হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস

পর্ব - ১৫

🟢

ঝলমলে এক সকালে ভার্সিটির একপাশে মাঠের বিরাট বটগাছের নিচে প্রতিদিনকার ন্যায় আড্ডা জমিয়েছে রিজভী, শুভ, আহাদ৷ নিজের বাইকের উপর বসে আছে রিজভী। বাকিরা দুইপাশে দাঁড়ানো। আলাপ চলছে ফাইজানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে।

শুভ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,

"তিনদিন আগে বলল, সিলেট যাচ্ছে। সেই যে সিলেট গেলো একদম লাপাত্তা!"

আহাদ তাল মিলিয়ে বলল,

"তাও তো প্রথমদিন পৌঁছানোর পর কথা হয়েছিলো আমাদের। দু'দিন ধরে তো সেটাও বন্ধ। কোথায় হারালো ও?"

রিজভী বলল,

"ব্যাটা বিয়ে করে বউ নিয়ে হানিমুন করছে বোধহয়৷ এজন্য আমাদের ভুলেই গেছে।"

"ফাইজান এসেছে।"

তৎপর ভার্সিটির গেটের সামনে আবির্ভাব হলো ফাইজানের বাইকের। পেছনে বসা শায়রা। প্রথমেই শুভর চোখে পড়লো এ দৃশ্য৷ ওর কথায় বাকিরাও তাকিয়েছে গেটের দিকে। এরূপ দৃশ্যের সম্মুখীন হয়ে বিস্ময়ে হা হয়ে গেলো সকলে। রিজভী তো একলাফে বাইক ছেড়ে নেমে গেছে। সে হতভম্ব হয়ে বলল,

"এ এতদিন লাপাত্তা থেকে আজকে একদম পেছনে নায়িকা নিয়ে হাজির? এই কয়দিন তো বড় গলাবা*জি করলো। আজকে আবার এইসব?"

আহাদ বলল,

"আসুক আগে। তারপর ধরছি ওকে।"

শায়রা ফাইজানের বাইকের পেছন থেকে নেমে কিছু একটা বলার জন্য হা করলো শুধু। ফাইজান তার আগেই বলল,

"একদম চুপ। কোনো কথা শুনতে চাচ্ছি না৷ সোজা নিজের ক্লাসে চলে যাবি আর ছুটি হলে বাসায়৷ এছাড়া যদি ভার্সিটিতে কোনো আহ্লাদীপনা করার চেষ্টা করেছিস, তাহলে তোকে তুলে আ*ছাড় মারবো। মাথায় থাকবে?"

শায়রা মুখ বাঁকাল। তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,

"খোলা চোখে সপ্ন দেখা বন্ধ করো। তোমাকে নিয়ে আহ্লাদী করার সময় আমার নেই। আমি নিজের ইচ্ছেতে বিয়ে করি নি যে সবার কাছে নিয়ে জামাইয়ের শো-অফ করবো।"

ফাইজান বলল,

"তোর উপর বিশ্বাস নেই। কাল থেকেই যা সব কান্ড-কারখানা শুরু করেছিস!"

শায়রা বিপরীতে বলল,

"আমি কিচ্ছু করি নি। আমার মতো ভালো মেয়ে এই শহরে কয়টা খুঁজে পাবে তুমি? সে তো তোমার সাত কপালে ভাগ্য আমার মতো বউ পেয়েছো। নাহলে কোনো পাগলীও বিয়ে করতো না।"

ফাইজান বিতৃষ্ণায় কপাল কুঁচকালো। বিড়বিড়িয়ে বলল,

"ভালো মানুষ আর পেলাম কই? সেই তো পাগলকেই বিয়ে করতে হলো।"

শায়রা সবে ঘুরেছিলো ভেতরে যাওয়ার জন্য। ফাইজানের কথায় থামতে হলো তাকে। পেছন ফিরে শুধালো,

"কি বললে তুমি?"

