হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস

পর্ব - ১৮

🟢

তপ্ত সূর্যটা ঠিক মাথার উপর। রৌদ্রের প্রখর তাপ যেন ভ*ষ্ম করে দিবে সবকিছু৷ সেই উত্তপ্ততায় ঘাম ঝড়ছে ফাইজানের৷ তাতেও ছেলেটার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। হঠাৎ শায়রার উধাও হয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পাগলপ্রায় অবস্থা তার। লাগাতার এলোমেলো পায়চারী করে যাচ্ছে মাঠে আর বারবার তাকাচ্ছে ভার্সিটির বড়সড় প্রবেশপথটার দিকে৷

বন্ধুদের স্বান্ত্বনায় বহুকষ্টে অনেকটা সময় ধৈর্য ধরলো ফাইজান। এরপর আর না পেরে ছুটলো বাড়ির উদ্দেশ্যে। প্রায় অনেকটা সময় লাগিয়ে বাড়ি পৌঁছালো সে। অস্থিরচিত্তে সিঁড়ির দু'তিনটে ধাপ একসাথে লাফিয়ে পার করে উঠে এলো তিনতলায়। নিজেদের ফ্ল্যাটের কলিংবেল বাজাতে থাকলো অনবরত। যার ফলে মালেকা বেগম একপ্রকার বিরক্ত হয়েই এসে দরজা খুললেন৷ বললেন,

"কি হয়েছে তোর? এমন পাগলের মতো কলিংবেল বাজাচ্ছিস কেন?"

ছুটোছুটির সুফল হিসেবে হাঁপাচ্ছে ফাইজান। ঠিকঠাক কথাও বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে৷ জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টায় খানিক সফল হতেই বলল,

"মা, শায়রা কই? বাসায় আছে?"

ফাইজানের অবস্থা ভালোমতো পরখ করতেই অজানা আ*শঙ্কা হানা দিলো ভদ্রমহিলার মনে৷ তৎপর আবার শায়রার খোঁজ জানতে চাওয়া। দুইয়ে মিলিয়ে তিনি বেশ ভালোই দুশ্চিন্তায় পতিত হলেন৷ শুধালেন,

"শায়রা তো তোর আগেই বের হলো বাসা থেকে৷ এখনো তো বাড়িতে আসে নি। তাহলে হয়তো ভার্সিটিতেই আছে।"

দরজা চাপিয়ে ভেতরে ঢুকলো ফাইজান৷ চিন্তার কড়া ভাজ তার কপালে৷ ঘামে গায়ের শার্টটা ভিজে নাজেহাল। প্রত্যেকটা রুমে উঁকিঝুঁকি দিতে দিতে বলল,

"মা, ও ভার্সিটিতে নেই। আমি পুরো ভার্সিটি খুঁজেছি। ওর ক্লাসমেটদেরও জিজ্ঞেস করেছি। সবাই বলল, ও নাকি আজ যায়-ই নি। তাহলে সকালে বেরিয়ে গেলো কোথায়? তুমি সিউর ও ভার্সিটিতেই গেছে?"

শায়রার নিখোঁজ হওয়ার খবর পেতেই ঘাবড়ে গেলেন মালেকা বেগম। হতচেতন হয়ে বললেন,

"তুই..তুই ওকে ভার্সিটিতে দেখিস নি? তাহলে কই ও? আমি তো সকালে বের হতে দেখে ভেবেছি ও ভার্সিটিতেই গেছে৷"

ফাইজান বুঝে গেলো তার মাও শায়রার বিষয়টা জানে না। তাই নিজেই খোঁজ লাগাতে ঢুকলো আনুসার রুমে। পেছন পেছন তার মা-ও গেলো। এরপর দেখতে পেলো শায়রা প্রতিদিন ভার্সিটি যাওয়ার সময় যেই ব্যাগ নেয়, সেটা টেবিলের উপর ফেলে রাখা। আর পার্স, যেটা কোথাও ঘুরতে গেলে নেয় সেটা লাপাত্তা। মালেকা বেগম ঘটনা বুঝতে পেরে বললেন,

"ব্যাগ এখানে? তার মানে শায়রা ভার্সিটিতে যায় নি। তাহলে কোথায় গেলো? আবার সিলেটে চলে গেলো না তো? তুই ফোন করে দেখেছিস ফাইজান?"

