হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস

পর্ব - ৪

🟢

ঘড়ির কাঁটা তখন রাত্রি দশটার ঘর পেরিয়ে গেছে। ভাঙা কলসির টুকরোর ন্যায় চাঁদখানা জ্বলজ্বল করছে আকাশে। হালকা শীতল বাতাসও বইছে বাইরে। সেটা মাঝেমধ্যেই ঘরে প্রবেশ করে ছুঁয়ে দিচ্ছে মানুষগুলোর শরীর।

ডাইনিং টেবিলে বসা চারজন মানুষ। শায়রা, আনুসা, মালেকা বেগম ও ফজল সাহেব। ফাইজানের অনুপস্থিতিতেই খেতে বসেছেন সকলে। মালেকা বেগম বসতে চান নি প্রথমে। কিন্তু শায়রার জোড়াজুড়িতে বসতেই হলো শেষমেশ।

খাওয়ার মাঝপথেই সশব্দে বেজে উঠলো কলিংবেল। আন্দাজ করতে সমস্যা হলো না, এই মুহুর্তে কে আসতে পারে। মালেকা বেগম সঙ্গে সঙ্গে উঠে গেলেন গেট খুলতে। তবে শায়রা দিলো না। হাত চেপে ধরে থামিয়ে দিলো তাকে। বলল,

"ছেলে আসতে না আসতেই সব ভুলে দৌড় লাগিয়েছো? কি বলেছি শুনো নি? তোমরা কেউ গেট খুলবে না, বলে দিলাম।"

অগত্যা পুনরায় বসতে হলো ভদ্রমহিলাকে। খাবারটা আর গিলতে পারলেন না। প্লেট সামনে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন শুধু।

শায়রা একবার তাকালো ঘড়ির দিকে৷ দশটা বেজে বিশ মিনিট। অর্থাৎ দুই ঘন্টা বিশ মিনিট লেট হয়েছে ফাইজানের। আধোমাখা ভাতটা রেখেই উঠে গেলো শায়রা। বেসিনের সামনে গিয়ে হাত ধুয়ে নিলো। অতঃপর ঢুকলো রুমে। বেরিয়ে এলো একটা কাগজ হাতে। টেবিলে বসা প্রত্যেকেই খাওয়া থামিয়ে দেখে যাচ্ছে ওর কর্মকান্ড।

শায়রা এগিয়ে গেলো মূল দরজার কাছে। ইতিমধ্যেই কয়েকবার বাজতে বাজতে থেমেছে কলিংবেল। তবুও গেট খোলার নাম নেই। বন্ধ দরজার ওপাশের মানুষটা ভীষণ বিরক্ত। তার বিরক্তির সমাপ্তি ঘটালো শায়রা।

নাহ, গেট সে খুলে নি। দরজার নিচের অল্প একটু ফাঁক দিয়ে কাগজটা বাইরে ঠেলে দাঁড়িয়ে রইলো নিজের মতো।

বারকয়েক কলিংবেল বাজানোর পরও দরজা খোলার পরিবর্তে নিচ দিয়ে কাগজ পাওয়ায় ভ*য়ংকর রা*গ চড়লো ফাইজানের মাথায়। ক্ষি*প্ত কন্ঠে বলল,

"এসব কি নাটক? আমি কতক্ষণ ধরে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি, ওরা গেট না খুলে দরজার নিচ থেকে লিফলেট বিতরণ করছে!"

দ্রুত কাগজটাকে হাতে তুলল ফাইজান। চারকোনা কাগজটায় বড়বড় করে লেখা,

❝রাত আটটার পর বাড়িতে প্রবেশ নিষেধ। বিলম্ব হওয়ায় আজ আপনাকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়া হবে না।❞

শব্দগুলো পরে কিয়ৎক্ষণ কাগজটা হাতে নিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ফাইজান। ধাতস্থ হতে সময় লাগলো বেচারার। হুশে আসতেই জোরেশোরে দরজায় কয়েকটা বারি দিয়ে রা*গান্বিত স্বরে বলল,

"গেট খোল শায়রা! তোর ঢং দেখার জন্য বাড়িতে আসি নি। ভেতরে ঢুকতে পারলে খবর আছে তোর! গেট খোল বলছি।"

