হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস

পর্ব - ৬

🟢

সূর্যের তাপ প্রখর। ভার্সিটির কাছাকাছি একটা মাঠের এককোণে বিশাল এক বটগাছের ছায়ায় একটি বাইক রাখা। রিজভী বাইকের উপর বসে আছে। হাতে একটা হাফ লিটারের স্প্রাইটের বোতল। আহাদ ও শুভ প্রত্যেকের হাতেই একটা করে বোতল। একটু একটু চুমুক দিচ্ছে, কথা বলছে আর অপেক্ষা করছে ফাইজানের আসার।

ফাইজান এলো প্রতিদিনকার চেয়ে একটু দেরিতেই৷ এটা ছিলো বাকি তিনজনের জন্য বিশাল এক চমক। হাফ-হাতা টি-শার্ট পড়নে, চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ে রাখা ছেলেটাকে কয়েক মুহুর্তের জন্য চিনতেই পারলো না তারা। এক দেখায় রিজভীর মুখ থেকে স্প্রাইটটুকু ছিটকে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো। পরপর তিনজোড়া হতবিহ্বল দৃষ্টি চেয়ে রইলো ফাইজানের দিকে।

ফাইজান খানিক ইতস্তত করে বলল,

"এইভাবে হা করে কি দেখছিস?"

আহাদ বিস্মিত স্বরে বলল,

"আপনি কে ভাই? ফাইজানের জময ভাই আছে বলে তো জানতাম না! হ*তচ্ছা*ড়া কোনোদিন বলে নি আমাদের।"

ফাইজান ক্ষে*পলো প্রচুর। রা*গান্বিত স্বরে বলল,

"কিসব উল্টোপাল্টা বলছিস তোরা? আমার জময ভাই থাকতে যাবে কেন? আমার কি মাথায় দু'টো শিং গজিয়েছে যে এভাবে দেখতে হবে? শা*লা সুন্দরী মেয়েমানুষ দেখলেও তো এভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকাস না। আমার দিকেই কেন? সমস্যা আছে নাকি তোদের?"

সঠিক জায়গায় ঘাঁ পড়ায় প্রত্যেকেই থতমত খেয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। শুভ দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

"একদম পুরুষত্বে আঙুল তুলবি না, শা*লা! ভার্সিটির ছাদ থেকে ফে*লে দিবো তোকে। এইভাবে হঠাৎ বেশভূষা বদলে আসলে আমরা অবাক হয়ে দেখবো স্বাভাবিক! আজ এত ভদ্র পোশাকে আসলি কি করে তুই?"

ফাইজান তৎপর বলল,

"বাধ্য হয়েছি! ওই মুটকি আমার সব শার্টের বোতামগুলো শার্ট থেকে ছুটিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে। কি ধু*রন্ধর মেয়ে ভাবা যায়? আমার লাইফটা জা*হান্নাম বানিয়ে দিচ্ছে। রাত্রি আটটার আগে বাড়ি যেতে বলেছিলো। যাই নি বলে ওদিন গেটই খুলল না। দু'টো ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। আমি শার্টের বাটন খোলা রেখে ঘুরি বলে, ওটাও তার সমস্যা হয়েছে। এজন্য শার্টের বাটনই রাখে নি। না থাকবে বাঁ*শ, না বাজবে বাঁশি! আজকে বলেছে আমি চুল আঁচড়াই না বলে আমার চিরুনিও ডাস্টবিনে ফেলে দিবে। আজকে চিরুনি ফেলবে, কাল বিছানা, পরশু কাবার্ড, তারপর দিন আমার বাডি থেকে আমাকেই ডাস্টবিনে ফেলে দিবে। এর একটা ব্যবস্থা না করলে হচ্ছেই না!"

এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামলো ফাইজান। কপালের ভাজগুলোতে ফুটে উঠেছে স্পষ্ট বি*রক্তি। সবক'টা হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছে ওর দিকে। বিরক্তির পারদ তড়তড় করে বাড়লো ফাইজানের। খ্যাঁ*কিয়ে উঠে বলল,

"আবার হা করে চেয়ে আছে! আমি ওই মেয়ের জ্বা*লায় অ*তিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছি ভাই! কি করবো একে?"