ফাইজান উত্তর দিলো,

"অনেকবার ফোন করেছি, না৷ কিন্তু ওর ফোন বারবার বন্ধই বলছে। শেষমেশ একজনের কাছ থেকে জোগাড় করে আশাকেও কল করেছিলাম৷ দু'বার কল দেয়ার পরও ধরলো না। আর তৃতীয়বার..."

শ্বাস নেয়ার জন্য কিঞ্চিৎ থামলো ফাইজান৷ এরপর বলল,

"তৃতীয়বার আশার ফোনও সুইচড অফ বলল৷ বুঝতে পারছি না সকাল সকাল কই গেলো ও?"

"আমাদের সবাইকে না বলে চলে গেছে ও। যেখানেই গেছে তোকে শান্তি দিয়ে গেছে৷ এবার খুশি হয়েছিস না তুই?"

আকস্মিক মালেকা বেগমের সম্পূর্ণ রা*গ উথলে উঠলো ফাইজানের উপর। শায়রার নিখোঁজ হওয়ার পেছনে তিনি ফাইজানকেই পুরোপুরিভাবে দায়ী করলেন। অন্যদিকে মায়ের হঠাৎ এমন রেগে যাওয়ায় হতভম্ব হলো ফাইজান। বিস্মিত সুরে জানতে চাইলো,

"আমি খুশি হবো? কিন্তু কেন? একটা আস্ত মানুষ আমাদের বাড়ি থেকে নিখোঁজ, আর আমি খুশি হবো? মামা শায়রাকে আমাদের দায়িত্বে রেখেছে। তোমরা মামাকে কি জবাব দেবে?"

মালেকা বেগম ছেলের চেয়েও দ্বিগুন তে*জে চেঁ*চালেন,

"জবাব আমরা দিবো৷ তোকে কে ভাবতে বলেছে? কাল পর্যন্তও তো মেয়েটাকে কথা শুনিয়েছিস। এগুলো শুনে থাকবে কেন ও? চলে গেছে। এবার তুই শান্তিতে থাক। আর কেউ তোর জীবনে বাগড়া দিবে না৷ দেরি করে ফিরলে কেউ তোকে দরজায় আটকাবে না৷ রাস্তা-ঘাটে মা*রামা*রি করলেও কেউ বাঁধা দিবে না৷ আর কেউ তোর এই বেপরোয়া স্বভাব ঠিক করতে চাইবে না। তুই থাকবি নিজের মতো, আর শায়রা নিজের মতো। তোর তো খুশি হওয়া উচিত, তাই না?"

বলেই মুখ ঝামটা মেরে রুম থেকে চলে গেলেন উনি। পেছনে রেখে গেলেন হতবিহ্বল, বিস্মিত ছেলেটাকে।

আসলেই তো তার খুশি হওয়া উচিত। শায়রা না থাকা মানে ফাইজানের জন্য নিজের ছন্নছাড়া জীবনে মুক্তি। তবুও ফাইজান খুশি হতে পারছে না৷ মনের কোনো এক অনুভূতি খুব করে শায়রাকে আশেপাশে চাইছে৷ কিন্তু সেই অনুভূতির নামটা ফাইজান অনুভব ধরতে পারছে না৷ মস্তিষ্কে শুধু একটা কথাই ঘুরছে, খুঁজে বের করতে হবে শায়রাকে।

*********

মালেকা বেগম কাজ-টাজ অসমাপ্ত রেখেই রুমে এসে ঢুকলেন৷ যদিও ছেলেকে শক্তকন্ঠে অনেকগুলো কথা শুনিয়ে এসেছেন তবুও তিনি মনে-প্রাণে চাইছেন ফাইজান শায়রাকে খুঁজে বের করুক।

দরজার শব্দ হতেই মালেকা বেগম টের পেলেন, ফাইজান আবার বেরিয়েছে বাড়ি থেকে৷ এরপর তিনি নিজেই কল করলেন শায়রার নাম্বারে। তিনিও ছেলের মতো একই বাণী শুনলেন৷ হতাশ হয়ে কল কেটে দিলেন তিনি। মেয়েটা কোথায় আছে, তা নিয়ে বিস্তর দুশ্চিন্তায় নিমজ্জিত ভদ্রমহিলা। আর কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে ভয়ে ভয়ে কল করলেন ভাবির নাম্বারে।