শায়রা বিন্দুমাত্র বিচলিত না। ফাইজানের হু*মকিতে ভ*য় পাওয়া তো দূরের বিষয়! খানিক উঁচু আওয়াজে চেঁচিয়ে বলল,

"আহা! এটা ভদ্রলোকের বাড়ি। এভাবে চেঁচামেচি মানাচ্ছে না তোমাকে। ভদ্রতা বজায় রাখতে পারলে থাকো, নাহলে এই বাড়িতে জায়গা হবে না। সকালেই বলেছিলাম, রাত আটটার পর ফিরলে বাড়িতে জায়গা হবে না।"

ফাইজান দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

"রাখ তোর ভদ্রতা আর শর্ত! শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করছি, গেট খুলবি নাকি না?"

শায়রা সোজাসাপটা উত্তর দিলো,

"না। আর দরজা ভে*ঙে ঢোকার চেষ্টা করো না। এত রাত্রে ভা*ঙচুর করে মানুষের ঘুম ডিস্টার্ব করলে তোমাকে তুলে রাস্তায় ফেলে আসবে।"

ফাইজান বাহির থেকে চেঁচিয়ে বলল,

"মানুষের ভদ্রতা, ঘুম, শর্ত! কত্ত নানান রঙের কাহিনি জানিস তুই? অভিনয় দেখলে জান বাঁচে না। যত্তসব ফাউল! তুই থাক বাড়িতে। ভদ্র বাড়ির এত ভদ্রতা আমার সহ্য হচ্ছে না। চলে যাচ্ছি।"

শায়রা ভেতর থেকেই চেঁচাল,

"অভদ্র মানুষদের ভদ্রতা সহ্য হবে কি করে? না সইলে যাও গিয়ে, দেখো কেউ তোমায় রাখে কি না!"

বলেই কান পাতলো দরজায়। কারো সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাওয়ার শব্দ কানে আসলো শুধু। মালেকা বেগম ছেলের প্রস্থানে হন্তদন্ত হয়ে উঠে এলেন। অস্থির চিত্তে বললেন,

"ছেলেটা তো চলে গেলো! থাকবে কই? এত রাতে কই যাবে?"

শায়রা প্রতিত্তোরে বলল,

"আহা, ফুপ্পি! এত টেনশন নিচ্ছো কেন? আমাকে আমার কাজ করতে দাও। তোমার ছেলে ভালো হয়ে যাক, এটা চাও না তুমি?"

মালেকা বেগম চুপ করে গেলেন। শায়রা ফোনটা নিয়ে কল করলো বাড়ির দারোয়ানকে। অপরপাশ থেকে রিসিভ হতেই সালাম দিয়ে বলল,

"আপনাকে কি বলেছিলাম মনে আছে তো? গেট একদমই খোলা যাবে না। বেশি হুলস্থুল করলে অভিযোগ দেয়ার ভয় দেখাবেন। আই থিংক কাজ হয়ে যাবে।"

ওপাশ থেকে লোকটা বলল,

"আপনি চিন্তা করবেন না। যেরকম বলেছেন, তেমনটাই হবে।"

সস্থির নিশ্বাস ফেলে কল কাটলো শায়রা। মালেকা বেগম বিস্ময় নিয়ে বলল,

"কি করতে চাইছিস, বল তো! ওকে ঘরে ঢুকতে দিলি না, আবার বাইরেও যেতে দিবি না। তাহলে ফাইজান থাকবে টা কোথায়?"

শায়রা বলল,

"সিঁড়িতে থাকবে। তুমি ছেলের প্রতি দরদ দেখানো বন্ধ করো। এই সবকিছুতে দরদ দেখাতে দেখাতেই এতখানি বিগড়ে গেছে।"

ফজল সাহেব শায়রার কথায় তাল মিলিয়ে বললেন,

"একদম ঠিক বলেছো, শায়রা। এই কথাটা আমি বললেই তো খারাপ হয়ে যাই। তুমিই একটু বুঝাও ওদের!"

