ফাইজান শায়রার আগে আগে ডাইনিং টেবিলে ফিরে খেতে বসে গেছে। এর খানিক পরেই চিন্তিত মুখে ফিরলো শায়রা। তৎক্ষণাৎ ফাইজান বলল,
"আমিও যাবো তোর সাথে।"
শায়রা অবাক হয়ে চাইল ফাইজানের দিকে। কন্ঠে অবিশ্বাস ঢেলে বলল,
"তুমি যাবে?"
ফাইজান থমথমে স্বরে বলল,
"হ্যাঁ। কেন? আমি গেলে কোনো সমস্যা?"
শায়রা মাথা নেড়ে বলল,
"না। আমার কি সমস্যা হতে যাবে? কিন্তু তোমার কি সময় হবে আমার সাথে যাওয়ার? ব্যস্ত মানুষ তুমি! আমাকে দেয়ার মতো সময় আছে?"
কথার সুরে স্পষ্ট খোঁচা বুঝতে পারলো ফাইজান। তবুও কোনো তর্কে জড়ানোর চিন্তাভাবনা করলো না। উত্তর দিলো,
"সময় আছে আমার। আমি যাবোই। এমনিতে আশার সাথে ওর হবু হাসবেন্ড যাবে। ওরা একসাথে ঘুরবে আর তুই একা একা? এজন্যই যাচ্ছি আমি।"
ভ্রু উঁচালো আনুসা। টেনে-টেনে বলল,
"মা। ভাইয়া আজকাল শায়রা আপুর কথা একটু বেশিই ভাবছে না?"
মুখ লুকিয়ে মৃদু হাসলেন মালেকা বেগম। পরমুহূর্তেই আবার মুখটাকে গুরুগম্ভীর করে বললেন,
"তোর ওসব ভাবতে হবে না। আর শায়রা, কে কে যাচ্ছিস তোরা?"
শায়রা বলল,
"আশা, ইশা, ওর হাসবেন্ড ফরহাদ ভাইয়া আর তার ছোট ভাই। আর এদিক থেকে আমরা দু'জন।"
ফাইজান জিজ্ঞেস করলো,
"কিভাবে যাবে? আর কোন মার্কেটে যাবে?"
শায়রা উত্তর দিলো,
"ফরহাদ ভাইয়ার গাড়িতে।"
ফাইজান খেতে-খেতে বলল,
"এক গাড়িতে ছয়জন জায়গা হবে না। ওরা নিজেদের বাড়ি থেকে যাক। তুই লোকেশন জেনে নিস, আমরা আলাদা যাবো।"
শায়রা প্রতিত্তোরে মাথা নাড়লো। মনে মনে বলল,
"আশ্চর্য! এই ছেলের এত আলগা দরদ উথলে পড়ছে কেন? না না, এর কথাবার্তায় একদম দুর্বল হওয়া চলবে না। কে বলতে পারে, একদিন হুট করে ডিসিশন শুনিয়ে দেবে ডিভোর্সের। এমনিতেও আমাদের বিয়ের ভবিষ্যৎ ডিভোর্স ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।"
**********
দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পরই বেরিয়ে গিয়েছিলো ওরা সকলে। শায়রার মুখে ফাইজানের যাওয়ার খবর শুনে যারপরনাই খুশি হয়েছে আশা। সঙ্গে সঙ্গে সম্মতিও দিয়েছে তাদেরকে আলাদা আসার।
বিকেল সাড়ে তিনটা নাগাদ বসুন্ধরা শপিং মলের সামনে হাজির হলো ফরহাদের গাড়িটা। ভেতর থেকে একে একে নেমে এলো ফরহাদের ছোট ভাই ফাহিম, আশা ও ইশা। দুপুরের পর পর আসায় এখনো তেমন ভীড় জমে নি। পার্কিং স্পটে গাড়িটা পার্ক করে বের হলো ফরহাদ। বর্তমানে এই জায়গাটা অনেকটাই ফাঁকা। ফাহিম নেমেই সর্বপ্রথম জিজ্ঞেস করলো,
"ভাবি, আপনার ফ্রেন্ড শায়রা আসলো না যে?"
আশা উত্তরে বলল,
"এসে পড়বে হয়তো। একটু অপেক্ষা করো, আমি কল করে জিজ্ঞেস করি ও কোথায় আছে।"
ব্যাগ থেকে ফোন বের করলেও আশার আর কল করা হলো না। এর আগেই হাজির ফাইজান ও শায়রা। ফাইজানের বাইকে করে এসেছে দু'জনে। শায়রা বাইক থেকে নেমেই আশার কাছে এসে বলল,
"বেশি অপেক্ষা করিয়েছি নাকি? দেরি করে ফেললাম?"