অল্প সময়েই রিসিভ হলো সেটা। দ্বীতি বেগম খুব খুশিমনে তাদের কুশল জানতে চাইলেন।

বিপরীতে মালেকা বেগম শুকনো ঢোক গিললেন। কোনোরকম আটকে আটকে উচ্চারণ করলেন,

"ভা..ভালো। ভাবি একটা কথা বলার ছিলো।"

দ্বীতি বেগম হাসিমুখেই জানতে চাইলো,

"হ্যাঁ, বলো।"

মালেকা বেগম নিখোঁজ হওয়ার কথাটা বলতে দোনোমনা করলেন ভীষণ। কিন্তু বলতে তিনি বাধ্য। তাই অনেকক্ষণ ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে বললেন,

"কি বলব! শায়রা সেই কোন সকালে ভার্সিটি গিয়েছে, আসার নাম নেই! ফোনটাও যে কেন অফ রেখেছে!"

দ্বীতি বেগম বললেন,

"শায়রার ফোন অফ? তাহলে হয়তো চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছে। সকালেও তো আমার সাথে কথা হলো৷ বলল, আজ ম্যাডাম ভার্সিটি না গিয়ে আশার বাড়িতে গিয়েছেন। আশাকে নাকি পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে, সেখানেই ও আজ সারাদিন থাকবে। সন্ধ্যার পর পর বাড়িতে চলে যাবে বলল।"

হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন মালেকা বেগম। অন্ততপক্ষে শায়রার খোঁজ তো পেয়েছেন! এতেই খুশি হয়ে আলাপচারিতা শুরু করলেন দুই ননদ-ভাবী ও বেয়াইন। আনুমানিক একঘন্টা ব্যয় হয়ে গেলো তাদের কথা-বার্তাতেই। এরপর ফোন রেখে রুম থেকে বেরিয়ে কিচেনে ঢুকলেন মালেকা বেগম৷ একবার ভাবলেন শায়রার খোঁজটা ফাইজানকে দিয়ে দিবেন৷ ছেলেটা পাগলের মতো খুঁজে চলেছে শায়রাকে। পরমুহূর্তেই বাতিল করলেন সেই চিন্তা। খুঁজছে, খুঁজুক না নিজের বউকে! একটু হারানোর ভয় না থাকলে বুঝবে কি করে ভালোবাসা আছে নাকি নেই?

***********

সূর্য ঢলে গেছে পশ্চিম আকাশে। রক্তিম গোধূলির পরে তখন অন্ধকার নেমেছে চারপাশে। সবখানে তখন কৃত্রিম আলোর মেলা। সেসময় ফাইজান বিধ্বস্ত অবস্থায় ঢুকলো বাড়িতে।

বাড়ির বাকিরা তখন ড্রইংরুমের সোফায় বসে। মালেকা বেগম, ফজল আহমেদ ও আনুসা সবাই উপস্থিত। মালেকা বেগম ইতিমধ্যেই বাকিদের কাছে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তৎক্ষনাৎ ছেলের অবস্থা ভেবে স্বল্প হেসেছিলেন তারা৷ কিন্তু ফাইজানকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি বন্ধ করলেন। খুবই গুরুগম্ভীর ও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মুখখানা বানিয়ে এগিয়ে এলেন ফজল সাহেব। জিজ্ঞেস করলেন,

"পেয়েছো শায়রাকে?"

না-বোধক ইঙ্গিতে মাথা নাড়লো ফাইজান৷ শ্যামলা মুখশ্রীতে তার ফুঁটে উঠেছে সারাদিনের ক্লান্তি। এমনকি দুপুরে খায় নি অব্দি! এটাকে ঠিক কি বলা যায় নিজেও বুঝতে পারছে না সে। শায়রা তাদের দায়িত্ব হিসেবে ঢাকা শহরে আছে, তাই দায়িত্বের খাতিরেই কি এত দুঃসহ অবস্থা? নাকি হারানোর আশঙ্কাতে এমন হচ্ছে?

হেঁটে গিয়ে একটা সোফায় বসলো ফাইজান। মুখখানা শুকিয়ে পাংশুটে বর্ণ ধারণ করেছে। আনুসার বেশ মায়া হলো ভাইকে দেখে। সাথে সাথে একগ্লাস পানি এনে এগিয়ে দিলো ফাইজানের দিকে৷ ফাইজান এক মুহুর্ত দেরি করলো না। খালি করে ফেলল গ্লাসটা। অতঃপর ফজল সাহেবও দরজা লক করে ওদের কাছে এলেন। ছেলেকে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,

"কোনো খোঁজই পাও নি মেয়েটার?"