শায়রা মৃদু হেসে বলল,

"সবাই বুঝবে আস্তে-আস্তে। এখন তোমরা খাও তো সবাই।"

********

ফাইজান নিচে নেমে দেখলো মেইন গেট ইতিমধ্যে বন্ধ করে দিয়েছে দারোয়ান। কিন্তু ঘড়িতে সময় এগারোটাও বাজে নি। প্রত্যেকদিন তো এগারোটায় গেট লাগায়। তাই ফাইজানও মাঝেমধ্যে আসে এগারোটার ঠিক আগমুহূর্তে। আজকে দ্রুত আসার কারণ নিজের ভেতরকার কৌতুহল। আটটার পর আসলে শায়রা কি করবে, সেটা ভেবেই আগ্রহ দমন করতে পারে নি। আগে আগেই চলে এসেছে বাসায়। এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে অবস্থা!

গেট বন্ধ দেখেই দারোয়ানের রুমের কাছটায় গেলো ফাইজান। দরজা নক করে বলল,

"আঙ্কেল, গেটটা একটু খুলে দেবেন? আমি বাইরে যাবো।"

লিটন সাহেব শুরুতে একটু ভয়ই পাচ্ছিলেন ফাইজানের মুখোমুখি হতে। এখন ফাইজানের নরম সুরে কথা বলায় সাহস পেলেন কিছুটা। শায়রার কথামতো সাফ-সাফ জানিয়ে দিলেন,

"আমার তো বাবা ডিউটি টাইম শ্যাষ। আইজ আর গেট খুলতে পারুম না। আপনে ঘরে গিয়া ঘুমায়া পড়েন।"

ফাইজান দ্বিতীয় দফায় হতভম্ব হলো। লোকটা যে দায়িত্বে গাফিলতি করে মুখের উপর গেট খুলতে নাকচ করে দিবে, এটা সে কস্মিনকালেও ভাবে নি। আজ যেন দুনিয়ার সব আশ্চর্যজনক ঘটনাগুলো তার সাথেই ঘটে যাচ্ছে।

শায়রার কারবারে ফাইজানের মেজাজ এমনিতেই খিঁচে রয়েছে। উপরন্তু লিটনের কথায় মেজাজ আরও চড়লো। তবুও নিজের থেকে বয়সে বড় লোকটাকে সম্মান দেখিয়েই কন্ঠ যথাসম্ভব শান্ত রেখে বলল,

"গেট খুলতে পারবেন না মানে? আমি শুধু বাইরেই তো যেতে চাইছি। এখন মানুষ কি বিপদেও বাসার বাইরে যেতে পারবে না?"

শান্ত স্বরের কথাটাও কর্কশ ঠেকলো লিটনের কাছে। আমতা-আমতা করে বলল,

"আপনে ছোড মানুষ। আপনের আবার কিয়ের বিপদ থাকবো? ঘরের মুরব্বিরা কইলে মানন যায়। ছোড মাইনষেগো আবার কিয়ের বিপদ থাকে?"

ফাইজান একইরকম ভঙ্গিতে বলল,

"বিপদ আবার ছোট-বড় দেখে হয় নাকি? এছাড়া আমাকে ছোট লাগছে কোন এঙ্গেল থেকে? পাঁচ বছরের বাচ্চা আমি? যে বাড়ির বাইরে গেলে হারিয়ে যাবো?"

লিটন সাহেব ঘাবড়ালেও উপর-উপর কিছু প্রকাশ করলেন। নিজেকে শক্ত রেখে জবাব দিলেন,

"হেইডা আমি কইতারি না। বাড়ির নিয়ুম ছোডগো রাইতে বেরাইতে দেওন যাইবো না, আমি নিয়ুম পালন করুম। তোমার মা-বাপে আইয়া কইলে গেট খুইলা দিতে পারি। তয় তোমার লাইগা করুম না।"

ফাইজান বিড়বিড়িয়ে বলল,

"মা-বাপ এসে আর কি বলবে! তারা তো ওই মেয়ের কথায় নেচে গেটই খুলছে না।"

লিটন ওর নিশ্চুপতায় সুযোগ পেল যেন। বেশ সাহস করে বলেই ফেলল,

"একটা কথা কই, বাবা! তোমগো বয়েসটা বুঝছো, উড়নের বয়স। এই বয়সে রক্ত থাহে গরম। মা-বাপের বকা হুনলেও মন চায় সব ছাইড়া-ছুইড়া যাই গা। তয় এরুম করন উচিত না। ঠান্ডা মাতায় মিটমাট কইরা ঘরে গিয়া খাইয়া-লইয়া ঘুমাও। রাইত-বিরাইতে বাইরে ঘুইরো না।"

ফাইজান চাপা ক্রো*ধে বলল,

"আপনাকে উপদেশ দিতে বলি নি। দরজা খুলতে বলেছি, খুলবেন কি না বলেন!"