শুভ বেশ শান্ত কন্ঠে বলল,

"মেয়ে মনে হচ্ছে তোর চেয়ে ডাবল ঘাড়ত্যা*ড়া। তোর আপন বোন তোকে কত্ত ভয় পায়! মুখের উপর কথা বলার সাহস অব্দি পায় না। সেখানে তোর মামাতো বোন এসে এইভাবে টাইট দিচ্ছে?"

ফাইজান বিতৃষ্ণায় নাক-মুখ কুঞ্চিত করে বলল,

"ও তো আমার কোনো তর্জন-গর্জন কেই ভয় পায় না। আমি চেঁচালে ওই ফাঁটা স্পিকার আরও জোরে চেঁচায়। গলার সাউন্ড তো না যেন হাই ভলিউমের স্পিকার! কে যেন বলেছিলো মোটা মানুষের মাথায় বুদ্ধি কম থাকে? ওকে ধরে আমার কাছে নিয়ে আয়, ড্রে*নে চুবাবো।"

আহাদ মিনমিন করে বলল,

"কথা সত্য! মোটা মানুষদের মাথায় আসলে বুদ্ধি না, প্যাঁ*চ কম। তারা অধিকাংশ সময় খাবারের চিন্তা করে। তাই বাহ্যিক কু*কর্মের চিন্তা মাথাতেই আনে না। খাবারই তাদের জীবন। এছাড়া কোনো ক্যাঁ*চালে তারা নেই। আমার চাচাতো বোনটা এরকম।"

শুভ আহাদের পাশেই দাঁড়ানো ছিলো। আহাদের কথা শেষ হতেই শুভের হাত পড়লো তার কলারে। তারপর ঘাড়টা ধরে ফাইজানের সামনে ধাক্কা দিয়ে বলল,

"নে ধর৷ ওর ধারনামতে মোটা মানুষরা সরল-সোজা। এবার ওকেই ড্রেনে চুবিয়ে আয়।"

আহাদ আঁতকে উঠে বলল,

"ভাই, এসব কি? আমি তো সত্যি কথাটাই বলেছি। আজকাল দেখছি সত্যি কথার ভাতই নেই।"

ফাইজান আহাদের কলার টেনে ধরে বলল,

"ভাত নেই। তবে ড্রে*নের পানি আছে। খাবি?"

আহাদ মুখটাকে বিকৃত করে বলল,

"ছিহ! তোর কথা শুনেই বমি আসছে। আমি এসব খাই না। তোর মন চাইলে তুই খা। এমনিতেও যেই মামাতো বোনের পাল্লায় পড়েছিস, ক'দিন পর ও-ই নিজ দায়িত্বে তোকে খাইয়ে দিবে। বেস্ট অফ লাক!"

ফাইজান ছেড়ে দিলো আহাদকে। চিন্তায় হাবুডুবু খেয়ে 'চ' সূচক শব্দ করে বলল,

"এই মেয়ের থেকে কিভাবে প্র*তিশোধ নেয়া যায়? ও বুঝতে পারছে না! আমি এই ভবঘুরে জীবনেই ভালো আছি। জেন্টেলম্যান আর সংসারী পুরুষ হয়ে কি করবো? এখন পর্যন্ত তো বিয়ে-শাদি করার চিন্তাই করি নি। আজাইরা ভেজালে যাবো না। ভবঘুরে জীবনেই ভীষণ শান্তিতে আছি।"

রিজভী ফট করে বলল,

"গাইজ, রেডি হও। আমরা খুব জলদি ফাইজানের বিয়ে খেতে যাচ্ছি।"

আহাদ বিস্মিত স্বরে বলল,

"কি বলিস? কবে বিয়ে করছে ও? আমাদের তো জানালোও না। তোকে জানিয়েছে? মেয়ে কে? কোত্থেকে টপকালো?"

ফাইজান জোরেশোরে এক ধমক দিলো,

"চুপ! কিসের বিয়ে? আমার বিয়ে আমি জানি না, রিজভী জানে? বাহ! কে বলেছে এসব আলতু-ফালতু খবর?"

