হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস

পর্ব - ১০

🟢

পশ্চিম গগনে সূর্য ঢলে পড়ার আগ মুহুর্তে ক্লান্ত বিকেল। ঝিমিয়ে রয়েছে প্রকৃতি। আজ দুপুরেই মনোয়ারা বেগমকে বাড়িতে আনা হয়েছে। বর্তমানে তিনি নিজের রুমেই বিশ্রামরত আছে। তার সাথে রয়েছে আনুসা। ফজল সাহেব ও মালেকা বেগম গেস্টরুমে আছেন। আফজাল সাহেব ও দ্বীতি নিজেদের রুমে। আলাপ করছে সবচেয়ে গুরুতর বিষয়টা নিয়ে।

ফাইজান ও শায়রা দুইজনের একজনও বাড়িতে নেই। শায়রা গিয়েছে ওর এক বান্ধবীর সাথে দেখা করতে। বলে গিয়েছে সন্ধ্যার আগেই এসে পড়বে, কিন্তু এখনো আসার নাম নেই। আর ফাইজান তো এমনিতেও বাড়িতে চুপচাপ বসে থাকার ছেলেই নয়!

"তুমি নিশ্চিত, তুমি কথাটা ভেবে-চিন্তে বলছো? নাকি মা-বোনের আবদার পূরণ করতে চাইছো শুধু?"

সন্দিহান দৃষ্টিতে স্বামীর দিক চেয়ে কথাটা বললেন দ্বীতি। প্রতিত্তোরে আফজাল সাহেব বললেন,

"আমি সবদিক ভেবে-চিন্তেই বলছি, দ্বীতি। মেয়েকে আজ নয় কাল বিয়ে তো দিতেই হবে, তাই না? আমরা হয়তো ভালো ভেবেই শশুড়বাড়িতে পাঠাবো। কিন্তু সুখে থাকার গ্যারান্টি দিতে পারবো? ছেলের পরিবার কেমন হবে আমরা কি জানবো? এদিক থেকে ভাবতে গেলে ব্যাপারটা খারাপ হয় না। মালেকা শায়রাকে কত আদর করে সেটা তো তুমি, আমি দুজনেই জানি। মা-ও চাইছে ওদের বিয়েটা হোক। তিনি বয়স্ক মানুষ, দুনিয়া দেখেছেন। মা কি শায়রার খারাপ চাইবে?"

এইবার দ্বিমত করতে পারলেন না দ্বীতি। তবুও গাঁইগুই করে বললেন,

"কিন্তু ফাইজান? ওর যেই মা*রকুটে স্বভাব! আমাদের মেয়ের উপর হাত তুললে?"

হেসে উঠলেন আফজাল সাহেব। বললেন,

"স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, বিয়ের আগে কলেজ লাইফে এরকম একটু-আধটু গুন্ডামি আমিও করেছি। কলেজ, ভার্সিটির সিনিয়র হলে এরকম নেতা-নেতা ভাব ছেলেদের মধ্যে থাকেই। আমিও একসময় কম মানুষের হা*ড্ডি গুড়ো করিনি! কিন্তু বিয়ের পর?"

আচমকা হু*ঙ্কার ছুড়লেন দ্বীতি বেগম,

"এজন্যই তো বলি, তুমি কেন এত সাপোর্ট নাও তোমার ভাগ্নার! ও এইসব স্বভাব তোমার থেকে পেয়েছে বলেই তুমি ওর সাপোর্টে কথা বলো। আর আমি কি না জীবনের বিশটা বছর এমন লোকের সাথে সংসার করছি?"

আফজাল সাহেব কপাল কুঁচকে বললেন,

"এই.. একদম আমার ব্যাপারে উল্টোপাল্টা বলবে না। খারাপ কি করেছি আমি? যা গু*ন্ডামি করেছি, সেসব কলেজ লাইফে। বিয়ের পর কিছু করিনি। পুরোদস্তুর ভদ্রলোক হয়ে গিয়েছিলাম। নাহলে তোমার মা-বাবা কি তোমাকে আমার হাতে তুলে দিত?"

