আফজালদের বাড়িটা একতলা। সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই মাঝারি সাইজের হলরুম। তার একপাশে ডাইনিং টেবিল অন্যপাশে সোফাসেট সাজানো। এছাড়া আছে চারটি বেডরুম। বর্তমানে একটি রুমে আফজাল সাহেব ও দ্বীতি আছেন। দ্বিতীয় রুমে ফজল সাহেব ও মালেকা বেগম। শায়রার রুমটায় শায়রা, আনুসা ও মনোয়ারা বেগম শুয়েছেন। অন্য রুমটায় ফাইজান। মধ্যরাতে ঘুমন্ত পুরীর ন্যায় নিস্তব্ধতার মধ্যেও শায়রা ও ফাইজান দু'জনেই জেগে।
সাধারণত আফজাল সাহেব রাত্রিবেলা সদর দরজা লক করে চাবি নিজের কাছে রাখেন। আজকেও তার ব্যতিক্রম নয়। সুতরাং দরজা দিয়ে পালানোর কোনো রাস্তা নেই। অতএব রাস্তা বাকি শুধু ছাদের। শায়রা একপ্রকার আশঙ্কা নিয়েই ছাদের দরজার কাছে গেলো। এবং সস্থির সাথে লক্ষ্য করলো, দরজায় তালা মারা নেই। হয়তো ভুলে গেছে আজ। এটাই তার জন্য সুবর্ণ সুযোগ।
শায়রা একটা ওড়না নিয়ে ছাদে গেলো। ভাবনা এটা দিয়েই একটুখানি বেয়ে নিচে নামলে তার রুমের বারান্দার গ্রিল ধরতে পারলেই কেল্লাফতে!
শায়রা ও ফাইজান। দু'জন দু'মেরুর মানুষ হলেও আজ অদ্ভুতভাবে তাদের ভাবনা মিলে গেলো। ফলাফলস্বরূপ শায়রার কিছুপরেই ফাইজানও এসে হাজির হলো ছাদে। ফাইজান ওকে ছাদে দেখেই হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলো। জিজ্ঞেস করলো,
"কিরে, মুটকি? তুই এত রাতে ছাদে কি করছিস?"
ফাইজানের কন্ঠস্বর পেয়ে ঘুরলো শায়রা। এক মুহুর্তের জন্য থতমত খেলেও দ্রুত সামলে নিলো নিজেকে। ধাতস্থ হতেই কটমট করে বলল,
"বাড়ির বাইরের তেতুল গাছটায় আমার পে*ত্নী বান্ধবি বসে আছে। তার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। যত্তসব!"
ফাইজানের মেজাজ চড়ে গেলো। ঠিক শায়রার মতো ত্যাড়া উত্তর দিলো,
"কাল থেকে পেত্নীর সাথে তেতুল গাছের উপর বসে মানুষের ঘাড় ম*টকানোর ডিউটি করবি নাকি?"
শায়রা দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
"প্রয়োজনে তাই করবো। তবুও তোমাকে বিয়ে করবো না। এজন্যই পালিয়ে যাচ্ছি।"
ফাইজান অ*গ্নিদৃষ্টিতে শায়রার দিক চেয়ে বলল,
"আমারও কোনো শখ নেই তোকে বিয়ে করার। এজন্যই রাতারাতি পালিয়ে ঢাকা চলে যাবো। পরিস্থিতি ঠান্ডা হওয়ার আগে বাড়িতেই ঢুকবো না।"
শায়রা ফাইজানকে বিশেষ পাত্তা দিলো না। অন্যদিকে ঘুরে ব্যস্ত হলো নিজের কাজে। অতিরিক্ত নিয়ে আসা ওড়নাটা ছাদের একপাশের স্টিলের রেলিং-এ বাঁধতে বাঁধতে বলল,
"যেখানে মন চায় যাও। আমি আগে পালাবো। সরো সামনে থেকে।"
ফাইজান হুট করে ওড়নায় টান বসালো। বলল,
"আগে আমি পালাবো। ওড়নাটা আমার কাছে দে।"
শায়রা কপাল কুঁচকে তাকালো ফাইজানের দিকে। বলল,
"পালানোর বুদ্ধি আমার, ওড়না আমার, তাই আমি আগে পালাবো। সরো।"
ফাইজান 'চ' সূচক শব্দ করে বলল,
"না। আমি আগে পালাবো। তুই যেই মুটকি, তোর ভারে যদি ওড়নাটা ছিড়ে যায় তাহলে আমি পালাবো কি করে? এরচেয়ে ভালো আমি আগে পালাই।"
শায়রা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বলল,
"আমার ওড়না ব্যবহার করে পালাতে চাইছো আবার আমাকেই মোটা হওয়ার খোটা দিচ্ছো। তুমি তো মীর জাফরের ডিজিটাল ভার্সন!"