রিজভী জ্ঞানী মানুষের ভাব দেখিয়ে বলল,

"এটা একটা থিওরি। বেশ প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। যেসব ছেলে বা মেয়েরা বলে বিয়ে করবে না, করবে না, ঘটনাক্রমে তাদের বিয়েই আগে হয়ে যায়। এই যেমন আমাদের মধ্যে ফাইজান বলছে বিয়ে করবে না। দেখবি ওর বিয়েটাই আগে হবে। আচ্ছা ফাইজান, আমি কিন্তু অগ্রিম দাওয়াত নিয়ে রাখলাম। আর তোদেরও দাওয়াত দিয়ে রাখলাম।"

ফাইজান তাচ্ছিল্যসূচক হেসে বলল,

"ভাবখানা ধরেছে এমন, যেন তিনি ক্লাস টপার! অথচ পরিস্থিতি এমন, ব্যাকবেঞ্চে যে জায়গা পায় এটাই তার সৌভাগ্য।"

রিজভী তেজী স্বরে বলল,

"এই, একদম খোঁচা মারবি না। তুই নিজে কি ক্লাস টপার নাকি? টেনেটুনে পাশ করা স্টুডেন্ট! আবার আসে আমাকে বলতে!"

"এত পড়াশোনা করে কি হবে? আমার তো বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। শুধু মা-বাবার জোরজবরদস্তিতে কোনোরকম টেনেটুনে নিয়ে যাচ্ছি। মাস্টার্সটা দিয়ে দিলেই ভেজাল শেষ! আর শায়রার খবর জানিস? ওর শুধু খাওয়া-দাওয়া নয়, বইয়ের সাথেও প্রেম চলে। আই থিংক বইয়ের মধ্যে ডুবে ডুবে আমাকে জ্বা*লানোর ষ*ড়যন্ত্র করে।"

একসঙ্গে প্রত্যেকের হাত পড়লো কপালে। শুভ হতাশ কন্ঠে বলল,

"ভাই, থাম! ওই মেয়ের পিছু ছাড়!"

ফাইজান নাকচ করে দিলো সঙ্গে সঙ্গে। বলল,

"একদম না! এই ক'দিন আমাকে বেশিই জ্বা*লাচ্ছে। একটা প্র*তিশোধ না নিলে তো হচ্ছে না!"

**********

"অসম্ভব! আমরা শায়রাকে ঢাকায় তোমার বোনের বাসায় পড়াশোনার জন্য পাঠিয়েছি। ওদের ছেলেকে বিয়ে করে সংসার করার জন্য নয়। আর এমনিতেও, ওরকম ব*খাটে ছেলের কাছে মেয়ে দিবো কেন? আমার মেয়ের জন্য কি ছেলের অভাব পড়েছে?"

ক্রো*ধে ফুঁ*সছেন দ্বীতি বেগম। মনের ক্ষোভটুকু ঝাড়লেন স্বামীর উপর। আফজাল সাহেব নিজেদের কক্ষের খাটে বেশ চিন্তিত হয়ে বসে আছেন। তার স্ত্রীর রা*গের কারণ যথার্থ। মেয়েকে ঢাকা পাঠানোর পর এমনকিছু হয়ে যাবে, সেটা তিনি নিজেও ঘুণাক্ষরে আন্দাজ করেন নি।

স্ত্রীকে স্বান্ত্বনা দিতে বললেন,

"দ্বীতি, থামো। এত চেঁচানোর মতো এখনও কিছু হয় নি। মালেকা এখনও সরাসরি কিছুই বলে নি।"

দ্বীতি বেগম রা*গান্বিত স্বরে বললেন,

"সরাসরি বলে নি৷ বলতে কতক্ষণ? আজ যদি আকারে ইঙ্গিতে বলতে পারে, ক'দিন পর সরাসরিই বলে দিবে। তুমি এর আগেই কিছু একটা ব্যবস্থা করো।"

ভদ্রমহিলা অস্থির চিত্তে এসে বসলেন স্বামীর পাশে। চোখে-মুখে আকুতি ধরা দিচ্ছে। আফজাল সাহেব বললেন,

"এখন কি ব্যবস্থা করবো, বলো? শায়রা অলরেডি ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে গেছে। এখন কি ওকে আনা সম্ভব? হ্যাঁ, আমরা টিসি নিয়ে ওকে আনতে পারি৷ কিন্তু শায়রা কি এসব মানবে?"