দ্বীতি ভেঙচি কেটে বললেন,

"হয়েছে হয়েছে! যেহেতু তোমার ভাগ্না গু*ন্ডামির স্বভাব তোমার থেকেই পেয়েছে তাহলে এখন ভদ্রলোক হওয়ার ট্রেনিংটাও তুমিই দাও গিয়ে। তারপর না হয় মেয়ে দেয়ার কথা ভাববো!"

আফজাল সাহেব মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন,

"পুরুষদের একটু মা*রকুটে স্বভাব থাকা ভালো। বউয়ের দিকে অন্যকেউ চোখ তুলে তাকালেও সেই চোখ উ*পড়ে ফেলার ক্ষমতা রাখতে হয় তাদের।"

দ্বীতি বললেন,

"আর ভাগ্নার পক্ষে বলা লাগবে না। তুমি রাজি হয়ে গেছো, সেটা বুঝতেই পেরেছি। এখন সবাই রাজি থাকলে আমি আর নতুন করে কি বলবো? কিন্তু কিন্তু.."

আফজাল সাহেব চোখ তুলে চাইলেন। আগ্রহী হয়ে শুধালেন,

"কিন্তু কি?"

দ্বীতি বেগম বেশ চিন্তিত হয়ে বললেন,

"তোমার ভাগ্নাও বদমেজাজি আর তোমার মেয়েও। গত কিছুদিনেই এরা যা কাহিনি করেছে, তা তো শুনলামই! বিয়ে দিয়ে দিলে কি করবে এরা?"

আফজাল সাহেব নিশ্চিত ভঙ্গিতে বললেন,

"কি করবে, সেসব আমরা চিন্তা করে কি করবো? আমাদের বাড়িতে তো আর থাকছে না! থাকলে মালেকার বাড়িতে, যা হবে ও-ই বুঝে নেবে। এই কয়দিন যেভাবে বুঝেছে।"

দ্বীতি বেগম বললেন,

"তাহলে আর কি! আল্লাহ যেখানে জোড়া রেখেছে, সেখানেই। কিছুদিন যাক। তোমার ভাগ্না ভার্সিটি লাইফ শেষ করে একটু ভদ্র হোক। তারপর না হয় বিয়ের কথা বলবো?"

আফজাল সাহেব বললেন,

"দ্বীতি, আমি হঠাৎ করেই ওদের বিয়ের সিদ্ধান্তটা নিয়েছি মায়ের জন্য৷ জানোই তো, মা আজকাল খুব অসুস্থ থাকে। যদি বিয়ে দিতেই হয়, তাহলে মায়ের কোনোকিছু হওয়ার আগেই তার শখটা পূরণ করে দেই। অন্ততপক্ষে অল্প আয়োজনে কাবিন করিয়ে রাখি। পরে অনুষ্ঠান করে নিবো সময়-সুযোগ বুঝে। তুমি রাজি থাকলে, আজ সন্ধ্যায়-ই আলাপ করে ফেলি?"

দ্বীতি বেগম বেশ কিছুক্ষণ ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

"যেমন তুমি ভালো বুঝো তাই করো! কিন্তু.."

"আবার কিসের কিন্তু?"

অধৈর্য শোনালো আফজাল সাহেবের কন্ঠস্বর। দ্বীতি বেগম বিপরীতে শান্ত স্বরে বললেন,

"কোনোভাবে মেয়ের জীবনটা নষ্ট করে দিচ্ছি না তো?"

আফজাল সাহেব স্ত্রীর দু'গালে হাত রেখে স্বান্ত্বনার সুরে বললেন,

"আল্লাহর উপর ভরসা রাখো। যা হবে, ভালোই হবে। আর সত্যি বলতে, বিয়েটা সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। উনি চাইলে হয়ে যাবে। আর না চাইলে আমরা হাজার চেষ্টা করলেও কোনোদিনও বিয়েটা হবে না। বুঝতে পেরেছো?"