ফরহাদ বলল,
"আরেহ না না। আমরাও মাত্রই এসেছি। একটুও অপেক্ষা করান নি।"
ততক্ষণে ফাইজান বাইক পার্ক করে রেখে এসে পড়েছে ওদের মাঝে। ফাহিম হা করে দেখছে ওকে। মূলত শায়রাকে একটা ছেলের সাথে আসার ব্যাপারটা হজম হয়নি ওর দ্বারা। তাই বুঝতে চাইছে ছেলেটি শায়রার কি হয়? অপেক্ষায় আছে আশা পরিচয় করিয়ে দিবে। কিন্তু আশা কিছুই বলছে না। সে ইতস্তত করছে ফাইজানকে কি বলে পরিচয় দিবে? শায়রার ফুপাতো ভাই নাকি শায়রার হাসবেন্ড? এদের দু'জনের মতিগতির কিছু ঠিক নেই। উভয়দিকেই বি*পদ।
অবশেষে ধৈর্যহারা হলো ফাহিম। নিজেই সেধে জিজ্ঞেস করলো,
"শায়রা, উনি তোমার কি হয়?"
সোজাসুজি তুমি সম্বোধনটায় হোঁ*চট খেলো শায়রা। ওইদিন আশার বাড়িতে দু'জনের মধ্যে যে দু-চারটে বাক্য বিনিময় হয়েছে তাতে ফাহিম আপনি করেই বলেছিলো। কিন্তু আজ সরাসরি তুমি। ফাইজানের চেহারা দেখেই মনে হচ্ছে ক্ষে*পেছে। মনের ভাবনা এই, আরেকজনের বউয়ের সাথে ভাব জমানোর জন্য সোজা তুমি করে ডাকছে! এটা যদি ভার্সিটি বা অন্য কোনো মাঠ হতো, নিঃসন্দেহে এই মুহুর্তেই কিছু একটা হয়ে যেত!
শায়রা পড়েছে মহাবিপাকে। একবার ভাবছে কাজিন পরিচয় দেবে। পরমুহূর্তেই ভাবছে ফাইজান নিজেই যেহেতু একবার হাসবেন্ড-ওয়াইফ পরিচয় দিয়েছে তাহলে ওর দিতে সমস্যা কোথায়? কিন্তু কিছু একটা ভেবে বাতিল করলো সেই ভাবনা। ফাইজানকে আরেকটু পরীক্ষা করতে বলল,
"আমার কাজিন হয়। ফুপাতো...."
"হাসবেন্ড।"
ফাইজান হাসি-হাসি মুখ করে উত্তর দিলো,
"আমি ওর হাসবেন্ড হই। আর ও আমার ওয়াইফ।"
আশা ব্যতীত কেউ-ই ওদের ব্যাপারটা জানে না। সুতরাং প্রত্যেকেই বিভ্রান্ত হয়েছে দু'জনের দু'রকম উত্তর শুনে। একজন বলে কাজিন, আরেকজন বলে হাসবেন্ড। পুরোপুরি কনফিউজড হয়ে ইশা একবার ফাইজানের দিকে আরেকবার শায়রার দিকে তাকিয়ে দু'জনের বলা বাক্যটুকু মেলালো,
"ফুপাতো হাসবেন্ড? মানে ফুপাতো জামাই? সব ঠিক আছে, কিন্তু জামাই আবার ফুপাতো হয় কি করে?"
আশা কনুই দিয়ে ইশার পেটে খোঁচা মারলো। ইশা কঁকিয়ে উঠে ওর দিক তাকাতেই আশা চোখ রাঙিয়ে চাপা কন্ঠে বলল,
"ফুপাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে হলে ওটাকে ফুপাতো হাসবেন্ড বলে। গা*ধা কোথাকার! বড়দের মাঝে বেশি কথা বলবি না।"
ইশা মাথা নাড়লো। অর্থাৎ আর কিচ্ছু সে বলবে না। ওরা থামতেই ফরহাদ ফাইজানকে বলল,
"আপনি শায়রার হাসবেন্ড?"
ফাইজান জবাব দিলো,
"হ্যাঁ, ভাইয়া। আশা আর শায়রা দু'জনে খুব ভালো ফ্রেন্ড। আর আপনি আশার হাসবেন্ড, আমি শায়রার হাসবেন্ড। হিসেবে তো আমরা ভাইরা ভাই হলাম, তাই না?"
