্মেসীতে বসেও ছেলেটা সম্পূর্ণ নিরুদ্বেগ।
আচমকা বেজে উঠলো শায়রার ফোন। শায়রা ব্যাগ থেকে সেটা বের করে হাতে নিতেই দেখলো তার ফুপুর। রিসিভ করে উত্তরটা দেয়ারইও সময় পেলো না। তার আগেই মালেকা বেগম ব্যস্ত কন্ঠে বললেন,
"তুই আর ফাইজান কই আছিস শায়রা? জলদি বাসায় আয়। সিলেট যেতে হবে।"
আকস্মিক সিলেটের কথা শুনে ঘাবড়ে গেলো শায়রা। ঢোক গিলে শুধালো,
"কি হয়েছে ফুপি? সবাই ঠিক আছে তো?"
মালেজা বেগম অস্থির চিত্তে হড়বড় করে বললেন,
"মায়ের স্ট্রো*ক হয়েছে আবারও। এখন হসপিটালে ভর্তি আছে। আমরা সবাই দেখতে যাবো। তোরা আসলেই বের হতাম।"
দাদির হসপিটালে ভর্তির কথা শুনতেই উদ্বেগ প্রকাশ পেলো শায়রার চেহারায়। অস্থিরতায় চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলো। কোনোরূপ উচ্চারণ করলো,
"আমরা জলদিই আসছি।"
কল কাটতেই ফাইজান জিজ্ঞেস করলো,
"এভাবে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে গেলি কেন? কি হয়েছে?"
শায়রা বলল,
"দাদি হসপিটালে ভর্তি। সিলেট যেতে হবে আমাদের!"
ফাইজান বিড়বিড়িয়ে বলল,
"আবার সিলেট? অ*সুস্থ রোগী দেখতে সিলেট যাবো আর সেই রোগী সুস্থ হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করবে, নানুভাই আমার নাতবউ কই?"
শায়রা বুঝতে না পেরে শুধালো,
"কিছু বলছো?"
ফাইজান এবার আর চাপলো না। শায়রাকে বলল,
"নানুর কথা বলছি। উনি সুস্থ হয়েই নাতবউ খুঁজবে। এমনভাবে বলবে, যেন আমি যাওয়ার আগে উনার নাতবউ কাবার্ডে রেখে যাই!"
গুরুগম্ভীর পরিস্থিতিতেও ফিঁক করে হেসে ফেলল শায়রা৷ বলল,
"এই ভয়ে কি দেখতে যাবে না নাকি?"
ফাইজান বলল,
"না। যাবো তো। এই আমার হয়ে গেছে। চল শায়ু, যাই!"