দ্বীতি বেগম মাথা নাড়লেন। আস্তে করে বললেন,

"ভালো কিছুই হোক!"

**********

সন্ধ্যা পেরিয়ে অন্ধকার নেমেছে ধরনীতে। সন্ধ্যা হতেই শায়রা ফিরে এসেছে বাড়িতে। কিন্তু ফাইজানের আসার কোনো খবর ছিলো না। শেষে ফোন করে ডেকে আনা হয়েছে তাকে।

ড্রইংরুমে ছোটখাটো একটা আলোচনা সভা বসে গেছে। আফজাল সাহেব এখনো পরিষ্কার করে কিছুই বলছেন না। সবাই উৎকন্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছে ঘটনা জানার জন্য। আফজাল সাহেব শুরুতেই সে আলাপে গেলেন না। অন্য প্রসঙ্গ ধরলেন কথা বলার জন্য,

"বলছিলাম মালেকা, সিলেটে তো এলিই অনেকদিন পর। কয়েকটা দিন আমাদের এখানে থেকে যেতি।"

মালেকা বেগম একবার স্বামীর চেহারার দিকে তাকিয়ে ঘুরলেন ভাইয়ের দিকে। জবাবে জানালেন,

"আমিও তো থাকতে চেয়েছিলাম, কিন্তু উনার যে ব্যবসা ছেড়ে এসেছেন। আবার ফাইজান, শায়রার ভার্সিটি, আনুসার কলেজ। সব রেখে এখানে থাকি কি করে? আমরা না হয় এইবার ঈদের ছুটিতে সিলেটে এসে থাকবো। কিন্তু এইবার যেতেই হবে। আগামীকালই চলে যাবো ঢাকা।"

আফজাল সাহেব হতাশ শ্বাস ফেলে বললেন,

"কয়েকটা দিন থাকলে কি হয়? আসিস না তো সবসময়। আর আসলেও শুধু যাই-যাই করিস।"

ফজল আহমেদ মৃদু হেসে বললেন,

"ভাইয়ার কি এইবার মেয়েকে ছাড়তে মন চাইছে না? কিন্তু কি করার? পড়াশোনা আছে যে। আমি চাই না কোনো কারণে ওদের পড়াশোনার কোনো ক্ষতি হোক।"

সস্থির লুকায়িত নিশ্বাস বেরিয়ে এলো দ্বীতির শ্বাসনালী ফুঁড়ে। যাক, অন্ততপক্ষে তার মেয়েটার পড়াশোনা নিয়ে তো ওরা চিন্তা করছে!

আফজাল সাহেব সময় নিয়ে মনে মনে কথা সাজালেন। অতঃপর বললেন,

"আমি অন্য কারণে থাকার কথাটা বলছিলাম। দু-একদিন থেকে গেলে যদি বেশি সমস্যা হয়, তাহলে তো কিছু করার নেই।"

মালেকা বেগম বললেন,

"ভাইয়া, থাকার সুযোগ থাকলে তো অবশ্যই থাকতাম। কিন্তু বাচ্চাদের পড়াশোনা, উনার কাজ, সব ফেলে তো থাকা যায় না! এজন্যই ভেবেছি কাল বিকেলেই চলে যাবো।"

ফজল সাহেব সন্দিহান দৃষ্টিতে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

"ভাইয়া বলছিলেন, কোনো কারণে থাকার কথা বলছিলেন। কারণটা কি, জানতে পারি?"