ফাইজান বিতৃষ্ণায় নাক-মুখ কুঁচকে বলল,
"দেখ ভাই, ওতসব গবেষণা করতে পারবো না। আগে আমাকে যেতে দে।"
শায়রা বলল,
"আমি আগে যাবো। তারপর তুমি যাবো। ওড়না নিয়ে টানাটানি করতে করতে রাত পেরিয়ে গেলে এই ভাই ডাকের থেকে বউ ডাক হয়ে যাবে। যেটা আমি একদম চাচ্ছি না।"
তর্ক-বিতর্ক অবিরাম চলছে দু'জনের মধ্যে। এরমধ্যে দু'জনের হাতেই ওড়না। একপাশ থেকে শায়রা টানছে অন্যপাশ থেকে ফাইজান। এর ফলে কখন যে সেটা রেলিং থেকে খুলে গেছে সেসবে খেয়ালই নেই তাদের। তারা নিজের মত ঝ*গড়ায় ব্যস্ত। কেউ-ই কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়।
*********
কোনো এক অজ্ঞাত কারণে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো ফজল সাহেবের। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ জানান দিচ্ছে সময় একটার কাছাকাছি। পানির পিপাসা অনুভূত হতেই উঠে বসলেন তিনি। পানির খোঁজে গেলেন টেবিলের কাছে। কিন্তু জগ খালি। অগত্যা মধ্য রাত্রির অন্ধকারেই তাকে বের হতে হলো রুমের বাইরে।
ফজল সাহেব ডাইনিং রুমে এসে সবেমাত্র টেবিল থেকে গ্লাস ও জগটা তুলেছেন। তৎক্ষনাৎ থমকে গেলেন কোনোকিছুর শব্দ পেয়ে। রাত্রির নিস্তব্ধতা এতটাই গাঢ় যে ছাদ থেকে আসা শব্দগুলো আবছা বোঝা যাচ্ছে। প্রকৃতিগত স্বভাবেই যে ভাবনা প্রথমে মাথায় আসলো তাতে গায়ের রক্ত ঠান্ডা হওয়ার জোগাড়। গায়ের পশমগুলোও কেমন হুড়হুড় করে দাঁড়িয়ে গেলো মুহুর্তেই।
ভদ্রলোকের আর পানি খাওয়া হলো না। গ্লাস আর জগটা ওভাবে রেখেই দ্রুত পা ফেলে রুমে আসলেন। তড়িঘড়ি করে শুতে যাবেন সেসময় তার নড়াচড়ায় ঘুম ভেঙে গেলো মালেকা বেগমের। তিনি চোখ অল্প খোলা অবস্থাতেই ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললেন,
"এত রাত্রে কই গিয়েছিলে?"
ফজল সাহেব ঢোক গিলে বললেন,
"পানি খেতে গিয়েছিলাম। কিন্তু খাওয়া হলো না।"
মালেকা বেগম বহু কষ্টে একটু চোখ খুলে চাইলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
"খাও নি কেন?"
ফজল সাহেব বললেন,
"ছা..ছাদের দরজা কি আজ খোলা রেখে এসেছিলে তোমরা? ম..মনে হলো ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে আ..আর ছাদে কারো শব্দ পাওয়া যা..যাচ্ছে।"
ঘুম উড়ে গেলে ভদ্রমহিলার। ধড়ফড় করে উঠে বসলেন বিছানায়। বিস্মিত সুরে বললেন,
"ছাদের দরজা খোলা? আমরা তো বিকেলে ছাদ থেকে কাপড় নিয়ে আসার পর বাইরে থেকে লাগিয়ে এসেছিলাম।"
ফজল সাহেব ধাতস্ত করলেন নিজেকে। বললেন,
"ছাদের দরজা লাগানো থাকলে ভেতরে ঠান্ডা বাতাস আসলো কোত্থেকে? সব দরজা-জানালাই তো বন্ধ। আবার আওয়াজ? সেটাই বা কিসের?"