ফাইজান উত্তর দিলো,

"কিছু না। ক্লাসে যা।"

ক্লাস শুরুর সময় হয়ে যাওয়ায় শায়রা আর কথা বাড়ালো না। আশাকে দেখে ছুটে গেলো তার কাছে। শায়রা চলে যেতেই ফাইজানও এগিয়ে গেলো নিজের গ্রুপের দিকে। রিজভী ওকে দেখেই বলল,

"কিরে? মধুচন্দ্রিমা কেমন কাটলো?"

আকস্মিক এই প্রশ্নটায় একটা হৃৎস্পন্দন মিস করলো ফাইজান। থতমত খেয়ে গেছে পুরো। কারণ সে নিজের বিয়ের ব্যাপারটা এখনো বন্ধুদের জানায় নি। তন্মধ্যে এমন প্রশ্নে একটু বিস্মিত হওয়াই স্বাভাবিক। ভেবে কূল পাচ্ছে না তারা বিয়ের খবর জেনে গেলো কি করে?

ফাইজান নিশ্চিত হতে জিজ্ঞেস করলো,

"মধুচন্দ্রিমা? কিসের মধুচন্দ্রিমার কথা বলছিস তোরা?"

আহাদ সন্দিহান দৃষ্টিতে উপর-নীচ মেপে বলল,

"মধুচন্দ্রিমার কথা শুনতেই তোর মুখটা এমন শুকিয়ে গেলো কেন? সত্যি সত্যি কাজ-টাজ সেরে এসেছিস নাকি?"

রিজভী জোর গলায় বলল,

"দেখলি? আমি বলেছিলাম না যে বিয়ে করতে চায় না তারই আগে বিয়ে হয়। কিন্তু ফাইজানের থেকে এটা আশা করিনি। বললিও না আমাদের কিছু? এই এতদিনের বন্ধুত্বের পরিনাম? ছিঃ ভাই ছিঃ! ভীষণ কষ্ট পেলাম।"

ফাইজান কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। হা করে শুধু গিলে যাচ্ছে সবার কথা। মনের মধ্যে শুধু একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। সুদূর সিলেটের খবর এই ঢাকাবাসী জানলো কি করে?

আরও কিছুক্ষণ অভিনয়ের পর ফাইজানের অবস্থা দেখে হাসি চাপতে পারলো না তারা। হাসতে হাসতে শুভ বলল,

"হয়েছে, ভাই! বেচারাকে আর ঝটকা দিস না। ওর চেহারাটা দেখ একবার! মনে মনে ভাবছে, এরা বিয়ে ছাড়া আমার মধুচন্দ্রিমা কই পেলো?"

সস্থির নিশ্বাস নিলো ফাইজান। শুভের কথায় বোঝা গেলো তারা বিয়ে সম্পর্কে কিছুই জানে না। এতক্ষণ যা বলেছে তা শুধুই দুষ্টামী।

অতঃপর আহাদ বলল,

"আচ্ছা৷ সেসব যাক। কিন্তু তুই সিলেট গিয়ে একদম লাপাতা হয়ে গেলি কেন? আর তোর নানি, উনি ঠিক আছে?"

ফাইজান বলল,

"হ্যাঁ সব ঠিকঠাক আছে। এখন বাইরে চল, একটু ঘুরে আসি। আজ ক্লাস করার ইচ্ছে নেই।"

*********

ভার্সিটি ছুটির পরের সময়টা। ফাইজানরা এখনো ভার্সিটির পাশের অন্য একটা মাঠে আড্ডা দিচ্ছিলো। মাঠের সামনেটায় কয়েকটা ফুচকার ভ্যান রাখা। অগণিত স্টুডেন্ট সেখানে ভীড় করে ফুচকা, চটপটি খাচ্ছে।

আশা ও শায়রা মাত্র ভার্সিটি থেকে বেরিয়েছে। আশা খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে কিছু একটা বলছে শায়রাকে। শায়রাও মনোযোগ দিয়ে শুনছে সেটা।

"তুই সিরিয়াসলি উনার সাথে সংসার করবি? তোর মাথা ঠিক আছে? ভার্সিটিতে দেখিস না কি কি হয়? একটু উনিশ-বিশ হলেই মা*রামা*রি নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। রাস্তা-ঘাটে আড্ডা ছাড়া আর কিছু আছে?