আফজাল সাহেবের আর কারণটা বলা হলো না। কলিংবেলের আওয়াজে সকলের মনোযোগ ঘুরে গেলো সেদিকে। শায়রা উঠে গেলো গেট খুলতে। দরজার খুলতেই ফাইজানকে দেখে জিজ্ঞেস করলো,

"এতক্ষণ কোথায় ছিলে? ঢাকার মতো এই সিলেটেও কয়টা পার্টনার জোগাড় করে রেখেছো? আসলেই তাদের সাথে গিয়ে রাস্তায় বসে থাকো। বাড়িতে তো দেখাই যায় না।"

ফাইজান কটমট করে বলল,

"রাস্তায় বসে থাকি, গাছে চড়ে বসে থাকি, গাছের নিচে বসে থাকি তাতে তোর কি? এখন কি এজন্য তোদের বাড়িতেও ঢুকতে দিবি না? বল তো এখনই ঢাকা ব্যাক করি আমি।"

শায়রা আঙুল উঁচিয়ে শাসানোর ভঙ্গিতে বলল,

"আমাকে কি তোমার মত অভদ্র মনে হয়? যে বাসায় আসা মেহমানকে বাসা থেকে চলে যেতে বলবো? এতটুক ভদ্রতা আমি জানি। তোমার মতো অভদ্র নই।"

ফাইজান ফটাফট বলে দিলো,

"তুই আমার মত না, আমার চেয়েও বড় অভদ্র। তাই তো আমার বাড়িতে আমাকেই ঢুকতে দিস না।"

এ পর্যায়ে ফজল সাহেব চেঁচিয়ে বললেন

"আহা, কি শুরু করেছো তোমরা? বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই ঝগড়া শুরু করে দিয়েছো? একটু চুপচাপ বসতে পারো না।"

দ্বীতি বেগম শায়রাকে চোখ রাঙিয়ে বললেন,

"শায়রা, চুপচাপ এদিকে এসে বস। তোকে এত জিজ্ঞাসাবাদ করতে কে বলেছে?"

ধমক খেয়ে দু'জনেই চুপ হলো। ভালো মানুষের মতো ফিরে এলো সোফার কাছে। ফাইজান এসেই ধপ করে বাবার পাশের খালি জায়গাটায় বসে পড়লো। তৎপর জিজ্ঞেস করলো,

"কি হয়েছে? হঠাৎ এত জরুরি তলব কেন?"

শায়রা গুটিগুটি পায়ে এসে বাবার পেছনে দাঁড়িয়েছে। আচমকা ঘরের পরিবেশ কেমন গুরুগম্ভীর রুপ ধারন করলো। এমন মুহুর্তে শায়রার চুপ থাকাই উত্তম মনে হলো। পুতুল বনে দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করতে লাগলো বাবার কথা শোনার জন্য।

আফজাল সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে প্রথম প্রশ্নটা করলেন,

"ফাইজান, পড়াশোনার পর তোমার কি করার ইচ্ছে আছে? মানে চাকরী বা বিজন্যাস? ফিউচার প্ল্যান জিজ্ঞেস করছি আরকি!"

ছেলের হয়ে ফজল সাহেব তড়িৎ গতিতে উত্তর দিলেন,

"চাকরী কেন করবে? আমার বিজন্যাস আছে না? সেটার হাল ধরবে ফাইজান। আমি তো বুড়ো হচ্ছি, আজ আছি কাল নেই। ব্যবসা ছেলের হাতে দিয়েই তো নিশ্চিন্তে ম*রতে পারবো।"

মৃ*ত্যুর কথা বলে সরাসরি ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল। ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেই ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ফাইজান। ওর ছন্নছাড়া জীবনে যে এই বিজন্যাস নামক বিপদ মাথায় চাপবে সেটা আগে থেকেই জানা ছিলো। এখন কিছুদিন যে জীবনটাকে উপভোগ করে নিবে, সেটাও হচ্ছে না এদের জ্বালায়।

আফজাল সাহেব পুনরায় বললেন,

"ভাইয়া, আমি ফাইজানকে জিজ্ঞেস করেছি। ওর মতামতও শুনি।"

ফাইজান শুধু বলল,

"বাবা যা বলেছে সেটাই।"