ফাইজান প্রচন্ড হতাশার সাথে জানালো,

"না। জানি না কোথায় আছে!"

ফাইজান দিনে হাজারবার শায়রার নাম্বারে কল করেছে। গত উনিশ বছরেও শায়রাকে ততবার কল করা হয়, যতবার আজ করেছে। কিন্তু ওর ফোন সারাদিনই সুইচড অফ বলেছে। ফাইজান ভার্সিটির হোস্টেল, এছাড়া আশেপাশের হোস্টেলেও গিয়েছে ওর খোঁজ নিতে। যদি ও গিয়ে থাকে? কিন্তু প্রত্যেকবারই হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে তাকে৷ হঠাৎ কি ভেবে তার মনে হলো, শায়রা কি সিলেট গিয়েছে? এই আশঙ্কায় নিজের মামাকেও ফোন করেছে কিন্তু সেখানেও কোনো খবর নেই। সেই সকালে বাসা থেকে বেরিয়েছে। গেলে তো এতক্ষণে সিলেটে পৌঁছেই যেত, তাই না? পুলিশ কম্পলেইন করবে? তারা তো নিখোঁজের চব্বিশঘন্টা হওয়ার আগপর্যন্ত কেস নেয় না।

হাজারো দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে ছেলে যখন নাজেহাল, মায়া হলো মালেকা বেগমের৷ তিনি ভাবলেন এইবার ছেলেকে শায়রার খোঁজ বলে দেয়া উচিত। যেই মুহুর্তে তিনি প্রস্তুতি নিলেন ফাইজানকে সবটা বলবেন তৎক্ষনাৎ কলিংবেল বাজলো। আনুসা দৌঁড়ে গিয়ে গেট খুলতেই ভেতরে ঢুকলো শায়রা। খুশিমনে আনুসাকে বলতে শুরু করলো,

"জানিস, আজ আশাকে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছিলো৷ সব ঠিকঠাক থাকলে আগামীমাসেই বিয়ে হয়ে যাবে। কত্ত মজা হয়েছে আজ সারাদিন!"

মালেকা বেগম ও ফজল সাহেবও শায়রাকে দেখেই ওর কাছে চলে এলেন। আর শায়রা উৎফুল্ল চিত্তে আজকের ঘটনাগুলো বলছে।

শায়রাকে দেখা মাত্র ফাইজান সোফা ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই ওর কথাগুলো শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলো সে৷ এই মেয়ে সারাদিন ইঞ্জয় করেছে আর ও কি-না দুশ্চিন্তায় মাথা ব্যা*থা বানিয়েছে? কথাটা মস্তিষ্কে প্রবেশ করতেই শক্ত হলো ফাইজানের চোয়াল। ডান হাতের তালু মুষ্টিবদ্ধ করলো রা*গ নিয়ন্ত্রণে। বড় বড় কদম ফেলে শায়রার কাছে এগিয়ে এসে কর্কশ কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

"তোর ফোন কই?"

ফাইজানের একটু আগের কন্ঠস্বর ও এখনকার কন্ঠস্বরের ভিন্নতা দেখেই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো মা-মেয়ে৷ বুঝলো, এতক্ষণ টেনশনে ডুবে থাকা ছেলেটা এবার ইচ্ছামতো ঝাড়বে শায়রাকে। বিপরীতে শায়রাও কম বলবে না! আর তারা থাকবে নিরব দর্শক৷

শায়রা আচমকা কিছু একটা মনে পড়ার ভঙ্গি করে কপালে হাত রাখলো৷ বলল,

"ফোন তো আমার ব্যাগে। ভালো কথা মনে করিয়েছো.."

এরপর ব্যাগ হাতড়ে ফোনটা বের করতে করতে বলল,

"ফোনের চার্জ একদম শেষ হয়ে গিয়েছিলো৷ এজন্য সকাল থেকে সুইচড অফ হয়ে আছে। আনুসা, নিয়ে একটু চার্জ দিয়ে দে তো!"

ফাইজান দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

"আশার বাড়িতে কি কোনো চার্জার ছিলো না? সারাদিনে একটু চার্জ দেয়া যেত না? বোধ-বুদ্ধি কি আসার আগে সিলেটেই ফেলে এসেছিস? তোর মাথায় এতটুক ঢুকে নি, আমাকে কেউ কল করতে পারে। কেউ হয়তো টেনশন করতে পারে। বাড়িতে ফোন করে বলে দেই!"