দেখ শায়রা, আমি এই এলাকায় অনেকদিন আছি। তোর ওই কাজিন ওরফে বরকে আমার চেনা আছে। প্রেম-ভালোবাসাতেই যার কোনোদিন ইন্টারেস্ট ছিলো না, তার সংসারে আগ্রহ হবে? তোকে নিয়ে আমার অনেক টেনশন হচ্ছে!"

শায়রা মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলল,

"ধুর! এসব কোনো টেনশনের ব্যাপার হলো? বিয়ে হয়েছে তো কি হয়েছে? বাউন্ডুলে থাকবে নিজের মতো, আমি নিজের মতো। কথা শেষ।"

আশা চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,

"সারাজীবন নিজের মতো করেই চলবে? বিয়ে করেও এরকম সিঙ্গেল সিঙ্গেল লাইফ কাটাবি?"

শায়রা বলল,

"আশা, তোকে বলছি না এসব বাদ দিতে? এখন চল গিয়ে ফুচকা খাই।"

বলেই হাত টানতে টানতে নিয়ে গেলো তাকে একাধারে সাজিয়ে রাখা ফুচকার ভ্যানের পাশে। ভীড় কম দেখে একটা ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজলো ফাইজানকে। চোখে চোখ পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে গেলো শায়রা। অর্ডার করলো নিজেদের দু'প্লেট ফুচকা।

এক প্লেট ফুচকা শেষ হতেই দ্বিতীয় প্লেট অর্ডার দিলো শায়রা। আশা কিঞ্চিৎ বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

"দুইপ্লেট খাবি?"

শায়রা উত্তর দিলো,

"হ্যাঁ, খাবো। তোর কোনো সমস্যা?"

আশা ঘনঘন মাথা নাড়লো দু'পাশে। বলল,

"না, না। আমার কি সমস্যা হতে যাবে? তুই খা।"

"তোর মন চাইলে তুইও খা। দিবো আরেক প্লেট অর্ডার?"

আশা না করে দিলো। তার জন্য এক প্লেটই যথেষ্ট। কিন্তু শায়রার উপর যে আজ কি ভূ*ত চড়ে বসেছে! একের পর এক দুই প্লেট সাবাড় করে তৃতীয়বারের মতো অর্ডার দিলো ফুচকা।

আশার খাওয়া বেশ কিছুক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে। এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে শায়রার৷ কিন্তু তৃতীয় প্লেট অর্ডারের পর অধৈর্য হলো আশা। বলল,

"আর কয় প্লেট খাবি ভাই? তোর পেটে কি আজ ফুচকাখা*দক রা*ক্ষস ঢুকেছে? খেতেই আছিস, থামাথামির কোনো নাম নেই৷ হয়েছে কি তোর?"

শায়রা সরল-সোজা উত্তর দিলো,

"জামাইয়ের পকেটের টাকা উজাড় করবো। তাই যত প্লেট খেতে পারি, খেতেই থাকবো। এরপর জামাই তো আছেই বিল দেয়ার জন্য।"

আশা হতাশ শ্বাস ফেলে আফসোসের সুরে বলল,

"আজ একটা জামাই নেই বলে।"

শায়রা প্রতিত্তোরে কিছু বলল না৷ ব্যস্ত হলো ফুচকার প্লেটে। একে একে তিন প্লেট ফুচকা শেষ করে বড়সড় ঢেকুর তুলে ক্ষান্ত দিলো খাওয়ায়। প্লেটটা ফিরিয়ে দিয়ে ফুচকাওয়ালাকে বলল,

"আপনি একটু অপেক্ষা করেন। আমি মাঠের ওই কোন থেকে আমার হাসবেন্ডকে ধরে আনছি বিল দেয়ার জন্য।"

ফুচকাওয়ালা অসম্মতি জানিয়ে বলল,

"না, আপা। আপনে যদি না আইয়েন তাইলে আমার টাকাডি?"