বলেই সোফায় গা এলিয়ে দিলো। মাথা পেছন দিকে এলিয়ে চোখ বন্ধ করে মনে মনে ভাবলো,

"ফিউচার প্ল্যান যাই হোক, কিন্তু বিয়ে নয়। বিবাহ করা যাবে না। সব সম্ভব, মানুষের সাথে লাইফ শেয়ার সম্ভব নয়।"

বেচারার ভাবনায় এক বালতি পানি ঢেলে আফজাল সাহেব বলে বসলেন,

"মায়ের ইচ্ছেমতো আমি চাইছিলাম ফাইজান আর শায়রার বিয়েটা দিয়ে দিতে। এজন্যই কিছুদিন সময় চাচ্ছিলাম। কিন্তু তোমাদের পক্ষে যখন সম্ভব নয়, তখন জোর করবো না। তবে মায়ের চোখের সামনে আগামীকাল বিকেলে ওদের আকদ করিয়ে রাখতে চাইছি। তোমাদের কি মতামত?"

বসার ঘরটায় ছোটো-খাটো একটা বজ্রপাত হলো যেন। আনুসা খুশিতে লাফিয়ে উঠেছে প্রায়। ফজল সাহেব আর মালেকা দুজনেই খুশি হয়েছেন কথাটা শুনে। তবে ফাইজান ও শায়রার অবস্থা সবচেয়ে বেশি শোচনীয়। শায়রা চোখ পিটপিট করছে ঘটনা বোঝার চেষ্টায়। কিন্তু মাথায় ঢুকছে না, তার বাবার কথা সত্যি, নাকি সে সপ্ন দেখছে? অন্যদিকে ফাইজান তো একপ্রকার লাফিয়ে উঠে বসেছে। চোখ দু'টো বড়বড় হয়ে গেছে আকস্মিক ধাক্কাটায়।

মালেকা বেগম আড়চোখে একবার চাইলেন স্বামীর দিকে। দু'জনের চোখাচোখি হতেই দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকালেন ভাইয়ের দিকে। ঢোক গিলে বললেন,

"তো ভাইয়া, কালকেই আকদ করাবে?"

আফজাল সাহেব ঘোষণার মত করে বললেন,

"হ্যাঁ, মা যেহেতু চাইছে ওদের বিয়েটা দেখতে তাহলে তার চোখের সামনেই বিয়েটা দিয়ে দেই। ডক্টর কাল কি বলল, শুনলিই তো। এজন্য চাচ্ছিলাম আগামীকাল আকদ করিয়ে দেই, পরে না হয় সবাইকে দাওয়াত করে অনুষ্ঠান করে দিবো। কি বলিস?"

ফজল সাহেব বেজায় খুশি হলেন ব্যাপারটায়। তবে খুব একটা প্রকাশ করলেন না সেসব। ধীরে-সুস্থে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,

"করাই যায়। আপনারা যেহেতু বলছেন তাহলে আগামীকালই ফাইনাল। বিকেলে আকদ করিয়ে আমরা না হয় সন্ধ্যাতেই বউ নিয়ে যাবো। বছরখানেক পর ফাইজানের মাস্টার্স শেষ হলে রিসেপশন করবো।"

ফাইজান হতভম্ব হয়ে বলল,

"একি! আমাদের বিয়ের কথা বলছো অথচ একবারো আমাদের কিচ্ছু জিজ্ঞেস করলে না? আমাদের কি কোনো দাম নেই?"

মালেকা বেগম আশ্চর্য বনে বললেন,

"সেসব তোদের জিজ্ঞেস করতে যাবো কোন দুঃখে? আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ওটা চুপচাপ মেনে নিবি। ছোট মানুষের এত কথা কিসের?"