এসব ব্যাপারে আবার অদম্য আগ্রহ মালেকা বেগমের। আগ্রহী হয়ে এগিয়ে এলেন স্বামীর দিকে। কৌতুহলে চকচক করছে চোখদু'টো। ফজল সাহেবকে অবাক করে দিয়ে তিনি বলে বসলেন,
"চলো ছাদে গিয়ে দেখে আসি দরজা খোলা নাকি বন্ধ। আর আওয়াজটাই বা কিসের!"
ভদ্রলোকের চোখ বড়বড় হয়ে গেলো বিস্ময়ে। হতভম্বতার সুরে বললেন,
"তোমার মাথা খারাপ? এত রাত্রে তুমি ছাদে যাবে?"
মালেকা বেগম ভ্রু কুঁচকালেন। বললেন,
"এই বুড়ো বয়সে তুমি ভূতে ভয় পাচ্ছো? এসব কি তোমাকে মানায়?"
ফজল সাহেব জবাবে বললেন,
"তোমাকে কে বলেছে আমি ভূতে ভয় পাচ্ছি? চোর-ও তো হতে পারে তাই না? যদি ওদের হাতে কিছু থাকে? তাহলে কি প্রাণ দিতে যাবো নাকি আমরা?"
"যদি সত্যি সত্যি চোর হয় আর ছাদের দরজা খোলা থাকে তাহলে একটু পর এমনিতেও এসে প্রাণ নিবে। তারচেয়ে ভালো না আমরাই এগিয়ে যাই। তাহলে প্রতিরোধের উপায় থাকবে। দারুন এডভেঞ্চার হবে না?"
অকাট্য যুক্তি। এর বিপরীতে বলার মতো কিছু খুঁজে পেলেন না ফজল সাহেব। শেষমেশ স্ত্রীর জোরাজুরিতে একপ্রকার অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠতে হলো তাকে। ডাইনিং রুমে এসে সিঁড়ির দিকে উঁকি দিতেই ঠান্ডা বাতাসের তোড় অনুভব করতে পারলেন মালেকা বেগম। অর্থাৎ ছাদের দরজাটা বোধহয় খোলাই। এতক্ষণ হম্বিতম্বি করলেও এখন ঠিকই ভয় পেতে লাগলেন তিনি। শেষে সাহসে না কুলাতেই কড়া নাড়লেন ভাইয়ের রুমের দরজায়।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। খানিক বাদেই দরজা খুলে বাইরে আসলেন দ্বীতি বেগম। তিনিও যে কাঁচা ঘুম ভেঙে উঠে এসেছেন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। হাই তুলতে তুলতে বললেন,
"কি হয়েছে আপা? এত রাত্রে তোমরা জেগে আছো যে?"
মালেকা বেগম ফিসফিস করে পুরো ঘটনা বললেন। দ্বীতির ঘুমও চোখের পাতা ছেড়ে দূরে পালালো। বিস্মিত হয়ে বলল,
"বিকালে না ছাদের দরজা লাগিয়ে আসলাম? এখন খোলা কি করে?"
আফজাল সাহেবও উঠে এসেছেন বিছানা ছেড়ে। তাদের কথা শুনে অবাক বিস্ময়ে বললেন,
"তাহলে তো চেক করতে হচ্ছে। আমরা এতবছর ধরে এই বাড়িতে আছি, এরকম কোনো ঘটনা তো আগে ঘটে নি। না চো*র-ডা*কাত না ভৌতিক কিছু ঘটেছে। তাহলে আজ এসব কি করে?"
মালেকা বেগম প্রস্তাব রাখলেন,
"কোনো গন্ডগোল আছে, ভাইয়া। এক কাজ করি। আমি আর ফাইজানের আব্বু উপরে যাই। গিয়ে দেখি কি হচ্ছে? আর তোমরা ব্যাকআপ হিসেবে নিচে থাকো। দুই মিনিট পর আমরা নিচে না আসলে তোমরা উপরে যাবে। ঠিক আছে?"
রাজি হয়ে গেলেন তারাও। এরপর ফজল সাহেব ও মালেকা বেগম দু'জনেই সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলেন উপরে। মালেকা বেগম আবার হাতে বেলনও নিয়েছে। সাবধানের মা*র নেই।
ছাদের দরজা পেরিয়ে ভেতরে তাকাতেই হতভম্ব হয়ে গেলো দু'জন। দু'জনের মুখ ফুড়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো,
"ফাইজান!"
"শায়রা!"