শায়রা বলল,

"টেনশন নিচ্ছেন কেন? এই যে আমার বান্ধবিকে আপনার জিম্মায় ছেড়ে যাচ্ছি। আমি না আসলে ও বিল দিয়ে দিবে।"

আশা হতভম্ব হয়ে বলল,

"কি করতে চাইছিস তুই? আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে তোরা জামাই-বউ পা*লিয়ে যাবি না তো?"

শায়রা বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল,

"তুই কি পাগল? নিয়ে কোথাও পালানোর মতো জামাই নাকি ও? আজিরা কথা বাদ দিয়ে চুপচাপ দাঁড়া। আমি ওকে নিয়ে আসি।"

আশার বাঁধা উপেক্ষা করে শায়রা ছুটে গেলো ফাইজানের কাছে। ওকে দেখেই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলো ফাইজান। কে জানে এখন কোন মু*সিবত দাঁড় করাবে?

ফাইজানের বাকি বন্ধুরাও অবাক হয়েছে বেশ। কি উদ্দেশ্যে এসেছে এটা নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করলো সবাই। তৎক্ষনাৎ শায়রা ফাইজানকে বলল,

"তুমি এখনো এখানেই বসে আছো? আমি ফুচকা খেয়েছি। যাও গিয়ে বিল দিয়ে আসো।"

গুচ্ছাকারে রাখা বাঁশের উপর খানিকটা উঁচু জায়গায় বসা ছিলো ফাইজান। শায়রার কথায় লাফ দিয়ে নামলো সেখান থেকে। কঠোর কন্ঠে বলল,

"তোর ফুচকার বিল আমি দিতে যাবো কেন?"

শায়রা আহ্লাদী স্বরে বলল,

"আমি তোমার বউ না? বউয়ের ফুচকার বিল তো জামাইকেই দিতে হয়।"

ফাইজানের তিনটা বন্ধুই যেন আকাশ থেকে পড়লো এই কথা শুনে। হতবিহ্বলতায় বড়বড় করে ফেলল চোখদু'টো। সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো প্রায়,

"বউ?"

শায়রা ঘুরলো তাদের দিকে। নিষ্পাপ মুখভঙ্গি করে বলল,

"কি হলো? আপনারা জানতেন না? ও আপনাদের বলে নি?"

আহাদ ডানে-বামে মাথা নেড়ে বলল,

"না তো। ফাইজান তো কিছু বলে নি আমাদের, আপু।"

রিজভী ওর ঘাড়ে ঠেলা দিয়ে বলল,

"আপু আপু করছিস কেন? ভাবি বল, ভাবি! উনি ভাবি লাগে আমাদের।"

আহাদ ভুল করেছে টের পেতেই দাঁতে জিভ কাটলো। বলল,

"সরি, ভাবি।"

শায়রা স্মিত হেসে বলল,

"ইট'স ওকে, ভাইয়া।"

এরপর ঘুরলো ফাইজানের দিকে৷ বলল,

"তুমি এখনো যাচ্ছো না? বিল দাও গিয়ে।"

ফাইজান দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

"তুই আমাকে জ্বা*লিয়ে মা*রবি, মুটকি! ফুচকার সাথে সাথে আমার জীবনের সব শান্তি খেয়ে নিয়েছিস।"

শায়রা হাসলো। এরপর গিয়ে দু'হাত দিয়ে ফাইজানের বাহু জড়িয়ে ধরলো। দুনিয়ার সবচেয়ে রোমান্টিক কাপলের ভান ধরে এগিয়ে গেলো। সামনে থেকে আশার বিভ্রান্ত দৃষ্টি ও পেছন থেকে বন্ধু পার্টির কুঁচকানো ভ্রু, দুটোর অর্থ ঘুরে-ফিরে একই দিকে যাচ্ছে। এরা স্বামী-স্ত্রী? আর যেরকম ভাব দেখাচ্ছে সেসব আদ্যো সত্যি তো?