শায়রা কাঁদোকাঁদো মুখ করে বলল,

"তো ছোট মানুষকে বিয়ে দিতে চাইছো কেন, ফুপ্পি? তোমার ওই খা*টাশ ছেলেকে আমি বিয়ে করবো না।"

ফাইজান ধমকে উঠলো,

"মুটকি, তুই চুপ। কত্ত বড় সাহস আমাকে খা*টাশ বলে! আমি খা*টাশ হলে তুই খা*টাশের নানি, খা*টাশ স্কয়ার।"

শায়রা চেঁ*তে গিয়ে বলল,

"তুমি খা*টাশ টু দি পাওয়ার ফোর!"

দ্বীতি অতিষ্ঠ হয়ে বললেন,

"চুপ কর তোরা দুইজন। আমরা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ভেবে-চিন্তেই নিয়েছি। বড়রা যা সিদ্ধান্ত নিবে সেটা তোমাদের ভালো বুঝেই নিবে। তাই বাক-বিতন্ডা না করে বিয়ের প্রস্তুতি নাও। আগামীকালই তোমাদের বিয়ে।"

*********

রাত্রি বারোটার প্রহর পেরিয়ে গেছে। বাড়ির সকলেই এতক্ষণে গভীর নিদ্রায় মগ্ন। কাল সকাল থেকে আবার শুরু হবে বিয়ের প্রস্তুতি। যদিও আকদ করা হবে বলে তেমন কাউকেই দাওয়াত দেয়া হয় নি। তাও কাজ তো থাকেই। তার উপর আকদ শেষে আগামীকাল সন্ধ্যায়-ই ফজল সাহেব সপরিবারে ঢাকা ফিরে যাবেন। তবে এইবার পুত্রবধূসহ।

কিন্তু তার গুনধর পুত্র ও হবু পুত্রবধূ এই বিয়ে করতে নারাজ। ওইসময় বসার ঘরে প্রচুর ঘ্যানঘ্যান করেছে দু'জন। কিন্তু কোনো লাভ হয় নি। শায়রা কেন বিয়ে করবে না এই বাহানায় ফাইজানের হাজার দোষ বর্ণনার ফাঁকে ফাইজান জেদ করে বলে বসেছে, সে বিয়েতে রাজি। এখন রাত্রি বাড়তেই তার হা-হুতাশের পরিমাণ বাড়ছে কেনও সেসময় জেদের বশে হ্যাঁ করে দিয়েছিলো!

আনুসা অনেকক্ষণ কথা বলে ঘুমিয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। ও ঘুমানোর পরপরই শায়রা বিছানা ছেড়েছে। বেশ বুঝতে পেরেছে আজ রাত্রে আর ঘুম আসবে না। গোটা রাত্রি নির্ঘুম কাটাতে হবে।

এই দুশ্চিন্তায় ঘরময় পায়চারী করতে করতে আচমকা মাথায় হানা দিলো ভয়ংকর বুদ্ধি।

সে এই বিয়ে করবে না। ফাইজানকে তো ভুলেও বিয়ে করবে না। আজকে ফাইজানের জেদের বশে হ্যাঁ করাতে শায়রার মাথায় এতটুক ঢুকেছে এই ব্যাটা নিশ্চিত ওর থেকে প্র*তিশোধ নিবে। তাই শুধু শুধু ফেঁসে যাওয়ার থেকে রাত্রির অন্ধকারে পালিয়ে যাওয়া ভালো!

********

ফাইজানও ঘুমায়নি এতক্ষণ। এখন ওর মনে হচ্ছে জেদের বশে "হ্যাঁ" করে কত বড় ভুল করে বসেছে। শায়রাকে বিয়ে করা মানে শুধু শুধু নিজের বিপদকে দাওয়াত দিয়ে, হাতে-পায়ে ধরে নিয়ে আসা। এটা সে কিছুতেই হতে দিবে না। প্রয়োজনে আজ রাতারাতি সিলেট ছেড়ে ঢাকা চলে যাবে। এখন কোনোভাবে বাড়ি থেকে পালাতে পারলেই হলো!

হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস পর্ব ১০ গল্পের ছবি