দ্বীতি বেগম বললেন,

"তাহলে কি ও ফাইজানদের বাসাতেই থাকবে? ওখানে থাকলে ব্যাপারটা আরও বড় হবে, শায়রার আব্বু। আমি কোনোভাবেই মেয়েকে ফাইজানের সাথে বিয়ে দিবো না। তুমি শায়রাকে বুঝিয়ে সিলেটেই নিয়ে আসো। যদি না বুঝে তাহলে জোর করে নিয়ে আসবে। এছাড়া উপায় নেই।"

আফজাল সাহেব প্রতিত্তোরে বললেন,

"ভর্তির সাথে সাথেই টিসি নেয়া সম্ভব নয়, দ্বীতি। একটু বোঝার চেষ্টা করো। এছাড়া বললেই তো আর আমরা বিয়ে দিয়ে দিবো না, তাই না? ওরা যদি সরাসরি প্রস্তাব রাখেও আমরা না হয় মানা করে দিবো? বলে দিবো মেয়ে পড়াশোনা করবে, এখন বিয়ে দিবো না।"

দ্বীতি বেগম দ্বিগুন চিন্তিত হয়ে বললেন,

"এই সুযোগে যদি ওরা শায়রার ব্রেইনওয়াশ করে দেয়? আমি কিন্তু ফাইজানের সাথে কোনোভাবেই বিয়ে দিবো না। এই ছেলের মতি-গতির ঠিক আছে? না আছে জীবনের চিন্তা আর না আছে কোনো ক্যারিয়ারের চিন্তা। নিজের মত ভবঘুরে জীবনযাপন করছে। ওর কাছে মেয়ে দিয়ে আমি আমার মেয়ের জীবনটা ন*ষ্ট করতে পারবো না।"

আফজাল সাহেব কিছু বলার আগেই তাদের রুমের দরজায় খটখট শব্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে স্বামীর কাছাকাছি অবস্থান থেকে সরে গেলেন দ্বীতি।

এই বাড়িতে তারা দু'জন ব্যতীত আর একজন ব্যক্তিই আছে। আফজাল সাহেবের মা মনোয়ারা বেগম। এই মুহুর্তে ঘরের দরজায় তিনিই আছেন ব্যাপারটায় নিশ্চিত স্বামী-স্ত্রী উভয়ে। রাত্রি আটটা বাজেই দরজা লাগান নি তারা। শুধু জরুরি বিষয়ে কথা বলছিলেন বিধায় চাপানো ছিলো দরজা। এখন মনোয়ারা বেগম আসায় দ্বীতি উঠে গিয়ে খুলে দিলেন দরজা। ধীরগতিতে ভেতরে ঢুকলেন বৃদ্ধা।

আফজাল সাহেব তাকে দেখেই বললেন,

"এসো, মা। এখানে এসে বসো।"

মনোয়ারা বেগম বেশ অনেকদিন যাবত অসুস্থ। বয়সের সাথে সাথে রোগও বেড়েছে। আল্লাহর অশেষ কৃপায় এখন অব্দি হাঁটা-চলা করতে পারেন তিনি। শুয়ে-বসে কিংবা খানিক হাঁটাহাঁটি করে সচল রাখেন শরীর।

বৃদ্ধা বেশ ধীরে-সুস্থে এসে বসলেন খাটের একপাশে। দম নিয়ে নরম সুরে বললেন,

"তোমাদের দু'জনকে কিছু কথা বলতে চাই আমি।"

দ্বীতি কৌতুহলী হয়ে বললেন,

"হ্যাঁ মা, বলুন।"

মনোয়ারা বেগম একবার ছেলের দিকে তাকালেন, একবার পুত্রবধূর দিকে৷ দু'জনের চেহারাতেই আগ্রহ ফুটে উঠেছে। তবে দ্বীতির আগ্রহটাই একটু মন দিয়ে পরখ করলেন মনোয়ারা বেগম। মেয়েটা পুত্রবধূ হলেও সবসময় তাকে মায়ের মতো সম্মান দিয়েছে। সবসময় খুব খেয়ালে রেখেছে। দ্বীতি মনোয়ারা বেগমের বাড়ির বউ হয়ে আসার পর থেকেই তার আচার-আচরণে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন। আজও সেই ভরসাতেই মনের সুপ্ত শখের ঝুলি খুলে বসেছেন।