শায়রা ফাইজানকে সামনে নিয়ে আড়ম্বরতার সাথে ফুচকাওয়ালার সাথে পরিচয় করানো শুরু করলো,

"এই যে আমার হাসবেন্ড। উনিই আমার ফুচকার বিল দিবে। চিনে রাখুন, নেক্সট টাইম থেকে আমি যত প্লেট ফুচকা খাবো সবকটার বিল ও দিবে। তাই না?"

ফাইজান দাঁতে দাঁত চেপে রাগ নিয়ন্ত্রণ করলো। জনসমাগমের মাঝে বললো না কিছুই। ফুচকাওয়ালা বলল,

"মামা, আপনের বউ তিন পেলেট ফুচকা খাইছে। তিন পেলেটের ট্যাকা বাইর করেন।"

ফাইজান অবাক হয়ে বলল,

'তিনপ্লেট ফুচকা খেয়েছে?"

শায়রা বলল,

"হ্যাঁ, কেন? কোনো সমস্যা?"

শায়রার হাত এখনো ফাইজানের হাতের উপর শক্তভাবে অবস্থান করছে। সে কোনোভাবে হাত নাড়িয়ে পকেট থেকে মানিব্যাগও বের করতে পারছে না। উপরন্তু অন্য প্রসঙ্গে কথা চলমান থাকায় হাত ছাড়ার কথাও বলছে না এই মুহুর্তে। তিন প্লেট ফুচকার প্রসঙ্গ ধরেই বলল,

"একসাথে মানুষ তিন প্লেট ফুচকা খায়? এইভাবে তো দিনে দিনে আরও ফুলে যাবি তুই। সাধে তো তোকে মুটকি বলি না আমি!"

ফাইজান চেঁ*তে আছে বুঝতে পারলো শায়রা। ভালোভাবে কথা বলার মুড ফাইজানের নেই, এটা স্পষ্ট শায়রার কাছে।

এই সুযোগটাই সে আরও আরও ভালো করে কাজে লাগালো। তাড়াহুড়ো করে বলল,

"তুমি বিলটা দিয়ে দাও। আমি আশাকে নিয়ে চলে যাচ্ছি। রিকশা করে চলে যাবো তোমার টেনশন করতে হবে না।"

বলেই হাত ছেড়ে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে রিকশা ডাকলো। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে শায়রা রিকশায় উঠে হাত নেড়ে ফাইজানকে বিদায় জানালো। ওর কান্ড-কারখানা দেখে অতীষ্ঠ ফাইজান ফুচকার বিল দেয়ার জন্য পকেটে হাত দিতেই চমকে উঠলো।

ছেলেটা বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলো প্যান্টের যেই পকেটে মানিব্যাগ নিয়ে এসেছিলো সেটা খালি। টাকাসহ মানিব্যাগটা বেমালুম হাওয়া সেখান থেকে। ঘাবড়ে গিয়ে ফাইজান প্যান্টের বাকি পকেটও চেক করলো।

বিধিবাম! কোথাও নেই তার মানিব্যাগ৷ মানিব্যাগের মধ্যেই ছিলো তার টাকাগুলো। এখন মানিব্যাগ হাওয়া হওয়ায় ফুচকার বিল দেওয়াও অসম্ভব ব্যাপার। ফুচকাওয়ালাও অধৈর্য হয়ে পড়েছে। তিনি বললেন,

"কি মামা, বিল দিতেন না? আপনের বউ আপনের কতা কইয়া গেলো আর এহন আপনেও খাড়াইয়া রইছেন। বিল দিবো কেডায়? দেহেন, তিন পেলেট ফুচকার বিল কিন্তু আমি মাফ করতাম না।"

ফাইজান হতাশ শ্বাস ফেলে ডাকলো রিজভীকে। সে কাছে আসলেও মুখটাকে অমাবস্যার মতো কালো বানিয়ে রাখলো। জিজ্ঞেস করলো,

"কি হয়েছে?"