শায়রা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

"আমাকে নিয়ে আবার কে টেনশন করতে যাবে?"

ফাইজান নিজেকে দমাতে পারলো না আর! শক্ত হাতে খা*মচে ধরলো শায়রার দু'বাহু। নিজের মুখোমুখি দাঁড় করাতেই চোখদুটো বড়বড় করে ফেলল শায়রা৷। ফাইজান সাফ-সাফ উত্তর দিলো,

"আমি করেছি টেনশন। সারাদিন তোর একটাও খোঁজ ছিলো না। না বাড়িতে বলে গিয়েছিস আর না কল ধরেছিস। বাহানাও ভালোই বানাতে পারিস। ফোনে চার্জ নেই! যত্তসব!"

একঝটকায় পুনরায় মেয়েটাকে দূরে সরিয়ে দিলো ফাইজান। এরপর হনহন করে গিয়ে ঢুকলো নিজের রুমে। শায়রা নিজের পক্ষে যুক্তি দেয়ার ফুরসত অব্দি পেলো না। হতবাক হয়ে বলল,

"যাহ, বাবা! আমি আবার কি করলাম? ফোন সুইচড অফ ছিলো এজন্য এভাবে ঝা*ড়ি মেরে যাবে?"

স্মিত হাসলেন মালেকা বেগম। বললেন,

"ঝা*ড়ি দেয়ার মতো পরিস্থিতি হয়েছে বলেই দিয়েছে। ছেলেটা আজ সারাদিন পাগল হয়ে গিয়েছিলো তোর খোঁজে। দুপুরে খায় নি পর্যন্ত। কতটা টেনশনে ছিলো ভেবেছিস?"

শায়রা ঠোঁট উল্টালো। বিড়বিড়িয়ে বলল,

"আমি হারালে ওর টেনশন হবে কেন? আর খোঁজই বা করেছে কেন? কোনো কথা শুনানো বাকি ছিলো বুঝি, যেটা আজ শুনাবে?"

ফজল সাহেব হাত রাখলেন শায়রার মাথায়। অনুশোচনায় জর্জরিত স্বরে বললেন,

"মা, আমি জানি আমার ছেলেটা একটু বেপরোয়া। তোমাকেও কতসময় কত কটু কথা বলে ফেলে। তুমি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করো। আমি চাই তুমি যেন সবসময় এরকমই থাকো। ফাইজান একটা বললে বিপরীতে তুমি দু'টো শুনাবে। এক্ষেত্রে আমি কিন্তু তোমার পক্ষে আছে। তবুও এইসব ব্যাপার নিয়ে মন খারাপ করো না, বা আমাদের উপর রাগ-অভিমান করো না৷ সবটাই ঠিক হয়ে যাবে কোনো একদিন!"

হাসলো শায়রা। প্রতিত্তোরে মাথা নাড়লো শুধু। এরপর ফজল সাহেবও চলে গেলেন। পরপর আনুসাও ঢুকলো নিজের রুমে। ফোন চার্জে দেয়ার যে দায়িত্ব তার উপর দেয়া হয়েছে সেটা পালন করতে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে শায়রা। অস্ফুটে উচ্চারণ করলো,

"কোনো একদিন!"

মালেকা বেগম শুনতে পেলেন না। তিনি বললেন,

"আমি যাই, গিয়ে ছেলের খাবার দেই।"

শায়রা ভ্রু কুঁচকে চাইল তার দিকে। ভেঙচি কে*টে বলল,

"তো দাও না গিয়ে! আমি কি ওকে বলেছিলাম আমার টেনশনে খাওয়া বন্ধ করে বসে থাকো?"

ভদ্রমহিলা মৃদু হেসে বললেন,

"তুই বলিস নি, তাও টেনশন করেছে৷ হয়তো নিজে না চাইতেও ওর টেনশন হয়েছে তোকে নিয়ে৷ না মানে, টেনশন থেকে যদি ভালো কিছু হয় তাহলে টেনশনই ভালো!"

হেসে ফেলল শায়রা। বলল,

'সার্ফ এক্সেলের অ্যাড দিচ্ছো, ফুপ্পি?"

হৃদয়ের রঙিন ক্যানভাস পর্ব ১৮ গল্পের ছবি