প্রথম দেখাতেই ফাইজানের আন্তরিকতাপূর্ণ কথায় খুশি হলো ফরহাদ। হ্যান্ডশেক করে এখানেই অল্প-স্বল্প আলাপ সেরে নিলো তারা। ওদের কথোপকথনের মাঝে আশা শায়রার কানে কানে বলল,
"ভাইয়া তো ভার্সিটিতে নিজের বন্ধুদের সাথে ছাড়া কারো সাথেই ভালোভাবে কথা বলে না। আর জুনিয়র হলে তো ধ*মকা-ধ*মকি ছাড়া কথাই নেই! আমি তো ভেবেছিলাম উনি অসামাজিক একজন মানুষ। কিন্তু আমার জামাইয়ের সাথে এত ভালো মিলল কি করে?"
ঠোঁট উল্টালো শায়রা। ঘাড় উঁচিয়ে বলল,
"আমি কি জানি? ভার্সিটির সিনিয়র-জুনিয়র কি? ও তো ঘরের বউয়ের সাথেই সুন্দর করে কথা বলে না। আচ্ছা আমার কথা বাদই দিলাম, নিজের ছোটবোনের সাথেও ওর ভাব নেই। জানিস, আনুসা ওকে জমের মতো ভয় পায়। সব চো*টপাট আমার সাথে, ভাইকে দেখলেই সব ফুঁস। আর আমার সাথে তো কথা বললেই ঝ*গড়া লেগে যায়। এজন্য কথা বলাই ছেড়ে দিয়েছি৷ যেখানে ওর সাথে খুঁটিনাটি বিষয়েই বনিবনা হয় না, সেখানে সারাজীবন সংসার আদ্যো সম্ভব?"
আশা বলল,
"বিয়ে যেহেতু হয়েছে, সেহুতু সব সম্ভব। তুই একটু ধৈর্য ধর। ওই একটু মা*রামা*রি আর বেপরোয়া স্বভাব বাদে খারাপ কোনো কিছুই নেই। আজকালকার দিনে কোনো ছেলেকে বিয়ে করার আগে বহুবার ভাবতে হয় তার গার্লফ্রেন্ড আছে নাকি? কিন্তু ভাইয়ার বেলায় সেরকম ঝক্কি-ঝা*মেলা নেই। তার একটামাত্র বউ তুই। পুরুষমানুষ তা ছেড়ে যাবে কই? শেষমেশ তোর বর তোর কাছেই থাকবে দেখিস!"
শায়রা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
"মিথ্যে স্বান্ত্বনা দিস না। এমনিতেও আমি এসব নিয়ে ভাবি না। যা ভাগ্যে আছে তাই হবে।"
দীর্ঘশ্বাস ফেলল আশা। ওকে বুঝিয়েও কোনো কূল হচ্ছে না তার। দু'জনে নিজের জায়গায় স্থির থাকলে সম্পর্ক আগাবে কি করে?
ফাহিম বিস্ময়াভাব কাটিয়ে উঠেছে মাত্র৷ প্রথমে মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিলো, যাকে ও পছন্দ করলো সেই মেয়েটি বিবাহিত। কিন্তু বাস্তবতা তো ওর মেনে নেওয়া বা মেনে না নেওয়ার উপর নির্ভর করে বসে থাকবে না। মেনে নিতে হবে, ওর পছন্দের মানুষটি অন্য কারো বউ।
ফরহাদের পর ফাহিমও কিছু কথা বলল ফাইজানের সাথে। তার পরিসর থেমে থাকলো অল্পের মধ্যেই। শায়রার মধ্যে কথা বলার স্বভাব বেশি থাকলেও ফাইজান সর্বদা বিপরীত। যা কথা বলে তা ওই বন্ধুদের মাঝে গেলেই। নাহয় বাড়িতে তো সারাক্ষণ খিটখিটে মে*জাজেই থাকে।
হঠাৎ ফাইজান বলল,
"আচ্ছা, আপনারা তাহলে উপরে যান। আমরা একটু পরেই আসছি।"
ফরহাদ জিজ্ঞেস করলো,
"কেন? তোমরা কোথাও যাবে নাকি?"
ফাইজান বলল,
"না না। কোথাও যাচ্ছি না। আপনারা উপরে উঠুন, আমরা পেছন পেছন আসছি।"
অতঃপর ফাইজানের কথা মেনে নিয়ে ওরে আগে আগেই ঢুকলো শপিংমলের ভেতরে। শায়রা পা বাড়াতেই ফাইজান পেছন থেকে ওর হাত ধরলো। চোখ বড়-বড় হয়ে গেলো শায়রার। বিড়বিড়িয়ে বলল,
"ইয়া আল্লাহ! এ আজকাল এমন আচরণ করছে কেন? মানুষের সামনে বউ-বউ করছে, পেছন থেকে হাত টান দিচ্ছে। এসব কি হচ্ছে আমার সাথে? বাউন্ডুলে ঠিক আছে তো? কোনো জ্বীন-ভূতে আছর করে নি তো?"