ফাইজান বলল,

"আমাকে দু'শ টাকা ধার দে। কাল দিয়ে দিবো।"

রিজভী কপট রাগ দেখিয়ে বলল,

"তুমি আমাদের না জানিয়ে বিয়ে করো, আবার আমাদের কাছেই টাকা ধার চাও। লজ্জা করে না?"

ফাইজান বিরক্ত হয়ে বলল,

"দেখ ভাই! বিয়ে আমি শখ করে করি নি যে সবাইকে ঢোল পিটিয়ে পিটিয়ে জানাবো, আমি বিয়ে করেছি। সিলেটে গিয়েছিলাম, আমাদের পুরো ফ্যামিলি দু'জনকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে৷ নাহলে এই মুসিবতকে বিয়ে করার ইচ্ছা আমার কোনোকালেই ছিলো না। এখনও য*ন্ত্রণায় ভুগছি।"

রিজভী জোর গলায় বলল,

"এসব কাহিনি আমাদের কাছে বলিস না৷ আমি সকালবেলা ঠিকই বলেছিলাম। তুই বিয়ে করে সিলেটে মধুচন্দ্রিমা পালন করে এসেছিস। অথচ আমাদের সামনে কি ভোলাভালা সেজে থাকার নাটক করিস।"

ফাইজানের রাগ নিয়ন্ত্রণ হারালো। হুঙ্কার ছেড়ে বলল,

"এই টপিকে কথা বলা বন্ধ করবি? যেটা চেয়েছি সেটা পারলে দে নাহলে দেখ অন্য কে দিতে পারবে। নাহলে এসব ফাও আলাপ আমার ভালো লাগছে না।"

তার রাগান্বিত কন্ঠস্বরের সামনে আর তর্কে জড়ালো না রিজভী। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করতে করতে বলল,

"কি করবি দু'শ টাকা দিয়ে?"

ফাইজান জবাব দিলো,

"মহারাণী তিন প্লেট ফুচকা খেয়ে গিয়েছে। ষাট টাকা করে প্লেট, একশ আশি টাকা দিতে হবে। বিল দিতে গিয়ে দেখি মানিব্যাগ নেই।"

রিজভী আঁতকে উঠে বলল,

"সে কি? তোর মানিব্যাগ ছিনতাই হয়ে গেছে? কিভাবে কি ভাই? কত টাকা ছিলো সেখানে?"

ফাইজান রিজভীর হাত থেকে দু'শত টাকা নিলো। এরপর নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

"খেয়াল নেই। বাসায় গিয়ে গুনে জানাবো কত টাকা ছিলো।"

রিজভী বিভ্রান্ত হয়ে বলল,

"বাসায় গিয়ে জানাবি মানে? চোর কি তোর বাসায় মানিব্যাগ রেখে যাবে?"

ফাইজান বিল মিটিয়ে ফিরলো। বলল,

"চোর না চুন্নি। মানিব্যাগ বাসা থেকে আর যাবে কই?

আমার জীবনে হতাশার পরিমাণ দেখলি? মনে হচ্ছে কোনোকালের পাপের শাস্তি পাচ্ছি৷ ছোটবেলায় দেখতাম মা বাবার মানিব্যাগ থেকে সুযোগ পেলে টাকা সরিয়ে নিতো। আমি দেখলেও বাবাকে জানাতাম না৷ এটাই বোধহয় অন্যায় হয়েছে। তারই শাস্তি! আমার মা তো বাবার মানিব্যাগ থেকে অল্প-স্বল্প টাকা সরাতো। আর আমার বউ তো আমার পুরো মানিব্যাগটাই মেরে দিয়েছে।"

হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস পর্ব ১৫ গল্পের ছবি