ফজল সাহেব শুরুতেই নিয়েছেন ছেলের নাম। আর মালেকা বেগম নিয়েছে ভাতিজির নাম। অন্যদিকে দু'জনের কন্ঠস্বর পেয়ে থতমত খেয়ে গেছে ফাইজান ও শায়রা। দরজার দিক ঘুরে তাদের দেখেই ঘাবড়ে গিয়ে চোখের পলক পর্যন্ত ফেলতে ভুলে গেছে। এরমাঝে দু'জনের হাতে থাকা ওড়নাটা ফঁসকে নিচে পড়ে গেছে। হা করে নিষ্পলক সামনে তাকিয়ে আছে শুধু।
ফজল সাহেব ও মালেকা বেগম মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন একে-অপরের। অতঃপর ফজল সাহেব এগিয়ে এসে বললেন,
"এত রাতে তোমরা দু'জন ছাদে কি করছো?"
কিছু মুহুর্তের জন্য কথা হারিয়ে ফেলল দু'জন। হুশে আসতেই আড়চোখে চাইল একে অন্যের দিকে। শায়রা কোনোরূপ ঢোক গিলে সাফাই দিলো,
"আসলে ফুপা, কাল তো ঢাকা চলে যাবো। বাড়িটাকে মিস করবো, তাই একটু ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। দেখতে দেখতে ছাদে এসে পড়েছি।"
শায়রার থেকে উত্তর পেয়েই দু'জনে ঘুরলেন ফাইজানের দিকে। ভ্রু নাচিয়ে শুধালেন,
"আর তোর কি বাহানা?"
ফাইজান ঘটনার আকস্মিকতা সামলে নিতেই নিজের চিরাচরিত রুপে ফিরে এলো। নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
"ঘুম আসছিলো না। তাই ছাদে হাওয়া খেতে এসেছিলাম। এখন ঘুম আসছে, তাই রুমে ঘুমাতে যাচ্ছি।"
বলেই গটগট করে হাঁটা দিলো সেখান থেকে। শায়রাও ক্যাবলার মতো দাঁত কেলিয়ে পাশ কাটালো। ওরা চলে যেতেই নিচে পড়া ওড়নাটা হাতে উঠালেন ফজল সাহেব। ভ্রু কুঁচকে ওড়নার দিক চেয়ে বললেন,
"শায়রার পড়নে ছিলো একটা ওড়না, এখানে আরেকটা। ও দু'টো ওড়না নিয়ে কেন এসেছে?"
দু'জনেই একপ্রকার পালিয়ে নিচে নেমে এসেছে এক দম্পতির হাত থেকে। নিচে নামতেই মুখোমুখি হলো আরও দুইজোড়া সন্দিহান দৃষ্টির। দ্বীতি হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
"তোরা দু'জন ছাদে ছিলি? তোদের শব্দই আসছিলো বুঝি? আর সবাই ছাদ থেকে কথার শব্দ পেয়ে কি না কি ভেবে বসেছিলো! তা এত রাতে তোরা ছাদে গেছিলিই বা কেন?"
শায়রা উত্তর দেয়ার আগেই ফজল সাহেব সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে শুধালেন,
"এত রাতে কেন গিয়েছিলো সেটা না হয় একটু পর বলবে। আগে বলো, এক্সট্রা ওড়না কেন নিয়ে গিয়েছিলে? কাকে বাঁধতে?"
দুশ্চিন্তার সাগরে হাবুডুবু খেলো মেয়েটা। একটুখানি আশার আলো পেতে তাকালো ফাইজানের দিকে। কিন্তু ওর নিরুদ্বেগ ভাব-ভঙ্গি স্পষ্ট বলে দিচ্ছে, এই মামলায় সে কোনো সাহায্য করবে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে তামাশা দেখবে শুধু৷
শায়রা মনে মনে বলল,
"এত বড় ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পর উনি এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন ভাজা মাছও উলটে খেতে জানে না। আরে হ*তচ্ছাড়া, তুই নিজেও তো পালানোর প্ল্যানিং নিয়েই ছাদে গিয়েছিলি। তাহলে তুই কেন পারছিস না কিছু সাজিয়ে বলতে? সব আমার ঘাড়ে চাপিয়ে ভালো মানুষ সেজে আছে!"
শায়রার ওই মনে মনে দেয়া গা*লিগুলোতে ফাইজান পাত্তা দিলে তো? তার মধ্যে উত্তর দেয়ার কোনো তাড়া নেই। শুধুমাত্র দাঁড়িয়ে থাকতে হয় বলেই এখানে দাঁড়িয়ে থাকা। নাহলে কবেই গিয়ে শুয়ে পড়তো বিছানায়।
ফজল সাহেব দু'জনকে চুপ দেখে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,
"কি হলো? উত্তর দিচ্ছো না কেন তোমরা?"