কিয়ৎক্ষণ থেমে পেছনে ফিরলো শায়রা। হাত ছাড়ানোর চেষ্টায় তৎপর থেকে বলল,
"কি হয়েছে? ঠিক আছো তুমি? শরীর খারাপ লাগছে? বাসায় যাবে?"
একের পর এক এই প্রশ্নগুলোতে ভ্রু কুঁচকে শায়রার দিকে তাকালো ফাইজান। বলল,
"শরীর খারাপ লাগবে কেন? আর হঠাৎ এমন প্রশ্নই করছিস কেন? বাসায় যাওয়ার কথা একবারও বলেছি আমি?"
শায়রা যত চেষ্টা করছে হাত ছাড়ানোর, ফাইজান তত শক্ত করে চেপে ধরছে। শেষমেশ ছেলেটা তিতিবিরক্ত হয়ে বরাবরের ন্যায় ধমক ছুড়লো,
"সা*পের মতো মোচড়ামুচড়ি করছিস কেন? ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের নাগিন কোথাকার! চুপচাপ দাঁড়ানো যাচ্ছে না? হাত ধরেছি শুধু। এ*রেস্ট করে জেলে ভরার জন্য হ্যান্ড*কাফ লাগাচ্ছি না।"
এক ধমকে মোচড়ামুচড়ি থেমে গেলো শায়রার। ধমক শুনেই টের পেলো ফাইজান ঠিক আছে। তাই সস্থির নিশ্বাস ফেলে বলল,
"যাক বাবা! তুমি ঠিক আছো তাহলে।"
ফাইজান কর্কশ কন্ঠে বলল,
"ভুল ছিলাম কখন?"
শায়রা রাখ-ঢাকহীন ফাইজানের মুখের উপর বলে দিলো,
"লোকের সাথে তোমার ভালো ব্যবহার দেখে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম, তুমি সুস্থ আছো কি না! এমনিতে তো তোমার মুখ থেকে সুন্দরভাবে কথা বের হয় না। তাই টেনশন হচ্ছিলো অসুস্থ হলে কি না। কিন্তু না! এখন দেখলাম আমার সাথে যেই ঝা*ড়াঝা*ড়ি করার, সেটাই করছো তুমি। তাই কনফার্ম হলাম সুস্থই আছো।"
ফাইজান হতভম্ব হয়ে গেলো শায়রার কথা শুনে। বলল,
"আমি মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করি? আর কখনো ভালো ব্যবহার করছি মানে আমি অসুস্থ? এটা একটা রোগ? তুই কি ইনডাইরেক্টলি আমায় মানসিক রোগী বলতে চাইলি?"
শায়রা দাঁতে জিভ কেটে বলল,
"আরে না না। সেরকম কখন বললাম? আমি কি একবারও বলেছি তুমি পাগল? পাগলদের মুখের উপর তাদেরকে কখনো পাগল বলতে হয়? মানবতার ব্যাপার আছে না একটা! আমি অতটাও অমানবিক নই।"
ফাইজান রেগে-মেগে বলল,
"চুপ কর! মানবতার জ্ঞান দিতে এসেছে আমার মানবতার ফেরিওয়ালি। তিনি এতই মানবতাবাদী যে লোকের সামনে নিজের বিবাহিত হওয়ার কথাটা অব্দি বলে না। সমস্যা কোথায় তোর?"
এবার হতভম্ব হওয়ার পালা শায়রার। তবুও ভীষণ নিষ্পাপ স্বরে জানালো,
"তুমি কথা ঘুরাচ্ছো কেন? আমরা তো তোমার সুস্থ, অসুস্থ হওয়ার টপিকে কথা বলছিলাম। তুমি আবার বিবাহিত-অবিবাহিত এর টপিকে গেলে কেন?"
ফাইজান শায়রার হাত টেনে আরও কাছে টানলো। তবে ফাইজানের হাত এখনো শায়রার হাত ছেড়ে অন্য কোথাও পৌঁছায় নি। সামান্য এতেই শায়রার ডাগর চোখগুলো আরও বিস্ফারিত হলো। ফাইজান বলল,
"কারণ আমি সুস্থ আছি। তাই ওই টপিকে কথা বলার প্রয়োজন মনে করছি না৷ এখন আমার কথার উত্তর দে।"
শায়রা স্বাভাবিক করতে চাইলো নিজেকে। ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইল,
"কি?"