"আহহা! কইছি তো খুলুম না। আমার ডিউটি টাইম শ্যাষ, আমি যামু ঘুমাইতে। এই রাইতে আর কাহিনি কইরা লাভ হইবো না, বাবা। তুমি এহন বেশি জিদ ধরলে তোমাগো ফেমিলির নামে অভিযোগ যাইবো।"

এইবার আর বলার মত কিছু খুঁজে পেলো না ফাইজান। জীবনে যতই ছন্নছাড়া হোক না কেনও, তার জন্য মা-বাবাকে অপমানিত হতে হোক সেটা সে কোনোদিনও চায় নি। আজকেও তার ব্যতিক্রম নয়। মা-বাবার কথা ভেবেই ক্লান্ত ভঙ্গিতে আবারও উঠে এলো উপরে। দু-বার কলিংবেল বাজিয়ে ডাকলো,

"শায়রা, দরজাটা খুলে দে বলছি। নাহলে ভালো হবে না!"

ভাষায় হু*মকি থাকলেও কন্ঠস্বরে নেই আগেরবারের মতো তেজ। শায়রা এতে খুশিই হলো ভীষণ। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো সময় সবে এগারোটা বেজেছে। এখন তো ভুলেও গেট খোলা যাবে না।

ফাইজান পুনরায় দরজায় নক করে বলল,

"আশ্চর্য! বাড়ির সবাই কি ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি? আমি এতক্ষণ ধরে নক করে যাচ্ছি খোলার নাম নেই?"

শায়রা উঠে এসে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ালো। বলল,

"বলেছিলাম না, আটটার পর বাড়িতে ঢুকে দেখিও। হলো তো? তুমি যেহেতু সময় অতিক্রম করেছো তাই আজ বাইরেই থাকতে হবে!"

ফাইজান বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে বলল,

"ঘরে ঢুকতে দিবে না, বাইরে যেতে চাইলে সেখানেও গেট খুলবে না, বলি আমি থাকবো টা কোথায়?"

শায়রা এপাশ থেকে জবাব দিলো,

"চোখের সামনে সিঁড়ি দেখতে পাচ্ছো না? সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ো। আজ রাত্রে আর দরজা খুলবে না। কাল থেকে আটটার আগে বাড়ি আসলে তোমার ভাগ্য ভালো। নয়তো এভাবেই চলবে।"

হতাশ শ্বাস ফেলল ছেলেটা। প্রথমবার মনে হচ্ছে এই মেয়ের সামনে হার মানতে হবে! দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যাথা হয়ে গেছে। তার উপর দু'বার সিঁড়ি বেয়ে নামা-উঠা হয়েছে। মনের ক্রোধ চাপা রেখে ফাইজান শান্ত কন্ঠে বলল,

"আচ্ছা, হার মেনে নিলাম আমি। এইবারের শর্ত তুই জিতেছিস। এবার গেটটা খুলে দে।"

শায়রা জবাবে বলল,

"গেট খুললেই তো আমি হেরে গেলাম! উহু, সেটা একদমই হচ্ছে না। তুমি কাল থেকে আটটার আগে বাড়ি ফিরলে তবে ঢুকতে পারবে। আজকের জন্য বাইরেই থাকো।"

ফাইজান ভেবে দেখেছে, এখন শুধু বাড়িতে ঢুকতে পারলেই হলো! মেয়েটা তো তাদের বাড়িতেই আছে। সময়-সুযোগ বুঝে প্রতিশোধটা পরেও নেয়া যাবে। তাই আপাতত হার মেনে নেওয়াই উত্তম। নাহলে সারারাত্রি এই সিঁড়িতেই দাঁড় করিয়ে রাখবে। তাই কন্ঠ আরেকটু নরম করে বলল,

"আমি তো হার মেনে নিয়েছি। তাহলে গেট খুলতে কিসের সমস্যা?"