বৃদ্ধা বেশ খানিকটা সময় নিয়ে বললেন,

"আমার বহু আগে থেকেই ইচ্ছে ছিলো ফাইজান ও শায়রার বিয়ে দেয়ার। ভেবেছিলাম ওরা বড় হলে তোমাদের কাছে নিজের শখের কথা বলবো। কিন্তু তার আগেই ফাইজান সব উলটপালট করে দিলো। কেমন করে যেন ভবঘুরে জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে গেলো। ওর এই পরিবর্তনের কারণেই আমি এখন অব্দি এই কথাটা বলার সাহস করে উঠতে পারি নি। কিন্তু আজ যখন ব্যাপারটা নিয়ে কথা উঠেই গেছে, এজন্য ভাবলাম বলেই দেই।"

কথা শেষ করে ভারী দম ফেললেন বৃদ্ধা। তাকালেন দু'জনের দিকেই। উভয়েই হতভম্ব হয়ে আছে। মায়ের কথাটা মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে তাদের সময় লাগলো কিছুটা। বেশ কিছু মুহুর্ত পরে দ্বীতি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

"মা, আমি মানছি এটা আপনার শখ ছিলো। কিন্তু এটা কি আদ্যো পূরণের যোগ্য? আপনারও তো একটা মেয়ে আছে। মায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে ভেবে দেখুন, আপনি কি পারতেন একটা ভবঘুরে ছেলের হাতে মেয়ে তুলে দিতে?

হ্যাঁ, এখন আপনি বলতেই পারেন ফাইজান ভবঘুরে হলেও চাল-চুলোহীন নয়। ভালো পরিবার, বাবার ব্যবসা, পুরান ঢাকায় ফ্ল্যাট সবই আছে। কিন্তু মেয়ে বিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে শুধু মা-বাবার পরিস্থিতি দেখলে চলে? যে ছেলের সাথে মেয়েটা সারাজীবন কাটাবে তার স্বভাব, আচার-আচরণ, অবস্থান দেখবে না? সবদিক বিবেচনা করেই বলছি, ফাইজানের সাথে শায়রাকে বিয়ে দেয়ার কথাটা আমি কোনোদিন মানতে পারবো না।"

মনোয়ারা বেগম মাথা নাড়লেন দু'পাশে। অতঃপর বললেন,

"তোমার প্রত্যেকটা কথার সাথে আমি একমত। আমিও মানি এসব। ঠিক এই কারণেই আজ পর্যন্ত নিজের সুপ্ত শখের কথা বলি নি তোমাদের। কিন্তু একটা কথা কি জানো, মা? ছেলেদের জীবনের একটা বড় দখলদারিত্ব থাক তার জীবনসঙ্গিনীর হাতে। মেয়েটা চেষ্টা করলে পারে ছেলেটাকে পরিবর্তন করতে।"

"এটা অনেক বড় রিস্ক, মা। সবসময় যে পরিবর্তন হবেই এমন কোনো কথা নেই। হয়তো..হয়তো কিছু ছেলে পরিবর্তন হতে পারে। সবাই হয় না। তাই শুধু একটা বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে আমি মেয়ে দিতে পারবো না।"

দ্বীতির প্রত্যেকটা কথায় প্রত্যাখ্যানের ইঙ্গিত। উনি কোনোভাবেই মেনে নিবে না এই প্রস্তাব।

আফজাল সাহেব উভয়পক্ষের চাপে ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেছেন। একদিকে তার মা-বোন চাচ্ছে শায়রাকে ফাইজানের সাথে বিয়ে দিতে। কিন্তু মা-বাবা হিসেবে তারা কোনোভাবেই এটা মেনে নিতে পারছেন না। মালেকা বেগম তো শুধু আকারে-ইঙ্গিতে ভাইকে বুঝিয়েছেন কথাটা। এতেই বাড়িতে ছোটখাটো ঝড় বয়ে গেছে। যদিও বা ওদের বিয়ের প্রস্তাব রাখা হয়, সরাসরি প্রত্যাখ্যান ছাড়া কোনো উপায়ই থাকবে না!

হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস পর্ব ৬ গল্পের ছবি