আচমকা বিদ্যুৎ স্পর্শের মতো বুদ্ধি খেলে গেলো শায়রার মাথায়। ওড়না, কথার শব্দ, সব মিলিয়ে সুন্দর একটা কাহিনি সাজালো মনে মনে। পরমুহূর্তে উগলে দিলো সেটাই,
"তোমরা যেমন শব্দ শুনে ছাদে গিয়েছিলে, কে আছে দেখতে? আমিও সেরকমই গিয়েছিলাম। শব্দ পেয়ে ভাবলাম যদি ভূত হয়? তাই ওড়না নিয়ে গেছি ভূতকে বেঁধে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দিবো। আমার পরপর এই বাউন্ডুলেটাও শব্দ পেয়েই ছাদে গেছে।"
ফজল সাহেব কথা বোঝার ভঙ্গিতে ভ্রু উঁচালেন। বাচ্চাদের মতো যুক্তিটা শুনে হাসি চেপে বললেন,
"ভূতকে বেঁধে ছাদ থেকে ফেলে মারতে চাইছিলে, তাই তো? কিন্তু আমি তো এতদিন জানতাম মানুষ মরলে ভূত হয়। সেই ভূতকেও যে আবার মারা যায় তা জানতাম না। বুঝলাম, আমার জানায় অনেক ঘাটতি আছে।"
বাকিরাও মুখ চেপে হাসতে শুরু করেছে। নার্ভাসনেসে কি বলে বসেছে সেটা টের পেতেই লজ্জা পেলো শায়রা। ততক্ষণে সবাই নিজের মতো একটা ধারনা করে নিয়েছে। ভেবেছে, ওরা হয়তো একে-অপরকে পছন্দ করে কিন্তু মুখে স্বীকার করে না। তাই রাত্রিবেলা ছাদে দেখা করতে গিয়েছিলো। আর ওরাই ওদের প্রেমে ঢুকে বাগড়া দিয়েছে। মালেকা বেগম হাসি থামিয়ে বললেন,
"থাক, আর বলতে হবে না। বুঝতে পেরেছি আমরা। কাল তো বিয়ে হয়েই যাবে। তারপর সারারাত দু'জনে মিলে ছাদে বসে ভূতকে পি*টাবি কি ফেলে দিবি তোদের ব্যাপার। আজকের জন্য সমাপ্তি দে। এখন ঘুমাতে যা।"
পালানোর সুযোগ হাতে এসে ধরা দেয়ার পর সেটাকে যেতে দেয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ না। তাই ভালো বাচ্চাদের মতো মাথা নেড়ে দু'জনেই হাঁটা দিলো রুমের দিকে। পাশাপাশি রুমদু'টোর দরজার কাছে আসতেই ফাইজান বলল,
"তোকে বিয়ে করা যাবে না। দেখা যাবে আমার ভবিষ্যৎ বাচ্চাকে শিখাবি, মানুষ মরলে ভূত হয় আর ভূত মরলে আবার মানুষ হয়। এরকম বেশি জানা মা দিয়ে তো আমি আমার বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ আর নষ্ট করতে পারি না!"
বলেই ঘরে ঢুকে দুম করে দরজা লাগিয়ে দিলো। শায়রা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিয়ৎক্ষণ। অতঃপর বিড়বিড়িয়ে বলল,
"হায় আল্লাহ! আমি একে বিয়েই করতে চাচ্ছি না আর ও বাচ্চা পর্যন্ত ভেবে নিচ্ছে?"
*******
দু'জনে নিজেদের রুমে যাওয়ার পর ফজল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"আমার বারবার মনে হচ্ছিলো, ওদের উপর আমাদের সিদ্ধান্তটা জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছি না তো? ওরা এই বিয়েতে সুখী হবে তো?
কিন্তু আমার ধারনা ভুল প্রমাণ করে দিলো ওরা। আজ একসাথে ছাদে না দেখলে তো বুঝতামই না ওদের মুখে এক, মনে আরেক। যাক, আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে।"
প্রত্যেকেই সম্মতি পোষণ করলো কথাটায়। দ্বীতি বেগম বললেন,
"হ্যাঁ। এখন আগামীকাল ভালোয় ভালোয় ওদের আকদটা হয়ে গেলেই হলো।”