"অনেক সমস্যা। আমি খুলবো না। আগে বলো, কাল থেকে আটটার আগে বাড়ি ফিরবে তো?"

শায়রা দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে উত্তরের অপেক্ষায়। ওর সাথে সাথে ডাইনিং রুমের প্রত্যেকটা মানুষও একটা সম্মতি শুনার অপেক্ষায়।

ওপাশ থেকে উত্তর আসতে সময় লাগলো কিছুক্ষণ। তবে মেনে নিলো ফাইজান। বলল,

"হ্যাঁ। কাল থেকে আটটার আগেই ফিরবো।"

মালেকা বেগম খুবই খুশি হলেন এই কথা শুনে। পারেন না, এই মুহুর্তে দরজা খুলে ছেলেকে ধরে কেঁদে ফেলেন। তার খুশিতে ভাটা পড়লো ফজল সাহেবের কথায়,

"আগেই খুশিতে নাচা বন্ধ করো। তোমার ছেলের উপর বিশ্বাস নেই। আজ হ্যাঁ বলে দেখা যাবে কাল পল্টি মে*রেছে!"

বন্ধ দরজার এপাশ-ওপাশ। ফাইজান ও শায়রা ঘুরে-ফিরে এই একই বয়ান দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু গেট খোলার নাম নেই। সময় যত পেরোচ্ছে ছেলেটার ধৈর্যের বাঁধ ততই ভ*ঙ্গুর হচ্ছে৷ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পায়ে ব্যাথা হয়ে গেছে, কিন্তু বসার উপায় নেই। একটুখানি বসার জায়গার খোঁজে উতলা হচ্ছে ছেলেটা। তবে শায়রা গেট খুললে তো?

ঘড়ির কাঁটা রাত্রি বারোটার ঘর পেরোতেই অপেক্ষার অবসান ঘটলো। বারোটা বেজে দশ মিনিটে দরজা খুলে দিলো শায়রা। ফাইজান হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকেই সোফায় গিয়ে বসে পড়লো। ব্যাথায় টনটন করতে থাকা পা-টার এতক্ষণে প্রশান্তি মিলল। ছোট বোনকে হুকুম করলো,

"আনুসা, পানি নিয়ে আয়।"

আনুসা বাধ্য মেয়ের মতো হুকুম তামিল করলো। মালেকা বেগম ব্যস্ত হলেন ফাইজানের খাবার রেডি করতে। ফজল সাহেব ততক্ষণে চলে গেছেন বিছানায়। কাল সকালেই উঠতে হবে অফিস যাওয়ার জন্য।

শায়রা দরজাটা লাগিয়ে এসে ড্রইংরুমে ফাইজানের মুখোমুখি বসলো। বেশ শান্ত কন্ঠে বলল,

" বাজিটা কিন্তু আমি জিতেছি।"

ফাইজান ভ্রু কুঁচকে তাকালো ওর দিকে। শুধালো,

"কিভাবে? আমি তো ঠিকই ঢুকলাম বাড়িতে।"

শায়রা প্রতিত্তোরে বলল,

"তুমি তো আজ ঢুকেছো। বাজিটা তো গতকালের ছিলো। গতকালের হিসেবে বলেছিলাম আটটার আগে ঢুকলে আমি জিতবো, পরে ঢুকলে তুমি জিতবে। আটটার পরে ঢুকতে পারো নি তুমি। গোটা একটা দিন পর ঢুকেছো। বিশ্বাস নাহলে ফোনে আজকের তারিখটা চেক করো। বারোটার ঘর পার হতেই বাজিটা আমি জিতে গেছি।"

ফাইজান জবাব দিলো না। নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো শায়রার বুদ্ধিতে অভিভূত হয়ে। শায়রার কাছে আজ হেরে গিয়েছে ফাইজান। তার এই হেরে যাওয়াই হয়তো জীবনে জিতে যাওয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে নাম লেখালো!

হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস পর্ব ৪ গল্পের ছবি