ফাইজান সোজাসাপটা প্রশ্ন করলো,
"সবজায়গায় আমাকে এমন কাজিন, ফুপাতো ভাই বলে পরিচয় দিস কেন? ভাই বানানোর এত শখ লেগেছে কেন? বড় ভাইয়ের সম্মান দিয়েছিস কোনোদিন আমায়?"
শায়রা স্পষ্ট বুঝলো ফাইজানের সমস্যাটা কোথায়! চকিতে মনে হলো, তাহলে কি সে ধরে নিবে ফাইজান ওর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে? এক মুহুর্তের জন্য এই ভাবনা আসতেই পরবর্তী সময় আবার ভাবলো ফাইজান নিজে না আগানো পর্যন্ত ও কিছু বলবে না। এত দ্রুত ধরা দেয়ার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। তাই কিছুক্ষণ ভেবে-চিন্তে উত্তর দিলো,
"তাহলে বড় ভাইয়ের সম্মান দিবো তোমাকে? সবসময় বড় ভাইয়া, বড় ভাইয়া করে ডাকবো?"
চোখদু'টোতে একরাশ নিষ্পাপত্ব নিয়ে শায়রা তাকিয়ে রইলো ফাইজানের দিকে। আগুনে ঘি ঢালার মতো একটা কথা বলেও এমন ভান করলো যেন ভাজা মাছটাও উলটে খেতে জানে না। তবে মনে মনে প্রস্তুতি নিলো আরেকটা ঝা*ড়ি খাওয়ার। বিধিবাম!
শায়রাকে ভুল প্রমাণিত করে ফাইজান স্মিত হাসলো শুধু। এতেই আরও অবাক হলো মেয়েটা। বকা দেয়ার বদলে ফাইজানের হাসি দেখে আন্দাজ করতে পারলো না পরমুহূর্তে সে কি বলতে পারে! শায়রার বিস্ময়কে আরও প্রকট রূপ দিতেই যেন ফাইজান বলল,
"তুই এখন থেকে পাবলিক প্লেসে এমনকি সব জায়গায় ভাইয়া ডাকবি আমাকে, তাই তো? ওকে মেনে নিলাম। তবে এর বিপরীতে আমিও তোকে সবজায়গায় বউ, বউ বলে ডাকবো। আমি কিন্তু একদম দেখবো না আশেপাশে ছোটরা আছে নাকি মুরব্বিরা? তখন লোকসমাগমে তুই লজ্জায় পড়লে আমাকে কিছু বলতে পারবি না। জানিস তো, পুরুষ মানুষদের লজ্জা-শরম একটু কমই থাকে। তাই এই কাজটা করতে আমি বিন্দুমাত্র পিছু হটবো না, বউউউউ!"
তড়াক করে যেন লাফিয়ে উঠলো শায়রার হৃৎপিণ্ডটা। ফাইজানের টেনে-টেনে বউউ উচ্চারণটা কম্পন ধরিয়েছে হৃদয়ে। তার ধুকপুক শব্দ স্পষ্ট টের পাচ্ছে শায়রা। ফাইজানের বউ ডাকটা আরেকটু লম্বা হতো যদি না শায়রা ওর মুখ চেপে ধরতো।
মেয়েটা এতই লজ্জা পেয়েছে যে কূল হারিয়ে ডান হাতখানা চেপে ধরেছে ফাইজানের মুখে। বাম হাতটা এখনো ফাইজানের হাতের মুঠোয় বন্দি। সেটাকে ছাড়ানোর কোনো তাড়া নেই তাদের মধ্যে। শায়রা সময় নিচ্ছে হৃৎপিণ্ডের অস্থির স্পন্দন স্বাভাবিক করতে। মুহুর্তটুকুতে দু'জনে চেয়ে রয়েছে একে-অন্যের চোখের পানে। শায়রা বারকয়েক এলোমেলো পলক ফেললেও ফাইজানের চোখের পাতাদ্বয় নিষ্পলক। একাধারে চেয়ে রয়েছে শায়রার দিকেই। এতেই মেয়েটার হৃৎপিণ্ডের গতি স্বাভাবিক হওয়ার বদলে আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। একদিকে তুমুল ঝড় উঠছে মনে, অন্যদিকে বাহিরের প্রকৃতি ততোধিক শান্ত। অল্প-স্বল্প বাতাস শুধু। বিকেলের এই স্নিগ্ধ মুহুর্তটা লিখিত হলো ফাইজান-শায়রার নামে।